বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

কনস্পিরেসি-০৫

"ফ্যান্টাসি" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X পলিটিক্যাল থ্রিলার, কনস্পিরেসি (পর্ব-৫) সাইফ ধৈর্য্য ধরে দোকানির চাঁদপানা হাসি হাসি মুখটার দিকে তাকিয়ে আছে।সব মানুষই বোধহয় মানুষকে বিভ্রান্তিতে ফেলে মজা পায়! হাসি কিছুক্ষণ পর থামতে সাইফ বলল,'ব্যাপারটা খুলে বলবেন কি?' দোকানি কথা না বলে দোকানের একটা কোণের দিকে ইশারা করল। জায়গাটা দোকানের ভেতর দিকেই। একটা বড় র্যাক আড়াল করে রেখেছে।তার ফাঁক দিয়েই উঁকি দিচ্ছে একটা কালো রঙের বস্তু।এখান থেকে ভাল দেখা যাচ্ছেনা।তার উপর আঁধার হয়ে আসছে।পায়ের আঙ্গুলে ভর দিয়ে সামান্য উঁচু হল সাইফ। এবার পুরোপুরি দেখতে পেল বস্তুটা। চিনতে পারার সাথে সাথেই হতভম্ব হয়ে গেল ও।সিসি ক্যামেরা!এই দোকানে? দোকানের দিকে আবার দৃষ্টি ফেলল সাইফ।জৌলুষহীন এই দোকানে সিসি ক্যামেরা থাকবে সেটা কে ভেবেছিল? সাইফ দোকানির দিকে ফিরে তাকাল।'সিসি ক্যামেরা লাগিয়েছেন কী মনে করে?' 'হে হে,এইটা আমার ভাইয়ের দোকানের ছিল।ভাই দোকান বিক্রি কইরা দিছে তো তাই এইটা আমারে দিয়া দিছে।ভালই কাজে আসে।আমি একলা মানুষ, তার উপর এইখানে সব ছোট ছোট পোলাপান আসে।বাচ্চা তো,অনেক সময় বিল না দিয়াই চইলা যায়।এইটা দেখলে ভয়ে থাকে,তাছাড়া এইসব আলগা ভাবভঙ্গি দেখলে কাস্টমার আসে বেশি হে হে!'আবার হেসে উঠল দোকানি।' 'গ্রেট!' অপ্রত্যাশিত সাহায্য পেয়ে মনে মনে খুশি হয়ে উঠল সাইফ।ভাল করে লক্ষ্য করে দেখল ক্যামেরাটা দোকানের দরজা এবং দরজার সামনের কিছু অংশ কাভার করছে। তবে ডাস্টবিনেও কাভার করছে কিনা বোঝা গেলনা।কোনো মনিটর দেখা যাচ্ছেনা।জিজ্ঞেস করল,'ক্যামেরাটা কতখানি কাভার করে?' 'এই তো সামনের জায়গা,দরজা।' 'ডাস্টবিনও কি কাভার করে? ' হাসিটা একটু ম্লান হল লোকটার। বলল,করে কিন্তু পুরাটা না।একবারে ডাস্টবিনের কাছে গিয়া দাঁড়াইলে ক্যামেরায় ধরব,নইলে না।' 'তাহলে তো সমস্যা হয়ে গেল। আচ্ছা, আপনার রেকর্ড রাখার সিস্টেমটা কী?' 'মানে?বুঝাইয়া বলেন একটু।' 'মানে কতদিনের ফুটেজ ব্যাকআপ করে রাখেন?' 'ও আচ্ছা।আমার কম্পিউটারে জায়গা কম তো,এক সপ্তাহ পর পরই ডিলিট করতে হয়।' 'এখন কতদিনেরটা আছে?' 'পাঁচদিন মনে হয়।দেখতে হইবো।' 'আচ্ছা পরে দেখলেই চলবে।এখন আজকের ফুটেজটা দেখান একটু।' 'আজকে বিকাল তিনটার পরে,আপনি শিওর তো,স্যার?' 'হ্যাঁ, এর আগে হলে কী সমস্যা?' 'না মানে,আমার আসল ব্যাবসা শুরু হয় দুপুরের পর থিকা তো তাই স্কুল ছুটি হওয়ার আগে আগে ক্যামেরা চালু করি।' 'ও আচ্ছা,না তিনটার পরই।' 'তাইলে আছে।কিন্তু দেখতে হইলে তো স্যার,কাউন্টারের ভিতরে আসতে হইবো।' মোটাসোটা লোকটাকে সাইফের ভাল লেগে গেছে।মুচকি হাসি দিয়ে বলল,'আপনার নামটা জানা হলনা।' 'আমার নাম?আমার নাম মাহবুব। একগাল হাসি দিয়ে বলল লোকটা। সাইফ পাল্টা একটা হাসি দিয়ে কাউন্টারে ঢুকতে যাবে এমনসময় এক সাথে দোকানে চার পাঁচজনের একটা দল ঢুকল।সবাই তরুণ তরুণী। আড্ডা দিতে এসেছে সম্ভবত। মাহবুব একটা ক্ষমাপ্রার্থনার হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে সেদিকে অর্ডার আনার জন্য এগিয়ে গেল। অনেক কষ্টে চেহারা স্বাভাবিক রাখল সাইফ।তীরে এসে তরীর মুখ ঘুরে গেলে যা হয় আরকি! একটা ব্যাপার মনে পড়ে গেল সাইফের।এইফাঁকে কাজটা করে ফেলা যাবে।দোকান থেকে বেরিয়ে এসে খসরুকে ফোন করল। 'হ্যালো স্যার।'দুবার রিং হতেই ওপাশ থেকে বলল খসরু।'কিছু পেলেন?' 'হুমম,তবে কতটুকু কাজে দেবে বুঝতে পারছিনা।এখানে একটা দোকানে সিসি ক্যামেরা আছে, তবে আমাদের কলারকে ক্যামেরা ধরতে পেরেছে কিনা জানিনা।আচ্ছা, আপনি আমাকে কলের এগজ্যাক্ট টাইমটা জানান।' 'প্লিজ ওয়েট।'কয়েক সেকেন্ড পরই লাইনে এল খসরু।'স্যার তিনটা বেজে বাইশ মিনিট।' 'আর আমাদের টিম পৌছায় কখন?' 'পঁচিশ মিনিটের মধ্যেই।' 'ওকে,থ্যাংকস। বাই দ্যা ওয়ে,কলারকে ট্রেস করতে আরেকটা টিম পাঠাতে বলেছিলাম,ওদের খবর কী?' 'জী পাঠিয়েছি, তবে এখন পর্যন্ত কিছু জানায়নি।গুরুত্বপূর্ণ কিছু জানতে পারলেই আপনাকে জানাব।' 'ওকে।' ফোন রেখে দিল সাইফ।দোকানে ঢুকে দেখতে পেল অর্ডার সার্ভ করা হয়েছে। সাইফ কাউন্টারে ঢুকে বলল,'আপনি সোয়া তিনটা থেকে পৌনে চারটা,এই আধঘন্টার ফুটেজ দেখান আমাকে। এরমধ্যেই ডাস্টবিনের কাছে এসেছিল আমার বন্ধু।' 'দাড়ান,স্যার,'বলে কম্পিউটার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল মাহবুব।কিছুক্ষন পর মনিটর ওর দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে বলল দেখেন স্যার।' ক্যামেরার ভিউটা দেখল সাইফ। দোকানের সামনে অংশ আর ডাস্টবিনের কিছু অংশ কাভার করছে। ডাস্টবিনের খুব কাছে না গেলে আসলেই বোঝা যাবেনা কিছু।তবে আশার কথা হল ফোনটা যেখানে পাওয়া গেছে ওখানে রাখতে হলে ক্যামেরার আওতায় আসতেই হবে কলারকে।তবে কতটুকু দেখা যাবে সেটাই হচ্ছে প্রশ্ন।যতদুর মনে হচ্ছে রহস্যময় কলার ক্যামেরা সম্পর্কে সচেতন নয়।না হবারই কথা। প্রথমত এমন দোকানে ক্যামেরা থাকবে সেটা ঠিক বিশ্বাস্য নয়। তাছাড়া ক্যামেরার অবস্থান দোকানের ভেতরে।দোকানের দিকে মোটামুটি ভালমত না তাকালে দেখার সম্ভবনা নেই।আর কলারের মত সচেতন কেউ দোকানিকে নিজের চেহারা দেখাবার ঝুঁকি নিয়ে ড্যাবড্যাবে চোখে তাকিয়ে থাকবেনা। সাইফ আশা নিরাশার মাঝামাঝি অবস্থানে আছে।খুব বেশি আশা করা কিংবা একেবারে হতাশ হয়ে পড়া ওর স্বভাব না। ফুটেজটা ফার্স্ট ফরোয়ার্ড করে দিল সাইফ।একের পর এক স্টিল ফটো দ্রুত স্লাইড করে সরে যেতে লাগল। ক্যামেরাটার এফপিএস(FPS) ভালই। সুক্ষ্ম ডিটেইলসগুলোও ধরা পড়ছে। এফপিএস হল 'frame per second' এর সংক্ষেপিত রূপ।একটা ক্যামেরা যত বেশি এফপিএস সম্পন্ন হবে,অর্থাৎ প্রতি সেকেন্ডে যত বেশি ফ্রেম ধারণ করবে ছবি তত বেশি মানসম্পন্ন হবে। ফার্স্ট ফরোয়ার্ডে ডিটেইলসও তত বেশি ধরা পড়বে।যদিও এখন পর্যন্ত তেমন কিছু চোখে পড়েনি,ফুটপাত দিয়ে ঝড়ের বেগে হেঁটে যাওয়া পথচারী ছাড়া।ফার্স্ট ফরোয়ার্ডিং এর কারনে মনে হচ্ছে সবার পায়ে চাকা গজিয়েছে বোধহয়। সময় দেখল সাইফ।পনেরো মিনিটের ফুটেজ দেখা হয়ে গেছে।ফোন করার পরও বেশ কিছুক্ষন অপেক্ষা করেছে কলার।নিশ্চিত ছিল সিক্রেট শ্যাডো এধরনের মেসেজ পেলে আসবেই।তারমানে বোঝা যাচ্ছে ছেলেটা সিক্রেট শ্যাডো সম্পর্কে ভালই জ্ঞান রাখে।ক্রিমিনাল হলেও উড়িয়ে দেবার মত নয় এই রহস্যময় কলার।আগেই অনুমান করে দেখেছে ফোন করার কতক্ষন পর আসতে পারে সিক্রেট শ্যাডো।তার আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করে গেছে। বিশ মিনিট।আর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ঘটনাস্থলে হাজির হয়ে যাবে সিক্রেট শ্যাডো টিম।এর মধ্যে কাজ না হলে আবার গোড়া থেকে দেখতে হবে পুরো ফুটেজটা।ভাবতে না ভাবতেই সাইফের বুকে কাঁপন তুলে ফ্রেমে ঢুকে পড়ল একটা লোক। সাইফ নিশ্চিত এই সেই রহস্যময় কলার! ক্যামেরার দিকে পেছন ফিরে থাকায় চেহারা দেখা গেলনা।দেহাবয়ব সাধারন, বিশেষত্বহীন। কাঁধ পর্যন্ত লম্বা চুল।ক্যাজুয়াল শার্ট আর জিন্স পরে আছে লোকটা।লোক না বলে ছেলে বলাই ভাল।বয়সে সাইফের চাইতে কিছু ছোটই হবে। হাতের সিগারেট ফেলার ভঙ্গি নিয়ে এগোলো ডাস্টবিনের দিকে।অন্য হাতে আরো কী যেন ধরা,বোঝা যাচ্ছেনা।ছেলেটা সিগারেট ফেলার সাথে সাথেই অপর হাত থেকে সেই বস্তুটাও মাটিতে পড়ে গেল।একটা রুমাল।পড়ে যাওয়া রুমালটা ওঠাতে গিয়ে উবু হল ছেলেটা। সাথে সাথে সাইফ ধরতে পারল ব্যাপারটা।ছেলেটা রুমাল ওঠাবার ফাঁকেই ফোনটা রেখে দেবে জায়গামত।ঘটলও তাই।ছেলেটা উঠে দাঁড়াতেই তার দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে ডাস্টবিন আর খাম্বার মাঝখানে অস্পষ্টভাবে পড়ে থাকতে দেখা গেল ফোনটা। এমন সময় আরেকটা জিনিস লক্ষ্য করে অবাক হয়ে গেল সাইফ।ছেলেটা সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে রাস্তার ওপাশের কিছু একটা দেখে চমকে গেছে।একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সেদিকে। কী দেখছে ছেলেটা?সিক্রেট শ্যাডো টিম চলে এসেছে? তাও তো হবার কথা না।সিক্রেট শ্যাডো এলে রাস্তার এপাশ দিয়েই আসবে। রাস্তার ওপারে তাহলে কী দেখছে ছেলেটা?নাকি ফোন রাখতে কেউ দেখে ফেলল?তা কী করে হয়?সে যে কৌশলে ফোনটা রেখেছে সেটা আগে থেকে জানা না থাকলে সাইফও ধরতে পারতনা। ছেলেটা অবশ্য একটু পরই জায়গা থেকে সরে একটু দুরে গিয়ে দাঁড়াল। স্ক্রীনে শুধু তার পা'টা দেখা যাচ্ছে। পা'টা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে নাচাচ্ছে।বোধহয় মুদ্রাদোষ,কিংবা অস্থিরতার প্রকাশ। অপেক্ষা করছে সিক্রেট শ্যাডোর। এরপর হঠাৎ করেই পা'টা স্ক্রীন থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল।একটু পরই দেখা গেল সিক্রেট শ্যাডোর তিন এজেন্টকে। যে দেখার ছিল আপাতত দেখা হয়ে গেছে সাইফের।ফুটেজটা হেড কোয়ার্টারে নিয়ে গিয়ে আরো ভালমত যাচাই করতে হবে। কিন্তু সাইফের মন খচ খচ করছে অন্য একটা কারণে।ছেলেটা তখন কী দেখছিল ওভাবে? দোকানের গ্লাসের মধ্য দিয়েও দেখা যায় রাস্তার ওপাশের দৃশ্য। কোনো কারণ ছাড়াই ওদিকে চোখ চলে গেল সাইফের। সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে।রাস্তা এখন আলোকিত স্ট্রীট লাইটের আলোতে।সাঁই সাঁই করে ছুটে যাচ্ছে গাড়ি। হঠাৎ করেই জীবনের অন্যতম আশ্চর্য ব্যাপারটা চাক্ষুস করল সাইফ।চোখদুটো বিস্ময়ে বিস্ফারিত হয়ে গেল। সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যেই সক্রিয় হল সাইফের মস্তিষ্ক। বিদ্যুৎ খেলে গেল যেন গোটা দেহে। মাহবুবকে এক ঝটকায় মেঝেতে ফেলে দিয়ে নিজেও ডাইভ দিল মেঝে লক্ষ্য করে।সেই সাথে গর্জে উঠল,'গেট ডাউন!' সঙ্গে সঙ্গে যেন প্রলয় নেমে এল ছোট্ট দোকানটায়। একটানা বুলেটের আঘাতে ঝন ঝন করে ভেঙ্গে পড়ল কাঁচের দেয়াল। টুকরো টুকরো কাঁচগুলো বুলেটের মতই দ্রুত বেগে ছুটতে লাগল দিগ্বিদিক।ঝন ঝন আওয়াজটা অনুরণন তুলছে।মাথায় ঝিম ধরা একটা অনুভূতি। সাইফ মাটিতে ডাইভ দিয়েই দুই হাঁটু বুকের কাছে তুলে মাথা ঢেকে ফেলেছে।এরই ফাঁকে এক নজরে তাকাল মাহবুবের দিকে।বেচারা মাটিতে শুয়ে ভয়ে কাঁপছে।আচমকা প্রলয় নেমে আসাতে ভড়কে গেছে। সাইফ রাস্তা থেকে পেছন ফিরে আছে।ওর পেছনে ক’জন গুলী চালাচ্ছে জানা নেই।কাউন্টারের নীচের ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে দেখল তরুণ তরুণীদের দলটাও মেঝেতে শুয়ে আছে।একটা মেয়ে মাহবুবের মতই ভয়ে কাঁপছে।ঘটনার আকস্মিকতায় কয়েক মুহুর্তের জন্য ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেও রিফ্লেক্সবশত ওরাও মেঝেতে শুয়ে পড়েছে।তাদের আড়াল দিয়েছে দোকানের কাউন্টার।তবে সাইফ আর মাহবুবকে আড়াল দেবার জন্য কাঁচের দেয়ালটা ছাড়া আর কিছুই নেই।যেটা এখন শত টুকরো হয়ে ছড়িয়ে আছে মাটিতে।তবে আড়াল না থাকলেও বুলেটগুলো কোনো ক্ষতি করল না ওদের। যেভাবে আচমকা শুরু হয়েছিল ঠিক সেভাবেই সব নীরব হয়ে গেল।গুলী বন্ধ হয়ে গেছে।কাঁচ ভাঙার ঝনঝনানি থামার পরের নীরবতাকে কবরের নীরবতা বলে ভ্রম হচ্ছে।বাইরের ছুটে যাওয়া যানবাহনের আওয়াজ ছাপিয়ে নীরবতাই যেন প্রকট হয়ে উঠছে। পুরো ব্যাপারটা ঘটে গেছে দশ সেকেন্ডেরও কম সময়ের মধ্যে। সাইফ সতর্কতার সাথে উঠে দাঁড়াল। প্রস্তুত।যেকোনো মুহুর্তে হোলস্টার থেকে অস্ত্র হাতে উঠে আসবে। ভাঙা কাঁচের ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকিয়ে হতভম্ব হয়ে গেল সাইফ। বাইরের পরিবেশ বলতে গেলে সম্পুর্ণ স্বাভাবিক।শুধু পাশের দোকানি আর কয়েকজন পথচারী কৌতুহলী চোখে তাকিয়ে আছে কফিশপের দিকে।চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে তারা কিছুই বুঝতে পারেনি।হঠাৎ ব্যাপারটা উপলব্ধি করতে পারল সাইফ।গুলীর কোনো আওয়াজ ওরা কেউ শোনেনি। আচমকা কাঁচ ভাঙার আওয়াজই ভীতির সঞ্চার করেছে সাইফ বাদে কফিশপে উপস্থিত বাকিদের মধ্যে। তবে কাঁচ যে বুলেটের আঘাতে ভেঙ্গে পড়েছে সেটা শুধু সাইফই জানে। পুরো ব্যাপারটা আবার মনে করার চেষ্টা করল সাইফ।তখন ফুটেজ দেখার পর রহস্যময় কলার রাস্তার ওপাশে তাকিয়ে কী দেখছিল সেটা আঁচ করবার জন্য ও বাইরে তাকায়। রাস্তার ওপাশে তেমন কিছুই ওর নজরে পড়েনি।তাকিয়ে থাকতে থাকতেই দেখতে পায় রাস্তার এপাশে,কফিশপের কাছেই একটা গাড়ি এসে দাঁড়ায়।কালো রঙের গাড়িটার সবগুলো কাঁচ নামানো ছিল। চোখ ফিরিয়ে নেবে এমন সময় লক্ষ্য করল গাড়ির একটা জানালা নেমে গিয়ে সে পথে বেরিয়ে আসছে একটা পিস্তলের ব্যারেল। দ্বিতীয়বার কিছু ভাবতে যায়নি সাইফ।সঙ্গে সঙ্গে বিপদ বুঝতে পেরে কাভার নেয়।এখন বুঝতে পারছে যেটা দেখেছিল ওটা আসলে পিস্তলের ব্যারেল ছিলনা। সাইলেন্সার ছিল।হামলাকারী সাইলেন্সার ব্যাবহার করেছে। বলাই বাহুল্য গাড়িটা এখন আর নেই। মেঝেতে ডাইভ দেবার সাথে সাথেই শোল্ডার হোলস্টারে হাত চলে গিয়েছিল সাইফের।তবে অস্ত্র বের করতে গিয়েও করেনি।ততক্ষণে বুঝে ফেলেছিল এই হামলা আর যাই হোক ওদের হত্যার জন্য করা হয়নি।নয়ত মাটিতে শুয়ে পড়ার আগেই ঝাঁঝরা হয়ে যেত ওরা।বোঝাই যাচ্ছে হামলাটা প্রফেশনালদের কাজ।আর প্রফেশনালরা এত কাছ থেকে এতগুলো গুলী ছুড়েও লক্ষভেদ করতে পারবেনা এটা স্রেফ অসম্ভব। এখন লাখ টাকা দামের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে,ওদের উপর কেউ কেন গুলী চালাবে?সাইফের উপর গুলী চালানোটা অযৌক্তিক কিছুনা।ওর পেশায় খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।কিন্তু সত্যিই যদি ও-ই টার্গেট হত তাহলে এখনো নিশ্বাস নিতে পারত না ও। হামলাকারীরা নিশ্চয়ই জানে সাইফকে শুধু গুলীর ভয় দেখিয়ে সুবিধা করা যাবেনা।হামলাকারীর উদ্দেশ্য যাই থাক ওকে হত্যা করা ছিলনা।তাহলে আর কাকে ভয় দেখাবে?নিরীহ এক কপিশপের মালিক কিংবা কয়েকজন তরুণ তরূণীকে কেউ এভাবে ভয় দেখাবেনা।আর তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেয়া যায় এটা একটা ভীতি প্রদর্শনী ছিল,সেক্ষেত্রে সাইলেন্সার ব্যাবহার করত না হামলাকারী। তাহলে?বাইরে তাকিয়ে ভাবছিল সাইফ। মাহবুব দোকানের বাইরে গিয়ে উৎসুক জনতার উদ্দেশ্য জোর গলায় কী কী যেন বলছে।পথচারীরা কাঁচ ভাঙার আওয়াজে কৌতুহলী হয়ে দেখতে এসেছে ঘটনা।গুলীর ব্যাপারটা সাইফ ছাড়া আর কেউই টের পায়নি।দুষ্টু কোনো ছোকরার কান্ড ভেবেছে সবাই।ঢিল ছুড়ে পালিয়েছে।গাড়িটাকেও কেউ দেখেছে বলে মনে হয়না।সব মিলিয়ে বোধহয় পাঁচ ছয়টার বেশি গুলী ছোড়া হয়নি। বাইরে থেকে চোখ ফিরিয়ে ভেতরে তাকাল সাইফ।তরুণ তরুণীদের দলটা উঠে দাঁড়িয়েছে।পরিস্থিতি গুরুতর নয় দেখে স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। সাইফের দিকে একটা ছেলে রাগ রাগ চোখে তাকিয়ে আছে।যেন বাকিদের বলতে চাইছে,এই ভীতু লোকটা বাচ্চাদের ঢিল ছুড়তে দেখে কী ভয়টাই না পাইয়ে দিয়েছিল,বাপস! সাইফ তার মুখভঙ্গি দেখে মুচকি হাসি দিয়ে কাউন্টারের ভেতরে তাকাল।সাথে সাথেই লাখ টাকা দামের প্রশ্নের জবাবটা পেয়ে গেল ও। চার গুলশানে নিজের বাসার সামনে এসে দাঁড়াল সাইফের মার্সিডিজ।একবার হর্ণ দিতেই খুলে গেল গেট। দারোয়ানের সালামের জবাব দিয়ে গাড়ি গ্যারেজে এনে পার্ক করল সাইফ। দোতলা এই আলিশান বাড়িটায় সাইফ একাই থাকে।সঙ্গে থাকার মত কেউ নেই।মা জন্মের সময় মারা যান,আর বাবা বছর পাঁচেক আগে।বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান সাইফ। বাবার বিশাল সম্পত্তি,ব্যবসার একচ্ছত্র মালিক।কিন্তু এই অর্থ বিত্ত ওকে কখনই টানেনা।সিক্রেট শ্যাডোর জন্য অনেক টাকা খরচ করেছে সাইফ।কোনো বেতনও নির্দিষ্ট করা নেই ওর সিক্রেট শ্যাডো থেকে।সিক্রেট শ্যাডোকে স্রেফ প্রতিষ্ঠান ভাবেনা ও।ওর অস্তিত্ব এই সংস্থাটা।এই সংস্থার মাধ্যমেই অপরাধ নির্মূল করে যাচ্ছে,দেশে মাতৃকার সেবা করে চলেছে প্রতিনিয়ত,আর কি লাগে বেঁচে থাকতে?তবে এই বিশাল বাড়িটাতে মাঝে মধ্যেই খুব নিঃসঙ্গবোধ করে ও।তবে সঙ্গী খোঁজার চিন্তা ভাবনা আপাতত ওর নেই।সঙ্গীকে সঙ্গ দেবার মত সময় কোথায়?তবে মনে মনে ঠিক করে রেখেছে সিক্রেট শ্যাডো আরো খানিক শক্ত জমিনের উপর দাঁড়িয়ে গেলেই সঙ্গী খোঁজার মিশনে নামবে ও! নিজের রুমে এসে বাথরুমে ঢুকল। সারাদিন প্রচুর ধকল গেছে।এখন বাথটাবে ঘন্টাখানেক শুয়ে না থাকলে মরেই যাবে।এরপর নিরবচ্ছিন্ন একটা ঘুম।কাল থেকে আবার নামতে হবে লড়াইয়ে। নতুন এই কেসটা ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে।এখন হলফ করেই বলা যায় এটা এখন আর সাধারণ কোনো ব্যাপার নয়। শুরু থেকে ভাবা যাক।আজ দুপুরে একটা ফোনকল এল।যাতে দাবী করা হচ্ছে সামনেই দেশের ভয়াবহ বিপদ। কলার একটা ফোন ইচ্ছে করেই তুলে দিল ওদের হাতে।যেটা থেকে সযত্নে মুছে ফেলা হয়েছে ট্র্যাক করবার মত সব রকমের চিহ্ন।এরপর সেই ফোনের সূত্র ধরে একটা ফুটেজ খুঁজে পাওয়া গেল যেখানে কলারের আংশিক দেহাবয়ব দেখা গেল। সেখানেও অদ্ভুত ব্যাপার।কলারকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখা গেল অজ্ঞাত এক বস্তুর দিকে। এরপরই রহস্যময় হামলাকারী হামলা করল ওদের উপর।হামলার উদ্দেশ্য এখন পরিষ্কার সাইফের কাছে। সাইফ তখন কাউন্টারের ভেতর দিকে তাকাতেই দেখতে পায় মাহবুবের কম্পিউটারটা শত টুকরো হয়ে গিয়েছে।উদ্দেশ্য পরিষ্কার,হামলাকারীরা কম্পিউটারটা টারমিনেট করতেই এসেছিল। তারমানে,তারা কিছুতেই সিক্রেট শ্যাডোকে রহস্যময় কলারের হদিস পেতে দেবেনা। আপাতঃদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে এই হামলাটা সেই কলারের তরফ থেকেই করা হয়েছে কিন্তু আরেকটা ব্যাপার অন্য দিকে ইঙ্গিত করছে। সাইফের ধারণা হামলাকারী গাড়িটা কলারের পিছনে লেগে রয়েছে।কলার তখন রাস্তার ওপাশে এই গাড়িটার দিকেই তাকিয়ে ছিল।অর্থাৎ কলার আর হামলাকারী সম্পুর্ণ ভিন্ন দুটো দল।তাদের মধ্যে এসে পড়েছে সিক্রেট শ্যাডো।ওদের টেনে আনা হয়েছে।কলার ওদের কিছু একটা বলতে চাইছে আর অপর দলটা বাধা দিয়ে যাচ্ছে যেন ওরা কলারের কাছে পৌঁছতে না পারে। কী রহস্য লুকিয়ে আছে পুরো ব্যাপারটার মধ্যে?এই কলার কিংবা অন্য দলটার পরিচয় কী?কী ঘটাতে চাইছে ওরা? কলারকে খুঁজে পাওয়া এখন খুবই জরুরী হয়ে দাড়িয়েছে।তার কাছেই সমস্ত প্রশ্নের জবাব পাওয়া যাবে। সাইফের কাছে আর কোনো সূত্রই নেই তাকে ধরবার মত।সামান্য যেটা ছিল সেটাও নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। হয়ত ওই ফুটেজটা ভাল করে স্টাডি করলে কিছু একটা বেরিয়ে যেত। ফোন বেজে উঠতেই চিন্তার সুতো ছিঁড়ে গেল সাইফের।গোসল করার সময় ফোনটা বাথরুমে নিয়ে আসতে হয় ওকে বাধ্য হয়েই! ‘হ্যালো,’ফোন রিসিভ করে বলল সাইফ।আগেই দেখেছে খসরুর নাম্বার। ‘স্যার,’উত্তেজনায় সামান্য হাঁপাচ্ছে যেন খসরু। ‘আপনি এখনও বাসায় যাননি?রাত তো অনেক হয়েছে।’ খসরু সাইফের কথা শুনতে পেয়েছে বলে মনে হয়না।‘বলল,স্যার একটা ঘটনা ঘটে গেছে।আপনি শুনলে বিশ্বাসই করতে চাইবেন না।’ বুকের মধ্যে ধক করে উঠল সাইফের।‘কী হয়েছে?’ ‘স্যার,দ্বিতীর যে টিমটা পাঠিয়েছিলাম কলারকে ট্র্যাক করবার জন্য,ওরা একটা ঠিকানা ট্রেস করতে পেরেছে।যে দোকান থেকে সিম কিনেছে কলার সেখানে একটা ঠিকানা দিয়েছে সে।’ ‘ভুয়া নিশ্চয়ই,’বলতে গিয়েও বলল না সাইফ।ভুয়া একটা ব্যাপার নিয়ে এত উত্তেজিত হবেনা খসরু।‘কিভাবে নিশ্চিত হলেন,ঠিকানাটা ফেক নয়?’ ‘স্যার,আরো আশ্চর্যের ব্যাপার হল কলার নিজের ছবিও দিয়েছে সিম রেজিস্ট্রেশনের জন্য।আমরা তার দেয়া ঠিকানায় গিয়ে আশেপাশের লোকজনদের ছবি দেখিয়ে নিশ্চিত হয়েছি এই লোক ওই ঠিকানায়ই থাকে।’ ‘আশ্চর্য!আচ্ছা,খসরু,আপনি সেই ছেলেটার চেহারার একটা বর্ণনা দিন তো।’ ‘দিচ্ছি।ছেলেটার বয়স পঁচিশ ছাব্বিশ হবে।শ্যামলা।ঘাড় পর্যন্ত লম্বা চুল।’ খসরু এতটুকু বলতেই সাইফ থামিয়ে দিল তাকে।‘থাক,আর বলতে হবেনা। এই সেই কলার।ফুটেজে দেখা চেহারার সাথে মিলে যাচ্ছে হুবহু।’ সাইফ কোনো কুলকিনারা করতে পারছেনা।এই ছেলেটা এত লুকোচুরি করল,অথচ অপরদিকে তাকে ট্রেস করবার জন্য এতই সোজা একটা রাস্তা খুলে রাখল যেটার খোলা থাকবে সে চিন্তাও ওরা কেউ করেনি। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে ব্যাপারটা ইচ্ছাকৃত।এই রহস্যময় কাজের অর্থ কী?ছেলেটা যদি ওদের হাতে এত সহজে ঠিকানা তুলেই দেবে তাহলে এত কেন লুকোচুরি করল প্রথমে? জবাবটা পেয়ে গেল সাইফ।ওদের আগ্রহ তৈরির জন্যই একাজ করেছে সে।আসলেই,ফোনের মধ্যে যদি কলারের সমস্ত তথ্য থাকত তাহলে খুব দ্রুতই আগ্রহ হারিয়ে ফেলত সিক্রেট শ্যাডো।এত ঝুট ঝামেলা করে তাকে খুঁজে বের করবার চিন্তাও মাথায় আনত না।তারমানে ফুটেজে আংশিকভাবে নিজেকে দেখানোটাও ইচ্ছাকৃত ছিল!কলার খুব ভাল মতই জানত মাহবুবের দোকানে ক্যামেরা আছে।এটাও জানত ক্যামেরা কখন চালু করা হয়।কতটুকু জায়গা কাভার করে। নিখুঁত প্ল্যানের মাধ্যমে প্রথমে আগ্রহী করেছে সিক্রেট শ্যাডোকে,এরপর ধীরে ধীরে টেনে এনেছে নিজের তৈরি মঞ্চে।একজন মাস্টার প্ল্যানার ছাড়া এমন নিখুঁত পরিকল্পনা করা কারো পক্ষে সম্ভব না।পুরো সিক্রেট শ্যাডোকে নিজের ইচ্ছে মত খেলিয়েছে সে। সাইফ মনে মনে একটা স্যালুট ঠুকল অজ্ঞাত পরিচয় এই মাস্টার প্ল্যানারকে। এখন প্রশ্ন,কে এই মাস্টার প্ল্যানার?সেই কি সব কিছুর মূলে,নাকি তার পেছন থেকে কলকাঠি নেড়ে চলেছে অন্য কেউ?তার উপর হামলাই বা করতে চাইছে কারা? অনেকগুলো প্রশ্ন।যার জবাব আছে শুধুমাত্র একজনের কাছেই। সাইফকে অনেক্ষণ যাবত চুপ থাকতে দেখে নিজেও চুপ করে রইল খসরু। কল্পনার চোখে দেখতে চাইছে ফোনের ওপাশে সাইফের চিন্তিত মুখ।সত্যি বলতে,এফবিআইতে অনেকদিন ধরে কাজ করে অনেক বাঘা বাঘা স্পাই আর গোয়েন্দাকে দেখছে খসরু,কিন্তু সাইফের প্রতি আলাদা একটা শ্রদ্ধা অনুভব করে সে।এই ছেলেটার নিষ্ঠা,হীরার মত ধারালো বুদ্ধি,সাহস,দক্ষতা সব কিছুই অন্য সবার থেকে আলাদা করেছে সাইফকে। বেশ কিছুক্ষন পর সাইফ বলে উঠল।‘এখন আমাদের টিমটা কোথায়?’ ‘কলারের জন্য অপেক্ষা করছে।বাড়ি ফিরলেই ক্যাঁক করে ধরবে।’ ‘আপনি ওদের ফিরে আসতে বলুন।’ ‘স্যার?’ ‘হ্যাঁ,টিম নিয়ে ওকে ধরা সম্ভব নয়।’ ‘তাহলে?’ ‘আমি নিজেই যাচ্ছি।’একটু বিরতি,‘আমাদের বন্ধুর দাওয়াত কবুল করতে।’মুচকি হাসি দিয়ে বলল সাইফ।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৭৬ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now