বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন

বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা

আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

স্মৃতির পাতায় যশোর ক্যান্টনমেন্ট হাইস্কুল

"স্মৃতির পাতা" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান বি এম ইউসুফ আলী (guest) (১৬৬৮ পয়েন্ট)



X স্মৃতির পাতায় যশোর ক্যান্টনমেন্ট হাইস্কুল এক. আমাদের এই ছোট্ট জীবন বহতা নদীর মতো। অতীতকে ফেলে বর্তমানকে সাথে নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে ছুটে চলে। অতীত এক সময় বিবর্ণ ফিকে হয়ে স্মৃতিতে পরিণত হয়। কিন্তু সেই স্মৃতি যতই পুরনো হয় ততই মূল্যবান হয়ে ওঠে। এমনকি মাঝে মধ্যে তা মনের দরজায় কড়া নাড়ে। তখন আমরা হয়ে পড়ি স্মৃতিকাতর। ইদানীং আমার স্মৃতির পাতার যে অংশটি সবকিছুকে ছাপিয়ে বারবার মানসপটে জীবন্ত ছবির মতো ফুটে উঠছে তা হলো— আমার যশোর ক্যান্টনমেন্ট হাইস্কুল জীবনের দিনগুলো। সেই স্কুলজীবনের টুকরো টুকরো স্মৃতির অজস্র বর্ণালি মেঘ মনের আকাশে ভিড় করে। কোনোটা আশা- আনন্দের আলোয় উজ্জ্বল, কোনোটা দুঃখ বেদনামিশ্রিত অশ্রুভারে সজল কালো। দুই. ১৯৮২ সালে যশোর সেনানিবাস ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার ছাত্র-ছাত্রীদের লেখাপড়ার উদ্দেশে ক্যান্টনমেন্ট জুনিয়র স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। এরিয়া সদর দপ্তর, স্টেশন সদর দপ্তর ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের উদ্যোগে এবং সামরিক ভূমি ও সেনানিবাস অধিদপ্তরের অর্থায়নে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত খোলা হয় । পরের বছর অর্থাৎ ১৯৮৩ সালে এই স্কুলে নবম ও দশম শ্রেণি চালু করে এটিকে হাইস্কুলে উন্নীত করা হয়। ১৯৮৪ সালে আমি সেখানে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হই। আমার সেজ ভাই খোজারহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. ইউনুস আলী আমাকে ভর্তি করিয়ে দেন। তিন. ‘আজও আমি একলা রাতে, স্মৃতির স্রোতে নামি। কারণ আমার কাছে স্কুলজীবনের স্মৃতিগুলোই, বড্ড বেশি দামী।’ ক্যান্টনমেন্ট হাইস্কুলটি আমাদের পুরনো খয়েরতলা বাজার থেকে হাঁটাপথে দশ মিনিট সময়ের। একটি এমপি চেকপোস্ট তখন খয়েরতলা বাজারে ছিল। আমরা সেই চেকপোস্ট দিয়ে প্রবেশ করতাম। এরপর রেলগেট পার হয়ে বাঁ দিক দিয়ে মেঠো পথ ধরে স্কুলে যেতাম। আমাদের গ্রামের দক্ষিণপাড়ার অধিকাংশ শিক্ষার্থী এই স্কুলে পড়তো। তাদের মধ্যে মইন, ফারুক (আমার ভাগ্নে), নিজাম, ডলি, শেলি, সিতু, নার্গিসসহ আরো অনেকেই। বাকিদের নাম আজ আর মনে করতে পারছি না। উত্তরপাড়া থেকে একমাত্র হাফিজুরই (হাফি) পড়তো। সে আমাদের এক ক্লাস নিচে ছিল। চার. পুরনো বন্ধুদের ছেড়ে নতুন স্কুলে আসা। প্রথমে খারাপ লাগতো। তবে কিছুদিনের মধ্যে নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিলাম। বন্ধুও জুটে গেল। সেই সাথে পড়াশোনার প্রতি আগের থেকে মনোযোগী হলাম। নিজের অজান্তেই কেন জানি ভেতরে একটি প্রতিযোগিতার মনোভাব জেগে উঠলো। তার ফলাফল অবশ্য প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় পেয়েছিলাম। পাঁচ. ক্লাস নাইনে আমি মানবিক বিভাগ নিয়েছিলাম। বাংলা, ইংরেজি, ইসলাম ধর্ম ছিল আবশ্যিক। আর ভূগোল, ইতিহাস, পৌরনীতি ও সাধারণ বিজ্ঞান ছিল ঐচ্ছিক বিষয়। বাংলা পড়াতেন শামসুন নাহার ম্যাডাম। তিনি ছিলেন স্কুলের প্রথম প্রধান শিক্ষক এম এ হাই ভূঁইয়া স্যারের স্ত্রী। হেডস্যার ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র ক্লাস নিতেন। তিনি অত্যন্ত অমায়িক মানুষ ছিলেন। কাউকে কখনো বকা দিতে দেখিনি। তিনি একদিন আমাকে বলেছিলেন, ‘তুমি তো গণিতে ভালো, তাহলে সাইন্স নাওনি কেন?’ আমি কী বলেছিলাম মনে নেই। তিনি ১৯৮২ সালের ৯ জুন থেকে ১৯৮৬ সালের ৪ মার্চ পর্যন্ত আমাদের প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৮৬ সালের এসএসসি পরীক্ষা শুরুর দুইদিন পূর্বেই তিনি বদলি হয়ে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট স্কুলে চলে যান। অনেকের কাছেই স্যারের খবর নেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু কেউ দিতে পারেনি। ইংরেজি প্রথম পত্র ক্লাস নিতেন শক্তিপদ বিশ্বাস স্যার। ছোট ছোট সেন্টেন্সে প্যারাগ্রাফ লিখে দিতেন। তিনি ইংরেজিতে বেশ দক্ষ ছিলেন। সাধারণ গণিত ও সাধারণত বিজ্ঞান ক্লাস নিতেন সম্ভবত শৈলেন্দ্রনাথ স্যার। ইদ্রিস আলী স্যার ধর্ম, ফেরদৌসী ম্যাম ইতিহাস এবং ভূগোল ক্লাস নিতেন ব্যানার্জি স্যার। মজার ব্যাপার ছিল শিপ্রা ম্যাডাম বায়োলজির শিক্ষক হয়েও নতুন জয়েন করার পর পৌরনীতি ক্লাস নিতেন। ছয়. আরবপুরের সন্নিকটে যশোর ক্যান্টনমেন্ট কলেজের মূল ভবনেই প্রথম স্কুলটির কার্যক্রম চালু হয়েছিল। পরবর্তীতে শিফট করা হয়। আমাদের ক্লাস হতো পুরাতন বিল্ডিংয়ে। অর্থাৎ স্কুলটি এখন যেখানে, তার উত্তর দিকে। বড় মসজিদের পূর্বদিকে রাস্তার পাশে। প্রথম থেকে দশম পর্যন্ত একই ভবনে। নাইন-টেনের ক্লাস হতো ভবনের পশ্চিম দিকে তিন তলায়। এই ভবনটি এখন আছে কিনা জানি না। স্কুলের ঠিক পূর্বদিকে বড় খেলার মাঠ ছিল। এই মাঠেই আমাদের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও ফুটবল খেলা হতো। তবে অ্যাসেম্বলি হতো স্কুলবিল্ডিংয়ের সামনে ফাঁকা মাঠে। রেজাল্ট দেওয়া হতো অ্যাসেম্বলিতে; যা ছিল অস্বস্তিকর। এতো শিক্ষার্থীর মাঝে রেজাল্ট! ফলাফল খারাপ হওয়া মানেই সকলে জেনে যেত। তবে এমন অস্বস্তিতে আমাকে কখনোই পড়তে হয়নি। সাত. ক্লাস নাইনে প্রথম সাময়িকী পরীক্ষার রেজাল্ট দেওয়ার কথা এখনো আমার হৃদয়ে গেঁথে আছে। একদিন স্কুলে গিয়ে শুনি আজ রেজাল্ট দেবে। তখনও জানি না রেজাল্ট কীভাবে দেবে। অ্যাসেম্বলিতে ঘোষণা করা হলো আজ এখানেই রেজাল্ট দেওয়া হবে । এক এক করে চলছে ঘোষণা। এবার নবম শ্রেণির পালা। আমার বুক দুরুদুরু করছে। বিজ্ঞান থেকে মকবুল সাদাকাত আর মানবিক থেকে আমি ছাড়া কেউ সকল বিষয়ে পাস করতে পারেনি। সকলের সামনে ফলাফল দেওয়ার ফলে আমার লাভ হয়েছিল। সেই লাভটা ছিল ‘লাভ লেটার’ পাওয়া। যদিও ভয়ে সেটি ভৈরব নদের জলে টুকরো টুকরো করে ভাসিয়ে দিয়েছিলাম। এভাবেই জীবনের প্রথম পাওয়া প্রেমপত্রটি জলে গিয়েছিল। ‘স্কুল লাইফ, একই বেঞ্চে বসা আড্ডা আর টিফিন ভাগ সেইসব দিনের গল্পগুলো এখন না হয় স্মৃতি হয়ে থাক।’ আট. স্কুলে নির্দিষ্ট ইউনিফর্ম ছিল। ছেলেদের জন্য সাদা শার্ট ও খাকি কালারের প্যান্ট আর সাদা পিটি কেডস। আর মেয়েদের জন্য ছিল সাদা রংয়ের সালোয়ার ও ওড়না আর আকাশি কামিজ। পিটি কেডস সাদা রংয়ের। স্কুলে বিভিন্ন হাউস ছিল। হাউজ ক্যাপ্টেন ছিল। আমাদের দুইজন বন্ধু হাউজ ক্যাপ্টেন ছিল। এনায়েত আর সবুজ। ২০১৭ সালের কথা। জুন কিংবা জুলাই মাস হবে। আমি আম কেনার জন্য কাজীপাড়ার কৃষিবিদ বাজারে গেছি। ভেতরে গিয়ে ঘুরে ফিরে দেখছি। এমন সময় চোখ গেল কাউন্টারে। দেখলাম সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এক লোক। বেশ লম্বা। কথা বলছেন ক্যাশ কাউন্টারের ভদ্র মহিলার সাথে। তিনি উল্টো দিকে ঘুরতেই পরিচিত মনে হলো। আমি কাছে গিয়ে বললাম, ‘এনায়েত না?’ একথা শোনার পর তিনি আমার দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন। আমার বুঝতে বাকি রইল না সে আমাকে ঠিক চিনতে পারেনি। পরিচয় দিলাম। এবার তার ঘোর কেটে গেল। ১৯৮৬ সালের পর তার সাথে সেদিনই প্রথম দেখা হয়েছিল। এনায়েত আমার ক্লাসমেট। আমরা দুজনেই নূতন খয়েরতলা মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছেড়ে যশোর ক্যান্টনমেন্ট হাইস্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম। সে সেনাবাহিনীর চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার পর এখন কৃষিবিদ গ্রুপে কাজ করছে। সবুজ কোথায় তা জানি না। নয়. আমাদের সময় প্রতিদিন অ্যাসেম্বলিতে শপথবাক্য পাঠ করানো হতো। তারপর জাতীয় সংগীত গাইতে হতো। গেম টিচার শামসুদ্দিন স্যার তার বাঁশিতে বারবার হুইসেল দিয়ে সকলকে জড়ো করতেন। তার হাতে একটা লম্বা লাঠি থাকতো। লাইন একটু এদিক ওদিক হলে কিংবা লাইনে দাঁড়িয়ে কথাবার্তা বললেই পশ্চাদ্দেশে লাঠির ঘা পড়তো। আর এই জন্যই কখনো কখনো স্যারের বিখ্যাত সেই দুই চাকার বাইকের হাওয়া উধাও হয়ে যেত। তারপরও অ্যাসেম্বলিতে খুনসুটি থামিয়ে রাখা যেত না। সেকারণেই আমি ঠিকমতো জাতীয় সংগীত গাইতে পারতাম না। বন্ধু জনিদুর আমার মনোযোগ নষ্ট করে দিত। যেই বলতাম ‘আমি তোমায় ভালোবাসি ’, তখন সে পেছন থেকে আমাকে খোঁচা দিয়ে বলত, ‘চাচা তুমি কারে ভালোবাসো?’ আরো কত কী! সেইসব দিনের কথা আজ বড্ড বেশি মনে পড়ে। আজও স্কুলের পাশ দিয়ে গেলে গেটের ওপার থেকে কে যেন বলছে মনে হয় ... ‘কি রে! এত তাড়াতাড়ি বড় হয়ে গেলি...’ দশ. পরীক্ষায় কম নম্বর পেলে আমরা শিক্ষকদের উপর দোষ চাপাতাম। তখন মনে মনে ভাবতাম স্যার মনে হয় তার স্ত্রীর সাথে ঝগড়া করে খাতা দেখতে বসেছিলেন। আবার এটিও মনে করতাম স্যারেরা পৃষ্ঠা গুণে নম্বর দেন। একবার আমাদের বন্ধু আজাদ নাকি নজরুল সেটি স্মরণে নেই, ইসলাম ধর্ম পরীক্ষায় ৩৪ পৃষ্ঠা লিখেছিল। ইদ্রিস আলী স্যার তাকে ৩৪ নম্বর দিয়েছিলেন। যদিও আমরা তার থেকে অর্ধেক পরিমাণ লিখে বেশি মার্কস পেয়েছিলাম। পৌরনীতি পড়াতেন মিসেস শিপ্রা সাহা। তিনি সবেমাত্র স্কুলে জয়েন করেন। তিনি এক পরীক্ষায় আমাকে ৪০ এর মধ্যে ৩৮ নম্বর দিয়েছিলেন। এতো নম্বর পেয়ে আমি যেমন খুশি হয়েছিলাম তেমনিভাবে আশ্চর্য হয়েছিলাম। আমি নিজেও আজ শিক্ষক। কিন্তু আমি কখনো যদি ম্যাডামের মতো নম্বর প্রদান করি শিক্ষার্থীদের অনুভূতিটিও আমার মতো মনে হয়। এগার. ফেরদৌসী ম্যাডাম ছিলেন তখন ইয়াং টিচার। সাদা এপ্রোনে তাকে আরো অল্প বয়সী মনে হতো। তাকে মাঝে মাঝে রাগানোর চেষ্টা করতাম। পড়া পারলেও অনেক সময় বলতাম পারি না। ম্যাডাম রেগে যেতেন। তার অবধারিত ফল ছিল শাস্তি। ম্যাডামের শাস্তির হাতিয়ার ছিল পেয়ারা গাছের ডাল। তিনি ওটা দিয়েই হাতে শপাশপ মার দিতেন। ওনার সর্বশক্তি দিয়েই মারতেন। কিন্তু আমাদের মনে হতো ম্যাডামের গায়ে জোর নেই। একটা দুইটা মার দেওয়ার পর আমরা লাঠি মুঠো করে ধরতাম। ম্যাডাম আরো রেগে যেতেন। আজ আর ক্লাসে শারীরিক শাস্তির প্রচলন নেই। সরকার নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু মাডামের শাস্তির কথা আজও মনে আছে। তিনি ইতোমধ্যে তার কর্মজীবন শেষ করেছেন ঠিকই কিন্তু আমাদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন ভালো একজন শিক্ষক হিসেবে। বার. স্কুলের অফিসে কাজ করতেন আশরাফুজ্জামান। তিনি ছিলেন নিরেট ভদ্রলোক ও শান্ত মেজাজের। আমাদের সাথে তার সদ্ভাব ছিল। পরে আরো একজন জয়েন করেন। তিনি হলেন আব্দুল মান্নান। এক সময় ক্যান্টনমেন্ট খয়েরতলা বাজারে তার টাইপ ও শর্টহ্যান্ড শেখানোর একটি প্রতিষ্ঠান ছিল। ওনার ছোট ভাই সেখানে প্রশিক্ষক ছিলেন। এইচএসসি পরীক্ষার পর আমি সেখানে কিছুদিন টাইপিং প্রশিক্ষণ নিয়েছিলাম। দুজনেই আমাদের নূরপুর গ্রামের গোলদারপট্টিতে বাড়ি করেছেন । । দপ্তরি ছিলেন সরোয়ার ভাই। উচ্চতা বেশ ছিল । টিফিনের জন্য টুকটাক খাবারও বিক্রি করতেন। তিনি আমাদেরকে ছোট ভাইয়ের মতো আদর করতেন। তার স্নেহময়তার কথা আজও ভুলিনি। তের. আমাদের স্কুলের আশেপাশে কোনো বাজার বা দোকানপাট ছিল না। তবে স্কুলের পেছনে কাশবন আর ঝোপঝাড়ও ছিল। টিফিনের ফাঁকে এখানে ধূমপায়ীরা লুকিয়ে লুকিয়ে সুখটান দিত। অনেকেই আবার গ্যারিসন হলে গিয়ে নিয়মিত সিনেমা দেখতো। সেখানে তখন বাংলাদেশি সিনেমার পাশাপাশি ভারতীয় বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হতো। চৌদ্দ . আমাদের সময়ে মাইকেল মধুসূদন হাউজ, কাজী নজরুল হাউজ, জসিমউদদীন হাউজ ও ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ হাউজ নামে চারটি হাউজ ছিল। প্রত্যেকটি হাউজে একজন ক্যাপ্টেন ও একজন সহকারী ক্যাপ্টেন ছিল। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার সময় পিটি-প্যারেড হতো। আন্তঃহাউজ ফুটবল খেলা চালু ছিল। পনের. সেনাবাহিনীর একটি বাসে শিক্ষার্থীদের স্কুলে আনা-নেওয়া করা হতো। সেই স্মৃতি অনেকেরই ভুলবার নয়। সকালে বাসের জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা। ছুটির পর দৌঁড়ে বাসে ওঠা। কখনো কখনো পিছনে ছিট রেখে দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ানো। আর হই হুল্লোড় করা। নামার সময় ঠেলাঠেলি করে নামা। মাঝে মাঝে সকালে বাস মিস করা। বৃহস্পতিবার ছুটির পর বাসে না উঠে অনেক মেয়ে মিলে হেঁটে বাসায় যেত। যতদূর মনে পড়ে গাড়িতে ছেলেদেরকে নিত না, শুধু মেয়েরাই চড়তে পারতো। আহারে! তাতে কতইনা কষ্ট পেয়েছে কিছু ছেলে। কারণ প্রিয় বান্ধীর সাথে একত্রে বাসে উঠতে পারেনি। ষোলো . আমাদের স্কুলের আশেপাশে পেয়ারার বাগান ছিল। তাছাড়াও রাস্তার দুই ধারেও পেয়ারাগাছ ছিল। সেই গাছ থেকে পেয়ারা পেড়ে খাওয়ার মজাই আলাদা ছিল। যার জন্য বহুবার আরপি আঙ্কেলদের তাড়া খেতে হয়েছে। আমাদের খয়েরতলা বাজার থেকে হাঁটাপথে স্কুলে যেতে সেনাবাহিনীর খেলার মাঠ পড়তো। সময় বাঁচাতে মাঠের মধ্যে দিয়েই অনেকে হেঁটে যেত। আর সাথে সাথেই আরপির হুঁইসেল। কিন্তু থামার কোনো আগ্রহ নেই। আরপি আঙ্কল ছুঁটে আসতেন। তখন অন্যরা তাকে বাঁচাতে বলতো, ‘আঙ্কেল ওতো কানে কম শোনে। তাই আপনার বাঁশি বাজানোর শব্দ শোনেনি।’ ওনাদের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে কিছুদূর গিয়ে আমরা হেসে কুটিকুটি হয়ে যেতাম। সতেরো . আমাদের সময়ে কয়েকজন সিনিয়র ও জুনিয়র পুরো স্কুলে সমান জনপ্রিয় ছিল। হেডস্যারের মেয়ে ঝুমা আপার কথা এখনো মনে আছে। তার মধ্যে লিডারশিপের গুণ ছিল। ওনার সাথে ম্যাগাজিনের কাজ করতে গিয়ে আমাদের বন্ধু মকবুল সাদাকাত তার অন্ধভক্ত বনে গিয়েছিল। সাদাকাতকে জুনিয়র একজন মেয়ে পছন্দ করতো। কিন্তু বন্ধুটি আমার তাকে কোনো পাত্তাই দিতো না। যার মাশুল তাকে দিতে হয়েছিল। একদিন সেই মেয়েটি ওকে ল্যাং মেরে ফেলে দিয়েছিল। হায়রে বেচারা! মেয়েটির নাম ছিল শারমিন। আমাদের নীচের ক্লাসে পড়তো পিকু। স্কুলের সকলে তাকে ‘পিকু মামা’ বলে ডাকতো। হেডস্যারের শ্যালক আর সামসুন নাহার ম্যাডামের ছোটভাই ছিল এই পিকু মামা। আঠারো. বছর গড়িয়ে গেল। ১৯৮৬ সালে ক্লাস টেনে উঠলাম। সেই সময়ের বিশাল আয়তনের যশোরের রাজারহাট পিকনিক স্পট ‘ক্ষণিকা’য় আমাদের শিক্ষাসফরে নিয়ে যাওয়া হলো। গাড়ি থেকে নেমে ভিতরে গিয়ে বিশাল এক অতি প্রাচীন দিঘি দেখে আনন্দে মন নেচে উঠলো । দিঘির দক্ষিণ পাড়ে ছাউনি ছিল। সেখানে বসে আড্ডা, হাসি-তামাশা করে সেদিনটি আমরা অতিবাহিত করি। কেউবা দিঘিতে সাঁতারও কেটেছিল । আর বুক ভরে নির্মল বায়ু সেবনের কথা আজও মনে পড়ে। সে এক মনোরম পরিবেশ। এই স্পষ্টের একদিকে যশোর-খুলনা মহাসড়ক, আরেক দিকে রেললাইন। ৫৬ বিঘা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত রাজারহাটের এই পিকনিক স্পটটি ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ঐতিহ্যবাহী এই পিকনিক স্পটে বর্তমানে আগের সেই পরিবেশ নেই। এখন সেখানে জঙ্গলে ঢেকে গেছে। আগের মতো কেউ এখানে পিকনিক কিংবা চিত্তবিনোদনের জন্য আসে না । আমরা আজ স্মৃতি রোমন্থন করছি কিন্তু জুনিয়রা প্রতি বছরই পিকনিকে গিয়ে আনন্দে মেতে ওঠে। উনিশ . ফেব্রুয়ারির শেষ কিংবা মার্চের প্রথম দিকের ঘটনা। একদিন মাঠে খেলতে খেলতে প্রথম ঘণ্টার ক্লাসের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। ক্লাস টিচার সাইফুর রহমান স্যার আমাদেরকে ডেকে পাঠালেন। এই দলে ছিল ভেকুটিয়ার শরীফ, মতিউরসহ আরো অনেকে। ওরা খুব ভালো ফুটবল খেলতো। তড়িঘড়ি করে ক্লাসে গেলাম। বুঝতে পারলাম আবহাওয়াটা সুবিধাজনক নয়। স্যার আমাদেরকে পড়া ধরা শুরু করলেন। পড়া ধরার পর আমরা তো একেবারেই থ মেরে গেলাম। স্যার এসব কী জিজ্ঞেস করছেন? কবে পড়িয়েছেন তাও মনে নেই। জ্যামিতির বিভিন্ন সংজ্ঞা। এই ছাইপাস তো অনেকদিন আগেই ভুলে গেছি। আসলে আমাদেরকে মারার জন্য তিনি এই ফন্দি এঁটেছিলেন। আর আমাদের ভাগ্যে সেদিন জুটেছিল বেতের শপাং শপাং ঘা। বেতের আঘাতে আমরা অনেকেই উহঃ আহঃ করতে লাগলাম। সেই মার খাওয়ার স্মৃতি আজও ভুলিনি। ভোলাও যাবে না। লেখাপড়ার জন্য সেটিই ছিল সর্বশেষ মার খাওয়া। ৫/৬ বছর আগে একদিন স্যারের সাথে মোবাইলে কথা হয়েছিল। তিনি আমাকে আদর করে ডাকতেন ‘গাজী ইউসুফ’। তিনি বাদামতলা বাজারে স্টাফ কোয়ার্টারে থাকতেন। আমি স্যারের কাছে কয়েকমাস গণিত বিষয়ে প্রাইভেট পড়েছিলাম। বিশ. ‘স্কুলজীবনেও একসাথে ছিলাম কলেজে উঠে ছাড়াছাড়ি। স্কুল লাইফের সুখের জীবন, শেষ হয় বুঝি তাড়াতাড়ি।’ আমাদের সাথে ভেকুটিয়ার ছয় বন্ধু ছিল। শরিফ, মতিউর, সগির, জনিদুর , সাঈদ আর রফিকুল। শরিফের সাথে অনেকের যোগাযোগ আছে। ও যশোর শহরে চশমার ব্যবসা করে। শুনেছি সাইফুর রহমান স্যার মাঝে মধ্যে ওর দোকানে আসেন। মতিউর ক্যান্টনমেন্ট কলেজে পড়তো। আমাদের ব্যাচের গেট টুগেদার হলে ওর সাথে দেখা হয়। এখন ভেকুটিয়া হাইস্কুলের শিক্ষক। জনিদুর কোর্টে চাকরি করে। আরবপুর মোড়ের লম্বা রফিক আর জুয়েল, পুরাতন কসবার ডায়মন্ড, নজরুল ও ভুট্টো। এদেরকে এখনো মনে আছে। নজরুল রাশিয়ায় থাকে। এদের মধ্যে ভুট্টো কিছুটা ড্যামকেয়ার স্বভাবের ছিল। বন্ধু নাজমুল কাজী ও লিটন কাজীপাড়ার বাসিন্দা। কলাবাগানের মুরাদ ছিল চটপটে। সেনাবাহিনীর চাকরি থেকে অবসর নিয়ে যশোর শহরের খড়কিতে থিতু হয়েছে। আমাদের ফুটবল দলের গোলকিপার ছিল আজাদ। ওর গ্রামের বাড়ি কুড়িগ্রাম। বিমানবাহিনীর চাকরি করতো। কিছুদিন হলো অবসরে গেছে। নওয়াপাড়ার মাসুমও এয়ারফোর্সে ছিল। সেও এখন অবসরে । মাসুম বিল্লাহ সংবাদমাধ্যমে কাজ করে। ঢাকায় থাকে। ওর ছোট ভাই মুকিম বিল্লাহ বর্তমানে আমাদের স্কুলেরই একজন শিক্ষক। কুমিল্লার হাসিনা আক্তার। পেশায় একজন শিক্ষক। কর্মস্থল চট্টগ্রাম। ‘চাঁদনী রাত’ নাম নিয়ে ফেসবুকে আছে নোয়াখালীর কাজল। যদিও স্বামী সংসার সব কিছু চট্টগ্রামে। রুমা ও রেখার বাড়ি যশোর এয়ারপোর্টের পাশে কলোনিতে । বর্তমানে রুমা থাকে ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে কেরানীগঞ্জে। আর রেখার বিয়ে হয়েছে আমাদের গ্রামের ইসমাইল ভাইয়ের সাথে। যদিও আমার সাথে তার কখনো দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি । শিলা, নার্গিস, রুনু, খাদিজা, কোহিনূর (ওকে নানি বলে ডাকতো ), জাফরিন, কামরুজ্জামান, ছোট নজরুল (কুমিল্লা), জান্নাতুল বাকি সিপার, হুমায়ুন কবির, মোসলেহ উদ্দিনের সাথে কারোরই কোনো যোগাযোগ নেই। এদের মধ্যে হাসিনা, জাফরিন, বেল্লাল, মোসলেহ উদ্দিন আমার সাথে যশোর ক্যান্টনমেন্ট কলেজে পড়তো। ১৯৯৪ বা ৯৫ সালে মোসলেহ উদ্দিনের সাথে মতিঝিলে দেখা হয়েছিল। সাবেক ধর্ম প্রতিমন্ত্রী আলহাজ নাজিমউদ্দীন আল আজাদের ছেলে নয়ন ভাইয়ের সাথে ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে চাকরি করতো। সম্ভবত উত্তরা ইন্সুরেন্স বা জনতা ইন্সুরেন্সে। হাসিনার সাথে একবার কুমিল্লায় দেখা হয়েছিল ছোট নজরুলের । জান্নাতুল বাকি শিপার মানবিকে গ্রুপে পড়তো। বেশ মেধাবী ও পড়াশোনায় বেশ সিরিয়াস ছিল। পড়াশুনায় সে আমার সাথে প্রতিযোগিতা করতো। এনায়েত সাভারে থাকে। মকবুল সাদাকাত ও মামুন স্বপ্নের দেশ আমেরিকায়। সিলেটের রহিমা খাতুনের সাথে শরিফের দীর্ঘদিন যোগাযোগ থাকলেও একযুগের উপরে তা বিছিন্ন হয়ে গেছে। গোলাম ফারুক বাদল কুষ্টিয়ার মিষ্টি ভাষায় কথা বলতো। কুষ্টিয়া শহরের মজমপুরের ছেলে। হিউবার্ট সরকার ভালো তবলা বাজাতে পারতো। তার হাতের কারুকার্য এখনো চোখে ভাসলেও সে সবার চোখের আড়ালেই রয়ে গেছে। সম্ভবত ফেরদৌসী নামেও আমাদের এক বান্ধবী ছিল। সে শানতলা সিগনাল সেন্টার থেকে স্কুলে যেত। দারুণ মিশুক ছিল বেল্লাল। প্রবাস থেকে ফিরে কুমিল্লায় ব্যবসা করতো। বেশ কয়েক বছর আগে আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেছে না ফেরার দেশে। স্কুলজীবনের সেই বন্ধুত্বের বন্ধন যেন একটু ঢিলা হয়ে গেছে। তারপরও কোথাও দেখা হলে অস্পষ্ট চেনামুখ হঠাৎ বলে ওঠে- ‘বন্ধু, কী খবর বল? কত দিন দেখা হয় নি… ” একুশ. দশম শ্রেণির প্রথম সাময়িক পরীক্ষা শেষ হলো। ওদিকে অভিভাবকদের তাড়া। এই স্কুলে আমাকে আর রাখা হবে না। মানে ট্রান্সফার করে অন্য স্কুলে নেওয়া হবে। একথা শোনার পর মনটা বিষাদে ভরে গেল। মনে হলো আমি সবে বাসা বাঁধা নীড়হারা পাখিতে পরিণত হচ্ছি। হলামও তাই। ক্যান্টনমেন্ট হাইস্কুলের দেড় বছরের জীবনের অনেক স্মৃতি যত্ন করে তুলে রেখেছি আমার স্মৃতিতে। যখনই মনে হয় তখন নস্টালজিক হয়ে যাই। যতোই দিন যাচ্ছে এই প্রতিষ্ঠানের ফেলে আসা দিনের স্মৃতিরা নিঃশব্দে এসে আমার মনকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। আর সেই ফেলে আসা দিনগুলোর স্মৃতির ছায়া দীর্ঘতর হচ্ছে আমার মনের মণিকোঠায়। স্কুলজীবনের সবকিছুই আবার ফিরে পেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু তা তো হওয়ার নয়। সময়ের স্রোত অতীত ফিরিয়ে দেয় না। তাই স্মৃতি হাতড়ে বেঁচে থাকতে হবে জীবনভর। লেখক: কলাম লেখক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক bmyusuf01@gmail.com


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৬০ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...