বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
মেয়েটা বড্ড অভিমানী ছিলো। মেয়েটা সবচেয়ে বেশি অভিমান করতো ছেলেটার সাথে। কারণ, ছেলেটা যে তার একান্ত আপন। তাই প্রিয় মানুষটার দেয়া সামান্য আঘাতও সে সইতে পারতোনা। তবুও সব জেনেশুনে ছেলেটা কারণে - অকারণে মেয়েটার মনের আকাশে অভিমানের মেঘ জমিয়ে দিতো। মেয়েটাকে রাগিয়ে দিতে আর মেয়েটার অভিমানী মুখটা দেখতেই যেন ছেলেটার যতো আগ্রহ। কারণ, ছেলেটা জানে, মেয়েটার খুব বেশি অভিমান কিংবা খুব বেশি রাগ হলে মেয়েটার দুচোখ থেকে বৃষ্টি ফোটার মতো অশ্রু ঝড়ে। ছেলেটা খুব আগ্রহ করে দেখে মেয়েটার ঠোটঁ ফোলানো অভিমানী মুখ, রাগে লাল হয়ে যাওয়া মেয়েটার গাল। অসম্ভব সুন্দর দেখায় মেয়েটাকে ঠিক ঐ মুহূর্তটাতে। এক পর্যায়ে মেয়েটার দুচোখ ভরে আসে, টলমল করে অশ্রুতে। নাকের ডগায় আর গালে রক্তিম আভা দেখা যায়। একটা মানুষের জল ভরা চোখ এতোটা মায়াবী হতে পারে এটা ছেলেটা মেয়েটাকে না দেখলে হয়তো বুঝতেই পারতোনা। কিন্তু এই পর্যায়ে এসে ছেলেটা আর পারেনা নিজেকে সামলে রাখতে। কারণ, মেয়েটার চোখের জল যে ছেলেটার বুকে ঝড় তুলে দেয়। সে চায় মেয়েটার চোখ থেকে যেন কখনোই একফোঁটা অশ্রুও গড়িয়ে না পড়ে।
তাই ছেলেটা মেয়েটার চোখ থেকে অশ্রুর ফোঁটা গড়িয়ে পড়ার আগেই জোর করে হেসে ওঠে। আর মেয়েটা টলমল চোখে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে ছেলেটার দিকে। পরক্ষণেই বুঝতে পারে প্রতিবারের মতো এবারেও ছেলেটা তাকে বোকা বানালো। ছেলেটা ইচ্ছে করেই তাকে রাগিয়ে দিতে চেয়েছে, আর সে নিজেও ছেলেটার ফাঁদে পা দিয়েছে। মেয়েটার এখন নিজের উপরেই প্রচন্ড রাগ হয়। কেন সে আবারো একই ভুল করলো! সেতো প্রতিজ্ঞা করেছিলো, ছেলেটা তাকে যতো যা-ই বলুক না কেন সে ছেলেটার সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে দেবে। এবার সে কিছুতেই বোকামি করবেনা। কিন্তু, এতো আটঘাট বেধেঁও কেন সে পারলোনা নিজেকে সামলাতে? কেন ছেলেটার ছল করে দেয়া মিথ্যে আঘাতটুকুও তার বুকে কাঁটার মতো বিঁধে যায়? ছন্নছাড়া ভাবনার সুতোগুলো মেয়েটাকে আনমনা করে ফেলে। অম্যদিকে, ছেলেটা দিশেহারা হয়ে ভাবতে থাকে কীভাবে সে তার প্রেয়সীর মান ভাঙাবে। অচিরেই ছেলেটার মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে। ডায়েরির পাতা থেকে খুব যত্ন করে আবৃতি করতে শুরু করে মেয়েটাকে নিয়ে লেখা তার কবিতার লাইন। ছেলেটা বেশ ভালো করেই জানে, এইবারে পাগলীটা কিছুতেই পারবেনা অভিমানের মেঘ জমিয়ে রাখতে। বরফ এবার গলবেই। হলোও ঠিক তাই।ধীরেধীরে মেয়েটার থমথমে মুখটাতে হাসির রেখা স্পষ্ট হতে থাকে আর গালের টোল দুটোও নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয়। ঠিক তক্ষুনি ছেলেটার মনে হয়, সময়টা যদি এখানেই থমকে যেতো! তাহলে, মেয়েটার গালের ঐ টোল দুটোর দিকে তাকিয়ে সে অনায়াসেই এক জনম কাটিয়ে দিতে পারতো।
কদিন ধরেই ছেলেটা কেন যেন মেয়েটাকে এড়িয়ে চলছে। যোগাযোগ প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। হুট করে সামনাসামনি চলে এলে ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে মেয়েটাকে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। ছেলেটা তো জানে, মেয়েটা তাকে ছাড়া একটা দিনও কল্পনা করতে পারেনা। তবুও কেন যে ছেলেটা মেয়েটাকে যন্ত্রণায় দগ্ধ করছে কে জানে! তবে কি ছেলেটা মেয়েটাকে ভুলতে বসেছে!! সে কী মেয়েটার অস্তিত্ব তার জীবন থেকে মুছে ফেলতে চায়? তাহলে এতোদিন এতো যত্ন করে ভালোবেসে স্বপ্ন দেখানোর কি মানে ছিলো!! সবটাই কী তার ছলনা? নাকি মেয়েটাকে নতুন করে রাগিয়ে দেয়ার এটাও একটা চাল? এরকম হাজারো প্রশ্ন প্রতিনিয়ত মেয়েটার মনে ঝড় তুলছে। এদিকে সেদিন এক পাত্রপক্ষ এসে মেয়েটাকে পছন্দ করে নিয়েছে। যদিও পাত্র আসেনি। প্রতিবারের মতো এবারেও মেয়েটা প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে বাবা-মাকে বুঝিয়ে সম্বন্ধটা ভাঙার। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছেনা। তারা বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করে নিয়েছে। ছেলেটা মাসখানেক আগেই খুব ভালো একটা চাকরি পেয়েছে। দুজনেই তখন ভেবে নিয়েছিলো, এবার আর দেরি করবেনা। চলতি মাসেই মেয়েটার বাড়িতে ছেলেটার বাবা-মাকে পাঠাবে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। কিন্তু, হঠাৎ করেই সবকিছু যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। মেয়েটা দিশেহারা হয়ে যায়, কি করবে ভেবেই কূল পায়না।
মেয়েটার বাড়িতে পুরোদমে বিয়ের প্রস্তুতি শুরু হয়। সাথে সাথে মেয়েটার মনে ছেলেটার প্রতি রাগ আর ঘৃণার পাহাড় জমা হয়। সে ভাবতে থাকে, উল্টোদিকের মানুষটা তাকে ছেড়ে যদি দিব্যি ভালো থাকতে পারে তবে, সে নিজে কেন পারবেনা একটা স্বার্থপর ছেলেকে ভুলে থাকতে! মনটাকে বারংবার শক্ত বাধঁনে বাধঁতে চাইলেও মেয়েটা কিছুতেই পারছেনা ঐ মানুষটাকে ভুলতে। বরং, যতোই সে ভুলে থাকার চেষ্টা করছে ততোই ছেলেটার বলা প্রতিটা কথা, প্রতিটা অনুভূতি, তার লেখা কবিতার প্রতিটা লাইন আরো বেশি করে মনে পড়ে যাচ্ছে। মেয়েটা বেশ বুঝতে পারছে, তার বিয়ে অন্য কারো সাথে হলে তাকে জ্যান্তলাশ হয়ে থাকতে হবে, মিথ্যে সুখের অভিনয় করে যেতে হবে সারাজীবন। হঠাৎ একদিন মেয়েটার প্রিয় বান্ধবী যে কিনা তাদের দুজনের ব্যাপারে সবটাই জানে, সে এসে জানায় সে নাকি ছেলেটাকে দেখেছে বিয়ের বেনারসি কিনতে। এইবার মেয়েটার কাছে সবকিছু স্পষ্ট হয়ে যায়। সে বুঝতে পারে, ছেলেটা তার বাধঁন ছিড়ে ফেলে অন্য সুতোয় নিজেকে বাধঁতে চাইছে। মেয়েটা ভাবতে বসে, তবে কি তাদের সম্পর্কটা নাজুক সুতোয় বাধাঁ ছিলো? পরে নিজেই আবার নিজেকে বোঝায়, এখানে তার তো কোনো দোষ নেই, মুখোশের আড়ালে থাকা ছেলেটার কুৎসিত রুপটাকে সে আগে দেখতে পায়নি।
বদলে গেছে দিন.....;
বদলে গেছে রাত.....।
বদলে গেছে পাশাপাশি.....;
আঁকড়ে ধরা হাত......।
শুধু বদলাইনি আমি......;
হয়তোবা আমি কম দামী.....।
তবু ও যেন নেই মানে....;
তাকিয়ে একটিবার.......।
দেখি তাহার পানে......;
একটুকু সুখের ছোঁয়ায়......।
একটু ভালোবাসায়.......;
পাওয়া না পাওয়ার ভেলায়......।
হারিয়েছি সব হেলায়......;
সে কি ছিলো প্রেম নামক ভালোবাসা.....?
নাকি ভালোবাসা নামক প্রেম......?
বুঝতে হয়েছে বড্ড দেরি.....।
তাইতো আজ আমি......;
বেশ নিশ্চুপ প্রহরী......।।
মন থেকে ছেলেটার ভাবনা এক পাশে সরিয়ে মেয়েটা এবার নিজেকে বিয়ের জন্য প্রস্তুত করতে থাকে। অন্যদিকে, ছেলেটা তার হবু বউয়ের জন্য প্রতিটা শাড়ি, গহনা থেকে শুরু করে সমস্তকিছু নিজে পছন্দ করে কিনে নেয়। আর কল্পনায় বারংবার তার অপ্সরীকে সাজায় নতুন রুপে, নতুন সাজে। দেখতে দেখতে সেই কাঙ্ক্ষিত দিনটি চলে আসে। একবুক যন্ত্রণা নিয়ে মেয়েটা নীল বেনারসিতে বউ সাজে। আজ তাকে একদম আকাশ থেকে নেমে আসা নীলপরীর মতো লাগছে। না চাইতেও মেয়েটার মনে পড়ে যায়, ছেলেটা চেয়েছিলো মেয়েটাকে ঠিক এইরকমভাবে বউ সাজে দেখতে। আজকে মেয়েটা একদম ছেলেটার মনের মতো করেই সেজেছে। শুধু মানুষটা বদলে গেছে, আজ সে অন্য একটা মানুষের জন্যে বউ সেজেছে। অন্যদিকে, ছেলেটা বরযাত্রী নিয়ে বেড়িয়ে পড়েছে তার স্বপ্নকন্যাকে আনতে। ছেলেটার কাছে মনে হচ্ছে, আজকে যেন পথ কিছুতেই শেষ হচ্ছেনা। ছেলেটা তার অপ্সরীর জন্য লেখা নতুন কবিতাটা হাতে নিয়ে বারবার চোখ বুলায় আর মিটিমিটি করে হাসতে থাকে। ছেলেটা ভাবতে থাকে, আজকে মেয়েটার অভিমান ভাঙবে তো? এবার যে মেয়েটাকে সে অনেক বেশিই কাঁদিয়েছে।
বরযাত্রী মেয়েটার বাড়ি অব্দি পৌঁছাতে পারেনা, পথিমধ্যেই একটা মারাত্নক এক্সিডেন্ট হয়। মেয়েটা খবর পায়, এক্সিডেন্টে হসপিটালে নেয়ার পরে বরসহ আরো দুজন মারা গেছে। খবরটা শুনে একদিকে মেয়েটা নিশ্চিন্ত হয় এই ভেবে যে, শেষ পর্যন্ত বিয়েটা তাকে করতে হয়নি। আবার একটু খারাপও লাগে, না জানি কার মায়ের কোল খালি হলো! বেচারা কতো আশা নিয়ে আসছিলো বিয়ে করতে। মেয়েটার বাড়ির লোক হসপিটালে যায় লাশ দেখতে। মেয়েটা যাওয়ার ব্যাপারে তেমন কোনো আগ্রহ দেখায়নি, কেউ তাকে নিতেও চায়নি। হসপিটাল থেকে মেয়েটার ভাই ফিরে এসে মেয়েটার হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দেয়, মৃত্যুর আগে নাকি মেয়েটার হবু বর মেয়েটাকে এইটা দিতে বলেছে। মেয়েটা অবাক হয়ে ভাবে, ঐ মানুষটাকে তো সে চিনতোনা, কোনোদিন কথাও হয়নি। তাহলে মানুষটা কি এমন কথা লিখে রেখেছে এই কাগজে তার জন্যে! দুরুদুরু বুকে কাঁপাকাঁপা হাতে মেয়েটা কাগজটা খুলে দেখে চিরচেনা সেই হাতের লেখায় লেখা একটা কবিতা। মেয়েটা কবিতাটা পড়তে শুরু করে।
তোমায় নিয়ে আমার আমি বাঁচি,
তুমি আছো হৃদয়ের কাছাকাছি।
হৃদয় মাঝে তোমারই শুধু ছায়া,
তুমি হীনা জীবন আবছায়া।
মন গহীনে তোমার বসবাস,
তোমায় নিয়ে বাচাঁর অভিলাষ।
আসুক যতোই বাধাঁ, বিপত্তি, প্রলয়,
তোমার জন্যে করবো সবি জয়।
বুকের মাঝে আগলে রেখো আমায়,
আপন করে পেতে চাই তোমায়।
তোমায় নিয়ে সাজাবো সুখের বাসা,
পূর্ণতা পাবে আমাদের ভালোবাসা।
কবিতার শেষে খুব যত্ন করে লেখা,
"লক্ষীটি, আর রাগ করে থেকোনা। আমি জানি, তুমি অনেক কষ্ট পেয়েছো। তোমায় কষ্ট দিতে গিয়ে আমিও প্রতিনিয়ত কষ্ট পেয়েছি। আর তো মাত্র কিছুক্ষণ! এরপরেই আমাদের কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নটা পূর্ণতা পাবে। আমাদের সব কষ্ট, সব অপেক্ষার অবসান হবে। কথা দিচ্ছি,আজ থেকে আর কক্ষনো এক মুহূর্তের জন্যেও তোমার চোখে পানি আসতে দেবোনা, সারাক্ষণ হাসিখুশি রাখবো তোমায়। আর তোমার ঐ হাসিমাখা মুখের দিকে তাকিয়ে তোমার গালের টোল দুটোর গভীরতা মাপবো।"
মেয়েটার পৃথিবীটা ঝাপসা হতে শুরু করে। ছেলেটা তাহলে তাকে ধোঁকা দেয়নি! ছেলেটা তাকে বউ করে ঘরে তুলে চমকে দিতে চেয়েছিলো! মেয়েটার এই বউসাজ তাহলে শুধুমাত্র ঐ মানুষটার বউ হওয়ার জন্যেই! মেয়েটা না জেনেশুনে ছেলেটাকে স্বার্থপর, মুখোশধারী, কুৎসিত মনের মানুষ ভেবে নিয়েছিলো! আর সেইজন্যেই কি সৃষ্টিকর্তা মানুষটাকে তার কাছ থেকে কেড়ে নিলো? মানুষটাকে সে পেয়েও হারিয়ে ফেললো চিরদিনের জন্য। ছেলেটা যে তাকে কথা দিয়েছে, আজকের পর থেকে আর কক্ষনো মেয়েটার চোখে অশ্রু আসতে দেবেনা। তাহলে কেন সে কথা দিয়েও কথা রাখছেনা! মেয়েটা আর ভাবতে পারেনা, জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যায় মেঝেতে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now