বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন

বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা

আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

হারিয়ে যাওয়া গল্প

"মজার গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Radiyah Ridhi (৩০ পয়েন্ট)



X এক রাজ্যে খুব নামকরা একজন লেখক ছিল। আশপাশের রাজ্যজুড়ে ছিল তার অদ্বিতীয় গল্পের সুনাম। লেখক প্রায়ই কাগজ–কলম আর একটা ছোট্ট ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়ত নতুন গল্পের অন্বেষণে। নানান গ্রাম ঘুরে ঘুরে, নানান রকম মানুষের সঙ্গে কথা বলত লেখক। মানুষের জীবনযাপন, আচার–ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করে সে তার গল্পের জন্য করত গবেষণা। গবেষণা শেষ হলে নিজের বাড়িতে ফিরে এসে রচনা করত অনন্য একেকটা গল্প। লেখককে তাই বেশ কিছু রাজ্যের প্রধান বিভিন্ন পুরস্কার দিয়ে সম্মানিতও করেন। কয়েক বছর পর হঠাৎ একদিন পাশেরই এক রাজ্যের ব্যাপারে খুব অদ্ভুত একটা গুজব শুনতে পেল লেখক। সেখানকার মানুষের নাকি ভুলে যাওয়া রোগে ধরেছে! আগে সেটা গুটি কয়েকজনের হচ্ছিল, তাই কেউ খুব একটা পাত্তা দেয়নি। কিন্তু এখন নাকি মহামারি আকারে দেখা দিয়েছে রোগটা! ‘ভুলে যাওয়া রোগ, তা–ও আবার মহামারি আকারে! ব্যাপারটা তো তাহলে দেখে আসতে হয়।’ বেশ উদ্বিগ্নভাবে ভাবল লেখক। পাশের সেই গ্রামে নতুন গল্পের সন্ধানে সে আগেও গিয়েছে বহুবার। তাই বুঝি অন্য রকম একটা টান অনুভব করে ব্যাপারটি নিজে দেখে আসার জন্য। সেই রাজ্যে গিয়ে লেখক দেখল, রাজ্যের অনেকেরই কোনো একটা নির্দিষ্ট সময়ের বিশেষ কোনো স্মৃতি মনে নেই। এমনকি খুব কাছের আত্মীয়রাও দেখা যাচ্ছে সেই স্মৃতিগুলো মনে করতে পারছে না। সময়ের সঙ্গে অন্যদের কথোপকথনে বা নিছক আগ্রহভরা প্রশ্ন করতে গিয়ে দেখা যায়, রাজ্যের অনেকের মাঝেই স্মৃতির বিলুপ্তি ঘটেছে! কিন্তু এর কারণ কেউই বুঝতে পারছে না! পূর্বপরিচিত একজনকে লেখক জিজ্ঞাসা করে, ‘তোমার বাম চোখটা কীভাবে নষ্ট হয়েছিল, বারেক?’ কিন্তু সে কিছুতেই তা মনে করতে পারে না! এমনকি তার পরিবারের লোকজনও এ বিষয়ে কিছুই মনে করতে পারল না! লেখক দেখল, রাজ্যের অনেকের সঙ্গেই এমনটা হয়েছে। সেই রাজ্যের কয়েকজন বড় বড় ডাক্তার আর বিজ্ঞ মহলের কাছেও রোগটার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইল লেখক, কিন্তু কেউই কোনো সন্তোষজনক জবাব দিতে পারল না। কিছুই করতে না পেরে দুদিন পর লেখক ফিরে এল তার রাজ্যে। তবে যাওয়ার আগে তাকে যেমন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মনে হচ্ছিল, ফিরে আসার পর সেই দুশ্চিন্তার কোনো ছাপ দেখা গেল না তার চেহারায়। কিন্তু কেমন যেন অন্যমনস্ক মনে হচ্ছিল তাকে। তবে কি এই অদ্ভুত রোগকে কেন্দ্র করে নতুন কোনো গল্প তার মাথায় এল! সোজা তার বাসায় গিয়ে ঢুকল লেখক। নিজের ঘরে ঢুকে কাঁধের ব্যাগটা রাখল মাটিতে। বিছানার একপাশে আয়নাটার পাশে গিয়ে দাঁড়াল সে। আচমকা, দেয়ালের একটা জায়গায় আঙুল দিয়ে কেমন একটা চিহ্ন আঁকার মতো ভঙ্গি করল লেখক! আর সঙ্গে সঙ্গেই খুলে গেল একটা গুপ্ত দরজা। সামনে দেখা গেল একটা সিঁড়ি নিচে নেমে গেছে। সেই সিঁড়ি বেয়ে নিচের একটি আলো–আঁধারি ঘরে নেমে এল লেখক। লেখক এবার বাতাসে আঙুল দিয়ে একটা অদ্ভুত চিহ্ন আঁকার ভঙ্গি করল, আর সঙ্গে সঙ্গেই শত শত ভাসমান কাগজ তার সামনে এসে হাজির হলো! মনে হলো কাগজগুলো যেন ওখানেই ছিল, লুকানো অবস্থায়! কাগজগুলোতে নীল রঙের উজ্জ্বল কালির লেখার আবির্ভাব ঘটল। সব কাগজ আসলে একেকটা গল্পের পাণ্ডুলিপি। ওহ্‌, এটা তাহলে লেখকের গল্প লেখার ঘর! কিন্তু এত লুকোছাপা কেন আর এত জাদুটোনারই–বা কী প্রয়োজন! কে আসছে তার গল্প চুরি করতে? কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই পাণ্ডুলিপিগুলো যেন একেকটা জীবন্ত গল্প হয়ে উঠল! যেন লেখকের সামনে অনেকগুলো সিনেমার খণ্ড খণ্ড কিছু অংশ ভেসে বেড়াচ্ছে। সেখানে সত্যিকারের মানুষেরা একে অন্যের সঙ্গে কথা বলছে, ঝগড়া করছে, মারামারি করছে। একটা গল্পের অংশে দেখা গেল, একজনের চোখে এক সাপ এসে ছোবল দিল! আরে, এ তো পাশের রাজ্যের সেই বারেক! যার কাছে লেখক তার অন্ধত্বের কারণ জানতে চাইছিল! তাহলে কি এভাবে সাপের কামড়েই অন্ধ হয়ে গিয়েছিল মানুষটা? কিন্তু লেখকের কাছে সেই গল্পের স্মৃতি এল কী করে? চারপাশে এমনই অসংখ্য টুকরো টুকরো স্মৃতি ভেসে বেড়াতে লাগল, যেন লেখক এদের জড় করে রেখেছে নিজের কাছে। না ভুল হলো, স্মৃতিগুলোকে আসলে বন্দী করে রেখেছে লেখক! লেখকের মুখটা এবারে দেখতে কেমন ভয়ংকর লাগছিল। মনে হচ্ছে, কোনো লোভী শিকারি তাকিয়ে আছে তার শিকারের দিকে। ‘তোদের স্মৃতিগুলো চিরদিনের মতো শুধুই আমার গল্পে বন্দী হয়ে থাকবে! কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি এটা আমার কারসাজি!’ বলেই কুৎসিত অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল সে।এভাবেই না জানি কত মানুষের তিল তিল করে গড়ে তোলা অমূল্য সব স্মৃতিকে লেখক শুধু নিজের গল্প হিসেবে বন্দী করে রেখেছে, একেকটা অনবদ্য আর অদ্বিতীয় সব গল্প! কিছুদিনের মধ্যেই আশপাশের আরও কিছু রাজ্যে সেই স্মৃতিবিলুপ্তি রোগের খবর পাওয়া যেতে লাগল। সেই রাজ্যগুলোতে তাই এখন গল্পের জন্য যাওয়াটা ঠিক হবে না বলে মনে করে লেখক। যদিও সে নিশ্চিত ছিল যে তার ধরা পড়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই, তবু এটুকু সাবধানতা সে অবলম্বন করছিল। কিন্তু অনেক দিন হয়ে গেছে সে কোনো নতুন গল্পের খোঁজে বের হতে পারছে না। কত দিন আর এভাবে বসে থাকা যায়? তাই এক সকালে ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ল সে! এবার সে পাড়ি জমাবে বহু দূরের কোনো এক রাজ্যে, যেখানে আগে কখনো যায়নি। ‘কেমন হবে সেখানকার মানুষ? আর কেমনই–বা হবে তাদের গল্পগুলো?’ ভাবতেই লেখকের লোভী মনটা উৎফুল্ল হয়ে ওঠে! দীর্ঘ কয়েক দিনের পথ পাড়ি দিয়ে পাহাড়ে ঘেরা এক রাজ্যে এসে পৌঁছাল লেখক। পথঘাট বেশ উঁচু-নিচু আর দুর্গম। জনসমাগমও বেশ কম এখানে। একদিন শেষ বিকেলের কথা, পাহাড়ি পথ ধরে হেঁটে যেতে যেতে রাতটা কোথায় কাটানো যায়, সেটাই ভাবছিল লেখক। হঠাৎ পা পিছলে খাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে পড়ে গেল নিচে। গুরুতর আহত অবস্থায় জ্ঞান হারানোর আগে তার চোখে পড়ল কয়েকজন আদিবাসী লোক অদ্ভুত এক ভাষায় হই হই করতে করতে এগিয়ে আসছে তার দিকে! পহরের সেবায় ধীরে ধীরে লেখক সুস্থও হয়ে উঠতে থাকে। পহরের সঙ্গে ঘুরে দেখে গ্রাম এবং আশপাশের পাহাড়। পহর লেখককে জানায়, তার স্বপ্নের কথা—ফুলানদের গল্পগুলো সব রাজ্যে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে চায় সে! জ্ঞান ফিরতেই লেখক নিজেকে আবিষ্কার করল বাঁশের তৈরি একটা ঘরের মেঝেতে। উঠে বসার চেষ্টা করতে গিয়ে দেখল, মাথা আর শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা! খেয়াল করল, তার মাথায় ব্যান্ডেজ, ডান হাতটা মনে হয় ভেঙে গেছে, বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। চিকিৎসাপদ্ধতি দেখে মনে হলো, আদিবাসীদের নিজস্ব সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়েছে। লেখক আবার তার চারপাশে তাকাল, বাঁশের বেড়া দিয়ে তৈরি ঘরের দেয়ালের মাঝ দিয়ে ঘরে ঢুকছে মিষ্টি রোদ। একপাশে ছোট একটা জানালাও আছে, সেখান দিয়ে গাছপালা আর নীল আকাশ চোখে পড়ছে। শুয়ে শুয়ে জ্ঞান হারানোর আগের দৃশ্যগুলো মনে করছিল লেখক। একটা সময় ঘরের দরজা খোলার শব্দ হলো। লেখক তাকিয়ে দেখল, দরজা খুলে ঘরে ঢুকছে দুজন মানুষ। দুজনই আদিবাসী, কমবয়সী একজন ছেলে আর মায়াবী চেহারার একজন মেয়ে। লেখককে জেগে থাকতে দেখে ছেলেটা মেয়েটাকে তাদের ভাষায় কী যেন বলল। হালকা ধমকের সুরে উত্তর দিল মেয়েটা। মেয়েটা লেখকের কাছে এগিয়ে এসে মিষ্টি করে হেসে পাশে বসল। পরিষ্কার করে লেখকের ভাষায় বলল, ‘ঘুম ভাঙল তাহলে আপনার? কেমন আছেন আজকে?’ লেখক সবকিছু ভুলে মেয়েটার চোখের দিকেই তাকিয়ে রইল, কী মায়াবী চোখগুলো! মেয়েটা ইশারা করতেই বেশ বড়সড় একটা ঝুড়ি পাশে রেখে দিল ছেলেটা। সেই ঝুড়িতে চিকিৎসার অনেক সরঞ্জাম রাখা। মেয়েটার সাহায্যে উঠে বসল লেখক। ‘আমার নাম পহর, আমরা ফুলান জাতির বংশধর। আপনাকে আমার ভাইয়েরা সেদিন পাহাড়ের ঢাল থেকে উদ্ধার করেছে। তারপর আমি আপনার চিকিৎসা করি। আপনার হাতে আর মাথায় বেশ ভালোই জখম হয়েছে, গত দুই দিন আপনার জ্ঞান ছিল না! তবে ভয়ের কিছু নেই, দেখবেন ধীরে ধীরে ঠিকই সুস্থ হয়ে উঠবেন’, বলতে বলতে লেখককে কিছু জড়িবুটি ওষুধ খাওয়াতে থাকে মেয়েটি। লেখক এতক্ষণে কথা বলে, ‘পহর, তুমি তাহলে ডাক্তার?’ মেয়েটি হেসে উত্তর দেয়, ‘ওই কবিরাজ ডাক্তার আরকি, আমাদের তো আপনাদের মতো অত পড়াশোনা জানা নেই।’ এরপর লেখকের সঙ্গে মেয়েটির আরও অনেকক্ষণ গল্প হলো। জানা গেল, ছোট এই গ্রাম অন্যান্য রাজ্য থেকে আলাদা করে রেখেছে নিজেদের। একেবারে স্বতন্ত্রভাবে এরা জীবন যাপন করে। নিজেদের সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যকে অটুট রাখতেই তাদের এই স্বতন্ত্রতা রক্ষা করা। বাইরের প্রযুক্তির ওপর নির্ভর না করে তারা প্রকৃতি থেকেই নিজেদের যাবতীয় প্রয়োজন মিটিয়ে থাকে। তবে পহর এই সিদ্ধান্তকে পুরোপুরি সমর্থন করে না বলে জানাল। একদিকে সে যেমন নিজেদের সংস্কৃতিকে ভালোবাসে, সেই সঙ্গে অন্য সব রাজ্য ও প্রযুক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার অপকারিতাগুলোও সে উপলব্ধি করে। তাই নিজের চেষ্টায় নিজেদের ভাষার পাশাপাশি অন্যান্য প্রচলিত ভাষাগুলোও রপ্ত করছে পহর। আদিবাসীদের চিকিৎসাজ্ঞানকে আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যার সঙ্গে সংমিশ্রণের চেষ্টা করছে! গ্রামে সে-ই একমাত্র অন্য ভাষায় কথা বলতে পারে, যদিও ঠিকমতো লিখতে পারে না এখনো। শুরুতে গ্রামের বিজ্ঞমহল তার এ ধরনের কাজে অসন্তুষ্ট হলেও যখন তার চিকিৎসার দ্বারা গ্রামের অনেকের উপকার হতে থাকে, তখন কেউ আর পহরকে বাধা দেয় না। বরং গ্রামের সবাই পহরকে অনেক সম্মান করে।এদিকে নিজের আসল পরিচয় গোপন রেখে একজন ভ্রমণকারী হিসেবে পরিচয় দিল লেখক। এভাবে প্রতিদিন পহরের সঙ্গে লেখক গল্পে গল্পে অনেক কিছু জানতে পারে। লেখক মুগ্ধ হয়ে শুধু পহরের গল্প শোনে, কী সুন্দর গুছিয়ে কথা বলে মেয়েটি! ফুলানদের নানা প্রচলিত গল্প, রূপকথা যা যুগ যুগ ধরে কেবল তাদের লোকমুখে বেঁচে আছে, লেখক সেসব গল্প শোনার সৌভাগ্য লাভ করে। পহরের সেবায় ধীরে ধীরে লেখক সুস্থও হয়ে উঠতে থাকে। পহরের সঙ্গে ঘুরে দেখে গ্রাম এবং আশপাশের পাহাড়। পহর লেখককে জানায়, তার স্বপ্নের কথা—ফুলানদের গল্পগুলো সব রাজ্যে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে চায় সে! তাই অন্য ভাষাগুলো শিখছে সে। যখন লিখতে শিখে যাবে, তখন আরও ভালোভাবে ছড়িয়ে দিতে পারবে তাদের সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যপূর্ণ গল্পগুলো। লেখক এত সব অদ্বিতীয় গল্প শুনে নিশ্চয়ই তখন ভাবছে, কখন সব গল্প জাদুবলে নিজের কবজায় নিয়ে নেবে? কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, পহর নামের মায়াবী চেহারার মেয়েটির অসাধারণ সব গল্পের প্রতি লেখকের বিন্দুমাত্র কোনো লোভ জন্মাল না! বরং সে মনে মনে ভাবতে লাগল, সুস্থ হয়ে সে নিজেই মেয়েটিকে লিখতে শেখাবে। পহরের নামে ফুলানদের গল্পগুলোকে রাজ্যে রাজ্যে ছড়িয়ে দেবে লেখক! পহরের স্বপ্নকে যেন সে নিজের লক্ষ্য বানিয়ে বসল। এমনটা তো হওয়ার কথা নয়! সে কি তাহলে এবার তার অভিশপ্ত জাদুকরি জীবন ছেড়ে দিয়ে সাদামাটা শান্তিপূর্ণ এক জীবন বেছে নেবে! এক বিকেলে ঘুরতে বেরিয়ে পহরকে লেখক জানাল, সে তাকে লিখতে শেখাতে চায়। শুনে তো পহর খুব খুশি! সে লেখকের কাছে তার জীবনের গল্প জানতে চাইল। লেখক এড়িয়ে গিয়ে বলল, ‘আমার গল্প একেবারেই সাদামাটা পহর, তার চেয়ে তুমি তোমার গল্পগুলো বলো।’ পহর তখন মিষ্টি করে হেসে নতুন একটা গল্প বলতে আরম্ভ করে। ‘আমাদের ফুলান জাতির মাঝে যুগ যুগ ধরে একটা বিশেষ গল্প প্রচলিত আছে, আজ আপনাকে তাহলে সেই গল্পই শোনাব।’ লেখক আগ্রহভরা চোখে গল্প শোনার জন্য প্রস্তুত হলো। এখন তাকে দেখে কে বলবে সে একজন ভয়ংকর জাদুকর, যে মানুষের স্মৃতি চুরি করে বেড়ায় নিজের গল্পের খোরাকের জন্য। বরং তাকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন একজন কিশোর কোনো এক রহস্যভরা কল্পকথার জগতে হারিয়ে গেছে! কিন্তু পহরের সেই বিশেষ গল্প শুনতে শুনতে লেখকের দৃষ্টি ধীরে ধীরে বদলে যেতে শুরু করে; পহর তাকে যে গল্পটা শোনাচ্ছিল, তা ছিল ফুলান জাতির এক গৌরবময় ইতিহাসের গল্প। ‘বেশ কয়েক যুগ আগে দূরের এক রাজ্যে এক জাদুকরের আবির্ভাব হয়েছিল। সে জাদুবলে মানুষের স্মৃতি বন্দী করে রাখত নিজের কাছে, আর নানান অশুভ জাদুবিদ্যার কাজে সেই সব স্মৃতি ব্যবহার করত! তখন কেবল ফুলান জাতিই সমর্থ হয় সেই জাদুকরকে পরাজিত করতে। ফুলান জাতির সে সময়ের জ্ঞানী-গুণীরা নিজস্ব বিশেষ ক্ষমতা দিয়ে সেই খারাপ জাদুকরকে ধ্বংস করে। যে কারণে সেই রাজ্যের রাজা কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ফুলান জাতিকে অনেক সোনাদানা উপহার দেন, আর তাদের নাম ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখার প্রতিজ্ঞা করেন। কিন্তু ফুলান জাতি লোভ–লালসা বা জাগতিক স্বীকৃতিকে দুর্বলতা মনে করায় সেই উপহারগুলো অস্বীকার করে এবং নিজেদের মতো করে লোকচক্ষুর আড়ালে এই পাহাড়েই বসবাস করতে থাকে। জগৎবাসী জানতেও পারে না ফুলান জাতির অবদান। কিন্তু তারা রাজাকে এটাও কথা দেয়, যখনই এ রকম দুষ্ট জাদুকরের আবির্ভাব জগতে আবার ঘটবে, তখনো এই ফুলান জাতিই সবাইকে রক্ষা করবে। কারণ, উত্তরাধিকারসূত্রে ফুলানদের সেই ক্ষমতা ও গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়েছে!’লেখকের হাত–পা তখন ঠান্ডা হয়ে গেছে! এ কেমন গল্প তাকে শোনাল পহর! গল্পটা যে আসলেই সত্যি! কারণ, গল্পের সেই জাদুকর তো লেখকেরই পূর্বপুরুষ! ছোটবেলায় সে তার দাদার কাছে এই গল্প শুনেছে, কোনো এক শক্তিশালী ও পবিত্র অজ্ঞাতনামা গোত্র তাদের ক্ষমতাবলে অশুভ জাদুকরের বিনাশ ঘটায়। লেখকের পরিবার তাদের সেই পূর্বপুরুষের জন্য সমাজের অনেক লাঞ্ছনা সহ্য করে। তাই পরিবারের সবাই সেই জাদুকর পূর্বপুরুষকে ঘৃণা করত। দাদা তাকেও সাবধান করেছিলেন নিজেদের সেই অভিশপ্ত অতীতের প্রতি আসক্ত না হতে, কিন্তু লেখক ঠিক সেই কাজই করল! নিজেই পরিণত হলো একজন অশুভ জাদুকর হিসেবে। কিন্তু কী হচ্ছে এসব? পহরের জাতিই কি তাহলে লেখকের সেই পূর্বপুরুষের হত্যাকারী? পহর দেখল, লেখক ঘামছে। সে ভাবল, লেখকের হয়তো শরীর খারাপ করেছে। লেখকও কথা না বাড়িয়ে শরীর খারাপের অজুহাতে সোজা নিজের ঘরে চলে এল। মেয়েটা যখন জানবে, বাকি রাজ্যে আবার স্মৃতিবিভ্রাটের রোগের প্রকোপ দেখা গেছে এবং সে নিজে একজন বড় লেখক, দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাতে কত দিনই–বা লাগবে পহরের? তাহলে কী করবে সে এখন! নানান চিন্তায় সে তার ঘরে পায়চারি করতে লাগল। এর মাঝে পহর তার খোঁজ নিতে এল, ওষুধ দিতে চাইল। কিন্তু ঘুমানোর কথা বলে তাকে মানা করে দিল লেখক। কোথায় ঘুম? উল্টো সারা রাত বিছানায় শুধু ছটফট করেই কাটল লেখকের। সকালে লেখককে দেখে চেনাই যাচ্ছে না। এক রাতেই যেন তার বয়স কয়েক বছর বেড়ে গেছে! তবে রাতের চেয়ে বেশ শান্ত দেখাচ্ছে তাকে। ঘরের বাইরে এসে পহরের খোঁজ করল লেখক। গ্রামের কিছু রোগীর চিকিৎসা করতে গেছে পহর। পাড়া থেকে একটু দূরে একটা জায়গায় বসে তার জন্য অপেক্ষা করল লেখক। বসে বসে সে তার সিদ্ধান্তটা পরখ করে দেখে। লেখক যদিও চেয়েছিল পহরের ওপর কোনো জাদুটোনার ব্যবহার করবে না সে, কিন্তু ভাগ্যের ফেরে তাকে সেটা এখন করতেই হবে! পহর তার জাতশত্রুদের বংশধরদের কুকীর্তি সহজেই ফাঁস করে দিতে পারে। তাই একমাত্র উপায় পহরের ওপর জাদু করে তার বিশেষ সেই গল্পের স্মৃতিটা ধ্বংস করে দেওয়া! দাদা তাকেও সাবধান করেছিলেন নিজেদের সেই অভিশপ্ত অতীতের প্রতি আসক্ত না হতে, কিন্তু লেখক ঠিক সেই কাজই করল! পহর কাজ সেরে এলে একটু দূরে পাহাড়ের কোলে একটা ঝরনার কাছে গেল ওরা। পহর লেখকের চেহারা দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে বলে, ‘আপনি ঠিক আছেন? কাল রাতে তো ওষুধও খেলেন না!’ লেখক বলল, ‘তেমন কিছু না, আমি ভালো আছি।’ লেখক পহরের একটু কাছে এগিয়ে এল, ‘তোমাকে আজ একটা কথা বলব পহর’, বলেই লেখক পহরের কাঁধে আলতো করে একটা হাত রাখে। পহরও আগ্রহভরা চোখে তাকায় লেখকের দিকে। এ সময় লেখক চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে অদ্ভুত এক ভাষায় জাদুমন্ত্র আওড়াতে শুরু করে। আঙুলের স্পর্শে পহরের কাঁধে একটা চিহ্ন আঁকতে শুরু করে। শুরু হয়ে যায় জাদুটোনার পর্ব! পহর তখন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সম্মোহিতের মতো, চোখে শূন্যদৃষ্টি। ধীরে ধীরে তার শরীর থেকে নীল একটা আভার মতো বেরিয়ে লেখকের হাত হয়ে তার শরীরে প্রবেশ করতে থাকে। লেখকের চোখে কেমন একটা নির্লিপ্ত চাহনি। সে অনুভব করতে পারে, পহরের পূর্বপুরুষের সেই ঐতিহাসিক গৌরবকথার স্মৃতিটি ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে। এই গল্পকে লেখক কোনো পাণ্ডুলিপিতেও আটকে রাখবে না, একেবারে ধ্বংস করে ফেলবে! যেন কেউ আর কখনো এই গল্প জানতে না পারে। সে অনুভব করে, জাদুবলে বাকি যারাই এই গল্প জানত, তারাও ভুলে যাচ্ছে। ঠিক এটাই চেয়েছিল লেখক, সব তার পরিকল্পনামতোই হচ্ছে। আর কিছুক্ষণমাত্র, তারপর এই সবকিছুকে পেছনে ফেলে সে পহরের সঙ্গে নতুন একটা জীবন শুরু করতে পারবে। কিন্তু পরক্ষণেই যা ঘটল, লেখক তার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিল না! জাদুর পর্বটা প্রায় যখন শেষের দিকে, ঠিক তখন লেখকের শরীর থেকে লাল বর্ণের একটা আভা বেরিয়ে পহরের ভেতরে প্রবেশ করতে লাগল! দুজনের চোখই তখন সাদা হয়ে গেল আর ওরা শূন্যে ভাসতে লাগল। লেখক যেন তার জায়গায় আটকে গেছে, পহরের কাঁধ থেকে সে হাতটা কিছুতেই সরিয়ে আনতে পারছে না। কোনোভাবে পহর লেখকের জাদুর পাল্লাটা নিজের আয়ত্তে নিয়ে ফেলেছে! লেখকের জাদুটা এবার সে লেখকের ওপরেই প্রয়োগ করতে শুরু করল। সেই লাল আভাগুলোর আদলে লেখকের সব স্মৃতি পহর একে একে নিজের চোখের সামনে দেখতে শুরু করল। তার ছেলেবেলা থেকে শুরু করে অশুভ জাদুবিদ্যার প্রশিক্ষণ নেওয়া, লেখক হিসেবে মিথ্যা সুনাম অর্জনের পেছনের রহস্য, ইত্যাদি সব স্মৃতি পহর যেন দেখতে পাচ্ছিল এবং অনুভব করতে পারছিল। শুধু একটা স্মৃতি নয়, একে একে লেখকের সব স্মৃতিই এবার ছিনিয়ে নিতে আরম্ভ করল পহর! লেখক কিছু করতে না পারলেও সব বুঝতে পারছিল, তার জাদু যে তার ওপরেই ব্যবহার করা হচ্ছে! কিন্তু এ কীভাবে সম্ভব? এত দূর এসে তবে কি সে হেরে যাবে, কিছুতেই না! তখন লেখক আবার পহরের কাছ থেকে ছুটে আসার চেষ্টা করতে থাকে, কিন্তু ব্যর্থ হয়। কোনোভাবে চিৎকার করে সে পহরকে বলে, ‘পহর! কী করে করছ তুমি এসব? তুমি কি তবে জাদুও জানো? এভাবে তুমি প্রতারণা করলে আমার সঙ্গে?’পহরের অট্টহাসি শোনা গেল, কিন্তু কণ্ঠটা যেন ঠিক পহরের নয়। অনেকের সম্মিলিত আওয়াজ যেন! সেই সম্মিলিত আওয়াজ তখন গর্জন করে লেখককে বলে, ‘আমরা তো এখন আর পহর নই! আমরা ফুলানদের বংশধর। যুগে যুগে যখনই তোর মতো কোনো অশুভ জাদুকরের আবির্ভাব হবে, তখনই আমরা তাকে প্রতিহত করতে হাজির হব। এই ক্ষমতা আমাদের রক্তে মিশে আছে। আর তুই তো নিজে থেকে আমাদের কাছে ধরা দিয়েছিস, আমাদের কাজটা সহজ করে দিয়েছিস! এত বড় সাহস তোর! ফুলান জাতির গৌরবময় ইতিহাস তুই ধ্বংসের পাঁয়তারা করছিলি! যত মানুষের ক্ষতি তুই করেছিস, তার মাশুল তোকে দিতেই হবে।’ তখনই পহরের শরীরের নীল আভা প্রজ্বলিত হয়ে লেখকের সব স্মৃতি নিজের কাছে বন্দী করে নিল লাল আভার আদলে! কিছুক্ষণ পর আলোর ছটাগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল। পহর তার নিজের রূপে ফিরে এল, কিন্তু যা ঘটেছে সব তার পরিষ্কারভাবে মনে রইল। পহর কাঁধ থেকে লেখকের হাতটা ঝটকা দিয়ে সরিয়ে আস্তে করে মাটিতে পা রাখল। আর লেখকের নিথর শরীরটা তখন ধুপ করে পড়ল মাটিতে। জ্ঞান হারিয়েছে সে, মেরে ফেলেনি পহরের পূর্বপুরুষেরা। কিন্তু তার সব স্মৃতি তারা কেড়ে নিয়েছে! কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে লেখকের নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে রইল পহর। চোখে–মুখে প্রবল রাগ আর ঘৃণা তার, ‘তোকে আমি সরলমনে বিশ্বাস করেছিলাম, মনে করিস না শেষ মুহূর্তে এসে তুই ভালো হয়ে গিয়েছিলি। মিথ্যার মুখোশ পরে অন্যের জীবনকে যারা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে, শাস্তি তাদের পেতে হবেই!’ পহর আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। ফিরে এল নিজের গ্রামে। ফেরার সময় চোখ দুটোতে রাগ আর অবিশ্বাস মেশানো অশ্রুধারা দেখা যাচ্ছিল! পহর গ্রামে ফিরে বয়স্কদের সব কথা খুলে বলল। তারা লেখকের দেহটা তুলে গ্রাম থেকে বেশ কিছু দূরে নিরাপদ এক জায়গায় রেখে আসে। তখনো তার জ্ঞান ফেরেনি। এক দিন পর লেখকের জ্ঞান ফেরে ঠিকই, কিন্তু সে তার নাম–পরিচয় কিছুই মনে করতে পারে না! উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটতে হাঁটতে পথে যার সঙ্গে দেখা হয়, তাকেই নিজের পরিচয় জিজ্ঞেস করতে থাকে, ‘ভাই, বলেন না আমি কে?’ মানুষ তাকে পাগল মনে করে দূরে সরে যায়। এভাবেই হাঁটতে হাঁটতে সে নিজের রাজ্য থেকে তো বটেই, পহরের গ্রাম থেকেও অনেক দূরে চলে আসে। এখন দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করে বেড়ায় সে। পরিশেষে এভাবেই লেখকরূপী জাদুকর হারিয়ে ফেলে তার জীবনের সব স্মৃতি, সব গল্প! এই গল্পটার লেখক আমি না


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২৬৪ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...