বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
জোনার: হরর,থ্রিলার
(৭ম পর্ব)
পৃষ্ঠাটি পড়ার পর মনে হয়েছিল আলেস তবে এভাবেই
ধুকেধুকে মরেছিল! আজ পোল্যান্ডে প্রতি বছর ৬০
হাজার টন মেয়াদউত্তীর্ণ খাদ্য ফেলে দেওয়া হয়।
কিন্তু এদেশেরই একটা অকুতোভয় কন্যা একসময়
খাবারের অভাবে ধুকেধুকে মরতে হয়েছিলো। সেই
অজ্ঞতা আর অন্ধকারাচ্ছন্ন পোল্যান্ড দ্বিতীয়
বিশ্বযুদ্ধে সম্পূর্ণ নুয়ে পড়ার পরেও আজ উন্নতির
শীর্ষে। যাহোক, ক্ষানিকের জন্যে আমি
ভেবেছিলাম আলেসের মৃত। কিন্তু পৃষ্ঠা উল্টাতেই
আবারো আলেসের লেখা বেড়িয়ে পড়লো।
"আজ সন্ধ্যায় এক রক্ষী দুটো ভূট্টা আর এক মশক পানি
নিয়ে এসেছিল। আমি ওর কাছ থেকে হাত বাড়িয়ে
খাবার নেইনি। কেন জানি মনে হল সেই হয়তো আমার
মার্টিনীকে খুন করেছে। হয়তো ওর হাতে এখনো মৃত
মার্টিনীর রক্ত লেগে আছে। গত রাতের স্বপ্নটা মনে
পড়ে গেল। ওর হাত থেকে খাবার নেওয়াটা আমার
কাছে সেই স্বপ্নে দেখা মার্টিনীর ঝুলন্ত লাশ থেকে
ঝরা রক্ত খাবার মতোই নিকৃষ্ট মনে হলো। আমি শুয়ে
থাকলাম। ও কিছুক্ষণ খাবার হাতে দাড়িয়ে থাকল।
যখন দেখলো আমি উঠে ওর কাছ থেকে খাবার নিচ্ছি
নাহ তখন সে মশক আর ভূট্টা দুটো আমার সেলের ভেতর
ছুড়ে ফেলে চলে গেল। মাটিতে পড়ে মশক ফেটে
মেঝেতে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগলো। আমি আর সহ্য
করতে পারলাম নাহ। সে পানির উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম।
মেঝে থেকে সবটুকু পানি চুষে খেলাম। আহ পানি.....।
ঈশ্বরের এক মহিমান্বিত উপহার। পানিটুকু খাওয়ার পর
আমি ভূট্টা দুটো কুড়িয়ে খেতে লাগলাম। পানির
অভাবে আমার গলাটা এতটাই শুকিয়ে গেছিলো যে
ভূট্টার দানাগুলি বারবার আটকে যাচ্ছিলো। খাবার
সময় গলায় প্রচন্ড জ্বালাপোড়া হচ্ছিল, মনে হচ্ছিলো
যেন জ্বলন্ত কয়লা খাচ্ছি। কিন্তু তবুও পেটের দায়ে
না খেয়ে উপায় ছিলো নাহ। একটা ভূট্টা খাওয়ার পর
যখন অপরটিতে কামড় বসালাম তখন মনে পড়লো
মার্টিনীর কথা। ও থাকলে হয়তো দুজনে ভাগ করে
খেতাম। এতে পেট কম ভরলেই মনটা আনন্দে ভরে যেত।
বুকের গহীন থেকে এক লম্বা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।
খেয়ে আবার শুয়ে পড়লাম। মনেমনে বললাম আমি আর
পারছি না প্রভু।এই নৃসংশতা থেকে এবার আমায় মুক্তি
দাও। আমাকে তোমার কাছে নিয়ে চল প্রভু। আজ রাতই
যেন আমার এই ঘৃন্য জীবনের শেষ রাত হয়। কিন্তু প্রভু
যীশু আমার গতরাতের প্রার্থনা অগ্রাহ্য করলেন। আমি
বেঁচে রইলাম আরেকটি দুর্বিষহ দিনের অভিজ্ঞতা
গ্রহণের জন্যে। "
তার পরের পৃষ্টায় আবার লিখেছে,
" আজ সকালে এক প্রহরীর লাথি খেয়ে আমার ঘুম
ভাঙ্গল। অনাহারক্লিষ্ট দুর্বল শরীর নিয়ে আমি এতটাই
গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিলাম যে প্রহরীর হাঁকডাঁকে
কোন কাজই হয়নি। বাধ্য হয়েই ওকে কষ্ট করে সেলের
তালা খুলে ভেতরে ঢুকে আমাকে জাগাতে হয়েছে।
আমাকে লাথি মেরে সে তার এই অতিরিক্ত
পরিশ্রমের শোধ নিতে চাইছে। ব্যাথ্যা পেলেও আমি
ওকে কিছুই বললাম নাহ। ইদানীং ব্যাথা পেতে পেতে
তা মুখবুজে সহ্য করাও শিখে ফেলেছি। শুধু অবাধ্য
চোখ দুটো কোন বাধা মানে না। ব্যাথা পেলেই কয়েক
ফোঁটা জল ছেড়ে দেয়। প্রহরী আমায় এক প্রস্থ কাপড়
দিয়ে বলল তাড়াতাড়ি কাপড় পরে তৈরি হয়ে যেতে।
আজ নাকি জনসম্মুখে আমার বিচার করা হবে। কাপড়
পড়তে গিয়েও আমার মার্টিনীকে মনে পড়ে গেল।
এইতো সেদিন আমরা একটা কাপড়কে দুজনে ভাগ করে
পড়েছিলাম। আজ তার অনুপস্থিতিতে এ কাপড়ের
মালিক আমি একাই। কিন্তু এই একাকীত্বই আমাকে
সবচেয়ে বেশী যন্ত্রনা দিচ্ছে। ক্ষুদা, পিপাসা,
চাবুকের আঘাত বা অন্যকোন নির্যাতন নয়। মানুষের
স্মৃতির এক আশ্চর্য ত্রুটি হল দুঃখ ভুলে যাওয়া কিন্তু
সুখময় দিনগুলি মনে রাখা। মার্টিনীর সাথে সেই সুখময়
দিনগুলির স্মৃতি আমাকে তাড়িয়ে বেড়াবে। মৃত্যু
ব্যাতিত এর থেকে মুক্তির আর কোন পথ খুলা নেই।
কাপড় পরা মাত্র ওরা আমাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে
যেতে লাগলো। সিড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে একসময়
আমরা একতালা গীর্জার ছাদে পৌছে গেলাম।
রক্ষীরা আমাকে একটা ঝুলন্ত কাঠের ফ্রেমের সাথে
বেঁধে দিল। পূর্ব দিগন্তে তখন সবে মাত্র গ্রীষ্ম
ঝলমলে সূর্যোদয় হয়েছে। তার উষ্ম পরশ আমার
ভাঙ্গাচুরা শরীরটাকে রাঙ্গিয়ে দিচ্ছে। একজন ঘোষক
এসে গ্রামবাসীকে গীর্জা প্রাঙ্গণে একত্রিত হওয়ার
আহব্বান জানালো। মানুষজন ধীরে ধীরে জমা হতে শুরু
করলো। তারপর সম্মান্বিত পাদ্রী গীর্জার ছাদে এসে
বসলেন। শুরু হল তিন তিনটে খুনের দায়ে অভিযুক্ত
ডাকিনী আলেসের বিচার।"
তার পরের পৃষ্টায়,
" মাননীয় পাদ্রী একে একে আমার উপর আনা সকল
অভিযোগ উপস্থিত সবাইকে পড়ে শুনালেন! প্রথম
অভিযোগ হল আমি নাকি সরাইখানার একক মালিক
হওয়ার আশায় আমার বাবাকে অভিশাপ দিয়ে মেরে
ফেলেছি। কি অদ্ভুত অভিযোগ। বাবা বেঁচে থাকতে
আমি কখনোই সরাইখানায় যেতাম না। আমার
ব্যবসাপাতিতে একটুও আগ্রহ ছিলো নাহ। যে জিনিসে
আমার আগ্রহই নেই তার একচ্ছত্র মালিকানার জন্যে
আমি আমার জন্মদাতা পিতাকে খুন করব! এটা ভাবা
যায়? তাছাড়াও বাবার সম্পত্তি তো তার একমাত্র
সন্তান হিসাবে আমার কপালেই জুটতো। তাকে খুন
করে ছিনিয়ে নেবার কোন প্রয়োজনই তো ছিলো না।
তবুও আমি পিতৃঘাতী। এটাই কি পৃথিবীর ন্যায়বিচারের
উদাহরণ?
তার পরের অভিযোগ, আমি নাকি সামান্য কটা
স্বর্নমুদ্রা হাতিয়ে নেওয়ার জন্যে সরাইখানার এক
ঘুমন্ত অতীথিকে খুন করেছি! ঐ মদ্যপ বুড়োটার কাছে
স্বর্নমুদ্রা থাকলে তো নিবো। সে যা আয় করে সবই
আমার সরাইখানায় মদ খেয়ে উড়িয়ে দেয়। ওর কাছে
স্বর্নমুদ্রা আছে এমনটা ভাবাও পাগলামি। আর যদি
ঘুর্ণাক্ষরে দু একটা স্বর্নমুদ্রা থাকতো এবং আমার
সেটার প্রয়োজন হতো তো আমি ওকে দু বোতল মদ
দিয়েই তা বাগিয়ে নিতে পারতাম। খামাখা ওকে খুন
করতে যেতাম কেন?আমার এই অতিসাধারণ যুক্তি তর্ক
গুলি বিচারে গ্রহণ করা হলো নাহ। আমাকে ওই
মদ্যপটার খুনি হিসাবেই চিহ্নিত করা হলো।
অতপর ওই অভাগা রক্ষীকে হত্যার অভিযোগ উঠলো।
এবং যথারীতি সকল যুক্তিতর্কের উর্ধে উঠে আমাকে
দোষী সাব্যস্ত করা হল। অতপর প্রিস্ট এসে সর্বসম্মুখে
আমার গালে চড় মারলেন। নিচে গীর্জা প্রাঙ্গণে
গণজমায়েতের মাঝে ওনেক শিশুও ছিলো। এতো গুলি
লোকের সামনে এভাবে অপমানিত হওয়ার লজ্জায়
আমার মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছা হলো। অতঃপর
বিচারের রায় ঘোষনা করা হলো। "ডাইনি আলেসকে
আগামী রোববার প্রার্থনার পর গীর্জা প্রাঙ্গণে
সর্বসম্মুখে ফাঁসীতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা
হবে। " মৃত্যুদণ্ড শব্দটা আমার কানে যেন মধু বর্ষণ
করলো। আর মাত্র চারদিন। এর পরেই আমি এই নির্মম
পৃথিবী ছেড়ে আমার স্রষ্টার পাণ পাড়ি জমাবো।
শাস্তি ঘোষনার পর প্রিস্ট তার হাতের আংটি খুলে
তা আগুনে পুড়িয়ে লাল টকটকে করে আমার কপালে
ছ্যাঁকা দিলেন। গভীর একটা পোড়া দাগ আংটির উপর
মুদ্রিত নকশা সমেত আমার কপালে বসে গেল। এটা সেই
চিহ্ন যা দ্বারা একজন ডাইনিকে চিহ্নিত করা হয়।
কপালের অসহ্য জ্বালাপোড়া আর মিথ্যা ডাইনি
অপবাদের যন্ত্রনায় আমি চিৎকার করে কেঁদে উঠলাম।
আমার কান্না দেখে উপস্থিত অনেকেই অট্টহাসিতে
ফেটে পড়লো। অতপর প্রিস্ট সগর্বে গীর্জার ছাদ
থেকে নেমে গেলেন। প্রিস্ট চলে যেতেই উপস্থিত
জনতা আমার দিকে বৃষ্টির মত পাথর ছুড়তে লাগলো!
যারা পাথর ছুড়ছিল তাদের প্রায় সবাইকেই আমি
চিনি। তাদের মধ্যে ছিলো জোসেফ আন্টোনিও, সেই
মোখপোড়া চাষি। গতবছর ওর ক্ষেতের ফসল আগাম
শীতে নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। ফসল ফলাতে পারেনি
বলে সে বউ বাচ্চা নিয়ে শীতে উপোস করে মরতে
বসেছিলো। একরাতে সে আমাদের বাসায় এসে কিছু
অর্থকড়ি ভিক্ষা চায়। আমার বাবা ওকে সাফ মানা
করে দেন। কিন্তু ওর অসহায় মুখের দিকে চেয়ে আমি
আমার বড়দিনের উপহার কেনার জন্যে জমানো টাকার
পুরোটাই তার হাতে তুলে দেই। সেই শীতের রাতে সে
আমাকে মা মেরী অবতার বলে কুর্নিশ করেছিল। কিন্তু
মাত্র ছয় মাসের ব্যবধ্যানে আজ রোদ্রউজ্জল গৃষ্মে সে
আমাকে ডাইনি বলে পাথর ছুড়ছে! কতই না দ্রুত এই
মানুষগুলি বদলে যায়। তারপর চোখ পড়লো রজার
বরিসের দিকে। আমার প্রাক্তন প্রেমিক। সেও সবার
সাথে তাল মিলিয়ে আমার দিকে সমানে পাথর ছুড়ছে।
অথছ কদিন আগেও সে কতনা মধুর কন্ঠে আমার রূপের
প্রসংশা করতো। প্রতি বৃহষ্পতিবার সন্ধায় ও আমাদের
গোয়ালঘরের পেছনে আমার সাথে মিলিত হবার জন্যে
ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতো। আমিও বোকার মতো
বাবার চোখকে ফাকি দিয়ে ওর মতো একটা লম্পটের
সাথে মিলিত হতাম। ও আমাকে স্বর্গদেবী বলে
ডাকতো। এইতো দুমাস আগেও সে তার স্বর্গদেবীকে
বিছানায় পাবার জন্যে সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত
ছিল। কিন্তু আজ সেই স্বর্গ দেবীকে নরকের ডাইনি
বলে গালি দিচ্ছে আর খুজে খুঁজে বড় পাথরগুলি বের
করে ছুড়ে মারছে। ধ্বংস হোক এমন স্বার্থপর লম্পট
পুরুষজাতির। ওর দিকে তাকাতেও আমার ঘেন্না হচ্ছে।
গীর্জা প্রাঙ্গণের এক কোণে কতগুলি শিশু কিশোর জড়
হয়ে হৈ হোল্লড় করছে আর আমার দিকে পাথর মারছে।
কচি অপ্রস্তুত হাতে ছোড়া পাথরগুলির বেশীরভাগই
লক্ষভ্রষ্ট হচ্ছে। তাদের মধ্যে আমি আলেক্স রবার্ট
উইলসন কে দেখতে পেলাম। ওর মা আমার প্রতিবেশী।
ছেলেটা দেখতে খুবই সুন্দর। কচি বয়স ৪-৫ হবে। এইতো
সেদিন ওর জন্মের সময় খুব বেশী তুষার ঝড় হয়েছিল।
রাস্তায় তুষার জমে আমাদের গ্রামটা প্রায় বিচ্ছিন্ন
হয়ে গিয়েছিলো। এমন প্রতিকুল পরিবেশে ওর মায়ের
যখন প্রসব বেদনা উঠে তখন কোন ধাত্রীকেই খুজে
পাওয়া যাচ্ছিলো নাহ। ওদিকে সে তার মায়ের
যৌনিতে উল্টো হয়ে আটকে গেছিলো। ওর বাবা বাড়ি
ছিলো নাহ। লোকটা কাঠ কাটতে পার্শ্ববর্তী উইলো
জঙ্গলে গিয়েছিলো। ওর মা ঘরে সম্পূর্ণ একা
কাতরাচ্ছিলো। সেদিন তার আর্তচিৎকার শুনে আমি
ওদের বাড়ি ছুটে গিয়েছিলাম। গরম পানি তৈরি করে,
ওর মা কে শুইয়ে আমি নিজের হাতে ছেলেটাকে
টেনে বের করেছিলাম। আমার হাত ধরেই ও এই
পৃথিবীতে এসেছিলো। কৃতজ্ঞতাবশত তার মা আমার
নামের সাথে মিলিয়ে তার নামকরণ করেন আলেক্স।
আজ সেও আমার পর হয়ে গেছে! অতপর পাথরের
আঘাতের তীব্রতায় আমি এক সময় জ্ঞান হারিয়ে
ফেললাম। রক্ষীরা আমার অজ্ঞান দেহকে বয়ে সেলের
ভেতর নিয়ে এলো। জানিনা কতক্ষণ অজ্ঞান ছিলাম।
জ্ঞান ফিরলে দেখলাম রাত হয়ে গেছে। ইতিমধ্যেই
দেখলাম সেলের এক কোনে রক্ষীরা খাবার আর পানি
রেখে গেছে। হয়তো জীবনের শেষ চারটে দিন ওরা
আমায় অভুক্ত রাখতে চায় না। খেয়ে দেয়ে আমি
আবারো লিখতে বসলাম। মৃত্যু প্রতিক্ষায়, জীবনের
আতিবাহিত আরেকটি দীর্ঘ গ্রীষ্মের দিনের বর্ণনা।"
(চলবে).............
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now