বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
১।
একটি ব্যস্ত দিনের পর অফিসের রেস্ট রুমের এসি বাড়িয়ে, আরাম করে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসেছিল মুস্তাফিজ। ঠাণ্ডা বাতাসে শরীর জুড়িয়ে, সিগারেট ধরিয়ে বিষাক্ত সুখের ধোয়ায় হৃদপিন্ডটা পোড়াতে শুরু করল সে। কিন্তু তার এই সুখে কার যেন নজর পড়ে গেল। কর্কশ শব্দে রিসেপশন থেকে আসা কলটি টেবিলে রাখা টেলিফোনে বেজে উঠল। আজ এই টেলিফোনের ঘন্টা প্রচুর বিরক্তিকর লাগছে তার কাছে। ওপাশের সুন্দরি ও স্মার্ট রিসেপশনিস্ট, লিজার কন্ঠ যদিও টেলিফোনের ঘন্টার মতো না। অন্য দিন হলে মুস্তাফিজের লিজার সাথে কথা বলতে ভালোই লাগত। কিন্তু আজ আর কিছুই ভালো লাগছে না। তাই রিসিভার তুলেই বললো, "হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট? আমি এখন রেস্ট এ আছি। জরুরি কিছু থাকলে দ্রুত বলো।"
লিজা তার মিষ্টি কন্ঠে আরো মধুর ফ্লেবার যোগ করে বলল, "স্যার! রাগ করছেন কেন? জরুরি বলেই তো আপনাকে ফোন দিলাম। নাহলে আমি কী জানি না এসময় আপনাকে নাড়ানো কতটা বিপদজনক? গতবার তো…" লিজার কথা শেষ না হতেই মুস্তাফিজ বললো, "তোমার এই ফালতু কথা আমি এখন শুনতে চাচ্ছি না। জরুরি বিষয় টা কী? সেটা বলো?"
লিজা একটু অভিমানি সুরেই বলল, "একটি লোক এসেছেন আপনার সাথে দেখা করার জন্য।
"আমি এখন কারো সাথে দেখা করতে ইচ্ছুক না। কালকে সকালে আসতে বলো।"
ফোন রেখে দিয়ে একটা শান্তির নিশ্বাস ছাড়ল সে। আজ আর অফিসে থাকবে না মনে করে, উঠে দাঁড়িয়ে তার কালো ব্যাগটিতে প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস গুছিয়ে নিতে লাগল। কিন্তু একটু পর তার রুমের দরজায় একটি টোকা পড়ল। তাই চোখ তুলে সেদিকে তাকাল মুস্তাফিজ। ওপাশ থেকে একটা চিকন পুরুষ কন্ঠ কথা বলে উঠল, "মুস্তাফিজ সাহেব, আমি কী ভেতরে আসতে পারি?"
চেহারায় মারাত্মক বিরক্তি ভাব টা ফুটে উঠল তার। "লিজার দিনকে দিন খুব বাড় বেড়েছে। একটু লায় দিতেই মাথায় উঠে পরতে চাচ্ছে। আমি নিষেধ করার পরও লোকটাকে এখানে আসতে দিয়েছে কেন? ওর একটা ব্যবস্থা করতেই হবে।" কিন্তু এখন আর কি করা যায়! ভদ্রতার খাতিরে ভেতরে আসতে বলতেই হবে দরজার লক খোলাই ছিল। হালকা করে ধাক্কা দিয়ে যিনি ভেতরে প্রবেশ করলেন, তার দৈহিক আকারের সাথে কন্ঠের কোনো মিল খুঁজে পেল না মুস্তাফিজ। তিনি নিতান্তই অতিরিক্ত স্বাস্থ্যবান। গায়ের রঙ একটু বেশিই ফর্সা। বাংলাতে কথা না বললে ওনাকে পশ্চিমা দেশের বাসিন্দা ভাবলে ভুল হবে না। বরং বাঙালী ভাবলেই ভুল হতে পারে। লোকটি তার দাত গুলো বের কর হাসতে হাসতে বললেন, " আপনি আজকে কী বেশিই ব্যস্ত নাকি?"
"একটু জরুরি কাজে বাইরে যাচ্ছিলাম আর কি! আপনার কাজটা কী খুব বেশি জরুরী? না হলে কাল আসলে খুব ভালো হয়।" নিরস গলায় বলল মুস্তাফিজ।
তিনি বললেন, "আমার কাজ টা শুধু আমার জন্য জরুরী না বরং আপনার জন্যও জরুরী হতে পারে। আমি আশা করি এতে আপনিও ভালো পরিমাণ লাভবান হবেন।"
"কেমন কাজ?"
"আমার মনে হয় বসে কথা বললে ভালো হয় কী বলেন?" বললেন লোকটা।
"জি, অবশ্যই বসুন, বসুন।" মুস্তাফিজ চেয়ারে বসে টেবিলে বিপরীতে তার সামনের চেয়ারে লোকটাকে বসতে ইশারা করল। লোকটি তার ভারি প্রশ্চাদেশ চেয়ারের নরম কুশনে সেধিয়ে দিলেন। মুস্তাফিজ কিছু বলতে যাবে তার আগেই লোকটি বলতে শুরু করলো, "আসলে আমি আপনার কাছে একটা অনেক বড় অফার নিয়ে এসেছি। এবং সেটা একটু আর্জেন্ট। তাই আপনার স্টাফ দের বাধা দেওয়ার পর ও চলে আসতে হলো?" মুস্তাফিজ অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো, "কী এমন কাজ যে আজই করাতে হবে? কাল সকালে হলে কী খুব দেরি হয়ে যায়?"
"আমি আপনাকে যে জিনিস দেখাব, সেটার জন্য আপনি নিজেও অপেক্ষাই থাকতে চাইতেন না।" তার আগে আমার পরিচয় দিয়ে নিই। আমার নাম সাহেদ আল মাসুদ। আপনি নিশ্চয় 'এম ডাইমন্ড এন্ড জুয়েলারি'স কম্পানির নাম শুনেছেন? আমিই সেটার মালিক।"
এবার মুস্তাফিজ একটু না বরং বেশিই অবাক হলো। সে যে এই লোকের নাম শুনেনি তা নয়। চারিদিকে এই কম্পানির অনেক সপ রয়েছে। শহরে মনে হয় খালি এদের ব্যবসাই চলে। দেশের বিজনেস এ সফলতার শীর্ষে থাকা একটি কম্পানি। আগে দেখা হয়নি কিন্তু নামটা ভালো মতোই জানা। তাই সে এবার আর বিরক্তি ভাব না দেখিয়ে আগ্রহের সাথে প্রশ্ন করলো, "মাসুদ সাহেব, আপনার মতো এতো বড় ব্যক্তির আমার কাছে কি কাজ থাকতে পারে?"
মাসুদ সাহেব বললেন,"আসলে আমার কাছে যে জিনিস আছে তা আমার কাছেই ওয়ান পিছ আছে। তাই আমার যে কাজ তা একমাত্র ওয়ান পিছ আপনিই করতে পারবেন।
"তাহলে আগে আপনার সে জিনিস টাই দেখি।" বলল মুসাফিজ। মাসুদ সাহেব বললেন, "এখানে মনে হয় ঠিক হবে না। কোনো সুরক্ষিত এবং গোপন স্থানে গিয়ে ডিসকাস করলে ভালো হতো। আসলে বিষয় টা খুব কনফিডেনসিয়াল।"
মুস্তাফিজ কপালের ওপরে নেমে আসা চুল গুলো একপাশে সরিয়ে দিল।
"আসলে এখানে আমার কাজ কী? আমি সেটা বুঝতে পারছি না। দয়া করে যদি একটু খুলে বলতেন, তাহলে ভালো হতো।" মাসুদ সাহেব বললেন, "তাহলে আমার বাসায় একবার যেতে হবে আপনাকে।"
কিছুটা জোর জবরদস্তি করেই মুস্তাফিজ কে নিয়ে গাড়িতে উঠলেন তিনি। দামি মারসিডিস মুহুর্তেই গতি উঠিয়ে ছুটতে লাগল। জানালা দিয়ে রাস্তার পাশের উঁচু বিল্ডিং গুলোর দিকে তাকিয়ে একটি ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলল মুস্তাফিজ।
২।
প্রায় বছর দশেক আগে গ্রামের মায়া ত্যাগ করে এই ছলনাময়ী শহরে এসেছিল সে। এই শহর কখনোই তার ভালো লাগেনি। মাস খানেক এর মাঝেই বুঝে গিয়েছিল এই শহর তার যোগ্য নয়। তাই ফিরে এলো তার গ্রামের কুঠুরিতে। কিন্ত একমাত্র আপনজন তার মা চেয়েছিল নিজের ছেলেকে ইঞ্জিনিয়ার বানাবে। তাই তার মা নিজের কছম দিয়ে বলল, "ইঞ্জিনিয়ার হয়ে তার পর শহর থেকে ফিরবি। তার আগে যদি পালিয়ে আসিস, তাহলে আমার মরা মুখ দেখবি।"
বাবা হারা মুস্তাফিজ তার মায়ের অশ্রু ভেজা চোখ ও মলীন মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝে গিয়েছিল কতটা কষ্ট করে তাকে তিনি মানুষ করেছেন তিনি। তাই তার মায়ের কোনো কথা সে ফেলতে পারবে না। সে বলেছিল, "না মা। আসলে তোকে দেখতে খুব মন চাচ্ছিল রে। তাই ছুটে চলে এলাম। আমি কিছুদিন পরই ফিরে যাব। তুই দেখিস আমি দেশের সব থেকে বড় ইঞ্জিনিয়ার হয়ে ফিরবো।
মায়ের চোখ থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় অশ্রু গড়িয়ে মাটিতে পড়ল। সে অশ্রু হীরের মতো চকচকে ছিল। মা বললেন, "আয় বাবা। খেতে বস। রোদে পুড়ে কত কালো হয়ে গেছিস তুই। শুকিয়ে গেছিস কেন এতো? ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া করিস না। তাই না? কী আর করবি, আমিও তো মাসে এর বেশি টাকা পাঠাতে পারি না।"
রাতে ঘুমানোর সময় মুস্তাফিজ বিছানায় এবং তার মা মাটিতে শুয়ে পড়ল। তখনও ঘুম আসেনি, চোখের পাতা কেবল একটু ভারি হয়ে এসেছিল। মুস্তাফিজ শুনতে পেল পাশের বাড়িতে হাল্কা হইচই।
রহিমের মা বলছে, "দেখ মুস্তার মা, গত ধারের চাল তুমি এখনো ফিরাও নাই। তাই আমি তোমারে চাল দিতে পারছি না।"
"ভাবি এইবারের মতো দাও। বাড়িতে একদানা চাল নাই। মুস্তা আমার এতোদিন পর আসছে। সকালে ওরে কি খাওয়াবো ?"
"তা আমি জানি নে। তুমি যাওগা। আর ছেলে তো ভালোই ডাগর হইছে ক্ষেতের মুনিশে লাগাইলেও তো কিছু পয়সা পাবা।"
"মাফ করো গো ভাবি, ওরে আমি অনেক বড় মানুষ বানাব। এইডা ওর বাপেরও শেষ চাওয়া ছিল।"
"যাও! যাও! ঘরে খাওন নাই আবার কি বড়লোক হয়ব?" মা নিরবে ফিরে আসলেন।
মুস্তাফিজ দ্রুত সরে গিয়ে, বিছানায় ঘুমানোর ভান করে শুয়ে পড়ল। ভোর হতেই মুস্তাফিজ মাকে ডেকে বলল, "মা আমাকে এখনি যেতে হবে। কলেজে কী একটা পরিক্ষা হবে। "
"খাওয়া দাওয়া করে যাবি না?"
"না সময় নেই। ট্রেন ধরা লাগবে।" ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বলল মুস্তাফিজ। মায়ের চোখে জ্বল এসে গাল ভিজিয়ে দিচ্ছিল। সেটা পেছনে না তাকিয়েও সে বুঝে নিয়েছে।
মফেজ আলি এলাকার বড় মুদিখানার মালিক। প্রথমে তার কাছে বাকি জিনিস কিনতো মুস্তাফিজের মা। কিন্তু বাকি শোধ করতে না পারায় সেও আর ধার দেয় না। সেদিন সে সকালেই এসে হাজির মুস্তাফিজের বাড়িতে।
"মুস্তার মা ও মুস্তার মা। বাড়ি আছ নি?"
তার মা ঘর ঝাট দেওয়া রেখে দরজা খুলল। দেখল মফেজ মিয়া ও তার দোকানের ছোকরা টা এক বস্তা চাল নিয়ে এসেছে। কিছুটা অবাক হল সে। "মুস্তা আজ ভোরের পর আইছিল। আমি তো পড়ে পড়ে ঘুমুচ্ছিলাম। আমাকে ডেকে তুলে বাকির হিসাব পরিশোধ করে গেছে। আর ৫০ কেজির এই বস্তাটার টাকা দিয়ে পাঠিয়ে দিতে বলল। ভাবলাম তোমাকে বলে গেছে, তুমি নিতে আসবা। পরে আর আসলানা দেখে আমি নিজেই চলে আসলাম।"
তবে মার কথা তার রাখা হয়নি। বছর খানেক পরই সে গ্রামে ফিরেছিল। কারন তার মা তাকে ছেড়ে মৃত্যুকে আপন করে নিয়েছিল। মাকে শেষ বারের মতো দেখতে গিয়েছিল সে। তার কবরের পাশে পড়ে রাতদিন কেঁদে পার করেছিল মুস্তাফিজ। পরের দিনই সে ঐ গ্রাম থেকে ফিরে এসেছিল। তারপর থেকে আর যায়নি সেখানে। যে গ্রামের মাটি তার বাবা-মা দুজনকেই গিলে খেয়েছে, সে মাটিতে পা রাখতে পারবে না সে।
৩|
গাড়ির ব্রেকে সজরে পা চাপল ড্রাইভার। অসাবধানতার কারনে সামনে ঝুঁকে গেল মুস্তাফিজ। জানালার কাচ দিয়ে দেখতে পেল এক বিশাল বাড়িতে ঢুকেছে গাড়িটি। সামনে প্রাসাদের মতো একটা বিশাল সাদা পাথরের বাধানো বাড়ি দাড়িয়ে আছে। হঠাৎ একটা জায়গায় তার চোখ আঁটকে গেল।
"ওহ মাই গড?"
…………|…………..
গাড়ি গেটের সামনে আসতেই একজন সিকিউরিটি গার্ড গেট খুলে দিল। জানালার কাঁচের সামনে এসে সালাম দিল মাসুদ সাহেবকে। বড়লোকদের পেছনে মানুষ হাজার গালাগালি দিক, সামনে স্যালুট ঠিকই দিয়ে যেতে হয়। ভেতরের দৃশ্য দেখে মুস্তাফিজের চক্ষু চড়ক গাছ। আগে এরকম বিলাস বহুল বাড়ি সে দেখেনি। বাড়ির বিশালতা বা তার ডিজাইন দেখে সেটা বলা হচ্ছে না। চারিদিকে সবুজ ঘাসে ঢাকা বিস্তৃত এলাকা। মঝাখানে একটি সুন্দর রাস্তা। সামনে একটা পানির ফাউন্টেইন চোখে পড়ল তার৷ সেটির মাঝখানে একটি নগ্ন নারী মূর্তি। সেটি ওষ্ঠ অধর গোল করে চুম্বনের ভঙ্গিতে মুখ সামনে এগিয়ে আছে। আর নিপুণ হাতে গড়া ঠোঁটের মাঝ থেকে ঝকঝকে স্বচ্ছ পানি বেরিয়ে পড়ছে৷ সে পানির শব্দ অতি মধুর কিংবা সেই নারী মূর্তিটি অত্যধিক আকর্ষণীয়। প্রতিটি অঙ্গ যেন অনন্য সৃষ্টি। সেই দিকে মুস্তাফিজের মনোযোগ ছিল না। সে তাকিয়ে ছিল। সুসজ্জিত ফুলের বাগানের দিকে৷ সব অনেক দামী বিদেশী গাছ দিয়ে সাজান। কালো পোশাক পরিহিত কিছু গার্ড চোখে পড়ল তার। প্রত্যেকের হাতে অটোমেটিক মেশিনগান। কালো রঙের এম ফোর্টি সিক্স। একবার ট্রিগার চাপলেই অসংখ্য বোলতা বেরিয়ে ছুটে এসে নিমেষেই প্রাণ কেড়ে নেবে। গাড়ি থেকে নেমে মুস্তাফিজকে সোজা নিয়ে যাওয়া হলো একটা গোপন কক্ষে। বাসায় বাকি কোনো সদস্যদের সাথে তার আর পরিচিত হওয়া হলো না। তার অবশ্য প্রয়োজনও নেই।
'আসুন! ভেতরে আসুন মুস্তাফিজ সাহেব।' দরজার সামনে রাখা বায়োমেট্রিক সিকিউরিটি সিস্টেমে হাতের ছাপ ও চোখের রেটিনা এন্টার করে দরজা খুলে বলল সাহেদ আল মাসুদ। মুস্তাফিজের এখন মনে হচ্ছে সত্যিই অনেক বড় কাজ। কারণ সিকিউরিটী দেখে তাই মনে হচ্ছে। এমন কী জিনিস দেখাবেন তিনি, যে এতো সিকিউরিটির ব্যবস্থা করা হয়েছে। আবার সেই কনফিডেনসিয়াল বস্তু তাকেই বা এই লোক কেন দেখাবে। বড় লোকেরা স্বার্থ ছাড়া কিছু করে না। তাই এখানে মনে হচ্ছে তার অনেক বড় লাভের স্বার্থ জড়িত। কিন্তু...আমাকেই কেন? এমন প্রশ্ন মুস্তাফিজের মাথায় প্রায়ই উঁকি দিচ্ছে।
ঘরের ভেতরেও দুই জন কালো পোশাকের, অস্ত্র হাতে গার্ড দাঁড়িয়ে। একটি চারকোনা টেবিলের সামনের চেয়ারে বসতে বলা হলো মুস্তাফিজকে। তার সামনে বসলেন সাহেব আল মাসুদ।
"মাসুদ সাহেব! আমি সত্যিই আর কৌতুহল ধরে রাখতে পারছি না। আপনার যেটা দেখানোর সেটা তাড়াতাড়ি দেখান প্লীজ। "
কিঞ্চিত হেঁসে মাসুদ সাহেব বলল, "দেখেছেন আমি বলেছিলাম। আপনার নিজেরই তর সইবে না।"
"তা ঠিক! আমার সত্যিই আর তর সইছে না।"
"আচ্ছা একটু অপেক্ষা করুন।"
মুস্তাফিজ ভেবেছিল যতক্ষন তারা এই কনফিডেনসিয়াল বিষয় নিয়ে কথা বলবে ততক্ষণই দুইটি মেশিনগান তার দিকে তাক হয়ে থাকবে। পেছনের গার্ড দুজনের হাবভাব সেটাই বুঝিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু তাকে অবাক করে সাহেদ আল।মাসুদ গার্ডদের বিদায় করে দিল। মুস্তাফিজ শুধু মুঁচকি হাসলো সেটা দেখে।
একটা সম্পূর্ণ সিলভার রঙের একটি বাক্স রাখা হলো টেবিলের ওপরে। সেটি পাশের ঘর থেকে মাসুদ সাহেব নিজে নিয়ে এসেছে। সে ঘরে কী আছে তা মুস্তাফিজের জানার কথা না। কিন্তু এই বাক্সে কী আছে? সেটা কিছুক্ষণের মধ্যেই সে দেখতে পাবে। ভেতরে ভেতরে তার নিজেরই উত্তেজনা বেড়েই চলেছে।
বাক্সটা অতি আধুনিক। দেখে মনে হচ্ছে টাইটানিয়াম ধাতু দিয়ে তৈরী। এটাকে ভাঙা অসম্ভব। তবে তার প্রয়োজন নেই। শাহেদ আল মাসুদ নিজেই পাসওয়ার্ড দিয়ে সেটি খুলতে পারবেন। বাক্স এর একটি অংশে আলো জ্বলে উঠল। দেখা গেল নীল রঙের টাস স্ক্রিন। সেখানে হাতের ছাপ মেলালেন তিনি। তারপর দিতে হলো পাসওয়ার্ড। এছাড়া বাক্সটি খোলার উপাই নেই। মুস্তাফিজ সব তীক্ষ্ণ নজরে পর্যবেক্ষণ করতে ছিল। এবার সেই সময় এসেছে। বাক্সটি খোলা হচ্ছে৷ মুস্তাফিজ একটু সামনে ঝুকে বসল।
বাক্সটার ঢাকনা খুলে গেল। আর সাথে সাথেই ভেতরের বস্তুটি দেখে মুস্তাফিজের মাথা পায়ের নিচের মাটিও কেঁপে উঠল।
হ্যাঁ। সে সত্যিই দেখতে পাচ্ছে। তার সামনে। মাত্র দুই হাত সামনে রাখা সেটি। জ্বলজ্বল করছে। বাক্সের ভেতর থেকে সেই উজ্জ্বল রশ্মি তার চোখে মুখেও পড়ছে। চকচক করছে মুস্তাফিজের চোখ। একটা আসল ব্লাক ডাইমন্ড? মুস্তাফিজের মুখ প্রায় হা হয়ে গিয়েছিল।
মাসুদ সাহেবের তুড়িতে সে স্তম্ভিত ফিরে পেল।
কাঁপা কাঁপা গলায় সে বলল, "এটা কী সেইটা? এটা কী সত্যিই আসল?"
"আসল না হলে আপনাকে কেন দেখাতে আনতাম?"
"আমি কী একবার হাতে নিয়ে দেখতে পারি?"
"অবশ্যই পারেন। এটার জন্যই আপনাকে এখানে আনলাম।"
"মানে?" চকচকে কালো বড় সাইজের হীরাটা হাতে তুলে নিতে নিতে জিজ্ঞাসা করল মুস্তাফিজ।
"আপনার একটু সাবধানে হাত লাগানো উচিত ছিল।"
"কেন?"
"হীরেটা চুরির।"
মুস্তাফিজ সাথে সাথে পকেট থেকে রুমাল বের করে হীরে থেকে তার আঙুলের ছাপ মুছে দিতে উদ্যত হলো৷
"আরে চিন্তার কিছু নেই। আমার কাছে আপনি নিরাপদ।"
মুস্তাফিজ ভেবে পাই না এতো টাকা-পইসা ও সম্পত্তির মালিকের আবার চুরি করার কী দরকার।
"আপনি এটা কোথায় থেকে চুরি করেছেন?" মুস্তাফিজ বলল৷
"কেন খবর-সবর দেখেন না নাকি? বাংলাদেশের জাতীয় যাদুঘর থেকে।"
"কী! এটা বাংলাদেশে ছিল? এতো দামি হীরা এই দেশে কীভাবে?"
"অবশ্য এটি আমাদের দেশের সম্পত্তি না। কিছু বিদেশি আরাবিয়ান শেখ বেশ কিছু দেশের মতো আমাদের দেশেও এটির প্রদর্শনীর জন্য এসেছিল।"
"আর আপনি এটা চুরি করেছেন? আর পুলিশ আপনাকে খুঁজছে না?"
"আহা! আমি কী এতোটাই বোকা। চুরি আমি করিনি। একজন কে দিয়ে করিয়ে নিয়েছি।"
"কিন্তু আমাকে সব কেন বলছেন? আমি যদি পুলিশকে খবর দিয়ে দিই?"
"হা হা হা! এখান থেকে বের হতে পারলে তো?"
মুস্তাফিজ এর অর্থ ভালভাবেই বুঝে গেছে।
"কিন্তু এখানে আমার কী প্রয়োজন? আমি কী করবো সেটা বলবেন?"
"আপনাকে আমার একটা কাজ করে দিতে হবে৷ এর জন্য মোটা অংকের টাকাও দেওয়া হবে আপনাকে৷"
"হ্যাঁ। বুঝলাম। কাজটা কী সেটা বলুন। আপনি একই কথা বারবার ঘুরাচ্ছেন কেন?"
"আপনাকে অনলাইনের একটি তথ্য পরিবর্তন করতে হবে।" বললেন মাসুদ সাহেব।
"সেটা কীভাবে? আর কেন?"
"মুস্তাফিজ সাহেব! আমি এমনি এমনি আপনাকে এখানে নিয়ে আসিনি। আপনি হয়তো জানেন না। কিন্তু আমি আপনার সম্পর্কে সব খোঁজ খবর নিয়ে ফেলেছি। আমি এটাও জানি আপনি একজন অনেক বড় হ্যাকার।" মুস্তাফিজ চেয়ারে পিঠ ঠেকিয়ে হেলান দিয়ে বসলো।
কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনার পর সে অনেক দেশি-বিদেশি কম্পানি ও ফার্মে কাজ করেছে। কিন্তু সে নিজের বিজনেস শুরু করতে চাইতো। তাই নিজেই একটি কম্পিউটার ফার্ম খুলে ফেলল৷ দক্ষতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে অল্প সময়েই তার কম্পানি দাড়িয়ে গেল৷ এসব কথা সবার জানার কথা। কিন্তু সে একজন হ্যাকার এটি জানা স্বাভাবিক না। সে সূদুর অতীতের কথা। একসময় তার অভাব ছিল। পড়াশোনা বন্ধ হবার জোগাড়। কেউ নেই যে তাকে একটা পয়সা দিয়ে সাহায্য করবে। তখন সে তার কম্পিউটারের জ্ঞান কাজে লাগিয়ে দেশের বড় বড় নেতা-মন্ত্রী ও অফিসারের ব্যাংক একাউন্ট থেকে টাকা গায়েব করে নিয়েছিল। তার নিপুন ভাবে করা কাজের ফলে কেউ সে চুরির হদিস পাইনি। আর সেই সকল টাকা ছিল বেয়াইনি ভাবে ইনকাম করা। বলতে গেলে ঘুষ, দুর্নীতি, লুটপাট ইত্যাদি করে জমানো। সবটাই কালো টাকা। তাই সেইভাবে পুলিশ কেস করার সাহস পাইনি অনেকেই। মুস্তাফিজ সেই টাকা দিয়ে নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি অনেক অনাথ আশ্রমের শিশুদের সাহায্য করেছে।
"আসলেই আপনি আমার বিষয়ে অনেক খোঁজ নিয়েছেন বুঝতে পারছি। কিন্তু এটাও নিশ্চয় জানেন আমি এখন সেগুলো ছেড়ে দিয়েছি।" মুস্তাফিজ কঠিন গলায় বলল৷
মাসুদ সাহেব মুচকি হেঁসে বললেন, "তাতে কী আমার জন্য এই কাজটি করে দিন। অথবা টাকার জন্য।"
"আমার তো আপনার টাকার কোন প্রয়োজন নেই।"
"তবুও কাজটি আপনাকে করতেই হবে। কারণ আপনি ছাড়া আর কেউ এই কাজ করতে পারবে না।"
মুস্তাফিজ জানে এখানে থেকে সে বের হতে পারবে না। তাকে কাজটি করতেই হবে। যদিও পুরটাই বেয়াইনি। কিন্তু আর কোনো উপায় নেই। সবার আগে নিজের প্রাণ।
"আচ্ছা আমি রাজি। কিন্তু টাকার জন্য না। আমি পার্টনারসিপ চাই। আপনি তাতে রাজি থাকলে বলুন।"
"অনেক বড় শর্ত জুড়ে দিলেন মুস্তাফিজ সাহেব। আচ্ছা কি আর করার আছে। আমি আবার প্রতিভাবে মূল্যায়ন করার পক্ষে। কত পার্সেন্ট?"
কিঞ্চিৎ হেঁসে মুস্তাফিজ বলল, "৪০ %।"
"না। কল্পনার থেকেও বেশি। ১০ %।"
"৩০ %।"
"১৫%।"
"২৫।"
"দেখুন ২০% এর বেশি আমি দিতে পারবো না। তাই আর কোনো কথা বলবেন না।"
মুস্তাফিজের মুখে তবুও হাঁসি ফুটে উঠল। এই কালো হীরার দাম টাকায় কম করে হলেও ৫০ লক্ষের বেশিই হবে। আর ইন্টারন্যাশনাল নিলামে তুললে তো এর দাম কয়েক কোটিতে উঠতে পারে। কিন্তু মাসুদ সাহেব এর টাকার অভাব নেই। তিনি কেন এই হীরে চুরির সাথে যুক্ত হয়েছেন সেটাই একটা রহস্য।
"আচ্ছা তাহলে এবার আমার কাজটা আমাকে বিস্তারিত বুঝিয়ে দিন।" মুস্তাফিজ সোজা হয়ে বসল।
"হ্যাঁ....” কথা শুরু করতে যাচ্ছিলেন শাহেদ আল মাসুদ। আর তখনই তার মোবাইল ফোনটি বেজে উঠল।
…………|…………..
"হ্যালো।"
"হ্যাঁ। সে রাজি হয়ে গেছে। কিন্তু ২০% পার্টনারশিপ চাই।"
"তাও সমস্যা নেই। আচ্ছা আমি ঠিক মতো দেখবো। চিন্তা করবেন না। আপনার ডিলে কোনো বিঘ্ন আসবে না।" মোবাইল নামিয়ে রাখলেন মাসুদ সাহেব।
মুস্তাফিজ বুঝতে পারছে তার ধারণাই সঠিক এর সাথে আরো বড় কেউ জড়িত। পেছনে হয়তো আরও বিশাল বিশাল ভুড়িওয়ালা মাথা রয়েছে।
"তাহলে কাজটা ভালোভাবে বুঝে নিন।"
"জি প্লিজ। "
"এই হীরের মালিক তার নামে এটা রেজিস্ট্রার করে রাখবে এটাই স্বাভাবিক। এটি যদি কোথাও সেল করতে হয় তাহলে এর লিগাল পেপার গুলো প্রয়োজন। তবে আপনার এখানে কোনো কাজ নেই। আমার হায়ার করা চোর ডাইমন্ডের সাথে তার প্যাপারগুলিও চুরি করে এনেছে। কিন্তু সমস্যা বেধে গেছে অনলাইন রেজিষ্ট্রেশনে। এখন তো সবকিছু অনলাইনে থাকে। এই কাগজগুলো যদিও ডুবলিকেট বানিয়ে ফেলা খুব একটা জটিল না। কিন্তু অনলাইনে থাকা এই হীরের মালিকানার পরিবর্তনটা খুবই জটিল। আপনাকে হ্যাকিং এর মাধ্যমে উক্ত তথ্যের পরিবর্তন করে দিতে হবে।"
"বুঝলাম। মনে হচ্ছে খুব একটা সহজ কাজ না। যেহেতু চুরি হয়েছে সবকিছুর ওপর কড়া নজরদারি চলছে। হয়তো রেজিস্ট্রেশনের ওয়েবসাইটের ওপর নজর রাখছে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থারা। তবে আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব।"
"চেষ্টা না আপনাকে পারতেই হবে।" শাহেদ আল মাসুদ হালকা হাঁসলেন৷
"হুম! কিন্তু কাজটা এখানে হবে না। আমার কম্পিউটার লাগবে। আর সেটার জন্য আমার বাসায় যেতে হবে।" মুস্তাফিজ বলল।
"তাহলে চলুন! তবে হালকা খাওয়া দাওয়া করা যাক। অনেকক্ষণ কথা বলে ক্ষুদা লেগেছে অবশ্যই।" ভোজন প্রিয় মানুষের মাথায় খাবারের কথায় সর্বদা নাড়া দেয়।
৪।
মুস্তাফিজের সিক্রেট থাকার জায়গাটি একটি শাখা নদীর ওপর অবস্থিত। ছোট একটা কাঠের দুচালা বাড়ি। গ্রামে এধরনের মাটির বাড়ি চোখে পড়ে। কিন্তু তার ছোট বাড়িটা দেখতে অনেক সুন্দর। গাড়ি থেকে নেমে কাঠের ব্রিজের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে হলো। নদীতে এমনিতেই পানি কম। নদী থেকে উঁচুতে দাড়িয়ে আছে বাড়িটি। সূর্যাস্তের সময় সুন্দর একটা দৃশ্য উপভোগ করা যায়।
মুস্তাফিজের একটি আলাদা রূম আছে। সেখানে তার কম্পিউটার ও যাবতীয় সরঞ্জাম থাকে৷ ঘরের দরজা খুলতেই ভেতরে আলো জ্বলে উঠলো। একটা লাল-সবুজ আলো জ্বলে কম্পিউটারের পর্দায় 'ওয়েলকাম' লেখা ভেসে। আর যান্ত্রিক নারী কন্ঠে সেটি উচ্চারিত হলো। লাল-সবুজ রং নিজের দেশের পতাকার সাথে মিলিয়ে রাখা।
মাসুদ সাহেব হা করে তাকিয়ে আছেন। ঘরের এক কোনে একটি তাক। সেখানে প্রায় বিশের অধিক এওয়ার্ড ও মেডেল। সাইবার সিকিউরিটি প্রতিযোগিতার ফার্স্ট প্রাইজ। "ঠিক ছেলেকেই পাওয়া গেছে। এই পারবে কাজটি করতে।" মনে মনে একটু আসস্ত হলেন তিনি। বিশালাকার মনিটরে নানা গ্রাফিক্স দেখা যাচ্ছে। এসবের মাথা মুন্ডু কিছুই বোঝে না শাহেদ আল মাসুদ।
মনিটরের সামনে একটি গোল কি-বোর্ড। সেটি দেখে অনেক অবাক হলেন তিনি।
"এটা আবার কী ধরনের কি-বোর্ড? এই প্রথম গোল কি-বোর্ড দেখলাম।"
মুস্তাফিজ কম্পিউটারের সাথে তার নিজস্ব সার্ভারের তারের সংযোগ দিতে দিতে বলল, "এই কি-বোর্ড একমাত্র জাপানে তৈরী হয়৷ এবং শুধু জাপানি ভাষায়। এটা আমার নিজের জন্য বানানো। এই কি-বোর্ডে সাধারণগুলোর থেকে অনেক গুন দ্রুত কাজ করা যায়।"
"ভালো। এটি যদি বাংলাদেশের মার্কেটে নিয়ে আসেন তাহলে বিলিয়ন বিলিয়ন কামাতে পারবেন।"
"সেটা অবশ্য ঠিক।"
সব সংযোগের পর মনিটরের সামনে একটা চেয়ারে বসলো মুস্তাফিজের। মসৃণ টেবিলের ওপর কি-বোর্ড ও মাউস সেট করা। পাশে অন্য একটি চেয়ার টেনে মাসুদ সাহেব বসলেন।
"এবার হীরের অরজিনাল কাগজ বের করুন।"
একটা ফাইল ব্যাগ থেকে বের করে রাখলেন মাসুদ সাহেব। টেবিলের কোনায় পড়ে থাকলো সেটি। এখন ওয়েবসাইট হ্যাক করা প্রথম কাজ। ওয়েব সাইটে লগইন করল মুস্তাফিজ।
"হুম! যা ভেবেছিলাম তাই।"
"কী?"
"ওয়েবসাইটে কড়া সাইবার নিরাপত্তার ব্যাবস্থা করা হয়েছে। দশ লেয়ারের ফায়ারওয়াল সিকিউরিটি।"
ফায়ারওয়াল হলো ইন্টারনেট জগতের সুরক্ষা ব্যাবস্থা।
মুস্তাফিজ কি-বোর্ডে খটমট করে আঙুল চালিয়ে যাচ্ছে। মাসুদ সাহেব তাকিয়ে আছে মনিটরে। কত সংখ্যা, লেখা উঠেই যাচ্ছে। তিনি কিছুই বুঝতে পারছেন না তিনি। এদিকে মুস্তাফিজ শুধু গোল কি-বোর্ড দ্রুত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বিভিন্ন কি চেপে যাচ্ছে।
একসময় মুস্তাফিজের মুখে হাঁসি ফুটল।
"ইয়েস! প্রথম সুরক্ষা ব্যাবস্থা ভাঙা শেষ। এবার বাকি কাজ খুব সহজেই হবে।"
মাসুদ সাহেব তার পিঠ চাপড়ে বাহবা দিল। আবার আঙুল চলতে লাগলো কি-বোর্ডের ওপর।
এক-দুই, তিন করে পাঁচ লেভেলের ফায়ারওয়াল সুরক্ষা ব্যাবস্থাও হ্যাকিং এর মাধ্যমে ভেঙে ফেলল মুস্তাফিজ।
কিন্তু হঠাৎ সে একটু ভয় পেয়ে গেল। মনিটরে লাল আলো জ্বলে উঠলো।
ভেসে উঠলো বিশাল লাল অক্ষরে লেখা, "Alert." যান্ত্রিক নারী কণ্ঠ সাথে সাথে ইংরেজিতে বলতে লাগলো, "সিস্টেম ইজ আন্ডার এটাক।"
শাহেদ আল মাসুদ লাফিয়ে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "কী হলো?"
"ওয়েবসাইটের সাইবার নিরাপত্তা টিম বুঝে ফেলেছে তাদের সাইট হ্যাক করার চেষ্টা করা হচ্ছে।"
"এখন কী হবে? পুলিশ চলে আসবে? পালাতে হবে আমাদের।"
"আরে না। আমাকে ট্রাক করা এতো সহজ না। আমার আইপি এড্রেস বের করতে ও লোকেশন ট্রাক করে লক করতে তাদের এক মিনিটের মতো সময় লাগবে।"
"তাহলে এখন কী করবেন?"
"আজ একটা খেলা খেলবো। ষাট সেকেন্ডের খেলা। দেখি আমি জিতবো না তারা। টাইমার সেট করুন।"
মাসুদ সাহেব মোবাইলের টাইমারে ষাট সেকেন্ড সেট করে চালু করে দিল।
মুহুর্তেই ঘড়ির চাকা ঘুরতে শুরু করল। মুস্তাফিজ তালি বাজিয়ে উঠলো, "ছয় নম্বর লেয়ার ব্রেক ডাউন হয়ে গেছে।"
"আর চল্লিস সেকেন্ড আছে। দ্রুত করুন।"
কপাল বেয়ে ঘাম বের হচ্ছে তার। আঙুল থেমে কি-বোর্ড থেকে নেমে টেবিলের ওপর। আবার খটাখট কি চাপলো। পরের দশ সেকেন্ডে আরেকটি সুরক্ষা লেয়ার ভেঙে গেল। আর বাকি তিনটি লেয়ার।
কিন্তু একটা সমস্যা দেখা দিল। মুস্তাফিজের মুখে হঠাৎ অন্ধকার নেমে এল।
"তারা আমার সিস্টেমের সিকিউরিটি লেয়ার ভেঙে প্রবেশ করছে। তাই বাকি লেয়ার ভাঙতে গেলে সময় থাকবে না। আমরা ধরা পড়ে যাব।"
ঘড়ির চাকা ঘুরছে। আর ৩০ সেকেন্ড৷ মুস্তাফিজ মাথার চুল টেনে ছেড়ার মতো করতে লাগল। ছাদের দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে থাকল৷
"কিছু একটা তো করুন। তা নাহলে সব যাবে।"
"আর কত সেকেন্ড?"
"২০ সেকেন্ড বাকি।"
একটা বড় নিশ্বাস নিল মুস্তাফিজ। কপালের সামনে ঘামে ভিজে যাওয়া চুল সরিয়ে কি-বোর্ডে আঙুল রাখল।
প্রতিটা আঙুল এতো দ্রুত চলছিল যে মাসুদ সাহেব দেখতেই পাচ্ছিলেন না। মনে হচ্ছে তার দুই হাতে দশটা না আরও বেশি আঙুল।
আর দশ সেকেন্ড বাকি থাকতে থেমে গেল সে৷
"ওয়েবসাইট আর হ্যাক করা সম্ভব না।"
"তাহলে এতক্ষণ কী করলেন?" রাগে গরম হয়ে গেলেন মাসুদ সাহেব।
মুস্তাফিজ একটা রহস্যময় হাঁসি দিল। তারপর এক আঙুল সামনে নিয়ে এন্টার বাটনে চাপ দিল। আর তখনি একটা অকল্পনীয় কাজ হলো। মাসুদ সাহেব কিছুই বুঝলেন না।
কিন্তু এদিকে সাইবার সিকিউরিটি টিমের প্রতিটা কম্পিউটারের মনিটর সাদা হয়ে গেছে। সবার মাঝে একটা আতঙ্ক। কি হলো এটা? কেউ কোনো হদিস বের করতে পারল না। কোনো কম্পিউটার চালু হচ্ছে না৷ কোনো সিস্টেম আর কাজ করছে না।
মুস্তাফিজ চেয়ার সরিয়ে দাড়িয়ে গেল।
"ইয়েস।"
"কী হলো?"
"ওয়েব সাইট হ্যাক করে একটা তথ্য পরিবর্তন করার মতো সময় ছিল না। যেহেতু হীরের কোড মিলিয়ে তথ্য খোঁজা আবার তা এডিট করে নতুন তথ্য এন্টার করা, অনেক সময় লেগে যেত। ততক্ষনে আমরা ধরা পড়ে যেতাম। তাই আমি একবারে পুরো সাইট ডিলেট করে দিয়েছি। এই সংক্রান্ত কোনো তথ্য তাদের কাছে আর নেই। তাদের কম্পিউটার সিস্টেমের তথ্যও কোরাপ্ট বা নষ্ট করে দিয়েছি। তাই তাদের কাছে আর কোনো ক্লু থাকল না। এবার আমাদের ধরা তাদের পক্ষে অসম্ভব।" বিজয়ীর হাঁসি হাসলো মুস্তাফিজ।
যখন কোনো তথ্য থাকবেই না তখন এই হীরের আসল মালিক কে সেটা প্রমাণেরও সুযোগ নেই। ডুবলিকেট মালিকানার কাগজ ছাপানো কোনো ব্যাপার না তার কাছে। তাই মাসুদ সাহেব খুব খুশি হলেন। এই ছেলেকে সাথে রাখলে তিনি অনেক টাকা কামাতে পারবেন এটাও ভাবলেন। হাত মিলিয়ে হ্যান্ডশেক করলো দুইজন।
"আপনার ২০% এর চেক কালকেই পেয়ে যাবেন।"
মুস্তাফিজের সেটা নিয়ে কোনো ভাবনা নেই। তার জানার ইচ্ছে জেগেছি অনেক কড়া নিরাপত্তার মাঝে থেকেও হীরা ও এর কাগজ কে চুরি করেছে।
প্রশ্নটা করেই ফেলল সে।
মাসুদ সাহেব একটু ভেবে বললেন, "আপনাকে বলতে আর সমস্যা নেই। এখন আপনি আমাদেরই একজন। আসলে তাকে আমিও চিনি না। নাম, পরিচয় কিছুই জানা নেই। কোনো এক গোপন ড্রাক সাইট থেকে তাকে হায়ার করে আমাদের একজন। সে কে সেটা আবার জানতে চেয়ে বসবেন না। বলা যাবে না।"
"তাহলে ডিল কীভাবে করলেন?"
"সে নির্দিষ্ট স্থানে ডেলিভারি দিয়ে গেছে। আমার লোক সেখান থেকে নিয়ে এসেছে। আমার কাজ শুধু আপনাকে দিয়ে এই কাজটা করানো আর আসল জায়গায় হীরে ডেলিভার করা। সেটা কোথায় তা আবার জানতে চাইবেন না।" ঠাট্টায় হাসলেন মাদুদ সাহেব।
"একদম অজানা, অপরিচিত একজন চোর। বাহ! ইন্টারেস্টিং। আর এতো নিক্ষুত একটা চুরি করলো যে কেউ জানতেই পারল না কে সে?"
"হ্যাঁ! একদম সাইলেন্টলি সেরে দিয়েছে সব। তাই তার একটা নাম দিয়েছি আমি। 'সাইলো'।
"সাইলো! ওয়াও স্টাইলিশ।"
"হুম! তার চুরি করার স্টাইলটাও তো সেই।" দুজনেই হাঁসিতে মেতে উঠলো।
তারপর হাঁসি ঠাট্টার মাঝে কিছু জিনিস আরও জানতে পেল মুস্তাফিজ।
৫।
রাশিয়ান মাফিয়ার একটা বড় লিডারের সামনে বসে আছেন মাসুদ সাহেব। তাদের সাথেই এই ডিল সম্পন্ন হবে। এই হীরেটা চুরি করা টাকার জন্য না। আসলে এরকম রেয়ার বড় সাইজের ব্লাক ডাইমন্ড খুব কমই পাওয়া যায়৷ শেখগুলোর থেকে যখন কেনা গেল না৷ তাই চুরি করতেই হলো।
কিন্তু মাফিয়া ডন হীরেটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলেন। তারপর হঠাৎ ছুড়ে ফেলে দিলেন লঞ্চ থেকে।
সবাই চোখ বড় করে তাকালো পানির দিকে। মাসুদ সাহেব চিৎকার করে বললেন, "এ কী করলেন?"
রাশিয়ান ভাষায় মাফিয়া ডন বলল, "ওটা নকল। আসল হীরে কোথায়? আমার সাথে চিটিং করতে চান?" মাসুদ সাহেবের অনুবাদক কথা অনুবাদ করে দিল। তার পায়ের নিচের মাটি মুহুর্তেই সরে গেল, ভেঙে পড়লো মাথার ওপরের খোলা আকাশ।
"এটা কীভাবে সম্ভব। আমি নিজে চেক করেছিলাম। ওটা আসল ছিল।"
একটা ভয়ানক দৃষ্টি নিয়ে ডন উঠে দাড়াল। মাসুদ সাহেবের গালে সজোরে একটা থাপ্পড় মেরে দিলেন তিনি।
"আমার হীরা কোথায়?"
"আমি সত্যিই জানি না। কীভাবে সম্ভব?" আসলে তার এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না। হীরা গেল কোথায় তাহলে?
চারিদিকে অনেক একে ফোর্টি সেভেন তাক করা। মাঝখানে হাত-পা বাধা অবস্থায় মাসুদ সাহেব পড়ে আছেন। তার একটি চোখ থেতলে গেছে বন্ধুকের আঘাতে। দেহের বিভিন্ন জায়গায় রক্ত জমে গেছে। অনেক ক্ষত সৃষ্টি করেছে তারা। মুখ দিয়ে রক্ত ঝরছে তার। অনেক সময় ধরে টর্চারের পরও যখন হীরের খোঁজ মাফিয়ারা বের করতে পারল না। তখন তাদের একজন বসকে বলল, "এখন এর কী করবেন? মেরে দিই এটাকে?"
"না! সেটা খুব ছোট সাজা হয়ে যাবে। কল দ্যা পুলিশ৷ তাকে এই চুরির অপরাধে ফাসিয়ে দাও। এই সৌদি আরবে ছোট চুরির জন্যও কোঠর শাস্তি দেওয়া হয়। আর শেখদের ঐতিহ্যময় রেয়ার কালেকশন 'ব্লাক ডাইমন্ড' চুরির অপরাধে তার কেমন শাস্তি হবে সেটা দেখবো। তাকে অনেকটা যন্ত্রণা দেবে তারা।"
পুলিশ যখন মাসুদ সাহেবকে নদীর কুল থেকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল তখন তার পকেটের ফোনটা বেজে উঠলো। পুলিশের একজনই সেটি রিসিব করে মাসুদ সাহেবকে কথা বলতে দিল। কারণটা জানা গেল না। পুলিশ কেনই বা সে ব্যাক্তির কথা শুনল?
"হ্যালো কেমন আছেন?"
"কে! কে আপনি?" কন্ঠটা একটু হলেও চেনা মনে হলো তার কাছে।
" যদি প্রাণে বেঁচে যান তাহলে আশা করি জেলে বসে অনেক সময় পাবেন সেটা ভাবার।"
"এই বল কে তুই? আমি বুঝেছি। আমার সাথে এতো বড় ধোঁকার খেলা খেললি। হীরাটা তুই বদলে নিয়েছিস তাই না? আমার অনেক বড় সর্বনাশ করেই ফেলেছিস? যদি বেঁচে থাকি তোকে ছাড়ব না। শুধু বল কে তুই। সাহস থাকলে বল। মায়ের দুধ খেয়ে থাকলে নিজের পরিচয় দে। নাম বল তোর। "
"চিৎকার করছেন কেন? বেশি স্ট্রেস নিলে হৃদপিণ্ড ফেটে যেতে পারে। হা হা হা। আমার অতি সুন্দর একটা নাম তো আপনিই দিয়েছেন।"
"এই তোকে আমি ছাড়বো না। বল কে তুই?"
"সাইলো।" ওপাশ থেকে একটা হাঁসি শোনা যাচ্ছিল। রাগের চোটে ফোনটা আঁচড়ে ভেঙে ফেললো মাসুদ সাহেব।
।সমাপ্ত।
পরিশিষ্টঃ 'ব্লাক ডাইমন্ড' পরের দিন ঠিক মিউজিয়ামের যেখানে রাখা ছিল সেখানে সুরক্ষিত অবস্থাই পাওয়া গেল। আর কেউ বলতে পারবে না বাঙালী জাতি চোর। শুধু কিছু বড়লোকের জন্য এই জাতির ওপর কালো দাগ পড়েছে। এর কয়েক সপ্তাহ পরেই ধরা পড়লো রাশিয়ান মাফিয়ার দলটি৷ কোনো অজ্ঞাত লোক নাকি পুলিশকে সব তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছিল। তাকে নিয়েই এখন সব খবরাখবর। কিন্তু কে সে? সেটাই সকলের কাছে অজানা।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now