বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
ডানা
সুপ্তি যেদিন ইকারাসের গল্প শুনতে চেয়েছিল আমি খুব সহজেই তাকে বলতে পেরেছিলাম।
-তারপর ইকারাস ডেডালাসের সতর্কবাণী ভুলে গিয়ে উড়ে যেতে থাকে দূরে আরও দূরে। উঠতে থাকে আরও উপরে। সূর্যের আলো আরও তীব্র হতে থাকে। একসময় ইকারাসের ডানা গলতে শুরু করে।
সুপ্তি উত্তেজনায় আমার হাত চেপে ধরল।
-ইকারাস টের পায় না। ওড়ার আনন্দে সে সব কিছু ভুলে যায়। তারপর মুখ থুবড়ে সমুদ্রের পানিতে পড়ে যায় ইকারাস।
তারপর আমি থামলাম। সুপ্তি বলে, ইশ মানুষ যদি উড়তে পারত!
-মানুষ?
-হ্যাঁ। সমস্যা কী? পাখির মত যদি মানুষের ডানা থাকত মানুষও উড়তে পারত।
-ইকারাসের মত?
-হ্যাঁ।
-এসব গাঁজাখুরি বিশ্বাস করতে মন চায়?
-চায় তো। তোমার চায় না?
-না। চায় না। মানুষের কেমন করে পাখা থাকবে? আর থাকলেও মানুষের যেই ওজন, ঐ হালকা পালকের পাখা সেই লোড নিতে পারতো না। মানুষের হাড়ের গঠন আর পাখির হাড়ের গঠন সম্পুর্ণ আলাদা।
-উফ্!
ও আমার হাত ছেড়ে দিয়ে কাঁধ থেকে মাথাটা সরিয়ে নিল। বলল, তুমি এমন কেন? দিলে তো পুরো ব্যাপারটাতে পানি ঢেলে।
আমি হাসি লুকিয়ে রেখে গম্ভীর হয়ে বলতাম, এইরকম আজগুবি একটা ব্যাপার তুমি বিশ্বাস করছো সেইটা আমার সহ্য হচ্ছে না।
-আমি মোটেই বিশ্বাস করছি না। এসব রূপকথার গল্প কেউ বিশ্বাস করে না। মানুষ যে পাখি হতে পারেনা সেটা তুমি যেমন জানো আমিও জানি। একটু কল্পনা করলে অসুবিধাটা কী?
সুপ্তি ছিল অনেক বেশি কল্পনাপ্রবণ। ভীষণ আবেগ ওর। কিন্তু আমি ছিলাম তার পুরোপুরি উল্টো। ওর এই আবেগগুলো কেমন হাস্যকর মনে হত আমার। বসে বসে আকাশ কুসুম ভাবার মাঝে কোন যুক্তি খুঁজে পেতাম না আমি। ইকারাসের মত মানুষের কেন উড়তে পারতে হবে,আর সেটা ভেবে সময় নষ্ট করার কি যুক্তি আছে আমি বুঝতে পারতাম না। চেষ্টাও করিনি।
কিন্তু প্রথম পরিবর্তনটা শুরু হয়েছিল বেশ অযৌক্তিকভাবে। হঠাৎ করেই আমি বুঝতে পারি আমার চরিত্রের যুক্তিবাদী অংশটুকু আবেগকে একটু বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। সুপ্তির মত আমিও বেশ অদ্ভুতভাবে কল্পনা করতে শুরু করে দিয়েছি। যদিও আমি জানি কারণ ছাড়া আমি কিছুই কল্পনা করিনা, কিন্তু কারণটা ধরতে পারছিলাম না। সন্ধ্যার দিকে বেশ অনেকটা সময় শুধু আকাশ দেখেই পার করে দিতাম। শুধু পাখিদের বাড়ি ফেরা দেখতাম। মেঘের ওড়াউড়ি দেখতাম। এত খুঁটিয়ে দেখতাম যে আমি নিজেই অবাক হয়ে যেতাম। ব্যাপারটাকে আমি খুব একটা গুরুত্ব দেই নি। কিন্তু আমি বুঝতে পারি নি যে সত্যি সত্যি এটা কোন কিছুতে মোড় নিতে পারে।
প্রথম দিকে কিছুই টের পাইনি আমি। শুধু একটা বিচ্ছিরি অস্বস্তি হত। প্রথমে শুরু হত মেরুদন্ডের হাড় থেকে। তারপর আস্তে আস্তে একটা বিচ্ছিরি চুলকানি পিঠের চামড়া ফুঁড়ে ফুঁড়ে বেরিয়ে আসতে থাকে। পুরো পিঠে ছড়িয়ে পড়ে। পিঠে আর কোন অনুভুতি থাকে না। শুধু ভোঁতা চুলকানির মত অস্বস্তি। আর অনুভুতিহীন একটা পিঠ। কখনও মনে হতো চুলকানি না। বিচ্ছিরি একটা ব্যাথা। মৃদু অথচ অসহ্য। চামড়া কেটে দাঁত ওঠার মতন। দম ধরা একটা চাপা অস্বস্তি। আমি দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে যেতাম।
আমি ঠিক বুঝতে পারিনি যে সত্যিই সেখানে চামড়া কেটে কিছু বেরিয়ে আসবে। শুতে গেলে একটা হালকা চাপ অনুভব করতাম। কিন্তু পাত্তা দেই নি। কখনও সত্যিই শক্ত কিছু অনুভব করতাম। তবুও কিছু মনে করিনি। কিন্তু একদিন প্রিতম বলল, তোর পিঠে কি হয়েছে রে অদ্রি?
-কই কি হয়েছে?
-এই যে এইখানে।
ও আমার পিঠে হাত রাখে। যেইখানে দাঁত ওঠার মত অস্বস্তি হয় ঠিক সেইখানটায়। শিরদাঁড়ার উপর। আমি ঝাকুনি দিয়ে হাতটা সরিয়ে দিই।
-কিছু হয়নি। কি হবে?
-মনে হচ্ছে তোর পিঠে দাঁত উঠেছে।
আমার ভেতরটা শিউরে উঠল। কিন্তু মুখে ফুটে উঠতে দিলাম না। সবগুলো দাঁত বের করে হেসে বললাম, দাঁত? পিঠে? পিঠে আবার কেমন করে দাঁত উঠবে?
ও হাসলো না। গম্ভীর মুখে বলল, মনে হচ্ছে মেরুদন্ডের হাড় চামড়া ফুঁড়ে বেরিয়ে মাথা বের করে রেখেছে।
-ওহ্! আরে ফোঁড়ার মত হয়েছে বোধহয়। ওটা কিছু না।
-না। ফোঁড়ার মত না। শক্ত হাড়ের টুকরোর মত কিছু। শার্টের উপর উঁচু উঁচু হয়ে আছে। তুই শার্ট খোল। আমি দেখবো।
আমি ওকে দেখতে দেইনি। যদিও তখনও আমি জানতাম না কি হয়েছে তবুও ওকে জানতে দিতে রাজি ছিলাম না।
আমার পরিবর্তনটা একেবারেই টের পাইনি আমি। যদিও আমার পুরো শরীরে একটা চাপা অস্বস্তি ছিল। একটা অদ্ভুত চিড়বিড়ে ভাব ছড়িয়ে থাকতো পুরো শরীর জুড়ে। অস্বস্তির কোন বর্ণনা নেই আমার কাছে। মনে হত আমার ভেতরটা কেমন যেন শুষ্ক হয়ে উঠছে। আমি যেন নিঃশ্বাসের সঙ্গে আমার পুরো শরীরের সব কিছুও শুষে নিচ্ছি। ভেতরটা ভীষণ রকম হালকা হয়ে উঠছে। নিঃশ্বাসের বাতাস যেন পুরো শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পৌঁছে যায়। হাড়ের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়। আঙুলের ডগায়, পায়ের হাড়ে সেই বাতাসের অস্তিত্ব অনুভব করি আমি। আশ্চর্য রকম ওজনহীন মনে হয় নিজেকে। মনে হয় চাইলেই বাতাসে ভর দিয়ে ভেসে থাকতে পারব।
তখনও আমি বাইরে বের হতাম। সুপ্তির সঙ্গে ঘাসের উপর খালি পায়ে হাঁটতাম। ওর অযৌক্তিক আবেগময় কথাগুলো শুনতাম। মুগ্ধ হয়ে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। আমি জানি না কেন ওর চোখের দিকে তাকালে আমার সবকিছু ওলটপালট হয়ে যেত। সুপ্তি বলতো, মনে করো সত্যি সত্যি ইকারাস আছে।
আমি ওর এসব কল্পনার সঙ্গী হই নি কখনও। শুনতেই ভালো লাগত শুধু। ও যখন এসব আজগুবি কথা বলতো আমি চুপ করে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। ওর কল্পনায় ডুবে যাওয়া দেখতাম। কি অদ্ভুত ভঙ্গিতে মেয়েটা কল্পনা করে!
-আর সেই ইকারাস তার প্রেমিকাকে নিয়ে আকাশে মেঘের ভেতর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। প্রেমিকা তার গলা জড়িয়ে ধরে আছে। বেশ শক্ত করে। ওরা উড়ে যায় মেঘের ভেতর, রংধনুর ভেতর--
-রংধনু বলে তো কিছু নেই সুপ্তি। ওটা জাস্ট আলোর প্রতিসরণ।
ও বেশ বিরক্ত হতো। আমি ওর বিরক্ত হওয়া দেখতাম মুগ্ধ হয়ে। ইচ্ছে করে খেপিয়ে দিতাম ওকে। এই মেয়েটাকে অকারণে রাগিয়ে দিতে কেন জানি না আমার দারুণ লাগতো।
একটা সময় আমাকে ঘর থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দিতে হয়। মাথা বের করে রাখা হাড়ের টুকরোগুলো বড় হতে থাকে। মেরুদন্ডের দুপাশে বেরিয়ে আসে কিছু হালকা ফাঁপা হাড়ের টুকরো। শার্টের নিচে ঢেকে রাখা যায় না। মেরুদন্ডের দুপাশে শতপদীর পায়ের মতো বেরিয়ে থাকে। বড় হচ্ছে। আরও হবে। শিরশিরে একটা যন্ত্রণা হয় সেখানে। মনে হয় শিরার ভেতর রক্তের প্রবাহ টের পাই। শিরশির করে তরল রক্ত বয়ে যায়। বয়ে যায় নিঃশ্বাসের সাথে প্রবাহিত হওয়া বাতাস। হাতের আঙুলের মত নাড়ানো যায় হাড়গুলো। ডানে বাঁয়ে। উপরে নিচে। যেদিকে খুশি। যেভাবে খুশি।
আয়নায় নিজেকে যত দেখি অবাক হই আমি। ফিগার বদলে যাচ্ছিল আমার। বুকের হাড় আরও চওড়া হয়ে উঠছে। কাঁধ হয়ে উঠছে আরও উঁচু। পেশিগুলো ফুলে উঠছে ব্যায়ামবিদের মত। হাড়গুলো হয়েছে আরও মজবুত। আরও দৃঢ়। শিল্পীর হাতের নিখুঁত ভাস্কর্যের মত মনে হত নিজেকে। মাইকেল এঞ্জেলোর ডেভিডের মত নিখুঁত। মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতাম নিজের দিকে। অদ্ভুত। আমি অদ্ভুত সুন্দর। আমি পালটে যাচ্ছি।
অথচ আমার ওজন বেশ কমে যাচ্ছিল। টের পেতাম খুব হালকা পায়ে হাঁটি আমি। বুকের চওড়া হাড়ের ভেতর বাতাসের অস্তিত্ব অনুভব করতাম। আশ্চর্য ফাঁপা মনে হতে শুরু করে শরীরের প্রতিটা হাড়। মাংসপেশির ওজনহীনতা টের পেতে থাকি।
আমার মা একদিন জানতে চাইল আমি কেন হুট করে সবার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে ঘরের ভেতর বসে আছি।
-তোমাকে কে খবর দিল?
-তোর বন্ধুরা। সুপ্তিও বলেছে তুই ওর সাথেও যোগাযোগ করিস না। অন্তু বলেছে ও বাসায় গেলে তুই ওর সামনে যাস না।
-যেতে পারি না মা।
-পারিস না! কেন? কি হয়েছে?
-শরীর ভালো নেই।
-শরীর ভালো না তো ডাক্তার দেখা। ঘরবন্দী হবার কি হল?
মাকেও আমি বলতে পারিনি যে আমি আর স্বাভাবিক নেই। আমার কিছু একটা হচ্ছে। অদ্ভুত কিছু একটা। যেটা স্বাভাবিক নয়। আমি পালটে যাচ্ছি। আমার ভেতর খুব অদ্ভুত একটা পরিবর্তন হচ্ছে। আমি ইচ্ছে করে কারও সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেই নি। আমি আসলে কাউকে জানাতে পারছি না। কাউকে বলতে পারছিনা আমার পিঠে কিছু হাড় বেড়ে উঠছে ভীষণ অদ্ভুত ভাবে। প্রতিমুহূর্তে আমার প্রতিটা মাংসপেশি প্রতিটা হাড় পালটে যাচ্ছে। পালটে যাচ্ছে আমার চেহারা। দেহাবয়ব। এইভাবে আমি কারও সামনে দাঁড়াতে পারবো না। আমার এই অস্বাভাবিকতা প্রকাশ করতে পারবো না কারও কাছে। সঙ্গত কারণেই পারবো না। যেটা স্বাভাবিক নয়, যেটা স্বাভাবিকভাবে ঘটে না সেটা কখনও সামনে আসে না। আসতে পারে না।
আমি কিন্তু হঠাৎ করে বের হওয়া বন্ধ করে দেই নি। একটু একটু করে নিজেকে আলাদা করে নিয়েছি। প্রথমে বন্ধুদের সময় দেওয়া বন্ধ করেছি। ক্লাসে যাওয়া বন্ধ করেছি। সুপ্তির সঙ্গে দেখা করা বন্ধ করেছি। এমনকি অন্তুর সামনেও বের হওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল আমার। কিন্তু কিছু করার ছিল না।
মা আমেরিকা যাবার পর অন্তু আমাকে বাজার করে রান্না করে দিয়ে যেত। কিন্তু ওর সামনেও যেতে পারিনি আমি। আমি কখনও ভাবতেও পারিনি আমার বেরিয়ে থাকা হাড়গুলো দেখলে ওর কি প্রতিক্রিয়া হত। বীভৎস শতপদীর পায়ের মতো নড়তে থাকা হাড়গুলো দেখলে কি করতো ও। শুধু ও কেন, কেউই এই ব্যাপারটা সহজ ভাবে নিত না। একটা সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের পিঠের মাঝে কিছু অদ্ভুত অস্বাভাবিক হাড়। যেগুলো নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কাঁধের হাড়ের মতন যেদিকে খুশি সেইদিকে। যেগুলো বড় হচ্ছে। আরও হবে।
বন্ধুরা যেদিন এসেছিল আমি কম্বল জড়িয়ে তাদের সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। ততদিনে মাটি ছুঁয়েছে ওগুলো। ওগুলো আর উল্টো হয়ে থাকা আরশোলার পায়ের মত উঁচু হয়ে থাকে না। নামিয়ে রাখা যায়। ভাজ করে রাখা যায় পিঠের দুপাশে। কম্বলের নিচে লুকিয়ে রাখা হাড়গুলো দেখতে পায় নি ওরা। একেবারেই বুঝতে পারে নি ওদের চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা স্বাভাবিক ভাবে কম্বল জড়িয়ে থাকা মানুষটা আসলে ঠিক স্বাভাবিক নেই। তার পিঠ জুড়ে বিস্ময়করভাবে গজিয়ে উঠেছে অদ্ভুত কিছু হাড়। যেগুলোর জন্য তার বাইরের পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ শেষ করে ফেলতে হয়েছে। ঘরে বন্দী হয়ে যেতে হয়েছে। ওরা জানতে চেয়েছিল আমার যদি কিছু নাই হয়ে থাকবে তাহলে আমি কেন দুনিয়া থেকে আইসোলেটেড হয়ে যাচ্ছি।
আমি কোন উত্তর করি নি। বলেছি, কোথায় আইসোলেটেড হয়ে যাচ্ছি? এই যে তোরা আছিস। আইসোলেটেড মানুষের কি বন্ধুবান্ধব থাকে?
-তুই কিছু একটা লুকাচ্ছিস অদ্রি।
-কি লুকাবো? কিছুই লুকাচ্ছি না।
সত্যিই আমি ওদের কাছে কিছু লুকাচ্ছিলাম না। কারণ আমি নিজেই তখন জানি না কি হচ্ছে বা হতে চলেছে। নিজের অজান্তে সবার অগোচরে হয়ে চলেছে। আমি শুধু এইটুকু লুকিয়েছি যে, আমি নিজে থেকে আইসোলেটেড হয়ে যাইনি। আমাকে বাধ্য হয়ে যেতে হয়েছে। আমি আমার মেরুদন্ডে নতুন গজানো হাড়গুলো নিয়ে ওদের পৃথিবীতে থাকতে পারতাম না। ওরা কেউ মেনে নিতো না। এই হাড়গুলো সহ আমাকে ওরা কখনোই মেনে নিতো না।
আয়নায় নিজেকে দেখে কখনও চমকে উঠতাম আমি। এত সুন্দর সুঠাম দেহ আমার ছিল না। এত চওড়া বুক, এত সরু কোমর। উঁচু কাঁধ, পেশিবহুল দুটো বাহু। সুন্দর একটা দৃঢ় মজবুত শরীর। অথচ পেছনের হাড়গুলো মেলে ধরলে মাকড়সার মত মনে হত নিজেকে। আট ফুট লম্বা একেকটা হাড় ছড়িয়ে যেত পিঠের দুই পাশে। যেগুলোর ডগায় নরম রেশমের মত পালক গজাতে শুরু করেছিল।
হ্যাঁ আমি ইকারাস হয়ে গেছি। আমার আট ফুট লম্বা ডানায় পালক গজিয়েছে। নরম রেশমের মত পালক। উড়ে যাওয়া বকের পাখার মত ধবধবে সাদা। কোমল অথচ কি মজবুত। দেড়ফুট লম্বা একেকটা পালক। ছুঁয়ে দেখতাম আমি। আয়নার সামনে মেলে দেখতাম। দুইপাশে ছড়িয়ে রাখতাম বিশাল পাখির মত। আমার তখনও বিশ্বাস হত না। ছুঁলে হাতে স্পর্শ টের পাই। নাড়াতে পারি সত্যিকার পাখির ডানার মত। ঝাপটে ভারী বাতাস তৈরি করতে পারি। ইচ্ছে করলে বাতাসে ভর দিয়ে উড়ে যেতে পারি। উঠে যেতে পারি উপরে আরও উপরে। সূর্যের আলোয় ডানা খসে পড়বার ভয় নেই আমার। তবুও না। বিশ্বাস হত না।
ঈগল পাখির মত ডানা মেলে একদিন আমাকেও উড়ে যেতে হবে জানতাম আমি। বাইরের পৃথিবী থেকে অনেক দূরে কোথাও চলে যেতে হত। হয়তো কোন বিচ্ছিন্ন একলা দ্বীপে। কোন ঘন গভীর জঙ্গলে। যেখানে কেউ থাকবে না। আমাকে কারও কাছ থেকে পালিয়ে থাকতে হবে না। কম্বলে ঢেকে রাখতে হবে না আমার ডানাগুলো। মুক্ত স্বাধীন আকাশে উড়ে বেড়াব আমি। হয়ত একা। কিন্তু মুক্ত। পুরোপুরি মুক্ত।
এক পূর্ণিমার রাতে আমি প্রথম বার ওড়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমার যত দূর মনে পড়ে সেরকম এক পুর্ণিমায় আমি প্রথম সেই অদ্ভুত মৃদু অস্বস্তি টের পেয়েছিলাম। প্রতিটি পূর্ণিমায় একটু একটু করে আমি পুরোপুরি ইকারাস হয়ে গেছি। আমি আর সেই অদ্ভুত অস্বস্তি বয়ে যাওয়া সাধারণ মানুষ ছিলাম না। আমি একজন ইকারাস। গল্পের সেই ডানাওলা মানুষ। সত্যিকারের ডানাওলা মানুষ।
মাঝরাতে ছাদে উঠে যাই আমি। আকাশের চাঁদ বেশ গোল ছিল সেদিন। নরম একটা জোছনা ইলেট্রিসিটির আলোকে ছাপিয়ে পৃথিবীতে ছড়িয়ে ছিল। কাছে বা দূরে কোন জানালায়ই আলো জ্বলে ছিল না। জোছনা দেখতে শহরের মানুষ রাত জাগে না। নয়তলার ছাদের উপর ল্যাম্পপোষ্টের আলো এসে জমে থাকে না। বিশুদ্ধ জোছনায় ঢেকে ছিল ছাদের পাঁচিল। জোছনার সাদা আলোতে ছাদের মেঝেকে মাখনের মত নরম মনে হচ্ছিল আমার। বাতাসে হালকা শিশিরকণা ভেসে বেড়াচ্ছিল। শিশিরের শীতল গন্ধে আশ্চর্য রকম স্বপ্নিল মনে হচ্ছিল চারপাশ।
আমি ডানা ছড়িয়ে দেই। ছাদের মেঝেতে আমার ছায়া পড়ে। নিশাচর পাখিদের মত দেখায়। বিশাল ডানায় হয়তো জোছনা চিকচিক করে ওঠে। আমি ডানা ঝাপটাই। খুব দুরের কোন এক বহুতল বাড়ির দেওয়ালে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসে সেই ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ। তারপর আমি ছাদের পাঁচিলের উপর উঠে দাঁড়াই। নিচে রাস্তায় পাহারাদারদের হাঁটতে দেখা যায়। ওদের নিয়ে ভয় ছিল না আমার। ওরা কখনও ভুল করেও ওপরে তাকায় না। আকাশ দেখে না। জোছনার আলো গায়ে মাখে না। কখনও ঝিমুতে ঝিমুতে গলায় ঝুলতে থাকা বাঁশিতে ফুঁ দেয়। কখনও একটু হাঁটে। বুকের ভেতর থেকে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ে। ওরাও নিঃসঙ্গ। আমার মতই। রাতের অন্ধকারে ওরাও নিশাচরের মত হাঁটে।
বুক ভরে শ্বাস নিয়েছিলাম আমি। যেন নিঃশ্বাসের সঙ্গে বহুদূরের বাতাস পর্যন্ত শুষে নিয়ে ফেলি বুকের ভেতর। তারপর বাঁ পায়ে ধাক্কা দিয়ে লাফিয়ে উঠে যাই উপরে। ডানা দুটো ঝাপটাই। বাতাসের উপর ডিগবাজি খেতে খেতে ডানায় ভর দিতে চেষ্টা করি। বাতাসে ধাক্কা দিয়ে উপরে উঠতে চেষ্টা করি। বাতাস কেটে উড়ে যেতে চেষ্টা করি। প্রথমে পারিনি। নিচের দিকে পড়তে থাকি। ডানা ঝটপটিয়ে আবার উঠতে চাই। কিছুক্ষণ পরেই আমি সফল হই। বাতাসে ভর দিয়ে উপরে উঠে যেতে পারি। সাঁই করে নিচে নেমে আবার উপরে উঠে যাই আমি। আঠারো তলার একটা বিল্ডিং এর চারপাশে চক্কর কেটে ফিরে আসি। ঘন কুয়াশার মত মেঘের ভেতর দিয়ে উড়ে আসি। যত উপরে যাই বাতাস তত হালকা হয়। কুয়াশা তত ঘন হয়ে ওঠে। আমি উড়তে থাকি পৃথিবীর আকাশে প্রথম ইকারাস হয়ে।
পরদিন সুপ্তি ফোন করেছিল বেশ ভোরে।
-অ্যাই জানো আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে?
-কী হয়েছে?
-আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে।
-হঠাৎ?
-হ্যাঁ। আমি বোধ হয় সিজোফ্রেনিক হয়ে যাচ্ছি।
আমি ফিসফিস করে ষড়যন্ত্রীর মত বললাম, ঘটনা কী?
-কাল রাতে একটা স্বপ্ন দেখেছি। কিন্তু কোনভাবেই সেটাকে স্বপ্ন বলে মেনে নিতে পারছি না। এতটা বাস্তব ছিল মনে হচ্ছে যেন সত্যি সত্যি ঘটেছে। কেমন একটা ঘোরের মাঝে আছি। কিছুতেই বের হতে পারছি না।
-ইন্টারেস্টিং!
-তোমার ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে?
-আচ্ছা যাও। ইন্টারেস্টিং না। কাহিনী কী সেইটা বল।
-বলব?
-বলো শুনি।
-গল্পটা মোটামুটি এইরকম যে আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি। তখন মাঝরাত। কাল পুর্ণিমা ছিল জানো তো!
-হুঁ।
-দেখি অনেক দূর থেকে বিশাল একটা পাখি উড়ে আসছে। এত বড় পাখি আমি আগে কখনও দেখিনি।
আমি খুব আগ্রহ নিয়ে শুনছি। সুপ্তি বলল, সে ঘুরে ঘুরে আমার বারান্দার দিকে আসতে থাকে। তারপর আবিষ্কার করি সেটা কোন পাখি না। সেটা একটা ইকারাস। শরীরের গঠন অসাধারণ সুন্দর। কতটা অসাধারণ তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে দেখি। আরও কাছে এলে বুঝতে পারি সেটা আসলে তুমি।
ও একটু থামে।
তারপর বলল, তুমি আমার বারান্দার গ্রিল ধরে থেমেছো। তারপর আমার নাম ধরে ডাকলে। তারপর বললে সুপ্তি বিশ্বাস করো আমি এসেছি। তুমি আমাকে দেখতে চাইছিলে না? এই দেখো আমি। সত্যিকারের আমি। ছুঁয়ে দেখো। আমি ছুঁয়ে দেখলাম। তোমাকে ছুঁয়ে দেখলাম। তোমার উড়তে থাকা ডানা দুটো হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেখলাম। বললাম আমার বিশ্বাস হয় না। তারপর তুমি গ্রিলের ফাঁকে হাত গলিয়ে আমার হাত ধরলে। তারপর --
-তারপর?
ও চুপ করে থাকে। আমি আবার জানতে চাই, তারপর?
-আমি বলতে পারব না।
-কেন বলতে পারবে না?
-আমি আর বলব না অদ্রি।
-ঠিক আছে। আর বলতে হবে না।
আর বলতে হবে না। আর কিছুই বলতে হবে না। কখনোই বলতে হবে না। তুমি বলতে পারবে না কাউকে। যেটা আমাকে বলতে পারোনি সেটা আর কাউকে বলতে পারবে না। বললেও কেউ বিশ্বাস করবে না। গাঁজাখুরি কেউ বিশ্বাস করে না। রূপকথার গল্প কেউ বিশ্বাস করে না। সত্যি হয়ে গেলেও করে না।
আমি অদ্রিনীল পার্থ। সত্যি সত্যিই একদিন আমি আমার পরিচিত পৃথিবীকে ছেড়ে চলে এসেছি। না। আমি কারও কাছ থেকে বিদায় নেই নি। আমি যে চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছি জানাই নি কাউকেই। কেউ জানে না পৃথিবীতে সত্যিই একজন মানুষ ইকারাস হয়ে গিয়েছিল।
আই অ্যাম স্যরি সুপ্তি। তোমাকে নিয়ে মেঘের ভেতর দিয়ে উড়ে যেতে পারলাম না। রঙধনুর ভেতর ঘুরে আসতে পারলাম না। বলতে পারলাম না সেদিন তুমি ইকারাসকে সত্যিই দেখেছো। সত্যিই সেটা আমি ছিলাম। সত্যিকারের আমি ছিলাম। তুমি সিজোফ্রেনিক হয়ে যাওনি। আই অ্যাম স্যরি মা। তুমি ফিরে এলে আর আমাকে দেখতে পাবে না। কারণ আমি মানুষের পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছি। আমি আর মানুষ নেই মা। আমি ইকারাস হয়ে গেছি। মানুষ কখনও আমাকে মেনে নেবে না। তুমি চাইলেও আমাকে খুঁজে পাবে না। আমি তখন পৃথিবীর অন্য কোন প্রান্তে ডানা মেলে উড়ে বেড়াচ্ছি। সেখানে কোন মানুষ নেই। সেখানে আমাকে কেউ স্বপ্ন ভেবে উড়িয়ে দেবে না। সেখানে কেউ জানতে চাইবে না আমি কেন আইসোলেটেড হয়ে যাচ্ছি। আমি কারও কাছ থেকে বিদায় নিতে পারিনি। কারণ কেউই আমার এই নিঃশব্দ বিদায় মেনে নিত না। মানুষ এত সহজে কোন কিছু মেনে নেয় না। মানুষ কল্পনা করে ঠিকই। কিন্তু সেই কল্পনা সত্যি হয়ে গেলে মানুষ সেটা মেনে নেয় না।
হারিয়ে গিয়েও আমি রয়ে যাব শুধু সুপ্তির কল্পনায়। ও হয়তো মাঝরাতে বারান্দায় এসে দাঁড়াবে। মনের অজান্তে আকাশের দিকে তাকাবে। আমার কথা ভাববে। মনে করবে একদিন কেউ ছিল ওর জীবনে যে কখনও কল্পনা করতে ভালোবাসতো না। যে হঠাৎ নিজেকে আড়াল করে ফেলেছে। তারপর হারিয়ে গেছে চিরতরে। হয়তো মনে করবে ইকারাসকেও। কী হয়েছিল সেদিন যা সে কাউকে বলতে পারেনি। তারপর স্বপ্ন বলে উড়িয়ে দেবে। একটা সময় ও সত্যি সত্যি বিশ্বাস করে নেবে ইকারাসকে সে দেখেছিল সেটা ছিল কেবল একটা স্বপ্ন। পৃথিবীর একমাত্র ইকারাস শুধু একটা মেয়ের দেখা স্বপ্ন হয়ে বেঁচে থাকবে। কেউ জানবে না। কাউকে বলবে না মেয়েটা। কারও কৌতুহল হবে না কখনও।
পৃথিবীর মানুষ তখনও কল্পনা করবে ইকারাসকে নিয়ে। কাঁধে মাথা রেখে বলে উঠবে, মনে করো সত্যি সত্যি ইকারাস আছে। কোন এক জোছনা পুর্ণিমায় সে তার প্রেমিকার সামনে এসে দাঁড়ায়। অদ্ভুত সুন্দর শরীর তার।
হয়তো তখনও প্রশ্ন আসবে, এইসব গাঁজাখুরি বিশ্বাস করতে মন চায়?
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now