বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

নিয়তি-০৫ (শেষ)

"ফ্যান্টাসি" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X ৫। পরদিন সকালে অনেক ভোরে ঘুম ভেঙ্গে গেল খন্দকার সাহেবের। কক্সবাজারে আজই তার শেষ দিন। বিছানা থেকে উঠে হাতমুখ ধুয়ে প্রাতঃরাশ সেরে নিলেন তিনি। একটু ঘুরে আসবেন, তারপর ব্যাগ গুছিয়ে রওনা দেবেন ঢাকার উদ্দেশ্যে। হোটেল থেকে বেরিয়ে হাটতে হাটতে পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে গেলেন তিনি। এবং পৌঁছেই থমকে দাঁড়ালেন। আজ তার আগেই সেখানে বসে আছে দুজন মানুষ। সাজেদুল করিম, আর... আর বাংলোর সেই মহিলা! আস্তে আস্তে তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন খন্দকার সাহেব। তাকে দেখেই লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন দু’জন। তাদের কাউকেই যেন চেনা যাচ্ছে না, গতকালের সাথে আজ তাদের চেহারায় আকাশপাতাল ব্যবধান। গতকাল যেখানে দু’জনেই ছিল জীবন যুদ্ধে নিয়তির অমোঘ বিধানে হার মানা দুই সৈনিক, আজ সেখানে তারা যেন পরিনত হয়েছে আঠার-উনিশ বছর বয়সের উচ্ছল দুই তরুণ-তরুণীতে। খুশির ঝরনা যেন উপচে পড়ছে দু’জনের চোখ থেকে। ‘আপনি কে, বলুন তো?’ বললেন মহিলা, গলায় এক রাশ বিস্ময় নিয়ে। ‘আমার পরিচয় তো আমি আগেই দিয়েছি। কিন্তু আপনারা দু’জন এখানে, একসাথে? কি ব্যাপার বলুন তো?’ মৃদু হাসলেন খন্দকার সাহেব, যদিও প্রশ্নটার উত্তর তিনি জানেন। ‘ন্যাকামী করবেন না, বুঝলেন? আপনি তো সবই জানতেন, শুরু থেকেই। আমি বুঝতে পেরেছি। কিন্তু, কিভাবে?’ মহিলার উচ্ছসিত প্রশ্ন। ‘বিশ্বাস করুন, আমি কিছুই জানতাম না। কিছুই করিনি আমি, যদি কিছু ঘটে থাকে তবে তা হয়েছে একান্তই নিয়তির ইচ্ছায়। আমরা সকলেই তো ভাগ্যের হাতে ক্রীড়নক মাত্র।’ এতক্ষণ মুখে মৃদু হাসি নিয়ে সব শুনছিলেন সাজেদুল করিম। এবার বললেন, ‘তাহলে আপনি বলতে চাচ্ছেন, কাল সকালে আমাকে আত্মহত্যা থেকে বিরত করা, বাংলোতে গিয়ে শায়লার সাথে দেখা করা, তারপর বিকেলে হুট করেই আমাকে বাংলোর কথা বলা, এসবের কিছুই আপনি নিজের ইচ্ছাতে করেননি? সবই নিয়তির খেলা?’ ‘আমি শুধু কিছু সন্দেহের বশবর্তী হয়ে কাজ করেছি মাত্র।’ বললেন খন্দকার সাহেব। ‘আর আপনার সন্দেহটা জন্মাল কিভাবে?’ একটু ভাবলেন খন্দকার সাহেব। ‘এই সন্দেহের জন্যে প্রকৃতপক্ষে যিনি দায়ী, তাকে আমি নিজেই চিনি না। তবে এটা বলতে পারি, নিয়তি, ঈশ্বর, ভাগ্য বা প্রকৃতি যাই বলুন না কেন, তিনি কখনও নিজ হাতে কাজ করেন না। তৃতীয় কোন মাধ্যমের আশ্রয় নেন। ধরে নিন আপনাদের ক্ষেত্রে নিয়তি আমাকেই সেই তৃতীয় মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিল? তবে যাই হোক, আপনাদের দুজনকে একসাথে দেখে আমার সত্যিই খুব ভাল লাগছে।’ ‘আরে দেখুন তো, আপনাকে আমার পরিচয়ই দেয়া হয়নি। আমি শায়লা, শায়লা করিম।’ হাত বাড়িয়ে দিলেন মহিলা। তারপর একটু লাজুক গলায় বললেন, ‘আজই বিয়ে করছি আমরা। আপনি কিন্তু অবশ্যই আসবেন।’ ‘থাকতে পারলে আমি খুবই খুশি হতাম, কিন্তু সেটা বোধহয় সম্ভব হবে না। আজই ঢাকায় ফিরতে হবে আমাকে।’ বললেন খন্দকার সাহেব। ‘তবে মিস্টার করিম, আপনি কি আপনার সব কথা খুলে বলেছেন ওকে?’ ‘আপনি ওর অসুখের কথা বলছেন নিশ্চয়ই? ও সব বলেছে আমাকে। আপনার কি ধারনা, আমি ওকে মরতে দেব? এতদিন পর ফিরে পেয়েছি কি হারিয়ে যেতে দেবার জন্যে? শোনেননি, ভালবাসা পৃথিবীর সবচেয়েবড় ওষুধ? আমার ভালবাসা দিয়ে ওকে বাঁচিয়ে রাখব আমি।’ ভালবাসার মানুষটির দিকে উজ্জ্বল চোখে তাকিয়ে আছেন মহিলা। ‘আর অর্ক আসলে ওর বাবাকে দেখে কি খুশি হবে বলুন তো?’ ‘কিন্তু ওর কাছে ব্যাপারটা কিভাবে ব্যাখা করবেন আপনি? ও তো জানে ওর বাবা মারা গেছে।‘ জানতে চাইলেন খন্দকার সাহেব। ‘ভুল বোঝাবুঝির কারণে কি স্বামী স্ত্রীর মাঝে ছাড়াছাড়ি হয়ে যেতে পারে না? আর তার অবসানও তো হতে পারে, তাই না? ও সব বুঝতে পারবে। আমি জানি, আমার ছেলে না ও?’ হাসলেন শায়লা করিম। কিছুক্ষণ তিনজনেই চুপচাপ। একসময় সাজেদুল করিম নীরবতা ভাংলেন। ‘খন্দকার সাহেব, যদি কিছু মনে না করেন তবে আমরা এবার উঠব। আমাদের অনুষ্ঠানের সময় হয়ে আসছে।’ ‘আপনাদের শুভক্ষণের আর দেরি করাব না। আসুন তাহলে। আপনাদের জীবন সুখের হোক।’ মৃদু হেসে বললেন খন্দকার সাহেব। উঠে দাঁড়ালেন সাজেদুল করিম ও শায়লা করিম। খন্দকার সাহেবও দাঁড়ালেন। বললেন, ‘আমি এখানে আর কিছুক্ষণ বসতে চাই।’ হঠাত করেই তার হাতটা ধরলেন শায়লা করিম। ‘আপনি কি রূপকথার সেই জাদুকর? আপনি না আসলে হয়তোবা এই জীবনে আমাদের দু’জনের আর দেখাই হত না। আপনাকে ধন্যবাদ জানানোর ভাষা আমার জানা নেই।’ তার চোখে চিকচিক করছে অশ্রু। খন্দকার সাহেব কি বলবেন, ভেবে পেলেন না। শেষবারের মত বিদায় নিয়ে হাত ধরাধরি করে ঝাউবনের মাঝে হারিয়ে গেলেন জীবনের হারানো মানে খুঁজে পাওয়া দু’জন মানুষ। ********* একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পুরানো সেই ঝাউগাছের গুড়িটার উপর বসলেন খন্দকার সাহেব। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে গল্পের এখানেই শেষ, তবু মনের ভিতর কোথায় যেন খচখচ করছে তার। কেন? এতদিন পর কিসের ইশারায়, কোন মায়াজালে কিভাবে দু’জন দু’জন কে ফিরে পেল? সে প্রশ্নের উত্তর হয়তো কোনদিনই জানা হবে না। প্রকৃতি তার সব রহস্য মানুষের সামনে কোনদিনই প্রকাশ করে না। সেজন্যেই হয়তো পৃথিবীটা এত সুন্দর, বেঁচে থাকা এত অর্থময়! ‘কি ভাবছেন?’ পেছন থেকে কারও গলার আওয়াজে চমক ভাংলো খন্দকার সাহেবের। পেছনে ফিরে তাকালেন তিনি। কখন যেন এসে দাঁড়িয়েছেন সেই বৃদ্ধ। ‘আপনি? কখন এলেন?’ উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন খন্দকার সাহেব। ‘এই মাত্র। অবশেষে তবে দুজনার মিলন হল?’ রহস্যময় হাসি বৃদ্ধের মুখে। ‘তাই তো দেখছি।‘ বলেই চমকে উঠলেন খন্দকার সাহেব। এই বৃদ্ধ জানল কিভাবে সেকথা? অবাক চোখে তাকালেন তিনি। ‘আপনি কিন্তু আপনার পরিচয়টা এখনও দেননি।’ ‘আমি? আমার পরিচয় জেনে আপনার খুব একটা প্রয়োজন আছে কি? আমাকে বরং আপনি একজন বার্তাবাহক বলতে পারেন।’তার পাশে বসতে বসতে বললেন বৃদ্ধ। খন্দকার সাহেবও বসলেন। ‘বার্তাবাহক? কিসের বার্তা নিয়ে এসেছেন আপনি?’ ‘যে ভালবাসা আশ্রয় খুঁজে পায় না, কখনও কখনও তা যে ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে, জানেন? ‘একটা মানুষ তার স্ত্রীকে ভালবাসত অনেক। কিন্তু কোনদিন সে তার স্ত্রীর ভেতরের মানুষটাকে ছুঁয়ে দেখতে পারেনি। তার স্ত্রীও তাই সে মানুষটাকে তার ভালবাসার প্রতিদান দিতে পারেনি। তার মত করে ভালবাসতে পারেনি। ওদিকে, সে লোকটা যখন তার ভালবাসার প্রতিদান পেল না, সে তীব্র ভালবাসার উত্তর পেল না, তখন সে অস্থির হয়ে উঠল। দিনে দিনে আরও তীব্র হল তার ভালবাসা, কিন্তু তার স্ত্রী তাকে বারবার ফিরিয়ে দিল। বলুন তো, এমনটা কি হতে পারে?’ বললেন বৃদ্ধ। খন্দকার সাহেব বৃদ্ধের কথার অর্থ ঠিক বুঝতে পারলেন না। বললেন, ‘হতেও পারে। ভালবাসা বড় অদ্ভুত জিনিস।‘ ‘শেষ পর্যন্ত লোকটা যখন তার ভুল বুঝতে পারল, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। সে চলে গেছে না ফেরার দেশে। কিন্তু জীবন- মৃত্যুর সীমারেখা দিয়ে কি ভালবাসাকে বাঁধা যায়, বলুন? তীব্র ভালবাসার অস্তিত্ব যদি থেকে থাকে, তবে তার থেকেই জন্ম হয় দুঃখের। আর দুঃখ জন্ম দেয় অনুতাপের। অনুতাপ, সেই সাথে প্রায়শ্চিত্ত করার ইচ্ছা যদি প্রচন্ড হয়ে থাকে তবে কে জানে, মৃত্যুর পরেও তা পূর্ণ হবে না?’ ‘আপনার কথা আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।’ গম্ভীর গলায় বললেন খন্দকার সাহেব। ‘সেই মানুষটা চেয়েছিল তার স্ত্রী সত্যিকারের ভালবাসা খুঁজে পাক। তার যে ভালবাসা সে বোঝাতে পারেনি, অন্য কেউ সেই শূন্যস্থানটুকু পূরণ করুক। আমি সেই ভালবাসার বার্তা নিয়ে এসেছিলাম।’ ‘তার মানে, আপনি...’ মৃদু হাসি নিয়ে খন্দকার সাহেবের দিকে তাকিয়ে আছেন বৃদ্ধ লোকটি। কাঁপা কাঁপা পায়ে উঠে দাঁড়ালেন খন্দকার সাহেব। হ্যা, এবার সব বুঝতে পেরেছেন তিনি। খাপে খাপে মিলে গেছে সব। বৃদ্ধও উঠে দাঁড়িয়েছেন। বললেন, ‘আমার ফেরার সময় হয়েছে। আপনিও তো আজই ফিরে যাবেন, তাই না?’ ‘হ্যা। কোনদিকে যাবেন আপনি?’ বললেন খন্দকার সাহেব। একবার মনে হল জিজ্ঞেস করেন, তার আজ ফেরার কথা বৃদ্ধ জানেন কিভাবে। কিন্তু তারপরে মনে হল, প্রশ্নের উত্তর তিনি জানেন। ‘যেদিক দিয়ে এসেছি, সেদিকেই।’ বললেন বৃদ্ধ। পা বাড়ালেন খন্দকার সাহেব। কিছুদূর এসে পিছনে ফিরে তাকালেন। দেখলেন, বৃদ্ধ পাহাড়ের কিনারার দিকে হেটে যাচ্ছেন, ধীর পায়ে। (শেষ) ৷ ৷ *আগাথা ক্রিস্টি’র ‘The Mysterious Mr. Quin’ বইয়ের ‘The Man from the Sea’ গল্প অবলম্বনে লিখিত।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৯৪ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now