বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

নষ্ট সমাজের গল্প।

"শিক্ষণীয় গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান জাহিন আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর (০ পয়েন্ট)

X অস্থিরতায় কাটছে প্রতিটি দিন, প্রতিটি ক্ষণ। হিংসা বিদ্বেষ অসত্য আর ধ্বংসের খবরে আকীর্ণ থাকছে দৈনিক পত্রিকা-গণমাধ্যম। অবিবেচনা, অবিবেচক এবং অবিচারের মস্ত এক পাথর যেন বসে আছে সমাজ এবং জাতির মনোজগতে। ইতিহাসে বিভ্রান্তি, ভূগোলে আবিলতা আর ধারাপাতে ছন্দপতনই যেন এখনকার রীতি হয়ে উঠে আসছে। সর্বত্রই বিশ্বাসহীনতা, সমাজ-সংসারকে কুরে কুরে খাচ্ছে। দেশ এবং জাতির হৃদয়ে অশান্তির দাবানল। এই দহন-জ্বালার বিস্তার ঘটছে প্রতিনিয়ত। তামাম বিশ্বজুড়েই যেন এমন দৃশ্য এমন হা হুতাশ। যত ধীরলয়েই হোক নীতি-নৈতিকতা বর্তমানে নিম্নগামী। নিম্নগামী সভ্যতার পারদ। বিভক্তি এখন সব এলাকায়; কি দেশ কি জাতি, কি সমাজ কি পরিবারে। এই বিভাজনই অস্থিরতাকে করছে প্রলম্বিত। অবিশ্বাসে আচ্ছন্ন হচ্ছে জাতি-দেশ। ইদানীং এখান থেকেই বেরিয়ে আসছে বিদ্বেষের ফোয়ারা, ধ্বংসের বিভীষণ। এই বিভীষণরাই মূলত একটি দেশ এবং একটি জাতির আশা-আকাক্সক্ষাকে ছিন্ন-ভিন্ন করার ব্যাপারে যথেষ্ট। এমন উদাহরণ ইতিহাসে অনেক। শংকার সংবাদ হলো এই ভাটিমুলুকেও যেন বিভীষণদের উৎপাত বেড়েই চলেছে। এই বৃদ্ধি এই বিষক্রিয়া জাতি এবং দেশের শিরা-উপশিরাগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে তুলছে দিন দিন। যে জন্য এখন প্রতিটি এলাকায় অশান্তির অনল। বিদ্বেষ বিভেদের বিষবত প্রতিক্রিয়া। সমাজে বাড়ছে হতাশা, হানাহানি, পরিবারে বাড়ছে কলহ- যার তিক্ততায় দেশে বাড়ছে বিসংবাদ-দুর্নীতি-দুর্ভাবনা। কেবল দেশ-জাতি ধ্বংসের অনুষঙ্গই এসব উপলক্ষ নয়, সভ্যতা ধ্বংসের উপাদানও এই লক্ষণগুলো। ইতিহাস এই সত্যগুলোকেই তুলে এনেছে বারবার। এই দেশ এই জাতিও যেন এমনি একটি ক্রান্তিকালে এসে উপনীত হয়েছে। সময় যাচ্ছে দ্রুত। স্বাধীনতার প্রায় আটল্লিশ বছর অতিক্রম করল জাতি। আজ বিজয় দিবস।আটচল্লিশ বছর একটি দীর্ঘ সময়। এই দীর্ঘ সময়েও কলহ মিটল না। অবসান ঘটল না বিভেদ-বিদ্বেষের । শান্তি এখনো সুদূরপরাহত। অশান্তি যেমন আটকে দেয় অর্থনৈতিক উন্নতিকে তেমনি পথ আগলে দাঁড়ায় শিক্ষা-সভ্যতাকেও। শিক্ষা-সভ্যতা থেকেই জন্ম নেয় নীতি-নৈতিকতা। সার্বিক বিবেচনায় এ দিকটির প্রতি দৃষ্টি দিলেও দেখা যাবে শুধু কুয়াশা আর কুয়াশা। জাতি হাবুডাবু খাচ্ছে এমনি এক বিতিকিচ্ছি কুয়াশায়। প্রতিদিনের পত্রিকাগুলোতে থাকছে ধ্বংসের খবর, অশান্তির খবর, বিভেদের খবর। যে সব খবর হিংসা-বিদ্বেষকেই উচকে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। বিবেক বিবেচনার তোয়াক্কা করছে না কেউ। যে জন্যে স্থিতি আসছে না কোন প্রান্তেই। পৃথিবীতে এমনও দেশ দেখা গেছে স্বাধীনতার দশ-বিশ বছরেই শিরদাড়া শক্ত করে দাঁড়িয়ে গেছে। এর নেপথ্য কারণ বিবেক-বিবেচনা আর দেশপ্রেম। এই প্রেমে ঘাটতি এবং বিবেচনার বৈকল্য আঁচলকে আটল্লিশ বছরেও কোমরের ব্যাধির উপশম হয়নি। এই ব্যাধি বর্তমানে সর্বাংগে ছড়িয়ে যাচ্ছে। দৃষ্টিতে পড়ছে ছানি। লেজার অপারেশনেও যেন সারতে চাচ্ছে না। চিরান্ধর দিকে ধাবিত হচ্ছে দেশ-জাতির ভবিতব্য। বসে যাচ্ছে, কল-কারখানা, স্তব্ধ হয়ে পড়েছে নতুন বিনিয়োগ, প্রশাসনে বিশৃঙ্খলা, শাসনে দক্ষতার অভাব, ভালবাসা মমতায় বৃহ¤œলাসুলভ ব্যবহারেই এমনটা ঘটছে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। এমনকি অজ্ঞরাও বর্তমানে বুঝতে শুরু করেছে আগামী দিনগুলো অন্ধকার। এই অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে রাজনীতি, সমাজনীতি, শিক্ষানীতি এমনকি ধর্মনীতিও। ধর্ম মানবজাতিকে সত্যের সন্ধান দেয়, শৃঙ্খলায় আবদ্ধ করে উন্নতির পথ দেখায়। শোভনকে নিয়ে আসে দৃষ্টির সীমায়। বিশ্বের সব শ্রেষ্ঠ ধর্মগুলোর রীতি-নীতি প্রায় সমপর্যায়ের। মঙ্গল কামনাই ধর্মের বিভূতি। কিন্তু ইদানীং একশ্রেণীর কথিত বিদ্ধজন-চিন্তক ধর্মেও অকল্যাণ ধ্বংস আবিষ্কারে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। অভিসন্দর্ভ পর্যন্ত রচনা করে ফেলছেন রাতারাতি। আসলে ব্যাপারটি এরকম, ‘চোরায় না শোনে ধর্মের কাহিনী’। হয়তো এই শ্রেণীর বিদ্ধজন-চিন্তকগণ ধর্মের নাম শুনলেই আতঙ্কিত হন। আজকাল শাসন-প্রশাসনে যারা অধিষ্ঠিত হচ্ছেন তারাও কম বেশি বিষয়-ভাবনায় এর বাইরে থাকছেন না। ধর্মের কাহিনী শোনাতে গেলে পদে পদে বাধা। দুর্নীতি-দুঃশাসন অসভ্যতা, অনৈতিকতা এবং অসত্য ধর্মবিবেচনায় পরিত্যাজ্য বিষয়গুলোর মধ্যে প্রধান। এই প্রধানই কারো কারো কাছে মহা অপ্রধান হয়ে উঠে আসছে। যে কারণে এরা ধর্মে এতটা ভয়ে বিবশ। আসলে এই ভয় থেকেই বিদ্বেষের জন্ম। তবে আশার খবর হলো এমন চিন্তক-শাসকের সংখ্যা অতি নগণ্য, সমাজ-সংসারে। এ শ্রেণীটির উৎপাত উৎকণ্ঠিত করে তুললেও তা বরাবরই সাময়িক। অতি ক্ষুদ্র সময়কেই আবেসিত করে, আচ্ছন্ন করে এরা। বয়সের হিসাবে পৌঢ়ত্বে উপনীত হলেও বুদ্ধি-বিবেচনায় শৈশবের চৌকাঠই যেন অতিক্রম করতে পারেনি এ জাতি। আচার-ব্যবহারে তেমনটাই প্রকাশমান। যেন ‘ডিমেনশিয়া ব্যাধিতে আক্রান্ত সমগ্র জাতি। কি শিক্ষিত কি অশিক্ষিত, সব একবরাবর। উপশমের কোন লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। দিন দিন আরো প্রকট হচ্ছে এ ব্যাধি। যে কারণে সামাজিক খাতার পৃষ্ঠা যেমন শূন্য, সাহিত্য-সংস্কৃতির জমিনও আগাছায় আকীর্ণ। কেবল সুফলা বুদ্ধি আর বিবেকের বাণিজ্য জমিন। যখন কোন দেশের শিক্ষিতজনরা বিভ্রান্তি ছড়ায় তখন বিভ্রাটে জড়িয়ে যায় জাতি। বাংলাদেশের যা হযবরল অবস্থা তাতে এর বাইরে আর কোন ভাবনার অবকাশ থাকছে না। কি রাজনীতি কি সমাজনীতি সব এলাকার দশাই দিকভ্রান্ত জাহাজের মতো। অনভিজ্ঞ নাবিকই কেবল এ জন্যে দায়ী তাই নয়, নাবিকের অসততাও এ ব্যাপারে প্রকটভাবে উঠে আসে এবং আসছে। কোন কারখানার পরিচালক বা মালিক যদি অসৎ বা দুর্নীতিগ্রস্ত হয় তখন কর্মচারীদের দুর্দশার অবধি থাকে না। পাশাপাশি কর্তা ব্যক্তিটি বা মালিক নির্বোধ হলেও বিপদ অবধারিতভাবে ধেয়ে আসে। তখন ধ্বংস অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। ইদানীং এই দেশ এই সমাজ-কাঠামো উভয়বিদ উপসর্গে আক্রান্ত। কারণ বয়সের তুলনায় বুদ্ধির ঘনত্ব আসেনি। শরীর বৃদ্ধির ব্যাপারটিও তথৈবচ। চিকিৎসা-বিজ্ঞানে যার নামকরণ করা হয়েছে ডিমেনশিয়া। এই ডিমেনশিয়া ব্যাধিতে আক্রান্ত জাতির তাই তেতাল্লিশ বছরেও বালকসুলভ আচরণকে অতিক্রম করতে পারল না। পত্রিকায় চোখ রাখলেই কেবল ধ্বংসের খবর। হিংসা-বিদ্বেষের শ্রেণীবিন্যাস। পৃষ্ঠাজুড়ে থাকছে অশান্তি আর অসত্যের উগলানো বয়ান। কোথাও আশার বাণী নেই। স্বস্তিদায়ক কোন চিন্তা-ভাবনা যেন ভুলতে বসেছে সবাই। চ্যানেলগুলোতেও দৃশ্যায়িত হচ্ছে জাতিবিধ্বংসী চিত্রাবলি দেশ-বৈরী কথকতা। ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়। থাকতেও পারে। আছেও, তবে তা খুবই নগণ্য, মাইক্রোস্কোপিক। তাই জাতি ভুগছে আশাহীনতায়, উদ্দেশ্যহীনতায়। শোভন চিন্তায় দেশপ্রেমে নিজেদের যুক্ত করতে ব্যর্থ হচ্ছে বারবার। হিংসা-বিদ্বেষ আর অসত্যের ডামাডোল এতটাই উচ্চনিনাদে বহমান যে, পরিবেশে ভিন্ন কিছু-চিন্তা করার অবকাশই থাকছে না। অপভাবনার নেপথ্যে পড়ে থাকছে শোভন ব্যবহার, চিন্তা-চেতনার ইতিহাস-ভূগোল। সুশীল সমাজের সুভাবনার মাঠটি এখন আগাছায় ভরপুর। এই আগাছা উৎখাতের কোন উদ্যোগ নেই। উৎসাহও যেন ফুরিয়ে গেছে। প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ক্ষমতাও একপ্রকার নিঃশেষের পথে। যে কারণে সমাজে অসত্য-অশান্তির জয়জয়কার-উল্লাস। নষ্ট সমাজে কষ্ট যেমন বৃদ্ধি পায়, ভ্রষ্টদের উৎপাতও বাড়ে পাল্লা দিয়ে। এই ভ্রষ্টতার বিস্তারে আতঙ্কিত সুনাগরিকগণ-নিরীহ জনতা। যে দেশের সুশাসনের ঘাটতি দেখা দেয় সেই মাটিতেই জন্ম নেয় ভ্রষ্ট চরিত্র, ভ্রষ্ট ধ্যান-ধারণা। এ রকমেরই একটি ভ্রষ্টতায় আটকে গেছে দেশ, জাতির বিবেক-বিবেচনা। দেশের বিদগ্ধজনরা যখন বিভ্রাটে নিপতিত হয় তখনি আমজনতার অস্থিরতা বাড়ে। মাছের পচন নাকি শুরু হয় মগজ থেকে। এই বঙ্গদেশেও সুশীল আর কুশীল একাকার। উন্মাদের আচরণ প্রতিটি প্রান্তেই। সাহিত্য-সংস্কৃতির অঙ্গনেও বিভাজন, দ্বন্দ্ব, দস্যুতা। সুশীল সমাজও আর সুশীল থাকছে না। দ্বন্দ্ব শেষাবধি মন্দের দিকে ধাবিত হচ্ছে। তেতাল্লিশ বছরেও তেমন কোনো অর্জন নেই এই অঙ্গনে, কেবলমাত্র হিংসা-বিদ্বেষের কারণে। নিষ্ঠুরতাই এখানে একটি বড় ধরনের উপসর্গ। আর একটি কারণ আপন-ভূমির প্রতি মমতার অভাব। অর্থবিত্তের প্রতি প্রচন্ড রকম লোভ লালসা। অন্যায়-অবিচারে এদের শীতলতা। এ সত্যটিকেই যেন আরো স্পষ্ট করে তুলে আনে। যাদের একমাত্র আরাধ্য হওয়া উচিত সমাজ-সংসারের মঙ্গল কামনা। এরাই যখন বিপরীত চিন্তায় বিভোর হয়, স্বার্থ ভাবনায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত থাকে প্রতিপলে তখনি দেশে নেমে আসে ঘোর অমানিশা। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে বাংলাদেশকেও যেন সে রকমেরই একটি ভয়ানক অমানিশা ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। এ থেকে বুঝি উদ্ধারের পথ নেই। হতাশা, শঙ্কা, আশঙ্কাই যেন এ জাতির নিয়তি। বিদগ্ধজনদের ভাবনার জাগরণ এবং সত্যের প্রতি প্রণতিই পরিবেশকে পরিশীলিত করার পথ প্রশস্ত করতে পারে। কিন্তু এমন আশা দূরাশায় পর্যবসিত হচ্ছে। দুর্ভাবনাকেও তুলে আনছে। এরপরও আশার দিকে হস্ত প্রসারিত রাখাটাই সুবিবেচনা। নষ্ট সমাজে বসতি বা নষ্ট শাসনে আক্রান্ত এমনটা ভাবতে কষ্ট হলেও এ রকম ভাবনা থেকে উদ্ধারের উপায় থাকছে না। চারপাশটায় দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে সেই নষ্টের ভিতরে কষ্টের ঢাক-ঢোল বেজে উঠছে বিকট আওয়াজে। তাই হতাশা আর অস্থিরতা বাড়ছে সমাজে-দেশে। বর্তমান বাংলাদেশের পরিবেশ-পরিস্থিতির সাথে যেন একাকার হয়ে যাচ্ছে ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রা.) একটি বাণী। বাণীটি হলো এ রকম- ‘ ‘কখন বুঝবে একটা দেশ ও সমাজ নষ্ট হয়ে গেছে? যখন দেখবে- দরিদ্ররা ধৈর্যহারা হয়ে গেছে, ধনীরা কৃপণ হয়ে গেছে, মূর্খরা মঞ্চে বসে আছে, জ্ঞানীরা পালিয়ে যাচ্ছে এবং শাসকরা মিথ্যা কথা বলছে।’ -হজরত আলী (রা.) প্রায় দেড় হাজার বছর আগে উচ্চারিত এই বাণী আজকের দিনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কতটুকু প্রযোজ্য, সেটাই ভাবছি। আমাদের দরিদ্ররা কি ‘ধৈর্যহারা’ হয়ে গেছে? না, এ দেশের প্রতিটি মানুষের মনে অনেক যন্ত্রণা। তাদের মুখে মুখে হাজারও অভিযোগ। কিন্তু তাদের ধৈর্য অপরিসীম। তারা অল্পতে তুষ্ট। পড়ে পড়ে মার খায়, তারপরও সালাম ঠোকে। আমাদের ধনীরা কি ‘কৃপণ’ হয়ে গেছেন? না, তারা কৃপণ নন। তারা বিদেশী খান, বিদেশী পরেন, বিদেশী মালামাল কেনার সময় দোকানসুদ্ধু কিনে ফেলতে চান। তারা মোটেই কৃপণ নন। তবে একটা জায়গায় তারা সত্যিই ‘কৃপণ’। তারা ‘হলমার্ক’, ‘কুইক রেন্টাল’, ‘পদ্মা সেতু’ ইত্যাদি শর্টকাট আঙুল-ফোলানো কারবারের প্রতি যতটা আকৃষ্ট, কর ফাঁকি, ওভার-আন্ডার ইনভয়েসিং, মানি লন্ডারিং ইত্যাদির সুযোগ যেভাবে লুফে নেন, তার ছিটাফোঁটাও দীর্ঘমেয়াদি শিল্প-কারখানায় বিনিয়োগে উৎসাহী নন। যেখানে মুনাফা কিছু কম তার ধারেকাছেও তারা হাঁটতে চান না। এ দেশের দরিদ্র মানুষের শ্রমের উপার্জনে গড়ে ওঠা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রায় বিনামূল্যে বিদ্যা অর্জন করার সুযোগ নিয়ে তারা গাছের মগডালে উঠেছেন। এখন সুযোগ পেলেই ভিন দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। সেই বিচারে তাদের এই স্বভাবগত বৈশিষ্ট্যকে রাষ্ট্র বা জাতির সঙ্গে ‘প্রতারণা’ বলা গেলেও ‘কৃপণতা’ বলা যায় না। আমাদের জাতীয় ‘রঙ্গমঞ্চে’ যারা আছেন তারা কি মূর্খ? না, তাদের ঢালাওভাবে মূর্খ বলার কোনোই সুযোগ নেই। তাদের অনেকেই উচ্চশিক্ষিত। উকিল-ব্যারিস্টার, প্রফেসর-ভাইস-চ্যান্সেলর, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার সবই আছেন। যদিও সেই শিক্ষা কাজে না লাগিয়ে তারা নীরবে নেতৃপদতলে প্রণিপাত হয়ে থাকেন। তবে তাকে আর যাই হোক, মূর্খতা বলা যাবে না। তারা বুদ্ধিমান। বুঝেশুনে লাভ-লোকসানের হিসাব কষেই কাজ করছেন। শিক্ষা ও বুদ্ধিমত্তার এর চেয়ে লাভজনক ব্যবহার আর কি হতে পারে? আমাদের জ্ঞানীরা কি পালিয়ে যাচ্ছেন? না, তারা মোটেই পালিয়ে যাচ্ছেন না। তারা রাজনীতির পেছনের কাতারে বসে ক্ষমতাবানদের নিরলস সেবা দিয়ে বিদ্যার তেজারতি চালিয়ে বহাল তবিয়তে মঞ্চ আলো করেই থাকছেন। তারা পালাবেন কেন? পালিয়ে গেছে যাত্রামঞ্চের সেই সুপরিচিত ভাঁড়টি, যার নাম ‘বিবেক’। আমাদের শাসকরা কি মিথ্যা কথা বলেন? জ্ঞানী ব্যক্তিরা বলেন, মিথ্যা তিন প্রকারের : ‘অর্ধ-মিথ্যা’, ‘মিথ্যা’ ও ‘সংখ্যাতত্ত্ব’। আমাদের শাসকরা প্রতিদিনই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির নানা সুখবর তুলে ধরছেন। পারিবারিক বাজেট মেলাতে গিয়ে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠলেও সরকারি বিশেষজ্ঞদের ‘বিজ্ঞাপনী বক্তৃতা’র চিত্তাকর্ষক সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ সব অপ্রাপ্তির যন্ত্রণা ভুলিয়ে দেয়। সাধারণ মানুষের পেট খালি থাকলেও মন ভরে যায় মোহনীয় সংখ্যাতত্ত্বে। ব্রিটিশ আমলের কৃষক নেতা আবদুর রহমান খান সাহেব সুরসিক ব্যক্তি ছিলেন। ষাটের দশকে এই বর্ষীয়ান নেতা সভা-বৈঠক মাতিয়ে রাখতেন। একদিন মরহুম আতাউর রহমান খান সাহেবের বৈঠকখানায় দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনায় তিনি বলে উঠলেন, ‘শোনেন। আমাদের গ্রামের হামিদের ছয়-সাতটা বাচ্চা। ওদের দুষ্টামিতে গ্রামের লোক অতিষ্ঠ। তার বন্ধু করিম একদিন তাকে বলছে, ‘কিরে হামিদ, তোর বউ নাকি আবার পোয়াতি হইছে?’ হামিদ নির্লিপ্ত স্বরে জবাব দেয় : ‘হ ভাই, কি আর করমু। পরের মাইয়া ঘরে আনছি। পেট তো খালি রাখতে পারি না!’ সব দেশেই শাসকরা কম-বেশি এভাবেই দেশবাসীর পেট ভরিয়ে থাকে। তবে শাসকরা সব সময়ই তার প্রতিপক্ষকে ‘মিথ্যুক’ বলে থাকে। ক’দিন আগে আমাদের প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছেন, ‘বেগম জিয়া মিথ্যা তথ্য দিয়ে দেশে-বিদেশে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন।’ অপরদিকে বেগম জিয়ার লোকেরা প্রতিদিনই সরকারি দলকে মিথ্যাবাদী আখ্যায়িত করে মাঠ গরম করে রাখছেন। দুয়ে দুয়ে চার হলে অতঃপর দেশের রাজনীতিকরা যা বলেন তার সবই ‘মিথ্যা’। আমাদের ক্ষমতাসীন সরকার ও ক্ষমতাচ্যুত সরকার এভাবেই প্রতিনিয়ত পরস্পরকে এমন ভাষায় আক্রমণ করে কথা বলেন, যা গ্রামের মহিলাদের ‘কাজিয়া’কেও হার মানায়। গ্রাম্য জীবনে মেয়েদের ‘কাজিয়া’ পরম উপভোগ্য বিষয়। আমি আমার শৈশবের প্রথম ৫-৬ বছর গ্রামে কাটিয়েছিলাম। বেশিরভাগ সময় কাটাতাম নানার বাড়িতে। নানীর পরম আদরের ধন ছিলাম। নানার বাড়ির অনেক স্মৃতির মধ্যে একটি হচ্ছে ‘কাজিয়া’। নোয়াখালীর ভাষায় ‘কইজ্জা’। আমার নানার বাড়ির ছিল তিন ‘হিস্যা’। বাড়ির ‘উত্তরের হিস্যা’ ও ‘দক্ষিণের হিস্যা’র দুই মহিলার বিরোধ মাঝেমধ্যে কাজিয়াতে গড়িয়েছে। প্রথমে দু’জনে কোমরে শাড়ি পেঁচিয়ে যার যার উঠানের নিরাপদ দূরত্বে থেকে পরস্পরের দিকে বাক্যবাণ ছুড়তে থাকেন। তারপর মাঝখানের উঠানটা হয়ে ওঠে তাদের রণক্ষেত্র। সেই রণক্ষেত্রের এক প্রান্ত থেকে একজন চীৎকার করে গালাগাল দিতে দিতে আঙুল উঁচিয়ে অপরজনের দিকে এগিয়ে আসছেন। অপরজন তখন তার হিস্যার উঠানে পিছু হটে সেখান থেকে ততধিক তীব্র ভাষায় জবাব দিচ্ছেন। ‘ইনি’ ক্লান্ত হয়ে গেলে ‘উনি’ একইভাবে কোমরে শাড়ি পেঁচিয়ে হাত উঁচু করে ধেয়ে আসেন। ‘ইনি’ তখন পিছু হটে নিজ উঠানের সীমানায়। বাড়ির মহিলা এবং ছেলেমেয়েরা চারপাশে গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে সেই অপূর্ব ক্রীড়াশৈলী উপভোগ করছে। কেউবা মোড়া টেনে এনে পানের বাটা হাতে জুত করে বসেছে (ভিআইপি গ্যালারি)। এভাবেই পালাক্রমে চলতে থাকে দুই পক্ষের ‘কবি’ (নরসিংদীতে ‘কবি’ বলতে বোঝায় অশ্লীল সুরেলা গালাগালি)। একসময় দু’জনের গলা ভেঙে যায়। ঘণ্টা-দু’ঘণ্টা চলার পর টি-ব্রেক। দর্শকরা বিশ্বকাপের ফাইনাল দেখার আনন্দ নিয়ে নিজ নিজ ঘরে। গ্রামের বিনোদনহীন জীবনে এক পশলা বিনোদন। আমাদের জাতীয় রাজনীতির দুই মহীয়সী সেভাবেই জাতির জীবনে বিনোদনের ঘাটতি পুষিয়ে দিচ্ছেন। পেট না ভরলেও মন ভরছে। তাদের দেশবাসীর পক্ষ থেকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। দরিদ্রের অসীম ধৈর্য হজরত আলী (রা.)-এর কথার এদিক-ওদিক করা হবে সখ্ত্ বেয়াদবি। তবু একটা প্রশ্ন মনে জাগে। শেরে খোদা প্রথমেই দরিদ্রদের ধৈর্যহারা হওয়ার কথা বলেছেন। দরিদ্ররা কি সহজে ধৈর্যহারা হয়? দরিদ্ররা সহজে ধৈর্যহারা হয় না বটে, তবে তারা ধৈর্যহারা হয়ে গেলে বিপদ। সে অবস্থাকে বলা হয় ‘নৈরাজ্য’- Anarchy। ফরাসি বিপ্লবকে Anarchy ছাড়া আর কী বলা যায়? Rosa Luxemburg-কে Anarch-র পক্ষে তার তত্ত্ব ও কর্মকাণ্ডের জন্য মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে ইলেকট্রিক চেয়ারে বসতে হয়েছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধও সেভাবে অনেকটা Anarchy দিয়েই শুরু হয়েছে। অতি সম্প্রতি দিল্লির আম আদমির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল নিজেকে Anarchist ঘোষণা দিয়ে বিপদে পড়েছেন। আমাদের শাসকদের অবশ্য সেজন্য ভয়ের কিছু নেই। কারণ, বাংলাদেশের দরিদ্ররা এখন খুবই ধৈর্যশীল। এই ধৈর্য অবশ্য এমনি এমনি আসেনি। পারস্য দেশের দুই ভাই। ছোটটি খুব চালাক-চতুর। কিন্তু বড়টি একেবারেই সরল-সোজা। সেই শহরে ছিল এক সুন্দরী রাজকন্যা। ভীষণ দজ্জাল প্রকৃতির। তার শর্ত, সে যাকে বিয়ে করবে তাকে প্রতি রাতে একশ’ ঘা জুতার বাড়ি খেতে হবে। রাজকন্যার রূপে আকৃষ্ট হয়ে এই কঠিন শর্ত মেনে নিয়ে অনেকে তাকে বিয়ে করতে এগিয়ে এসেছে। কিন্তু কয়েক দিন পরেই ছাড়াছাড়ি। প্রতিদিন একশ’ জুতার বাড়ি আর কত সহ্য করা যায়। (মনে হয় আজকের দিনের কোনো নারীবাদী লেখিকা টাইম মেশিনে চড়ে পেছনে গিয়ে এই গল্পটি লিখেছেন)। তারপরও সেই কঠিন শর্ত মেনে নিয়েই রাজবাড়িতে উপস্থিত হল বোকা বড় ভাইটি। দু’দিন পর সে রাজবাড়ি থেকে পালিয়ে এলো। দজ্জাল রাজকন্যার জুতার আঘাতে তার চাঁদিতে একটাও চুল অবশিষ্ট নেই। ছোট ভাইটি সব শুনে বলল, দাঁড়াও দেখাচ্ছি মজা। বড় ভাই তাকে অনেক বারণ করল। কিন্তু সে কিছুই শুনল না। রাজবাড়িতে গিয়ে ওই দজ্জাল মেয়েকে বিয়ে করল। দু’দিন, দশ দিন, মাস যায় ছোট ভাইটি রাজবাড়িতে বসবাস করছে। একদিন তাকে কাছে পেয়ে বড় ভাই লক্ষ্য করল তার মাথার সব চুল যথাস্থানেই আছে। কী ব্যাপার, কোন জাদু-মন্ত্রে এমনটি হল? বড় ভাই তার কাছে জানতে চায়। ‘খুব কিছু করতে হয়নি। কেবল শাদির পহেলা রাতে বিড়াল মেরেছি।’ -ছোটটি জানায়। মানে? বিয়ের রাতে প্রথমেই রাজকন্যা বলল, ‘খিদে পেয়েছে, খাব’। দু’জনে খেতে বসলাম। আর তখনই রাজকন্যার প্রিয় বিড়ালটি লাফ দিয়ে এসে ডাকল, মিউ, মিউ...। সঙ্গে সঙ্গে কোমর থেকে তলোয়ার বের করে একটা কোপ বসিয়ে দিলাম। রাজকন্যা হাঁ হাঁ করে তেড়ে উঠল- ‘এ কী হচ্ছে-? এ কী হচ্ছে-?’ বললাম, ‘আমি বেয়াদবি একেবারেই পছন্দ করি না।’ বলেই আরেক কোপ দিয়ে বিড়ালটাকে একেবারে দু’টুকরা করে ফেললাম। মেঝেটা রক্তাক্ত হয়ে গেল। রাজকন্যা ভয়ে সাদা। তারপর একেবারে চুপ। সেই থেকে পারস্য দেশে প্রবাদ- ‘শাদির পহেলা রাতে মারিবে বিড়াল’। পাদটীকা আমাদের মহান শাসকবৃন্দ ১৯৭২ সালের সেই পহেলা রাত থেকে বিড়াল মারতে মারতে এ দেশের মানুষকে ‘হাঁটু ভাঙা দ’ বানিয়ে ছেড়েছেন। এখন ওই রাজকন্যার মতো তাদেরও সব হাঁক-ডাক শেষ। অতঃপর তাহারা দুই শরিক কেবল ২০১৯ সাল পর্যন্ত নয়, অনন্তকাল ধরিয়া সুখে-শান্তিতে বংশপরম্পরায় পালাক্রমে রাজ্য শাসন করিয়া চলিবেন।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১২১০ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now