বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
By জাফর ইকবাল
দুই থেকে তিন ঘণ্টার মাঝে করার নিয়ম। আমরা হয়তো আরো একটু তাড়াতাড়ি করব। দুই ঘণ্টা পর য়ুহা শীতলঘরটিতে আবার ফিরে এসে প্যানেলগুলোর দিকে তাকালো। এগারোজন মানুষকে এগারোটি পাথরের মূর্তির মতো দেখাচ্ছে। তাদের শরীরে প্রাণের স্পন্দন দূরে থাকুক কোনো ধরনের রাসায়নিক বিক্রিয়ার কোনো চিহ্ন নেই। য়ুহা দীর্ঘ সময় রায়ীনার নিষ্প্রাণ মুখমণ্ডলের দিকে তাকিয়ে থাকে। এই মেয়েটির দেহে সত্যি কি আবার প্রাণ সঞ্চার করা যাবে? সেটি কি এই মেয়েটির জন্যে একটি জীবনের শুরু হবে না কি একটা ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নের শুরু হবে? য়ুহা কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে জিজ্ঞেস করল, এই এগারোজনকে দেখে-শুনে রাখবে কে? আমাদের কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক। য়ুহা ভুরু কুঁচকে বলল, যদি কোয়ান্টাম নেটওয়ার্কে কোনো সমস্যা হয় মানুষটি শব্দ করে হেসে বলল, সমস্যা হবে না। যদি হয়। হবে না। আমি কথার কথা বলছি। যদি হয়? মানুষটি বলল, তুমি কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক সম্পর্কে জান না বলে এ রকম বলছ। কোয়ান্টাম নেটওয়ার্কে কখনো সমস্যা হয় না। এখানে চারটি স্তর আছে। একটি স্তর নষ্ট হলে অন্যটা দায়িত্ব নেয়। সেটা নষ্ট হলে অন্যটা। যখন কোনো স্তর নষ্ট হয় সেটা নিজে থেকে নিজেকে সারিয়ে নেয়। অনেকটা জৈবিক প্রাণীর মতো শুধু প্রাণী থেকে অনেক বেশি চৌকস! য়ুহা কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল, যদি কেউ কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক একটা নিউক্লিয়ার বোমা দিয়ে উড়িয়ে দেয় তাহলে কি এই এগারোজন মারা যাবে? না। মারা যাবে না। এই সিলিন্ডারের যে ব্যাকআপ সিস্টেম আছে সেটা দায়িত্ব নেবে। তাকে বাঁচিয়ে রাখবে। মানুষটি ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, তুমি এ রকম অদ্ভুত অদ্ভুত প্রশ্ন কেন জিজ্ঞেস করছ? রুহা মাথা নাড়ল, বলল, মোটেও অদ্ভুত প্রশ্ন নয়। এগুলো অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন। এগারোজন মানুষের জীবনের দায়িত্ব খুব সহজ দায়িত্ব নয়। মানুষটি হা হা করে হেসে বলল, এই কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক পুরো মহাকাশযানটা মহাকাশে উড়িয়ে নেবে। শুধু এই এগারোজন নয় আমাদের সবার জীবনের দায়িত্ব কোয়ান্টাম নেটওয়ার্কের। য়ুহা মাথা নেড়ে বলল, ভাগ্যিস আমার কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক হয়ে জন্ম হয়নি–আমি কখনো এত বড় দায়িত্ব নিতে পারতাম না! মানুষটি হেসে বলল, কিন্তু কোয়ান্টাম কম্পিউটার এই দায়িত্বটি নেয়। রুটিনমাফিক নেয়। মিটিয়া নামে কমান্ডের ডাক্তার মেয়েটি য়ুহার ওপর ঝুঁকে পড়ে তার কপালের পাশে একটা প্রোব লাগাচ্ছিল। মেয়েটি বেশ হাসিখুশি, দুক্ষ হাতে কাজ করতে করতে সে গুনগুন করে একটা ভালোবাসার গান গাইছে। প্রিয় মানুষটি মহাকাশে হারিয়ে গেছে, ভালোবাসার মেয়েটি জানালা দিয়ে দূর আকাশের একটি নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে ভাবছে, এটি কি তার প্রিয় মানুষের মহাকাশযান-গানের কথাগুলো এ রকম। য়ুহা বলল, তুমি খুব সুন্দর গাইতে পার।
মিটিয়া হেসে বলল, তার অর্থ তুমি কখনো গান বা সঙ্গীত শোনো না! সে জন্যে বলছ আমি সুন্দর গাইতে পারি। য়ুহা বলল, শুনি। সে জন্যেই বলছি। তোমার গলা খুব সুন্দর। ধন্যবাদ। কমান্ডের এই কঠিন কাজ করতে করতে তুমি গান গাইবার সময় পাও?। পাই না। তাই কাজ করার সময় গুনগুন করি। তুমি এখন কী করছ মিটিয়া। মিটিয়া মাথা নেড়ে বলল, বিশেষ কিছুই না। তুমি যেহেতু প্রথমবার যাচ্ছ তাই তোমাকে নিয়ে আমরা একটু বেশি সতর্ক থাকছি, আর কিছু না। আমাকে নিয়ে তোমাদের ব্যস্ত হতে হবে না। প্রশিক্ষণের সময় আমাকে খুব ভালোভাবে প্রস্তুত করে দিয়েছে। প্রশিক্ষণ ক্যাম্প আর আসল মহাকাশযানে অনেক পার্থক্য। প্রশিক্ষণ ক্যাম্প সবকিছু হয় নিয়মমাফিক। রুটিনমাফিক। সত্যিকারের মহাকাশযানে বিচিত্র বিচিত্র ঘটনা ঘটে। প্রত্যেকটা অভিযান হচ্ছে নতুন, প্রত্যেকটা অভিযান হচ্ছে বিচিত্র! এখন পর্যন্ত একটা অভিযানে আমি যাইনি যেখানে নতুন একটা কিছু ঘটেনি। য়ুহা মাথা ঘুরিয়ে মিটিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার কী মনে হয়? এই অভিযানেও কী নতুন কিছু ঘটবে? ঘটতেই পারে? কী ঘটতে পারে বলে তোমার মনে হয়? মিটিয়া খিল খিল করে হেসে বলল, সেটা আমি আগে থেকে কেমন করে বলব? তুমি যেহেতু নতুন মানুষ তুমি কিছু একটা কর। য়ুহা মাথা নেড়ে বলল, সেটা তুমি খারাপ বলনি! আমারই কিছু একটা করা দরকার। মিটিয়া বড় বড় দুটি বেল্ট হাতে নিয়ে বলল, এখন তুমি কয়েক মিনিট চুপ করে বস, তোমাকে এই সিটের সাথে এখন শক্ত করে বেঁধে ফেলতে হবে!। য়ুহা নিঃশব্দে বসে রইল, মিটিয়া তার দক্ষ হাতে তাকে আরামদায়ক চেয়ারটায় আটকে ফেলে বলল, চমৎকার! এখন তুমি ইচ্ছে করলেও কোনো বিপদ ঘটাতে পারবে না। য়ুহা বলল, আমার বিপদ ঘটানোর কোনো ইচ্ছে নেই!
শুনে খুশি হলাম। মিটিয়া য়ুহার হাত ধরে বলল, তোমার শরীরের সকল কাজকর্ম এখন কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছে। তোমার কোনো অসুবিধা হবার কথা নয়। তার পরেও যদি মনে করো তোমার কিছু একটা সমস্যা হচ্ছে তাহলে এই লাল লিভারটা টেনে ধরো। ঠিক আছে। তুমি এখন চুপচাপ শুয়ে থাক। কিছুক্ষণের মাঝেই আমরা রওনা দেব। চমৎকার। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ মিটিয়া। ধন্যবাদ য়ুহা। মিটিয়া চলে যাবার পর য়ুহা আরামদায়ক চেয়ারটাতে সমস্ত শরীর এলিয়ে দিয়ে আধশোয়া অবস্থায় অপেক্ষা করতে থাকে। তার এখনো বিশ্বাস হয় না যে সে সত্যি সত্যি একটি মহাকাশ অভিযানে যাচ্ছে। পদার্থ প্রতি পদার্থের বিক্রিয়ায় যে প্রচণ্ড শক্তির সৃষ্টি হবে সেই শক্তিতে এই মহাকাশ্যানটি তীব্র গতিতে ছুটে যাবে। সেই গতির কারণে সময় স্থির হয়ে যেতে চাইবে–সেই মুহূর্তগুলো কি সে অনুভব করতে পারবে? য়ুহা এক ধরনের উত্তেজনা নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। ক্যাপ্টেন ক্ৰবের গলায় একটা ঘোষণা শুনতে পেল য়ুহা, শান্ত গলায় বলছে, মহাকাশযানের সবাইকে যাত্রার জন্যে প্রস্তুত হতে বলছি। আমি ইঞ্জিন দুটো শুরু করছি এখন। য়ুহা একটা চাপা গুমগুম শব্দ শুনতে পেল। হঠাৎ করে মহাকাশযানটি থরথর করে কাঁপতে থাকে। কিছু একটা হঠাৎ ঘটে গেল, য়ুহার মনে হতে থাকে অদৃশ্য কোনো একটা শক্তি তাকে যেন তার চেয়ারে প্রচণ্ড শক্তিতে চেপে ধরেছে! য়ুহা প্রাণপণে নিজেকে সেখান থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করে, তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যেতে চায়, সে বড় বড় মুখ করে নিঃশ্বাস নেয়, ৩ মনে হয় সে বুঝি বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। মহাকাশযানের মাঝে একটা লাল আলো কিছুক্ষণ পর পর ঝলকানি দিতে থাকে। একটা চাপা যান্ত্রিক শব্দ ভেসে আসে। পুরো মহাকাশযানটি থরথর করে এমনভাবে কাঁপতে থাকে যে য়ুহার মনে হতে থাকে পুরো মহাকাশযানটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। যতই সময় যেতে থাকে য়ুহার মনে হয় অদৃশ্য শক্তিটা বুঝি তাকে আরো জোরে চেপে ধরছে। তার মনে হতে থাকে সে বুঝি তার চোখের পর্দাটাও আর খুলতে পারবে না। মাথায় এক ধরনের ভোতা যন্ত্রণা অনুভব করতে থাকে, চোখের ওপর একটা লাল পর্দা খেলা করতে থাকে। মুখের ভেতরটা শুকিয়ে গেছে, সে প্রবল এক ধরনের তৃষ্ণা অনুভব করে। য়ুহার মনে হতে থাকে সে বুঝি জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে, কিন্তু যে কোনো মূল্যে সে জেগে থাকতে চায়। য়ুহা প্রচণ্ড গতির সেই বিস্ময়কর শুরুটুকু নিজের চোখে দেখতে চায়, নিজের ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করতে চায়। প্রাণপণে সে চোখ খোলা রেখে বড় বড় নিঃশ্বাস নিতে থাকে। সে বিড়বিড় করে নিজেকে বলল, আমি অচেতন হব না। কিছুতেই অচেতন হব না। কিছুতেই হব না? য়ুহা দাঁতে দাঁত কামড় দিয়ে শক্ত হয়ে বসে থাকে। সে অনুভব করতে থাকে তার শরীরের মাংসপেশিতে ভোতা এক ধরনের যন্ত্রণা। সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে, মনে হচ্ছে কেউ যেন টেনে তার মুখের মাংসপেশি পেছন দিকে সরিয়ে নিয়েছে, মুখ থেকে দাঁতগুলো বের হয়ে আসছে, চেষ্টা করেও সে সেটা বন্ধ করতে পারছে না। এটি একটি অভূতপূর্ব অনুভূতি। য়ুহা নিজেকে বোঝাল, পৃথিবীর খুব বেশি মানুষের এই অনুভূতিটি অনুভব করার সৌভাগ্য হয়নি। আমি নিঃসন্দেহে একজন সৌভাগ্যবান মানুষ। অত্যন্ত সৌভাগ্যবান মানুষ। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি য়ুহা এক সময় এই ভয়ঙ্কর পরিবেশে অভ্যস্ত হয়ে গেল। সে অনেক কষ্ট করে বড় বড় নিঃশ্বাস নিতে নিতে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকে। কোনো একটা বিচিত্র কারণে সে পরিষ্কার করে কিছু চিন্তা করতে পারছিল না, মাথার ভেতরে কিছু একটা দপদপ করছে, সে তার সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে অপেক্ষা করছে কখন এটি শেষ হবে। বুকের ওপর চেপে বসে থাকা অদৃশ্য পাথরটি সরে যাবে, আবার সে উঠে বসতে পারবে।
য়ুহার কাছে যখন মনে হয় বুঝি অনন্তকাল কেটে গেছে তখন হঠাৎ করে মহাকাশযানের ত্বরণ কমে আসতে শুরু করে। য়ুহার হঠাৎ করে মনে হতে থাকে তার সারা শরীর বুঝি পাখির পালকের মতো হালকা হয়ে আসছে। যখন মিটিয়া এসে তার বেল্টটি চাপ দিয়ে খুলে তাকে বের করে আনল, তখন য়ুহা তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, অনেক ধন্যবাদ মিটিয়া, আমার মনে হচ্ছিল, আমি বুঝি আর কখনো এই অদৃশ্য দানবের হাত থেকে মুক্তি পাব না! মিটিয়া য়ুহার দিকে তাকিয়ে বলল, প্রথমবার হিসেবে তুমি চিৎকার করেছ য়ুহা। তোমাকে নিয়ে আমাদের রীতিমত গর্ব হচ্ছে। ধন্যবাদ মিটিয়া। এরপরের ধাপে তুমি নিশ্চয়ই আরো ভালো করবে! পরের ধাপ? হ্যাঁ। এর পরের ধাপ! য়ুহা ভুরু কুঁচকে বলল, এর পরের ধাপ মানে কী? মহাকাশযানটি ক্রমাগত তার গতিবেগ বাড়িয়ে চলে। একবারে তো করা যায় না, তাই এটাকে ধাপে ধাপে করতে হয়। প্রত্যেকবারই তার গতিবেগ আগের থেকে বাড়িয়ে তোলা হয়। মাঝে মাঝে আমরা বিরতি দিই, তখন দৈনন্দিন কাজগুলো সেরে নিতে হয়। খাওয়া-দাওয়া করি। য়ুহা ভয় পাওয়া গলায় বলল, আবার মহাকাশযানের গতি বাড়ানো হবে? আবার আমাকে মহাকাশযানের চেয়ারে বেল্ট দিয়ে বেঁধে বসতে হবে? হ্যাঁ। মিটিয়া মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, একবার নয়, অনেকবার। অনেকবার? হ্যাঁ। প্রত্যেকবারই আগেরবার থেকে বেশি তীব্রতায় এবং বেশি সময় ধরে। য়ুহা ফ্যাকাসে মুখে বলল, সত্যি? হ্যাঁ, সত্যি। তবে ভয় নেই-তুমি দেখবে ধীরে ধীরে পুরো ব্যাপারটায় তুমি অভ্যস্ত হয়ে পড়েছ! তার মানে আমার আর কষ্ট হবে না? মিটিয়া য়ুহার হাত স্পর্শ করে বলল, আমি সেটা বলিনি। কষ্ট যেটুকু হবার সেটা তো হবেই। তাহলে? কষ্ট সহ্য করা শিখে যাবে।
ঘণ্টা দুয়েক পর য়ুহা আবার আবিষ্কার করল, তাকে মহাকাশযানের আরামদায়ক চেয়ারটিতে শক্ত করে বেঁধে ফেলা হয়েছে। সে নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করতে থাকে। বিশাল মহাকাশযানটি আবার ঝটকা দিয়ে থরথর করে কাঁপতে শুরু করে। মহাকাশযানের ভেতর একটা লাল আলোর ঝলকানি দেখা যায়, য়ুহার মনে হতে থাকে তার বুকের ওপর একটা অদৃশ্য পাথর ধীরে ধীরে চেপে বসেছে। হব না। আমি অচেতন হব না। য়ুহা বিড়বিড় করে বলল, আমি কিছুতেই অচেতন হব না। য়ুহা তার সমস্ত স্নায়ুকে শক্ত করে পাথরের মতো বসে থাকে। মনে হতে থাকে বুঝি অনন্তকাল কেটে যাচ্ছে। ধাপে ধাপে মহাকাশযানের গতিবেগ বাড়িয়ে শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত গতিবেগে পৌঁছানোর পর মহাকাশযানের ভেতরের অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে এলো। খাবার টেবিল ঘিরে কমান্ডের সবাই এসে বসেছে, ক্যাপ্টেন ব য়ুহার দিকে তাকিয়ে চোখ মটকে বলল, এই যে কবি য়ুহা তোমার অবস্থা কেমন? ভালো। তোমার খুব দুর্ভাগ্য যে তুমি একটা সামরিক মহাকাশযানে যাচ্ছ। সাধারণ যাত্রীদের মহাকাশযানে এত কষ্ট নেই। কষ্ট ছাড়া যদি যাওয়া যায় তাহলে মিছি মিছি কষ্ট করা হয় কেন? সময় বাঁচানোর জন্যে। প্রাথমিক গতিবেগ যত বাড়ানো যায় তত সময় বাঁচানো যায়। মহাকাশযানের পুরো ব্যাপারটাই হচ্ছে সময়। আমরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্রাথমিক বেগটা বাড়িয়ে নিয়েছি। য়ুহা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, বেগ যেটুকু বাড়ানোর কথা ততটুকু বাড়ানো হয়ে গেছে? আর বাড়ানো হবে না? ক্যাপ্টেন ত্রুব একটু হাসার ভঙ্গি করে বলল, কবি য়ুহা–এই যে তুমি মহাকাশযানের ভেতরে ভেসে বেড়াচ্ছ না, শক্ত মেঝেতে দাঁড়িয়ে আছ তার অর্থ আমাদের বেগ এখনো বাড়ছে। তবে সেটা আমাদের সহ্যসীমার ভেতরে। তাই তুমি টের পাচ্ছ না। য়ুহা মাথা নেড়ে বলল, সব মিলিয়ে আমার একটা চমৎকার অভিজ্ঞতা হলো। মিটিয়া নামের ডাক্তার মেয়েটি হেসে বলল, অভিজ্ঞতা হলো বলো না, বল অভিজ্ঞতা হওয়া শুরু হলো। য়ুহা ভয়ে ভয়ে বলল, কেন? আরও কিছু হবে নাকি? গতিবেগটা যেভাবে বাড়ানো হয়েছে আবার সেভাবে কমানো হবে? একই ব্যাপার হবে তখন।
য়ুহা শুকনো মুখে বলল, সেটা কখন হবে? মিটিয়া মাথা নাড়ল, বলল, যখন সময় হবে তখন জানানো হবে। ক্যাপ্টেন ক্ৰব মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, তার দেরি আছে য়ুহা। তুমি নিশ্চিন্ত মনে তোমার মহাকাশ ভ্রমণ উপভোগ কর। তোমার আনন্দের জন্য এখানে সব রকম ব্যবস্থা করে দেয়া আছে। ধন্যবাদ ক্যাপ্টেন ক্ৰব। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। আমাকে ধন্যবাদ দেবার কিছু নেই। আমাদের উপরে নির্দেশ দেয়। হয়েছে আমরা যেন তোমার আনন্দের ব্যবস্থা রাখি। তোমার সম্মানে আজকে আমরা বিশেষ ধরনের খাবারের ব্যবস্থা করেছি। নাও খেতে শুরু কর। বিশেষ ধরনের খাবার খেতে গিয়ে য়ুহা আবিষ্কার করে সেটি আসলে মোটামুটি সাধারণ খাবার। মহাকাশযানের দীর্ঘ সময়ের জন্যে নিশ্চয়ই খাবারে বৈচিত্র্য আনা কঠিন। য়ুহা এক টুকরো শুকনো রুটি গরম স্যুপে ভিজিয়ে মুখে দিয়ে চিবুতে চিবুতে বলল, আমার ধারণা ছিল তোমাদের কোনো একজন একটা ককপিটে বসে থেকে মহাকাশযানটাকে চালিয়ে নিয়ে যাবে! য়ুহার কথা শুনে খাবার টেবিলের কয়েকজন শব্দ করে হেসে উঠল। ক্যাপ্টেন ক্রুব মাথা নেড়ে বলল, না, আমাদের এই মহাকাশযানটা আমাদের চালিয়ে নিতে হয় না। যাত্রার শুরুতে আমাদের গন্ত স্থানের কোঅর্ডিনেট ঢুকিয়ে দিতে হয়। বাকি কাজটুকু কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক করে। তোমাদের কিছুই করতে হয় না? না, আমাদের কিছুই করতে হয় না। য়ুহা একটু ইতস্তত করে বলল, একটা যন্ত্রের ওপর এত বিশ্বাস রাখা। কি ঠিক? উত্তেজক পানীয় খাবার কারণে প্রায় সবাই একটু তরল মেজাজে ছিল, এবারে অনেকেই শব্দ করে হেসে উঠল। হিসান নামের সুদর্শন মানুষটি তার পানীয়ের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল, কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ককে যন্ত্র বলা ঠিক নয়। তার ভেতর যে জটিল নেটওয়ার্ক আছে সেটা মানুষের মস্তিষ্কের নেটওয়ার্ক থেকেও বেশি জটিল, বেশি বিস্তৃত। এই মহাকাশযানের প্রত্যেকটা বিন্দুর ওপর সেটি দৃষ্টি রাখছে, সেটি নিয়ন্ত্রণ রাখছে। ক্যাপ্টেন ত্রুব গলা উঁচিয়ে বলল, য়ুহাকে আমাদের কোয়ার্টজ গোলকের পরীক্ষাটি দেখিয়ে দিই। মিটিয়া মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, সেটা দেখিয়ে দাও! ক্যাপ্টেন ক্রব হিসানের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি একটা কোয়ার্টজ গোলক নিয়ে এসো তো! হিসান প্রায় সাথে সাথেই একটা ছোট কোয়ার্টজের স্বচ্ছ গোলক এনে ক্যাপ্টেন ক্ৰবের হাতে ধরিয়ে দেয়। ক্যাপ্টেন ক্র অনেকটা বক্তৃতার ভঙ্গিতে বলল, এই যে আমার হাতে গোলকটা দেখছ এটা একটা নিখুঁত গোলক। এটাকে ভরশূন্য পরিবেশে তৈরি করা হয়েছে। এই কোয়ার্টজের গোলকটাকে আমি সাবধানে এই টেবিলটার ওপর রাখছি।
ক্যাপ্টেন ত্রুব সাবধানে গোলকটাকে টেবিলের ওপর রাখল, তারপর হাত সরিয়ে নিয়ে বলল, তুমি দেখছ এটা স্থির হয়ে আছে, কোনোদিকে গড়িয়ে যাচ্ছে না? য়ুহা মাথা নাড়ল, বলল, হ্যাঁ দেখছি। তার মানে কী বলতে পারবে? য়ুহা মাথা চুলকে বলল, তার মানে, তার মানে—এই টেবিলটা একেবারে সোজা, এটা কোনোদিকে ঢালু হয়ে নেই? হ্যাঁ। একজন কবি হিসেবে তোমার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা খারাপ নয়। আমাদের এই মহাকাশযানের প্রযুক্তি প্রায় নিখুঁত, এই টেবিলগুলো সব সময়েই সোজা কোথাও কোনোদিকে ঢালু হয়ে নেই। কিন্তু এখানে আরেকটা ব্যাপার আছে। কী ব্যাপার? মহাকাশযানটা এক জি ত্বরণে সোজা, সামনের দিকে যাচ্ছে। এত বড় একটা মহাকাশযানের গতিতে এতটুকু বিচ্যুতি না ঘটিয়ে নিখুঁতভাবে নেয়া কিন্তু সহজ নয়। যদি এতটুকু বিচ্যুতি হয় আমরা এই গোলকটাতে দেখব। যদি মহাকাশযানটা একটু বামদিকে ঘুরে যায় এই গোলকটা ডানদিকে গড়িয়ে আসবে, যদি মহাকাশযানটা ডান দিকে ঘুরে যায় এটা বাম দিকে গড়িয়ে যাবে। য়ুহা মাথা নাড়ল, বলল, মজার ব্যাপার। ক্যাপ্টেন ক্ৰব কোয়ার্টজের স্বচ্ছ গোলকটা য়ুহার হাতে দিয়ে বলল, নাও। এটা তুমি রাখ, তোমার ঘরের টেবিলের ঠিক মাঝখানে এটা রেখে দাও। তুমি দেখবে আগামী এক মাসেও এটা এক চুল ডানে বা বামে সরবে না। আমাদের কোয়ান্টাম নেটওয়ার্কের কাজ এত নিখুঁত! য়ুহা গোলকটা হাতে নিয়ে বলল, তোমাকে ধন্যবাদ ক্যাপ্টেন ক্ৰব। খাওয়ার পর সবাই মহাকাশযানের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ল। য়ুহা হিসানকে খুঁজে বের করে বলল, হিসান, তুমি কি আমাকে কোয়ান্টাম নেটওয়ার্কটা একটু দেখাতে পারবে? হিসান একটু অবাক হয়ে বলল, কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক দেখবে? হ্যাঁ। আসলে এটা তো দেখার মতো কিছু নয়। মহাকাশযানের ঠিক মাঝখানে একটা ঘরের ভেতরে আছে।
সেই ঘরে আমরা যেতে পারি না? না। ভেতরে যাবার কোনো উপায় নেই। উঁকি দিয়ে দেখতে পারি না? হিসান হেসে ফেলল, বলল, উঁকি দিয়ে দেখারও কিছু নেই। মূল নেটওয়ার্কটা হচ্ছে প্রায় এক মিটার বর্গাকৃতির একটা নিখুঁত ক্রিস্টাল, এর মাঝে একটা পরমাণুও তার সঠিক জায়গা থেকে বিচ্যুত হয়নি। এটাকে রাখা হয় চরম শূন্যের কাছাকাছি তাপমাত্রায়। আলোর সকল তরঙ্গে এর সাথে যোগাযোগ হয়। বাইরের পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ করার জন্যে এটাকে ঘিরে রয়েছে একটার পর আরেকটা তারপর আরেকট। ওর! হিস। এ মুহূর্ত থেমে বলল, তোমার ঘরের যোগাযোগ মডিউলে তুমি এ সম্পর্কে সব তথ্য পেয়ে যাবে। হলোগ্রাফিক ছবিতে দেখানো আছে। য়ুহা মাথা নাড়ল, বলল, আমি হলোগ্রাফিক ছবি দেখতে চাই না। আসল জিনিসটা দেখতে চাই। ঠিক আছে, তুমি তাহলে আস আমার সাথে, তোমাকে কোয়ান্টাম নেটওয়ার্কের ঘরটির কাছাকাছি নিয়ে যাই। হ্যাঁ। চল। আমার দেখার খুব শখ। হিসান য়ুহাকে মহাকাশযানের নানা গলি ঘুচি দিয়ে কোয়ান্টাম নেটওয়ার্কের ঘরটিতে নিয়ে গেল। চারপাশে নানা ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা, তার মাঝখানে বর্গাকৃতির সাদামাটা ঘর। বলে না দিলে বোঝার উপায় নেই এর ভেতরে কোয়ান্টাম নেটওয়ার্কটা রয়েছে। য়ুহা ঘরটার ধাতব দেয়াল স্পর্শ করে বলল, কেউ যদি এই দেয়াল ভেঙে ঢুকে যায়? হিসান শব্দ করে হেসে বলল, নিউক্লিয়ার বোমা দিয়েও এই দেয়াল ভাঙা যাবে না। মহাকাশযানের সবচেয়ে সুরক্ষিত এলাকাটি হচ্ছে এই কোয়ান্টাম নেটওয়ার্কের ঘর। য়ুহা বাইরে থেকে ঘুরে ঘুরে ঘরটিকে দেখে, ধাতব দেয়ালটি হাত দিয়ে স্পর্শ করে তারপর একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলে, চল, যাই। চল। তুমি যেটা দেখতে চেয়েছিলে সেটা দেখেছ? হ্যাঁ দেখেছি। সত্যি কথা বলতে কী তুমি এই ঘরের ধাতব দেয়াল ছাড়া আর কিছুই দেখনি। য়ুহা হিসানের দিকে তাকিয়ে একটু হাসার ভঙ্গি করে বলল, তুমি ভুলে যাচ্ছ আমি একজন কবি। আমার কাজই হচ্ছে কল্পনা করা। আমি যেটা দেখতে পাই না সেটা কল্পনা করতে পারি, আমি যেটুকু দেখিনি সেটুকু কল্পনা করে নিয়েছি।
হিসান মাথা ঘুরিয়ে একবার য়ুহার মুখের দিকে তাকালো, কোনো কথা বলল না। মহাকাশযানের গলি খুঁচি দিয়ে হেঁটে হেঁটে মূল নিয়ন্ত্রণকক্ষের দিকে ফিরে আসতে আসতে য়ুহা বলল, আমি এই মহাকাশযানে যে জন্যে এসেছি সেটা কিন্তু এখনো করিনি।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now