বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

বিপদে আনাতোলিয়া চ্যাপ্টার- ২

"সাইমুম সিরিজ" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X ২ প্লেনটা আছে আংকারার খুব কাছের শহর আংগোরায়। আংগোরা তুর্কি সেনাবাহিনীর প্রশাসনিক সদর দফতর। গন্তব্য আংগোরা হলেও আহমদ মুসাকে নামতে হবে আংকারা বিমান বন্দরে। সেখান থেকে পাহাড়ী পথে বিশ মিনিটের ড্রাইভে আংগোরা। আংকারা বিমান বন্দরে তাকে রিসিভ করার জন্যে প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে আসতে চেয়েছিল জেনারেল মোস্তফা। কিন্তু আহমদ মুসা রাজি হয়নি। বলেছিল, আমার মিশনটা গোপন। শুরুতেই ভিআইপি পরিচয় পেলে মিশনটা আর গোপন কি! জেনারেলের পরিচয় তো জানাই গেছে। উত্তরে আহমদ মুসা বলেছিল, আমরা তাকে জানাতে পেরেছি, কিন্তু সে জানতে পারুক তা আমি চাই না। তার মাধ্যমে ষড়যন্ত্র জানা যায় কিনা, সেই চেষ্টাই আমরা করব। এজন্যই তাকে গ্রেফতারের আমি বিরোধিতা করেছি। মিসেস আব্দুল্লাহ্ গাজেনের ডিইরি থেকে যে ইংগিত পাওয়া গেছে, তার ভাত্তিতে অনুসন্ধান চালিয়েই জেনারেল মেডিন মেসুদের পরিচয় জানা গেছে। মিসেস গাজেনের ডিইরিতে জেনারেল সম্পর্কে কয়েকটা ক্লু পাওয়া গিয়েছিল। তার প্রশস্ত কপাল। সদা হস্যোজ্জ্বল মুখ। ট্রেনিং-এ ব্রিলিয়ান্ট রেকর্ডের অধিকারী। ট্রেনিং-এর পর প্রথম নিয়োগ পায় ভ্যান ইউনিটে। এনব ক্লু সামনে রেখে আহমদ মুসার অনুরোধে তুরস্কের অভ্যন্তনীণ নিরাপত্তা প্রধান জেনারেল মোস্তফা অনুসন্ধান চালিয়ে চারজন সিনিয়র জেনারেলকে চিহ্নিত করে। এই চারজন জেনারেলের ব্যক্তিগত জীবনের উপর অনুসন্ধান চালানো হয়। খোঁজ নেয়া হয় ভ্যান-এর সাথে কার যোগাযোগ বেশি, কে বেশি বেশি ভ্যান-এ যায়। এই অনুসন্ধান থেকে বেরিয়ে আসে জেনারেল মেডিন মেসুদের নাম। সে এক সময় প্রতিটি উইক এন্ডে ছুটি কাটাতে ভ্যান-এ যেত। ভ্যান-এ তার কোন নিজস্ব বাড়ি নেই। সুতরাং ভ্যান-এ গেলে তার ওঠার কথা সেখানকার সবচেয়ে সুন্দর সেনা রেস্ট হাউজে। কিন্তু অধিকাংশ সময় সেনা রেস্ট হাউজে উঠতোই না। কোন কোন সময় যখন উঠতো, তখনও সে সেখানে থাকতো না। তার ফ্যামিলি রেকর্ড থেকে এটাও জানা যায় যে, তার দাম্পত্য জীবনে কোন সমস্যা না থাকলেও বিয়েটা তার অমতে হয়েছিল। তার সার্ভিস রেকর্ড থেকে আরেকটি বিষয়ও জানা যায়, সেটা হলো ভ্যান-এ তার প্রথম পোস্টিং হওয়ার পর সেখান থেকে তার ট্রান্সফার ঠেকানো এবং তদ্বির করে কয়েকবার ভ্যান-এ পোস্টিং নেবার তার একজন সেনা অফিসারের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে এবং বিভিন্ন সাক্ষ্য থেকে সেনা অফিসার মেডিন মেসুদ বলেই প্রমাণিত হয়েছে। সুতরাং মিসেস গাজেনের গোপন স্বামী হিসেবে জেনারেল মেডিন মেসুদের বিশাল সম্পত্তির সাথে তার আয়ের কোন সংগতি নেই। এটাও প্রমাণ করে তার অবৈধ আয়ের পেছনে তার কোন অবৈধ তৎপরতা বা যোগসাজশের সম্পর্ক আছে। জেনারেল মেডিন মেসুদ চিহ্নিত হবার পর তাকে গ্রেফতারের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু আহমদ মুসা এই সিদ্ধান্তে বাধা দেয়। বলে যে, তাকে গ্রেফতার করে শাস্তি দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু কোন্ ষড়যন্ত্রে সে যুক্ত, সে ষড়যন্ত্রের প্রকৃতি ও পরিধি কি তা নাও জানা যেতে পারে। অথচ সেসব জানা, শাস্তি পাওয়ার চেয়ে অনে বেশি প্রয়োজন। আহমদ মুসার এ যুক্তিকে তুর্কি সরকার গ্রহণ করে এবং বিকল্প হিসাবে কি করা যায় সে দায়িত্ব তারা আহমদ মুসার উপরই অর্পণ করে। সে দায়িত্ব নিয়েই আহমদ মুসা আজ যাচ্ছে আংগোরায়। কারও ‘এক্সকিউজ মি!’ শব্দে আহমদ মুসার চিন্তার স্রোতটা বাধা পেয়ে থেমে গেল। সুন্দর সুরেলা কণ্ঠ। মিষ্টি উচ্চারণ। আহমদ মুসা মুখ তুলে চাইল। দেখল, তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে বিশ-বাইশ বছরের অসম্ভব সুন্দরী একটি মেয়ে। দেখেই আহমদ মুসা চিনতে পারল। ইস্কান্দরুন থেকে এ মেয়েটি বিমানে উঠেছে। তার বাম পাশের প্যাসেজের ওপারে জানালার কাছের একটা সীটে বসেছিল মেয়েটি। ভ্যান থেকে আহমদ মুসার বিমানটি উড়ে ইস্কান্দরুনে কয়েক মিনিটের একটা যাত্রা বিরতি করেছিলে। ইস্কান্দারুন তুরস্কে ভূমধ্যসাগর উপকুলের একটা গুরত্বপুর্ণ নৌবন্দর। এটা পর্যটন শহরও। সেই সাথে এটা তুরস্কের কৌশলগত নৌঘাঁটিও। আহমদ মুসা মুখ তুলে তাকাতেই মেয়েটি বলল, ‘আমি আপনার পাশের সীটে বসতে পারি? আমি স্টুয়ার্ডকে বলেছি।’ মেয়েটির চোখে-মুখে বিব্রত ভাব। কণ্ঠে সংকোচ। মেয়েটির বিব্রতভাব ও সংকোটকে মেকি বলে মনে হলো না আহমদ মুসার। তার চোখের ভাষায় কোন মতলবের চিহ্ন নেই। তার বদলে আছে অসহায়ত্বের প্রকাশ। ‘আসনটা শূন্য। আমার আপত্তি নেই।’ ‘থ্যাংক ইউ…।’ মেয়েটি কথা শেষ করল না। প্রশ্নবোধক চিহ্ন ফুটে উঠেছে তার চোখে মুখে। ‘আবু আহমদ আব্দুল্লাহ।’ নিজের নাম বলল আহমদ মুসা। ‘থ্যাংক মি. আব্দুল্লাহ।’ বলে মেয়েটি আহমদ মুসার পাশের শূন্য সীটে বসে পড়ল। ‘স্যরি, টু ডিস্টার্ব ইউ। আমি ওখানে কমফোর্ট ফিল করছিলাম না।’ বসেই বলল মেয়েটি। আহমদ মুসা এর আগেই লক্ষ্য করেছে মেয়েটার পাশের সীটে খুবই সুবেশধারী ক্রিমিনাল চেহারার একজান মানুষ। আহমদ মুসা মেয়েটার কথার জবাবে বলল, ‘ওয়েলকাম মিস। আপনার অবশিষ্ট ভ্রমণ সুন্দর হোক।’ আহমদ মুসার পাশের শূন্য আসনটিতে বসতে গিয়ে বলল মেয়েটি, ‘আমার নাম সানেম, সালিহা সানেম।’ ‘ধন্যবাদ।’ বলল আহমদ মুসা। ‘আপনি তো আংকারা যাচ্ছেন?’ মেয়েটির প্রশ্ন। ‘হ্যাঁ, আংকারা।’ আহমদ মুসা বলল। ‘আপনি কি সেনাবাহিনীতে চাকুরী করেন?’ জিজ্ঞানা আবার মেয়েটির। বিস্মিত আহমদ মুসা তাকাল মেয়েটির দিকে। বলল, ‘সেনাবাহিনীতে চাকুরীর কথা ভাবলেন কি করে?’ ‘স্যরি, সেনাবাহিনীর অফিসাররা সাধারণঃত স্মার্ট হয়, চৌকশ হয় এবং শরীরাও সাধারণঃত মেদহীন হয়। আপনিও সেরকমই, তাই বলছিলাম।’ মেয়েটি বলল। ‘স্যরি, আমার ইমেজ আপনাকে বিভ্রান্ত করেছে। আমি সেনাবাহিনীতে চাকুরী করি না।’ আহমদ মুসা বলল। ট্রলিতে নাস্তা আসছে। সালিহা সানেমের চোখ ওদিকে গেল। আহমদ মুসা উঠে টয়লেটের দিকে চলে গেল। ফিরে এসে দেখল নাস্তা পরিবেশিত হয়েছে। সালিহা সানেম মদ খাচ্ছে পানির মত। পুরা এক বোতল সে নিয়ে নিয়েছে। তার নাস্তার সাথেও মদের বোতল দেখল আহমদ মুসা। বিস্মিত আহমদ মুসা বসতেই সালিহা সানেম বলে উঠল, ‘আপনি ছিলেন না। আমি যা নিয়েছি, আপনার জন্যেও তাই নিয়েছি। ঠিক করিনি?’ ‘ধন্যবাদ।’ বলল আহমদ মুসা। নাস্তা দেয়া শেষ করে নাস্তার ট্রলি নিয়ে ফিরছিল বিমান ক্রুরা। আহমদ মুসা মদের বোতল ওদের ফেরত দিয়ে বলল, ‘এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি দিন।’ পানি দিয়ে ওরা চলে গেল। ‘আমি আমার বোতল শেষ করে ফললাম, আর আপনি ফেরত দিলেন?’ ‘আমি মদ খাই না।’ আহমদ মুসা বলল। ‘ডাক্তারের নির্দেশ? কোন অসুখ-বিসুখ?’ বলল সfলিহা সানেম। ‘কোন অসুখ-বিসুখ নয়। আমি মুসলিম।’ আহমদ মুসা বলল। ‘আমিও তো মুসলিম।’ বলল সলিহা সানেম। হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘মুসলিম অবশ্যই, কিন্তু মুসলিমদের জন্যে মদ নিষিদ্ধ, এটা আপনি মানেন না।’ ‘আমি কেন, আমার চারদিকের প্রায় সবই তো মদ খায়।’ সালিহা সানেম বলল। ‘তারাও মানেন না।’ বলল আহমদ মুসা। ‘বুঝলাম, আপনি ধর্ম মেনে চলেন। আমি আপনাকে আধুনিক মানুষ মনে করেছিলাম।’ সালিহা সানেম বলল। আবার হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘ধর্ম মানলে বুঝি আধুনিক মানুষ হওয়া যায় না? ধর্ম ও আধুনিকতা কি দুই ভিন্ন জিনিস?’ ‘স্যরি, আমি তাই মনে করি। যারা ধর্ম মানে, তারা অতীতমুখী। অতীতমুখী হয়ে আধুনিক হওয়া যায় না।’ বলল সালিহা সানেম। ‘আচ্ছা বলুনতো, যারা ধর্ম মানে, তারা কি আধুনিক ডিজাইনের বিল্ডিং-এ বাস করে না? তারা কি আধুনিক কল-কারখানায় তৈরি আধুনিক কাপড়ের, আধুনিক ডিজাইনের পোষাক পরে না, যেমন আমি? খাবার টেবিলে কি আধুনিক বাসন-কোসন ব্যবহার করে না তারা? কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানসহ সব আধুনিক বিষয় কি তারা পড়ে না? তারা কি নানা ধরনের আধুনিক পেশায় নিয়োজিত নেই? তাদের ঘরে কি কম্পিউটার নেই? তারা কি সব ধরনের আধুনিক কম্যুনিকেশন সিস্টেম ব্যবহার করে না? তারা কি আধুনিক কালের সমৃদ্ধ ভাষা চর্চ্চা করে না? আধুনিক হোটেল-রেস্তোরাঁয় খাবার খায় না? পর্যটন- দেশ ভ্রমণে তারা কি নেই? তারা কি স্কলারশীপ পায় না? স্কলারশীপ নিয়ে বা নিজ খরচে তারা কি দেশ-বিদেশে পড়ছে না? ধর্ম যারা মেনে চলে তাদের মধ্যে বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ, লেখক, কবি, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার কি নেই?’ আহমদ মুসা থামল। ‘আপনার সব প্রশ্নের জবাব আমার কাছে ‘হ্যাঁ’।’ বলল সালিহা সানেম। সে কিছুটা বিব্রত। ‘তাহলে ধর্ম যারা মানে তারা তো আধুনিক। অতীতমুখী হলো কেমন করে তারা?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। ‘বিশ্বাসে তারা অতীতমুখী।’ বলল সালিহা সানেম। হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘সে বিশ্বাসগুলো কি? আল্লাহতে বিশ্বাস করা, সে বিশ্বাসের ভিত্তিতে আল্লাহর হুকুম অনুসারে নামায পড়া, রোযা রাখা, যাকাত দেয়া, আখেরাতে বিশ্বাস করা, ইহজগতের কৃতকর্মের জন্যে পরজগতে পুরস্কার অথবা শাস্তি পাওয়া, এসব কি?’ সালিহা সানেমের চোখে-মুখে বিব্রত অবস্থা বেড়ে গেছে। বলল, ‘হ্যাঁ, এসবই। আরও আছে যেমন বোরখা পরা, ছেলেমেয়েদের মেলা- মেশাকে বাঁকা দৃষ্টিতে দেখা, ইত্যাদি।’ কণ্ঠ তার শিথিল। ‘ধন্যবাদ, কথাগুলো খোলাখুলি বলার জন্য। কিন্তু বলুন তো, আল্লাহতে বিশ্বাস করা যদি অতীতমুখিতা বা পুরাতনপন্থা হয়, তাহলে এর আধুনিক পন্থাটা কি হবে?’ খুব শান্ত ও নরম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা। চোখ-মুখের সেই বিব্রত ভাব নিয়েই সে বলল, ‘না, ঠিক আল্লাহতে বিশ্বাস করা পুরাতন পন্থা বা অতীতমুখিতা নয়, এই বিশ্বাসকে উপলক্ষ্য করে যে বাড়াবাড়ি করা হয়, সেটাই অতীতমুখিতা।’ ‘আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের দাবী অনুসারেই তো নামায পড়া হয়, রোযা রাখা হয়, যাকাত দেয়া হয়। এসবকে আপনি কি বলবেন?’ বলল আহমদ মুসা। ‘নামায, রোযা, যাকাত এসব কারও অভ্যাস হিসাবে ভালো জিনিস। কিন্তু এসব নিয়ে যখন বাড়াবাড়ি করা হয়, অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়, এসব না করলে কাফের বলা হয়, তখন এই প্রবণতা অন্ধ অতীতমুখী মানসিকতার পর্যায়ে পড়ে যায়।’ সালিহা সানেম বলল। ‘সমাজে কখনও কখনও কেউ কেউ এটা করেন। কিন্তু আল্লাহ এটা করতে বলেননি। নামায, রোযার মত এবাদতগুলোতে যদি আন্তরিকতা না থাকে, নিজ ইচ্ছা না থাকে, একাগ্রতা না থাকে তাহলে তা আল্লাহ গ্রহণই করবেন না। কিন্তু একটা কথা বলুন মিস সালিহা সানেম, আপনি যা বিশ্বাস করেন, আপনি যা স্বীকার করেন, তা করা আপনার উচিত কিনা?’ আহমদ মুসা বলল। ‘অবশ্যই তা করা উচিত।’ বলল সালিহা সানেম। ‘যদি তা না করেন, তাহলে মানুষ আপনাকে কি বলবে?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার। ‘ওয়াদা ভংগকারী বলবে, বিশ্বাস ভংগকারী বলবে’ বলল সালিহা সানেম। ‘আল্লাহকে যদি আপনি বিশ্বাস করেন, আপনি যদি নিজেকে মুসলিম মনে করেন, তাহলে বিশ্বাসের দাবী মুসলমান হওয়ার জন্য অপরিহার্য শর্ত হিসাবে সে কাজগুলো, যেমন নামায, রোযা, হজ্জ্ব, যাকাত, সৎ ও পবিত্র জীবন যাপন, হারাম পরিহার ইত্যাদি করা দরকার, সেগুলো না করলে আপনার পরিচয় কী হবে, কী বলবে মানুষ আপনাকে?’ আহমদ মুসা বলল। সংগে সংগে উত্তর দিল না সালিহা সানেম। তার বিস্মিত দৃষ্টি আহমদ মুসার উপর নিবদ্ধ। ধীরে ধীরে মাথা নিচু করল। তারপর মুখ না তুলেই আস্তে আস্তে বলল, ‘তার মানে আপনি বলছেন, আমি বিশ্বাস ভংগকারী। আর বিশ্বাস ভংগকারী মুসলিম হওয়ার মানে অপরিহার্য শর্ত লংঘনকারী হিসাবে আমাকে কফের বলা যায়।’ বিস্মিত কণ্ঠ সালিহা সানেমের। ‘না মিস সানেম, আমি তা বলছি না। যদিও ‘কাফের’ শব্দের অর্থ বিশ্বাস অস্বীকারকারী, তবুও এ শব্দ কোন মুসলিমের উপর প্রয়োগ করা যায় না। কারণ অনেক ক্ষেত্রে একজন মুসলিম নামায না পড়লেও, রোযা না করলেও, হারাম খেলেও, পবিত্র জীবন যাপন না করলেও সে তার বিশ্বাস বা ঈমান পরিত্যাগ করে না। কাজে-কর্মে ঈমানের প্রকাশ না ঘটলেও ঈমান তার মধ্যে থাকে। তাই তো দেখা যায় বেনামাযি লোক এক সময় নামায পড়ে, এক সময় রোযা না করলেও, কোন এক সময় সে একনিষ্ঠ রোযাদার হয়ে যায়। সুতরাং কোন মুসলিমকে কাফের বলা ঠিক নয়।’ আহমদ মুসা বলল। ‘ধন্যবাদ। আপনি ঠিক বলেছেন। মুসলিম হিসাবে ইসলামের কোন অনুশাসন আমি অনুসরণ করি না, এ কথা ঠিক। কিন্তু আল্লাহর প্রতি আমার বিশ্বাস নেই, রসূলকে মানি না, এমন চিন্তা আমার মনে কোন সময় আসেনি। কিন্তু দেখুন, আমার পোষাক- পরিচ্ছদ ও আচার-আচরণ, চলা-ফেরা দেখেই আমাকে কাফেরের খাতায় নাম লিখে দিয়েছে। এটাই তো অন্ধত্ব, পশ্চাৎমুখিতা।’ বলল সালিহা সানেম। হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘ওদের বাড়াবাড়ি আছে ঠিকই, কিন্তু আপনার পোষাক-পরিচ্ছদ, আচার- আচরণ, চলা-ফেরায় কি বাড়াবাড়ি নেই?’ সালিহা সানেম একটু ভাবল। বলল, ‘সোসাইটিতে যা প্রচলিত আছে, তার বাইরে আমি কিছুই করতে পারি না, কিছুই করি না। এসব আমার বাড়াবাড়ি নয়।’ ‘আপনি আপনার সোসাইটির একজন। আপনার মত বহুজন নিয়েই আপনার সোসাইটি। সমাজ যা প্রচলন করে, সমাজে যা প্রচলিত হয়, তাতে সোসাইটির প্রত্যেক সদস্যের অংশ আছে। কিন্তু সে দায় সম্পর্কে আমার কোন কথা নেই। আমি জানতে চাচ্ছি, আধুনিকতা হিসাবে আপনি যা পরেন, যা করেন সে ব্যাপারে আপনার মন কি বলে?’ আহমদ মুসা বলল। ‘কঠিন প্রশ্ন। এসব ব্যাপারে মন আলাদা কিছু বলে কিনা বুঝিনি, ভেবেও দেখিনি কখনও। আমি যা করছি, মন তো তার সাথেই আছে।’ বলল সালিহা সানেম। ‘আচ্ছা, আপনাদের ক্লাবে আড্ডায় যখন আপনি দেখেন ছেলেরা ফুলড্রেসে, আর মেয়েরা অর্ধনগ্ন বা নামমাত্র পোষাকে, তখন কি আপনার কিছুই মনে হয় না? কেন মেয়েদের এ পোষাক? কার স্বর্থে? সে স্বার্থ কি মেয়েদের?’ আহমদ মুসা বলল। আহমদ মুসার প্রশ্ন শেষ হলেও তৎক্ষণাত উত্তর এল না সালিহা সানেমের কাছ থেকে। তার মাথাটা নিচু হয়েছে। ভাবছে সে। ধীরে ধীরে মুখ তুলে সালিহা সানেম বলল, ‘আমি বুঝেছি আপনার কথা। আপনি বলতে চাচ্ছেন, নারীদের মনোরঞ্জনের উপকরণে পরিণত করা হয়েছে, ভোগের পন্য হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে নারীরা। আমি এভাবে কোনদিন ভাবিনি। আমি মনে করতাম এটা নারীদের অধিকার, স্বধীনতা । কিন্তু আপনি যেটা বোঝাতে চাচ্ছেন, সেটা আমি বুঝতে পেরেছি। তবে মেনে নেয়ার জন্যে আরও ভাবতে হবে।’ ‘অবশ্যই ভাববেন মিস সালিহা সানেম। ইসলাম বুদ্ধিমত্তা ও জ্ঞানচর্চ্চাকে স্বাগত জানায়। আল্লাহর গোটা সৃষ্টিই তো জ্ঞানময়, বিজ্ঞা…।’ আহমদ মুসার কথার মাঝখানেই সীট বেল্ট বাঁধার ঘোষণা এল, ‘আংকারায় ল্যান্ড করতে যাচ্ছে বিমান।’ আহমদ মুসা থেমে গিয়েছিল। সীট-বেল্ট বাঁধায় মনোযোগ দিয়েছে সবাই। আহমদ মুসা এবং সালিহা সানেমও। ট্যাক্সিএ সীটে গা এলিয়ে দিয়ে আহমদ মুসা তার গন্তব্য আংগোরার কথাই ভাবছে। আংগোরা একটি সামরিক নগরী। পর্বত্য শহর। এখানে বেসরকারি কিছু লোকও আছে। কিন্তু তারাও সামরিক ব্যক্তিদেরই বংশধর। এখানে কয়েকটা ভালো হোটেল আছে পর্যটকদের জন্যে। সে হোটেলগুলোরই একটিতে আহমদ মুসার জন্যে সীট বরাদ্দ হয়েছে একজন পর্যটক হিসাবে। রাস্তার দু’পাশের দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হলো আহমদ মুসা। চারদিকটা সবুজ টিলা, আর সবুজ উপত্যকায় ভরা। গাড়িটা যখন চড়াইয়ে উঠেছে তখন চারদিকের সবুজ দৃশ্য এবং টিলার উপরের ছবির মত রং-বেরং এর বাড়ি চোখ জুড়িয়ে দিচ্ছে। রাস্তার দু’ধারটাও ছবির মত সাজানো। ড্রাইভারের কাছ থেকে জানল প্রাইভেট বাড়ি কিছু আছে, কিন্তু রাস্তার দু’পাশের অধিকাংশ বাড়িই হোটেল-মোটেল জাতীয়। প্রচুর পর্যটক আসে। তাছাড়া প্রচুর দেশীয় লোক এখানকার নিরিবিলি পরিবেশে ছুটি কাটাতে আসে।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১২০০ জন


এ জাতীয় গল্প

→ বিপদে আনাতোলিয়া চ্যাপ্টার- ৭ (শেষ)
→ বিপদে আনাতোলিয়া চ্যাপ্টার- ৬ ৩য় অংশ
→ বিপদে আনাতোলিয়া চ্যাপ্টার- ৬ ২য় অংশ
→ বিপদে আনাতোলিয়া চ্যাপ্টার- ৬ ১ম অংশ
→ বিপদে আনাতোলিয়া চ্যাপ্টার- ৫ বাকি অংশ
→ বিপদে আনাতোলিয়া চ্যাপ্টার- ৫
→ বিপদে আনাতোলিয়া চ্যাপ্টার- ৪ বাকি অংশ
→ বিপদে আনাতোলিয়া চ্যাপ্টার- ৪
→ বিপদে আনাতোলিয়া চ্যাপ্টার- ৩ বাকি অংশ
→ বিপদে আনাতোলিয়া চ্যাপ্টার- ৩
→ বিপদে আনাতোলিয়া চ্যাপ্টার- ২ ৩য় অংশ
→ বিপদে আনাতোলিয়া চ্যাপ্টার- ২ এর বাকি অংশ
→ বিপদে আনাতোলিয়া চ্যাপ্টার- ১ বাকি অংশ
→ বিপদে আনাতোলিয়া চ্যাপ্টার- ১

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now