বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন

বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা

আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

আমার সাইন্টিস মামা (২০)

"ছোটদের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান TARiN (১০২৯ পয়েন্ট)



X মুহম্মদ জাফর ইকবাল আমি টানা আধঘণ্টা হেঁটে গেলাম কিন্তু গাইগার কাউন্টার শব্দ এতটুকু বাড়ল না। আমি আস্তে আস্তে অনুমান করতে শুরু করলাম যে গাইগার কাউন্টারে কট কট শব্দ বেড়ে যাওয়ার কোনো চান্স নেই, বিষয়টা নিশ্চয়ই গুপ্তধন পাওয়ার মতন। আসলে তো আর কেউ সত্যি সত্যি গুপ্তধন খুঁজে পায় না শুধু এর গল্প শোনা যায়, আমারও সেই অবস্থা আমি খালি খুঁজে বেড়াব। কে জানে মামা হয়তো সেটা আগে থেকেই জানে, আমাকে ব্যস্ত রাখার জন্য কোনো একটা ফালতু যন্ত্র আমার হাতে দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে। এটা হয়তো আসলে গাইগার কাউন্টারই না, অন্য কিছু। কিংবা কে জানে আসলে হয়তো গাইগার কাউন্টার বলে পৃথিবীতে কিছু নাই, মামা বানিয়ে বানিয়ে কিছু একটা বলে আমাকে বোকা বানানোর চেষ্টা করছে। পরে যখন বাসায় যাব তখন আমাকে কীভাবে বোকা বানিয়েছে সেটা নিয়ে সবার সাথে গল্প করে হাসাহাসি করবে। মামার অসাধ্য কিছু নাই। যাই হোক, এখন সেটা নিয়ে কিছু করার নেই। হাঁটতে যখন বের হয়েছি তখন হেঁটেই যাই। কাজেই আমি হাঁটতে থাকলাম। হাতের গাইগার কাউন্টারটা শুরুতে হালকাই ছিল, কিন্তু যতই হাঁটছি এটা ততই ভারি হতে শুরু করেছে। যদি বেশি ভারি হয়ে যায় তাহলে আর হাতে করে টানা যাবে না। পিছনের ব্যাকপেকে রেখে দেব, সেখান থেকে যথেষ্ট স্পষ্টভাবে কটকট শব্দ শোনা যাবে। এটাকে যে হাতে রাখতেই হবে সেটা কে বলেছে? এর কটকট শব্দটা শুনতে পেলেই হলো। শুধু যে গাইগার কাউন্টারটা আস্তে আস্তে ভারী হতে শুরু করেছে তা নয় রোদটাও কেমন যেন গরম হতে শুরু করেছে। প্রথম প্রথম মিষ্টি একটা রোদ ছিল। সেটা এখন আর যাই হোক মিষ্টি নেই, রীতিমতো ঝাল’ অর্থাৎ গরম! আশেপাশে কেউ নেই তাই ইচ্ছে করলে শার্ট খুলে খালি গা হয়ে যেতে পারি। শুধু তাই না চিৎকার করে গানও গাইতে পারি কিন্তু আমি সেসব কিছু করলাম না, আমি ঘাড় গুঁজে হাঁটতে লাগলাম। পুরো এলাকাটা ফাঁকা। মাঝে মাঝে কিছু অদ্ভুত জন্তু জানোয়ার দেখা যায়। ইঁদুরের মতো কিন্তু ইঁদুর নয় সেরকম একটা জন্তুকে তাদের বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে ঘুরে বেড়াতে দেখলাম। মোটাসোটা একটা গুই সাপ খুবই ধীরে সুস্থে আমার সামনে দিয়ে হেঁটে গেল, আমার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল কিন্তু ভয় পেল বলে মনে হলো না। পুঁইসাপ যে একটু পরপর জিব বের করে আমি সেটা জানতাম না। জলা জায়গা অনেক ব্যাঙ, কাছাকাছি গেলে এক সাথে পানির মাঝখানে ঝাঁপ দেয়। গাছে অনেক পাখি কিচিরমিচির করছে, তবে পাখি থেকে বেশি মজার জিনিস বানর, এদের হাবভাব এতো মানুষের মতো যে দেখে অবাক হয়ে যাই। একটা বানর আমার দিকে তাকিয়ে মুখ ভেংচি দিল, বানর যে পাজি ছেলেদের মতো মুখ ভেংচি দিতে পারে আমি জানতাম না। আমি গরমে ঘামতে ঘামতে হাঁটতে থাকলাম। একটা বড় হাওড় পর্যন্ত গিয়ে আবার ঘুরে ফিরে আসতে লাগলাম। মোটামুটি অনেকটুকু জায়গা দেখে ফেলেছি, এর মাঝে কোনো রেডিও একটিভিটি নেই। আমি এখন মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেছি যে কোথাও কিছু পাওয়া যাবে না। সাইন্টিস্টদের জীবনে কোনো আনন্দ নেই, উত্তেজনা নেই, আছে শুধু রোদের মাঝে হাঁটা, কী আশ্চর্য। আমি কতক্ষণ হেঁটেছি জানি না, রোদ থেকে বাঁচার জন্য বড় একটা গাছের নিচে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেবার জন্য যাচ্ছিলাম তখন একেবারে ভূতের মতো হঠাৎ করে কোথা থেকে জানি একজন মানুষ বের হয়ে এলো। আমি তাকে দেখে যত অবাক হয়েছি মনে হলো সে আমাকে দেখে তার থেকে বেশি অবাক হয়েছে। সে চমকে উঠে প্রায় চিৎকার করে বলল, “কে? কে তুমি?” মানুষটাকে হঠাৎ করে দেখে আমি নিজেও চমকে উঠেছিলাম, কয়েক সেকেন্ড লাগল শান্ত হতে। মানুষটার মাথায় টুপি, থুতনির মাঝে একুশ বাইশটা দাড়ি। (যার দাড়ি এতো কম সে কেন দাড়ি রাখে সেটা একটা রহস্য)। মানুষটার কাছে একটা ছাতা, আমাকে দেখে ছাতাটা অস্ত্রের মতো ধরে রেখেছে। বোঝা যাচ্ছে দরকার হলে সে এই অস্ত্র নিয়ে আমাকে আক্রমণ করে ফেলবে। মানুষটার চোখে মুখে কেমন জানি ভয়ের চিহ্ন, আমি তার অর্ধেক সাইজ আমাকে দেখে ভয় পাওয়ার কী আছে বুঝতে পারলাম না। মানুষটা তার ছাতাকে বন্দুকের মতো করে আমার দিকে তাকিয়ে গলা উঁচিয়ে বলল, “বল, বল। কে তুমি? কোথা থেকে এসেছ? এখানে কী কর?”। আমি একটু ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম। মানুষটা আমাকে যে প্রশ্নগুলো করেছে তাকে খুশি করার মতো সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমার জানা নেই। আমি যেটাই বলব এই মানুষটার কাছে তার কোনো অর্থ নেই। কিন্তু তবু কিছু একটা বলতে হবে, বললাম, “আমি এইখানে ঘুরতে এসেছি।” মানুষটা উত্তর শুনে খুশি হলো কি না বুঝতে পারলাম না। ছাতাটা বন্দুকের মতো ধরে রেখে কেমন যেন কার্টুনের মতো ছোট ছোট লাফ দিয়ে বলল, “তোমার হাতে অস্ত্র কেন? খবরদার আমার দিকে অস্ত্র ধরবে না।” আমি একবার খাবি খেলাম, আমার হাতে অস্ত্র? তখন বুঝতে পারলাম আমার হাতের গাইগার কাউন্টারের সামনে যেহেতু একটা টিউব আছে সেই জন্য এটাকে মানুষটা কোনো একটা অস্ত্রের নল ভাবছে। টিউবটা সামনের দিকে মুখ করে আছে তাই মানুষটা ভাবছে অস্ত্রটা তার দিকে তাক করে রেখেছি। আমি গাইগার কাউন্টারের টিউবটা ঘুরিয়ে বললাম, “এইটা অস্ত্র না।”  “এইটা কী?” “এইটার নাম গাইগার কাউন্টার।” মানুষটা কী বুঝল কে জানে, আবার একটা ছোট লাফ দিয়ে বলল, “সর্বনাশ! কে তোমাকে এটা দিয়েছে? ফালাও নিচে ফালাও। এক্ষুণি নিচে ফালাও।” মানুষটার কথা শুনে আমার এই মূল্যবান গাইগার কাউন্টার নিচে ফেলা ঠিক হবে না। কিন্তু তাকে কীভাবে শান্ত করব বুঝতে পারলাম না। বললাম, “এইটা নিচে ফেলা যাবে না। এইটা অনেক মূল্যবান যন্ত্র।” “তুমি এই মূল্যবান যন্ত্র কোনখানে পেয়েছ? এইটা দিয়ে কী করে?” একসাথে দুইটা প্রশ্ন, কীভাবে উত্তর দেব বুঝতে পারলাম না। প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যখন কঠিন হয় তখন তার উত্তর দিতে হয় প্রশ্ন করে। কাজেই আমি সেই টেকনিক শুরু করলাম, বললাম, “আপনি সাইন্টিস কী জানেন?” “সাইন্টিস?”  “হ্যাঁ।”  “কেন? কী হয়েছে সাইন্টিসের?” মানুষটা এখন আমার টেকনিক শুরু করেছে। আমার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে প্রশ্ন দিয়ে। কী মুশকিল! কিন্তু কিছু একটা উত্তর দিতে হবে, তাই বললাম, “আমার মামা হচ্ছে সাইন্টিস, তাই মামা আমাকে এই যন্ত্রটা দিয়েছে গবেষণা করার জন্য।” মানুষটা আমার কথা বিশ্বাস করল না, বলল, “তুমি এতো ছোট মানুষ, তুমি কেমন করে গবেষণা করবা?” তারপর নাক দিয়ে বাতাস বের করে ঘোত করে একটা শব্দ করল। অবিশ্বাসের শব্দ। আমি বুঝতে পারলাম এই মানুষটার সাথে কথা চালিয়ে যাওয়া খুব মুশকিল, তাই খামাখা চেষ্টা করে লাভ নাই। আমার এখন এই মানুষটির কাছ থেকে চলে যাওয়াটাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে। আমি তাই আর কিছু না বলে হাঁটা শুরু করলাম, সাথে সাথে মানুষটা চিৎকার করে বলল, “খবরদার। খামোশ। নড়বে না, তুমি নড়বে না।” আমি বললাম, “নড়ব না?”  “না।”  “কেন?” আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে মানুষটা তার পাঞ্জাবীর পকেট থেকে একটা লাল রংয়ের মোবাইল ফোন বের করে সেটাতে দুই একটা চাপ দিয়েই কথা বলতে শুরু করল। “হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো হ্যালো আক্কাইস্যা হ্যালো হ্যালো”। কাউকে ফোন করলে কানেকশান হতে যে সময় লাগে এই মানুষটা সেটা জানে না, ডায়াল করেই সে আক্কাস মানুষটাকে ডাকাডাকি শুরু করেছে। যাই হোক শেষ পর্যন্ত আক্কাস নামের মানুষটা ফোন ধরল তখন একুশ দাড়ির মানুষটা কথা বলতে শুরু করল, “হ্যালো আক্কাইস্যা, ফোন ধরিস না কেন? কততক্ষণ থেকে ফোন করতেছি। শোন ভালো করে কী বলি, এক্ষুণি আয়, নদীর পাড়ে জঙ্গলের কিনারায় বড় বটগাছের নিচে। একটা ছেমড়া এক অস্ত্র নিয়ে ঘুরতেছে তারে ধরে বেন্ধে নিতে হবে” আমার চোয়াল ঝুলে পড়ল। বলে কী এই মানুষ? আমাকে ধরে বেন্ধে নিতে হবে? কোথায় ধরে বেন্ধে নিতে হবে? আমি বুঝতে পারলাম আমার আর এই মানুষের কথাবার্তা শোনার দরকার নেই। আমি হাঁটা শুরু করলাম। যদি আসলেই আমাকে ধরার চেষ্টা করে তখন দেখা যাবে কী করা যায়। যদি সত্যি সত্যি দরকার হয় তখন এই মানুষের হাত থেকে বাঁচার জন্য গাইগার কাউন্টারটাকে অস্ত্রের মতো ব্যবহার করে ভয় দেখানো যেতে পারে। আমি পিছনের দিকে না তাকিয়ে লম্বা পা ফেলে হাঁটতে থাকি। ঠিক তখন শুনতে পেলাম পেছন থেকে কে যেন ডাকলো, “টোপন! তুমি এখানে? আমরা তোমাকে কখন থেকে খুঁজছি।” আমি পিছন ফিরে তাকালাম, দেখলাম, মাহবুব, ডোরিন আর টনি। আমার বুকের মাঝে পানি ফিরে এলো। একুশ দাড়ির মানুষটার সাথে আমার আর একা ঝগড়াঝাটি করতে হবে না। আমরা চারজন মিলে এখন এই খ্যাপা মানুষের সাথে তর্ক বিতর্ক করতে পারব। অবশ্য তার আর দরকার হলো না। আমার সাথে অন্য তিনজন একত্র হওয়ার সাথে সাথেই একুশ দাড়ির মানুষটার উত্তেজনা মিইয়ে গেল। মানুষটা কেমন যেন ম্যাদা মেরে গেল। আমাকে ধরে বেন্ধে ফেলার চেষ্টা না করে মাথা নিচু করে উল্টো দিকে হাঁটা শুরু করে দিল।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৯৫ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...