বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন

বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা

আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

আঁখি এবং আমরা ক'জন (১৪)

"ছোটদের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান TARiN (১০২৯ পয়েন্ট)



X মুহম্মদ জাফর ইকবাল যখন আমি বড় বড় গোঁফের একজন মুচির সাহায্যে ঝুনঝুন বল আবিষ্কার করলাম ডাইনিং টেবিলে বসে খাচ্ছি তখন ভাইয়া জিজ্ঞেস করল, “তোদের ক্লাসের কানা মেয়েটার কী খবর?” আমি প্রশ্নটা না শোনার ভান করে খেতে থাকলাম। ভাইয়া আবার জিজ্ঞেস করল, “কী হল? কথার উত্তর দিস না কেন?” “কোন কথা?” “কানা মেয়েটার কথা?” “আমি কোনো কানা মেয়েকে চিনি না।” “আমার সাথে ঢং করিস, তাই না?” “আমি মোটেও ঢং করছি না।” “তা হলে প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিস না কেন?” “তুমি সুন্দর করে প্রশ্ন কর আমি উত্তর দেব।” ভাইয়া কেমন যেন খেপে উঠল, আম্মুর দিকে তাকিয়ে বলল, “আম্মু দেখেছ, তিতা কেমন বেয়াদপ হয়ে উঠছে?” আম্মু কিছু বলার আগেই আমি বললাম, ”আমার নাম তিতা না। আমার নাম তিতু।” ফুলি খালা ডাল নিয়ে আসছিলেন, টেবিলে রেখে ভাইয়াকে বললেন, “মানুষের নাম নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করা ঠিক না। তিতু যখন পছন্দ করে না তখন তুমি কেন তারে তিতা ডাক?” ভাইয়া ফুলি খালার ধমক খেয়ে কেমন যেন চিমসে গেল। আব্বু বললেন, “ফুলি ঠিকই বলেছে টিটু। তুমি তিতুকে কেন তিতা ডাক?” আম্মু বললেন, “আর কখনো ডাকবে না।” ভাইয়া তখন মুখটা গোঁজ করে খেতে লাগল। তখন আম্মু জিজ্ঞেস করলেন, “তোদের ক্লাসের ঐ মেয়েটা কেমন আছে?” “আঁখি?” “হ্যাঁ।” “ভালো আছে। আমাদের পুরো ক্লাসকে জন্মদিনের দাওয়াত দিয়েছে।” “পুরো ক্লাসকে?” “হ্যাঁ।” আম্মু বললেন, “খুব বড়লোক ফ্যামিলি?” “মনে হয়।” ভাইয়া মুখ বাঁকা করে বলল, “বড়লোক হয়ে লাভ কী? টাকা দিয়ে কি আর কানা চোখ ভালো করতে পারবে?” আমি ভাইয়ার কথা না শোনার ভান করে আম্মুকে জিজ্ঞেস করলাম, “আঁখির জন্মদিনে কী উপহার দেওয়া যায় আম্মু?” ভাইয়া বলল, “একটা লাঠি।” তারপর হা হা করে হাসতে লাগল যেন খুব মজার কথা বলেছে। আম্মু বললেন, “অন্য বন্ধুদের কী দিস?” “বই। গল্পের বই।” আম্মু বললেন, “আঁখিকেও তাই দে।” আব্বু বললেন, “বাসার কেউ একজন পড়ে শোনাবে।” “কয়েকজন কী ঠিক করেছে জান?” “কী?” “একটা গল্পের বই না দিয়ে সেটা পড়ে রেকর্ড করে ক্যাসেটটা দিবে।” আব্বু বললেন, “ভেরি গুড আইডিয়া। হাউ ক্লেভার।” আম্মু বললেন, “অন্য কিছু না পেলে খাবার জিনিস দে। খাবার জিনিস সবাই পছন্দ করে।” “উঁহু।” আমি মাথা নাড়লাম, বললাম, “নাহ্! আঁখি কিছু খেতে চায় না। তার টিফিনগুলো অন্যেরা ভাগাভাগি করে খেয়ে ফেলে।” ভাইয়া বলল, “আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে।” আমি ভাইয়ার দিকে তাকালাম, “কী আইডিয়া?” “একটা সুন্দর দেখে আয়না দে।” কথা শেষ করে আবার হা হা করে হাসতে লাগল, আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম। ভাইয়া চোখের সামনে আস্তে ‘আস্তে কেমন যেন বোকা হয়ে যাচ্ছে। বেশি মুখস্থ করলেই মনে হয় মানুষ বোকা হয়ে যায়। . দুপুরবেলা আমরা স্কুলের মাঠে সাতচাড়া খেলছি-তখন হঠাৎ করে আমার মাথায় আইডিয়াটা এলো। অন্যান্য দিনের মতো আমরা দৌড়াদৌড়ি করছি, আঁখি বসে বসে আমাদের খেলাটা উপভোগ করছে। মামুন মাত্র চাড়াটা ভেঙে দৌড়াচ্ছে আমি বল দিয়ে তাকে মারার চেষ্টা করলাম, তাকে লাগাতে পারলাম না, বলটা আঁখির খুব কাছে ড্রপ খেয়ে তার কানের কাছে দিয়ে গেল, আঁখি তখন বলটা ধরার চেষ্টা করল। আরেকটু হলে ধরেই ফেলত–একটুর জন্যে পারল না। আঁখি না দেখেই বলটা প্রায় ধরে ফেলেছিল শব্দ শুনে। বলটা খুব কাছে ড্রপ খেয়েছে বলে সে শব্দটা শুনেছে। তার মানে যদি সবসময় বলটার ভিতরে একটা শব্দ হতে থাকে তা হলে আঁখি বলটা কোথায় বুঝতে পারবে। এরকম একটা বল যদি কিনতে পাওয়া যেত তা হলে আঁখিও আমাদের সাতে সাতচাড়া খেলতে পারত। . আর সেই বলটা হত আঁখির জন্যে একেবারে সত্যিকারের উপহার। পরদিন আমি মার্কেটের দোকানগুলোতে গেলাম খোঁজ নেওয়ার জন্যে। আমার কথা শুনে তারা মনে হয় আকাশ থেকে পড়ল, অবাক হয়ে বলল, “বলের ভেতরে ঘণ্টা?” “আমি বললাম ঘণ্টা কিংবা অন্য কিছু। ঘুঙুরও হতে পারে।” দোকানের মানুষটার মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হল, সে ভাবছে আমি তার সাথে ঠাট্টা করছি। ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “কেন?” “যারা চোখে দেখতে পায় না তারা খেলতে পারবে।” মানুষটা মুখ বাঁকা করে বলল, “যারা চোখে দেখতে পায় না তারা খেলবে লুডু, বল কেন খেলবে?” আমি মানুষটার সাথে তর্ক করে একটা টেনিস বল কিনে আনলাম। যদি এরকম বল কিনতে পাওয়া না যায় তা হলে সেটা বানাতে হবে। রাস্তার মোড়ে বড় বড় গোঁফের একজন কমবয়সী মুচি কাজ করে। আমি একদিন তার কাছে গিয়ে হাজির হলাম। আমি আগেই লক্ষ করেছি একজন মুচির সামনে দিয়ে যখন কেউ হেঁটে যায় তখন সে কখনো মানুষটার মুখের দিকে তাকায় না, সবসময় তার পায়ের দিকে তাকায়। কাজেই কমবয়সী মুচিটিও আমার পায়ের দিকে একবার তাকিয়ে তার কাজ করে যেতে লাগল। আমি যেহেতু চলে যাইনি তাই শেষ পর্যন্ত মুচিটি আমার মুখের দিকে তাকাল। তখন আমি বললাম, “আমি কি আপনার সাথে একটা জিনিস নিয়ে কথা বলতে পারি?” “কী জিনিস?” আমি তখন তার সামনে বসে টেনিস বলটা দেখিয়ে বললাম, “এই টেনিস বলটা কেটে একটা জিনিস ঢুকিয়ে আবার কি সেটা ঠিক করে দেওয়া যাবে?” “কী জিনিস ঢুকাতে চাও?” আমি পকেট থেকে কয়েকটা ঘুঙুর বের করে দিলাম, “এই যে এগুলো।” মানুষটি ঘুঙুরগুলো পরীক্ষা করে দেখল, তারপর টেনিস বলটা দেখে বলল, “এটা কেটে তারপর ঢোকাতে হবে। আমার কাছে খুব চিকন সুঁই আছে সেটা দিয়ে সেলাই করে দিতে পারি, কিন্তু শুধু সেলাই দিয়ে হবে না।” “কেন হবে না?” “বাতাস বের হয়ে গেলে তো বল লাফাবে না।” আমি জিজ্ঞেস করি, “তা হলে কীভাবে করা যাবে?” “খুব ভালো আঠা দরকার। বিদেশী আঠা আছে খুব দামি। রবার পাস্টিক চামড়া সব জোড়া দিতে পারে।” “আছে আপনার কাছে সেই আঠা?” মানুষটা মাথা নাড়ল, “নাই। দেখি জোগাড় করতে পারি কি না।” দামি আঠা কতো দামি সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা হচ্ছিল, ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করলাম, “কতো খরচ পড়বে?” মানুষটা হাসল, বলল, “খরচ তো পরের কথা! আগে দেখতে হবে এটা সম্ভব কি না।” “আমার কাছে তো টাকা বেশি নাই সেই জন্যে জানতে চাচ্ছিলাম।” “পোলাপানের কাছে টাকা থাকার কথা না। আমি জানি।” মানুষটা গম্ভীর হয়ে বলল, “আমার কাছে রেখে যাও, দেখি কী করা যায়।” “কবে আসব?” “কাল-পরশু।” কাজেই আমি মুচির কাছে টেনিস বলটা রেখে গেলাম। কমবয়সী মানুষটা সেটা নিয়ে গবেষণা করল, দুইদিন পর সত্যি সত্যি সে টেনিস বলটা আমাকে ফিরিয়ে দিল। ভিতরে চারটা ঘুঙুর-বলটা নাড়ালেই ঝুনঝুন শব্দ করে। আমার কানেই খুব স্পষ্ট শোনা যায় আঁখি নিশ্চয়ই আরো অনেক ভালো শুনতে পাবে! মুচির হাতের কাজ খুবই ভালো, সেলাইটা প্রায় দেখাই যায় না। তার উপরে এক ধরনের আঠা লাগিয়েছে। আমি টেনিস বলটা মাটিতে ড্রপ দিয়ে দেখলাম, ড্রপ খেয়ে উপরে উঠে এল, সাথে ঝুনঝুন শব্দ। এক কথায় একেবারে ফাটাফাটি। মুচি আমার মুখের দিকে তাকিয়েছিল, আমার খুশি খুশি ভাব দেখে সেও খুশি হয়ে উঠল। জিজ্ঞেস করল, “এইটা দিয়ে কী করবে?” “আমার এক বন্ধুকে দিব। জন্মদিনের উপহার।” “অ।” মুচি মাথা নাড়ল, “তোমার বন্ধু ঝুনঝুন শব্দওয়ালা বল দিয়ে কী করবে?” “চোখে দেখতে পায় না তো তাই তাকে খেলায় নিতে পারি না। এই বলটা থাকলে খেলায় নিতে পারব।” “অ” মুচি মাথা নাড়ল। আমি একটু ইতস্তত করে বললাম, “কত দিতে হবে?” আমার বুকটা ভয়ে ধুকধুক করতে লাগল। যদি অনেক বেশি টাকা চেয়ে বসে তা হলে কেমন করে দিব? মুচি বলল, “কিছু দিতে হবে না।” বলে সে একটা পুরোনো জুতায় পেরেক ঠুকতে শুরু করল। আমি অবাক হয়ে বললাম, “কিছু দিতে হবে না?” “না। তুমি তোমার বন্ধুরে দেও। সে খেলুক।” “কিন্তু—কিন্তু–আপনার খরচ হয়েছে না? দামি বিদেশী আঠা কিনতে হয়েছে, কতো সময় লেগেছে।” “ওইগুলা কিছু না। তোমার বন্ধু এইটা দিয়ে খেলবে চিন্তা করলেই আমার আনন্দ হবে। ধরে নাও এই আনন্দটাই আমার মজুরি।” এইরকম একটা কথা বলার পরে তো আমি তাকে আর টাকা সাধতে পারি। আমি তারপরেও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বললাম, “আপনার নাম কী?” মুচি মানুষটি জুতায় পেরেক ঠোকা বন্ধ করে আমার দিকে তাকাল। জিজ্ঞেস করল, “নাম দিয়ে কী করবে?” “না মানে ইয়ে-” আমি নিজেও জানি না নাম দিয়ে কী করব! মুচি মানুষটি আবার জুতায় পেরেক ঠোকা শুরু করে বলল, “আমাদের নাম থাকা না থাকা সমান কথা। আমার বউ আমাকে ডাকে, হ্যাঁগা, ছেলেমেয়ে ডাকে বাবা, পাবলিক ডাকে এই মুচি। কোনটা চাও, বল?” আমি তখন বুঝতে পারলাম এই মানুষটা অন্যরকম, তাকে ঘাঁটানো ঠিক হবে না। তাই তখন যেটা সহজ সেটাই করলাম, বললাম, “আপনাকে অনেক থ্যাংকু।–” মানুষটা তখন মুখ তুলে আমার দিকে তাকিয়ে তার বড় বড় গোঁফের ভিতর দিয়ে একটু হাসল। . আঁখির জন্মদিনে আমরা দল বেঁধে তার বাসায় হাজির হলাম, আমরা সবাই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে ভালো কাপড় পরে এসেছি। সুজন পর্যন্ত মাথায় তেল দিয়ে চুল আঁচড়ে এসেছে, হঠাৎ দেখলে চেনা যায় না। আমরা সবাইকে সবসময় স্কুলের ভিতরে স্কুলের পোশাকে দেখি, এখানে কেউ স্কুলের পোশাক পরে নেই তাই সবাইকে অন্যরকম লাগছে। সবচেয়ে বেশি অন্যরকম লাগছে মেয়েদের-তারা মনে হয় সেজেগুঁজে এসেছে, কাউকেই চিনতে পারি না। আমরা সবাই কিছু না কিছু উপহার নিয়ে এসেছি, কেউ কেউ আমার মতো আলাদা কেউ কেউ রিতু শান্তা সুমির মতো একসাথে। সবাই চেষ্টা করেছে উপহারটাকে সুন্দর করে রঙিন কাগজ দিয়ে সাজিয়ে আনতে শুধু সুজনের উপহারটা খবরের কাগজ দিয়ে মোড়ানো। তার যুক্তিটা ফেলে দেবার মতো না–যত সুন্দর কাগজ দিয়েই মোড়ানো হোক আঁখি তো আর সেটা দেখতে পাবে না। আঁখিদের বাসাটি বিশাল, বাসার ভেতরে অনেক জায়গা। আঁখি দরজার সামনে দাঁড়িয়েছিল, আমাদের কেউ একজন এলেই সে আনন্দে চিৎকার করে উঠছে। আমি আসামাত্রই সে একটা চিৎকার দিল, “ও তিতু তুই এসেছিস! থ্যাংকু থ্যাংকু।” পাশে হালকা পাতলা একজন মহিলা দাঁড়িয়েছিলেন, আঁখি তার দিকে তাকিয়ে বলল, “আম্মু, এই হচ্ছে তিতু। আমাকে প্রথম দিন স্কুলে যখন অপমান করছিল আমি যখন রেগেমেগে বের হয়ে আসছিলাম তখন তিতু সবার আগে লাফ দিয়ে উঠে বলেছিল দাঁড়াও!” আমি অবাক হয়ে বললাম, “তুই সেটা জানিস?” “জানব না কেন?” আঁখি হি হি করে হাসল, “আমি না চাইলেও সবকিছু শুনি! সবকিছু মনে থাকে!” আঁখির আম্মু বললেন, “এসো বাবা। ভেতরে এসো।” বাসাটা খুব সাজানো গোছানো। এটা সবসময়ই এরকম সাজানো গোছানো থাকে না কী আঁখির জন্মদিনের জন্যে এভাবে সাজানো হয়েছে বোঝা গেল না। বিশাল বড় একটা ডাইনিং টেবিলের উপর খুব বড় একটা কেক। পিছনে একটা জন্মদিনের ব্যানার। ঘরের চারপাশে অনেক বেলুন। বাসায় অনেক মানুষ, বেশির ভাগেরই বয়স কম। যাদের বয়স একটু বেশি কম তারা ছোটাছুটি করছে। আমাদের বয়সী ছেলেমেয়েরা একটু ভদ্র হয়ে বসে থাকার চেষ্টা করছে। আঁখির আত্মীয়স্বজন, চাচাতো মামাতো খালাতো ফুপাতো ভাইবোনেরাও এসেছে। স্কুলের ছেলেমেয়েরা এক পাশে বসে নিজেরা নিজেরা গল্প করছি শুধু রিতু অপরিচিত ছেলেমেয়েদের সাথেও ভাব করে ফেলছে! আমি জানি আজকে জন্মদিনের শেষে যখন আমরা সবাই ফিরে যাব তখন এই বাসার সবাই শুধু রিতুর কথা মনে রাখবে। এরকম সময় একজন মানুষ একটা গ্লাসের মাঝে চামুচ দিয়ে ঠুন ঠুন শব্দ করতে লাগলেন, আর সবাই তাকে ঘিরে দাঁড়াল, আমরাও গেলাম। মানুষটাকে আমরা চিনতে পারলাম, আঁখির আব্বু, প্রথম দিন আঁখিকে নিয়ে আমাদের স্কুলে এসেছিলেন। আঁখির আব্বু তখন গ্লাসে ইন ইন শব্দ বন্ধ করে বললেন, “আঁখির জন্মদিনে আসার জন্যে সবাইকে অনেক ধন্যবাদ। এখন আমরা জন্মদিনের কেক কাটব তারপর আমাদের লাঞ্চ। লাঞ্চের পর জন্মদিনের উপহার খোলা হবে।” সুজন হাত তুলে বলল, “কেকটা খালি কাটব? খাব না?” সবাই হেসে উঠল, আঁখির আব্বুও হাসলেন, বললেন, “খাব, অবশ্যই খাব। এতো ভালো একটা কেক আনা হয়েছে সেটা আমাদের খেতে হবে। যখন জন্মদিনের উপহার ভোলা হবে তখন কেকও খাওয়া হবে।” কোনো কারণ ছাড়াই সবাই তখন আনন্দে চিৎকার করে উঠল। আঁখির আব্বু বললেন, “কেক খেতে খেতে জন্মদিনের উপহার খোলার পর আমরা বড়রা সরে যাব। তখন তোমরা ছোটরা যেভাবে খুশি সময় কাটাতে পার। বাইরে খালি জায়গা আছে খেলতে পার, ভেতরে নাচানাচি করতে পার, লাফালাফি করতে পার। তোমাদের বাসা থেকে পারমিশান দেওয়া থাকলে যতক্ষণ খুশি থাকতে পার। কীভাবে বাসায় যাবে সেটা নিয়ে চিন্তা কোরো না, আমি সবাইকে বাসায় পৌঁছে দেব।” সবাই তখন আবার আনন্দের একটা শব্দ করল। আঁখির আম্মু হাত তুলে সবাইকে বললেন, “আমি জানি তোমাদের বয়সী ছেলেমেয়েদের বেশি বেশি খিদে পায়–তাই একটু পরে পরেই এই টেবিলে নাস্তা দেওয়া হবে। তোমরা খাবে।” সুজন আবার হাত তুলে জিজ্ঞেস করল, “কী কী নাস্তা দেওয়া হবে?” সুজনের প্রশ্ন শুনে সবাই আবার হেসে উঠল, শুধু আঁখির আম্মু হাসলেন না, বললেন, “চানাচুর, চিপস, বিস্কুট, স্যান্ডউইচ, শিঙ্গাড়া, সমুচা, চিকেন নাগেট, মিষ্টি, ফলমূল, কোল্ড ড্রিংকস। তুমি যদি এর বাইরে আর কিছু চাও আমাকে বলতে পার।” আঁখির আম্মুর লিস্ট শুনে সুজনের মতো মানুষও একটু লজ্জা পেয়ে গেল, বলল, “না খালাম্মা আর কিছু লাগবে না।” আঁখির আব্বু বললেন, “তা হলে সবাই এসো, আমরা কেক কাটি।” আমরা ছোটাছুটি করে আঁখির পাশে দাঁড়ালাম, সাধারণত এরকম সময়ে অনেক মানুষ ছবি তোলে কিন্তু এখানে কেউ ছবি তুলছে না। আঁখি ছবি দেখতে পারে না সেই জন্যেই মনে হয় ছবি তোলায় কারো উৎসাহ নেই। একজন মানুষ শুধু চুপচাপ একটা ভিডিও ক্যামেরা নিয়ে ভিডিও করছে। কেকের উপর মোমবাতি লাগানো হল সেই মোমবাতি জ্বালানো হল তারপর হঠাৎ একজন সুর করে হ্যাপি বার্থ ডে গাইতে শুরু করল। আমরা সবাই তখন গলা মিলিয়ে হ্যাপি বার্থ ডে গাইতে লাগলাম। কেউ একজন বলল, “ফুঁ দিয়ে মোমবাতি নিভাও।” আরেকজন চিৎকার করে বলল, “এক ফুঁয়ে নিতে হবে কিন্তু।” এক ছুঁয়ে যদি নিভানো না যায় কেউ সেই ঝুঁকি নিল না। সবাই মিলে চারিদিক দিয়ে ফুঁ দিয়ে মোমবাতি নিভিয়ে দিল। তখন আঁখির হাতে একজন কেক কাটার ছুরি ধরিয়ে দিল, আঁখি বলল, “ওয়ান টু থ্রি”, তারপর কেকটার মাঝখান দিয়ে কেটে ফেলল। সবাই চিৎকার চেঁচামেচি করতে থাকে আর তখন একজন কেকটা ভিতরে নিয়ে টেবিলে খাবার দিতে থাকে। কতো রকম খাবার, দেখে আমাদের চোখ একেবারে ছানাবড়া হয়ে গেল। খাবার দেখেই কি না জানি না আমাদের হঠাৎ করে সবার একসাথে খিদে লেগে গেল। আমরা তখন রীতিমতো কাড়াকাড়ি করে প্লেটে খাবার নিতে থাকি গপগপ করে খেতে থাকি! একজন এর মাঝে টেবিলে মাংসের বাটি উল্টে ফেলল, একজনের হাত থেকে চপ নিচে পড়ে গেল, একজনের খাবার বোঝাই প্লেট মেঝেতে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেল, কোল্ড ড্রিংকসের বোতল থেকে ভুর ভুর করে ফেনা বের হয়ে এলো, কিন্তু কেউ সেগুলো নিয়ে মাথা ঘামালো না। আমাদের খাওয়া শেষ হবার পর বড়রা খেতে বসে। তখন লালচে চুলের একটা মেয়ে বলল, “সবাই বাইরের ঘরে এসো। এখন আঁখির গিফট খোলা হবে।” সবাই হইহই করে বাইরের ঘরে হাজির হয়। আঁখি দেয়ালে হেলান দিয়ে একটা কার্পেটের উপর বসে আর সবাই তখন তার উপহারগুলো তার সামনে এনে রাখতে থাকে। কতো রকম উপহার, ছোট বড় মাঝারি বাক্স, চকচকে রঙিন কাগজ দিয়ে মোড়ানো। লাল চুলের মেয়েটা সামনে বসে বড় একটা বাক্স তুলে উপরে লেখাগুলো পড়ে বলল, “এটা দিয়েছেন বড় খালাম্মা। হ্যাপি বার্থডে লেখা গিফট র‍্যাপ দিয়ে র‍্যাপ করেছেন।” সবাই চিৎকার করে বলল, “বড় খালাম্মী। বড় খালাম্মা।” আঁখি বাক্সটা খোলার চেষ্টা করে, আশেপাশে বসে থাকা ছোট ছোট কয়েকটা বাচ্চা টানাটানি করে তাকে সাহায্য করে, বাক্সটা খোলর পর ভেতর থেকে একটা টেডিবিয়ার বের হয়ে আসে। আঁখি নরম তুলতুলে টেডিবিয়ারটি বুকে চেপে একটু আদর করে বলল, “থ্যাংকু বড় খালা। থ্যাংকু।” বড় খালা কাছেই দাঁড়িয়েছিলেন, বললেন, “তোকে যে কী দেব বুঝতে পারি। তুই টেডিবিয়ার পছন্দ করিস তাই প্রতি বছর একই জিনিস দিয়ে যাচ্ছি।” আঁখি বলল,”বড় খালা এটাই আমার পছন্দ। থ্যাংকু।” লালচে চুলের মেয়েটা আরেকটা বাক্স আঁখির হাতে তুলে দিল। আঁখি বাক্সটা খুলতেই ভেতর থেকে একটা ইলেকট্রনিক গেম বের হয়ে এলো। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটা দশ-বারো বছরের ছেলে উত্তেজিত গলায় বলল, “আঁখি আপু এইটা মেমোরি গেম। তুমি একটা বাটন চাপ দিবে তখন একটা শব্দ হবে। সেটা মনে রেখে আরেকটা চাপ দিবে।” আঁখি বলল, “থ্যাংকু লিটন।” “আব্বু সিঙ্গাপুর থেকে এনেছে।” “হাউ নাইস। মামাকে থ্যাংকু দিস লিটন।” ছেলেটি গম্ভীর গলায় বলল, “দিব আঁখি আপু।” আঁখির আত্মীয়স্বজনেরা সবাই নিশ্চয়ই খুব বড়লোক-প্রত্যেকটা বাক্স থেকেই খুব দামি দামি উপহার বের হতে থাকল। কোনোটা এমপি থ্রি প্লেয়ার, কোনোটা মোবাইল ফোন, কোনোটা ইলেকট্রনিক গেম, কোনোটা দামি কাপড়, কোনোটা সুন্দর জুতো, কোনোটা মুক্তার মালা-এমন কিছু নেই যেটা সে উপহার হিসেবে পায়নি। বাক্সগুলো খুলতে খুলতে হঠাৎ করে আমাদের একটা প্যাকেট বের হল। লালচে চুলের মেয়েটা প্যাকেটের উপর লেখা দেখে পড়ল, “আঁখি আপু এটা দিয়েছে তোমার স্কুলের তিনজন বন্ধু–রিতু, শান্তা, আর সুমি। প্যাকেটটা খুব সুন্দর লাল কাগজ দিয়ে সাজিয়েছে।” আঁখি প্যাকেটটা হাতে নিয়ে খুলতেই ভেতর থেকে অনেকগুলো সিডি বের হল। আঁখি হাত দিয়ে বোঝার চেষ্টা করে কীসের সিডি, তখন রিতু বলল, “আঁখি আমরা দশটা গল্পের বই রেকর্ড করে দিয়েছি। একটা ভূতের, দুইটা সায়েন্স ফিকশান অন্যগুলো অ্যাডভেঞ্চার!” আঁখি আনন্দে চিৎকার করে বলল, “থ্যাংকু থ্যাংকু তোদের। থ্যাংকু।” তারপর সিডিগুলো খানিকক্ষণ বুকে চেপে রেখে বলল, “তোরা কখন এগুলো করলি?” রিতু বলল, “আস্তে আস্তে করেছি। আমার ভাইয়া সিডিতে রাইট করে দিয়েছে।” শান্তা বলল, “আমরা নিজেরা পড়েছি তো তাই উচ্চারণগুলো কিন্তু আমাদের মতোন।” আঁখি বলল, “সেটাই তো সবচেয়ে ভালো। আমি যখন শুনব তখন মনে হবে তোরা পাশে বসে আছিস!” আরো কয়েকটা প্যাকেট খোলার পর আঁখি আমার ছোট বাক্সটা হাতে নিল। সেটা একটু ঝুনঝুন শব্দ করে উঠল, আঁখি তখন সেটা কানের কাছে নিয়ে ঝাঁকায়, তারপর জিজ্ঞেস করে, “এটা কী?” লালচে চুলের মেয়েটা বলল, “এটা দিয়েছে তিতু।” আঁখি জিজ্ঞেস করল, “এটা কী তিতু?” আমি ইতস্তত করে বললাম, “খুবই হাস্যকর একটা জিনিস! তোর এতো সুন্দর সুন্দর গিফটের সাথে এটা না খুলে পরে খুলিস।” লালচে চুলের মেয়েটা বলল, “না না! সব এখনই খুলতে হবে।” আঁখি বাক্সটা খুলতেই টেনিস বলটা বের হয়ে এলো। আঁখি বলটা হাতে নিয়ে নাড়াতেই সেটা ঝুন ঝুন শব্দ করে উঠল, সাথে সাথে আঁখি ইলেকট্রনিক শক খাওয়ার মতো চমকে ওঠে, “এটা কোথায় পেয়েছিস?” “পাইনি। তৈরি করেছি।” “তৈরি করেছিস?” আঁখি উত্তেজিত গলায় বলল, “তুই তৈরি করেছিস?” “আমি নিজে তৈরি করিনি–একজন আমাকে তৈরি করে দিয়েছে।” “কী আশ্চর্য!” আঁখি বলটা দুই হাতে ধরে বুকে চেপে রাখল। তাকে দেখে মনে হয় সে এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না। যারা আঁখিকে ঘিরে দাঁড়িয়েছিল তারা এখনো ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছে না। দামি দামি উপহার পেয়ে আঁখি ভদ্রতার কথা বলে সেগুলো পাশে রেখে দিয়েছে–আর এই অতি সাধারণ টেনিস বল পেয়ে সে কেন এতো উত্তেজিত হয়ে উঠেছে কেউ বুঝতে পারছে না। আঁখি উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলল, “আম্মু আব্বু দেখে যাও আমি কী পেয়েছি!” আঁখির আম্মু আর আব্বু কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে এলেন, “কী পেয়েছিস মা?” “এই দেখো, ঝুনঝুনি টেনিস বল।” কেন এই টেনিস বলটা পেয়ে সে উত্তেজিত সেটা বোঝানোর জন্যে বলটা উপরে ছুঁড়ে দেয়, সেটা ঝুনঝুন শব্দ করে উপরে উঠে যখন আবার ঝুনঝুন শব্দ করে নেমে আসে সে শব্দটা লক্ষ করে বলটা খপ করে ধরে ফেলল! হঠাৎ করে সবাই এই বলটার গুরুত্বটা ধরতে পারে আর সবাই একসাথে বিস্ময়ের শব্দ করল। আঁখিকে ঘিরে থাকা ছেলেমেয়ের ভেতরে একজন বলল, “বলটা আমার দিকে ছুঁড়ে দাও আপু!” আঁখি বলটা ছুঁড়ে দিল। ছেলেটা বলটা ধরে বলল, “এখন তুমি ধরো।” ছেলেটা বলটা আঁখির দিকে ছুঁড়ে দেয়, আঁখি সত্যি সত্যি বলটাকে ধরে ফেলল। সবাই তখন আনন্দে চিৎকার করে উঠল! আঁখি আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি এখন তোদের সাথে সাতচাড়া খেলতে পারব!” আমি মাথা নাড়লাম, “হ্যাঁ। সেই জন্যেই তো তৈরি করেছি।” আঁখি বলল, “তিতু তুই একটা জিনিয়াস!” তারপরে সে আমাকে আনন্দে জাপটে ধরল। . আঁখির আম্মু ডাইনিং টেবিলে একটু পর পর অনেক রকম খাবার রেখে যেতে লাগলেন কিন্তু আমরা খাওয়ার জন্যে ভেতরে এলাম। আঁখিকে নিয়ে সাতচাড়া খেলোম। সে যে খুব সাংঘাতিক প্লেয়ার তা না, কিন্তু জীবনে এই প্রথমবার সে একটা বল নিয়ে ছোটাছুটি করে খেলছে!


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৬০ জন


এ জাতীয় গল্প


Warning: mysqli_fetch_array() expects parameter 1 to be mysqli_result, boolean given in /var/sites/g/golperjhuri.com/public_html/story.php on line 344

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...