বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
খেলা গ্রামের গল্প
"মজার গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান ʀɪᴍᴜ (০ পয়েন্ট)
X
গ্রামটার নাম খেলা গ্রাম। কুমিল্লার এই গ্রামকে অনেকে ভুল করে ডাকে খোলা গ্রাম নামে। আবার ভালোবেসে কেউ কেউ খোলা খেলা গ্রামও বলে। কেন এই নাম, ঠিকঠাক ঠাহর করা দায়। তবে এলাকার মুরব্বিদের মত, সব সিরিয়াস বিষয়কে এই গ্রামের আদ্যিকালের লোকজন খেলো করে দেখত, তাই খেলা গ্রাম। অপভ্রংশে খেলা হয়ে গেছে খোলা। আর কে না জানে, খেলার জন্য দরকার খোলা মাঠ। তো মাঠের পর্বে পরে আসা যাবে। আপাতত খেলোর কেচ্ছা শোনা যাক গোল হয়ে।
এই গ্রামের কোনো মানুষ যে কিনা থানা সদরে কোনো সরকারি দপ্তরে চাকরি করত, তাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করত, ‘ভাই, ভালো আছেন তো?’
তিনি নাকি প্রশ্নটাকে খেলো জ্ঞান করে উত্তর দিতেন, ‘সরকার বেতন দেয়, খারাপ থাকব কেন?’
আরে, আগের গল্প তো আগে। এই সেদিন এই গ্রামের ছেলে পল্টুর সঙ্গে দেখা হলো ঢাকায় আমার অফিসে। পল্টুদের আদিবাড়ি খেলা গ্রামে, এখন ঢাকায় থাকে পাকাপাকি। তবু শিকড়ের খেলো ভাব যেন রয়ে গেছে তার কথার ঘ্রাণেও। তো, তার বাবার সঙ্গে একটা কাজে আমার অফিসে এল পল্টু।
জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কোথায় পড়ো?’
পল্টু বলল, ‘উদয়ন স্কুলে।’
আমি বললাম, ‘ওহ, আমার এই বাংলা একাডেমি অফিস থেকে ওই যে কাছেই তো সেই উদয়ন স্কুল, তাই না!’
ওমা, পল্টু যেন তেড়ে উঠল খেলা গ্রামের খেলো প্রতিভায়, বলল, ‘উদয়ন স্কুল ঢাকায় পাঁচটা নাকি?পল্টুর বাবা বিস্মিত হবে দূরে থাক উল্টো ছেলেকে সমর্থন করে বলল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ। কেন যে মানুষ ফাউ প্যাঁচাল পাড়ে।’
আমি ফাউ প্যাঁচাল পাড়লাম! একি, এদের সঙ্গে দেখছি কথা বলাই দায়।
তবে যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই রাত হয়। আমার প্রিয় এক ছোট ভাই তাইফুল (ওকে অনেকে ভুলভাবে ‘সাইফুল’ নামে ডাকলেও ওর নাম ‘তাইফুল’-ই। খেলা গ্রামের ছেলে বলে ওর নামকে খেলো ভাবার কোনো সুযোগ নেই) খেলা গ্রাম ভ্রমণের দাওয়াত দিল। এক ভোরের কাঁচা ঘুম ভাঙিয়ে বলতে লাগল, ‘ভাই, চলেন আমাদের গ্রামে। গরমাগরম কাচ্চি বিরিয়ানি ফ্রি।’
আমি বিরস কণ্ঠে তাকে জানালাম, ‘আমি তো খাসির মাংস খাই না। সুতরাং নো কাচ্চি।’
খেলা গ্রামের ছেলে তাইফুল তো দমে যাওয়ার পাত্র নয়। বলল, ‘কাচ্চি না খেলে পান করবেন লাচ্ছি।’
‘তার মানে, কাচ্চির বদলে মোরগ পোলাও বা গরুর তেহারি না খাইয়ে তুই শুধু লাচ্ছি খাওয়াবি?’ আমার বিস্ময়বাক্যকে পাত্তা না দিয়ে তাইফুল পরসকালেই আমাকে নিয়ে রওনা দিল খেলা গ্রাম। গ্রামের মুখেই কুয়াশার সকালে দুই জগ বরফবৎ ঠান্ডা পানি গায়ে ঢেলে আমাদের স্বাগত জানাল তাইফুলের ভাগনে আর ভাগনি মাহির ও মৌরি। আচমকা কাপড়চোপড় ভিজে যাওয়ার দুঃখে আর গায়ে প্রবল শীত অনুভূত হওয়ার করুণ পরিস্থিতির সামনে দেখি মৌরি আর মাহির হাসতে হাসতে বলতে লাগল, ‘কেমন লাগল মামা। আমাদের ওয়েলকাম ড্রিঙ্কস!’
আমি তাইফুলের দিকে অসহায়ের মতো তাকাতেই সে বলে উঠল, ‘পুরোটা ভেঙে বল। কাচ্চি না খাওয়ার শাস্তি কী?’
মামার সমর্থন পেয়ে এবার মৌরি ও মাহির বলতে লাগল, ‘শুনলাম, আপনি মানুষটা কাচ্চি-ফ্রি। এ ধরনের মানুষেরা দাওয়াতে এলে আমরা তাদের লাচ্ছি খাওয়াই। কিন্তু আপনি যেহেতু মামার মতো, তাই শুধু লবণের লাচ্ছি তো আর দেওয়া যায় না। তাই ওয়েলকাম ড্রিঙ্কস হিসেবে শীতসকালের একটু ঠান্ডি-মিষ্টি পানি দিয়ে আপনাকে আমাদের গ্রামে স্বাগত জানাচ্ছি।’
আমি তাইফুলকে বললাম, ‘এই ছিল তোর মনে? স্বাগত জানানোর যদি এমন বাহার, বিদায় জানানোর রীতিনীতি না জানি কত প্রকার?’
তাইফুল হাসছে হো হো। তারও বেশি মৌরি আর মাহির। হি হি।
গ্রামে ঢুকে দেখি এলাহি কাণ্ড। তাইফুলদের কোনো আত্মীয়ের সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুর নাম রাখা, অর্থাৎ ‘আকিকা’ উপলক্ষে খানাপিনার আয়োজন, মাংসের ঘ্রাণ, মানুষের হট্টগোল।
তাইফুল বলল, ‘চলেন ভাই। ভুয়া খাদক ধরতে হবে, অভিযানে নামব।’
আমি চমকে উঠে ভাবলাম, এটা তাইফুলদের কোনো চাল। বললাম, ‘না রে। আমার কেমন যেন ক্লান্ত লাগছে। আর দাওয়াতে এসে অভিযান কেন!’
তাইফুল আমার চেয়ে আরও বেশি চমকে উঠে যেন বলল, ‘আরে কী বলেন ভাই! দাওয়াত কবুল করেছেন মানেই তো অভিযানও কবুল করেছেন। আপনাকে এমনি এমনি এনেছি নাকি? গ্রামের বাইরের একজন থাকলে অভিযানটা পোক্ত আর নিরপেক্ষ হবে।’
কোথায় এসে পড়লাম রে বাবা। দাওয়াত খেতে এসে একবার ঠান্ডা পানির ঝলকানি, এখন আবার অভিযানের ঝকমারি।
পড়েছি খেলা গ্রামের তাইফুলের হাতে, অভিযানে নামতে হবে খালি পেটে।
তাইফুল আমার চেয়ে আরও বেশি চমকে উঠে যেন বলল, ‘আরে কী বলেন ভাই! দাওয়াত কবুল করেছেন মানেই তো অভিযানও কবুল করেছেন। আপনাকে এমনি এমনি এনেছি নাকি? গ্রামের বাইরের একজন থাকলে অভিযানটা পোক্ত আর নিরপেক্ষ হবে।’
তাইফুলসহ খাবারের প্যান্ডেলের ভেতরে ঢুকে দেখি দুই লোক বহুক্ষণ ধরে আয়েশ করে কাচ্চি সাবাড় করছে। একজন আরেকজনকে বলছে, ‘দোস্ত, পাঁচ প্লেট না খেলে কাচ্চির মজাটা ঠিক টের পাওয়া যায় না।’
শুনে তাইফুল আপনমনে বলে, ‘দাঁড়ান, দেখাচ্ছি আপনার কাচ্চির মজা।’
বলতে না বলতেই সেই ভোজনরসিক বাবুদের টেবিলের সামনে গিয়ে বলল, ‘ভাই, আপনারা বরপক্ষ না কনেপক্ষ?’
আমি ভাবছি, আরে ও কী পাগলের প্রলাপ বকছে! এটা তো আকিকার অনুষ্ঠান। এর মধ্যে বর-কনে কোত্থেকে?
আমার ভাবনায় আরেকবার ঠান্ডা পানি ঢেলে লোক দুইটা বলতে লাগল, ‘আমরা কনেপক্ষের। তবে বুঝলে বাবা, কাচ্চির আলুটার টেস্ট ঠিক ভালোভাবে আনতে পারেনি বাবুর্চিরা।’
তাইফুল এবার তেড়ে উঠে বলল, ‘রাখেন আপনার আলুর টেস্ট। এইটা আকিকার অনুষ্ঠান। আর আপনারা আসছেন কনেপক্ষের হয়ে? আচ্ছা লোক তো আপনারা। বিনা দাওয়াতে বসে পড়েছেন।’
তাইফুলের কথা লোক দুটোর ষষ্ঠ প্লেট কাচ্চি খাওয়াকে তো নিরুৎসাহিত করতে পারলই না, উল্টো তাইফুলেরই এক আত্মীয় এসে জ্ঞান ঝাড়তে লাগল, ‘আরে তাইফুল, রাখ তোর নীতিকথা। বিনা দাওয়াতি না এলে দাওয়াত জমে নাকি? আর আকিকা আর বিয়েশাদি ওই একই হলো।’
বলে কী লোকটা! আকিকা আর বিয়েশাদি একই? হতেও পারে। খেলা গ্রাম বলে কথা।
তাই ফুলের অভিযান সেখানেই সাঙ্গ হলো, খাওয়াদাওয়ার পর্বও ফুরিয়ে এল। তাইফুল চুপি চুপি বলল, ‘ভাই, লবণের লাচ্ছির সঙ্গে আপনার জন্য অন্য কোনো খাবারের ব্যবস্থা করা যায় কি না, ভেতরে গিয়ে দেখে আসি। আপনি এখানে একটু বসে থাকুন।’ বলে গ্রামের একটা টংদোকানের বেঞ্চিতে বসিয়ে গেল আমাকে। গেল তো গেল, আর আসার নাম নেই। ওদিকে ক্ষুধা পেটের চোঁ চোঁ আর সকাল সকাল জার্নি করার ক্লান্তি চোখে আনল রাজ্যের ঘুম। দিনেদুপুরের একটা স্বপ্নে হাঁটতে শুরু করেই হোঁচট খেলাম টংদোকানে বসে থাকা পিচ্চি মেয়েটার কথায়। এতটুকু শিশু এই দোকান চালাচ্ছে!
এর মধ্যেই শুনি, দূর থেকে ঝগড়া–বিবাদের উচ্চ সুর ভেসে আসছে। হয়তো গ্রামের দুই পাড়ার মধ্যে কোনো গন্ডগোল বেধেছে। আর এই পিচ্চি মেয়েটা সেই শব্দ শুনে আপনমনে হাততালি দিয়ে বলতে লাগল, ‘কী মজা মজা। আমার ভাইজানও আছেন ওইখানে।’
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই খুকি, কোথায় আছে তোমার ভাইজান?’
সে আশ্চর্য দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনি নতুন নাকি? জানেন না, ওই মাঠে মারামারি হইতেছে! আমার ভাই আমারে দোকানে বসাইয়া মারামারি খেলতে গেছে।’
কী কাণ্ড রে বাবা, মারামারি এদের কাছে একটা খেলা? সাধে কি এই গ্রামের নাম খেলা গ্রাম!
আমাকে খালি পেটের এহেন দিবাস্বপ্ন-জাতীয় দৃশ্যের কবল থেকে উদ্ধার করল তাইফুল। বলল, ‘ভাই। কাচ্চি ছাড়া দাওয়াতে অতিথিকে অন্য কিছু খাওয়ালে নাকি অতিথির অসম্মান করা হয়। তাই আপনাকে হয় লাচ্ছি খেতে হবে, নয়তো একবারে ঢাকায় গিয়ে আপনাকে খাওয়াব সবজি-খিচুড়ি। আর ভেবে দেখেন খালি পেটে লাচ্ছি খাবেন, না ক্ষুধাটা ফ্রেশ রাখবেন ঢাকার সবজি-খিচুড়ির জন্য?’
দেখো কাণ্ড! কথার মারপ্যাঁচে এরা আমাকে খাবার তো দূরের কথা, পানীয় থেকেও করতে চাইছে বঞ্চিত। কী আর করা! কর্তার ইচ্ছায় কর্ম।
দুপুর বিকেলে না গড়াতে গড়াতে আমরা রওনা দিতে শুরু করলাম। খেলা গ্রাম থেকে ঢাকার দিকে। গ্রাম থেকে বের হওয়ার মুহূর্তে মৌরি-মাহির বলে উঠল, ‘বুঝলেন তো মামা, কাচ্চি না খাওয়ার ঝক্কি!’
সেটা তো হাড়ে হাড়ে বুঝলাম, খেলা গ্রামের পরিবেশিত ক্ষুধা-মাহাত্ম্যও টের পেলাম আর শেষ ধাক্কাটা খেলাম গ্রাম থেকে বের হওয়ার মুহূর্তে, মনের দুঃখে মিষ্টি পান মুখে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটা বটগাছের নিচে বসা পাগলবাবার কথার ঝালে। আমার দিকে না তাকিয়ে যেন আমার অবস্থার দিকে ইঙ্গিত দিয়েই আওড়াতে লাগল এ রকম দার্শনিক শব্দগুচ্ছ। নাকি এটাই এই গ্রামের থিম-কবিতা?—
‘খেলা গ্রামে এলি
কেমন মজা পেলি?
আরও মজা পাবি
ভরা পেটে আসবি।’
আমার পাশে তাকিয়ে দেখি এই গ্রামের গুণধর ছেলে তাইফুল রহস্যের হাসি হাসছে।
আর আমি? ঢাকায় গিয়ে সবজি-খিচুড়ি খাওয়ার প্রত্যাশায় সকাল থেকে এই গ্রামে বয়ে বেড়ানো ক্ষুধাটাকে ফ্রেশ রেখে হুটহাট বিকেলের বাসে উঠি।
সূত্র এই গল্পটার লেখক আমি না
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now