বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

একটা কাক অথবা রক্তের গল্প

"ভৌতিক গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X একটা কাক অথবা রক্তের গল্প এক রান্নাঘরের দরজায় একটা উচু টুলে বসে রাহনুমা লাউশাক কুটছে। কখনো হাত দিয়ে, কখনো বটি দিয়ে। আজ তেমন পোকা-টোকা নেই, টাটকা শাক, কুটে আরাম লাগছে। ওর ঠিক একহাত সামনে সাবিনা, সে কুটছে কৈ মাছ। চুলায় থাকা ভাতের পাতিল উপচে ফ্যান পড়বে পড়বে এমন সময় সাবিনা হালকা "উহ্" করে ওঠে। ছাইয়ে মাখামাখি বুড়ো আঙ্গুল বেয়ে সামান্য রক্ত বের হচ্ছে। শাকের ডালাটা নিচে রেখে রাহনুমা বলল, "কাটলো কিভাবে? " "লেজ কাটতে গিয়ে ঘষা লাগছে। ইদানিং কি জানি হইছে ভাবী, একটুতেই খালি কাটে, বুঝিনা। ভয় ভয় করে। " "আরে এগুলা এমনিই, কিছু না। যাও, হাত ধুয়ে মলম লাগিয়ে এই শাক কয়টা বাছো, অল্পই আছে। আমি মাছ ধরি। " ইতিমধ্যে ভাতের ফ্যান উপচাতে লাগল পাতিল বেয়ে। চুলার আগুনে পড়ায় ফিছফিছ শব্দ হচ্ছে। রাহনুমা ওর ঈষৎ ফোলা পেটে একহাত আলতো চেপে খানিকক্ষন দম নেয়। বাইরে পেয়ারা গাছে একটা কাক অনবরত ডেকেই চলেছে। কি তীক্ষ্ণ স্বর। গত কদিন ধরে খুব ডাকা ডাকছে। সকাল নাই দুপুর নাই বিকাল নাই খালি ডাকতেই থাকে। এত কেন ডাকে? রাহনুমার ভয় হয়। সাবিনা শাক বাছা শেষ করে এক গ্লাস পানি নিয়ে বসার ঘরে চলে আসে। আফসার মামা পানি চাইছিলেন। এসে দেখে তিনি খালি গায়ে সোফায় আধশোয়া হয়ে ইচ্ছামত হাসছেন। চোখ খোলা না বন্ধ বোঝা যাচ্ছে না। কোলের কাছে তার চব্বিশ ঘন্টার সঙ্গী রেডিওটা থেকে ব্যাঙ্গাত্মক ধরনের কথাবার্তা ভেসে আসছে। সাবিনা ডাকল, "মামা তোমার পানি। আর এত হাসছো কেন? " মামা এবার আসনের ভঙ্গিতে বসতে বসতে বললেন, "কিরে কখন এলি, বয় বয়। ফাটাফাটি একটা প্রোগ্রাম হচ্ছে বুঝলি, কে কত কৌতুকের ছলে পশ্চিম পাকিস্তানিদের ভেংচাতে পারে। ইচ্ছামত পচিয়ে ছাড়ছে সবগুলাকে। কয়েকটা শুনলেই হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাবি। " বলেই তিনি আরও জোরে হাসতে লাগলেন এবং একপর্যায়ে বিষম উঠে গেল। একহাতে মাথা চাপড়ে আরেক হাতে পানি খাচ্ছেন। মজার দৃশ্য। মেইন দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হল। সাবিনা বলল, "কে? " "আমি, খোল। " ফয়সালের কন্ঠস্বর। সাবিনার বড়ভাই, সোহরাওয়ার্দী কলেজের কেমিস্ট্রির অধ্যাপক। বাসা থেকে কলেজের দূরত্ব যেতে-আসতে মাত্র দশ মিনিট। দরজা থেকে কয়েক কদম এগুলেই মাঠ দেখা যায়, এমন কাছে। আগে পড়াত ব্রজমোহন কলেজে। হাতের ব্যাগটা পাশে রেখে ফয়সাল ধপ করে সোফায় হেলান দেয়। চেহারা মলিন, কেমন যেন আতঙ্কের ছায়া। বোনের দিকে চেয়ে আস্তে বলল, "রাহনুমা কি করে? " "ভাবী তো রান্না করে। ডাক দিবো? " "না থাক। দাড়িয়ে আছিস কেন, বস। " হালকা হাপানোর তালে মামা জিজ্ঞেস করে, "আজ এত তাড়াতাড়ি, ছেলেপেলে নাই? " "না মামা। ছাত্রীরা তো একদম আসেই না, ছাত্রও অনেক কমে গেছে। কিযে অবস্থা। রাস্তাঘাটে মানুষ নাই, পুরা এলাকা কেমন থমথমে। ও! মামা? " "হ্যা। " "টিচার্স রুমে গল্প করার সময় একটা কথা শুনলাম..." এতটুক বলে ফয়সাল একটু থামল। ওর কন্ঠ কাঁপছে, শ্বাস ওঠানামা করছে দ্রুত। চোখের চশমাটা হাতে নিয়ে খানিক দম ছেড়ে বলল, "কথাটা সত্যি কিনা বুঝতে পারতেছি না, পিরোজপুরে নাকি মিলিটারি নামছে। " বসার ঘরটা আপাতত একদম নিরব। টিনের চালে টুপটাপ বৃষ্টির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে কেবল। তিনজন যে যার মত চুপচাপ বসা। মামা চোখ বুজে গভীর চিন্তায় ঢুলছেন। ফয়সাল মেঝেতে তাকানো। ঠোঁটে হাত চাপা অবস্থায়ই হঠাৎ সাবিনা বলে ওঠে, "আমাদের কি তাহলে মরতেই হবে শেষপর্যন্ত? " কেউ কোন জবাব দেয় না। দুই নিরিবিলি বিকেল। ছিটছিট বৃষ্টি বাইরে। কাছের কোন মসজিদ থেকে আছরের আযান ভেসে আসছে। বিছানায় ফয়সাল এবং রাহনুমা পাশাপাশি শোয়া। একজন অপরজনের চোখে তাকানো। রাহনুমার চাহনিতে গভীর মমতা। তবু ফয়সালের চিন্তিত দৃষ্টি ওর চোখ এড়ায় না। এই গম্ভীর মানুষটাকে ও আগাগোড়া বুঝতে পারে এবং প্রচন্ড ভালবাসে। কন্ঠে মায়া টেনে ডাকল, "এই..." "বল। " "আমাদের বাবুটার আমি দুইরকম নাম রেখে ফেলছি। বলি? " "হুম। " "ছেলে হলে নাম রাখব স্বাধীন, আর মেয়ে হলে জয়ী। পছন্দ হইছে তোমার? " "খুব সুন্দর নাম। " "দেখো এই যুদ্ধে আমরা জয়ী হবই, আমাদের বাংলাদেশ স্বাধীন হবে। " ফয়সাল তৃপ্তির একটা হাসি দিয়ে স্ত্রীর পেটে হাত রাখে। কপালে কপাল ঠেকিয়ে চোখ বুজে ফেলল। ফ্রেশ ঘুম দরকার। এত দুশ্চিন্তা ওর আর ভাল লাগছে না। অনেকটা অস্তিরতা নিয়ে মামা রেডিওটার চ্যানেল সুইচ একবার এদিক আবার ওদিক ঘুরিয়েই চলছেন। বৃষ্টির কারণে ফ্রিকুয়েন্সি পেতে সমস্যা হচ্ছে, খালি ঘ্যারঘ্যার করে। কিন্তু তিনি নাছোড়বান্দা, নিজ ঘর থেকে বসার ঘরের চারপাশ ছুটে বেড়াচ্ছেন একটু লাইন পেতে। সেই দুপুরে খাওয়ার পর থেকে আরম্ভ। আপাতত সোফায় বসে হাপাচ্ছেন। মেইন দরজায় হঠাৎ কড়া নাড়ার শব্দ হল; টানা দুবার। মামা ভ্রু কুচকে ফেললেন। পরিস্তিতি এখন বড়ই জটিল, তাই খুব স্বাভাবিক ব্যাপারও মস্তিষ্ক অস্বাভাবিক রূপে গ্রহণ করে। ধীরে ছিটকিনি টেনে দরজার পাল্লা একটু ফাক করে দেখেন দুধওয়ালা মোহন মিয়া দাড়িয়ে আছে। সে বহুদিন ধরে এই বাসায় দুধ দেয়। বয়স ষাট ছুঁই ছুঁই, দেখে মনে হয় পঞ্চাশ। মামা আর রাহনুমার সাথে খাতির বেশ ভাল। প্রতি শীতে নিজের গাছের খাঁটি খেঁজুরের রস এনে দিয়ে যায়; টাকা দিতে গেলে হাসে, নেয় না। রাহনুমাকে ডাকে - আম্মা। মামাকে দেখে মোহন মিয়া আজ আর হাসল না। বরং মামা বিস্মিত হয়ে খেয়াল করলেন সে কাঁদছে। তার কুচকে যাওয়া বাদামী গাল বৃষ্টি আর চোখের পানিতে মাখামাখি। কিছুক্ষণ কান্না সামলে নিয়ে তারপর সে বলল, "ভাইজান যাইতাছিগা। " "আগে ভিতরে আসো মোহন মিয়া। তুমি কাঁদতেছো কেন, কি হইছে? " মামার কন্ঠ দারুণ বিচলিত, ভয়াবহ কিছুর আশঙ্কা করছেন। "আমগো এলাকার যত বাড়িঘর দোকানপাট আছে সব শ্যাষ ভাইজান। কাইল রাইতে মিলিটারিরা সব জ্বালাইয়া পোড়াইয়া শ্যাষ কইরা দিছে। " মোহন মিয়ার কন্ঠ অস্বাভাবিক কাঁপছে, কথা জড়িয়ে যাচ্ছে কথার সাথে। খানিক দম নিয়ে সে আবার বলে, "হ্যারা সামনে যারে পাইতাছে তারেই গুলি করতাছে ভাইজান। কি হিন্দু কি মুসলমান, কোন বাদ নাই। ছোড ছোড মাইয়া গুলানরে ধইরা লইয়া যাইতাছে, গরু ছাগল যা পায় সব লইয়া যায়। হ্যারা আমার বাড়িডাও..." মোহন মিয়া কথা শেষ করার আগেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। টপটপ করে চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। মামা আর ধৈর্য ধরতে পারলেন না, হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে ক'বার চোখ মুছলেন। মোহন মিয়াকে "দাড়াও একটু" বলে তিনি নিজের ঘরে চলে গেলেন। ফিরে এলেন কিছু টাকা হাতে। নোটগুলো গুঁজে দিয়ে ধরা গলায় বললেন, "কষ্ট পাইও না মোহন মিয়া। ঐ আল্লাহ আছে, তিনি সব বিচার করবেন। যেখানেই যাও সাবধানে থাইকো। " "আপনেরা পারলে অন্য কোথাও চইলা যান। এইদিক আইতে তাগোর কিন্তু দেরি লাগব না। যা করার এহনই করেন ভাইজান। আম্মা কেমুন আছে? " "ভাল আছে। গর্ভবতী তো, আমাদের চিন্তা ওকে নিয়েই বেশি। " "আল্লাহ ভরসা। যাই ভাইজান, আল্লাহ চাইলে আবার দ্যাখা হইব, আবার দুধ দিমু। " মোহন মিয়া ছিটছিট বৃষ্টির মধ্যে ভিজে ভিজে চলে যাচ্ছে। হাঁটার গতি অনেকটা দৌড়ের মত। মামার চোখ পানিতে টলটল করছে। তিনি একটা কাকের দিকে চেয়ে আছেন। কাকটা এই বৃষ্টিতেও ডাকছে, কা কা কা! বড় তীক্ষ্ণ শোনায়, অস্বস্তিকর। তবু মামা দরজা ধরে দাড়িয়েই রইলেন। ভেজা মাটির হালকা হালকা ঘ্রাণ শুকতে তার কেনজানি ভালই লাগছে। তিন ঘড়ির কাটা প্রায় দেড়টা ছুঁই ছুঁই। সারা বাড়ি অন্ধকার, ডিমলাইট নিভিয়ে দেয়া হয়েছে। ফয়সালের রুমে মূর্তির মত সবাই চুপচাপ বসে আছে। কেবল রাহনুমা শোয়া, ও গভীর ঘুম তাই জাগানো হয়নি। জাগালে ভয় পেত, কারণ গত আধঘন্টা যাবত কোথা থেকে যেন থেমে থেমে গোলাগুলি হট্টগোলের আওয়াজ ভেসে আসছে। ফয়সালের ধারণা আওয়াজটা আসছে মধ্যপাড়া এলাকা থেকে, কলেজের পিছনেই। মধ্যরাতের নিরিবিলি পরিবেশে তা স্পষ্ট বোঝা যায়। সবার আগে শোনে সাবিনা। ঘুমের মধ্যে কি যেন একটা বাজে স্বপ্ন দেখছিল, ধড়ফড়িয়ে জেগে উঠতেই টের পায় শব্দগুলো। তারপর ভয়ে ভয়ে মামা আর ফয়সালকে ডেকে তোলে। মূল ঘটনা অবশ্য সবাই বুঝতে পেরেছে, না বোঝার কিছু নেই। রাহনুমা মোচড়াচ্ছে। কিছুক্ষন এভাবে করার পর একসময় খুব ক্ষীণস্বরে ডাকল, "এই..." "এইতো আমি। কি, বাথরুমে যাবে? " ফয়সাল বলল। "হুম। " ওকে সাবধানে ধরে ধরে ফয়সাল রুম থেকে বেড়িয়ে গেল। অন্ধকার ঘর কিংবা গোলাগুলির শব্দ বিষয়ে কোন কিছুই জিজ্ঞেস করলো না রাহনুমা। চোখে ঘুম নিয়ে কেবল পা ঘষে ঘষে হাঁটছে। তারপর বাথরুম থেকে এসে আবার আগের মতই শুয়ে পড়ল। সাবিনা নিজের ঘরে চলে এসেছে। বাঁ পায়ের আঙ্গুলে চিনচিনে যন্ত্রণা, অন্ধকারে দরজার সাথে জোরে টাক লেগেছিল। ও হাত-পা গুটিয়ে বসে আছে বিছানায়। ভয়টা কেটে গেছে, কোন অনুভুতি হচ্ছে না এখন কিছু নিয়েই। হঠাৎ আসাদকে ভীষণ মনে পড়ছে, মুখটা ভাসছে চোখের উপর। বেশি না, মাত্র ছয় সাত মাস হবে ওদের বিয়ের বয়স। শ্বশুড়বাড়ি বাগেরহাট। সদরে বিশাল এক পাইকারি ঔষধের দোকান আছে আসাদের। বাড়ির অবস্থা যেমন ভাল তেমন মানুষগুলোও। সবাই ওকে খুব আপন করে নেয়। এবং অল্প সময়েই সাবিনা আসাদকে ভালবেসে ফেলল। একটু একটু করে সময় যায় আর সাবিনা পুরোদমে সংসারে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সারাদিন রান্নাবান্না, ঘরের কাজ; তারপর দিনশেষে আসাদ ফিরলে ওর হাত ধরে ছাদে হাঁটাহাঁটি করা। দুজন মিলে মন দিয়ে গল্প করত, হাসাহাসি করত, প্রকৃতি দেখত, আর সুযোগ পেলে গানের কলি খেলা। আসাদ ভুলভাল সুরে একেকটা গান গাইত, শুনে সাবিনা হেসেই খুন। রোজ রাতে শক্ত করে সাবিনার কোমড় জড়িয়ে ঘুমাত। মানুষটার এমন আদরে সাবিনা ভারি লজ্জা পায় আবার বড় ভালও লাগে। কখনো কখনো আনন্দে চোখে পানি চলে আসে। তখনো দেশের খারাপ পরিস্থিতি নিয়ে ওর তেমন ধারণাই ছিল না, আসাদের মুখে যতটুকু শুনত ততটুকুই। দোকানে যাবার সময় নিয়ম করে স্বামীর বুকে ফুঁ দিয়ে দিত যাতে বিপদাপদ না হয়। তারপর একদিন জলদি জলদি ফিরে আসাদ সবাইকে বলল সে ট্রেনিং নিতে ওপাড় যাবে। সঙ্গে সঙ্গে ওর মায়ের প্রশ্ন, "ট্রেনিং নিতে কেন? কিসের ট্রেনিং? " "যুদ্ধের ট্রেনিং। আমি যুদ্ধে যাব আম্মা। " "তাহলে আমাদের কি হবে? " "কপালে যা আছে তাইই হবে। পাকিস্তানিরা কুকুরের মত মানুষ মেরে মেরে পুরো দেশটা নিয়ে যাইতেছে আর আমি একটা পুরুষ হয়ে ঘরে বসে থাকব? অসম্ভব! " সাবিনা অতি বিস্ময়ে কিছু বলার খুঁজে পায় না। এমনকি বাসার অন্যকেউও না। আসাদ যে নাছোড়বান্দা তা ওর কথার দৃঢ়তায় বোঝা গেছে, কাজেই এটা নিয়ে কেউ আর তেমন উচ্চবাচ্য করলো না। তাছাড়া আরেকটা সিদ্ধান্ত হল, সাবিনাকে তার বাসায় রেখে আসা হবে। বাড়ি ছাড়ার আগের রাতে সাবিনা খুব কাঁদল আসাদের বুকে মুখ গুজে। কাঁদতে কাঁদতেই পরম মমতায় নিজ হাতে ব্যাগ গুছিয়ে দিল। একপর্যায়ে আসাদ ওর গালে দুটো চুমু খেয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, "সাবিনা শোন, যুদ্ধ শেষে আমি তো আবার ফিরে আসব। স্বাধীন একটা পতাকা উপহার দেব তোমাকে। আমাদের সন্তানরা মনখুলে এই মুক্ত দেশে ছুটে বেড়াবে, আমরা হাত ধরে কত জায়গায় ইচ্ছামত ঘুরব। আর ততদিন পর্যন্ত তুমি একটুও কাঁদবে না, ঠিকাছে? কি হল, কান্না থামাও। " সাবিনা কান্না নিয়েই হেসে ফেলে। কি আশ্চর্যরকম সুন্দর দেখাচ্ছে মেয়েটাকে। ভেজা গালে ওর তৃপ্তির হাসিটা দেখতে দেখতে আসাদ অন্যরকম এক ঘোরে চলে যায়। যে ঘোরের সংজ্ঞা বড় রহস্যময়, বড় সুন্দর। গোলাগুলি, মানুষের চিৎকারসহ বিকট বিকট শব্দ ক্রমাগত বেড়ে চলেছে ঐ মধ্যপাড়া এলাকা থেকে। আগের চেয়ে আরও স্পষ্ট। চুপ থাকা ঝিঁঝিঁরাও যেন রেগেমেগে হঠাৎ ডাকতে শুরু করেছে। বসার ঘর থেকে মামা ভাইয়ার আতঙ্কিত কথাবার্তা শোনা যায়। অথচ এতসবের কোনটাই সাবিনার কানে পৌঁছতে পারে না। জল ছপছপ দৃষ্টি মেলে ও একধ্যানে জোছনায় চেয়ে আছে। সন্ধ্যারাতের বৃষ্টি শেষে আকাশে এখন শুভ্র চাঁদ। বন্ধ জানালার ফাক-ফোকর গলে জোছনারা সরলরেখার মত মেঝেতে ছায়া ফেলছে। একটা দুইটা তিনটা... অনেকগুলো ছায়া। চার সে রাতের ঠিক একদিন পর। সকালবেলা। "আফসার ভাই, ও আফসার ভাই, দরজা খোলেন। আমি মোসলেম। এখনো ঘুম নাকি? " এভাবে পরপর কয়েকবার দরজা ধাক্কাধাক্কির শব্দে মামা কিছুটা বিভ্রান্ত। মোসলেম মিয়া এলাকার পরিচিত ব্যক্তি। বাজারে তার আঁতর, টুপি, কোরআন শরীফ এর দোকান আছে। ধার্মিক চালচলনের কারণে লোকে তাকে সম্মান করে এবং মামাও করতেন। তবে সে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে এটা জানার পর আর কথাবার্তা বলতেন না। মামা নিম ডাল দিয়ে দাঁত মাজা থামিয়ে দিলেন। এত সকালে মোসলেম মিয়া কি জন্য এলো, ঠিক বুঝতে পারছেন না। ওঘর থেকে ফয়সাল এসে কয়েক সেকেন্ড মামাকে দেখে বলল, "কে? " "মোসলেম মিয়া। আচ্ছা খোল, দেখ কি বলে। " দরজা খুলে চোখ বড়বড় হয়ে গেল দুজনের। মামা মনে মনে কেনজানি এমনটাই আশঙ্কা করছিলেন। প্রথমে ফয়সাল পরে মামা বাইরে নেমে দাড়াল। মোসলেম মিয়ার মুখে পান খাওয়া লাল দাঁতের হাসি। সে খুব শুদ্ধ উচ্চারণে মামাকে একটা সালাম দিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল উত্তরের আশায় কিন্তু উত্তর পেল না। এতে যেন তার হাসিটা আরেকটু চওড়া হল। বলল, "মামু- ভাইগ্না একসাথে দেইখা ভাল্লাগতেছে। তা কেমন আছো ভাইগ্না? " "জ্বি ভাল। " মুখে বাজিয়ে বলে ফয়সাল। "এমন ভাল থাকার কোন দাম আছে? কত কইরা বললাম আমাদের শান্তি কমিটিতে যোগ দাও যোগ দাও। শুনলা না। এখন? এখন ঐ নফরমান ভারতের চামচাগুলা কি তোমারে হেফাজত করবে? আমি তোমার মুরব্বি। মুরব্বিদের কথা না শুনলে এমনই হয় বুঝলা। " মোসলেম মিয়ার থেকে খানিক দূরে দাড়ানো পাঁচজন পাকিস্তানি মিলিটারি। এদের মধ্যে নেতা গোছের একজনকে সে কি যেন চাপাস্বরে বলল। টিমের ক্যাপ্টেন সম্ভবত। কথা শেষে ক্যাপ্টেন দুজন সেনাকে ইশারা করল, "Search the house." তারা দ্রুত ঘরে ঢুকে গেল। সে এবার ফয়সালের একহাত সামনাসামনি দাড়িয়ে সরুচোখে ওকে কিছুক্ষণ দেখে। তারপর ইংরেজিতে বলল, "You teacher? " "Yes." "Subject? " "Chemistry." "Chemistry? Very talent subject." ক্যাপ্টেন এখন উর্দুতে শুরু করে। "বল তো সাবানের রাসায়নিক বিক্রিয়া কি? সাবান। " "I don't know." "ভাল, খুব ভাল। " ফয়সাল মাটির দিকে তাকিয়ে আছে। সাবানের বিক্রিয়া ওর ঠোঁটস্থ কিন্তু বলবে না। প্রচন্ড রাগে চোয়ালে চোয়াল ঘষা খাচ্ছে। কেনজানি এছাড়া অন্য কোন অনুভুতিই মাথায় কাজ করছে না। আর মামা তো সেই তখন থেকে চুপচাপ। ইতিমধ্যে সাবিনাকে হেচড়ে টানতে টানতে সেনা দুজন চলে এসেছে। একজন বলে উঠল, "স্যার বাড়িতে আর কেউ নেই। " মাঝ দিয়ে মোসলেম মিয়া বলে, "ফয়সালের বউয়ের তো থাকার কথা। মনেহয় বাপের বাড়ি চলে গেছে। " ফয়সালের এতক্ষণে খেয়াল হয় রাহনুমার কথা। সাবিনাকে ধরে আনলো তাহলে ও কোথায়। গুলির শব্দ হয়নি অর্থাৎ মেরে ফেলেনি। ওকে খুঁজে পায়নি বোধহয়। হঠাৎ ফয়সালের খুব শান্তি লাগতে থাকে। চোখের উপর ভাসতে থাকে স্ত্রীর মমতাময়ী মুখটা। ক্যাপ্টেনের নির্দেশে মামা এবং ফয়সালকে দুহাত পিছে রেখে উল্টো ঘুরে দাড় করানো হল। তাদের পিঠ বরাবর চারটা রাইফেল প্রস্তুত। সাবিনার সারা শরীর ভয়াবহ কাঁপছে, যেন এখনি অজ্ঞান হয়ে যাবে। তারপর টানা কতগুলো গুলির শব্দে পুরো বাড়িটা যেন নড়ে উঠল। আকাশে গাঢ় মেঘ ডাকছে, বৃষ্টি পড়তে পারে এক্ষুনি। সাবিনা অজ্ঞান। এক সেনার ঘাড়ে করে ওকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে গাড়ির দিকে। পিছনে রক্তের মাখামাখিতে নিশ্চুপ পড়ে থাকে সাজানো গোছানো এক মায়ার সংসার। বাড়ির একেবারে শেষ কোণায় ধুলাভর্তি একটা পুরনো স্টোররুম থেকে আস্তে আস্তে পা ফেলে রাহনুমা বেরুল। ঘামে শরীর গোসল অবস্থা। খুব ভয় করছে, তলপেটে ব্যথা হচ্ছে ভীষণ। মিলিটারি এসেছে দেখে সাবিনা তখন জলদি ওকে এই রুমের একপাশে বসিয়ে দিয়ে চলে যায়, কিছু বলারও সুযোগ দিল না। সেই থেকে পেটে চাপ সহ্য করে বসে থাকা। ক্ষীণস্বরে কয়েকবার "সাবিনা" বলে ডাকল, সাড়া নেই। আরেকটু জোরে ডাকল, তাও সাড়া নেই। ওর কান্না পাচ্ছে, দ্রুত পা চালিয়ে এগুতে লাগল। বসার ঘর পাড় হয়ে মেইন দরজায় এসেই বরফের মত জমে গেল রাহনুমা। চোখ জ্বালা করছে, পেটের যন্ত্রণা এবার অস্বাভাবিক। চোখের সামনে পুরো চারপাশটা কেমন দুলে উঠল। এক পা এক পা করে ও খুব ধীরে ফয়সালের কাছে বসে। কোলের উপর কাঁপা হাতে ভেজা মাথাটা আগলে নেয়। পাশেই নিথর আফসার মামা। ঝিরঝির বৃষ্টিতে ওদের রক্তগুলো ধুয়ে যাচ্ছে। চলে যাচ্ছে মোটা-চিকন রক্তজলের ধারায় এদিক ওদিক। রাহনুমার এখন কান্না আসে না, সত্যিই আসে না। চোখ যায় টিনের চালে, ওখানে একটা কাক বসে আছে। সেই কাক, দিনরাত যে শুধু ডাকতেই থাকত ডাকতেই থাকত। অথচ আজ তার ডাক কোথায়, ঠোঁট বন্ধ কেন, এত চুপচাপ কেন সে? ওটাকে চিৎকার করে অনেক কিছু বলতে ইচ্ছে হয় রাহনুমার, কিন্তু পারে না তো। প্রচন্ড অসহায়ের মত কান্না করে ফেলে অবশেষে। মেঘের তুমুল গর্জনে ওর কান্নার শব্দ চাপা পড়ে যায়। বৃষ্টি বাড়ে, তবু কাকটা উড়ে না। কুচকুচে কালো পালকগুলো শরীরের সাথে গুটিয়ে একধ্যানে তাকিয়ে থাকে অন্যকোথাও। তার বড্ড ঠান্ডা লাগছে। ***


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৯৮ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now