বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
তখন আমি খুব ছোট।ক্লাস ফাইভে পরি। তখন সব কিছু ভালোমতো না বুঝলেও একটা জিনিস খুব ভালোভাবে বুঝতাম আমাদের বাসায় অনেক অতিথি আসতো সেই সময় । প্রায় রোজই অতিথি আসতো।আমার আব্বা বেশ রসিক লোক।অনেক গুছিয়ে গুছিয়ে কথা বলতে পারতেন। সবার সাথে খুব অল্পতেই আসর জমাতে পারতেন আব্বা।তার এই গুনের জন্যে হয়তো অনেকেই আব্বার সাথে সময় কাটাতে আসতেন।আব্বাও কোন লোক পেলেই গল্পের আসর বসিয়ে দিতেন।আর মা কে সারা দিন রান্না ঘরে কাজ করে কাটাতে হতো।আমার সেই ব্যপারটা মোটেও ভালো লাগতো। সবসময় চেঁচামেচি লেগেই থাকতো বাসায়।তখন মনে হতো বাসা থেকে চালে যাই।দূরে গিয়ে কোন বনে একটা বাড়ি বানাই সেখানে শুধু আমি থাকবো আর থাকবে অনেক গুলো জন্তুজানোয়ার। তারা তো কথা বলতে পারে নাহ তাই তাদের নিয়ে ওতটা ঝামেলাও হবে নাহ।টারজানের মতো চারপাশে জন্তুজানোয়ার থাকবে। আমি হবো ওদের রাজা।বড় বড় হাতির পিঠি উঠে বেড়াবো সারা দিন।খিদে লাগলে গাছ থেকে ফল ছিড়ে আনবে বানরের দল।আহ!কত আরাম সেখানে।বিশেষ করে ঘুমানোর আগে এমন ভাবনাগুলো মাথায় ঘুরপাক খেত লাঠিমের মতো।
আমি তখন অষ্টম শ্রেনিতে উঠেছি সবে মাত্র হাঠাৎ আব্বার একটা বড় এক্সিডেন্ট হয়। তখন আব্বার একটা অপারেশন করাতে হয়, তাতে অনেক টাকা খরচ হয়।আব্বা ছোট একটা ব্যাবসা করতেন।যা রোজগার করতেন তার প্রায় সবটাই খরচ হতো সংসারে। মায়ের জোরাজোরিতে আব্বা কিছু টাকা জমিয়ে ব্যাংকে রেখেছিলেন, সেই টাকা দিয়ে আব্বার অপারেশনটা করানো হয়। যে টাকা টুকু জমা ছিলো তার প্রায় সবটাই খরচ হয় বাবার পিছনে।
তখন একটা প্রশ্ন দাড়িয়েছিলো সংসার চলবে কি করে?আব্বা তিন মাস মেডিকেলে ছিলো। কিভাবে সংসার চলেছে তা এক মাত্র আম্মায় জানে।থাক সে কথা।
তিন মাস পর সুস্হ হয়ে আব্বা বাসায় আসেন।ঘরে খাবার নাই হাতে টাকাও নাই। আব্বা কোন উপায় না দেখে লজ্জার মাথা খেয়ে তার সব চাইতে কাছের বন্ধু যিনি প্রায় আমাদের বাসায় আসতেন সেই সেলিম চাচার কাছে আব্বা কিছু টাকা ধার চাইলেন।সেদিন আমি খুব অবাক হয়েছিলাম তার সাথে প্রচন্ড রাগও হয়েছিলাম যে সেলিম চাচাকে আব্বা নিজের ছোট ভাইয়ের মতো দেখতো, সেই সেলিম চাচা টাকা ধার দিতে অস্বীকার করলো।কিন্তু আব্বাকে দেখলাম তিনি শান্তই আছেন।কিভাবে আব্বা শান্ত আছেন সেদিন আমার মাথায় তা ঢুকে নি। অবশেষে গ্রামের জমি বিক্রি করে সেই বার কোন মতো বেচে গিয়েছিলাম আমরা।
আব্বা পুরাপুরি সুস্থ হতে সময় লাগে ছয় মাস। একটা ব্যাপার লক্ষ করলাম খুব করে এতদিন যারা আব্বার কাছে আসতো গল্প করতো আব্বার পাশে সব সময় থাকতো সে লোক গুলা আর আসে নাহ।কেন আসে নাহ?তার কোন কারন খুঁজে পাই নাই।হঠাৎ করে যেন সবাই পাল্টে গেলো।সেলিম চাচা,মকবুল চাচা,মিঠু মামা,আজিজ চাচা কেউ আর আমাদের বাসার ত্রিসীমানার মধ্যেই আসে নাহ।আব্বা সারাদিন একাই একাই বসে থাকে,কখনো বই পড়েন কখনো লেখেন কখনো বা উদাস হয়ে আকাশের দিকে তাকাই থাকেন।হয়তো নিসংঙ্গতা ঘিরে ধরে তাই এমন টা করেন।
আব্বা পুরাপুরি সুস্থ হয় আবার দোকানে যাওয়া শুরু করেন। এক মাসের মধ্যে আবারও আমাদের সবকিছু আগের মতো হয়ে যায়।দেখতে দেখতে আমার জেএসছি পরিক্ষা শুরু হয়। প্রথম পরিক্ষার দিন আব্বা চকচকা ১০০ টাকার একটা নোট দিছিলো।সেই ১০০ টাকা এখনো খরচ করিনি।রেখে দিয়েছি যত্নকরে।কারন সেই ১০০ টাকা ছিলো আমার জন্যে দোয়া স্বরুপ।
পরিক্ষার রেজাল্ট বের হলো।আমি জিপিয়ে ফাইভ পেয়েছি।আব্বার খুশি দেখে কে?আজ নিজেকে ধন্য মনে হচ্ছে বাবার জন্যে কিছু করতে পরে। আমার রেজাল্ট শুনে মিষ্টির ব্যাগ নিয়ে ছুটে এলেন সেলিম চাচা তার পর এলেন মিঠু মামা।এসেই আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন সাব্বাস বেটা। আপ্যায়নের কোন ত্রুটি হলো না তাদের।দই মিষ্টি আর নানান ফলে টেবিল ভরা।খাওয়ার মাঝখানে মিঠু মামা বলে উঠলো,ভাইজান আপনি অসুস্থ হওয়ার পর ঢাকা থেকে আর আসা হয়নি।বুঝেনি তো হাতে টাকা কড়ি নেই,তাতে সংসারের চাপ সব মিলে আর এই দিকে আসা হয়নি।আব্বা মুচকি হেসে বললেন,এসেই বা কি করতে,তুমি তো আর ডাক্তার নও।আব্বার কথা শুনে সবাই হো হো করে হেসে উঠলো। আব্বার কথা শুনে সেদিন রাগ উঠেছিলো। যে লোকগুলো বিপদে এগিয়ে না এসে পালিয়ে থাকলো সেই লোক গুলোকে আব্বা আবার আপন করে নিলেন?
আবারো শুরু হলো সেই আগের আড্ডার আসর।এক এক করে আবার যোগ দিলেন মকবুল চাচা,আজিজ চাচা।এখন প্রায় সবাই আমাদের বাসায় আড্ডা দেন।একদিন ভোরবেলা হাফাতে হাফাতে এলেন সেলিম চাচা।এসে আব্বার কাছে গিয়ে বললেন তিনার মা খুব অসুস্হ, হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে,এদিকে সেলিম চাচার কাছে টাকাও নেই তাই এসেছে আব্বার কাছে।আব্বা তাড়াহুড়ো করে আলমারি থেকে পাঁচ হাজার টাকা বের করে দিলেন। টাকা নিয়ে সেলিম চাচা একপ্রকার দৌড়াতে দৌড়াতে চলে গেলেন। বাবা আবার সুয়ে পরলেন।সেই দিন আমার প্রচন্ড রাগ হয়েছিলো।যেই লোকটা আব্বার বিপদে সামান্য কটা টাকা ধার দিতে অস্বীকার করে আব্বা সেই লোক কে এত সহজে কিভাবে এতগুলো টাকা দেয়।মাথায় আসে নাহ আমার!।
প্রচন্ড রাগে আমি সারাদিন না খেয়েই কাটিয়ে দিলাম।সন্ধ্যায় বারান্দায় বসে আছি।আজ সারা আকাশ জুড়ে থালার মতো একটা বড় চাদ উঠেছে।সেই চাদের জোৎস্নায় চারদিক থকথক করছে।আমাদের উঠোন জুড়ে ঝরে পরছে জোৎস্না।ঝিরঝির হাওয়া দিচ্ছে,আমি বসে বসে চাদ দেখছি আর তারা গুনার ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালাচ্ছি।এমন সময় দেখলাম আব্বা আসছে,আমি দেখেও না দেখার ভান করে রইলাম।আব্বার এসে ঠিক আমার পাশে বসে পরলেন।আমি কোন কথাই বলছি না। আব্বা আমার দিকে না তাকিয়েই বললো,
কি রে মন খারাপ?
আমি কোন উত্তর দিলাম না।
আব্বা আমার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললো কষ্ট চেপে রাখলে কষ্ট আরো বাড়ে।কষ্ট ঝেড়ে ফেলতে হয় তাহলে কষ্ট হালকা হয়।
মানুষ খুব স্বার্থপর আব্বা।
আমার মুখে এমন কথা শুনে আব্বা একটু অবাক হলেন নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন,বোকা ছেলে মানুষ কখনও স্বার্থপর হয় না স্বার্থপর হয় মানুষের চাহিদা গুলা। পৃথিবীর সব মানুষই সুন্দর,তাদের সবার একটা করে সুন্দর মন থাকে দেখ, যখন কোন শিশু জন্ম নেয় তখন তার মাঝে কোন স্বার্থ থাকে না,ধীরে ধীরে সে বড় হয় বড় হয়ে উঠে তার চাহিদাগুলো আর সেই স্বার্থপর চাহিদা গুলো এক সময় পেয়ে বসে।
আব্বার এমন কথাগুলো আমার কেমন জানি লাগে,মনে হচ্ছে আব্বা আমাদের চাইতে তিনার আড্ডাকে বেশি প্রাধান্য দেন।
একবুক নিশ্বাস ছেড়ে আব্বা বলতে শুরু করলো
জানি তোর মন খারাপ হয় এত এত লোক বাসায় সব সময় থাকে,তোর এটা ভালোলাগেনা এটা বুঝি।অতিথিরা তো অতিথি ওরা শুধু সুসময়েই পাশে থাকবে তাইতো তাদের অতিথি বলা হয়।আব্বার আমায় তার বুকের কাছে টেনে নিলেন।তার কথাটা বুঝতে না পারলেও মনে শান্তি লাগছে অন্য রকম শান্তি আমিও আব্বাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছি।
আব্বা মারা গেছে বছর তিন হলো। আমার বড় ছেলে রিয়াদ সকাল থেকে মন খারাপ করে বসে আছে আর তার মন খারাপের কারন বাসায় এত এত লোক জনের আনাগোনা। রিয়াদ কে দেখে মনে পরলো সেই আব্বার কথা। মুচকি হাসি দিয়ে আব্বার চাদরটা গায়ে জড়িয়ে রিয়াদের রুমে গেলাম,তকেও বুঝাতে হবে যে ভাবে আব্বা বুঝিয়েছিলেন আমায়।
#অতিথি
~নাইম ইসলাম অভ্র
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now