বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন

বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা

আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

আঁখি এবং আমরা ক'জন (১৩)

"ছোটদের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান TARiN (১০২৯ পয়েন্ট)



X মুহম্মদ জাফর ইকবাল যখন আঁখিকে দেখেশুনে রাখার কথা অথচ উল্টো তাকে নিয়ে একটা মহাবিপদের মাঝে পড়ে গেলাম অঙ্ক ক্লাসে সুমি একটা হাঁচি দিল, হাঁচি এমন কিছু অবাক ঘটনা না–যে কেউ হাঁচি দিতে পারে। সুমির হাঁচি কিন্তু একটা অবাক ঘটনা হয়ে গেল। কারণ একটু পর সে আরেকটা হাঁচি দিল, তারপর আরেকটা তারপর আরেকটা তারপর দিতেই লাগল। অঙ্ক স্যার বিরক্ত হয়ে বললেন, “তোর হয়েছেটা কী?” সুমি একটা হাঁচি দিয়ে বলল, “এলার্জি।” “কীসের এলার্জি?” সুজন ফিসফিস করে বলল, “জ্যামিতি ক্লাসের।” কেউ সেই কথাটা শুনতে পেল না, সুমি বলল, “জানি না স্যার। আমার মাঝে মাঝে হয়।” কথা শেষ করে সুমি আরেকটা হাঁচি দিল। অঙ্ক স্যার বললেন, “যা বাথরুম থেকে নাক ধুয়ে আয়।” সুমি মিনমিন করে বলল, “লাভ হবে না স্যার।” তারপর আরেকটা হাঁচি দিল। স্যার বললেন, “যা বলছি।” কাজেই সুমি বাথরুমে নাক ধুতে গেল। কিছুক্ষণ পর সে ফিরেও এল, নাক চোখ-মুখ পানি দিয়ে ধুয়ে এসেছে কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। একটু পর পর হাঁচি দিচ্ছে, নাকটা টমেটোর মতো লাল। স্যার জিজ্ঞেস করলেন, “হাঁচি কমে নাই?” সুমি মাথা নাড়ল, “না স্যার।” তারপর একটা হাঁচি দিল। ”কী করবি তা হলে?” “এলার্জির একটা ট্যাবলেট আছে সেটা খেলে কমে যাবে।” “কোথায় সেই ট্যাবলেট?” “ব্যাগের মাঝে থাকে। এখন আছে কি না জানি না। আবার হাঁচি।”তা হলে দেখ আছে কি না। থাকলে বের করে খা।” সুমি তার ব্যাগ আতিপাতি করে খুঁজল, ব্যাগের মাঝে নাই। স্যার জিজ্ঞেস করলেন, “ট্যাবলেটের নাম জানিস?” “জানি স্যার।” তা হলে টিফিনের ছুটিতে কাউকে পাঠিয়ে কিনে আনিস। সুজন তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠে বলল, “আমি কিনে আনব স্যার।” স্যার সুজনের দিকে সন্দেহের চোখে তাকিয়ে বললেন, “একা যাবি না। সাথে আরো দুই একজনকে নিয়ে যাস।” সুজন মাথা নাড়ল, বলল, “ঠিক আছে স্যার।” ঠিক তখন টিফিনের ঘণ্টা পড়ল। অঙ্ক স্যার বের হবার পর সুজন জিজ্ঞেস করল, “আমার সাথে কে যাবি ওষুধ কিনতে?” আমি বললাম, “আমি।” “আয় তা হলে।” সুমির কাছ থেকে ওষুধের নামটা লিখে নিয়ে আমরা ক্লাস থেকে বের হলাম। যখন হেঁটে হেঁটে স্কুলের গেটের কাছে এসেছি তখন শুনলাম কে যেন পিছন থেকে ডাকছে, “এই সুজন, তিতু দাঁড়া।” তাকিয়ে দেখি রিতু আর আঁখি। রিতু হাঁটছে তার থেকে একটু পিছনে আঁখি, রিতুর কনুইটা আস্তে করে ধরে রেখেছে, দেখে বোঝাই যায় না যে ধরে রেখেছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম”কী হল?” “আমরাও যাব।” “কোথায় যাবি?” “ওষুধ কিনতে।” আমি অবাক হয়ে বললাম, “ওষুধ কিনতে?” “হ্যাঁ।” “কেন?” রিতু চোখ মটকে বলল, “এমনি একটু বাইরে থেকে হেঁটে আসি।” “আঁখিকে নিয়ে?” “আঁখির জন্যেই তো যাচ্ছি! বাইরে থেকে হেঁটে আসি।” “স্যার যদি জানেন?” “স্যার জানলে সমস্যা কী? স্যারই তো সুজনকে বলেছেন কয়েকজনকে নিয়ে যেতে। আমরা হচ্ছি কয়েকজন।” সুজন দাঁত বের করে হাসল, বলল, “চল!” যে কোনো বেআইনি কাজে সুজনের সবসময় উৎসাহ। আমরা যখন গেটের কাছে পৌঁছে গেছি তখন মামুন আমাদের কাছে ছুটে এলো, জিজ্ঞেস করল, “কোথায় যাস?” রিতু বলল, “সুমির ওষুধ কিনতে।” “এতো জন?” “সমস্যা কী? এই তো রাস্তার ওপাশে ফার্মেসি। যাব আর আসব।” “আমিও যাব।” সুজন মুখ ভেংচে বলল, “তুই একা কেন? আরো চৌদ্দজনকে গিয়ে ডেকে নিয়ে আয়! তারপর সবাই মিলে মিছিল করতে করতে যাই!” রিতু বলল, “আমি স্লোগান দিয়ে বলব, যাচ্ছি কোথায় যাচ্ছি কোথায়। সবাই বলবে সুমির ওষুধ কিনতে! সুমির ওষুধ কিনতে!” মামুন মুখ শক্ত করে বলল, “আমি সাথে গেলে তোদর সমস্যা আছে?” আমি বললাম, “নাই।” “তা হলে চল।” কাজেই আমরা পাঁচজন গেটে হাজির হলাম। দারোয়ান ভুরু কুঁচকে বলল, “কী চাও?” রিতু বলল, “বাইরে যাব।” “বাইরে যাবে? কেন?” “আমাদের এক ফ্রেন্ডের জন্যে ওষুধ কিনতে। খুব সিরিয়াস অবস্থা।” “কী হয়েছে?” “এলার্জি।” “সেটা কী?” সুজন বলল, “খুব ভয়ংকর অসুখ। সারা শরীরে চাকা চাকা লাল দাগ। চোখ-মুখ ফুলে গেছে। নাক দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে।” এই হচ্ছে সুজনের কথা বলার ধরন। যেখানে সত্যি কথা বললেই কাজ হয় সেখানেও মিথ্যা কথা বলে ফেলে। দারোয়ান সুজনের কথা বিশ্বাস করল বলে মনে হয় না, মুখ শক্ত করে বলল, “টিফিনের ছুটিতে কোনো ছেলেমেয়ের বের হবার পারমিশান নাই।” সুজন চোখ লাল করে বলল, “আপনি চান আমাদের ক্লাসের একটা মেয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা যাক?” মারা যাবার কথা শুনেও দারোয়ানের কোনো ভাবান্তর হল না। সে একটা হাই তুলে ম্যাচের কাঠি দিয়ে দাঁত খুঁটতে খুঁটতে বলল, “সেইটার দায়িত্ব আমার না। আমার দায়িত্ব গেট খোলা আর গেট বন্ধ করা।” সুজন গরম হয়ে বলল, “আমার কথা বিশ্বাস না করলে জালাল স্যারকে জিজ্ঞেস করেন।” আমাদের অঙ্ক স্যারের নাম জালালউদ্দিন, স্কুলে এই স্যারকে সবাই গুরুত্ব দেয়। দারোয়ানও গুরুত্ব দিল, পকেট থেকে তার মোবাইল টেলিফোন বের করে সে কোনো একটা নম্বরে ডায়াল করল, অন্য পাশে ফোন ধরার পর বলল, “স্যার কিছু ছেলেমেয়ে বলছে তাদের না কি ওষুধ কিনার জন্যে বাইরে যাওয়া দরকার” দারোয়ানের কথা শেষ হবার আগেই স্যার নিশ্চয়ই সেটা সত্যি বলে জানিয়েছেন। কাজেই দারোয়ান খুবই বিরস মুখে টেলিফোনটা পকেটে রাখল। অনেকক্ষণ সময় নিয়ে গেটের ছিটকানি খুলে আমাদের বের হতে দিল। সুজন মুখ শক্ত করে বলল, “আপনার জন্যে আমাদের দেরি হল। যদি সুমির কিছু হয় তা হলে কিন্তু আপনি দায়ী থাকবেন।” অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজে দেরি হয়ে গেলে চোখে-মুখে যেরকম গম্ভীর ভাব রাখতে হয় আমরা সেরকম গম্ভীর ভাব করে গেট দিয়ে বের হলাম। বের হবার পরই অবশ্যি আমাদের মুখে হাসি ফুটে উঠল। আমরা রাস্তাটা পার হয়ে ফার্মেসিতে ঢুকলাম। ফার্মেসির মানুষটা একটা খবরের কাগজ পড়ছে, আমাদের দেখে চোখ তুলে তাকাল। সুমির ওষুধটার নাম কাগজে লিখে এনেছিলাম সেটা মানুষটার হাতে দিয়ে বললাম, “এইটা আছে?” মানুষটা দেখে বলল, “আছে। কয়টা নিবে?” সুজন জিজ্ঞেস করল, “দাম কত?” “এক পাতা দুই টাকা।” এক পাতায় অনেকগুলো ট্যাবলেট থাকে, এতোগুলো ট্যাবলেটের দাম মাত্র দুই টাকা। আমি পকেট থেকে টাকা বের করছিলাম কিন্তু সুজনের কথা শুনে থেমে গেলাম। সে দরদাম শুরু করে দিল, “কম করে বলেন। এক টাকা।” মানুষটা সুজনের কথা শুনে কেমন যেন অবাক হয়ে গেল, জিজ্ঞেস করল, “এক টাকা?” “হ্যাঁ। এক টাকা।” মানুষটা খবরের কাগজটা ভাঁজ করে রেখে আলমারি খুলে একটা ওষুধের বাক্স থেকে এক পাতা ট্যাবলেট বের করে কেমন যেন তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে আমাদের দিকে ছুঁড়ে দিল। আমি পকেট থেকে টাকা বের করলাম, লোকটা বলল, “টাকা দিতে হবে না। যাও। এক পাতা ওষুধের জন্যে যে দুই টাকা দিতে পারে না তার কাছ থেকে আমার টাকা নিতে হবে না। তোমার দুই টাকার জন্যে আমার লাল বাতি জ্বলবে না।” আমার অসম্ভব অপমান হল, কিন্তু সুজনের কোনোই ভাবান্তর হল না। সে ট্যাবলেটের পাতাটা নিয়ে আমাদেরকে বলল, “চল।” আমরা ফার্মেসি থেকে বের হয়ে এলাম, রিতু বলল, “কী লজ্জা। কী লজ্জা।” সু জন বলল, “লজ্জার কী আছে?” আমি রেগে বললাম, “লজ্জার কী আছে তুই বুঝিসনি। গাধা কোথাকার? আমরা কী ফকির না কি যে ভিক্ষে দেবে।” মামুন বলল, “ওষুধের ডেট নিশ্চয়ই শেষ, ফেলে না দিয়ে আমাদেরকে দিয়ে দিয়েছে।” আমরা তখন ট্যাবলেটের পাতাটা ওলটপালট করে দেখার চেষ্টা করলাম কোথাও তারিখ দেওয়া আছে কি না। তারিখ দেওয়া নেই তাই বোঝা গেল না বাতিল হয়ে যাওয়া ওষুধ আমাদের ধরিয়ে দিয়েছে কি না। আঁখি বলল, “বাতিল ওষুধ না। ওষুধ ঠিকই আছে।” রিতু বলল, “তুই কেমন করে জানিস?” প্রথম প্রথম কয়েকদিন ভদ্রতা করে আঁখির সাথে সবাই তুমি করে কথা বলেছে এখন আমরা তুইয়ে নেমে এসেছি। আঁখি বলল, “না জানার কী আছে? দুই টাকার ওষুধ ফ্রি দেওয়ার জন্যে বাতিল ওষুধ খুঁজতে হয় না।” আমি বললাম, “চল তা হলে যাই।” সুজনকে স্কুলে ফিরে যাবার ব্যাপারে খুব উৎসাহী দেখা গেল না। সে বলল, “আয় আরেকটা ফার্মেসি দেখে যাই।” ওষুধটা যেহেতু হয়েই গেছে এখন স্কুলে ফিরে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ কিন্তু ঠিক কী কারণ জানা নেই আমরা সবাই সুজনের কথায় রাজি হয়ে গেলাম। পাঁচজন মিলে কথা বলতে বলতে হাসাহাসি করতে করতে হাঁটতে থাকি। পরের ফার্মেসির সামনে দাঁড়িয়ে ভিতরে উঁকি দিয়ে সুজন বলল, “নাহ্। এখান থেকে ওষুধ কেনা যাবে না।” রিতু জানতে চাইল, “কেন?” “যে মানুষটা ওষুধ বিক্রি করছে তার চেহারাটা ভালো না।” একজন মানুষের চেহারা ভালো না হলে তার থেকে ওষুধ কেনা যাবে না এরকম যুক্তি এর আগে কেউ কখনো দিয়েছে বলে মনে হয় না কিন্তু আমরা যুক্তিটা মেনে নিলাম। এর পরে বড় একটা জেনারেল স্টোর ধরনের দোকান পাওয়া গেল যেটা দেখে সুজনের খিদে পেয়ে গেল। আমরা তখন টাকা-পয়সা ভাগাভাগি করে দুইটা চিপসের প্যাকেট কিনলাম-এখানেও সুজন খারাপভাবে দরদাম করল। এবারে অবশ্যি কোনো লাভ হল না, মানুষটা রেগেমেগে আমাদের ফ্রি দিয়ে দিল না। আমরা চিপস খেতে খেতে হাঁটতে থাকি তখন আরেকটা ফার্মেসি পেলাম, সেটা রাস্তার অন্যপাশে কাজেই সেখানে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। তখন মামুন বলল আমরা যদি এক কিলোমিটার হাঁটতে রাজি থাকি তা হলে শহরের সবচেয়ে বড় ফার্মেসি থেকে ওষুধটা কিনতে পারব। আমরা রাজি হয়ে হাঁটতে লাগলাম তখন মামুন রিকশা করে যাওয়ার প্রস্তাব দিল। আমরা তখন আবার টাকা-পয়সা ভাগাভাগি করে দেখলাম যে ইচ্ছে করলে রিকশা করে যেতে পারি। আমরা তখন দরদাম করে দুইটা রিকশা ভাড়া করলাম, একটা রিকশায় উঠল রিতু আর আঁখি অন্যটাতে আমি মামুন আর সুজন। আমরা গল্প করতে করতে যাচ্ছি, ফাঁকা রাস্তায় রিকশা গুলির মতোন ছুটছে। হঠাৎ করে সামনের রিকশাটি থেমে গেল আর সেখান থেকে রিতু আমাদের চিৎকার করে ডাকল। আমরা আমাদের রিকশা থেকে নেমে রিতুর কাছে গেলাম। রিতু বলল, “আঁখি বলছে। অবস্থা ভালো না।” আমরা জিজ্ঞেস করলাম, “কার অবস্থা ভালো না?” আঁখি বলল, “এই এলাকার।” “কী হয়েছে এই এলাকার?” “কোনো একটা গোলমাল হয়েছে এখানে।” “গোলমাল?” আমরা অবাক হয়ে চারিদিকে তাকালাম এবং হঠাৎ করে বুঝতে পারলাম আঁখি সত্যি কথা বলছে। এটা মোটামুটি বড় রাস্তা। অনেক গাড়ি যাবার কথা কিন্তু এখন কোথাও কিছু নেই। দোকানপাট বন্ধ এবং মানুষজন এদিকে-সেদিকে জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এবং চিন্তিত মুখে কথা বলছে। দূরে অনেকগুলো পুলিশ। আমি বললাম, “চল ফিরে যাই।” সুজন বলল, “আগে দেখি কী হয়েছে।” আমরা কিছু বলার আগে হঠাৎ করে কোথা থেকে অনেকগুলো মানুষ হইচই করতে করতে ছুটে আসতে থাকে, তাদের হাতে লাঠিসোটা।”একশান একশান ডাইরেক্ট একশান” বলতে বলতে তারা ঢিল ছুঁড়তে ছুঁড়তে একদিক থেকে এগিয়ে আসতে থাকে এবং অন্যদিক থেকে পুলিশ তাদের দিকে ছুটে আসতে থাকে। পুলিশ আর এই মানুষগুলো দেখতে দেখতে একদল আরেকদলের ওপর চড়াও হল এবং প্রচণ্ড মারামারি শুরু হয়ে গেল। আমরা ঠিক মাঝখানে রিতু আর আঁখি রিকশা থেকে নেমে পড়ে আর আমরা প্রাণপণে ছুটতে থাকি। ছুটতে ছুটতে আঁখি রাস্তায় আছড়ে পড়ল, মানুষজন তার ওপর দিয়ে ছুটতে থাকে পুলিশ লাঠি দিয়ে লোকজনকে পেটাতে থাকে। আমি কোনোমতে আঁখির কাছে ছুটে গেলাম, তাকে টেনে দাঁড়া করিয়ে অন্যদের খুঁজতে লাগলাম, কাউকে দেখতে পেলাম না। আঁখির চোখে-মুখে আতঙ্ক, সে আমাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। আমার মনে হল দূরে গুলির শব্দ শুনতে পেলাম। মানুষ আর্তনাদ করতে লাগল এবং তার মাঝে কয়েকটা বিস্ফোরণ হল। ক্যামেরা নিয়ে সাংবাদিকেরা ছোটাছুটি করছে এবং ছবি তুলছে। আমি আঁখিকে ধরে দৌড়াতে লাগলাম এবং মনে হল তখন সাংবাদিকেরা আমাদের ছবি তুলতে শুরু করেছে। একটা দোকানের বন্ধ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আমি অন্যদের খুঁজলাম, আশেপাশে কেউ নেই কে কোন দিকে গিয়েছে জানি না। রাস্তায় একজন মানুষ পড়ে আছে, মাথা ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। অন্য একজন মানুষ ভয়ে পুলিশের দিকে তাকাচ্ছে। পুলিশ তাকে লাথি মেরে ফেলে দিয়ে পিটাতে থাকে। হঠাৎ করে চারপাশে একটু ফাঁকা হয়ে যায় এবং শিলাবৃষ্টির মত ঢিল পড়তে থাকে। ঠিক আমার কানের কাছে দিয়ে বড় একটা ঢিল উড়ে গিয়ে নিচে পড়ে গুড়ো গুড়ো হয়ে গেল। আমি আতঙ্কিত হয়ে তাকালাম–দূর থেকে অনেক মানুষ ঢিল ছুড়ছে, এর যে কোনো একটা ঢিল মাথায় লাগলে মাথা ফেটে ঘিলু বের হয়ে যাবে। আমি দূর থেকে উড়ে আসা ঢিলগুলো দেখতে পাই, একটু সরে যেতে পারি কিন্তু আঁখি তো পারবে না-সে তো কিছু দেখছে না। “আঁখি!” “কী?” “তুই আমাকে ধরে থাকিস–আমি যেদিকে সরি তুই সেদিকে সরে যাবি।” আঁখি কাঁপা গলায় বলল, “ঠিক আছে।” ঠিক তখন একটা গাড়ি সাইরেন বাজাতে বাজাতে গেল, আর দূরের মানুষগুলো আরো দূরে সরে গেল। ঢিল একটু কমে এল আর আমি রিতুকে দেখতে পেলাম, সে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে আমাদের কাছে ছুটে এল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কী হয়েছে?” “পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়েছি।” আঁখি জিজ্ঞেস করল, “বেশি?” “না। ঠিক হয়ে যাবে।” আমরা তখন আমাদের বাকি দুজনকে দেখতে পেলাম, তারাও দৌড়ে আমার কাছে এল, সুজনের চোখে একটা ঢলঢলে সানগ্লাস। আমাদের দেখিয়ে বলল, “দেখেছিস? রাস্তায় পেয়েছি, ফাটাফাটি সানগ্লাস।” আমার বিশ্বাস হল না এরকম সময়ে কেউ রাস্তা থেকে কুড়িয়ে একটা সানগ্লাস তুলে নিতে পারে। সানগ্লাসটা ফাটাফাটি হতে পারে কিন্তু সেটা পরার পর সুজনকে দেখাচ্ছে অদ্ভুত! আমাদের রাস্তার মোড়ে একজন অন্ধ ফকির ভিক্ষে করে, বসন্ত হয়ে তার চোখ নষ্ট হয়ে গেছে, সে এরকম একটা সানগ্লাস পরে থাকে। সুজনকে আমি সেটা এখন আর বললাম না, সেটা বলার সময়ও এটা না, এখন আমাদের কোটি টাকার প্রশ্ন আমরা কেমন করে স্কুলে ফিরে যাব। এরকম ভয়ংকর মারামারির মাঝে হাজির হওয়ার খবরটা বাসায় কিংবা স্কুলে পৌঁছে গেলে আমাদের কপালে দুঃখ আছে। সাংবাদিকেরা আমাদের ছবি তুলছিল, যদি সেই ছবি পত্রিকায় ছাপা হয়ে যায় তা হলে কী হবে? আমাদের কথা ছেড়ে দিলাম, এরকম একটা জায়গায় আমরা আঁখিকে টেনে নিয়ে এসেছি সেটা যখন স্যার ম্যাডাম জানতে পারবেন তখন কী হবে? মাত্র এক সপ্তাহ আগে নতুন ম্যাডাম বলেছেন আমরা যেন আঁখিকে ভালো করে দেখেশুনে রাখি-এটা কি দেখেশুনে রাখার নমুনা? যদি একটা ঢিল এসে আঁখির গায়ে লাগত তা হলে কী হত? সুজন বলল, “রাস্তায় একটা মানিব্যাগ পড়ে ছিল, তোলার আগেই আরেকজন তুলে নিল। ইস!” রিতু চোখ পাকিয়ে বলল, “তোর মানিব্যাগের খেতাপুড়ি। এখন ফিরে যাব কেমন করে?” মামুন বলল, “হেঁটে। আবার কীভাবে?” আমি দূরে মানুষের জটলার দিকে তাকিয়ে বললাম, “মারামারি কি বন্ধ হয়েছে?” আঁখি বলল, “হ্যাঁ বন্ধ হয়েছে।” আমরা চোখ দিয়ে দেখে যেটা বুঝতে পারি না আঁখি কান দিয়ে শুনে সেটা বুঝে ফেলে। আমি বললাম, “চল তা হলে যাই।” ঠিক যখন রওনা দিব তখন একটা পুলিশের গাড়ি এসে থামল, অনেকগুলো পুলিশ সেখান থেকে নেমে আমাদের দিকে ছুটে আসে। সবার সামনে পাহাড়ের মতো বড় একজন পুলিশ, হাত-পা নেড়ে চিৎকার করে বলল, “এই! এই পোলাপান! তোমরা এইখানে কী কর?” আমরা কিছু বলার আগেই আরেকজন বলল, “কথা বলার দরকার নাই। লাঠি দিয়া দুইটা বাড়ি দেন।” একজন সত্যি সত্যি মোটা একটা লাঠি নিয়ে এগিয়ে এল, তখন আরেকজন থামিয়ে বলল, “দাঁড়াও। এরা কী করে এইখানে? আমরা যেখানে থাকার সাহস পাই না সেখানে এরা কী করে?” একজন সুজনের দিকে তাকিয়ে বলল, “এটাই হচ্ছে পালের গোদা। বদমাইশ। আমি দেখেছি এইটা ঢিল ছুড়ছে।” সুজন মিনমিন করে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল তখন পাহাড়ের মতো পুলিশটা ধমক দিয়ে বলল, “চুপ কর বদমাইশ। মাথা ভেঙে ফেলব।” রিতু এতো সুন্দর করে কথা বলতে পারে সে একটু চেষ্টা করল কিন্তু পাহাড়ের মতো লোকটা ধমক দিয়ে তাকেও থামিয়ে দিয়ে বলল, “সবগুলোর কোমরে দড়ি দিয়ে বেঁধে নিয়ে যাই। এক রাত হাজতে থাকুক তারপর চালান দিয়ে দিব। তখন বুঝবে মজা।” আরেকজন বলল, “বাপ-মায়েরও একটু শিক্ষা হওয়া দরকার। ছেলেপিলেরে মানুষ করতে পারে না, একেকটা বড় হচ্ছে যেন ইবলিসের বাচ্চা হয়ে।” রিতু আরেকবার কথা বলার চেষ্টা করল, মানুষটা চিৎকার করে বলল, “খবরদার একটা কথা না। গাড়িতে উঠ।” আমরা কিছু বলার সুযোগ পেলাম না, পুলিশগুলো ধাক্কা দিয়ে আমাদেরকে পুলিশ ভ্যানের পিছনে তুলে নিল। বেচারি আঁখি কোথায় কোনদিকে যাচ্ছে বুঝতে না পেরে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল, তখন পাহাড়ের মতো মানুষটা খেঁকিয়ে উঠল, “কানা না কি? চোখে দেখতে পাও না?” আঁখি কিছু বলল না। ভ্যানের পিছনে তোলার পর দুইজন আমাদের পাশে বসল। তখন গাড়িটা ছেড়ে দিল। আমাদেরকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে কে জানে। বলেছে হাজতে নিয়ে রাখবে, তারপরে না কি চালান দিবে। কেমন করে চালান দেয়? কোথায় চালান দেয়? যখন সবাই খবর পাবে যে পুলিশ আমাদের অ্যারেস্ট করে নিয়ে গেছে তখন তারা কী করবে? আব্বু আম্মু কী করবেন? নতুন ম্যাডাম কী করবেন? আমাদের নিশ্চয়ই টি সি দিয়ে স্কুল থেকে বের করে দিবে। তখন আমি কী করব? অন্যেরা কী করবে? চিন্তা করে যখন কোনো কূল-কিনারা পাচ্ছি না তখন শুনলাম সুজন ফিসফিস করে বলছে, “পালাতে হবে।” আমি ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলাম, “পালাতে হবে?” “হ্যাঁ।” “কেমন করে?” “যখন গাড়িটা থামবে, তখন লাফিয়ে নামব। তারপর দৌড়।” “আঁখি? আঁখি কী করবে?” “আঁখিও দৌড়াবে।” আমি অবাক হয়ে বললাম, “কেমন করে?” “একজনকে ধরে।” আমি বুঝতে পারলাম না সেটা কেমন করে সম্ভব। কিন্তু দেখা গেল সুজন ফিসফিস করে সবাইকে এই কথাই বলে দিচ্ছে। আঁখিকেও বলা হল এবং আমি দেখলাম সেটা শুনে সে কেমন যেন চমকে উঠল। তার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে উঠল কিন্তু সে আপত্তি করল না। আমরা ফিসফিস করে কথা বলছি সেটা হঠাৎ করে পাহাড়ের মতো পুলিশটা লক্ষ করল, সাথে সাথে সে খেঁকিয়ে ওঠে, “কী হচ্ছে এইখানে? গুজগুজ ফুসফুস কীসের? এক বাড়ি দিয়ে মুখ ভেঙে ফেলব।” কাজেই আমরা সবাই চুপ করে গেলাম। গাড়ি করে আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তখনো বুঝতে পারছি না হঠাৎ সেটা থেমে গেল। তাকিয়ে দেখলাম রাস্তার পাশে কয়েকজন পুলিশ অফিসার, একজন হাত তুলে গাড়িটা থামিয়েছেন। এখন আমাদের লাফ দিয়ে নামতে হবে তারপর দৌড় দিতে হবে। আঁখির হাতে ভাজ করা লাঠিটা সে ছেড়ে দিল, সাথে সাথে সেটা লম্বা হয়ে যায়, সেটা হাতে নিয়ে সে শক্ত হয়ে বসে থাকে। পুলিশ অফিসারটি গাড়ির পিছনে দাঁড়িয়ে ভিতরে তাকালেন। পাহাড়ের মতো পুলিশটি নেমে অফিসারকে একটা সেলুট দিল। অন্যজনও হাড়পাঁচড় করে নেমে পড়ে। পুলিশ অফিসারটি আমাদের দিকে তাকালেন, তারপর একটু অবাক হয়ে পাহাড়ের মতো পুলিশটাকে জিজ্ঞেস করলেন, “এরা কারা?” পাহাড়ের মতো পুলিশটা বলল, “স্পটে ধরা পড়েছে। ঢিল ছুড়ছিল।” অফিসারটা আঁখির দিকে তাকালেন, তার হাতের সাদা লাঠিটার দিকে তাকালেন। তারপর সুজনের দিকে তাকালেন তারপর তার অন্ধ ফকিরের মতো সানগ্লাসের দিকে তাকালেন তারপর আমাদের দিকে তাকালেন, তারপর পাহাড়ের মতো পুলিশটার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি কি জান এরা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বাচ্চা?” পাহাড়ের মতো পুলিশটা বলল, “জে?” “ঐ মেয়েটার হাতে সাদা লাঠিটা দেখেছ? দ্য হোয়াইট কেইন? তুমি কি জান পৃথিবীর অন্য যে কোনো দেশে ঐ সাদা লাঠিটা দেখামাত্র পুরো সিস্টেম তাকে সাহায্য করার জন্যে এলার্ট হয়ে যায়? তার যেন কোনো অসুবিধা না হয় সেই জন্যে সবাই এগিয়ে আসে। আর এই আনফচুনেট দেশে তুমি তাদেরকে মিসক্রিয়েন্ট বলে ধরে নিয়ে যাচ্ছ?” পুলিশ অফিসারটি ধমক দিয়ে বললেন, “আর ইউ ক্রেজি? আর ইউ স্টুপিড?” পাহাড়ের মতো মানুষটা একেবারে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল, দুর্বলভাবে বলল, “আমি দেখলাম ঢিল ছুড়ছে” পুলিশ অফিসারটা বললেন, “ডোন্ট টক ননসেন্স। এই মুহূর্তে ওদেরকে ওদের জায়গায় পৌঁছে দিয়ে আস।” “জি স্যার।” আঁখি বলল, “থ্যাংকু। আপনাকে অনেক থ্যাংকু।” পুলিশ অফিসারটি বললেন, “তুমি কিছু মনে কোরো না মা।” আবার গাড়ি ছেড়ে দিল, এবারে অবস্থা পুরোপুরি অন্যরকম। পাহাড়ের মতো মানুষটা মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, “তোমরা সবাই অন্ধ?” মামুন বলল, “হ্যাঁ।–” আমি সুজনকে দেখিয়ে বললাম, “অন্ধ না হলে কি কেউ এইরকম কালো চশমা পরে?” “কিন্তু, দেখে বোঝা যায় না।” সুজন বলল, “আমরা যেহেতু চোখে দেখি না তাই বেশিরভাগ কাজকর্ম করি কানে শুনে। আমাদের কান খুব ভালো। সবকিছু আমরা শুনি। শুনে বুঝে ফেলি।” রিতু বলল, “যেমন আপনার নিশ্বাসের শব্দ আমরা শুনতে পাচ্ছি। সেই শব্দ শুনে বুঝতে পারছি আপনার সাইজ পাহাড়ের মতো।” “তাজ্জব ব্যাপার।” মামুন বলল, “আপনার চেহারাটাও ভালো না।” পাহাড়ের মতো মানুষটা ভ্যাবাচেকা খেয়ে বলল, “সেইটা তুমি কেমন করে বললে?” মামুন উত্তর দেবার আগেই আঁখি বলল, “যে মানুষ যত সুন্দর করে কথা বলে তার চেহারা আমাদের কাছে তত সুন্দর মনে হয়। আপনি তো আমাদের সাথে সুন্দর করে কথা বলেন নাই।” পাহাড়ের মতো মানুষটাকে কেমন জানি বিপর্যস্ত দেখাল। আমাদের স্কুলের গেট আসার আগে পর্যন্ত সেই মানুষটা আর একটা কথাও বলল না।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৬১ জন


এ জাতীয় গল্প


Warning: mysqli_fetch_array() expects parameter 1 to be mysqli_result, boolean given in /var/sites/g/golperjhuri.com/public_html/story.php on line 344

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...