বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
তাঁরা চলে যাবার পর পাশের বাড়ি অনেক দিন খালি পড়ে রইল। আমার বেশ কিছুদিন খুব মন-খারাপ গেল। অল্প বয়সের মন-খারাপ দীর্ঘস্থায়ী হয় না। আমার বেলায়ও হল না। তা ছাড়া মন-খারাপ ভাব কাটানোর মতো একটা রহস্যময় ঘটনাও ঘটল। একদিন খুব ভোরে দুজন বিচিত্ৰদৰ্শন লোক কোদাল নিয়ে পারুল আপাদের ঘরে ঢুকল। তারা নাকি কবর খোঁড়ার লোক। ভেতরের দিকের উঠানে তারা কবর খুঁড়তে শুরু করল। এই ঘটনা শুধু যে শিশুদের মনে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করল তা নয়, বড়রাও অস্বস্তি বোধ করতে লাগলেন। আমার মার ধারণা হল ভদ্রলোক তার কোনো-এক মেয়েকে মেরে ফেলেছেন। এখন গোপন কবর দিয়ে দেয়া হচ্ছে। বাবা মাকে ধমক দিলেন–এইসব অদ্ভুত ধারণা তুমি পাও কোথায়? নিশ্চয়ই অন্য কোনো ব্যাপার।
আসলেই অন্য ব্যাপার, তবে কম রোমাঞ্চকর না। ওভারশিয়ার কাকুর পকেট থেকে একশো টাকা চুরি করেছে তার পিওন। অথচ সে তা স্বীকার করছে না। কবর খোঁড়া হচ্ছে সেই কারণেই। পিওন একটা কোরান শরিফ হাতে নিয়ে কবরে নামবে এবং কোরান শরিফ হাতে নিয়ে বলবে-সে টাকা নেয়নি। যদি সে মিথ্যা কথা বলে তা হলে আর কবর থেকে উঠতে পারবে না। কবর তাকে আটকে ফেলবে।
সেই ভয়াবহ দৃশ্য দেখার জন্য আমরা দল বেঁধে কবরের চারপাশে দাঁড়ালাম। দরিদ্র পিওন হাতে কোরান শরিফ নিয়ে কবরে নামল। সে থরথর করে কাঁপছে। গা দিয়ে ঘাম ঝরছে। তাকে দেখাচ্ছে পাগলের মতো। ওভারশিয়ার কাকু বললেন-এই, তুই টাকা চুরি করেছিস?
জে না।
সত্যি কথা বল। মিথা বললে কবরে আটকে যাবি।
টাকা চুরি করি নাই স্যার।
তোর হাতে কোরান শরিফ, তুই কবরে দাঁড়িয়ে আছিস-মিথ্যা বললে আর উঠতে পারবি না।
তখন এক ভয়াবহ দৃশ্যের অবতারণা হল। পিওনের হাত থেকে কোরান শরিফ পড়ে গেল। সে জ্ঞান হারিয়ে কবরের ভেতর পড়ে গেল।
ওভারশিয়ার কাকু বিজয়ীর ভঙ্গিতে বললেন, বলছিলাম না, টাকা এই হারামজাদাই নিয়েছে!
কবর বন্ধ করা হল, কিন্তু পুরোপুরি বন্ধ করা হল না। বিশাল একটা গর্তের মতো হয়ে রইল, যে-গর্তের দিকে তাকালেই ভয় ভয় লাগত। এ ছাড়াও আরও সব ভয়াবহ খবর কানে আসতে লাগল-যেমন, গভীর রাতে নাকি এই কবরের ভেতর থেকে ভারী গলায় কে ডাকে-আয় আয়। একবার কবর খোঁড়া হয়ে গেলে কাউকে-না-কাউকে সেখানে যেতে হয়। কবর তার উদর পূর্ণ করবার জন্য মানুষকে ডাকে।
আমি পারুল আপাদের বাড়ি যাওয়া ছেড়ে দিলাম। কী দরকার ঐ ভুতুড়ে বাড়িতে যাবার? পারুল আপার সঙ্গে যোগাযোগও কমে গেল, কারণ তার স্কুলের খাতায় একটি প্রেমপত্র পাওয়া গেছে। সম্বোধনহীন সেই প্রেমপত্রে তিনি একজনকে অনুরোধ করেছেন তাঁকে চুমু খাবার জন্যে। কেন জানি আমার মনে হয় ঐ প্রেমপত্রটি তিনি আমাকেই লিখেছিলেন। কারণ আমি ছাড়া অন্য কোনো ছেলের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ ছিল না। এবং একবার তাকে চুমু খাবার জন্যে লাজুক গলায় আমাকে অনুরোধও করেছিলেন। আমি এই অদ্ভুত প্রস্তাবে হেসে ওঠায় খুব লজ্জাও পেয়েছিলেন। তার স্কুলে যাওয়া বন্ধ। জানালার শিক ধরে মাঝে মাঝে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। আমাকে দেখলেই তিনি চিকন গলায় ডাকেন। আমি পালিয়ে যাই। তার বাবা-মা তাকে বন্দি করে রাখায় আমি একধরনের স্বস্তি বোধ করি। এখন আমাকে বিরক্ত করার সুযোগ তার নেই। পারুল আপার বন্দিজীবন আমাকে বেশিদিন দেখতে হয়নি। তারা মীরাবাজারের বাসা বদলে কোথায় যেন চলে গেলেন। হারিয়ে গেলেন পুরোপুরি।
মানুষ দ্বিতীয়বার শৈশবে ফিরে যেতে পারে না। পারা গেলে আমি অবশ্যই এই অসহায় অভিমানী, দুখি কিশোরীর পাশে গিয়ে দাঁড়াতাম। আজ তিনি কোথায় আছেন, কীভাবে আছেন, আমি জানি না। শুধু প্রার্থনা করি—যেখানেই থাকুন যেন সুখ তাকে ঘিরে থাকে। পৃথিবী ও মানুষের কাছে সুখ তার প্রাপ্য।
( সমাপ্ত)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now