বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
ক্লাশ থ্রি তে যখন ছিলাম, তখন আমার ক্লাশ রোল ছিলো দুই। পঞ্চম শ্রেণির বড় আপুরা আমায় স্নেহ করতো খুব। হ্যাঁ, শুধু আপুরাই স্নেহ করতো। আমি যেমন রোগা ছিলাম, তেমন বেঁটেও ছিলাম। মনে আছে, আমার সাইজ দেখে স্কুল থেকে আমাকে দুইবার ঘুরিয়ে পাঠিয়েছিলো। ভর্তি নেয়নি। তৃতীয়বারের বেলায় ভর্তি হতে পেরেছিলাম। ছোট সাইজ আর ভালো স্টুডেন্ট হওয়ায় স্কুলের বড় আপুরা খুব স্নেহ করতো আমায়। স্কুলের ফাইনাল পরীক্ষা শেষে সেবার সোনা-মসজিদে পিকনিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো। মিনু সে পিকনিকে যায়নি, আমি গিয়েছিলাম। বাসে চড়ে জায়গা পাইনি। যা একটু-আধটু পেলাম, ফাইভের ছেলেরা ধাক্কা দিয়ে উঠিয়ে দিয়ে নিজেরা বসে গেলো, নয়তো তাদের চেনাজানা কাউকে বসিয়ে দিলো। আমি অসহায় মুখে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার সেই অসহায় মুখ দেখে ফাইভের আপুরা আমার প্রতি মায়া দেখালো। তাদের কোলে বসেই আমি পিকনিকে গেলাম। পিকনিক থেকে ফেরার পথে আগেভাগেই পিছনের দিকে সিট দখল করে নিয়েছিলাম। কিন্তু কী যেন একটা প্রয়োজনে আবার আমাকে বাস থেকে নামতে হয়েছিলো। কারো উপদেশে নিজের নাম লেখা রুমালটা সেই সিটে রেখে নেমেছিলাম কেউ যেন সেখানে না বসে। ফিরে এসে দেখি সেই সিটে কুচকুচে কালো রঙের আর দাঁত বড় বড় একটা ছেলে বসে আছে। শুরু করে দিলাম মারামারি। ভালোমতোই মার খেলাম। সিট ছেড়ে দিতে হলো। বাসের মধ্যে দুইদিকের সিটের মধ্যখানে যে ফাঁকা জায়গা থাকে, সেখানে একটা ছোট্ট টুল পেলাম, সেই টুলে বসেই বাড়ি ফিরলাম। রুমালটা আর পাওয়া গেলো না। পরে শুনেছিলাম সেই টুলে বসে পাশের সিটে মাথা হেলান দিয়ে আমি নাকি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। পাশের সিটে ছিলো আমাদের ক্লাশের এক সুন্দরী। সেও নাকি ঘুমিয়ে গিয়েছিলো। ঘুমের মধ্যে আমরা দুজনে নাকি.....!
ক্লাশ ফোরে আমার রোল হলো এক। দাঁত বড় বড়, আর কালো রঙের ছেলেটা আমার এক ক্লাশ বড় ছিলো। সে ফেইল করলো এবং আমরা হলাম একই ক্লাশে। দীপু নাম্বার টু-তে দীপু আর তারিকের যেমন বন্ধুত্ব হয়েছিলো, সেই ছেলেটার সাথেও আমার ভালো বন্ধুত্ব হলো। ছেলেটার নাম অসীম। অসীমের সাথে বন্ধুত্ব হবার পরে ওর দৌলতে আরো কিছু ফেল্টুসের সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়ে গেলো। তারা হলো ইব্রাহিম (ইবু), হালিমা আর আতিয়া। তাদের সবার বাড়ি ছিলো এক জায়গায়, পাশাপাশি। অসীমের বাড়ি প্রথমদিন যেদিন গেলাম, সেদিন জানলাম অসীম আমার মামা বা কাকা টাইপ কেউ হয়। অসীমের খালার সাথে আমার দাদার সৎ ভাইয়ের নাকি বিয়ে হয়েছিলো। পরে অবশ্যি ছাড়াছাড়ি হয়ে গিয়েছিলো। সম্পর্ক যখন গড়ে উঠলো অসীমের বাড়ি যাওয়া হতে লাগলো বেশি বেশি। কীরকম একটা সময় কেটেছিলো তখন! সবাই আমাদের বন্ধুত্ব দেখে অবাক হতো। আমি ছিলাম ক্লাশে ফার্স্ট, আর আমার বন্ধুরা সবাই ছিলো ফেল্টুস। বন্ধুরা বলতে ইবু আর অসীমই বন্ধু ছিলো। আতিয়া আর হালিমাকে আমি পছন্দ করতাম না। ওরা খুব ঝগড়াটে ছিলো আর অপরিষ্কার পোশাক পরতো। অপরিচ্ছন্নতা আমার দারুণ অপছন্দ।
ফেল্টুসগুলোর মধ্যে মেয়ে দুজনের বিয়ে হয়ে বাচ্চাকাচ্চাও হয়ে গেছে শুনেছিলাম। অসীম পরিবারের হাল ধরেছে, সে এখন রাজমিস্ত্রিতে কাজ করে। ইবুর খবর জানি না। ক্লাশ ফাইভের পরে অসীম, ইবু কারো সাথেই আর দেখাটেখা তেমন একটা হয়না। কখনো হঠাৎ রাস্তায় দেখা হয়। ব্যস্ততার মাঝে কথাটা আর হয়ে উঠেনা।
ছোট বেলায় আসলে তখন ছেলে-মেয়ে আলাদা আলাদা, এমন বোধ ছিলো না। সুন্দর-অসুন্দর বোধ ছিলো না। তখন আমাদের বাড়িতে টিভি ছিলো না, স্মার্টফোনতো ছিলোই না। নাটক, সিনেমা তখনো দেখতে শিখিনি, বুঝিনি কিছুই। প্রেম তো নয়ই। বিয়ে বাদে ছেলে-মেয়ের আর কোনো সম্পর্ক, মানে প্রেম হতে পারে এমন ধারণা ছিলো না। ছেলে-মেয়ে সবার সাথেই খেলতাম। ফুফাতো বোন ছিলো পাঁচজন। বড় ফুফুর তিন মেয়ে, শাপলা আপু, সুমি আর সীমা, মেজো ফুফুর মেয়ে নিশা, ছোট ফুফুর নেয়ে মৌসুমী আপু। মৌসুমী আপুকে ডাকতাম টুকি আপা বলে। টুকি আপা, নিশা, শাপলা আপার বিয়ে হয়ে গেছে। ওরা এখন শশুরবাড়ির বাসিন্দা। সুমি-সীমা আসেনা আর। আসলেও কখনো কথাটথা হয়না। মাঝেমধ্যে কখনো ফুফুরা আসে।
যখন ছোট ছিলাম তখন সপ্তাহে একদিন-দু’দিন করে একবেলার জন্য হলেও ফুফুরা আসতো। কাছাকাছিই বাড়ি সবার। ফুফাতো ভাইবোনদের সাথে আমরা চাচাতো ভাইয়েরা রান্নাবাটি খেলতাম, আরো মেয়েলি যেসব খেলা আছে, খেলতাম সব। ফুফাতো ভাইবোন সাতজন, আর আমরা চাচাতো ভাইয়েরা পাঁচজন, বারোজন একসাথে হলে সবসময় কী যে হুল্লোড়ে মেতে থাকতাম! অবশ্য লিটু ভাইয়া আর শাহীন ভাইয়া আমাদের সাথে খেলতো না। তারা বড় ছিলো তো, তাইই। তাদের মধ্যে বোধহয় তখন ছেলে-মেয়ের ভিন্নতা ব্যাপারটা ঢুঁকে গিয়েছিলো। যেদিন সব ফুফুরা আসতো একসাথে, সেদিন বাড়িতে ঈদ লেগে যেতো। আমরা খেলে বেড়াতাম। বাড়ির বড় বড় মোরগ ধরে জবাই করে রান্না করা হতো। বিকেলে বিভিন্ন রকমের ক্ষীর, পিঠা বানানো হতো। এ ঈদ নয়তো কী?
বাড়ির পেছনে আমাদের একটা জায়গা ছিলো। তিনটা কাঁঠাল গাছ, একটা নিম গাছ, আর কয়েকটা সজনে গাছ ছিলো সেখানে। জায়গাটাকে আমরা বলতাম কাঁঠালতলা। কাঁঠালতলায় আমরা পাড়ার ছেলেমেয়েরা দাঁড়িয়াবান্ধা খেলতাম। দাঁড়িয়াবান্ধা খেলার স্থানীয় নাম আমাদের এলাকায় বদ্দি। কেউ কেউ বদ্দনও বলে। যেদিন কোনো কারণে খেলার জন্য তেমন কাউকে পেতাম না সেদিন পাঁচটা গুঁটি নিয়ে একটা খেলা আছে, ওটা খেলতাম। মেয়েলী খেলা। ছেলেরা কেউ খেলতো না ওটা। আমি, ইতি, আর মোস্তারি খেলতাম। মোস্তারি ছোট্ট একটা মেয়ে হয়েও এতো ভালো খেলতো, আমি কখনোই পারতাম না ওকে।
খেলাধূলার মধ্যে লুকোচুরি, দাঁড়িয়াবান্ধা, গুলি, লাটিম, ক্রিকেট, ফুটবল, শীতে ব্যাডমিন্টন, এবং স্থানীয় নামের আরো অনেক ধরনের খেলাধূলায় মেতে থাকতাম। খেলাধূলার চেয়ে যেটা সবচেয়ে বেশি করতাম আমি, সেটা পড়াশোনা। মাকে এতোটাই ভয় পেতাম যে আমার দিকে একটু কড়া চোখে তাকালেই আমি সব ছেড়েছুড়ে হাত-পা ধূয়ে বই নিয়ে পড়তে বসে যেতাম। পড়তে যে খারাপ লাগতো তা না। যতোদিন সম্ভব ছিলো, বই পাওয়ার প্রথম দিনেই গোটা বই পড়ে ফেলতাম। খুবই ভালো লাগতো পড়তে। তবে, খেলাধূলার আশাপাশে কি পড়াশোনা যায় কখনো? খেলাধূলা করতে করতে যখন মাগরিব হয়ে যেতো, তখন যেন খেলাটা একটু বেশি জমে উঠতো। সেই সময়ে খেলা ছেড়ে পড়াশোনা করাটা কি আর ভালো লাগে? যেদিন অমন দেরি করে ফেলতাম, সেদিন মা বিনা নোটিশেই কঞ্চি নিয়ে বের হতো। ইস! মায়ের কাছে কতো মাইর যে খেয়েছি ছেলেবেলায়!
***আরও একটু...
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now