বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

মাউন্ট আরারাতের আড়ালে চ্যাপ্টার- ৩

"সাইমুম সিরিজ" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X ৩ স্বপ্ন দেখছিল আহমদ মুসা। দেখছিল, দু’জন মুখোশধারী লোক ড. আজদাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল। ড. আজদা প্রাণপণে ‘স্যার’, ‘স্যার’ বলে চিৎকার করছিল। ‘দাঁড়াও’, ‘দাঁড়াও’ বলে ঘুমের মধ্যেই উঠে বসেছে আহমদ মুসা। ঘুম ভেঙে গেল তার। স্বপ্ন নয়, এবার বাস্তবেও ড. আজদার ‘স্যার’, ‘স্যার’ চিৎকার শুনতে পেল সে। একদম তার দরজার সামনে। মনে হচ্ছে, কেউ তাকে তার দরজার সামনে থেকেই ধরে নিয়ে যাচ্ছে। আঙ্কারা থেকে বিদায়ের সময় জেনারেল মোস্তফার দেয়া লেটেস্ট ভার্শন এম-১০ মেশিন রিভলভারটি বালিশের তলা থেকে বের করে হাতে নিয়ে জ্যাকেটটা গায়ে চাপিয়ে লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নামল সে। ডান হাতে রিভলভার বাগিয়ে ধরে বাম হাত দিয়ে দরজার নব ঘুরিয়ে এক ঝটকায় খুলে ফেলল দরজা। আহমদ মুসা দেখতে পেল, তার দরজা সোজা করিডোর দিয়ে দু’জন মুখোশধারী টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে ড. আজদা আয়েশাকে। আহমদ মুসা ওদিকে এগিয়ে যাবার জন্যে পা বাড়িয়েছে এমন সময় বাঁ দিক থেকে একটা ধাতব শব্দে সেদিকে ফিরে তাকাল। দেখল, তার দিকে রিভলভার তুলেছে একজন মুখোশধারী সন্ত্রাসী। তার রিভলভারের সেফটি ফ্ল্যাসপপিন তোলারই শব্দ পেয়েছে সে। তার মানে গুলি আসছে। চিন্তার মতই দ্রুত আহমদ মুসা বাম দিকে ফ্লোরের ওপর নিজেকে ছুঁড়ে দিয়েছিল। গুলিটা যেন তার ডান কাঁধ ছুঁয়েই বেরিয়ে গেল। মুহূর্ত সময়ের দূরত্বে মাথাটা বেঁচে গেল আহমদ মুসার। আহমদ মুসার দেহটা মাটি স্পর্শ করার আগেই তার ডান হাতের এম-১০ রিভলভার গুলি করেছিল সন্ত্রাসীকে লক্ষ্য করে যাতে সে দ্বিতীয় গুলি করার সুযোগ না পায়। তার পাশেই আরেকজন সন্ত্রাসী দাঁড়িয়েছিল। তার রিভলভার তাক করেছিল কয়েকজন ভীতসন্ত্রস্ত নারী-পুরুষকে। তারা ড. আজদার ফুপি, ফুপা, মামা ও মামাতো ভাই-বোনরা হবেন। ড. আজদার পিতা ইঞ্জিনিয়ার নাফী আগা বারজানী এবং মাতা লায়লা আজদা বারজানী থাকেন সোভিয়েত ইউনিয়নে দীর্ঘদিন ধরে। সোভিয়েত রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানীর তিনি একজন শীর্ষ ইঞ্জিনিয়ার। শোনা যায়, তারা কমিউনিস্ট পার্টি করেন। আহমদ মুসা দেহটা মাটিতে পড়ার পর দ্বিতীয় গুলিটা করল দ্বিতীয় সন্ত্রাসীকে লক্ষ্য করে। সন্ত্রাসীও রিভলভার উঁচিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল আহমদ মুসার দিকে। কিন্তু তার গুলি করার সুযোগ হলো না। তার আগেই বুকে গুলি খেয়ে ভূমি শয্যা নিল। যে দু’জন সন্ত্রাসী ড. আজদাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল, তারা ড. আজদাকে ছেড়ে দিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। তাদের দু’জনের রিভলভারই তাক করেছে আহমদ মুসাকে। আহমদ মুসা ঘুরে ওদের তাক করার আগেই ওদের রিভলভার থেকে গুলি শুরু হলো। আহমদ মুসা ফুটবলের মত দ্রুত গড়িয়ে গুলি যে দিক থেকে আসছে, সেদিকেই এগোলো। ঐদিকেই লাউঞ্জের পাশে করিডোরের প্যারালালে একটা পিলার রয়েছে। পিলারটাই আহমদ মুসার টার্গেট। পিলারের আড়ালে গিয়ে উঠে দাঁড়াল আহমদ মুসা। ওদের গুলি বন্ধ হয়নি। ওরা গুলি চালাতে চালাতেই এগিয়ে আসছে। কাছে এসে দু’দিক থেকে তাকে টার্গেট করার আগেই ওদের ঠেকাতে হবে, ভাবল আহমদ মুসা আহমদ মুসা মুহূর্তকাল স্থির হয়ে দাঁড়ানোর পর দু’পাশের গুলির রেঞ্জ দেখে নিয়ে তার এম-১০ মেশিন রিভলভারের অটোমেটিক ফ্ল্যাসপপিন অন করে ওদের গুলির রেঞ্জ থেকে রিভলভারটা ওপরে তুলে ওদের গুলির শব্দ লক্ষ্যে রিভলভারের নল কৌণিক এ্যাংগেলে স্থির করে ট্রিগার চেপে ধরল তর্জনী দিয়ে। রিভলভার থেকে অব্যাহত গুলির ঝাঁক বেরিয়ে যেতে লাগল। নির্দিষ্ট বৃত্তের মধ্যে তার রিভলভারের নল ঘুরতে লাগল। মাত্র কয়েক সেকেন্ড। ওদের গুলি থেমে গেল। চকিতে উঁকি দিয়ে ওদিকে তাকাল আহমদ মুসা। দেখল, দু’জন রিভলভারধারী মেঝেতে গড়িয়ে গড়িয়ে পেছন দিকে সরে যাচ্ছে। ওরা আহত হয়েছে মনে হলো। কিন্তু ড. আজদাকে দেখতে পেল না আহমদ মুসা। এদিকে নিশ্চয় আসেনি। তাহলে? চমকে উঠল আহমদ মুসা। তাহলে কি আরও সন্ত্রাসী ছিল? তারা ড. আজদাকে নিয়ে গেছে! আর ভাবতে পারল না আহমদ মুসা। সে গুলি করতে করতেই এগোলো গড়িয়ে চলা ওই দু’জনের দিকে। ওদিক দিয়েই বাইরে বেরুবার পথ। এ সময় ড. আজদার মামা ও ফুপারা ছুটে এল। ওরা চিৎকার করে বলল, ‘দু’জন সন্ত্রাসী ড. আজদার মুখ চেপে ধরে বের করে নিয়ে গেছে এই মাত্র।’ আহমদ মুসা ছুটল বাইরে বেরুবার জন্যে। সন্ত্রাসী দু’জনের দেহ লাফ দিয়ে ডিঙানোর সময় দেখল, দু’জনের দেহই ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। বেরিয়ে এল আহমদ মুসা। বাইরের বারান্দায় এসে পৌঁছতেই দেখতে পেল, একটা গাড়ি দ্রুত চলে যাচ্ছে। চিৎকার শুনতে পেল ড. আজদার। উপায় নেই দৌঁড়ে গিয়ে গাড়িকে ধরার। রিভলভার তুলল আহমদ মুসা। অটোমেটিক ফ্ল্যাসপপিন অন করাই ছিল। ট্রিগার চাপল আহমদ মুসা। বসে পড়ে মাটির এক ফুট উঁচু দিয়ে মাটির সমান্তরালে গুলি ছুঁড়েছিল আহমদ মুসা। পেছন থেকে মাইক্রোর টায়ারে গুলি লাগানো খুব কঠিন। তবু তাড়াহুড়োর মধ্যে যা করেছে, এর বেশি কিছু করা যেত না। আল্লাহ ভরসা। ভরসা ব্যর্থ হলো না। মুহূর্তের ব্যবধান। টায়ার ফাটার বিকট একটা শব্দ হলো। ছুটল আহমদ মুসা গাড়ির দিকে। গাড়িটির গতি বেশি ছিল না। তাই টায়ার ফাটার পর গাড়িটি কয়েকগজ গিয়ে থেমে গেল। আহমদ মুসা গাড়ির কাছে পৌঁছার আগেই মাইক্রোর দু’পাশের দরজা খুলে তিনজন বেরিয়ে এল। এপাশে নেমেছিল দু’জন। দু’জনের হাতে দু’টি স্টেনগান। তারা নেমেই আহমদ মুসার দিকে একবার তাকিয়ে স্টেনগান তুলল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে। কিন্তু আহমদ মুসা তার লেটেস্ট মডেলের এম-১০ মেশিন রিভলভার বাগিয়ে ধরেই দৌঁড়াচ্ছিল। শুধু ট্রিগার টিপতেই এক ঝাঁক গুলি গিয়ে ঘিরে ধরল ঐ দু’জনকে। তৃতীয় জন বেরিয়েছিল ওপাশ দিয়ে। আহমদ মুসা তাকে দেখতে পায়নি। গাড়ির আড়ালে দাঁড়িয়ে আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে সে তার রিভলভার তুলেছিল। তখন গাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিল ড. আজদাও। সে দেখতে পেয়েছিল গাড়ির আড়ালে দাঁড়ানো লোকটিকে। সে লোকটির রিভলভারের লক্ষ্য দেখেই চিৎকার করে উঠেছিল, ‘গুলি, মি. আবু আব্দুল্লাহ।’ শেষ মুহূর্তেই মুখ তুলেছিল আহমদ মুসা। দেখতে পেয়েছিল লোকটির রিভলভারের নল। কিছুই করার ছিল না। কিন্তু দেহের দুর্বোধ্য সতর্কতা কোন অশরীরী নির্দেশে পলকেই দেহটাকে বাঁকিয়ে নিয়েছিল ডান দিকে। গুলিটা এসে বিদ্ধ করল আহমদ মুসার বাম বাহুকে। দেহটা একবার ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল আহমদ মুসার। যেন সে বুকেই গুলি খেয়েছে, এমন অবস্থা নিয়ে সে আছড়ে পড়ল। কয়েকবার কাতরানোর মত দেহটা এদিক-ওদিকে নড়িয়ে স্থির করে ফেলল দেহটাকে। লক্ষ্য, লোকটাকে আড়াল থেকে বের করে আনা। আহমদ মুসার গুলি খেয়ে পড়ে যাওয়া গাড়ির আড়ালে দাঁড়ানো সন্ত্রাসীও দেখেছে। সে লাফ দিয়ে গাড়ির ওপর দিয়ে এপারে এসে ড. আজদার সামনে দাঁড়াল। তার মাথায় রিভলভার ঠেকিয়ে বলল, ‘ওর মত যদি মরতে না চাও তাহলে চল। এক মুহূর্ত দেরি করলে মাথা উড়িয়ে দেব।’ ভয় ও উদ্বেগে কাঠ হয়ে যাওয়া ড. আজদা গাড়ির দিকে ঘুরে দাঁড়াল যন্ত্রচালিতের মত। আহমদ মুসা একটা গুলি করল। গুলিটা সন্ত্রাসীটির কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল। গুলির উত্তাপ যেন পেল সে। চমকে উঠে পেছনে ফিরে তাকাল সন্ত্রাসীটি। আহমদ মুসা উঠে দাঁড়িয়েছিল তখন। তার রিভলভার তাক করাই ছিল সন্ত্রাসীটির দিকে। বলল আহমদ মুসা, ‘হাতের রিভলভার ফেলে দিয়ে হাত তুলে…।’ কথা শেষ করতে পারল না আহমদ মুসা। সন্ত্রাসী লোকটির রিভলভার বিদ্যুৎ বেগে আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে ওপরে উঠল। আহমদ মুসার কথা বন্ধ হয়ে গেল এবং সাথে সাথেই তার তর্জনী রিভলভারের ট্রিগারে চেপে বসল। সন্ত্রাসী লোকটি আহমদ মুসার লক্ষ্যে রিভলভার তুলেছিল ঠিকই। কিন্তু ট্রিগার টেপার সময় হলো না। তার আগেই আহমদ মুসার রিভলভারের গুলি তার কপালে এসে বিদ্ধ হলো। লোকটির দেহ এদিক-ওদিক কয়েকবার দোল খেয়ে খসে পড়ল মাটির ওপর। ড. আজদা ছুটে এল আহমদ মুসার কাছে। আহমদ মুসার বাম বাহু রক্তে ভেসে যাচ্ছিল। ‘স্যার আপনি ভালো আছেন? একি হলো! গুলি লেগেছে আপনার?’ আর্তকণ্ঠে বলে উঠল ড. আজদা আহমদ মুসার কাছে এসে। ড. আজদার ফুপি, ফুপা, মামা সকলে ছুটে এল আহমদ মুসার কাছে। ড. আজদার ফুপি কেঁদে উঠে বলল, ‘বেটা যেন সাক্ষাৎ আল্লাহর ফেরেশতা। সে আমাদের আজদাকে আবার বাঁচাল। বাঁচাল আমাদের পরিবারকে। একি হলো তার! কেমন আছ বাছা তুমি!’ আহমদ মুসা হাতের রিভলভার পকেটে রেখে বলল, ‘আমাকে নিয়ে আপনারা ব্যস্ত হবেন না। আমার তেমন কিছুই হয়নি।’ মুখে হাসি নিয়ে বলল আহমদ মুসা। ড. আজদারা আহমদ মুসার হাস্যোজ্জ্বল মুখের দিকে তাকিয়ে স্তম্ভিত হলো। সদ্য গুলিবিদ্ধ একজন মানুষের চেহারা এমন বেদনাহীন, স্বচ্ছ ও হাসিমাখা হতে পারে না। তাহলে কি গুলি লাগেনি! রক্ত কিসের তাহলে! ওদের কারও মুখেই যেন কথা জোগাল না। আহমদ মুসাই আবার কথা বলল, ড. আজদাকে লক্ষ্য করে, ‘ড. আজদা, এখনি থানায় টেলিফোন করা দরকার।’ থানার কথা শুনতেই ড. আজদাসহ সকলের মুখে উদ্বেগ নেমে এল। বলল আজদা ভীতকণ্ঠে, ‘স্যার এতগুলো লোক মারা গেল। পুলিশ এলে কি ঘটবে স্যার! খুব ভয় করছে। গত রাতেও ওদের ব্যবহার দেখেছি।’ আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘এর মধ্যেও গত রাতের কথা আপনার মনে পড়েছে? ভাববেন না। আমি আমার রিভলভার দিয়ে ওদের সাতজনকেই হত্যা করেছি। আমি ওদের এটাই বলব।’ গম্ভীর হলো ড. আজদার মুখ। বলল, ‘তাহলে আমাদের ভাবনাই আমরা ভাবব। আপনার ভাবনা আমরা ভাবতে পারবো না।’ কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলল ড. আজদা। ‘মা আজদা ঠিকই বলেছে। আপনি আমাদের জন্যে সব করলেন নিজের জীবন বিপন্ন করে। গুলিটা আপনার বাহুতে না লেগে বিপজ্জনক কোন জায়গায় লাগতে পারতো! আপনার কথাই তো আমাদের সবার আগে ভাবতে হবে। আসুক পুলিশ।’ বলল ড. আজদার মামা ড. সাহাব নুরী। একটু থেমেই সে আবার বলল, ‘আমিই যাচ্ছি পুলিশকে টেলিফোন করতে।’ বলেই সে দ্রুত এগোলো বাড়ির দিকে। ‘পুলিশ যতক্ষণ না আসছে ততক্ষণ আমরা বাইরেই দাঁড়াব। যেখানে যা কিছু যেমন আছে, তেমনি থাকা দরকার।’ বলল আহমদ মুসা সবাইকে লক্ষ্য করে। কথা শেষ করেই আহমদ মুসা এগোলো গাড়ির পাশে পড়ে থাকা তিনটি লাশের দিকে। আহমদ মুসা নিহত তিনজনেরই জামার বোতাম খুলে বাহু পরীক্ষা করল। তারপর জামার বোতাম লাগিয়ে দিয়ে ফিরে এল ড. আজদাদের কাছে। ‘আপনি ওদের বাহুতে কি খুঁজলেন? আহত বাহু নিয়ে এসব করছেন কেন? রক্তক্ষরণ এখনও বন্ধ হয়নি।’ বলল ড. আজদার ফুপা। ড. আজদার ফুপা কামাল বারকি একজন রাজনীতিক ও ব্যবসায়ী। বিরাট সম্পত্তির মালিক। ইদানীং তিনি আংকারায় ব্যবসা করছেন। সেখানেও তিনি বাম আন্দোলনের সাথে যুক্ত। আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘পুলিশ এসে পড়লে ঐ অনুসন্ধান করা যেত না। আমি ওদের দেহে একটা চিহ্ন খোঁজ করছিলাম।’ ‘চিহ্ন? কি চিহ্ন?’ বলল ড. আজদার ফুপা কামাল বারকি। আহমদ মুসা একটু ভাবল। একটু গাম্ভীর্য নেমে এল চোখে-মুখে। বলল, ‘বড় বড় অনেক গ্যাং-এর দেহে দলীয় চিহ্ন থাকে। সেরকম কোন দলের লোক কিনা ওরা, সেটাই দেখলাম।’ ড. আজদার ফুপা কিছু বলতে যাচ্ছিল, এ সময় দু’টি হেডলাইট ড. আজদাদের বাগানের গেট পেরিয়ে দ্রুত এগিয়ে আসছিল। থেমে গেল ড. আজদার ফুপা কামাল বারকি। ‘নিশ্চয় পুলিশ আসছে।’ বলল আহমদ মুসা। পুলিশের গাড়ি এসে দাঁড়াল সন্ত্রাসীদের মাইক্রোর ঠিক পেছনেই। পুলিশের দু’টি গাড়ি। একটা জীপ, অন্যটি একটা ক্যারিয়ার। জীপ থেকে নামল লোকাল থানার অফিসার ইনচার্জ। ক্যারিয়ার থেকে লাফ দিয়ে নামল কয়েকজন পুলিশ। ড. আজদার বাড়ির সামনের লন-কাম-বাগানটিতে বিদ্যুতের ‍দু’টি খুঁটি। গোটা বাগানই আলোকিত। গাড়ি বারান্দাতেও আলো। তার ফলে বাড়ির দেয়াল সবটাই আলোতে ঝলমল করছে। মাইক্রোর একটু সামনেই দাঁড়িয়েছিল আহমদ মুসা ও ড. আজদারা। পুলিশ অফিসার গাড়ি থেকে নামলে ড. আজদা ও তার মামারা পুলিশ অফিসারের দিকে এগোতে লাগল। পুলিশ অফিসার মোস্তফা ওকালান কয়েক গজ এগিয়ে ড. আজদাদের সামনে এসে ড. আজদাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘আপনিই তো ড. আজদা, ইঞ্জিনিয়ার নাফী আগা বারজানির মেয়ে? আপনাকেই কিডন্যাপের চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে?’ ‘হ্যাঁ অফিসার।’ বলল ড. আজদা। ‘আপনার সাথে এরা কারা?’ পুলিশ অফিসার ওকালান বলল। তার চোখে সন্ধানী দৃষ্টি। ড. আজদা মামা, ফুপা সবাইকে পরিচয় করিয়ে দিল। আর আহমদ মুসাকে দেখিয়ে বলল, ‘আবু আহমদ আব্দুল্লাহ। আমার মেহমান।’ সেই সাথে ড. আজদা গত রাতে তাকে কিডন্যাপের চেষ্টার ঘটনাও বলতে গেল। ‘আমি সে ঘটনা জানি মিস বারজানি। আমাকে জোনাল পুলিশ থেকে সব জানানো হয়েছে। তাহলে আপনার এই মেহমানই গত রাতে আপনার সাথে জোনাল পুলিশ অফিসে গিয়েছিলেন?’ বলল পুলিশ অফিসার। ‘জ্বি হ্যাঁ। ঘটনার সময় চলার পথে উনিও সেখানে দাঁড়ান। ইন্সপেক্টর দারাগ সব জানেন।’ ড. আজদা বলল। ‘কালকের ঘটনা জানেন, তবে সব জানেন না। উনি তো এ এলাকার লোক নন।’ একটু থেমেই আবার বলল, ‘এখানে তিনটি লাশ আর চারটি লাশ কোথায়?’ ‘আর চারটি লাশ ভেতরে।’ বলল ড. আজদার মামা ড. সাহাব নুরী। ‘চলুন, দেখব।’ পুলিশ অফিসার বলল। ‘আসুন।’ বলল ড. সাহাব নুরী। চলার জন্যে পা তুলে পুলিশদের দিকে ফিরে তাকিয়ে বলল, ‘তোমাদের দু’জন আমার সাথে এস। আর অবশিষ্টরা বাইরে পাহারায় থাক। গাড়ি, লাশগুলো, হাতিয়ার যা যেমন যেখানে আছে তেমনই থাকবে।’ মাত্র জনাচারেক পুলিশ ছাড়া সবাই পুলিশ অফিসারের সাথে ভেতরে ঢুকে গেল। ভেতরে ঢুকে ডান পাশে ড্রইংরুম ও বাম পাশে গেস্টরুমের মাঝে করিডোরটা পেরোলেই বেশ বড় একটা লাউঞ্জ। লাউঞ্জের অন্য তিন দিক দিয়েও ঘর। আবার দু’তলায় ওঠার সিঁড়িও এই লাউঞ্জ থেকেই। সন্ত্রাসীরা পানির পাইপ বেয়ে ছাদে উঠেছিল। তারপর চিলে-কোঠার তালা ভেঙে দু’তলায় প্রবেশ করেছিল। দু’তলায় তিনটি মাস্টার বেড আছে। তার একটি থেকে ড. আজদাকে ধরে নিয়ে লাউঞ্জে নেমে পালানোর চেষ্টা করেছিল। লাউঞ্জের পূর্ব প্রান্তের গেস্টরুম থেকেই বেরিয়ে এসেছিল আহমদ মুসা। লাল কার্পেটে মোড়া লাউঞ্জটা বলতে গেলে ফাঁকাই। গুচ্ছাকারে সাজানো কয়েকটা সোফা সেট রয়েছে মাত্র। বাইরের লাশগুলো যেভাবে দেখেছে, সেভাবে এ লাশগুলোও ঘুরে ঘুরে দেখে পুলিশ অফিসার মোস্তফা ওকালান বলল, ‘এরা যদি সন্ত্রাসী হয়, তাহলে সন্ত্রাসীরা খুন হয়েছে তিন পর্যায়ে। প্রথমে লাউঞ্জে সিঁড়ির গোড়ায়, তারপর লাউঞ্জের এ প্রান্তে করিডোরের মুখে। সর্বশেষে বাইরে গাড়ির কাছে।’ কথাগুলো শেষ করেই পুলিশ অফিসার প্রশ্ন করল ড. আজদাদের দিকে চেয়ে, ‘কথিত সন্ত্রাসীরা ড. আজদাকে কিডন্যাপ করার আগে আপনারা কে কোথায় ছিলেন?’ জবাব দিল ড. আজদা। বলল, ‘দু’তলায় আমার আব্বা যে মাস্টার বেডে থাকতেন, তার কাছাকাছি ফ্যামেলি গেস্টরুমে ছিলেন আমার ফুপা-ফুপি। আমার ভাইয়ের মাস্টার বেডটায় ছিলেন আমার মামা। আমি ছিলাম আমার মাস্টার বেডে। আর নিচতলার গেস্টরুমে ছিলেন আমাদের মেহমান জনাব আবু আহমদ আব্দুল্লাহ।’ ‘কথিত সন্ত্রাসীরা আক্রান্ত হয়েছিলেন লাউঞ্জে নামার পর। তারা আক্রান্ত হয়েছিলেন নিচ থেকে। তার মানে আপনাদের মেহমান আবু আহমদ আব্দুল্লাহ ড. আজদাকে রেসকিউ করতে এগিয়েছিলেন। কিন্তু সন্ত্রাসীদের তিন পর্যায়ের যে হত্যাকাণ্ড তা তিনিই কি করেছিলেন?’ জিজ্ঞেস করল পুলিশ অফিসার মোস্তফা ওকালান। সংগে সংগে প্রশ্নের উত্তর এল না কারও কাছ থেকেই। ড. আজদা তাকাল তার মামা, ফুপা ও আহমদ মুসার দিকে। উত্তর দিল আহমদ মুসা। বলল, ‘আপনার অনুমান সত্য অফিসার। সব সন্ত্রাসীকে হত্যা আমিই করেছি।’ স্বচ্ছ, সাবলীল কণ্ঠস্বর আহমদ মুসার। ‘সন্ত্রাসীরা বোধ হয় আপনাকে দেখেই তাদের হাতের অস্ত্র ফেলে দিয়েছিল! আর সেই সুযোগে ধীরে-সুস্থে দেখে-শুনে আপনি তাদের হত্যা করেছেন।’ বলল পুলিশ অফিসার। তার কণ্ঠে বিদ্রুপের সুর। হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘এ বিষয়টা আপনারাই ভালো জানেন। ক্রিমিনালদের ডীল করাই আপনাদের প্রাত্যহিক কাজ।’ মুখটা গম্ভীর হলো পুলিশ অফিসারের। কিন্তু উত্তরে কিছু না বলে উঠে দাঁড়াল পুলিশ অফিসার। বলল দু’জন পুলিশকে লক্ষ্য করে, ‘তোমরা এই লাউঞ্জে পাহারায় থাক। সবকিছু যেমন আছে, তেমন থাকবে।’ তারপর তাকাল ড. আজদাদের দিকে। বলল, ‘আপনারা কেউ কোথাও যাবেন না। এই ঘরেই অপেক্ষা করবেন। আরারাত রিজিওন ইজডির একজন শীর্ষ পুলিশ অফিসার ‘ডাইরেক্টর অব পুলিশ’ খাল্লিকান খাচিপ এখনি এসে পড়বেন। গোটা বিষয়টা তিনিই দেখবেন। আমি এর মধ্যে বাইরেটা একটু ঘুরে দেখি।’ বলে পুলিশ অফিসার মোস্তফা ওকালান বেরিয়ে গেলেন। লাউঞ্জের দু’পাশে দু’জন পুলিশ তাদের হাতের স্টেনগান নিয়ে এ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়াল। কয়েকটা সোফায় কাছাকাছি বসে আছে ড. আজদারা। ড. আজদাদের মুখ বিষণ্ণ। তাদের কারও মুখে কোন কথা নেই। তাদের সকলের মনেই ঘটনার পরিণতি নিয়ে তোলপাড় চলছে। কিন্তু আহমদ মুসার চোখে-মুখে কোন ভাবান্তর নেই। পুলিশ অফিসার তার উদ্দেশ্যে যে তীর্যক কথাগুলো বলেছে, তাতে বরং মজাই পেয়েছে আহমদ মুসা। কিন্তু আরারাত রিজিওন ইজডির পুলিশ অফিসারের ‘খাল্লিকান খাচিপ’ নামের এই শেষ অংশ ‘খাচিপ’ তার মনে একটা ধাক্কা দিয়েছে। ‘খাল্লিকান’ শব্দ টার্কিশ, কিন্তু ‘খাচিপ’ শব্দটি যতদূর তার মনে পড়ছে আর্মেনীয়। আহমদ মুসা আর্মেনিয়া থাকার সময় একদিন গিফটশপে সেলসম্যানের কাছে একজনকে ‘খাচিপ’ চাইতে শুনেছিল। সেলসম্যান তাকে একটি ছোট ক্রস দিয়েছিল। আহমদ মুসা তার আর্মেনীয় সাথীকে জিজ্ঞেস করে জেনেছিল, ‘খাচিপ’ অর্থ ‘ছোট ক্রস’। তবে এই প্রাচীন আর্মেনীয় শব্দ নাকি এখন প্রায় ব্যবহার হয় না বললেই চলে। কিন্তু প্রাচীন ‘খাচিপ’ মানে ‘ছোট ক্রস’ এই শব্দটি এই পুলিশ অফিসারের নামের সাথে কেন? এ শব্দের কি কোন ভিন্ন টার্কিশ অর্থ আছে! এই ভাবনাতেই বুঁদ হয়ে গিয়েছিল আহমদ মুসা। বুটের আওয়াজ তুলে মোস্তফা ওকালানসহ কয়েকজন পুলিশ অফিসার ভেতরে প্রবেশ করল, তখনই সম্বিত ফিরে পেল আহমদ মুসা। ড. আজদারা সবাই পুলিশ অফিসারদের স্বাগত জানাল। পুলিশ অফিসার মোস্তফা ওকালানের পাশের অপেক্ষাকৃত লম্বা গড়নের ভিন্ন রকমের পুলিশ অফিসারকে দেখে বুঝল, সেই হবে ‘ইজডির’ রিজিওনের ‘ডাইরেক্টর অব পুলিশ’ (ডিওপি) খাল্লিকান খাচিপ। ড. আজদাদের কাছাকাছি হয়েই সেই পুলিশ অফিসার খাল্লিকান খাচিপ ড. আজদাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘আপনাদের নিয়ে এসব কি হচ্ছে মিস আজদা? আপনারা কুর্দিস্থান ও তুরস্কের বিখ্যাত ও সম্মানিত একটা ফ্যামেলি। এই ফ্যামেলির মুখে আপনারা চুনকালি মেখে দিলেন। আপনার ভাই আতা সালাহ উদ্দিন বারজানি ড্রাগ ব্যবসা করে জেলে গেলেন। আর আপনাকে নিয়ে একের পর এক ভয়াবহ ঘটনা। ভাগ-জোক নিয়ে এসব আপনাদের ইনফাইটিং নয় তো? যারা মারা গেছে, আপনারা যারা বেঁচে আছেন সবাই কি এক দলের? এমন প্রশ্ন উঠছে কারণ ড্রাগ ব্যবসা ব্যাপক হওয়ার আগে এ ধরনের ঘটনা আরিয়াস, ইজডির কেন গোটা তুরস্কেও ঘটেনি।’ ভয় ও বিব্রতকর অবস্থা ড. আজদার। কোন কথাই সে বলতে পারলো না। ড. আজদার ফুপা কামাল বারকির চোখে প্রতিবাদের চিহ্ন ফুটে উঠেছিল। বলল সে, ‘কিন্তু অফিসার, আমাদের কথা না শুনে, ঘটনা ভালো করে না জেনেই তো আপনি মন্তব্য করছেন।’ অসন্তোষের ভাব ফুটে উঠল ডিওপি খাল্লিকান খাচিপের চোখে-মুখে। বলল, ‘আমি শুনে এবং জেনেই কথা বলছি জনাব। আরও বলতে চাই, ড্রাগ সিন্ডিকেটের এই ইনফাইটিং-এ আবু আহমদ আব্দুল্লাহকে হায়ার করে আনা হয়েছে।’ কথা শেষ করেই ডিওপি খাল্লিকান খাচিপ থানার ইনচার্জ মোস্তফা ওকালানকে বলল, ‘আপনি সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করে ফেলুন তাড়াতাড়ি। তাড়াতাড়ি লাশগুলো ময়নাতদন্তে পাঠিয়ে আমরা এদের সকলকেই জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে পুলিশ অফিসে নিয়ে যেতে চাই।’ আবার ড. আজদার দিকে ডিওপি খাল্লিকান খাচিপ তাকাল। বলল, ‘আপাতত আপনাকে ও আবু আহমদ আব্দুল্লাহকে আমরা গ্রেফতার করছি। জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে ড্রাগ ব্যবসায় ও ড্রাগ সিন্ডিকেটে যদি আপনাদের সংশ্লিষ্টতা না থাকে, তাহলে আপনারা সম্মানের সাথে ছাড়া পেয়ে যাবেন।’ উদ্বেগ-আতংকে ফ্যাকাশে হয়ে গেল ড. আজদা ও অন্যদের মুখ। পুলিশ অফিসারের এমন সরাসরি ও নগ্ন পক্ষপাতিত্বমূলক হস্তক্ষেপে বিস্মিত হলো আহমদ মুসা। বলল ডিওপি খাল্লিকান খাচিপকে লক্ষ্য করে, ‘তুরস্কের আইনে কি বাদী ও আসামীকে একসাথে গ্রেফতার করতে হয়? আক্রান্ত ও আক্রমণকারীকে কি একচোখে দেখতে হয়?’ যেন চাবুকের একটা বড় ঘা খেল ডিওপি খাল্লিকান খাচিপ। একটা গা ঝাড়া দিয়ে উঠে আহমদ মুসার দিকে তীব্র কণ্ঠে তাকিয়ে বলল, ‘আপনি যে রিভলভার দিয়ে এদের হত্যা করেছেন, সে রিভলভার কোথায়?’ আহমদ মুসা পকেট থেকে রিভলভার বের করে ডিওপি খাল্লিকান খাচিপকে দেখাল। ভ্রূকুঞ্চিত হলো ডিওপি খাচিপের। বলল ত্বরিত কণ্ঠে, ‘এ রিভলভার আপনি পেলেন কোথায়? পুলিশও এ রিভলভার পায়নি। পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা ছাড়া সাধারণের কাছে এটা বিক্রির প্রশ্নই ‍ওঠে না। নিশ্চয়ই লাইসেন্স নেই এ রিভলভারের।’ আহমদ মুসার ঠোঁটে এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল। জ্যাকেটের পকেট থেকে একখণ্ড কাগজ বের করে এগিয়ে দিল ডিওপি খাচিপের দিকে। ডিওপি খাচিপ কাগজটা হাতে নিয়ে চোখ বোলাল। বিস্ময় ফুটে উঠল তার চোখে-মুখে। বলল, ‘স্টেট সিকিউরিটি সার্ভিসের হেডকোয়ার্টার থেকে পারমিশন ইস্যু হয়েছে? ওখানে কি আপনার লোকজন আছে? কিংবা কাগজটা নকল নয়তো?’ ‘সেরকম মনে করলে সেখানে একটা টেলিফোন করুন না। টেলিফোন নাম্বারটা তো আছেই।’ বলল আহমদ মুসা। মুখটা চুপসে গেল পুলিশ অফিসারের। তাকাল একবার সে আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘টেলিফোন করার প্রয়োজন নেই। কোন কিছু নিশ্চিত করার পুলিশদের নিজস্ব পদ্ধতি আছে।’ ডিওপি খাল্লিকান খাচিপের কথার মাঝখানেই লোকাল থানা ইনচার্জ মোস্তফা ফিরে এলেন। ডিওপি খাচিপের কথা শেষ হতেই সে বলল, ‘স্যার, সুরতহাল রিপোর্ট কমপ্লিট।’ ‘আলামতগুলো সব নেয়া হয়েছে?’ জিজ্ঞাসা ডিওপি খাচিপের। ‘জ্বি, লাশগুলোও সব নেয়া হয়েছে।’ বলল থানা ইনচার্জ মোস্তফা ওকালান। ডিওপি খাচিপ থানা ইনচার্জ মোস্তফা ওকালানের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে তাকাল ড. আজদাদের দিকে। বলল, ‘তাহলে ড. আজদা ও মি. আবু আহমদ, আপনাদের যেতে হবে আমাদের সাথে।’ ‘কোথায়?’ ড. আজদা কিছু বলার আগেই আহমদ মুসা বলল কথাটা। ‘আমার অফিসে খুব বড় ঘটনা এটা। আপনাদের স্টেটমেন্ট নিতে হবে।’ ‘আমরা যাব থানায়। মামলা দায়েরের জন্যে। মামলার বিবরণীতে আমাদের সব কথা এসে যাবে। আমাদের স্টেটমেন্ট লাগবে না। এরপরও স্টেটমেন্ট নিতে চাইলে এখানেই নিতে হবে।’ মুহূর্তের জন্যে ভ্রূকুঞ্চিত হলো ডিওপি খাল্লিকান খাচিপের। ভাবনার একটা ছায়াও ফুটে উঠল তার মুখে। বলল, ‘আপনি যা বলছেন সেভাবেও হয়। আমি মনে করেছিলাম, আপনারা গেলে কেস নিয়ে আরও কথা হতো। আর সরকারিভাবেও তো কেস হচ্ছে, আপনাদের কেস করার দরকার আছে কি?’ ‘সরকারি কেস এক ধারায়, আমাদের কেস হবে ভিন্ন ধারায়। সরকারি কেসের মূল কথা হবে, কিডন্যাপের চেষ্টা এবং এ চেষ্টা করতে গিয়ে ৭ জন কিডন্যাপার খুন, এ কিডন্যাপের মোটিভ কি, আর এর পেছনে আর কে আছে ইত্যাদি। কিন্তু আমাদের কেসের মূল বক্তব্য হবে, আমাদের পরিবারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে। এ পরিবারের ছেলে ড্রাগট্রেডের মিথ্যা অভিযোগে জেলে আছে। বাড়িতে ড্রাগ লুকিয়ে রেখে ড. আজদাকে ফাঁসাতে চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু যে ড্রাগ রাখতে এসেছিল, সে ধরা পড়ে যায়। তাকে থানায় নেয়ার পথে তাকে ষড়যন্ত্রকারীরাই হত্যা করে যাতে তাদের ষড়যন্ত্র ধরা পড়া ছেলেটি ফাঁস করে না দেয়। এরপর ড. আজদা ষড়যন্ত্রকারীদের দ্বারা গত সন্ধ্যায় এবং আজ রাতে আবার আক্রান্ত হয়েছেন। এ ষড়যন্ত্রকারীরা শুধু এ পরিবার নয়, আরিয়াস-আরারাত এক কথায় আরারাত সন্নিহিত গোটা ইজডির প্রদেশের হাজার হাজার পরিবারের বিরুদ্ধে এই ষড়যন্ত্র চলছে। হাজারো তরুণকে ড্রাগ ট্রেডার সাজিয়ে জেলে পুরা হয়েছে। শতশত পরিবার বিরান হয়ে গেছে অথবা এই এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে। এই ব্যাপারে এই পরিবার এবং এই এলাকার পক্ষ থেকে সরকারের আশু তদন্ত ও আইনি প্রতিকার চাওয়া হবে।’ থামল আহমদ মুসা। আহমদ মুসার এই কথাগুলো বিস্ময়কর কোন কাহিনী ডিজক্লোস করার মত সকলের মনে তড়িৎ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করল। ডিওপি খাল্লিকান খাচিপের চোখ-মুখ যেন অনেকটা ফ্যাকাসে হয়ে গেল। উদ্বেগের চিহ্নও আছে তার মধ্যে। আর থানা ইনচার্জ মোস্তফা ওকালানের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেছে। অন্যদিকে ড. আজদার মামা ও ফুপাদের চোখে বিস্ময় ও কৌতুহল। কিন্তু অপার বিস্ময়ে বোবা হয়ে গেছে ড. আজদা। সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না, তার, তার পরিবার ও তার অঞ্চলের একথাগুলো আবু আহমদ লোকটি জানল কি করে! শুধু জানা নয়, সে কথাগুলো মামলা দায়েরের ভাষায় এমনভাবে সাজিয়ে বলল, যা সে নিজেও কখনো কল্পনা করেনি। এ ধরনের কেস যে এই সময় করা যায়, সেটাও তার মাথায় নেই। কিন্তু লোকটির মাথায় এল কি করে! কে এই লোক? ড. আজদা আহমদ মুসাকে যতই দেখছে ততই যেন দেখার আগ্রহ বাড়ছে। কে এই বিস্ময়কর লোকটি? ডিওপি খাচিপ দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়েছিল। বলল, ‘আপনি এসব কি বলছেন? এ ধরনের অভিযোগ কখনও কেউ আমাদের কাছে করেনি।’ ‘এবার অভিযোগ পাবেন।’ বলল আহমদ মুসা। এবার হাসল ডিওপি খাচিপ। পুরোপুরিই নিজেকে সামলে নিয়েছে সে। বলল, ‘ভালো! কেস দায়ের করুন। আপনার ভাষা শুনে মনে হচ্ছে, আপনি তুর্কি নন। আপনি রিভলভারের লাইসেন্স কিভাবে পেয়েছেন আমি জানি না। আপনি কিভাবে এদেশে আছেন সেটাও জানি না। আমি দেখব এসব। কিন্তু বেশি ঝামেলা করলে আপনিও বিপদে পড়বেন।’ বলে উঠে দাঁড়াল ডিওপি খাল্লিকান খাচিপ। থানা ইনচার্জ মোস্তফা ওকালানকে বলল, ‘চল, এখানকার কাজ শেষ।’ কথা শেষ করেই হাঁটতে শুরু করল খাচিপ। থানা ইনচার্জ ওকালান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই কথা শুনছিল। সেও যাবার জন্যে ঘুরে দাঁড়াবার সময় ড. আজদাকে বলল, ‘আপনারা এখন আসতে পারেন।’ ড. আজদা তাকাল আহমদ মুসার দিকে সিদ্ধান্তের জন্যে। ‘চলুন।’ আহমদ মুসা বলল। আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। উঠে দাঁড়াল ড. আজদাও। ড. আজদার মামা-ফুপারাও উঠে দাঁড়িয়েছে। ‘মামা, ফুপা-ফুপি, আপনারা এ দিকটা দেখুন। আমরা থানা থেকে আসছি।’ ড. আজদার মামা, ফুপুরা ড. আজদার কথায় সায় দিল। বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল আহমদ মুসা ও ড. আজদারা পুলিশের সাথে। নাস্তার পর একটু রেস্ট নিয়ে ফ্রেশ হয়ে আহমদ মুসা এল লাউঞ্জে। ড. আজদা, তার মামা ও তার ফুপা-ফুপুরা আগেই এসে বসেছিল লাউঞ্জে। কথা বলছিল তারা আহমদ মুসা মানে তাদের মেহমান আবু আহমদ আব্দুল্লাহকে নিয়ে। ড. আজদার ফুপা কামাল বারকি ড. আজদাকে লক্ষ্য করে শুরুতেই বলেছিল, ‘লোকটি আসলে কে আজদা? আমি আমার জীবনে এমন বিস্ময়কর মানুষ দেখিনি। শুধু অস্ত্রের যুদ্ধে অবিশ্বাস্যভাবে শত্রুকে পরাজিত করাই নয়, কথার যুদ্ধে প্রদেশের শীর্ষ পুলিশ অফিসারকে যেভাবে পরাজিত করেছে, আমাদের মামলার বিষয়টাকে সে যেভাবে সাজাল তা বিস্ময়কর। আগন্তুক বলে মনেই হলো না। যেন সেই এ বাড়ির কর্তা, সব জানে সে। এটা কি করে সম্ভব!’ কামাল বারকি থামতেই কথা বলে উঠেছিল ড. সাহাব নুরী। সে বলে, ‘উনি না থাকলে আজ কি ঘটত, তা ভাবতেও বুক কাঁপছে। আর উনি বুদ্ধি দিয়ে পুলিশ অফিসারকে কোণঠাসা করতে না পারলে আজদাকে পুলিশ হেডকোয়ার্টারে যেতে হতো এবং নানা নাজেহালের শিকার হতে হতো।’ ড. আজদা ভাবছিল। তার চোখে-মুখে বিস্ময়। এ ধরনের মানুষের কথা কল্পনাই করা যায়, বাস্তবে দেখবে, এমন আশাও কেউ করে না। কিন্তু আশাতীত ঘটনা, আর আশাতীত মানুষকেই সে দেখছে। সত্যি কে এই লোক? কোত্থেকে হঠাৎ তার বিপদের সময় হাজির হলো? ড. সাহাব নুরীর কথা শেষ হয়ে গিয়েছিল। তারপর কথা বলেছিল ড. আজদা। বলেছিল সে, ‘মামাজি, ফুপাজি, উনি কে আমিও জানি না এখনো। আসলেই উনি একজন বিস্ময়কর মানুষ। গত সন্ধ্যার সব কথা তো আপনাদের বলা হয়নি। উনি উপস্থিত না থাকলে, উনি ব্যাপারটাকে ট্যাকল না করলে আমাকে খুনের কেসে জড়াতে হতো। ইন্সপেক্টর রশিদ দারাগ সন্ত্রাসীদের পক্ষ হয়ে মিথ্যা কাহিনী তৈরি করেছিল, যাতে আমি খুনের আসামী হয়ে যাই। পুলিশের মিথ্যা কাহিনীর মোকাবিলায় আবু আহমদ আব্দুল্লাহ সাহেবও আমাকে বাঁচানোর জন্যে একটা কাহিনী তৈরি করেছিলেন এবং ইন্সপেক্টর রশিদ দারাগকে বলেছিলেন, যদি এ কাহিনী রশিদ দারাগ মেনে না নেয়, তাহলে পুলিশ রশিদ দারাগকে মেরে ফেলে প্রমাণ করবেন, সন্ত্রাসীদের গুলিতে ইন্সপেক্টর দারাগ নিহত হবার পর তিনি ঐ চারজন সন্ত্রাসীকে মেরেছেন রশিদ দারাগের রিভলভার দিয়ে। ইন্সপেক্টর রশিদ দারাগ আবু আহমদ সাহেবকে গুলি করতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তার আগেই আবু আহমদ আব্দুল্লাহ পুলিশ অফিসারের কাঁধে গুলি করে এবং বলে যে, আমি আপনাকে বুকে গুলি করে মেরে ফেলতে পারতাম, কিন্তু মারিনি। আশা করি সত্যটা মেনে নেবেন। না হলে মারার সিদ্ধান্ত এখনও নিতে পারি। বলে রিভলভার তুলেছিল পুলিশ অফিসারকে লক্ষ্য করে। অবাক ব্যাপার, হঠাৎ যেন পুলিশ অফিসার মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে! তখন কি ভেবে পুলিশ অফিসার আমাদের সহযোগিতা করেন। সেজন্যে আমি বেঁচে যাই।’ ড. আজদার মামা ও ফুপা-ফুপিরা নির্বাক হয়ে গিয়েছিল ড. আজদার কাহিনী শুনে। ভাবছিল, লোকটি কি অদ্ভুত! তার কি কোন অলৌকিক ক্ষমতা আছে? মামা ড. সাহাব নুরী বলেছিল অবশেষে, ‘পুলিশ অফিসার খাল্লিকান খাচিপকে আবু আহমদ সাহেব তার রিভলভারের যে লাইসেন্স দেখিয়েছিলেন, তা ইস্যু হয়েছে স্টেট সিকিউরিটির হেড অফিস থেকে। হেড অফিস থেকে এ ধরনের যে লাইসেন্স ইস্যু হয়, তা বিশেষ ধরনের এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে ইস্যু করা হয়। কিন্তু এই আবু আহমদ কে যে, তার জন্যে এটা করা হলো!’ কিছু বলতে যাচ্ছিল ড. আজদা। দেখতে পেল, আবু আহমদ আব্দুল্লাহ লাউঞ্জে প্রবেশ করছে। থেমে গেল ড. আজদা। উঠে দাঁড়িয়ে স্বাগত জানাল আহমদ মুসাকে। সামনে সোফা দেখিয়ে বলল, ‘বসুন স্যার। আমরা আপনার অপেক্ষা করছি।’ সবাইকে সালাম দিয়ে সোফায় বসল আহমদ মুসা। আহমদ মুসা বসতেই ড. আজদার ফুপা কামাল বারকি বলল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে, ‘আমরা কৃতজ্ঞ জনাব আবু আব্দুল্লাহ। আমাদের কৃতজ্ঞতা গ্রহণ করুন। আজদাকে আজ যে দেখা যাচ্ছে, সেটা আপনার কারণেই।’ ‘এটা কি আমাকে বিদায় দেয়ার অনুষ্ঠান? বিদায় দেয়ার সময় এভাবে মানুষ কৃতজ্ঞতা জানায়।’ বলল আহমদ মুসা। তার মুখে হাসি। আহমদ মুসার কথা শেষ হবার আগেই ড. আজদা ছুটে গিয়ে দু’হাত জোড় করে আহমদ মুসার পায়ের কাছে কার্পেটের ওপর বসল। বলল, ‘আমাদের ভুল বুঝবেন না স্যার। আমাদের কথার অর্থ ওটা নয়, প্লিজ। আমার এবং আমার পরিবারের যিনি ত্রাতা, তার সম্পর্কে কি কেউ এমন করে ভাবতে পারে?’ আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘স্যরি ড. আজদা। আমার কথাটাকে সিরিয়াসলি নিয়েছেন আপনি। আমি একটু রসিকতা করছিলাম।’ ড. আজদা উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘স্যার, রসিকতা যেটা বলেছেন, সেটার ভারও বহন করার সাধ্য আমাদের হৃদয়ে নেই।’ ‘স্যরি ড. আজদা।’ বলল আহমদ মুসা। ‘মাফ করবেন স্যার।’ বলে ড. আজদা উঠে গিয়ে তার আসনে বসল। আহমদ মুসা ড. আজদার ফুপা কামাল বারকিকে লক্ষ্য করে বলল, ‘জনাব, কৃতজ্ঞতা আমাকে নয়, কৃতজ্ঞতা জানানো দরকার আল্লাহকে। আমি আপনাদের এই আরিয়াসকে চিনি না, এখানে আমার স্বজনও নেই, এখানে আমার নিজের কোন প্রয়োজনও ছিল না, তাহলে আমি এখানে এলাম কেন? কিভাবে এলাম? এর জবাব আমার কাছে একটাই, সেটা হলো, আল্লাহ আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন। তারপর গত সন্ধ্যা থেকে আজ পর্যন্ত এখানে যা ঘটল, তা আমার কোন পরিকল্পনার অংশ নয়। গত সন্ধ্যা এবং রাতের দু’ঘটনায় আমি যা করেছি, তা আমার ইচ্ছায় হয়নি। আমাকে দিয়ে তা করানো হয়েছে। করিয়েছেন আল্লাহ। আমি মহান আল্লাহর একটা হাতিয়ার মাত্র। সুতরাং কৃতজ্ঞতা আপনাদের মহান আল্লাহকেই জানানো দরকার। তিনিই আমাকে এনেছেন, আমাকে দিয়ে এসব করিয়ে নেয়ার জন্যেই। তিনিই আপনাদেরকে আমার নতুন স্বজন বানিয়েছেন। হৃদয়ের সব কৃতজ্ঞতা তার দিকেই ধাবিত হওয়া দরকার।’ থামল আহমদ মুসা। কারও কাছ থেকে কোন কথা এল না। ড. আজদা, তার মামা ড. সাহাব নুরী, তার ফুপা কামাল বারকি এবং ফুপি লায়লা কামাল সবাই নীরব। তাদের চোখে-মুখে বিস্ময় ও আবেগের একটা স্ফূরণ। হঠাৎ করেই তাদের মুখের ভাব, চোখের দৃষ্টি যেন গলিত মোমের মত অনেকটা নরম হয়ে গেছে। কারও কারও চোখে সেই দৃষ্টিতে একটা অপ্রস্তুতের ভাবও। আহমদ মুসার কথাগুলোতেও একটা আবেগ ছিল। কথার শেষের দিকে তার কণ্ঠও ভারি হয়ে উঠেছিল। অস্বস্তিকর নীরবতা ভাঙল ড. আজদার ফুপি লায়লা কামাল। লায়লা কামালের বয়স ষাটোর্ধ্ব হবে। এই বয়সেও তার মেদহীন একহারা চেহারা। বোঝাই যায়, নিয়মিত উনি ব্যায়াম করেন এবং সম্ভবত ডায়েট কন্ট্রোলও করেন। চোখে তার দামী চশমা। নিয়মিত প্রসাধন ব্যবহার করেন, মুখ দেখলেই তা বোঝা যায়। পরনে আধুনিক পোশাক। ড. আজদার পরনে সালোয়ার কামিজসহ মাথায়-বুকে ওড়না থাকলেও মিসেস লায়লা পরেছেন ট্রাউজার ও শার্ট। লায়লা কামালই নীরবতা ভাঙল। বলল, ‘বেটা, তুমি আমাদের স্বজন বলেছ, আমরা তোমাকে পর ভাবতে পারি না। তুমি শুধু অসম সাহসী এবং সব দিক থেকে যোগ্যতাসম্পন্নই নও, বেটা তুমি খুব ভালো ছেলেও। কিন্তু বেটা, তুমি যাকে কৃতজ্ঞতা জানাতে বলেছ, তিনি তো আমাদের জীবনে নেই। আজদার বাবা মা’র মত আমরাও কমিউনিস্ট পার্টি করতাম। কমিউনিস্ট পার্টি এখন আমরা ঐভাবে না করলেও সেই আদর্শে বিশ্বাস করি। যে নেই, তাকে কৃতজ্ঞতা জানাব কি করে?’ আহমদ মুসা হাসল। বলল, ‘স্রষ্টা আপনার, বা আপনাদের জীবনে নেই বলেছেন। কিন্তু কোথাও নেই-এ কথা বলেননি। আসলে স্রষ্টা আছেন।’ ‘আছেন স্রষ্টা, এ কথা আপনি বলছেন কি করে?’ ‘আমি বলছি না, মানুষ, মানুষের ইতিহাস এ কথা বলছে।’ আহমদ মুসা বলল। ‘কিভাবে?’ জিজ্ঞাসা ড. আজদার ফুপি লায়লা কামালের। ‘মানুষের জীবনের শুরু আছে এবং শেষও আছে। তাই মানুষ সৃষ্ট। সৃষ্ট বলে তার স্রষ্টাও আছে। আর একটা কথা, মানুষও তার জন্যে অনেক প্রয়োজনীয় জিনিস সৃষ্টি করে। এগুলোর মধ্যে কোনটিই মানুষের জন্যে আপনা-আপনি সৃষ্টি হচ্ছে না।’ আহমদ মুসা বলল। ‘মানুষ যেসব জিনিস তৈরি করে, সেক্ষেত্রে না হোক, প্রাকৃতিক জগতে তো সবকিছুই আপনা-আপনি সৃষ্টি হচ্ছে, কাউকেই তো সৃষ্টি করতে দেখা যাচ্ছে না।’ হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট সব জীবন ও বস্তুর মধ্যে সৃষ্টিগত ঐকতান আছে। এক আইন, একই দর্শন রয়েছে সব সৃষ্ট বস্তু ও জীব-জীবনের মূলে। এর অর্থ, এসব কোন কিছুই আপনা-আপনি সৃষ্টি নয়, একক এক স্রষ্টার সজ্ঞান পরিকল্পনা ও আইন কাজ করছে সৃষ্টি জগতের মূলে। আপনা-আপনি সৃষ্টি হলে সব বস্তু ও জীবের সৃষ্টিগত দর্শন ও আইন এক রকম হতো না। হতো ভিন্ন ভিন্ন।’ আহমদ মুসা থামল। কিন্তু অনেকক্ষণ কোন কথা বলল না লায়লা কামাল। গভীর একটা ভাবনার প্রকাশ তার চোখে-মুখে। কিছুক্ষণ পর বলল, ‘কিন্তু স্রষ্টা নিজেকে আড়ালে রাখার কারণ কি? বিভ্রান্তি তো এখানেই।’ ‘স্রষ্টা নিজেকে আড়ালে রাখেননি। আমরা তাঁকে দেখতে পাই না মাত্র। এটা আমাদের সৃষ্টিগত সীমাবদ্ধতা। যেমন, আপনি আপনার প্রয়োজনে রোবট তৈরি করলেন। রোবটটি আপনি যেমন চান সেভাবে কাজ করবে। কিন্তু তার চোখ আপনাকে দেখবে না, জানবে না এবং বুঝবে না যে, কে তার স্রষ্টা। এটা রোবটের সৃষ্টিগত সীমাবদ্ধতা।’ আহমদ মুসা বলল। সূক্ষ্ম এক টুকরো হাসি ফুটে উঠেছে লায়লা কামালের মুখে। বলল, ‘আমরা রোবটকে বানাই নির্দিষ্ট কাজের জন্যে। কিন্তু আমাদের কাছে স্রষ্টা কি চান?’ ‘রোবটের স্রষ্টা হিসেবে মানুষ এবং মানুষের ‘স্রষ্টা’র মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। মানুষ রোবট সৃষ্টি করে তার প্রয়োজনে কিছু নির্দিষ্ট কাজ করার জন্যে। কিন্তু মানুষের স্রষ্টা আল্লাহ অভাবশূন্য, প্রয়োজনশূন্য। তিনি কোন কিছুরই মুখাপেক্ষী নন। মানুষের কোন কাজের দ্বারা ‍উপকৃত হবার জন্যে তিনি মানুষ সৃষ্টি করেননি। বরং বিশ্বজগতের সবকিছু সৃষ্টি করেছেন তিনি মানুষের প্রয়োজন পূরণের জন্যে। সূর্যের আলো মানুষ ও জীবজগতের জন্যে প্রয়োজন। সূর্য ‍ও পৃথিবীর পারস্পরিক আকর্ষণের ভারসাম্য পৃথিবীর কক্ষপথের স্থিতির জন্যে অপরিহার্য। চাঁদের আলো মানুষ, জীব ও উদ্ভিজ্জের জন্যে দরকারী। এইভাবে পৃথিবীর আলো, বাতাস, জীব-উদ্ভিজ্জ, পাহাড়, নদী, সমুদ্র সবকিছুই মানুষকে তার জীবনধারণে সাহায্য করছে। রোবটের স্রষ্টা মানুষ এবং মানুষের স্রষ্টা আল্লাহর মধ্যে এটাই পার্থক্য। মানুষ স্বার্থপর, তাই তার সৃষ্ট রোবটের কাছ থেকে স্বার্থ আদায় করে, কিন্তু মানুষের স্রষ্টা আল্লাহ মানুষের কাছে কোন উপকার চান না, নেন না। আর সে প্রয়োজনও মানুষের স্রষ্টার নেই।’ ড. আজদা, তার মামা ড. সাহাব নুরী এবং ফুপা কামাল বারকি আহমদ মুসার কথাগুলো যেন গোগ্রাসে গিলছে। তাদের চোখে-মুখে বিস্ময়-বিমুগ্ধতা। আর ড. আজদার ফুপি লায়লা কামালের চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। আহমদ মুসা থামতেই সে বলে উঠল, ‘তাহলে স্রষ্টা কষ্ট করে মানুষকে সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য কি? কোন কাজে না লাগলে, কোন স্বার্থ পূরণ না হলে তিনি মানুষ সৃষ্টি করবেন কেন? করেছেন কেন?’


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৯ জন


এ জাতীয় গল্প

→ মাউন্ট আরারাতের আড়ালে চ্যাপ্টার- ৭ বাকি অংশ (শেষ)
→ মাউন্ট আরারাতের আড়ালে চ্যাপ্টার- ৭
→ মাউন্ট আরারাতের আড়ালে চ্যাপ্টার- ৬ বাকি অংশ
→ মাউন্ট আরারাতের আড়ালে চ্যাপ্টার- ৬
→ মাউন্ট আরারাতের আড়ালে চ্যাপ্টার- ৫ বাকি অংশ
→ মাউন্ট আরারাতের আড়ালে চ্যাপ্টার- ৫
→ মাউন্ট আরারাতের আড়ালে চ্যাপ্টার- ৪ বাকি অংশ
→ মাউন্ট আরারাতের আড়ালে চ্যাপ্টার- ৪
→ মাউন্ট আরারাতের আড়ালে চ্যাপ্টার- ৩ বাকি অংশ
→ মাউন্ট আরারাতের আড়ালে চ্যাপ্টার- ২ বাকি অংশ
→ মাউন্ট আরারাতের আড়ালে চ্যাপ্টার- ২
→ মাউন্ট আরারাতের আড়ালে চ্যাপ্টার- ১ বাকি অংশ
→ মাউন্ট আরারাতের আড়ালে চ্যাপ্টার- ১

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now