বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন

বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা

আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

বাবা মা এখন আমাদের সন্তান

"ভিন্ন খবর" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান তুষার কবির (০ পয়েন্ট)



X শুরুতে দুটি গল্প বলি। কল্পনা নয়, জীবনের গল্প। ধীরেন্দ্রনাথের কথা মনে আছে? একটি ঝুড়িতে মাকে বসিয়ে সেই ঝুড়ি মাথায় নিয়ে ১০ মাইল পথ হেঁটে চিকিত্সকের কাছে গিয়েছিলেন ধীরেন্দ্র। ২০১৩ সালের ঘটনা। সংবাদপত্রের পাতা থেকে সেই ছবি ও সংবাদ ছড়িয়ে পড়েছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। মায়ের প্রতি ভালোবাসার এই বিরল নিদর্শন নিয়ে তখন কি আবেগ ও উচ্ছ্বাস সবার! শুধু একবার নয়, বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার চণ্ডীপুর গ্রাম থেকে পাশের উপজেলা জিয়ানগরে চিকিত্সকের চেম্বারে নাকি অসুস্থ মাকে নিয়ে নিয়মিতই আসতেন মাতৃভক্ত ছেলেটি। খোদ চিকিত্সকের ভাষ্য থেকে এটা জানতে পেরেছিলাম আমরা। এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে ধীরেন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘মায়রে মাথায় নিয়া হাঁটতে মোর কোনো কষ্ট অয় না।’ আরেকটি ঘটনা তো আরও হৃদয়স্পর্শী। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছিলেন রোহিঙ্গা সাইফুল্লাহ। কিন্তু সেই অরক্ষিত মাতৃভূমিতে বৃদ্ধা মাকে ফেলে আসেননি তিনি। ২০১৭ সালের ঘটনা। নিজেরই বয়স ৪৫ বছর তখন সাইফুল্লার। কিন্তু ৯৫ বছর বয়সী পক্ষাঘাতগ্রস্ত মাকে কাঁধে নিয়ে ২৯ মাইল পথ হেঁটে নাফ নদীর তীরে এসে পৌঁছেছিলেন। পাশে ছিলেন বাবা আবুল খায়ের, তাঁর হাতটাও ছাড়েননি। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামের অধিবাসী হতদরিদ্র ধীরেন্দ্রনাথ বা মিয়ানমারের সাইফুল্লাহ হয়তো কোনো দিন বিশ্ব মা দিবস বা বাবা দিবসের নাম শোনেননি। কিন্তু তাঁদের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগটার নাম ‘নাড়ির বন্ধন’। আমরা যারা পত্রিকায়, ফেসবুকে এই ছবি ও ঘটনা জেনে আবেগাপ্লুত হয়েছি, বন্ধুদের সঙ্গে ভাগাভাগি করেছি, তারাও নিশ্চয় সেই আবেগই বহন করি, কিন্তু পারি কি নিজের মাতা-পিতাকে পরম যত্ন ও মমতায় আগলে রাখতে? জীবনের শুরুতে যাঁদের হাত ধরে পায়ে পায়ে হাঁটতে শিখেছি, একটু একটু করে আমাদের হাঁটতে দেখলে যাঁরা আনন্দে উদ্ভাসিত হতেন, আজ এতকাল পরে তাঁদের হাতটা ধরে আমরা কি হতে পারছি তাঁদের নিরাপদ আশ্রয়? তাহলে কেন আমরা সংবাদপত্রে সেই বৃদ্ধা মায়ের কথা পাই, ঢাকার নিজের বাসা থেকে মাদারীপুরের শিবপুর উপজেলার সাদেকাবাদ গ্রামে নিজের বাড়ির পাশে রাস্তায় ফেলে গেলেন নিজের মেয়ে (নাম উল্লেখ করছি না)? এই করোনাকালেও অসুস্থ মা-বাবাকে পথে ফেলে যাওয়া, এমনকি লাশ সৎকার না করার খবর পর্যন্ত শুনেছি আমরা! পিতা-মাতাকে নিয়ে এ রকম অজস্র বিপরীতধর্মী ঘটনা আমাদের চারপাশে ঘটে চলেছে প্রতিনিয়ত। এ নিয়ে কত গল্প-নাটক, গান-চলচ্চিত্র নির্মিত হচ্ছে। সেসব ফিকশন আমাদের হৃদয় স্পর্শ করে। কিন্তু ঘরে ঘরে সেই আবেগের প্রতিফলন তো দেখি না! আবার ফকির আলমগীরের সেই দরদি কণ্ঠের গান, ‘মায়ের এক ধার দুধের দাম, কাটিয়া গায়ের চাম/ পাপোশ বানাইলে ঋণের শোধ হবে না...’ শুনলে যেকোনো সন্তানের দুচোখ সিক্ত হয়ে পড়ে। শত-সহস্র তরুণ দর্শকের কোলাহলে মুখর কোনো কনসার্টে যখন জেমস গেয়ে ওঠেন, ‘বাবা কত দিন কত দিন দেখি না তোমায়, কেউ বলে না তোমার মতো কোথায় খোকা ওরে বুকে আয়...,’ তখন দেখি কী অদ্ভুত বিষণ্নতা নেমে এসেছে অনুষ্ঠানজুড়ে। কিন্তু সেই আবেগ কি অনূদিত হয় যখন নিজের মা–বাবার প্রতি কর্তব্য পালনের দায়দায়িত্ব এসে পড়ে কাঁধে? কোনো সন্দেহ নেই, আমাদের যৌথ পরিবারগুলো এখন ভেঙে পড়ছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে এখন একান্নবর্তী পরিবারের দেখা মেলাই ভার। ভাইবোনেরা আলাদা চাকরিতে ঢোকে, পৃথক সংসার হয়, সন্তান আসে সংসারে। অর্থাৎ নতুন করে অনেক দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত হতে হয় সবাইকে। সেই নতুন কর্মব্যস্ততার ভিড়ে একটা পুরোনো অনুষঙ্গ শুধু থেকে যায়—পিতা-মাতা। নিজের ছেলেমেয়ের বেবিফুড, খেলনাপাতি থেকে স্কুল-কলেজের ভর্তির চিন্তার মধ্যে ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারায় বৃদ্ধ হতে থাকা মা-বাবার প্রসঙ্গ। খুব স্বাভাবিক, কারণ স্নেহ নিম্নগামী। আমাদের মা-বাবা আমাদের জন্য যা করেছেন, স্নেহ-মমতা যা দিয়েছেন, তার কিছুই তো তাঁদের ফিরিয়ে দিতে পারি না, বরং সেই সব উজাড় করে দিই নিজের সন্তানকে। এটাই হয়তো সংসারের পূর্ণাঙ্গ বৃত্তের চিরকালীন চিত্র। কিন্তু খুব বেশি না হোক, উপেক্ষা-অবজ্ঞার পরিবর্তে সামান্য একটু যত্ন-আত্তি, শরীরের খোঁজ নেওয়া, ওষুধটা ঠিকমতো খেলেন কি না তার খোঁজ নেওয়া কি খুব কঠিন? না, কঠিন নয়। কিন্তু আমরা যদি তাঁদের বোঝা মনে করি, যদি বাড়তি চাপ মনে করি, তাহলে তাঁরা অবজ্ঞার শিকার হন। এ ক্ষেত্রে দুটি সাধারণ কারণের কথা এখানে উল্লেখ করা যায়— ১. ভাইবোনেরা আলাদা সংসার পেতেছেন, কে নেবেন মা-বাবার দায়িত্ব? এ নিয়ে কখনো চাপা, কখনো প্রকাশ্য বিরোধ। আর এ বিরোধের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি মা-বাবার অমর্যাদা। ২. অন্য পরিবার থেকে যে মেয়েটি বউ হয়ে আসে, স্বামীর মা-বাবাকে আপন করে নেওয়ার ব্যাপারে তাঁর অসহিষ্ণুতা। এতে স্ত্রী ও মা-বাবার (বিশেষ করে মা) মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে স্বামী বা ছেলের টানাপোড়েন, অনেকটা ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’ অবস্থা। প্রথম কারণটি নতুন নতুনতর মাত্রা পাচ্ছে আজকাল। যেমন ভাইবোনের সংখ্যা দুই বা ততোধিক হলে তাঁরা চাইবেন দায়িত্বটা ভাগজোখ করে পালন করুক সবাই। সে ক্ষেত্রে কেউ একজন মাকে এবং অন্যজন বাবাকে নিয়ে গেলে তা যে এই প্রবীণ দম্পতির কাছে কত বড় বেদনার বিষয় হয়ে ওঠে, কল্পনাও করা যায় না! বৃদ্ধ বয়সে তো প্রবীণ দম্পতির ভালোবাসা ম্লান হয়ে যায় না। বরং জীবনসায়াহ্নে সুখে-দুঃখে একে অপরের আরও কাছে থাকতে চান। হিন্দি বাগবান (অমিতাভ বচ্চন ও হেমা মালিনী অভিনীত) ছবিটি যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা এই বিষয়টি কিছুটা হলেও অনুধাবন করতে পারবেন। সুতরাং এভাবে মা-বাবাকে ভাগ করার চিন্তা না করাই ভালো। দ্বিতীয় যে কারণ, সেটাও অনেকটা জনপ্রিয় ভারতীয় ধারাবাহিকগুলোর মতো ‘ঘর ঘর কা কাহানি।’ শাশুড়ি ও পুত্রবধূর দ্বন্দ্ব। এখানে দুজনকেই সহিষ্ণুতার পরিচয় দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে শাশুড়ি বৃদ্ধা হলে পুত্রবধূর দায়িত্ব নিতে হবে বেশি। মা-বাবা ও স্ত্রীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে প্রকৃত ব্যক্তিত্বের পরিচয় দিতে হবে ছেলে বা স্বামীকে, যাতে দুই পক্ষের বিরোধ মিটে যায়। মধুর একটি সম্পর্ক গড়ে উঠলে তো ভালো, না হলে অন্তত পারস্পরিক মর্যাদা যাতে অক্ষুণ্ন থাকে। আমাদের প্রত্যেকেরই বুঝতে হবে জীবনটা একটা বৃত্ত। শিশুকালে মা-বাবা আমাদের পেলে-পুষে বড় করেছেন। এখন জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই মা-বাবা অনেকটা অসহায় শিশুর মতো হয়ে পড়েছেন। তাঁদের অনেক আচরণই হয়তো বিরক্তি উদ্রেক করে, তাঁরা বাড়াবাড়ি আবদারও করেন অনেক সময়। আমাদের সন্তানদের এ রকম ‘বাড়াবাড়ি’ সহ্য করি না আমরা? আমাদেরও ‘অত্যাচার’ এককালে সহ্য করেননি তাঁরা? আজ এটুকু পারব না কেন? তাঁদের ভালোবাসা, যত্ন দিয়ে লালনপালনের ভার এখন আমাদের ওপর। ভাইবোনদের কেউ একজন মা-বাবাকে নিজের ঘরে রাখলে অন্যেরা যথাসম্ভব আর্থিক সহায়তা দিতে পারেন, চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারেন, যাতে একজনের পক্ষে চাপ হয়ে না যায়। বৃদ্ধাশ্রমের নির্বান্ধব জীবনের চেয়ে নাতি-নাতনি পরিবেষ্টিত দাদা-দাদির ছবিটা কত মধুর হতে পারে, তা মনে রাখতে হবে সন্তানকে। শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের জন্য নয়, একফ্রেমে তিন প্রজন্মের ছবিটাই হয়ে উঠুক আমাদের সবার আনন্দভবনের ছবি, আনন্দভুবনের ছবি। ●প্রথম আলো ● লেখক :বিশ্বজিৎ চৌধুরী


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৬২ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...