বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন

বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা

আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

বৃদ্ধাশ্রমের চিঠি

"স্মৃতির পাতা" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান ᴍᴅ. ɪǫʙᴀʟ ᴍᴀʜᴍᴜᴅ (২৫১ পয়েন্ট)



X সকালবেলা ডাকপিয়ন এসে দরজায় টোকা দিতে শুরু করেছে। সুলতান সাহেব তখনও ঘুম থেকে ওঠেনি । তার স্ত্রী কুলসুম বেগম দরজা খুলে চিঠিটি নিয়ে দেখলো খামের ওপরে প্রেরকের নাম ঠিকানা নেই । তাই তিনি রাগ করে সেই চিঠিটি সুলতান সাহেবের মুখের ওপর জোরে ছুড়ে মারলেন । সুলতান সাহেবও প্রেরকের নাম না দেখে খুব বিরক্ত হয়ে বালিশের নিচে রেখে দিলেন । এভাবে কয়েকদিন গেল। তারপর একদিন দুপুরবেলা কী একটা খুঁজতে গিয়ে বালিশ উল্টালেন । চিঠিটা দেখে তার মনে পড়ে গেল কয়েকদিন আগের কথা । চিঠিটা বেশ কিছুদিন আগে এসেছে অথচ খুলে পড়া হয়নি । চিঠিটা খুলে পড়তে শুরু করলেন। চিঠিতে লেখা ছিল প্রিয় থোকা, আশা করি ভালো আছিস, সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে আছিস । ভালো থাকারই কথা । যেখানে বৃদ্ধা মায়ের উৎপাত নেই । মায়ের সেবা করার জন্য সময় ব্যয় কতে হয় না। সেখানে তো অনেক ভালো ও সুখে থাকার কথা । আমার দাদুভাই ভালো আছে তো? ওকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। আমার কথা ভাবিস না, আমি বেশ সুখে আছি। এখানে যারা আমার দেখাশোনা করে তারা আমাকে খুব ভালোবাসে আর ঠিকমত যত্ন নেয়। সময়মত খেতে দেয়, ওষুধ দেয় আর গোসলও করিয়ে দেয় । ওরা আমাদের প্রতিদিন ভালো তরকারি দিয়ে খেতে দেয় । মাঝে মাঝে নিজ হাতে খাইয়ে দেয় । গত মাসের ২৪ তারিখে আমি খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। একটি ছেলে সারারাত জেগে আমার সেবা করেছিল। ও আমাকে আম্মা বলে ডাকে । আমিও ওকে এখন সন্তানের মতই দেখি । মাঝে মাঝে ওরা কয়েকজন আমার হাতে ভাতও খাইয়ে নেয় । মনে আছে তোর, ছোটবেলায় ভাত খেতে বললে তুই পালিয়ে যাস আর আমি হন্যে দিতাম । তুই মাছ খেতে খুব ভয় পাস তাই তোকে খাওয়ানোর সময় আমি কয়েকবার মাছের কাটা খুঁজে বের করতাম, যাতে একটি কাটাও তোর গলায় না লাগে। তোর মনে আছে খোকা? আমি মানুষের বাড়িতে কাজ করতাম । সেই টাকা দিয়ে ঠিকমত সংসার চলত না। তবুও আমি নিজে ঠিকমত না খেয়ে টাকা জন্য বই, খাতা, কলম কিনে দিতাম । নিজে ছেঁড়া কাপড় পরতাম কিন্তু তোকে কোনোদিন ছেঁড়া কাপড় পরতে দেইনি। নিজের জন্য কখনো ভালো কাপড় কিনতাম না কিন্তু তোর বন্ধুদের কাছে যেন কাপড় বা জুতা নিয়ে কথা শুনতে না হয় সে জন্য তোকে সবসময় দামি কাপড় জুতা কিনে দিতাম । আজ তুই লেখাপড়া শিখে অনেক ভালো চাকরি করছিস । প্রতি মাসে হাজার হাজার টাকা বেতন পাচ্ছিস। সেই টাকা দিয়ে নিজের জন্য কিনে আনিস। কিন্তু কখনো আমার জন্য একখানা দামি কাপড় কিনে আনিসনি । তবুও আমি খুশি থাকতাম তুই সুখে আছিস দেখে । বউকে নিয়ে তুই সুন্দর সাজানো গোছানো আর চারদিকে রঙিন বাতির আলোয় ভরা ঘরে থাকিস | সেই ঘরে সারাদিন সুগন্ধি ভেসে বেড়ায় আর আমাকে একটি অগোছালো ঘরে থাকতে দিয়েছিলি। সে ঘরের একপাশে ছিল বাড়ির পুরাতন আর ভাঙা আসবাবপত্র । তাতে ছিল ইদুরের বসবাস আর বিদঘুটে গন্ধ । তবু কোনোদিন কিছু মনে করিনি । কারণ তুই তো সুখে ছিলি । তোর সুখেই আমি নিজের সুখ খুঁজে নিয়েছিলাম । তোর ছেলের জন্মের পর তার কাপড় চোপড় ধোয়া, সারাক্ষণ কোলে করে নিয়ে বেড়ানো সবকিছুই করেছি । ঘোড়া সেজে ওকে পিঠে করে ঘুরিয়েছি। তখন আমার শরীরে অনেক শক্তি ছিল । ধীরে ধীরে আমার শরীরের শক্তি কমে আসতে লাগল, তাই বাড়ির কোনো কাজ করতে পারতাম না বরং ছিল। সে জন্য তোর বউ আর আমাকে দেখতে পারতো না। প্রতিদিন আমার নামে তোর কাছে নালিশ দিতো । তাই তুই আমাকে এখানে রেখে গিয়েছিস। তবুও আমার দুঃখ নেই, তুই সুখে থাকলেই আমার সুখ । আজ তোকে কিছু কথা বলব, যা কোনোদিনই বলা হয়নি । তখন তোর বয়স ৩ কি 8 বছর । একদিন হঠাৎ করে তোর গায়ে জ্বর শুরু হলো। আমি জলপ্রি দিতে থাকলাম তবুও জর কমছে না। তোর বাবা বেঁচে নেই, একাকী আমি কী করবো ভেবে কুল পাইনি। সেদিন প্রায় অর্ধেক রাতের সময় তুই জ্বরের চোটে কি সব বলতে শুরু করেছিলি আর জ্বর বেড়েই চলছিল। সে সময় কোনো কুল না পেয়ে আমি তোকে কোলে নিয়ে রাতের অন্ধকারে ৫ মাইল দুরে গফরগাওয়ের মোহন কবিরাজের বাড়িতে ছুটতে থাকি । সেদিন পুরো অন্ধকার ছিল না, অল্প অল্প জোৎস্না ছিল । আমি তোকে কোলে নিয়ে প্রাণপণ ছুটতে লাগলাম । পথে বেশ কয়েকবার গাছের শেকড়ের সাথে হোঁচট খেয়ে আমার পায়ের আঙ্গুল ফেটে রক্ত ঝরেছিল । তবু তোর জন্য আমি সেই কষ্টকে উপেক্ষা করে ছুটে চলেছি মোহন কবিরাজের বাড়ির দিকে | এ কথা তোকে কখনো বলতে চাইনি । কিন্তু আজ মনে বড় দুঃখ নিয়ে বলেই ফেললাম । যে তোকে না দেখে আমি একটা দিনও থাকতে পারতাম না, কোথায় আছিস কেমন আছিস ভেবে অস্থির হয়ে যেতাম । সেই তুই আমাকে আজ থেকে চার বছর আগে এখানে রেখে গিয়েছিলি কিন্তু তারপর থেকে একটিবারও দেখতে আছিসনি । বিছানায় যখন ঘুমাতে যাই তোর কথা মনে পড়ে । দিনের বেলা যখন খেতে বসি তখন তোর কথা মনে পড়ে, ঠিকমত খেয়েছিস কি না, এখনো মাছ খেতে তোর সমস্যা হয় কি না। এ্রসব কথা মনে পড়ে আর আমার দু'চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে । কিন্তু আমার কথা একটিবারও তোর মনে পড়ে না। একটিবারের জন্য তুই আমাকে দেখতে আসিসনি । তাই মনে খুব কষ্ট লাগে। অনেক কথা বললাম, হয়তো বিরক্ত হচ্ছিস । তাই আর বেশি কিছু বলবো না। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন তোমাকে সবসময় সুখে রাখে । আর আমার দাদুভাইকে যেন তোর থেকেও অনেক শিক্ষিত আর জ্ঞানী বানিয়ে দেয়। আমি আরো দোয়া করি যেন আমার মত তোদের হতে না হয়। পরিশেষে তোর সুখ কামনা করে শেষ করছি । ভালো থাকিস। ইতি তোর গর্ভধারিণী মা। চিঠিটা পড়ার পর সুলতান সাহেবের দুচোখের কোণে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে শুরু করল । কুলসুম বেগমও কিছু বুঝতে না পেরে রান্নঘরে চলে গেলেন । সুলতান সাহেব তার ড্রাইভারকে ডেকে গাড়ি বের করতে বললেন । একমাত্র ছেলে রুদ্রকে নিয়ে সুলতান সাহেব গাড়িতে উঠে নির্দেশ দিলেন। রুদ্বের বয়স তখন ১৪ বছর। সে বুঝতে পারলো না যে বাবা তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। তাই সে জিজ্ঞেস করলবাবা, আমরা কোথায় যাচ্ছিঃ আর আগে থেকে কিছু না বলে হঠাৎ করেই বা কেন? সুলতান সাহেব কিছুই বললেন না। উত্তর না পেয়ে রুদ্র চুপটি করে বসে থাকল । ঘণ্টা দুয়েক পর তারা বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে পৌছালো । তখন বৃদ্ধাশ্রমের সামনে কিছু লোক বসে আছে। সবার গায়ে সাদা পাঞ্জাবি আর মাথায় টুপি । সুলতান সাহেব গিয়ে তাদের তার মায়ের কথা বললেন এবং মায়ের সাথে দেখা করতে চাইলেন । মায়ের সাথে দেখা করতে চাইলে কেউ আর কোনো কথা বললেন না । তখন সুলতান সাহেব বিরক্ত হয়ে বললেনকী ব্যাপার, সবাই চুপ করে আছেন কেন? কেউ তো বলুন আমার মা কোন ঘরে | কেউ ডেকে দিন । তখন তার সামনে থাকা ব্যক্তি সেখান থেকে কিছু দূরে একটি কবরের দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন । বললেন এ ঘরটাতে আপনার মা শুয়ে আছেন। আমরা একটু আগে তাকে সেখানে রেখে এসেছি । সুলতান সাহেব ছুটে গেলেন কবরের কাছে। পেছনে পেছনে রুদ্রও গেল । কবরের পাশে গিয়ে সুলতান সাহেব নির্বাক হয়ে বসে পড়লেন। আর তার দুই চোখ দিয়ে শুধু কান্নার অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে লাগলো। লেখক:  এ.আই রানা চৌধুরী।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ১০১ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...