বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
ফুলটা হাত বাড়িয়ে নিল ইশিতা। নাকে ঘ্রাণ শুঁকল কিছুক্ষন। প্রানভরে অনুভব করলো ফুলে লেগে থাকা স্বামীর ছোঁয়া।
-- আমার মহারানীর অভিমান ভাঙলো তাহলে! বলল আবদুল্লাহ।
--হুম! আমি যখনই অভিমান করবো তুমি এভাবেই আমার অভিমান ভাঙাবা!
--জো হুকুম মহারানী! যথা আজ্ঞা
কিন্তু যদি আমি অভিমান করি, তাহলে তুমি কিভাবে অভিমান ভাঙাবা জানু? আবদুল্লাহর জিজ্ঞাসু দৃষ্টি।
--তোমার মাথায় এক বালতি পানি ঢেলে দিবো, অভিমানেরা সব ধুয়ে মুছে যাবে"
বলে ইশিতা মুচকি হাসতে লাগলো।
আবদুল্লাহও হাসতে হাসতে বললোঃ আমিও বালতির তলা আগেই ফুটো করে রাখবো !! দেখবো কেমন করে পানি ঢালো!
-হয়েছে ,আর ঢং করতে হবেনা।
বলে ইশিতা স্বামীর বুকে আলতো করে তার মাথাটা রাখলো।
তার মনে হলো এই মুহুর্তে তারচেয়ে সুখী আর কে আছে!!
আসরের আযান শুনা গেলো।
ইশিতা স্বামীর পান্জাবীটা ঠিক করে দিয়ে বললোঃ মসজিদে যাও, নামাজ পড়ে আসো।
--হুম! যাচ্ছি গো মহারানী! তবে যাবার আগে একটা সুন্নত আদায় করে যাই।
-কি সেটা ? জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল ইশিতা।
-এই যে এটা, বলে ইশিতাকে অবাক করে দিয়ে ইশিতার কপালে আলতো করে একটা কিস দিয়ে মুচকি হেসে মসজিদের দিকে চলে গেলো আবদুল্লাহ!
ইশিতার দু চোখে আনন্দাশ্রু।
ভাবে, স্বামীর এমন অকৃত্রিম প্রেম ভালোবাসা কজন স্ত্রীর কপালেই বা জোটে!
মাগরিবের পর সবার থেকে আল বিদা গ্রহন করে ইশিতা প্রাইভেটকারে উঠে বসলো।ইশিতার বান্ধবীরা এসেছে অনেকে। তারাও অশ্রুজলে বিদায় সম্ভাষণ জানালো। গাড়ির
পেছনের দুটো সিট আগেই নির্ধারণ করে রাখা হয়েছিলো।আবদুল্লাহ ও ইশিতা সেখানেই বসলো।
বাকীরা সামনে বসলো।
গাড়ী চলতে শুরু করলো।ইশিতা গাড়ির স্বচ্ছ কাঁচের ভিতর দিয়ে দেখলো তখনও তার মা বাবা অশ্রু স্বজল চোখে তাকিয়ে আছে গাড়ির দিকে।ইশিতার বাবা কিছুক্ষণ পরপর চশমাটা খুলে টিস্যু দিয়ে অশ্রু মুছছিলেন।
দৃশ্যটা দেখে ইশিতার ভেতরটা মোচর দিয়ে উঠলো।বাবা মাকে ছেড়ে যেতে তার কলজেটা ছিড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে যেন। দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে তার বুকটা!
অব্যক্ত কান্না করছে ইশিতা।
চোখের পানিতে বোরখার নিকাব ভিজে গাল বেয়ে অশ্রু ঝড়তে লাগলো।
আবদুল্লাহ ইশিতাকে কি বলে শান্তনা দিবে! এটাই যে নির্মম বাস্তবতা! প্রতিটি মেয়েকেই এভাবে সব কিছু ছেড়ে একসময় স্বামীর বাড়ি চলে যেতে হয়।
আবদুল্লাহ আলতো করে তার ডানহাত ইশিতার পিঠে রাখলো।
কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে
বললো"প্লিজ! এবার একটু শান্ত হও সোনা! আমি তো আছি তোমার পাশে!
আপাতত দু তিন দিনের জন্যই তো যাচ্ছো।আমি তোমাকে আবার দিয়ে যাবো। প্লিজ আর কান্না করোনা!
ইশিতা কিছু বললোনা। চুপচাপ স্বামীর কাঁধে মাথাটা রাখলো।
গাড়ি ছুটে চলছে দুরন্ত গতিতে।রোডের দুপাশে সোডিয়াম বাতিগুলো জ্বলে উঠেছে।কখন যে ইশিতা আবদুল্লাহর কাঁধে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে টেরই পায়নি।আবদুল্লাহ ইশিতাকে ডানহাতে ধরে রাখলো পরম যত্নে।
রাত্রি দশটা।
গাড়ি এসে আবদুল্লাহদের বাসার গেটের কাছে এসে থামলো।
আবদুল্লাহর মা আগেই বাসায় সবকিছুর বন্দোবস্ত করে রেখেছেন।গাড়ির হর্ন শুনে ইশিতার ঘুম ভাঙলো। দেখলো,স্বামীর বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে ছিলো এতোক্ষন। একটু লজ্জা পেলো। সামনে বসা কেউ দেখে ফেললো কিনা!
সবার শেষে আবদুল্লাহর হাত ধরে গাড়ি থেকে নামলো ইশিতা।
গাড়ি থেকে নামতে গিয়ে হঠাৎ হোচট খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল ইশিতা। আবদুল্লাহ দুহাতে ধরে ফেললো তাই রক্ষা।
কিন্তু ডান পায়ের জুতোটা ছিটকে গিয়ে পড়লো একটু দূরে। ইশিতাকে দাড় করিয়ে জুতোটা তুলে আনলো আবদুল্লাহ! যত্নসহকারে ইশিতার পায়ে পড়িয়ে দিলো জুতোটা।
ইশিতা ভীষণ লজ্জা পেলো। সবাই তাকিয়ে দেখছে জুতো পড়িয়ে দেওয়ার দৃশ্য।
--এ্যই কি করছেন এটা? আমি নিজেই পড়তে পারবো, দিন আমার কাছে দিন।সবাই দেখতেছে।
এই প্রথম স্বামীকে আপনি সম্বোধন করলো ইশিতা।
--কেন আমি পড়িয়ে দিলে কি সমস্যা! আমার জাত যাবে? আমার বউয়ের জুতোই তো পড়িয়ে দিচ্ছি, এতে কে কি ভাবলো সেটা আমার দেখার বিষয়না!
--সবাই ভাববে আপনে বউ পাগল!
--ভাবুক! এটা তো খারাপের কিছুনা!
তা তুমি আমাকে আপনি আপনে করে সম্বোধন করছো কেনো?
-সবার সামনে তুমি করে বলতে লজ্জা লাগে, সম্মানের জন্য আপনি করে বললাম।
-ঠিকাছে! তোমার যদি ভাল্লাগে নো প্রবলেম!
ইতোমধ্যে আবদুল্লাহর বোন তাহেরা এসে ইশিতার হাত ধরে ঘরে নিয়ে গেলো।
আবদুল্লাহরা এক ভাই বোন।
ছোট বোন তাহিরা স্থানীয় মহিলা মাদরাসায় পড়ে।
ভাইয়ের বিয়ে উপলক্ষে ছুটি নিয়ে বাসায় এসেছে কয়েকদিন আগে।
তাহিরা ভাবির হাত ধরে ভাইয়ার রুমে নিতে নিতে বললোঃ কিরে ভাইয়া! ভাবিকে পেয়ে দেখি আমাদের একেবারে ভুলে গেলি দেখছি!
-না রে পাগলি বোন আমার! ইদানিং একটু ব্যস্ততায় কাটছে সময়!
--হয়েছে হয়েছে! আর বাহানা করতে হবেনা।এ কয়দিন ভাবির আচল তলে লুকাই ছিলা আমি জানি!
বলে ভাবির দিকে তাকিয়ে
-কি ভাবি! ঠিক কইছিনা? বলে মিটমিটি হাসতে লাগলো তাহিরা।
ইশিতাও যোগ দিলো হাসিতে।
--এ্যই হতচ্ছাড়ি ! যাবি এখান থেকে! না দিবো এক কিল!
তাহিরা ভাবিকে রুমে পৌছে দিয়ে ভেংচি কেটে যেতে যেতে বললোঃ ভাবি! ভাইয়াকে আচল দিয়া শক্ত কইরা বাইন্ধা রাখবেন, যেন পালাইতে না পারে!
তাহিরার দুষ্টামি মাখা কথায় ইশিতা ও আবদুল্লাহ দুজনেই মুচকি হাসতে লাগলো।
ইশিতা এতোক্ষনে খেয়াল করে দেখলো। সুন্দর ছিমছাম গোছানো একটা রুম।একপাশে বুকশেলফ। শেলফে বিভিন্ন ইসলামী বইপত্র থরেথরে সাজানো।দেয়ালে শোভা পাচ্ছে মক্কা মদীনার ছবি সহ
নয়নাভিরাম দৃশ্যের পেইন্টিংস।খাটের পাশে একটা টেবিল ও কয়েকটি চেয়ার রাখা।মনে মনে স্বামীর রুচিবোধের প্রশংসা না করে পারেনা।
--এটা তোমার রুম?
--হুম! পছন্দ হয়েছে তোমার?
-অনেক পছন্দ হয়েছে। আচ্ছা! তোমার শেলফে রাখা বইগুলো আমারে পড়তে দিবা?
--অফকোর্স! কেন নয়!! এগুলো এখন থেকে আমাদের দুজনেরই তো! অনুমতির কি আছে?
বলে ইশিতার নাকটা হালকা টেনে দিলো আবদুল্লাহ!
হঠাৎ কারো আওয়াজে দরজার দিকে তাকায় উভয়ে।
"আসসালামু আলাইকুম "এই নে
খাবার এনেছি, বউমাকে নিয়ে খেয়ে নে।" বললেন আবদুল্লাহর মা কারিমা বেগম।
-ওয়ালাইকুমুস সালাম" তা তুমি কষ্ট করে আনতে গেলে কেনো মা ? তাহিরাকে বললেই পারতে?
বলতে বলতে আগ বাড়িয়ে মায়ের হাত থেকে খাবারের প্লেট নিলো আবদুল্লাহ। জগ গ্লাস আগেই রাখা ছিলো টেবিলে।
--পাগল ছেলে বলে কি! সন্তানের জন্য মায়ের কোন কাজে কষ্ট আছে নাকি রে! নে, খেয়ে তারাতারি শুয়ে পড় । বউমা অনেক ক্লান্ত। এতোটা পথ জার্নি করে এসেছে।"
বলে কিছুক্ষণ ইশিতার খোঁজখবর নিয়ে চলে গেলেন কারিমা বেগম।
--তোমার মা দেখি ঠিক আমার মায়ের মতই। খুব ভাল্লাগছে আমার।
--সত্যিই! দেখবে আর কিছুদিন থাকলে আমার মাকে ছেড়ে তুমি যেতেই চাইবেনা।
--আলহামদুলিল্লাহ্ "আমি আরেকটা মা পেয়েছি ঠিক আমার মায়ের মতো। "বলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলো ইশিতা।
--এ্যই! খাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
চলো খাবার খেয়ে নেই।
--এ্যই হুজুর! এখনও এশার নামাজ পড়া হয়নাই! আগেই এতো খাই খাই কেনো?
বলে ইশিতা মিটিমিটি হাসতে লাগলো।আবদুল্লাহ ইশিতার থুতনি একটু উচু করে ধরে চোখে চোখ রেখে বললোঃ
তুমি কি জানো সোনা! খাবার যদি সামনে হাজির হয়ে যায়, আর পেট যদি ক্ষুধার্ত থাকে তখন সুন্নত হলো আগে খাবার খেয়ে নেয়া।তারপর নামাজ পড়া।
-তাই! জানিনা তো! আমি তো তোমার কাছ থেকেই শিখছি ধীরে ধীরে সবকিছু। আচ্ছা তুমি এতো কিছু শিখলে কিভাবে?
--স্কুলে পড়ার আগে প্রাইমারি লেভেল পর্যন্ত আমি মাদরাসায় পড়েছি। কলেজে উঠে তাবলিগে তিন চিল্লা দিয়ে দ্বীনের মোটামুটি কিছু ইলম শিখেছি, এখনও শিখতেছি। আলহামদুলিল্লাহ!
--তাহলে তুমি যা শিখতেছো, তা আমাকেও শিখিয়ে দিও।
-ওকে আমার সোনা বউ! এবার চলো খাবে। বলে দুজনেই হাত ধুয়ে নিলো।
দুটো প্লেটে খাবার দেয়া হলেও আবদুল্লাহ একটা প্লেটে ভাত তরকারি নিয়ে মেখে স্ত্রীর মুখে একটা লোকমা তুলে দিলো!
ইশিতাও প্রতিদানে স্বামীর মুখে এক লোকমা খাবার তুলে দিলো পরম ভালোবাসায়। আবদুল্লাহ খেতে গিয়ে ইশিতার আঙুলে মৃদু কামড় বসিয়ে দিলো।
--উফ! ভারি দুষ্টু দেখছি তুমি! যাও। আমি আর খাইয়ে দিবোনা।
--স্যরি!জান এমন দুষ্টুমি করবোনা। আর তুমি খাইয়ে না দিলে খাবোনা।
--আচ্ছা ঠিকাছে আমার হাগল স্বামী! এই নেও খাইয়ে দিচ্ছি। তোমার এই দুষ্টামি আমার ভাল্লাগে"
বলে ইশিতা খাইয়ে দিতে গেলো।
--রাখো একটু!আচ্ছা, আমরা কি খাওয়ার আগে বিসমিল্লাহ বলেছি?
-উহু,দুজনেই ভুলে বসে আছি।
--তাহলে চলো আমরা একটা দুআ পড়ে নেই যে দুআটা খানা খাওয়ার শুরুতে বিসমিল্লাহ ভুলে গেলে পড়তে হয়।বলো আমার সাথে
"বিসমিল্লাহি আউয়্যালাহু ওয়া আখিরাহ্ "।
কেউ নিজ হাতে খেলো না। একে অন্যকে খাইয়ে দিয়ে খাওয়া দাওয়া শেষ হলো দুজনের।
আবদুল্লাহ রুমাল দিয়ে ইশিতার হাত মুখ মুখ মুছে দিয়ে বললোঃনাও এবার
খানা খাওয়ার শেষের দুআটা পড়ে নাও দেখি আমার সাথে।
"আলহামদুলিল্লাহিল্লাজি আত্বআমানা ওয়া সাক্বানা ওয়াযাআলানা মিনাল মুসলিমীন "
অর্থঃসমস্ত প্রসংশা ঐ আল্লাহর জন্য, যিনি আমাদের খাওয়ালেন, পান করালেন এবং আমাদের মুসলিম বানিয়েছেন"।
দুজন ওযু করে নিলো।আবদুল্লাহ সামনে ও ইশিতা পিছনে জায়নামাজে দাড়ালো।
নামাজ শেষে ইশিতাকে পাশে বসিয়ে আবদুল্লাহ সূরা মুলুক তিলাওয়াত করলো। ইশিতা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনে।কি সুন্দর তিলাওয়াত তার স্বামীর! শুনতেই মনে চায়!
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now