বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
০১ আগস্ট ২০২১
আমার বন্ধু খেড়িহর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ মহসিন মিয়ার কাছ কভিডকালীন শিক্ষায় অনলাইন ক্লাসের কার্যাবলী ও অনুভূতি জানতে ছেয়েছিল। তিনি আজ মেইল করে নিম্নোক্ত লিখা পাঠালেন,
“অনলাইন ক্লাশ : দায়বদ্ধতা ও সীমাবদ্ধতা
কোভিড-১৯ মহামারী শুরু হলে ২০২০ এর মার্চ মাসের মাঝামাঝি দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বন্ধ হয়ে যায়৷ কতিপয় শিক্ষাবান্ধন ও দেশপ্রেমিক শিক্ষক শুরু করেন ফেসবুক পেজভিত্তিক অনলাইন রেকর্ডেড ও লাইভ ক্লাশ নেয়া৷ সবার সাথে তালমিলিয়ে শুরু করতে চাইলাম৷ কিন্তু যারা ইতোপূর্বে সকল ডিভাইস সংগ্রহ করে শুরু করেছে তাদের সাথে তাল মিলানোটা খুবই কঠিন ছিল৷ কারণ-
আমার ক্যামেরা স্ট্যান্ড ছিল না, বয়া ছিল না, ইয়ার ফোন ছিল না৷ নিজ বাসায় অবস্থান করেছি বিধায় কোনো ব্ল্যাকবোর্ড কিংবা হোয়াইট বোর্ড ছিল না৷ বাজার থেকে কিনার মতো কোনো পরিস্থিতিও তখন ছিল না৷ তখন লকডাউনে মানুষ.খৃবই ভয় পেতো এবং ঘর থেকে বের হতো না!
কিন্তু শুরু আমাকে করতে হবেই৷ অন্যর কাছ থেকে পিছিয়ে থাকা বা দর্শকের ভূমিকা পালন করা বেশ লজ্জাজনক বিষয়! তাই শুরু করলাম পরিকল্পণা-
একটি মুলির মধ্যে কাপড়ের সুতা দিয়ে মোবাইলটা বেঁধে বানালাম ক্যামেরা স্ট্যান্ড;
পাশের মসজিদ থেকে ধার করে আনলাম একটি হোয়াইটবোর্ড;
শুরু করলাম ক্লাশ রেকর্ড করা৷ কিন্তু ক্লাশ রেকর্ড করতে পোহাতে হতো হরেক রকমের সমস্যা৷ পাশের বাসার একজন গাভী পালত৷ সে গাভী সর্বদাই হাম্বা হাম্বা করতো৷ সুযোগের অপেক্ষায় থাকতাম কখন গাভী হাম্বা বন্ধ করবে অমিও ক্লাশ রেকর্ড করবো৷ যখনই সুযোগমত রেকর্ড করা শুরু করতাম হঠাৎ সেটি আরো জোরে হাম্বা হাম্বা শুরু করতো৷ আমার ক্লাশ মাঝ পথেই বন্ধ করতে হতো৷ তখন প্রচন্ড গরম ছিল৷ আমার বয়া না থাকার কারণে আমি জোরে জোরে বক্তব্য দিতে হতো এবং কক্ষে ফ্যান বন্ধ করে ক্লাশ রেকর্ড করতে হতো, কারণ ফ্যানের আওয়াজে রেকর্ডের সাউন্ড কিছুটা বিঘ্ন ঘটে৷
শব্দ দূষণ থেকে পরিত্রাণ পেতে একদিন ফজর নামাজের পরপরই সকাল ক্লাশ রেকর্ড করা শুরু করলাম৷ কিন্তু ঐদিন গরুর হাম্বা না থাকলেও পাশের আরেক বাশার মোরগ খুব উচ্চ স্বরে ডাকা শুরু করলো৷ সাথে এড হলো কিছু রাজহাঁস৷ অর্ধে ক্লাশ করতে না করতেই ক্লাশ রেকর্ড বন্ধ করতে হলো৷ এর পর থেকে শব্দ দূষণ থেকে রক্ষা পেতে রাত ১০টার পরে সর্বদাই ক্লাশ রেকর্ড করতাম৷
কিছুদিন পর জন্মস্থান তিতাসের নিজ গ্রামে চলে গেলাম৷ সেখানে পেলাম ক্লাশ রেকর্ডের দারুন পরিবেশ৷ সবুজ শ্যামল মনোমুগ্ধকর পরিবেশ৷ কিন্তু হোয়াইট বোর্ড না থাকায় শিশু শিক্ষা কেন্দ্র থেকে একটা ব্ল্যাকবোর্ড ধার করে আনলাম৷ সে বোর্ডটি কাঠাল গাছের নিচে বেধে সেই মুলি পদ্ধতির মুলির মধ্যেই মোবাইল বেধে ক্লাশ রেকর্ড শুরু করলাম৷ কিন্তু আমার বাড়ি গোমতি নদীর পাশে থাকায় ট্রলারের ও বালুবাহী শীপের সাউন্ড থেকে রক্ষা পাওয়া যেত না৷ একটি ট্রলারের ইঞ্জিনের আওয়াজ এত বেশি ছিল যে ডানে আধা মাইল ও বামে আধা মাইল দূর থেকেও মোবাইলে এটির সাউন্ড ধরা পরতো৷ তাছাড়াও বাড়ির চারপাশে ধান মাড়াইর মেশিনের শব্দ তো আছেই৷
একদিন একটি ক্লাশ অন্য জেলার একটা অনলাইন স্কুল পেজে দেয়ার জন্য ভালোভাবে ক্লাশটি রেকর্ড করতে পাশের মসজিদ থেকে একটা হোয়াইট বোর্ড আনলাম৷ দু'দিন ক্লাশ শেষে মসজিদের দাতাদের একজন তাদের হোয়াইট বোর্ডটি দ্বারা আমি কী করি দেখতে আসলো৷ সে মনে করলো আমি যেন কি একটা অনলাইন বিজনেস খুলে বসেছি! তাই সেদিনই সে বোর্ডটি ফেরত দিতে আমার বাবাকে বললো৷ সেদিন আরেকটি ক্লাশ রেকর্ড করতে রেখে দিয়েছি৷ কিন্তু পরের দিন সে বোর্ডটি আমার বাবাকে দিয়ে জোর পূর্বক নিয়ে গিয়েছিল৷
তারপর শুরু করলাম লেপটপে স্ক্রীনরেকর্ডের মাধ্যমে ক্লাশ রেকর্ড করা৷ আমার লেপটপটি ২০১২ সালে কিনেছিলাম৷ সেটির RAM হচ্ছে ২জিবি৷ সবকিছুই দূর্বল৷ রেকর্ডকৃত ক্লাশটি এডিট শেষে রেনডারিং করতে সময় লাগে অনেকক্ষণ৷ তাই রাতে রেনডারিং দিয়ে ঘুমিয়ে থাকতে হতো৷ মধ্যরাতে জাগতে পারলে বন্ধ করে রাখতে পারতাম, নয়ত সকালে দেখতাম রেনডারিং সম্পন্ন!
অত:পর ভাবতে থাকলাম এত কষ্ট ক্লাশ করি, কিন্তু আমার ক্লাশগুলো দেখে কে? শিক্ষার্থীরা সবাই কি অনলাইনে আছে? সবাই কি আমার ফেজবুকে কিংবা ফেজবুক পেজে সংযুক্ত আছে? ক্লাশের স্বার্থকতা কী?
তাই পরিকল্পণা নিলাম জুমে ক্লাশ নিবো৷
সে জন্য সকল শিক্ষার্থীদের অভিভাবকের মোবাইল নম্বর শ্রেণি শাখা অনুয়ায়ী সেভ করে নিলাম৷ তাদের মধ্যে যাদেরকে হোয়াটসএ্যাপে পেলাম তাদেরকে নিয়ে শ্রেণি অনুযায়ী গ্রুপ বানালাম এবং তাদেরকে এডমিন বানিয়ে সে শিক্ষার্থীদেরকেই অন্যদেরকে গ্রুপে যুক্ত করার দায়িত্ব দিলাম৷ মোটামুটি প্রায় ৮০% শিক্ষার্থীকে হোয়াটসএ্যাপ গ্রুপে পেলাম৷ আমি ক্লাশ নেই জুমে স্ক্রীন শেয়ারে অনলাইন থেকে পিডিএফ টেক্সট বুক দিয়ে, হোয়াইট বোর্ড হিসেবে ওয়ার্ড ব্যবহার করে, পাওয়ারপয়েন্টের স্লাইড ব্যবহার করে৷ বাড়ির কাজ দেই-নেই গ্রুপে৷ সবাইকে ক্লাশে যুক্ত থাকতে অভিভাবকদেরকে ফোন করেছি, বিভিন্ন অভিভাবকদের পেজে নোটিশ দিয়েছি; কিন্তু শিক্ষার্থী উপস্থিত হয় প্রায় ২০% ! টীম ওয়ার্ক, মানে সকল শিক্ষকেরা ক্লাশ নিলে এবং শিক্ষার্থীদেরকে অনুপ্রাণিত দিলে উপস্থিতি সংখ্যাটা অনেক বেশি হতো! সরকারি নির্দেশ মোতাবেক সংসদ টিভির ক্লাশের আগে বা পরে আমাদের অনলাইন ক্লাশ নিতে হবে৷ তাই সকাল ৭:০০-৯:০০ পর্যন্ত ক্লাশ নেই৷ কিন্তু শিক্ষার্থী বাছাধনেরা এত সকালে ঘুম থেকে উঠতে পারে না! আবার যারা যারাই ঘুম থেকে উঠতে পারে তাদের একটা অংশ শিক্ষক ও ভাইয়া শিক্ষকদের নিকট প্রাইভেট পড়তে যায়৷ এমনকি এক শিক্ষক প্রাইভেটের শিক্ষার্থীদেরকে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, অনলাইনে ক্লাশ করার সরকারি কোনো নির্দেশনা নাই!
পরিশেষে বলতে চাই, আমি বেতনটা হালাল করে খেতে চাই৷ যদি একজন শিক্ষার্থীও ক্লাশে যুক্ত থাকে, ক্লাশ চালিয়ে যাবো, ইনশা আল্লাহ৷
লেখক- মোহাম্মদ মহসিন মিয়া
সহকারী প্রধান শিক্ষক”
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now