বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন

বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা

আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

আঁখি এবং আমরা ক'জন (১৬)

"ছোটদের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান TARiN (১০২৯ পয়েন্ট)



X মুহম্মদ জাফর ইকবাল যখন আঁখি তার আব্বুর কাছ থেকে ক্রিকেট টিমের জন্যে একটা অসাধারণ উপহার আদায় করল প্রত্যেকবারই ছুটির আগে আমি ছুটিতে কী কী করব তার একটা লম্বা লিস্ট করি, কোনোবারই সেই লিস্টের কোনো কিছুই করা হয় না। স্কুলের ছুটি শেষ হবার আগে প্রত্যেকবারই আমার মন খুঁতখুঁত করতে থাকে যে ছুটিতে কিছুই করতে পারলাম না। এইবার তাই বুদ্ধি করে ছুটির জন্যে কোনো কাজই রাখিনি, ঠিক করে রেখেছি এই ছুটিতে আমি কিছুই করব না, তা হলে ছুটি শেষ হবার পর মন খুঁতখুঁত করবে না। ম্যাডাম অবশ্যি প্রত্যেক ক্লাসের ছেলেমেয়েদের একটা বইয়ের লিস্ট ধরিয়ে দিয়েছেন, সবাইকে বলে দিয়েছেন ছুটিতে এই বইগুলো পড়তে হবে। গল্পের বই পড়া তো আর কাজ হতে পারে না তাই সেটা নিয়ে আমার কোনো দুশ্চিন্তা নেই। লাইব্রেরি থেকে একজন একেকটা বই ইস্যু করে নিয়েছে। এখন ছুটির মাঝে আমরা নিজেরা নিজেরা বইগুলো নিজেদের ভিতরে বদলাবদলি করে নিচ্ছি। একদিন সুজনের সাথে বই বদল করতে গিয়েছি, গিয়ে দেখলাম সে মহা উত্তেজিত। আমাকে দেখে হাত-পা নেড়ে বলল, “জানিস কি হয়েছে?” “কী হয়েছে?” “আমরা যে ক্রিকেট খেলায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম মনে আছে?” আমি মাথা নাড়লাম, “মনে থাকবে না কেন?” “আঁখির আব্লু সে জন্যে খুব খুশি হয়েছেন। খুশি হয়ে আঁখিকে বলেছেন আঁখি যেটা চাইবে সেটাই পাবে!” “কী মজা! আঁখি কী চেয়েছে?” “কী চেয়েছে সেটা শুনলে তুই ট্যারা হয়ে যাবি।” আমি বললাম, “আমি কেন ট্যারা হব?” সুজন বলল, “তুই বল দেখি আঁখি কী চেয়েছে?” আমি মাথা চুলকালাম। জন্মদিনে তার বাসায় গিয়ে আমি দেখেছি তারা, অসম্ভব বড়লোক। একজন মানুষের যা যা দরকার তার সবই সেই বাসায় আছে। আঁখি বেচারি যেহেতু চোখে দেখতে পায় না তাই অনেক জিনিস সে ব্যবহার করতে পারবে না। আমি চিন্তা করে বললাম, “একটা হনুমানের বাচ্চা?” সুজন আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল, “হনুমানের বাচ্চা?” “হ্যাঁ। হনুমানের বাচ্চা। ঠিকমতো ট্রেনিং দিলে সেটা আঁখির জন্যে কাজ করতে পারবে। ধর আঁখির একটা কলম দরকার, আঁখি বলবে, “এই গুলু-” “গুল?” “হ্যাঁ গুলু-হনুমানের নাম।” সুজন কেমন জানি রেগে উঠল, বলল, “হনুমানের নাম গুলু?” “কেন? হনুমানের নাম গুলু হতে পারে না?” সুজন কেন জানি আরো রেগে উঠল, বলল, “তোর নাম হওয়া উচিত গুলু।” এবারে আমিও রেগে উঠলাম, বললাম, “কেন আমার নাম কেন গুলু হবে?” “কারণ, তোর বুদ্ধি হচ্ছে হনুমানের মতো।” সুজন হাত-পা নেড়ে বলল, “আমি জিজ্ঞেস করলাম আঁখি তার আব্বুর কাছে কী চেয়েছে–আর তুই বললি হনুমান!” আমি রেগে বললাম, “হনুমানের বাচ্চা!” “ঠিক আছে হনুমানের বাচ্চা! একজন মানুষ যদি নিজে হনুমান না হয় তা : হলে সে হনুমানের বাচ্চার কথা বলতেই পারে না।” আমার সাথে সুজনের একটা মারামারি লেগে যেত–কিন্তু ঠিক তখন সুজনের আম্মু আমাদের জন্যে নাস্তা নিয়ে ঘরে ঢুকলেন তাই মারামারিটা লেগে গেল না, আমরা নাস্তা খেতে ব্যস্ত হয়ে গেলাম। নাস্তা খাওয়ার পর আমাদের মেজাজ একটু ঠাণ্ডা হল, তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আঁখি কী চেয়েছে তার আব্বুর কাছে?” “আঁখি তার আব্বুকে বলেছে আমাদের পুরা ক্রিকেট টিমকে কক্সবাজার রাঙামাটি বান্দরবান নিয়ে যেতে!” “সত্যি?” “হ্যাঁ।” “তার আব্বু রাজি হয়েছে?” “হবেন না কেন?” সুজন দাঁত বের করে হেসে বলল, “তার মানে আমি, বজলু, আশরাফ, মামুন, রিতু, শান্তা আর আঁখি কক্সবাজার রাঙামাটি আর বান্দরবান যাব। কী মজা!” আমি চমকে উঠলাম, আমার নাম বলেনি! তখন মনে পড়ল সত্যিই তো আমি ক্রিকেট টিমে নাই-কিন্তু আমি যদি ঝুনঝুন বলটা আবিষ্কার না করতাম তা হলে কী আঁখি ক্রিকেট খেলতে পারত? তা হলে আমি কেন যেতে পারব না? কিন্তু আমাকে যদি নিতে না চায় তা হলে আমি কী করব? সুজন ফ্যাক ফ্যাক করে হাসতে হাসতে বলতে থাকে, “কী মজা হবে! আঁখির আব্বু সব ব্যবস্থা করে দিবে, আমরা এয়ারকন্ডিশান গাড়ি করে যাব, হাইফাই হোটেলে থাকব, হাম বার্গার, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, চপ কাটলেট এইগুলো খাব, ঘুরে বেড়াব। চিন্তা করেই আমার ঘুম হচ্ছে না!” আমি শুকনো মুখে বললাম, “আঁখি তোদের সবার সাথে কথা বলেছে?” “এখনো বলে নাই। তারিখটা ঠিক হলেই বলবে।” “তোদের বাসা থেকে পারমিশান দিবে?” সুজন চোখ কপালে তুলে বলল, “দিবে না কেন?” আমি বললাম, “না–মানে ইয়ে–” কথাটা শেষ না করেই আমাকে থেমে যেতে হল। সত্যিই তো এরকম চমৎকার একটা ব্যাপার সেখানে যেতে বাসা থেকে পারমিশান দেবে না কেন? আমি বাসায় ফিরে আসলাম খুবই মন খারাপ করে। আমি ইচ্ছে করলেই ক্রিকেট টিমে থাকতে পারতাম–মামুন আর আশরাফের থেকে আমি মোটেও খারাপ খেলি না কিন্তু তাদের অনেক বেশি আগ্রহ ছিল দেখে আমি তাদের জন্যে ছেড়ে দিয়েছিলাম। এখন সেই জন্যে আমি পড়ে থাকব আর তারা রাঙামাটি, বান্দরবান আর কক্সবাজার বেড়াতে যাবে? পৃথিবীতে এর থেকে বড় অবিচার আর কী হতে পারে? পরের কয়েকদিন আমি ছাড়া ছাড়াভাবে এর কাছ থেকে ওর কাছ থেকে নানা রকম খবর পেতে থাকি। সুজন যেটা বলেছে সেটা সত্যি। ক্রিকেট টিমের সবাইকে আঁখির আব্বু এক সপ্তাহের জন্যে রাঙামাটি, বান্দরবান আর কক্সবাজার নিয়ে যাচ্ছেন। কীভাবে কী করা হবে সেটা ঠিকঠাক করার জন্যে পরশুদিন সবাই আঁখিদের বাসায় যাবে কথাবার্তা বলতে। সবার সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে–আমাকে কেউ কিছু বলেনি। যার অর্থ আমাকে ছাড়াই যাওয়া হবে। আমি ভাবলাম লজ্জার মাথা খেয়ে আমি আঁখিদের বাসায় গিয়ে আঁখির আবুকে বলি, “প্লীজ প্লীজ, আমাকে নিয়ে যান! আমি হয়তো ক্রিকেট টিমে নাই, কিন্তু আমি যদি ঝুনঝুন বলটা তৈরি করে না দিতাম তা হলে আঁখি ক্রিকেট খেলতে পারত না।” কিন্তু সত্যি সত্যি তো আর সেটা করা যায় না। পুরো ব্যাপারটা চিন্তা করে আমার খুব অভিমানও হল–আমি না হলে কিছুই হত না-অথচ আমাকে ছাড়াই সবাই আনন্দ করতে যাচ্ছে। অন্য সবার কথা ছেড়ে দিলাম, আঁখি কি তার আব্বুকে একবারও বলতে পারে না যে আমাকে নিয়ে যাওয়া হোক? আমি হিসেব করে বের করলাম কখন আঁখিদের বাসায় সবাই যাচ্ছে, সেই সময়টা আমি টেলিফোনের কাছাকাছি থাকলাম। মনে মনে আশা করতে লাগলাম হঠাৎ করে টেলিফোন বেজে উঠবে আর আঁখি ফোন করে বলবে, “তিতু তুই চলে আয়! তোকেও আমরা নিয়ে যাব।” কিন্তু টেলিফোন বাজল না। রাতে সুজন ফোন করে বকবক করতে লাগল, “বুঝলি তিতু, আমরা রওনা দিব খুব ভোরে। সকালে নাস্তা করা হবে রেস্ট এরিয়াতে। ডিম পরোটা আর সবজি। সাথে গরম চা। দুপুরের খাওয়া হবে চিটাগাংয়ে। গাড়িতে সবরকম খাবার থাকবে। পনেরোজনের বিশাল গাড়ি। ড্রাইভারের পাশে বসবে জাবেদ আঙ্কেল। আমরা পিছনে। জাবেদ আঙ্কেল হচ্ছে আঁখির আব্বুর ডান হাত, সবকিছুর ব্যবস্থা করে দেবে। জাবেদ আঙ্কেল ছাড়াও যাবে নিশাত আপু। নিশাত আপু হচ্ছে আঁখির কাজিন। মেডিকেলে পড়ে-হাফ ডাক্তার, আমাদের দেখে শুনে রাখবে। চিটাগাংয়ে একটা রেস্ট হাউজে আমরা লাঞ্চ করব–তারপর আবার রওনা। প্রথমে রাঙামাটি না কী প্রথমে বান্দরবান সেটা নিয়ে বিশাল আলোচনা হল, শেষে ভোটাভুটি। আমি বান্দরবান ভোট দিয়েছিলাম, ভোটে বান্দরবান জিতে গেল। হা হা হা!…” সুজন টানা কথা বলে যেতে থাকে আমি শেষের দিকে কিছু শুনছিলাম না, আমার চোখে শুধু পানি এসে যেতে থাকে। খাবার টেবিলে আমি কোনো কথা না বলে চুপচাপ খেলাম, ভাইয়া বকবক করে গেল। আম্মু একসময় জিজ্ঞেস করলেন, “তিতু তুই এতো চুপচাপ তোর শরীর খারাপ না কি?” আমি মাথা নাড়লাম, “না শরীর খারাপ না।” ফুলি খালা বলল, “তিতুর কিছু একটা হয়েছে। কয়দিন থেকে চুপচাপ, খালি কী যেন চিন্তা করে।” আম্মু আবার জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে তিতু। বল আমাদের।” আমি বললাম, “কিছু হয়নি। তারপর অনেক কষ্টে চোখের পানি লুকালাম। আমার মন খারাপ দেখে ভাইয়ার খুব আনন্দ হচ্ছে মনে হল, আমার দিকে বাঁকা চোখে তাকায় আর খ্যাক খ্যাক করে হাসে। খাওয়া শেষ করে আমি তাড়াতাড়ি বিছানায় শুয়ে পড়েছি। চোখে ঘুম আসছে না, প্রচণ্ড অভিমানে আমার বুকটা প্রায় ভেঙে যাচ্ছিল আঁখি অন্তত একবার ফোন করে আমার সাথে কথা বলতে পারত। ঠিক এরকম সময় ফোন বাজল, ফোন ধরল ফুলি খালা। তারপর আমার বিছানার কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, “তিতু, তুমি জাগা না ঘুম।” আমি উঠে বসলাম, “কেন?” “তোমার ফোন।” “কে?” “একটা মেয়ে। নাম আঁখি।” আমি একবার ভাবলাম বলি, গিয়ে বলে দাও ঘুমিয়ে আছি। শেষ পর্যন্ত বললাম না, গিয়ে ফোন ধরলাম, “হ্যালো।” অন্যপাশ থেকে আঁখি বলল, “তিতু?” “হ্যাঁ।“ আঁখি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “বুঝলি তিতু, যতবার চিন্তা করছি তুই যেতে পারবি না আমার মনটাই খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আমার মনে হচ্ছে আমরা প্রোগ্রামটা চেঞ্জ করি-তুই তোর গ্রামের বাড়ি থেকে ফিরে এলে তারপরে যাই–” আমি বললাম, “গ্রামের বাড়ি? কীসের গ্রামের বাড়ি?” আঁখি বলল, “তুই যে তোর ফ্যামিলির সাথে গ্রামের বাড়ি যাবি।” আমি অবাক হয়ে বললাম, “আমি গ্রামের বাড়ি যাব?” “হ্যাঁ। আমার আব্বু সেই যে ফোন করল, তোর ভাইয়ের সাথে কথা বলল। তোর ভাই বলল তোরা গ্রামের বাড়ি যাচ্ছিস। তুই যেতে পারবি না–” আমার মাথার মাঝে চন্ন করে রক্ত উঠে গেল। তার মানে ভাইয়া আঁখির আব্বুর সাথে মিথ্যা কথা বলেছে যেন আমি যেতে না পারি। আমি অনেক কষ্ট করে নিজেকে শান্ত করলাম, তারপর ঠাণ্ডা গলায় বললাম, “আমরা কোথাও যাচ্ছি না। আমরা এখানেই আছি।” “তার মানে তুই যেতে পারবি?” আঁখি চিৎকার করে বলল, “আমাদের সাথে যেতে পারবি?” “আবু আম্মু যদি রাজি হন-” “সেটা আমাদের উপর ছেড়ে দে।” আমি শুনলাম আঁখি ”ইয়াহু” বলে একটা চিৎকার করল। তারপর চিৎকার করে তার আব্বুকে ডাকতে লাগল। আমি শুনতে পেলাম আঁখি উত্তেজিত গলায় তার আব্বুর সাথে কথা বলছে, কিছুক্ষণ পর আঁখির আব্বু ফোন ধরলেন, “হ্যালো তিতু?” “জি চাচা।” “তোমার আব্বু আম্মু কি জেগে আছেন?” “জি চাচা জেগে আছেন।” “একটু কি কথা বলা যাবে যে কোনো একজনের সাথে?” আমি উত্তেজিত গলায় বললাম, “যাবে চাচা। যাবে। আপনি একটু ধরেন।” আমি প্রায় ছুটে গেলাম আব্বুর কাছে, যাবার সময় দেখলাম, ভাইয়া পড়ার টেবিলে বইয়ের উপর ঝুঁকে বসে পড়ার ভান করছে, কিন্তু তার চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে আসলে টেলিফোনে আমার প্রত্যেকটা কথা খুব মন দিয়ে শুনছে। তার চেহারার মাঝে একটা চোর চোর ভাব। আব্বু এসে ফোন ধরলেন, আমি কাছে দাঁড়িয়ে রইলাম। আব্বু একটু কথা শুনেই বললেন, “না, না–আপনার কষ্ট করে আসতে হবে না, ফোনেই বলতে পারেন।” আঁখির আব্বু মনে হল জোর করলেন, বাসায় এসে কথা বলতে চান। আব্বু তখন আর না করলেন না। আম্মুকে ডেকে বললেন, “তিতুর ক্লাসে আঁখি নামের যে মেয়েটা পড়ে তার আব্বু আসছেন।” “এতো রাতে কেন?” “ক্লাসের কয়েকজনকে নিয়ে চিটাগাং হিলট্রাক্সে বেড়াতে যাবে, তাই তিতুকে নিয়ে যেতে চাচ্ছেন। আমাদের পারমিশানের জন্যে।” “পারমিশানের কী আছে?” আম্মু বললেন, “সবাই মিলে বেড়াতে যাবে, ভালোই তো।” আবু বললেন, “ভদ্রলোক খুব সিরিয়াস টাইপের। বললেন আপনার ছেলেকে নিয়ে যাব, পুরো ব্যবস্থাটা শুনেন যেন আপনাদের মনে কোনোরকম দুশ্চিন্তা না থাকে।” “তাই বলে এতো রাতে?” আব্লু ইতস্তত করে বললেন, “আমি ঠিক বুঝলাম না, বললেন কী যেন ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে, কেন জানি মনে করেছিলেন আমরা গ্রামের বাড়ি যাব তিতুকে নিয়ে। সেই জন্যে আমাদের বলা হয়নি–অন্য সবাই রেডি। তিতু না কি কী একটা বল তৈরি করে দিয়েছে তার মেয়েকে, সেই বল দিয়ে মেয়ে না কি ক্রিকেট পর্যন্ত খেলতে পারে। তাই তিতু ছাড়া যাবে সেটা না কি চিন্তাই করতে পারছেন না।” আম্মু বললেন, “কিন্তু আমরা গ্রামের বাড়ি যাব সেই কথাটা কেন আসছে–” আমি বলতে গেলাম, “ভাইয়া–” কিন্তু বললাম না, থেমে গেলাম। পুরো ব্যাপারটা মিটে যাক তারপর দেখা যাবে। আঁখির আব্বু আর আম্মু দুজনেই চলে এলেন, আল্লু আর আম্মুর সাথে কথা বললেন, এমনভাবে কথা বললেন যে মনে হল আমি বুঝি খুবই গুরুত্বপূর্ণ মানুষ আর আমাকে যেতে দিয়ে আমার আব্বু আম্মু আঁখির আব্বু আম্মুকে কৃতার্থ করে দিলেন। কাজের কথা শেষ হবার পর অন্য গল্পগুজব হল, তারা আঁখিকে নিয়ে কথা বললেন, আগে কেমন মন খারাপ করে থাকত, আমাদের স্কুলে আসার পর কেমন হাসিখুশি থাকে এই রকম গল্প। . রাত্রে ঘুমানোর সময় যখন আশেপাশে কেউ নেই তখন আমি ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করলাম, “ভাইয়া তুমি আঁখির আব্বুকে মিথ্যা কথা কেন বলেছিলে?” ভাইয়া আমতা আমতা করে বলল, “আ-আ-আমি আসলে আসলে-” কথা শেষ না করে ভাইয়া থেমে যায়। আমার দিকে পিটপিট করে তাকিয়ে ভাঙা গলায় বলল, “প্লীজ তিতু তুই আম্বু আম্মুকে বলিস না। প্লীজ প্লীজ-আমি আর কোনোদিন করব না। খোদার কসম–” আমি অবাক হয়ে ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে রইলাম। সারাটা জীবন ভাইয়া আমাকে জ্বালিয়ে গেছে, হঠাৎ করে আমি আবিষ্কার করলাম ভাইয়া আসলে খুবই দুর্বল অপদার্থ, ফালতু একজন মানুষ। তার উপর রাগ করে লাভ নেই, তার জন্যে বরং মায়া হতে পারে। আমার তখন হঠাৎ করে এই দুর্বল হতভাগা ভাইটার জন্যে এক ধরনের মায়া হল। আহা বেচারা! . পরের দিন ঘুম থেকে উঠেই আমি আমার ক্লাসের সবার সাথে কথা বলতে শুরু করলাম, তখন সবকিছু আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। আমার সাথে কেউ যোগাযোগ করছিল না কারণ সবাই বুঝতে পেরেছিল আমি যেতে পারব না বলে নিশ্চয়ই আমার খুব মন খারাপ, এখন যদি অন্যেরা সেটা নিয়ে কথা বলে তা হলে আমার আরো মন খারাপ হবে। যে জিনিসটা কেউ ঠিক করে বুঝতে পারছিল না সেটা হচ্ছে আমাদের যদি আসলে গ্রামের বাড়ি যাবার কথা না থাকে তা হলে কেন ভাইয়া সেটা বলল। ভাইয়া চায় না আমি যাই সেই জন্যে এতো বড় মিথ্যা কথাটা বলেছে সেটা বলতে আমার লজ্জা হল তাই আমি আরেকটা ছোট মিথ্যা কথা বললাম। আমি তাদের বললাম, “এই ধরনের একটা আলোচনা হচ্ছিল ভাইয়া তারিখটা ভুলে গোলমাল করে ফেলেছে।” তবে ভাইয়া আমাকে নিয়ে যে মিথ্যা কথাটা বলেছে বজলুর জন্যে সেটা সত্যি হয়ে গেল। বজলুর নানা খুব অসুস্থ, ডাক্তার জবাব দিয়ে গেছে। যে কোনো মুহূর্তে মারা যাবেন তাই বজলুর বাসার সবাই তার নানাকে শেষ দেখার জন্যে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছে। বজলুকেও যেতে হবে। তার মানে সে আমাদের সাথে যেতে পারবে না। বজলুর সাথে কথা বলে বোঝা গেল মারা যাবার জন্যে এরকম একটা সময় বেছে নেবার জন্যে বজলু কোনোদিন তার নানাকে ক্ষমা করবে না। বজলুর মতোই ফাটা কপাল হল আশরাফের। ঠিক এই সময়টাতে তার বোনের বিয়ে। তার উপর যদি ছেড়ে দেওয়া হত তা হলে সে নিঃসন্দেহে বোনের বিয়েতে হাজির না থেকে আমাদের সাথে রাঙামাটি, বান্দরবান আর কক্সবাজার যেত। কিন্তু এই বিষয়গুলো আমাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয় না, বড়রা ঠিক করে, তাই আশরাফেরও যাওয়া হল না। দেখা গেল সব মিলিয়ে যাব আমরা ছয়জন, ছেলেদের মাঝে আমি, সুজন আর মামুন। মেয়েদের মাঝে রিতু, শান্তা আর আঁখি। আঁখির আব্বু খুবই গোছানো মানুষ, কবে কোথায় যাওয়া হবে, কোথায় থাকা হবে, সাথে কী নিতে হবে–সবকিছু কাগজে টাইপ করে লিখে দিয়েছেন। অন্যেরা আগেই সেই লিস্ট পেয়ে গেছে, সাথে যা যা নেওয়ার কথা সেগুলো জোগার করে তারা রেডি হয়ে গেছে। আমি শেষ মুহূর্তে পেয়েছি কিন্তু সেই জন্যে আমার সেরকম কোনো সমস্যা হয়নি। লিস্টটি খুবই সহজ, নিজের জামা কাপড় ছাড়া তেমন কিছু নেই। বাকি যা কিছু লাগবে সবকিছু আমাদের জন্যে ম্যানেজ করে নেওয়া হবে। আমি অবশ্যি নিজে খুঁজে খুঁজে কিছু জিনিস নিয়ে নিলাম। ছবি তোলার জন্যে আব্বুর ক্যামেরা, পড়ার জন্যে গল্পের বই, রোদ থেকে বাঁচার জন্যে বেস বল ক্যাপ, চোখে দেওয়ার জন্যে কালো চশমা, ছবি আঁকার জন্যে রং তুলি, লেখালেখি করার জন্যে কাগজ কলম, ভ্রমণের কাহিনী লেখার জন্যে ডাইরি, ছোটখাটো কাটাকুটি করার জন্যে ছোট চাকু, পেট খারাপ হলে খাবার জন্যে খাবার স্যালাইন, জ্বর সর্দি কাশির জন্যে প্যারাসিটামল, দাঁত ব্রাশ করার জন্যে টুথপেস্ট, টুথব্রাশ, চুল আঁচড়ানোর জন্যে চিরুনি। যেদিন রওনা দেব তার আগের রাতে আমার চোখে ঘুমই আসতে চায় না! শেষ পর্যন্ত যখন ঘুমিয়েছি তখন ঘুমটা হল ছাড়া ছাড়া, সারা রাত স্বপ্ন দেখলাম গাড়ি করে যাচ্ছি আর গাড়িটা থেমে যাচ্ছে, ধাক্কা দিয়ে দিয়ে নিয়ে যাচ্ছি সকলে মিলে!


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৪৪ জন


এ জাতীয় গল্প


Warning: mysqli_fetch_array() expects parameter 1 to be mysqli_result, boolean given in /var/sites/g/golperjhuri.com/public_html/story.php on line 344

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...