বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
রম্য গল্প
পাইছা চোরা!
ইরেজার হাসান
সঙ এর মত রঙবেরঙে সাজানো মুড়ির টিনে
বসে আছে যুবার। নড়বড় সীট আর জরাজীর্ণ
সীট কভার গর্ভে রেখে মানুষের অত্যাচারে
অতিষ্ট প্রায় এই মুড়ির টিন। হাত পায়ের ময়লা আর পান
এর চুন মাখানো সীট কভারের দৃশ্য যুবারের
নাকে যেন রীতিমত লাথি লাগাচ্ছে।
টিঙটিঙে রোগা ড্রাইভারটি সিতি পড়া ফুল হাতা শার্ট
গায়ে বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে স্টিয়ারিং ঘুরাচ্ছে। যুবার
কাচুমাচু চোখে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাচ্ছে বার
বার। সে একজন নিম্নমানের চোর হলেও
পরিচ্ছন্নতা প্রিয় একজন মানুষ।
মুড়ির টিনের ভেতরের পরিবেশ তার একদম সহ্য
হচ্ছে না। ঈদের আর কয়েকদিন বাকী বলে
মুড়ির টিনে এখন নিম্ন আয়ের মানুষদের উপচে
পড়া ভীড়। নাড়ির টানে, প্রিয় মানুষদের সাথে
ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করার জন্য মুড়ির টিনের
ভেতর দাঁড়িয়ে অন্যের পায়ে পাড়া দিয়েও বাড়ি
যেতে রাজি সবাই।
নড়বড় সীটে বসে গেলেও শান্তি নেই।
দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের ঘামার্ত বগলের বিটকাল সুবাস
আর শরীরের বলটে যাওয়া ধাক্কা এসে উপরে
পড়ে। মাঝে মাঝে অনাকাঙ্খিতভাবে তাদের আসল
জায়গাতেও ধাক্কা লাগে! এত ঝড়ঝাপ্টা উপেক্ষা
করে যুবারের এই মুড়ির টিনে যাওয়ার একটাই কারণ,
হাতে টাকা পয়সা নেই।
নিজ বাড়ি ময়মনসিংহ থেকে খুব কাছের একজন বন্ধু
পাইছা এর বাড়ি যাচ্ছে সে। পাইছার বাড়ি টাঙ্গাইল
জেলার চড় অঞ্চলের এক গ্রামে। দুই বন্ধু
মিলে গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন গ্রামে চুরি
করে বেড়িয়েছে।
কিন্তু গত বছর একদিন চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে
হাটুইরা কিল আর তেল মাখানো বেসরকারি লাঠির বাড়ি
খেয়ে একটা পা টা ভেঙে গেছে তার। সেই
থেকে নিজের বাড়িতেই থাকে পাইছা। এদিকে
যুবার একা একা কোথাও চুরি করে সুবিধা করতে
পারছে না। আর পাইছাও ভাঙা পা নিয়ে কোথাও কাজ
করে সঠিক মূল্য পাচ্ছে না।
তাই দুই বন্ধু মুঠো ফোনে যোগাযোগ
করেছে কয়েকদিন আগে। দুজন মিলে পাইছার
গ্রামের এক মেম্বারের বাড়িতে চুরি করবে।
এতে করে যা পাওয়া যাবে তাতে দুই বন্ধুর ঈদটা
ভালভাবেই কেটে যাবে। কিন্তু তারা কী পারবে
তাদের উদ্দেশ্য সফল করে তাদের পরিজনদের
সাথে আনন্দে ঈদ কাটাতে?
ডাইরেক্ট বাসে ময়মনসিংস থেকে টাঙ্গাইল
যেতে পাঁচ ঘন্টার বেশি সময় লাগে না।
সেক্ষেত্রে ঈদের এই বাজারে ভাড়া লাগে
পাক্কা একশত পয়তাল্লিশ টাকা। একদম পাক্কা টাকা
লাগবে কিন্তু! বাসের ভেতর কাঁচা টাকা নিয়ে
একবার ধরা পড়লে বিশ মিনিট পর নিজের খোমা
নিজেই চেনার উপায় থাকবে না!
কিন্তু ময়মনসিংহ টু টাঙ্গাইল রুটে "মুড়ির টিন"
হিসেবে খ্যাত এইসব বাসে যেতে সময় লাগে
আট থেকে নয় ঘন্টা। মুড়ির টিনের মত ভচকে
যাওয়া গঠন এবং গরুর গাড়ির মত শ্লথ গতির জন্য
এইসব বাস "মুড়ির টিন" হিসেবেই সবার কাছে
পরিচিত। বেশির ভাগই নিম্ন আয়ের মানুষেরা এতে
চলাচল করে।
লাগুক না হয় ঘন্টা নয়, ঈদের তোপের সময়
পঞ্চাশ টাকায় ময়মনসিংহ থেকে টাঙ্গাইল তো
নিজের দুলা ভাইও নিয়ে যেতে রাজি হবে না! না
হয় একদিন গরুর গাড়িতে করেই ভ্রমণ হলো!
***
পাইছার দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী, আশেপাশের
মানুষের সহযোগীতা নিয়ে পাইছার বাড়ি পৌছাতে
পৌছাতে রাত প্রায় নয় টার মত বেজে গেল। বাই
বাড়ি দাঁড়িয়ে পাইছার নাম ধরে ডাকলো যুবার।
আশেপাশের নিস্তব্ধ পরিবেশে সেই ডাক বহুদূর
পর্যন্ত শোনা গেল। বাড়ির ভেতর থেকে
বেরিয়েই আড়মোড়া ভাঙলো পাইছা। কুপি উচিয়ে
যুবারের মুখের কাছে ধরতেই যুবারকে জড়িয়ে
ধরলো পাইছা।
বোকা স্বভাবের পাইছা তার গ্রাম্য ভাষায় বলল, "কিবা
আছাও দোস্ত? পতে কোন বিপদ টিপদ অয় নাই
তো?"
যুবার আলিঙ্গন অবস্থাতেই হাসতে হাসতে বলল,
"না রে দোস্ত। গফরগাও এর পুলান চোখ বন্দ
কইরা নদীর উফরেও হাটবার পারে! "
কথাটি শুনে পাইছার হাসি থেমে গেল। আলিঙ্গন
ছেড়ে আবার কুপিটা যুবারের মুখে কাছে নিয়ে
আসলো। মাথাটা বাঁকা করে যুবারের মুখের দিকে
তাকিয়ে যুবারের দুই গালে হাত বুলাতে লাগলো
পাইছা।
"অবা কইরা কি দেহছ বেডা?" ভ্রু কুঁচকে
জিজ্ঞেস করলো যুবার।
"ওওওও! তর গালে দাঁড়ি জালাইছে তাইলে।
তাইতো কই. . . . . . . ." লম্বা টানে কিছু একটা
বলতে গিয়ে থেমে গেল পাইছা।
"হরে দোস্ত, আমরার বাইড়তে খালি আমার দাঁড়ি
জালাইছে। আমার বাপ দাদারা তো সব ফাকুন্দা। আমার
দেখতে বালা লাগতাছে না?"
"হ লাগতাছে। তাই তো কই, তর চাপায় তো আগে
এত দার আছিল না। এহন চাপার জোরে নদীর
উপরে দিয়া হাটা শুরু করছাও!" যুবারের গাল বুলাতে
বুলাতে বলল পাইছা।
"কি কইলি?"
"কিছুই না। আয় ভিতরে আয়। হাত পাও দুইয়া নে
আগে।" বলেই বউ বউ করে চিল্লাতে থাকলো
পাইছা।
পাইছার ডাকে ভেতর থেকে লম্বা ঘোমটা দিয়ে
এক মহিলা বেরিয়ে আসলো।
যুবার এর আগে অনেকবার পাইছার মুখে এমন
ঘটনার কথা শুনেছে। এই গ্রামের বউ ঝি অপরিচিত
কারো সামনে এলেই এভাবে লম্বা ঘোমটা দিয়ে
আসে। যেন সদ্য বিয়ে করা বউ বাসর ঘরে বসে
আছে!
পাইছার বউ বাইরে আসতেই তাকে উদ্দেশ্য
করে বলল, "আমার দোস্ত যুবার আইয়া পড়ছে।
ওর নিগা ভাত বাড়ো ছে তাড়াতাড়ি।"
কুপির আলোয় আধো আলো সম্বলিত ঘরে
বসে আছে তিন জন। হাত মুখ ধুয়ে এসে খাবার
খেতে বসেছে যুবার।
একটা প্লেট যুবারের দিকে এগিয়ে পাইছা বলল,
"এই নে দোস্ত, উরুম খা!"
প্লেটের দিকে তাকিয়ে অবাক হলো যুবার।
পাইছার দিকে তাকিয়ে বলল, "হেডি রে তরা উরুম
কস?"
"হ। এইডা আমগো গেরামের বুলি। মুড়ি রে উরুম
কই। ভাত শেষ অইয়া গেছে গা। মেলা ফাকে থিকা
আইছোস। নে তাড়াতাড়ি উরুম কয়ডা খাইয়া নি।"
তারপর যুবার হাসতে হাসতে প্লেটের দিকে
তাকিয়ে বলল, "হ, মুড়ি খাই। ইয়ে মানে উরুম খাই।"
মুড়ি খেতে খেতে দরজা দিয়ে চারপাশটা
দেখতে লাগলো যুবার। চাঁদের আলোয় চারপাশটা
ভালোই দেখা যাচ্ছে। পাইছার বাড়িটা ছনের হলেও
আশেপাশের কয়েকটা বাড়ি টিনের তৈরী। সেই
টিনের চালে চাঁদের আলো হুমড়ি খেয়ে
পড়ছে।
খাওয়া শেষ করেই যুবার ফিসফিস করে বলল,
"দোস্ত! আমার তো মোচড় দিছে।
কোনহানে যামু?"
"আমগো তো পায়খানা নাই। পাট ক্ষেতেই কাম
সাড়ি। তুই ঐ পাট ক্ষেতে যা, আমি ইকটু পর
আয়তাছি।"
"তুই আইবি ক্যান? আমার মেলা টাইম লাগবো। তরা
ঘুমাইয়া পড়। আমি কাম সাইড়া শুইয়া পড়মু নি।"
"আইচ্ছা যা তাইলে। দরকার অইলে ডাক দিস।"
তারপর কুপি জালিয়েই শুয়ে পড়লো পাইছা ও তার
বউ। এদিকে লুঙ্গি উপরে তুলে পাট ক্ষেতের
দিকে দৌড় দিলো যুবার।
***
সূর্যের আলোয় চারপাশ আলোকিত হওয়ার আগে
থেকেই গ্রামের লোকজন যার যার কাজে
লেগে পড়ে। কালাই ক্ষেত থেকে কালাই
তুলছে পাইছার বউ। বন্ধু যুবারকে নিয়ে বাইরে
ঘুরতে বের হচ্ছে পাইছা।
রাস্তায় বের হতেই কালাই ক্ষেত থেকে পাইছার
বউ বলল, "হালটে ঘুরতি যাতিছাও?"
"হ। কিছু কবা?"
"পাইছাডা দিয়া যাইয়ো।"
কথাটা শুনেই যুবার চোখ বড় বড় করে পাইছার হাত
টেনে ধরলো।
"তর বউ তর নাম ধইরালচে?"
"আমার বউ আমার নাম ধইরবো ক্যানে?"
"ঐ যে কইলো পাইছা দিয়া যাইতে?"
"হাহাহা! দোস্ত, মাটি তুলার যে টুকরি বা খাঁচা আছি না,
ঐডাক আমরা পাইছা কই!"
"তর নাম যে পাইছা, হেইডা ক্যারা রাকছে?"
"বাজান থুইছে। মুরব্বী মানুষ কি মনে থুইছাল
কেডা জানে!"
তারপর পাইছা সেই টুকরি তার বউয়ের কাছে দিয়ে
দুজন ঘুরতে বের হলো।
হাঁটতে হাঁটতে এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখলো
পাইছা।
জনশুণ্য রাস্তায় এসে যুবার কে বলল, "দোস্ত,
তক যে মেম্বারের বাড়ির কতা কয়েছিলাম মনে
রাখিছাও?"
"আমরার সব মনে থাকে।"
"হুন! এইডা হেই মেম্বারের বাড়ি। তয় এইহানে
চুরি করা যাইবো না। সমেস্যা আছে।" রাস্তার
পাশের বাড়িটাকে দেখিয়ে বলল পাইছা।
"অহন কি করতা তাইলে?"
"নো চিন্তা কইরো না। হের বাদের বাড়ি
বৈদেশী লোক আছে। কাইলের বাদের দিন
আবার চইলা যাবো। নগদ টেহা পাওয়া যাবো
ভালোই।"
"তাইলে আমরার আইজকাই কাম কইরালাই। কি কও?"
"হ, হেইডাই করমু।"
বলতে বলতেই পাইছার পাশের বাড়ির এক মহিলা
চিল্লাতে চিল্লাতে তাদের পাশ দিয়ে হেঁটে
গেল।
মহিলার অস্থিরতা দেখে পাইছা তাকে জিজ্ঞেস
করলো, "এবা ছুডি ছুডি কনে যাতিছাও ভাবি?"
"চকিদারের বাড়িত যামু।"
"ক্যানে?"
"কাইল রাইতে আমার ঘর থুন পাঁচ হাজার টেহা চুরি
অইছে। হেইডার বিচার দিবার যাইতাছি।"
কথাটা শুনেই কেশে উঠলো পাইছা। তাগাদা দেয়ার
ভঙ্গিতে বলল, "জলদি যাও! জলদি যাও!"
"চকিদার সাব! চকিদার সাব!" চকিদারের বাড়ি ঢুকেই
চিল্লাতে থাকলো মহিলা।
তার ডাক শুনে দুইজন চকিদার বেরিয়ে এল ঘর
থেকে। লুঙ্গি ঠিক করতে করতে তাদের
একজন বলল, "এই বিয়ান বিয়ান চিল্লান ক্যান? কি
অইছে?"
"অহনই আমার একটা বিচার লেহেন।"
"কিয়ের বিচার?"
"কাইল রাইতে আমার বাড়িত থুন পাঁচ হাজার টেহা চুরি
অইছে।"
"খাঁড়ান! খাতায় লেখতাছি।"
চেয়ারে বসে মহিলার অভিযোগ লিখছে এক
চকিদার। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে অন্য চকিদার।
তাদের ঠিক সম্মুখভাগে দাঁডিয়ে কথা বলছে মহিলাটি।
অন্য চকিদারটি মহিলার দিকে তাকিয়ে হাত সম্মুখে
বাড়িয়ে ফ্লাইং কিস দেওয়ার ভঙ্গি করছে। সেটি
দেখে মহিলাটিও চোখ মিটমিটিয়ে হাসছে।
অন্য চকিদারের এমন ভাব দেখে পাশের চকিদারটি
বলল, "কি ব্যাপার! তুমি হের লগে এইসব কি
করতাছো?"
"কিছু করি নাই তো। হেরে বুজাইলাম এইসব ঘটনা
আমগো কাছে কিছুই না। আমরা ফুঁ দিয়া এই গুলান
উড়াইয়া দেই।" হাসতে হাসতে বলল অন্য চকিদারটি।
তার কথা শুনে যে চকিদারটি অভিযোগ লিখছিল তিনিও
হাসতে থাকলো। অভিযোগ লিখা শেষে মহিলাটি
যখন চলে যাচ্ছিল তখন অন্য চকিদারটি মহিলাটির দিকে
তাকিয়ে বিদায় জানানোর জন্য হাত নাড়ছে।
এই অবস্থা থেকে পাশে থেকে চকিদারটি বলল,
"কি ঘটনা মিয়া! তুমি এহন তারে টাটা দিতাছো যে?"
"টাটা দেই না তো। তারে বুজাইলাম আপনে যান,
চিন্তা করুন লাগবো না। চোর ধইরা তারে এমনে
কইরা পিডামু!" হাত নেড়ে নেড়ে বলল অন্য
চকিদারটি। এই কথা শুনে পাশের চকিদার আবারো
হাসতে থাকলো।
***
মাঝ রাতে, চারাপাশে যখন ঝিঁঝি পোকার ডাক আর
মাঝে মাঝে বেওয়ারিশ কুকুরের ডাক ছাড়া আর
কিছুই শোনা যাচ্ছে না ঠিক সেই মুহূর্তে চুরির
প্রস্তুতি নিল পাইছা ও যুবার। চারপাশটা পর্যবেক্ষণ
করে লুঙ্গি কাছার দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল
তারা।
ঘর থেকে বের হতেই পাইছার বউ পাইছাকে
উদ্দেশ্য করে বলল, "খাড়ান! সাবধানে চুরি
কইরেন কইলাম।"
"চিন্তা কইরো না বউ, আমগো এইসব কইরা মেলা
অভ্যাস আছে।"
পাইছার কথা শুনে তার বউ তার গায়ে হাত বুলিয়ে ফুঁ
দিতে লাগলো। বউয়ের এমন যত্ন দেখে
যুবারের দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে বলল,
"আমার বউডা মেলা নক্কী বুঝলি। ওর এই ফুঁ পড়ার
লাইগা ওরে বিয়া করার পরে কোনদিন ধরা পড়ি নাই।
দেও বউ! বালা কইরা ফুঁ দেও!"
"আমরার কাছে চাফা মারোস তুই? বিয়ার পরের দিন
ধরা খাইয়া যে ঠ্যাঙ বাইঙ্গা লইছোস হেইডা বুইলা
গেছস?" পাইছার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল
যুবার।
"বিয়ার পর ঠ্যাঙ বাঙছিল নাহি? থাইগ্যা, যেইডা বুলছি
হেইডা বাদ দে। ল তাড়াতাড়ি চুরি কইরা আহি।" বলেই
দুজন বেরিয়ে গেল সেই বিদেশীর বাড়ির
উদ্দেশ্যে।
চুরি শেষ বাড়ি ফিরে বসে আছে দুজন। দুজনেরই
মন খারাপ। একটা ছোট টাকার বান্ডেল আর একটা
সোনার লকেট ছাড়া কিছু পায়নি।
টাকার বান্ডেল হাতে নিয়ে পাইছা বলল, "এই যে
দুই হাতে টেহা ভাগ কইরা নিলাম। এহন গুনার টাইম নাই।
দুই হাতের টেহা ওজনে সমান মনে অইলে
দুইজন ভাগ কইরা লইয়া যামু।"
পাইছার কথা শুনে কিছু বলল না যুবার। টাকা ভাগ করে
নিয়ে নিল দুজন। যুবারকে বলে সোনার লকেটটা
রেখে দিল পাইছা। অবশ্য বিনিয়মে কিছু টাকাও দিয়ে
দিয়েছে যুবারকে। টাকা গুলো নিয়ে ভোর
বেলাতেই নিজের বাড়িতে চলে গেল যুবার।
ঈদের দিন সকাল বেলা গ্রামের এক দোকানে
গিয়ে বসলো পাইছা। চারপাশে আরো কয়েকজন
লোক বসে গল্প করছে। একটু পর একজন
লোক এসে দোকানে বসল।
একটা সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে দোকানদারের
দিকে তাকিয়ে বলল, "কাইল রাইতে বিদেশী
ভাইয়ের বাড়ি থেইকা পঞ্চাশ হাজার টেহা চুরি
অইছে। বেচারার আইজকা বিমানে উঠুন লাগবো
বইলা বিয়ান বেলাই চইলা গেছে। তিনডা সোনার
লকেটও নাকি আছিল।"
কথাগুলো শুনে দাঁড়িয়ে পড়লো পাইছা। আচমকা
সেই লোকটিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
"কতাবার্তা ইনসাফ নিয়া কইবেন কইলাম। ঐ কয়ডা
টেহা পঞ্চাশ হাজার টেহা নাহি? ঐ টেহা তো
হাতের চিপি দিয়াই পইড়া যাইতো। লকেট তো
আছিল একটা। আমি মিছা কথা হুনবার পারি না। বানাইয়া
বানাইয়া কতা কন দেইখাই আননের বাড়িত চুরি করা বাদ
দিছি। থাকে এডা, কন আছিল পাঁচডা। চুরি করছি দেইখা
কি হাছা মিছাও বেইচা খাইছি নাহি?"
"তার মানে ঐ বাড়িত তুমি চুরি করছাও?" অবাক হয়ে
জিজ্ঞেস করলো লোকটি।
"হ করছি। বিদেশী লোক গেছেগা, বেবাক
ঝামেলা শেষ।" বলেই ভাঙ্গা পায়ে খুঁড়াতে
খুঁড়াতে দিলো দৌড়।
বাড়িতে পৌছে হাঁপাতে থাকলো পাইছা। এ যাত্রায়
বেঁচে গেল সে। আজকে বিদেশী
লোকটার ফ্লাইট না থাকলেই হয়তো আরেক
ঠ্যাঙ ভেঙে যেতে তার।
পাইছা কে হাঁপাতে দেখে তার বউ বলল, "কুত্তার
লাহান অবা কইরা জিভ বাইর কইরা আছেন ক্যান?"
"হুদাই। কুরকাডা কাটছাও?"
"না। কুরকার গোশত আমার বালা লাগে না। কতবার
কইলাম গরুর গোশত আনেন, আনলেন না!"
"হুন বউ! আমার মেলা সক হইছে ছাগীর ছাওডা
জবো করমু। ছাগীর গোশত মেলা দিন খাইনা।"
"হেইডা কইরেন। অহন দেহেন এই কাগজে কি
লেখা আছে!" বলেই হাতে রাখা কাগজটা পাইছার
দিকে এগিয়ে দিলো তার বউ।
পাইছা পঞ্চশ শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা করেছিল।
তাই বাংলা রিডিং পড়তে পারে সে। কাগজের লেখা
গুলোর দিকে মনযোগ দিয়ে তাকালো সে।
সেখানে লেখা "দোস্ত! তর আর ভাবির লাইগা
তিন হাজার টেকা দিয়া গেলাম। তর পিছের বাড়ির
বেডির পাঁচ হাজার টেকা আমিই চুরি করছিলাম। যেদিন
রাইতে তর বাড়িত আইছিলাম ঐদিন পাট ক্ষেতে কাম
সাইরা টেকা গুলান চুরি করছিলাম। ভাবছিলাম তরে কমুনা।
কিন্তুক তর ঘরের অবস্তা দেইখা টেকা গুলান একা
খাইতে ইচ্ছা করলো না আমরার। এই টেকার লগে
কিছু টেকা ভরি টিন কিন্যা ঘরের বেড়া দিস।"
লেখাগুলো পড়ে চোখ দুটো ছলছল হয়ে
গেল পাইছার। মাথা তুলে বউয়ের দিকে তাকাতেই
তার বউ জিজ্ঞেস করলো, "কি অইছে? এই
টেহা কার?"
পাইছার মুখ থেকে কোন কথা বের হলো না।
বন্ধুরা হয়তো এমনই হয়। তারা কখনো নিজের
জন্য ব্যস্ত থাকে না। বন্ধুর কাছে কিছু একটা
লুকিয়ে পরে সেটা দিতেই বন্ধুকে চমকে
দেয়।
কাগজটি হাতে নিয়ে টাঙ্কের দিকে এগিয়ে গেল
পাইছা। টাঙ্ক থেকে সোনার লকেটটা বের
করে বউয়ের পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো সে।
বউয়ের গলায় সেই লকেট পড়াতে পড়াতে বলল,
"বউ রে! এক ঠ্যাঙ বাঙ্গা বইলা কেউ আমারে কাম
দিতে চায় না। তাই তুমারে বালা কাপড়ও দিবার পারি না,
বালা-মন্দ খিলাবারও পারি না। এইডা চুরি কইরা আনছি তাই কি
অইছে? টেহা দিয়া তুমার লাইগাই থুইয়া দিছি। আইজকা
থিকা বেক সময় এইডা পইড়া থাকপি।"
কথাগুলো শুনে কেঁদে ফেলল পাইছার বউ। পাইছা
তার বউকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে ফেলল।
বউয়ের চোখের পানি মুছতে মুছতে বলল,
"কাইন্দো না বউ। আমার খিদা লাগছে, কয়ডা উরুম
দেও। আর রেডি হইয়া থাইকো, কাইল বিয়ান বেলা
আমরা মুড়ির টিনে কইরা যুবার গো বাড়ি বেড়াবার
যামু!
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now