বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

দিদৃক্ষা-পর্ব- ৪

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Hossain (০ পয়েন্ট)

X শায়লা ঘরের দরজাটা সামান্য ফাকা রেখে চলে গেল। অতঃপর জ্বরের মস্তিষ্ক ভাবতে লাগলো শায়লার কথা। লাগছে এই নামটার সাথে আমি যেন পরিচিত। কিন্তু এই নামের সঙ্গে আমার কোথায় কিভাবে পরিচয় হয়েছে তা ঠিক মনে করতে পারছিনা। তবে এইটুকু মনে হচ্ছে, একসময় এই নামটা কারো না কারো মুখ থেকে আমি প্রচুর শুনেছি। শায়লার দেওয়া কফিটা খেয়ে মাথার যন্ত্রণাটা খানিক কমেছিলো। কিন্তু গায়ের তাপমাত্রার কোনো উন্নতি হচ্ছে না। এদিকে গাঁ পুরে ছাই হয়ে যাচ্ছে। সকাল ৭ টা বাঁজতে এখনো ৯ মিনিট বাকি। রুনা খাবার নিয়ে আসলে বলবো, কয়েকটা প্যারাসিটামল ছিঁড়ে যেন আমার হাতে দেয়। কিন্তু একটা সমস্যা আছে। ঐ মেয়েটা তো আমার ঘরে ঢুকবেনা, কারন এবাড়ির মেয়েদের অবিবাহিত পুরুষের দিকে তাকানোই নিষেধ। আর তার ঘরে প্রবেশ করা তো অনেক দূরের কারবার। তাহলে কিভাবে ওষুধ ছিঁড়বে? ধুর ছাই! বোকার মতো কি আবল তাবল ভাবছি আমি। এটা বললেই তো হয় যে, রুনা আমার গায়ে প্রচন্ড জ্বর, আমি উঠতে পারছিনা। দয়াকরে রাস্তা থেকে কোনো একটা ছেলেকে ডেকে আমার ঘরে পাঠিয়ে দাও, সে যেনো এসে কয়েকটা প্যারাসিটামল ছিঁড়ে আমার হাতে দেয়। জামিল ভাই ডিউটিতে নেই। তার স্ত্রী টাইফয়েড জ্বরে ভুগছেন। বেচারির একটু খোঁজ নিতে পারলে মনটা শান্ত হত। শুধু জ্বরাক্রান্ত মানুষই জানে জ্বরের কত কষ্ট। আজ ছুটির দিন। প্রথমদিনের দারোয়ান আঙ্কেল, যিনি আমাকে এই চিলেকোঠার ঘরটা দেখিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, আজ থেকে এখানে তুমি থাকবে, ঘরটা নোংরা, কিন্তু নিজের মতো করে পরিস্কার করে নেবে। গতকাল তিনি কথা দিয়েছেন কাউছার আঙ্কেলের সঙ্গে আজ আমাকে দেখা করিয়ে দেবেন। কিন্তু কিভাবে দেখা করবো? আমি তো বিছানা ছেড়ে উঠার সাহস জোগাতে পারছিনা। আজ দু-তিন দিন যাবত একজন মানুষের ঘর দখল করে বসে আছি। অথচ সেই মানষটাকেই এখনো দেখতে পাইনি। বাবাকে ফোন করা উচিৎ। নাহ্ থাক! অসুস্থতার কথা জানালে লোকটা শুধু শুধু টেনশন করবে। একটা আপেল মুখে নিয়ে এক কামড় দিয়ে আর খেতে পারলাম না। নাড়িভুঁড়ি উল্টে সব বেড়িয়ে গেল। কিছুক্ষন পর আবার চোখ মুখ অন্ধকার হয়ে আসলো। . জ্ঞ্যান ফিরলো দারোয়ান আঙ্কেলের স্পর্শে। তিনি আমার মাথার কাছে বসে বসে জলপটি দিচ্ছেন। চোখ মেলে তাকাতেই জিজ্ঞেস করলেন, - এখন কেমন লাগছে বাবা? আঙ্কেল আসসালামু আলাইকুম। আপনি কখন এলেন? - ওয়ালাইকুম আসসালাম। আমি কখন এলাম সেটা বড় কথা নয়। তুমি এমন জ্বর বাধিয়ে বসে আছো, একটা বার আমাকে ফোন করে জানাতে পারতে। কি পারতেনা? - আঙ্কেল আপনিই কিন্তু কাউছার আঙ্কেলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে নিষেধ করেছিলেন, মনে আছে? - হ্যা আমি কাউছার সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করতে নিষেধ করেছি। কিন্তু আমাকে তো ফোন করতে নিষেধ করিনি। আমাকে ফোন করে একটাবার জানালে পরিস্থিতি এতটা খারাপ হতো? - আঙ্কেল, এই মুহূর্তে আমার মাথায় যে মানুষটা বসে বসে জলপটি দিচ্ছেন, তিনিই যে এ বাড়ির মালিক জনাব কাউছার আহমেদ তা বুঝতে আমার খুব বেশি সময় লাগেনি, স্যার। আমার কথা শুনে কাউছার আঙ্কেল জলপটি থামিয়ে দিলেন। পাঞ্জাবির পকেট থেকে মোবাইলটা বেড় করে কাউকে ফোন করতে করতে বাইরে চলে গেলেন। রুনা খাবার নিয়ে চিলেকোঠার বাইরে অপেক্ষা করছিলো। আঙ্কেল বেড়িয়ে যাওয়ার সাথেই রুনা ঘরে ঢুকলো। একবাটি স্যুপ হাতে নিয়ে আমার পাশে বসলো রুনা। - ভাইজান আপনি একটু উইঠা বসেন। কাউছার হুজুর বলছে স্যুপটা আপনেরে মুখে তুইলা খাওয়ায় দিতে। একটা অসুস্থ মার্কা হাসি দিয়ে রুনাকে প্রশ্ন করলাম, - তুমি কি কাউছার হুজুরের কথার বাইরে, এক পাও নড়ো না? রুনা কপট হেসে বলল, - এখন চুপচাপ খান তো। "বেশি কথাইয়েন না, মাথা ব্যাথাইবো" মানে? - মানে হইল, বেশি কথা বইলেন না। মাথা ব্যাথা করবো। এটা আবার কোন ভাষা? - এইডা আমার আর লিজা আপার ভাষা। আমরা মাঝে মইধ্যে এমন মশকরা কইরা অনেক কথা কই। লিজা আপা হাসতে হাসতে খই হয়। আর আপা যহন হাসে, এতো সুন্দর যে লাগে ভাইজান আপনেরে বুঝাইতে পারতাম না। হা করেন হা? - আর খাবো না রুপা। স্যুপ টুপ খেতে ভাল লাগছে না। - ওমা, তাইলে কি খাইবেন? আর কাউছার হুজুর কইছে জোর কইরা খাওয়াইতে। আমি কিন্তু জোর করতে পারমু না। ভালোয় ভালোয় খায়া লন। - আচ্ছা রুনা এখন কয়টা বাজে? - এখন তো তাও বিকাল চাইরটা বাইজা গেছে। - কি বলো! আমি না একটু আগে দেখলাম, সকাল ৭ টা বাজতে ৯ মিনিট এখনো বাকি? এতো তাড়াতাড়ি বিকেল হয়ে গেল? - "হায়রে কপাল আমার! আপনি দেখি কিছুই জানেন না। তাইলে শোনেন, সকাল ৭ টা বাজে আমি আইসা গেটের সামনে খাউন দিয়ে গেছি। আমি তো জানতাম না আপনি অসুস্থ। তাই আর ঘুমের ডিস্টার্ব করিনাই। কিন্তু ভিতরে যে আপনি অজ্ঞান হয়ে বিছানায় পরে আছেন, সেইডা বুঝতে পারলাম দুপুর বেলা। দুপুরের খাউন আনার পর দেখি আপনি সকালের নাস্তাই খান নাই। তখন আস্তে আস্তে আপনেরে ডাক দিলাম। কিন্তু আপনি হা না কিছুই কইলেন না। আবার ডাক দিলাম, তাও কোনো কথা নাই। তখন আস্তে আস্তে দরজাটা ধাক্কা দিলাম। দেখি আপনি বেঘোরে ঘুমাইতেছেন। কাছে গিয়ে জোরে ডাক দিলাম তাও কোনো খবর নাই। তারপর গায়ে হাত দিতেই হাতটা আমার পুড়ে উঠলো। তখনই বুঝলাম আপনি জ্বরের ঠেলায় অজ্ঞান হয়ে গেছেন। সাথে সাথে কাউছার হুজুররে ডাক দিলাম, হুজুর আইসা আপনার এই অবস্থা দেইখা তখনই ডাক্তার ডাইকা আনলো। ডাক্তার আইসা কয়ডা ইঞ্জেকশন দিলো। তারপর কয়ডা ওষুধ দিয়ে চলে গেলো। এইবার বুঝলেন?" - আমার শরির যে এতোটা খারাপ তা আমি এই মাত্র তোমার কথা শুনে বুঝতে পারলাম রুনা। কাউছার আঙ্কেল আবার চিলেকোঠায় প্রবেশ করলেন। আমার পাশে বসে বললেন, - ডাক্তারকে ফোন করেছি। সে আবার আসছে। - আঙ্কেল, শুধু শুধু আপনি এতো কষ্ট করছেন। এসব জ্বর তিনবেলা তিনটে প্যারাসিটামল খেলেই ঠিক হয়ে যায়। - কি খেলে ঠিক হয় সেটা ডাক্তার বুঝবে। তুমি কি ডাক্তার? - না। - তাহলে চুপ করে থাকো। আঙ্কেল আমার ধারণা আপনি আমার বাবাকে ফোন করে আমার অসুস্থতার কথাটা জানিয়ে দিয়েছেন। - হ্যা জানিয়েছি। বলতে পারো জানাতে বাধ্য হয়েছি। অল্পস্বল্প জ্বর হলে জানাতাম না। কিন্তু তোমার শরিরটা খুবই খারাপ ছিলো দুপুরে। কাউছার আঙ্কেলের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই ডাক্তার সাহেব চলে আসলেন। . ঘরের ভেতর ঢুকতেই তাকে সালাম দিলাম, - আসসালামু আলাইকুম। - ওয়ালাইকুম আসসালাম। কেমন বোধ করছেন এখন? - জ্বি স্যার, একটু ভাল লাগছে। আরেকটা ইঞ্জেকশন দিয়ে দেই, আরেকটু ভাল লাগবে। ডাক্তার সাহেব প্রয়োজনীয় ওষুধপাতি দিয়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেলেন। তার সঙ্গে কথা বলতে বলতে কাউছার আঙ্কেলও বেড়িয়ে গেলেন। দরজার আড়ালে দুজন নারী বোরখা পরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সম্ভবত একজন কাউছার আঙ্কেলের স্ত্রী, অপরজন তার একমাত্র কন্যা লিজা। পরিবারের সবাই ইসলামি শরিয়ত মাফিক পর্দা মেনে চলে। ডাক্তার চলে যেতেই তারা হুরমুর করে ঘরে ঢুকলেন। বয়স্ক আন্টি তার মুখটা খুলে দিয়ে আমার পাশে বসলেন। অপর বোরখাওয়ালি আমার পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে রইলো। একচুল নড়াচড়া করছেনা ও। আন্টির তবু মুখ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু ওর চোখদুটো অবধি দেখা যাচ্ছে না। মুখস দিয়ে সম্পূর্ণ ঢেকে রেখেছে। আন্টি আমার কপালে হাত রেখে বললেন, - তুমি কি কিছু খাবে বাবা? স্যুপ খাবে? - না আন্টি স্যুপ খেতে আর ভাল লাগছে না। আমি একটু ভাত খেতে চাই, প্রচন্ড ক্ষুদা পেয়েছে। আন্টি পায়ের কোনায় দাঁড়িয়ে থাকা বোরখাওয়ালিকে ধমক মেরে বলল, - এই লিজা? খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেন? যা গিয়ে ভাত নিয়ে আয়। লিজা এক দৌড়ে নিচে চলে গেল। - এখন কেমন লাগছে, বাবা? - জ্বি আন্টি একটু ভাল লাগছে। আমাকে চিনতে পেরেছো তুমি? - জ্বি আন্টি। আপনি কাউছার আঙ্কেলের স্ত্রী। আর কাউছার আঙ্কেল আমার বাবার বন্ধু। সন্ধ্যা পর্যন্ত লাগাতার খেদমত করলেন আন্টি। তারপর সবাই চলে গেলেন। রাত নটা অবধি শরিরটা ভালই লাগছিলো। কিন্তু তারপর আবার মাথাটা ব্যাথা করতে লাগলো। কিছুক্ষন ছাদে হাটাহাটি করলাম। ভাল লাগলো না। আবার গিয়ে বিছানায় শুয়ে পরলাম। সময় পেড়িয়ে যায়, অথচ চোখে ঘুম আসে না। কাল অফিসে যাবো কিভাবে সেই নিয়ে বড় টেনশনে আছি। মাথাটা ব্যাথাইতাছে। কেউ যদি মাথাডা টিপ্প্যাইতো তাইলে একটু আরাম পাইতাম। হঠাৎ রুনার ভাষা বেড় হচ্ছে কেন মুখ দিয়ে? . সাড়ে দশটা নাগাদ দরজায় কেউ একজন নক করলো। বললাম, - ভেতরে আসুন। দরজা খোলা আছে। দরজা খুলে হুরমুর করে ঘরের ভেতর ঢুকে পরল শায়লা। ঢুকেই দরজাটা আবার লক করে দিলো। শায়লাকে এতো রাতে আমার ঘরে ঢুকতে দেখে বেশ খানিকটা চমকে গেলাম। - কি ব্যাপার আপনি! এতো রাতে এখানে কি মনে করে? - ছাদে হাটাহাটি করছিলাম। ভাবলাম আপনাকে একটু দেখে যাই। - সে ঠিক আছে। কিন্তু দরজা লাগালেন কেন? শায়লা আমার কথার জবাব না দিয়ে উল্টো প্রশ্ন ছুড়লো, - আপনার শরিরটা কেমন? আমি কি আপনার মাথায় একটু হাত দিতে পারি? - হুম পারেন। - একি! আপনার তো জ্বর কিছুই কমেনি দেখছি। ওষুধ ঠিকমতো খাচ্ছেন না? - খাচ্ছি। জ্বর কমেও গিয়েছিলো। কিন্তু নটার পর আবার হঠাৎ করে বেড়ে গেল। এন্টিবায়োটিক খাচ্ছি। দুএক দিনের মধ্যেই ঠিক হয়ে যাবে। আর আপনি এত রাতে আমার এখানে এসে বসে আছেন, আপনার পরিবারের লোকজন চিন্তা করছে না? - চিন্তা করার মতো কেউ থাকলে চিন্তা করতো। - মানে? আপনি না বললেন আপনার মা আছেন, ছোট ছোট ভাই আছে তিনটা। তারাও তো টেনশন করতে পারে তাই না? - ওটা আমার সৎ মা। আমি যখন ছোট ছিলাম তখন আমার মা মারা গেছেন। তারপর বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। দ্বিতীয় বিয়ে করার কয়েকবছর পর বাবা একটা এক্সিডেন্টে মারা যান। ঐ ভাইগুলোও আমার সৎ ভাই। বাবা মারা যাবার আগে ব্যাংকে আমার নামে একটা একাউন্ট করেছিলেন। সেখানে তার অঢেল টাকা পয়সা জমা করে গিয়েছিলেন। সেই টাকার লোভেই তারা এখন আমার সঙ্গে থাকেন। -ওহ আচ্ছা। আপনি আমাকে কিভাবে চেনেন? - আপনার কল এসেছে। ফোনটা রিসিভ করুন। ফোন হাতে নিয়ে দেখলাম কাউছার আঙ্কেলের কল। রিসিভ করে সালাম দিলাম, - আসসালামু আলাইকুম আঙ্কেল। - ওয়ালাইকুম আসসালাম। কি অবস্থা বাবা তোমার? ঘুমাওনি এখনো? শরিরটা কি বেশি খারাপ লাগছে? আমি কি আসবো? - না না আঙ্কেল, এখন অনেক সুস্থ লাগছে। আপনাকে আসতে হবেনা আর। আমি শুয়ে পরেছি। একটু পর ঘুমিয়ে পরবো। - আচ্ছা ঠিকাছে, নিজের খেয়াল রেখো। . আচ্ছা শায়লা, একটা কথা বলবেন? - কি কথা? এইযে আপনি, এতো রাতে আমার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে বসে আছেন, আপনার ভয় হচ্ছে না? - নাহ্ মোটেও ভয় হচ্ছে না। ভয় হতো, যদি আপনাকে আমি না চিনতাম। কিন্তু আমি তো আপনাকে চিনি। আর তারপরও যদি আপনার মধ্যে কোন কুমতলব থাকে, সেক্ষেত্রে আপনি খুব বেশিদূর এগুতে পারবেন না। কারন আপনি এখন অসুস্থ, শয্যাশায়ী। শায়লার কথা শুনে একটা অসুস্থমার্কা হাসি দিয়ে বললাম, - এখন তো মনে হচ্ছে আপনারই কোনো কুমতলব আছে। - হা হা হা । আচ্ছা, আপনার কাছে আমার শেষ প্রশ্ন, - আপনি আমাকে কিভাবে চেনেন? শায়লা আমার প্রশ্ন এড়িয়ে বলল, আমি কি আপনার মাথাটা মালিশ করে দেবো? - আপনি আমার কথা এড়িয়ে যাচ্ছেন শায়লা। দয়াকরে বলবেন কিভাবে চেনেন আমাকে? শায়লা এবার মুখ ঘুরিয়ে নিলো। কিছুক্ষন পর লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল, - আপনার খুব কাছের একজন বন্ধুর কথা মনে আছে? যে তার প্রেমিকাকে রক্ত দিতে গিয়ে এক্সিডেন্টে মারা যায়। - আপনি কি তরিকের কথা বলছেন? - জ্বি। আমিই ছিলাম সেই তরিকের অভাগিনী প্রেমিকা, যাকে রক্ত দিতে গিয়ে তরিক এক্সিডেন্ড করে মারা যায়। সেসময় আমার জরায়ুতে ছোট একটা অপারেশন হয়। যার জন্য অনেক রক্তের প্রয়োজন হয়। কিন্তু "বি নেগেটিভ" গ্রুপের রক্ত সহজে পাওয়া যায়না। তরিকের গ্রুপ ছিলো বি নেগেটিভ। এদিকে আপনার গ্রুপও বি নেগেটিভ। আমি যখন অপারেশন থিয়েটারে, তরিক তখন রাস্তায়। ও আমার বাবার সঙ্গে সিএনজিতে করে হাসপাতালে আসছিলো। হাসপাতালের সামনে মোর ঘুরতেই চলন্ত ট্রাক এসে সিএনজির উপর দিয়ে চলে যায়। তারপর দুজনেই মারা যায়। শায়লাকে থামিয়ে দিয়ে আনমনে কাঁদতে কাঁদতে বললাম, - তখনও বেচে ছিলো তরিক। ও যখন ইমারজেন্সি বিভাগে। তখন আমার কাছে খবর আসে। খবর পেয়ে ছুটে চলে যাই হসপিটালে। গিয়ে দেখি তরিক জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। প্রচন্ড রক্তক্ষয় হয়েছে ওর শরির থেকে। ডাক্তাররা বললো জরুরীভাবে দুইব্যাগ রক্ত লাগবে। আমি বললাম, আমার দুইহাত থেকে দুইব্যাগ রক্ত আপনারা একসঙ্গে নিন, তবুও আমার বন্ধুকে বাচান। ওরা তাই করলো। দুইহাতে দুইটা ব্যাগ লাগিয়ে দিলো। কিন্তু রক্তগুলো আর কাজে লাগাতে পারলো না। তার আগেই তরিক ফুরিয়ে গেল। - শায়লা পাগলের মতো কাঁদতে কাঁদতে বললো, আপনার সেই দুইব্যাগ রক্ত দিয়েই সেইদিন আমার অপারেশন সাকসেসফুল হয়েছিল। আপনার রক্ত আমার শরিরে বইছে। জানেন, তারপর থেকে আমার জীবনের সমস্ত স্বাধ ফুরিয়ে গেছে। তরিকের ফেসবুক আইডিটা আমার কাছেই ছিলো। সেখান থেকেই আপনাকে খুঁজে পাই। আপনার জন্য মনে দিদৃক্ষা ছিলো বটে, কিন্তু বাস্তবে কখনো আপনাকে খুঁজে পাবো তা কখনো কল্পনাও করিনি। আপনার দুইবন্ধু তখন মিরপুরে একটা ট্রেনিং করছিলেন তাইনা? - হ্যা। তখন ঢাকা শহরে আমার একমাত্র পরিচিত বন্ধু ছিল তরিক। আমরা দুইজন একই রুমে থাকতাম। - অনেক রাত হল, প্রায় ১ টা বাজে। আপনার চলে যাওয়া উচিৎ শায়লা। শায়লা চোখের পানি মুছতে মুছতে আমার কপালে হাত দিল, জ্বরের গতিবিধি দেখে বলল, - দেখেছেন আমি কতো পোড়া কপাল নিয়ে জন্মেছি। আমার জন্য আমার বাবা মারা গেল, আমার জন্য আমার ভালবাসার মানুষটা মারা গেল। আজ আমার জন্য আপনি অসুস্থ হয়ে বিছানায় পরে আছেন। - আপনার জন্য কেউ মারা যায়নি শায়লা। তাদের ভাগ্যে ওভাবেই মৃত্যু লেখা ছিল বলেই মারা গেছে। আপনিও একদিন মারা যাবেন, আমিও একদিন মারা যাবো, তাই বলে কি আমাদের মৃত্যুর জন্য অন্য কেউ দায়ী হবে? - আপনি যাই বলেন। আমি আপনাকে ছেড়ে আজ কোথাও যাচ্ছি না। আমার জন্য আপনি অসুস্থ হয়েছেন। আমাকে আপনার সেবা করতে দিন। এই বলেই মাথা মালিশ করতে লাগলো শায়লা। - আমি বাধা দিলাম না। এই মেয়েটা আর পাঁচটা মেয়ের মতো স্বাভাবিক জীবন পায়নি। বিষাদ ওকে সারাক্ষণ তাড়া করে বেড়ায়। আমি যদি ওর পাশে থেকে ওকে একটু খুশি রাখতে পারি, তবে ক্ষতি কি? কিন্তু এভাবে পাশে থাকা যাবে না। এটা অনৈতিক। এটা অবৈধ। - কেমন লাগছে এখন? শায়লা প্রশ্ন করলো। - খুব ভাল, এতো সুন্দর করে মাথা মালিশ করলে তো একসময় আমি ঘুমিয়ে পরবো। - শায়লা ফিকে হেসে বলল, আমি তো চাই আপনি ঘুমান। আপনি ঘুমালেই আমি চলে যাবো। শায়লার কোমল হাতের স্পর্শে চোখদুটো সত্যিই অনায়াসে বন্ধ হয়ে আসছে। - আপনাকে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করবো? - হ্যা জিজ্ঞেস করেন। - আপনি কি সবসময় শাড়ি পরেন? - হ্যা, কেন? - এমনি জিজ্ঞেস করলাম। - সত্যি এমনি জিজ্ঞেস করলেন? - না। - তাহলে? - শাড়িতে আপনাকে খুব মানায়। - এটা কি ঘুমের ঘোরে বললেন, নাকি সচল মস্তিস্কে? - জানিনা। - হা হা হা। . চিলেকোঠার একটা জানালা সম্পূর্ণ খোলা রয়েছে। সেখান দিয়ে জ্যোৎস্না গড়িয়ে গড়িয়ে ঘরের মধ্যে পরছে। সারাঘর অন্ধকার, স্রেফ জ্যোৎস্নার আলোয় টিপ টিপ করে জ্বলছে শায়লার চোখ। আমি চিত হয়ে শুয়ে আছি লম্বা বিছানায়। শায়লা আমার মাথার পাশে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে। ওর হাতদুটো কখনো আমার মাথার চুলে কখনো কপালে, কখনো বা চোখে, ঠোটে অথবা কানে অনিয়মে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এ যেন এক অচেনা ঘোড়, অজানা সুখ। যে সুখে চোখের পাতা কেবলই বুজে আসে। চলবে...?


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৭৫ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-
☆ ☆ ☆ ☆ ☆

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now