বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন

বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা

আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

আঁখি এবং আমরা ক'জন (১৭)

"ছোটদের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান TARiN (০ পয়েন্ট)



X মুহম্মদ জাফর ইকবাল যখন আমরা আঁখিকে শিখিয়ে দিলাম কেমন করে একেবারে স্বাভাবিক মানুষের মতো চলাফেরা করতে হয় খুব ভোরে আম্মু আমাকে ডেকে তুললেন। অন্য যে কোনোদিন হলে আমি অনেক ধরনের গাইগুই করতাম, “আর পাঁচ মিনিট” “আর এক মিনিট” বলে বিছানায় ঘাপটি মেরে পড়ে থাকতাম, আজকে তার কিছুই করলাম না। তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠে বসলাম। তাড়াতাড়ি উঠে বাথরুমে গেলাম, দাঁত ব্রাশ করে গোসল করে রেডি হয়ে গেলাম। ফুলি খালা রুটি টোস্ট আর ডিম পোচ করে দিলেন। অন্য যে কোনোদিন হলে খাওয়া নিয়ে কমপক্ষে আধা ঘণ্টা ঘ্যানঘ্যান করতাম, আজকে কিছুই করলাম না, গপগপ করে খেয়ে ফেললাম। কিছুক্ষণের মাঝে বাসার সামনে একটা গাড়ি এসে হর্ন দিল, আমি সাথে সাথে ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে গেলাম। ভাইয়া ঘুমিয়ে থাকল না হয় ঘুমের ভান করে পড়ে রইল। আল্লু ঘুম ঘুম চোখে বাইরে এসে বললেন, “সাবধানে থাকিস।” আম্মু আমার সাথে গাড়ি পর্যন্ত এলেন, গাড়ির দরজা খোলা ভেতরে সবাই বসে আছে। আমার ব্যাগটা পিছনে রাখা হল, আমি সামনের সিটে বসলাম। আম্মু বললেন, “সাবধানে থাকিস। দুষ্টুমি করিস না।” আমি বললাম, “করব না আম্মু।” আম্মু তখন আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, “ফি আমানিল্লাহ্।” তখন অন্য সবাই তাদের মাথা এগিয়ে দিয়ে বলল, “চাচি আমাকে! চাচি আমাকে!” আম্মু তখন সবার মাথায় হাত রেখে বললেন, “ফি আমানিল্লাহ্।” তারপর দরজা বন্ধ করা হল, ড্রাইভার স্টার্ট দিয়ে গাড়ি ছেড়ে দিল। অন্য সবাইকে আগেই তুলে নেওয়া হয়েছে, আমি শেষ জন। আমাকে তুলে নেবার পর গাড়ি সত্যি সত্যি চিটাগাংয়ের রাস্তায় রওনা দিল। আমি ভালো করে ভেতরে তাকালাম, ড্রাইভারের পাশে বসেছেন আঁখির আব্বুর ডান হাত জাবেদ চাচা। পিছনে বসেছেন নিশাত আপু। আমরা ছয়জন মাঝখানে। জাবেদ চাচা কাজের মানুষ, কাজের মানুষেরা মনে হয় কথা কম বলে। তাই জাবেদ চাচা মুখে তালা মেরে বসে থাকলেন। নিশাত আপু মোটাসোটা নাদুসনুদুস একজন মেয়ে। যারা মোটাসোটা নাদুসনুদুস হয় তারা সাধারণত হাসিখুশি হয়, নিশাত আপুও হাসিখুশি। আমরা ছয়জন ভ্রমণের উত্তেজনায় এত হইচই করছিলাম যে নিশাত আপু আমাদের সাথে কথা বলার চেষ্টা না করে আমাদের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসতে লাগলেন। যারা মোটাসোটা নাদুসনুদুস তাদের মনে হয় ঘুম অন্যদের থেকে বেশি। একটু পর দেখলাম গাড়ির সিটে মাথা রেখে মুখে মিটিমিটি হাসিসহ নিশাত আপু ঘুমিয়ে পড়েছেন। গাড়ি ছাড়তেই সুজন বলল, “আমি কিন্তু জানালার পাশে বসব।” রিতু বলল, “ঠিক আছে। তোর ইচ্ছে করলে তুই গাড়ির ছাদেও বসতে পারিস।” আঁখি বলল, “উঁহু। কেউ গাড়ির ছাদে বসে যেতে পারবে না। সেফটি ফাস্ট।” আমি বললাম, “খামোখা চেষ্টা করে লাভ নেই। সুজনকে যতই বোঝানোর চেষ্টা কর সে কোনো একটা ঝামেলা করবেই।” মামুন বলল, “সুজন যদি বেশি দুষ্টুমি করে আমরা ওকে নামিয়ে দিয়ে চলে যাব।” শান্তা বলল, “আমরা তখন গাড়ি করে যাব আর সুজন গাড়ির পিছনে দৌড়াতে দৌড়াতে আসবে।” দৃশ্যটা কল্পনা করে আমরা সবাই হি হি করে হাসতে থাকি। সুজন হাসল সবচেয়ে জোরে জোরে। আঁখি হাসতে হাসতে বলল, “উঁহু। কাউকে গাড়ি থেকে নামানো যাবে না। সেফটি ফাস্ট।” রিতু বলল, “সুজনকে নামিয়ে দিলেই গাড়ির সেফটি বেশি হবে। তুই কী বেশি সেফটি চাস না কী কম সেফটি চাস?” আঁখি বলল, “আমরা সুজনকেও চাই, সেফটিও চাই!” এইভাবে কথা বলতে বলতে আমাদের গাড়ি এগুতে থাকে। আমরা এতো ভোরে রওনা দিয়েছি–এখনো চারিদিকে ঠিকমতো আলো হয়নি, কিন্তু তার মাঝেই লোকজন কাজকর্ম শুরু করেছে। চায়ের দোকানগুলো খুলছে, চুলোয় আগুন দিচ্ছে। মাথায় বোঝা নিয়ে মানুষজন যাচ্ছে। রাস্তার পাশে হকাররা খবরের কাগজ ভাগাভাগি করছে, রিকশা নিয়ে রিকশাওয়ালারা বের হয়েছে। এক কথায় দেখেই বোঝা যায় শহরটা জেগে উঠছে। আমি জানালা দিয়ে বাইরে দেখতে দেখতে হঠাৎ করে বুঝতে পারলাম আঁখি এর কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। শুধু যে দেখতে পাচ্ছে না তা নয় কখনোই দেখতে পাবে না। দেখতে না পেলে কেমন লাগে বোঝার জন্যে মাঝে মাঝে আমি চোখ বন্ধ করে থাকি কিন্তু কিছুক্ষণের ভিতরে আমি ছটফট করতে থাকি, আমাকে চোখ খুলে ফেলতে হয়। আঁখি দিনের পর দিন এভাবে কাটিয়ে দিচ্ছে চিন্তা করে হঠাৎ আমার ওর জন্যে অন্য এক রকম মায়া হতে থাকে। আমি জানি আঁখি সবকিছু সহ্য করতে পারে কিন্তু কেউ ওর জন্যে মায়া করলে সেটা সহ্য করতে পারে না, সে চায় সবাই তাকে অন্য সবার মতোন দেখুক। আমরা সবাই সেটা বুঝে ফেলেছি তাই তাকে সবসময় অন্য সবার মতোন দেখি, কখনোই আলাদা করে দেখি না। অন্তত সেরকম ভান করি। রাস্তার একপাশ থেকে হঠাৎ একজন মানুষ দৌড় দিয়ে রাস্তা পার হল, ড্রাইভারকে এক মুহূর্তের জন্যে গাড়িকে ব্রেক কষে মানুষটাকে বাঁচাতে হল, আমরা সবাই একটা ঝাঁকুনি টের পেলাম, আঁখি বলল, “কী হল?” আমি বললাম, “একটা ছাগল রাস্তা পার হতে চেষ্টা করেছে।” মামুন বলল, “ছাগল না। মানুষ।” আমি বললাম, “যে মানুষ এভাবে গাড়ির সামনে দিয়ে দৌড়ে রাস্তা পার হয় সে মোটেও মানুষ না। সে আসলে ছাগল।” ঠিক তখন সত্যি সত্যি একটা ছাগল হেলতে দুলতে রাস্তার মাঝখানে চলে এল, ড্রাইভারকে আবার ব্রেক কষে পাশ দিয়ে যেতে হল, আবার আমরা সবাই একটা ঝাঁকুনি টের পেলাম। আঁখি আবার জিজ্ঞেস করল, “কী হল?” আমরা তার কথার উত্তর না দিয়ে হি হি করে হাসতে লাগলাম। আঁখি বলল, “কী হল? হাসিস কেন?” “আবার একটা ছাগল রাস্তা পার হতে চেষ্টা করছে।” “এর মাঝে হাসির কী হল?” মামুন বলল, “এটা সত্যিকারের ছাগল, যেটা চার পায়ে হাঁটে।” আমরা তখন মাঝে মাঝে আঁখিকে ধারাবর্ণনা দিতে থাকি। যেমন আমি বললাম, “আমাদের পাশ দিয়ে একটা বাস যাচ্ছে। বাসের পিছনের জানালা দিয়ে মাথা বের করে একজন টিশটাশ মহিলা হড়হড় করে বমি করছে।” রিতু বলল, “ছিঃ তিতু! তোর এগুলো বলার দরকার কী?” “যা দেখছি সেটাই বলছি। চোখ আছে বলে খালি আমাদের এই সব দৃশ্য দেখতে হবে, আঁখিকে দেখতে হবে না সেটা হতে পারে না।” আঁখি হি হি করে হেসে বলল, “দে, দে, ওকে বলতে দে।” উৎসাহ পেয়ে আমি বললাম, “আমরা এখন শহর থেকে বের হয়েছি। রাস্তার দুই পাশে ধান খেত, খাল, গাছপালা এগুলো দেখা যাচ্ছে। একজন মানুষ তার গেঞ্জিটা ওপরে তুলে ভুড়িটা বের করে সেটা চুলকাতে চুলকাতে দাঁত ব্রাশ করছে। কেন একই সাথে ভুঁড়ি চুলকাতে হবে আর দাঁত ব্রাশ করতে হবে সেটা বোঝা যাচ্ছে না। দাঁত ব্রাশ করা খুবই জরুরি কাজ কিন্তু কেন সেটা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে করতে হবে সেটাও আমি জানি না।” একটু পরে বললাম, “একজন মানুষ বদনা নিয়ে ছুটছে। এই যে সে মাঠের পাশে বসে গেল। সে এখন কী করছে সেটা বলতে চাই না” শান্তা আর রিতু গুম গুম করে আমার পিঠে কিল দিয়ে বলল, “অসভ্য অসভ্য!” একটু পরেই এই ধারাবর্ণনা দেওয়াটা আমাদের মাঝে একটা খেলার মতো হয়ে গেল। সবচেয়ে সুন্দর করে দিতে পারে রিতু, সে বলে, “আমাদের রাস্তাটা এখন ডান দিকে একটু বেঁকে গেল, সূর্যটা বাম দিকে সরে এসেছে। সূর্যটা এখনো কমলা রংয়ের, মনে হয় বিশাল মসুরের ডাল। সামনে থেকে দৈত্যের মতো একটা ট্রাক আসছে, এই যে, হুঁশ করে পাশ দিয়ে চলে গেল। মনে হচ্ছে সামনে একটা নদী। নদীতে পানি টইটম্বুর, এতো সকালেও একটা নৌকা হেলতে দুলতে যাচ্ছে। নদীর দুই ধারে সবুজ ধান খেত। সবুজ রংয়ের মাঝে যে এতো রকম শেড থাকতে পারে কে জানতো। কোনো কোনো ধান খেত হালকা সবুজ কোনোটা গাঢ়। টুকটুকে লাল রংয়ের ফ্রক পরা ছোট একটা মেয়ে কালো রংয়ের বিশাল একটা ষাঁড়কে নিয়ে যাচ্ছে। ষড়টার শিংগুলো ভয়ংকর, মনে হয় চলন্ত ট্রাককে গেঁথে ফেলবে, কিন্তু এই ছোট মেয়েটার কোনো ভয়ডর নেই। সে বিশাল ষাঁড়টাকে নিয়ে মাঠের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। বাজে রকমের একটা বাস আমাদের ওভারটেক করতে চাচ্ছে, শুধু হর্ন দিয়ে যাচ্ছে। সামনে দিয়ে আরো গাড়ি আসছে এখন ওভারটেক করা যাবে না কিন্তু বেয়াদপ বাসটা ওভারটেক করে ফেলছে, কী ভয়ংকর! আমাদের ড্রাইভার চাচা অবশ্যি খুবই সাবধানে গাড়ি চালাচ্ছেন। এই যে এখন আমরা ছোট বাজারের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি, বাজারে অনেক রকম সবজি। এখনো বাজার শুরু হয়নি সবাই আসছে চারিদিক দিয়ে। বাজারের কাছে একটা বাসস্ট্যান্ড, সেখানে লাল শাড়ি পরা একটা বউ! ইশ, কী সুন্দর বউ! একেবারে সিনেমার নায়িকার মতো। এতো সুন্দর বউটার হাজব্যান্ডটা একটু ভ্যাবলা ধরনের। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কান চুলকাচ্ছে…” রিতু যতক্ষণ খুশি ততক্ষণ বলে যেতে পারে। আমাদের মাঝে সবচেয়ে খারাপ ধারাবর্ণনা দেয় সুজন। সে বলে, “এ্যা ইয়ে আমরা এখন সামনে যাচ্ছি। হা সামনে যাচ্ছি। একটা সিএনজি ওভারটেক করলাম। এ্যা-এখন যাচ্ছি। সামনে যাচ্ছি। আরেকটা সিএনজি ওভারটেক করলাম। এ্যা এ্যা যাচ্ছি। দূরে আরেকটা সিএনজি সেটাকেও ওভারটেক করব। এ্যা ওভারটেক করলাম। এখন সামনে যাচ্ছি। এ্যা সামনে যাচ্ছি!…” . ঘণ্টা দুয়েক পরে হঠাৎ জাবেদ চাচা ড্রাইভারকে বললেন, “রতন, গাড়ি থামাও।” “এখানে?” “হ্যাঁ। সামনে রেস্ট এরিয়া। সবাই একটু রেস্ট নিবে, চা নাস্তা খাবে।” রতন ড্রাইভার বলল, “এক্ষুনি?” জাবেদ চাচা বললেন, “হ্যাঁ। স্যার বলে দিয়েছেন প্রতি দুই ঘণ্টা পরে থামতে হবে, একটু রেস্ট নিতে হবে। তোমার চা খেতে হবে।” “আমার লাগবে না স্যার, আরো এক দেড়শ কিলোমিটার যেতে পারব।” “না না।” জাবেদ চাচা মাথা নাড়লেন, “এই বাচ্চাকাচ্চার দায়িত্ব আমার। তুমি একটু পরে পরে থামতে থামতে যাবে। আমি কোনো রিস্ক নিব না।” কাজেই ড্রাইভার একটা রেস্ট এরিয়াতে থামল। পিছনে নিশাত আপু একেবারে কাদার মতো ঘুমাচ্ছিলেন, গাড়ি থামতেই আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠলেন। বললেন, “কোথায় থেমেছি? রেস্ট এরিয়াতে?” আমরা মাথা নাড়লাম। নিশাত আপু হাসি হাসি মুখে বললে, “গুড! সবাই নাম। একটু হাত-পা ছড়িয়ে নেওয়া যাক। বাথরুম ব্রেকফাস্ট সব সেরে ফেলা যাক।” আঁখি নামতে নামতে জিজ্ঞেস করল, “আশেপাশে কী অনেক মানুষ?” আমি বললাম, “হ্যাঁ একটা বাস থেকে নামছে।” আঁখি একটা ছোট নিশ্বাস ফেলে বলল, “আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে?” “অনেকেই।” “আমাকে দেখে আহা উঁহু করছে?” “এখনো করছে না। এখনো বুঝতে পারছে না।” আঁখি বলল, “যা বিরক্ত লাগে আমার! হোয়াইট কেনটা খুলতেই সবাই বুঝে যাবে আর আহা উঁহু শুরু করবে।” আঁখির কথা সত্যি, সে যেই মুহূর্তে তার ভাঁজ করা সাদা লাঠিটা খুলে হাতে নিয়েছে সাথে সাথে সবাই মাথা ঘুরিয়ে আঁখির দিকে তাকাল। আমরা দেখলাম চাপা গলায় আঁখিকে নিয়ে কথা বলছে। আমরা যখন ভেতরে গিয়ে বসেছি তখন বোকা ধরনের একজন বয়স্কা মহিলা হেঁটে আমাদের কাছে এসে বলল, “এই মেয়ে চোখে দেখে না? অন্ধ?” আমাদের ইচ্ছে হল মহিলাটার টুটি চেপে ধরি, কিন্তু সত্যি সত্যি তো আর কারো টুটি চেপে ধরা যায় না তাই দাঁতে দাঁত চেপে বললাম, “না, দেখতে পায় না।” “আহারে! কী কষ্ট।” আমরা কিছু বললাম না। ”তোমাদের কী হয়?” “বন্ধু।” বন্ধু শুনে মহিলাটা কেমন জানি বিরক্ত হল, কেন বিরক্ত হল বুঝতে পারলাম না। বলল, “বাবা কী করে?” আঁখির বাবা কী করে আমি ভালো করে জানি না, কিছু একটা উত্তর দিতে হয় তাই বললাম, “র্যাব। মাঝে মাঝে ক্রসফায়ার করে।” “ও আচ্ছা। র‍্যাব!” মহিলা একটু ঘাবড়ে গেল তারপর গম্ভীরভাবে মাথা নেড়ে আঁখির মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “মা, তুমি এই জিন্দেগিতে কিছু না পেলে কী হবে, আখেরাতে তুমি সব পাবে! অন্ধ মানুষের দোয়া আল্লাহ্ কবুল করে।” মহিলা চলে যাবার পর আঁখি বলল, “মিথ্যা কথা।” “কী মিথ্যা কথা?” “অন্ধ মানুষের দোয়া আল্লাহ্ কবুল করে।” “কেন?” “আমি দোয়া করেছিলাম এই মহিলার মাথায় যেন ঠাঠা পড়ে। পড়ে নাই।” আমরা হি হি করে হাসতে লাগলাম, রিতু বলল, “আরে গাধা এইটা তো বদ দোয়া! বদ দোয়া কবুল করে কেউ তো বলে নাই।” আমাদের টেবিলে নানারকম খাবার দিয়ে যায়। সকালে খেয়ে বের হয়েছি তারপরেও বেশ খিদে লাগছে। আমরা বেশ উৎসাহ নিয়ে খেতে শুরু করলাম, শুধু আঁখি পানির বোতল থেকে এক ঢোক পানি খেয়ে বলল, “বুঝলি, এই জন্যে আমি বাসা থেকে বের হতে চাই না।” কী বলতে চাইছে সেটা আমরা ঠিকই বুঝতে পারছিলাম তারপরেও রিতু জিজ্ঞেস করল, “কী জন্যে?” “এই যে আমাকে দেখেই আহা উঁহু শুরু করে দেয়! আমার এত বিরক্ত লাগে কী বলব। আমার কী ইচ্ছে করে জানিস?” “কী?” “আমি এমনভাবে বের হব যে কেউ আমাকে দেখে বুঝতে পারবে না যে আমি দেখতে পাই না, আর আমাকে দেখে আহা উঁহু করবে না।” আমি বললাম, “সেটা আর কঠিন কী? তুই তোর লাঠিটা ব্যবহার করিস না তা হলেই কেউ বুঝতে পারবে না।” “হ্যাঁ! আর হাঁটতে গিয়ে বাদুড়ের মতো এখানে সেখানে ধাক্কা ধুক্কা খাই!” “খাবি না। আমরা তোর কাছে থাকব। তোকে সবকিছু বলে দেব। দেখ চেষ্টা করে।” আঁখি কয়েক সেকেন্ড কী যেন চিন্তা করল তারপর বলল, “ঠিক আছে। দেখি চেষ্টা করে। কিন্তু মনে রাখিস আমি যদি আছাড় খেয়ে পড়ে দাঁত ভাঙি তা হলে কিন্তু তোরা দায়ী থাকবি।” আমি বললাম, “আছাড় খাবি না। আমরা কাছাকাছি থাকব তোকে পড়তে দিব না।” আমরা যখন আবার গাড়িতে ফিরে যাচ্ছিলাম তখন আঁখি তার ভঁজ করা লাঠিটা খুলল না। সেটা হাতে নিয়ে হেঁটে যাওয়া শুরু করল। রিতু তার একটু সামনে, আমি তার একটু পিছনে। আমি ফিসফিস করে তাকে বলে দিতে লাগলাম, “সামনে দরজা। তারপর সিঁড়ি। তিনটা সিঁড়ি এক দুই তিন। সোজা সামনে, ডান দিকে মানুষ, বাম দিকে সরে যা।“ সামনে একটা বাস থেমেছে, সেখান থেকে মানুষজন নামছে, তারা আমাদের দিকে একনজর তাকাল কিন্তু কেউ আগের মতো ঘুরে তাকাল না! রিতু বলল, “খুব ভালো হচ্ছে আঁখি, কেউ তোকে সন্দেহ করছে না। শুধু একটা জিনিস তোর ঠিক করতে হবে।” “কী জিনিস?” “তুই সবসময় এক দিকে তাকিয়ে থাকিস। তোকে এদিক-সেদিক তাকাতে হবে। সব মানুষ খামোখা এদিক-সেদিক তাকায়। যখন কারো সাথে কথা বলবি তখন তার দিকে তাকাবি।” আঁখি বলল, “ঠিক আছে।” আমরা আঁখিকে নিয়ে হেঁটে হেঁটে গাড়িতে এসে উঠলাম, কেউ একবারও আঁখির দিকে ঘুরে তাকাল না। সবাইকে নিয়ে আবার গাড়ি ছেড়ে দিল। আবার আমরা আঁখির জন্যে ধারা বিবরণী দিতে লাগলাম। দুই ঘণ্টা পর আবার গাড়ি থামল তখন আবার আঁখি স্বাভাবিক মানুষের মতো নেমে এল, আমরা সাবধানে তাকে হটিয়ে নিয়ে গেলাম, কেউ তার দিকে ঘুরে তাকাল না, কেউ আহা উঁহু করল না! . আমরা চট্টগ্রাম পৌঁছলাম দুপুরবেলা। একটা গেস্ট হাউসে বলে রাখা ছিল, আমরা সেখানে গিয়ে উঠেছি। দুপুরে খাওয়ার জন্যে নানা রকম আয়োজন। সারা রাস্তা আমরা খেতে খেতে এসেছি, পেটে খিদে নেই। তারপরেও আমাদের ডাইনিং টেবিলে বসে খেতে হল। খাওয়ার পর সবাই একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার আমরা রওনা দিয়ে দিলাম। সাধারণত গাড়ি ছাড়তেই নিশাত আপু সিটে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন, এবারে কেন জানি আর ঘুমালেন না। পিছনে বসে বসে আমাদের গল্পগুজবে মাঝে মাঝে যোগ দিতে লাগলেন। রিতু গুছিয়ে কথা বলতে পারে তাই সে নিশাত আপুর সাথে নানা বিষয়ে কথা বলতে থাকে। ডাক্তারি পড়া কি কঠিন, যখন লাশ কাটতে হয় তখন কি ভয় করে, যদি কোনো রোগী মারা যায় তখন কি মন খারাপ হয় এ ধরনের নানা রকম প্রশ্ন! শান্তা জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি আগে বান্দরবান গিয়েছেন?” নিশাত আপু হেসে বললেন, “কতো বার! আমার কিছু করার না থাকলেই বান্দরবানে চলে আসি।” সুজন জিজ্ঞেস করল, “বান্দরবানে কি বান্দর আছে?” “আছে। আগে আরো অনেক বেশি ছিল, এখন কমে গেছে।” মামুন সুজনকে বলল, “তুই যখন যাবি, তখন আবার একটা বেড়ে যাবে।” আমরা সবাই হাসলাম, সুজনও হাসল, বলল, “ঠিকই বলেছিস, আমার সবসময় মনে হয় মানুষ না হয়ে যদি বান্দর হয়ে জন্মাতাম তা হলে কী মজাটাই হত! সারা দিন এক গাছ থেকে আরেক গাছে লাফাতে পারতাম!” রিতু বলল, “তুই মন খারাপ করিস না। আমরা তোকে রেখে আসব। তুই মনের সুখে এক গাছ থেকে আরেক গাছে লাফাতে পারবি?” আমি নিশাত আপুকে জিজ্ঞেস করলাম, “বান্দরবানে আমরা কোথায় থাকব?” “নতুন একটা রিসোর্ট তৈরি হয়েছে সেখানে। ছোট চাচা, মানে আঁখির আব্বুর একজন বন্ধু তৈরি করেছেন। পাহাড়ের উপর একেবারে ছবির মতোন। নিচে তাকালে দেখা যায় শঙ্খ নদী।” সুজন বলল, “খাওয়া দাওয়া?” “সেখানেই হবে। খুব মজার খাবার তৈরি করে। আমি যতবার যাই ততবার খেয়েদেয়ে আরো মোটা হয়ে আসি!” সুজন জিজ্ঞেস করল, “জঙ্গলে বাঘ ভালুক আছে?” “গভীর জঙ্গলে নিশ্চয়ই বন্য পশুপাখি আছে। আমরা যেখানে থাকব সেখানে নেই। তোমার ভয় পাওয়ার কিছু নেই।” শান্তা জিজ্ঞেস করল, “আমরা সেখানে কী করব?” “তোমাদের ইচ্ছা। শঙ্খ নদীতে নৌকা করে গভীরে যেতে পার। পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি করে ঘুরে বেড়াতে পার। কিছু করার ইচ্ছে না করলে রিসোর্টের বারান্দায় চুপচাপ বসে থেকে জঙ্গলের শব্দ পাখির ডাক শুনতে পার।” আঁখি বলল, “সেটাও যদি করার ইচ্ছা না করে তা হলে বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে ঘুমাতে পারিস!” আমরা হি হি করে হাসলাম, সুজন বলল, “ইস! আমরা এতো দূর থেকে ঘুমানোর জন্যে এসেছি না কি?” . আমরা যখন বান্দরবানে আমাদের রিসোর্টে পৌঁছেছি তখন অন্ধকার হয়ে গেছে। পাহাড়ি রাস্তায় একেবারে গভীর জঙ্গলে অনেক দূর যাবার পর আমরা একটা বড় গেটের সামনে থামলাম। পাহাড় কেটে সিঁড়ি করা হয়েছে, সেই সিঁড়ি ধরে হেঁটে হেঁটে আমরা উপরে উঠে গেলাম। ভালো জামাকাপড় পরা একজন কমবয়সী মানুষ আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছিল, আমাদের দেখে ব্যস্ত হয়ে বলল, “এসো এসো, সবাই এসো। আমরা অনেকক্ষণ থেকে তোমাদের জন্যে অপেক্ষা করছি। ভেবেছিলাম তোমরা আরো আগে পৌঁছবে!” জাবেদ চাচা বললেন, “আমরা খুব ধীরে সুস্থে এসেছি ম্যানেজার সাহেব। কোথাও কোনো তাড়াহুড়ো করিনি। স্যার বলে দিয়েছিলেন প্রতি দুই ঘণ্টা পর থামতে।” “সেটাই ভালো।” ম্যানেজার সাহেব বললেন, “তোমরা এসো তোমাদের রুমগুলো দেখিয়ে দিই। তোমাদের ছয়জনের জন্যে আমি সবচেয়ে ভালো ঘরগুলো রিজার্ভ করে রেখেছি। একেবারে পাহাড়ের উপর দুইটা রুম, তিনজন তিনজন করে ছয়জন। এসো আমাদের সাথে। আমরা ম্যানেজারের পিছনে পিছনে হেঁটে যেতে থাকি। আঁখি রিতুকে ধরে হাঁটছে, আমি আঁখির পিছনে। রিসোর্টের দুইজন মানুষ পিছনে পিছনে আমাদের ব্যাগগুলো নিয়ে আসতে থাকে। আমরা গাছগাছালি ঢাকা একটা পথ দিয়ে হেঁটে হেঁটে মনে হয় আরো একটা পাহাড়ের উপর উঠে গেলাম। সেখানে কাঠের একটা বাসা, দুইপাশে দুইটা রুম। ম্যানেজার সাহেব রুমগুলো খুলে বললেন, একটাতে তিনজন অন্যটাতে তিনজন, নিজেরা নিজেরা ঠিক করে নাও কে কোথায় থাকবে।” রিতু একটা ঘরে ঢুকে এদিক-সেদিক তাকিয়ে বলল, “আমরা এইটাতে থাকব।” কাজেই আমি সুজন আর মামুন অন্যটা নিয়ে নিলাম। হোটেলের মানুষগুলো আমাদের ব্যাগগুলো নিয়ে এসেছে। তারা সেগুলো আমাদের রুমে পৌঁছে দিয়েছে। আঁখি জিজ্ঞেস করল, “নিশাত আপু আর জাবেদ চাচা, আপনারা কোথায় থাকবেন?” ম্যানেজার সাহেব বললেন, “পাশের রকে। তোমাদের কোনো ভয় নেই গাছপালায় আড়াল হয়ে আছে কিন্তু জোরে ডাক দিলেই শুনতে পাবে।” “আর ড্রাইভার চাচা?” “তাকে নিয়েও তোমার চিন্তা করতে হবে না। নিচে তার জন্যেও থাকার জায়গা আছে। তোমরা হাত-মুখ ধুয়ে রেডি হয়ে যাও, আমাদের নিচে ডাইনিং রুমে খাবার দিলে তোমাদের ডেকে নেব। আজকের মেনু স্যার টেলিফোনে ঠিক করে দিয়েছেন। কাল থেকে তোমরা বলবে কোন বেলায় তোমরা কী খেতে চাও।” ম্যানেজার সাহেব আমাদেরকে রেখে নিশাত আপু আর জাবেদ চাচাকে নিয়ে চলে গেলেন। আমরা নিজেদের রুমে ঢুকে হাত-মুখ ধুয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে নিলাম। বাথরুমে সাবান শ্যাম্পু টুব্রাশ টুথপেস্ট এমনকি দাড়ি কামানোর জন্যে রেজর পর্যন্ত আছে। আমাদের দাড়ি গজায়নি বলে ব্যবহার করতে পারব না! সবার জন্যে ধবধবে সাদা পরিষ্কার টাওয়েল। তিনটা বিছানা তিন দিকে। চাঁদরগুলোও ধবধবে সাদা। বড় কাঁচের জানালা, ভারী পর্দা। সুন্দর একটা টেবিল। ঘরটার মেঝে মনে হল কাঠ দিয়ে তৈরি, ঘরের বাইরে বড় বারান্দা সেখানে খুব সুন্দর হেলান দেওয়া চেয়ার। কিছুক্ষণের মাঝেই আঁখি, রিতু আর শান্তাও বের হয়ে এলো। আমরা তখন পাহাড় বেয়ে নিচে নেমে গেলাম। এক পাশে বড় ডাইনিং রুম, সেখানে আমাদের জন্যে আলাদা করে একটা টেবিল সাজানো হয়েছে। নিশাত আপু আর জাবেদ চাচা আগেই সেখানে বসে আছেন। ডাইনিং রুমের মাঝে আলাদা আলাদা টেবিলে আরো অনেকে বসে আছে। কেউ খাচ্ছে, কেউ খাবারের জন্যে অপেক্ষা করছে, কেউ খেয়ে গল্পগুজব করছে। আমাদের দিকে সবাই একনজর তাকিয়ে নিজেদের মাঝে ব্যস্ত হয়ে গেল। কেউ দ্বিতীয়বার ঘুরে তাকাল না। আঁখি একেবারে স্বাভাবিক মানুষের মতো হেঁটে এসেছে, চেয়ারে বসেছে গল্পগুজব করছে কেউ সন্দেহ করল না যে সে অন্যরকম। আঁখি ফিসফিস করে বলল, “বুঝলি? এই জীবনে প্রথম কেউ আমাকে দেখে আহা উঁহু করছে না! কী মজা।” আমি গলা নামিয়ে বললাম, “দেখিস, কেউ বুঝতেই পারবে না।” আমরা অনেক সময় নিয়ে খেলাম। তারপর নিজেদের রুমে ফিরে গেলাম। বারান্দায় চেয়ারগুলোতে বসে আমরা নিচু স্বরে গল্প করতে থাকি। আকাশে অপূর্ব একটা চাঁদ উঠেছে আর তার নরম জোছনা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। বাতাসে গাছের পাতা শিরশির করে নড়ছে। বহু দূর থেকে কোনো একটা বুনো প্রাণীর ডাক শুনলাম। মাথার উপর দিয়ে অনেকগুলো পাখি কেমন যেন দুঃখী গলায় ডাকতে ডাকতে উড়ে গেল। আমরা চুপচাপ বসে রইলাম। আঁখি প্রথমে গুনগুন করে তারপর নিচু গলায় গান গাইতে শুরু করল, “আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে–”। কী সুন্দর তার গলা। আঁখি তো জোছনা দেখছে না তা হলে কেমন করে জানল আমরা জ্যোৎস্না রাতে বনে এসেছি?


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ১১৮ জন


এ জাতীয় গল্প


Warning: mysqli_fetch_array() expects parameter 1 to be mysqli_result, boolean given in /var/sites/g/golperjhuri.com/public_html/story.php on line 344

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...