বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
আইজ রাইতে আমার লগে শুইবি?চাইরশ ট্যাহা দিমু।
-চাইরশ ক্যান?
-আমার কাছে ৫০০ আছে।১০০ দিয়া রাইতে ভাত খামু,আর ৪০০ তোর।
মেয়েটির নাম মুনমুন।মা আর একটা ছোটবোন নিয়ে তার সংসার।বাবা মারা গিয়েছে বছর চারেক হলো।বাবা থাকতে যে খুব বেশি স্বচ্ছল ছিলো তা কিন্তু না।তবে ৪ জনের ছোট সংসার চলে যেতো কোনোরকম।বাবার মৃত্যুর পর মা লোকের বাড়ি কাজ করে তাদের পড়াশোনা আর খাওয়ার খরচ যোগাতো। হঠাৎ একদিন স্ট্রোক করে প্যারালাইজড হয়ে মা শয্যাশায়ী হয়ে গেলেন।অসুস্থ মা আর ছোটবোনকে নিয়ে সদ্য যৌবনা মুনমুন বিপাকে পড়ে গেলো।তিনটি মুখের অন্ন যোগাতে এবাড়ি ওবাড়ি হন্যে হয়ে কাজ খুঁজে বেড়িয়েছে সে।অল্পবয়সী একটা সুন্দরী মেয়ে যে কিনা যেকোনো পুরুষের মাথা ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম,এমন মেয়েকে কাজে রাখা আর খাল কেটে কুমির আনা গৃহিনীদের কাছে সমতুল্য।তাই এতগুলো বাড়ির একটাতেও তার কাজ জুটলো না।
আয়ার কাজ না পেয়ে গার্মেন্টসে ঢুকতে চেয়েছিলো।কিন্তু সেখানেও তো দালাল আর টাকার প্রয়োজন।তাই সেখান থেকেও হতাশ হয়ে ফিরছিলো আর তখনই এক মহিলা তাকে কাজের অফার দিলো।অভাবে জর্জরিত মুনমুন কোনোকিছু না শুনে,না ভেবেই মহিলাটির পিছু পিছু চলে গেলো।আর তারপর থেকেই সে নিষিদ্ধ পল্লীর একজন সদস্য।
মুনমুনের বাড়ির দু'বাড়ি পরই অনিকের বাড়ি।ছেলেটা মুনমুন এর সমবয়সীই বলা চলে।ছোটবেলা থেকে তারা একইসাথে খেলেছে,বড় হয়েছে,একইসাথে যৌবনে পা দিয়েছে।যতই দিন গিয়েছে,মুনমুনের প্রতি অনিকের ভালো লাগা ততই তীব্র হয়েছে এবং একসময় তা ভালোবাসায় পরিণত হয়েছে।কিন্তু অবুঝ মুনমুন কেনো যে বুঝতে চাইতো না কে জানে?
মুনমুনের বাবা মারা যাওয়ার পর অনিক চেয়েছিলো মুনমুনকে বিয়ে করে তাদের সংসারের দায়িত্ব নিতে,কিন্তু মুনমুন তার সাহায্য নিতে ছিলো অপারগ ।তাই একসময় প্রচন্ড রাগে অনিক নিজ থেকেই মুনমুনের জীবন থেকে সরে আসে।
যেদিন প্রথম শুনেছিলো মুনমুন পতিতাপল্লীতে নাম লিখিয়েছে,সেদিন কষ্টে অনিকের বুকটা ফেটে যাচ্ছিলো।সেদিন অনিক নিজেকে সামলে নিতে পারলেও আজ আর পারছে না।সেদিন সে বেকার ছিলো।কিন্তু আজ সে কিছু তো অন্তত করে।তাই ২ বছর বাদে আবারও মুনমুনের কাছে এসেছে।প্রেমের দাবীতে নয়,মুনমুনের কাস্টমার হয়ে।
ইদানীং পতিতাবৃত্তিতে তেমন সুবিধা হয়ে উঠছে না।পুলিশের দৌরাত্ম,কাস্টমারের চিটিং ইত্যাদির কারণে ব্যবসায় মন্দা দেখা দিয়েছে। মুনমুনের হাতে তেমন টাকা নেই,সেখানে ৪০০ টাকা তো অনেক! তাই মুনমুন অনিকের এক কথায় রাজি হয়ে গেছে।
-হ,আমি রাজি।
-আইচ্ছা।আমি ১ ঘন্টা পর আইতাছি।তুই রেডি থাহিস।
মুনমুন খুব সুন্দর করে সেজেছে,অন্য দিনের চেয়ে একটু বেশিই সেজেছে।প্রেমের টানে না হোক,পেশার খাতিরে যখন একসময়ে ভালোলাগার মানুষটাকে কাছে পাওয়া যাচ্ছে...তখন নিজেকে গুটিয়ে রাখার কোনো মানে হয় না।
.
বেলি ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণে পুরো ঘর মৌ মৌ করছে।অনিক রাতে না খেয়েই পুরো ১০০ টাকা খরচ করে মুনমুনের জন্য বেলি ফুল এনেছে।মুনমুন বেলি ফুল খুব ভালোবাসে।
-তোর কাছে না ১০০ ট্যাহা আছিলো? ফুলের ট্যাহা কই পাইলি?
-আছিলো আমার কাছে।
অনিকের মুখের দিকে তাকিয়েই মুনমুন বুঝতে পেরেছে অনিক ক্ষুধার্ত,না খেয়ে তার জন্যে ফুল এনেছে।এক প্লেট ভাত এনে নিজ হাতে অনিকের মুখে তুলে দিলো সে।
-হা কর দেখি?
-ক্যান? আমি খাইয়াই আইছি।তুই খা।
- মিছা কতা কইস ক্যান? আমি জানি তুই খাইস নাই।
অনিক আর কথা বাড়ালো না।বাধ্য ছেলের মত মুনমুনের হাতেই খেয়ে নিলো।
.
খাওয়া শেষে মুনমুন অনিকের মুখ ধুইয়ে শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছে দিলো।বেলি ফুলের মালাগুলো তখনও অনিকের হাতেই ছিলো।মুনমুন ইশারায় মালাগুলো পরিয়ে দিতে বললো।
হাতে,পায়ে,গলায় পরানোর পর সবশেষে মুনমুনের চুলেও একটি মালা পরিয়ে দিলো অনিক।ঘাড়ের ওপর থেকে মুনমুনের চুলগুলো সরিয়ে আলতো করে একটা চুমু খেলো।মুনমুনের সমস্ত শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেলো।পেছন ফিরে অনিকের দিকে তাকাতেই অনিক তার কপালে একটা চুমু এঁকে দিলো।প্রায় দুবছরের যৌনজীবনে এতটা ভালোবাসার পরশ আর কখনো পায় নি মুনমুন।অন্যরকম এক মাদকতায় ছেয়ে গেলো দুজনের মন।রাতের গাঢ় অন্ধকারে দুটো দেহের সাথে সাথে দুটো মনও মিশে একাকার হয়ে গেলো।
-মুন?
-হুম?
-আমার লগে যাবি?
-কই?
-আমার বাড়িতে?
-এহহ,ক্যান?
-ক্যান আবার?আমার বউ হইয়া যাবি।
অনিকের দিকে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে মুনমুন বললো,
-তুই আমারে নিজের বউ বানাবি?
-হ,বানামু।
-হাছা কইতাছোস?
-মিছা কমু ক্যান? আমিতো আগেও তরে কইছিলাম,তুই ই তো রাজি হইস নাই।আর না করিস না মুন সোনা।তরে আমি কোনোদিন কষ্ট দিমু না, দেহিস?
মুনমুন নতুন করে স্বপ্ন দেখে।তার আর ১০ টা মেয়ের মত স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে খুব ইচ্ছে করে।অভাবের তাড়নায় এ পথে আসলেও এখন তার এই নরকে দম বন্ধ হয়ে আসে।প্রতিদিন নতুন নতুন কাস্টমারের শয্যাসঙ্গী হতে আর ভালো লাগে না মুনমুনের।একেকদিন একেক মুখ...নিজেকে জঘন্য লাগে।তার চেয়ে একটা ভালোবাসার মানুষের সাথে বাকিটা জীবন সাজিয়ে নিতে পারলে ক্ষতি কি?
আজ হঠাৎ মুনমুনের প্রচন্ড স্বার্থপর হতে ইচ্ছে করছে।মা,বোন কারো কথাই ভাবতে ইচ্ছে করছে না।মনে হচ্ছে এই অনিক কোনো এক জাদুর পরশে সবকিছু ঠিক করে দিবে।
অনিকের সাথে পালানোর প্ল্যান করে মুনমুন। কেননা,এই পতিতাপল্লীর সর্দারনী এত সহজে একটা সুন্দরী কর্মী হাতছাড়া করতে চাইবে না।তার জন্য অনিককে একটা মোটা অংকের টাকা গুণতে হবে।কিন্তু অত টাকা অনিকের হাতে নেই,তাই তারা পালাচ্ছে।
দুদিন শহর থেকে অনেক দূরে বর্ডারের কাছে একটা গ্রামে গা ঢাকা দিয়ে থাকার পর অনিক বললো,
-আইজ তোরে এক জায়গায় নিয়া যামু,চল।
অনিকের সাথে বের হয়ে মুনমুন খুব খুশি।অনেকদিন পর পাহাড়ের মুক্ত পরিবেশে খোলা হাওয়ায় বের হয়ে নিজেকে পাখির মত স্বাধীন মনে হচ্ছে।এসবই সম্ভব হয়েছে অনিকের জন্য।ও না থাকলে তো ওই বদ্ধ কুঠুরীতেই আজীবন পঁচে মরতে হতো তাকে।
হঠাৎ তাকিয়ে দেখে আশেপাশে কোথাও অনিক নেই।খুঁজতে খুঁজতে কিছুদূর এসে দেখলো,অনিক একটা লোকের কাছ থেকে কিছু টাকা নিচ্ছে এবং বলছে,
-একদম খাসা মাল স্যার।ত্রিশ হাজারের কথা ছিলো,বিশ হাজার কম হইয়া যায় না?
-আরে মিয়া রাখো তো।তোমার লগে কি আমার আইজকালের কারবার? এবার এটা রাখো,পরেরবার বাড়াইয়া দিমু নে।
- বহুত কষ্ট হইছে এই মাইয়ারে পটাইতে।আইচ্ছা, কি আর করা...যা আছে দ্যান,বাকিটা পরে দিয়েন।
সবটা শুনে বুঝে ফেললো মুনমুন আসলে কি ঘটনা ঘটেছে।এক নরক থেকে এনে মুনমুনকে আরেক নরকে ফেলার চক্রান্ত করছে এই অনিক।আড়াল থেকে বের হয়ে মুনমুন বললো,
-এইসবের মানে কি অনিক?
- ও! তুই সব শুইনা ফেলছোস? তাইলে আর লুকাইয়া লাভ কি? শুন,তোরে আমি এই লোকের কাছে বেইচা দিছি।আমার কথা শুন,এনার লগে যা।বড় ভালা মানুষ। তোরে বিদেশ লইয়া যাইব,ওইহানে তুই কাম করবি।ভালা খাইবি,ভালা পড়বি।মাস শেষে মা, বইনের লাইগা ট্যাহাও দিতে পারবি।
- কিন্তু তুই কইছিলি আমারে তোর বউ বানাবি!
-হা হা হা! তোরে বানামু আমার বউ? আমার পিছনে কত মাইয়া ঘুরে জানোস?এই ২ বছরে আমার অনেক ট্যাহা হইছে, তোর মত নষ্টা মাইয়ারে ক্যান বিয়া করুম আমি?
-মানে? তুই না আমারে ভালোবাসস?
-ভালোবাসা কি রে? খায় না মাথায় দেয়?
মুহূর্তেই মুনমুনের পুরো দুনিয়া ওলটপালট হয়ে গেলো। এই মুহুর্তে অনিকের বলা কথাগুলো কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না তার।মনে হচ্ছে যেন, সে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে একটা দুঃস্বপ্ন দেখছে।এক্ষুনি ঘুম ভেংগে যাবে,আর অনিক আবার আগের মত হয়ে যাবে।
-তাড়াতাড়ি এই সাবের লগে যা।নাইলে আবার ঝামেলা হইতে পারে...
অনিক কথাটা শেষ করার আগেই ঝোঁপের আড়াল হতে একদল পুলিশ বেরিয়ে বললো,"হ্যান্ডস আপ! অনিক ইসলাম,ওরফে অক্টেল।তোমার খেলা শেষ। অনেকদিন ধরে এই নারী পাচার চক্রের সংগে যুক্ত হয়ে দেশের অসহায় নারীদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে তাদের পাচার করে দিয়েছো।ধন্যবাদ মিস মুনমুন,আমাদের সাহায্য করার জন্য।আপনার সহযোগিতা না পেলে এতকিছু কখনোই সম্ভব হতো না।"
হতবাক দৃষ্টিতে মুনমুনের দিকে তাকিয়ে রইলো অনিক। অনিকের গোবেচারা চেহারা দেখে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো মুনমুন।তারপর অনিকের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলতে শুরু করলো,"মনে পড়ে আজ থিকা ৬ বছর আগের কথা? আমার আব্বা তহন বাঁইচা আছিলো।আমরা খুব বেশি ভালা আছিলাম না,কিন্তু খুব একটা খারাপও আছিলাম না।একদিন তুই রাস্তায় আমারে প্রেমের প্রস্তাব দিছিলি।আমি না করায় আমার লগে রাস্তায় কত অসভ্যতা করলি।আমার আব্বা তহন ওই রাস্তা দিয়া যাইতাছিলো।আমার ওই অবস্থা দেইখা আব্বা তোরে থাপ্পড় মারছিলো আর তুই আমার আব্বারে মাইরা ফেলার হুমকি দিছিলি।এর ২ দিন পর রাইতে আমার আব্বার লাশ রহিম চাচার দোয়ানের সামনের বট গাছে যহন ঝুলাইতেছিলি,আমি তহন আব্বারে খুঁজতে একাই বাইর হইছিলাম।আমি নিজ চক্ষে দেখছি,আমার আব্বারে তুই খুন করছোস।প্রমাণ আর সাক্ষীর অভাবে এতদিন আমি চুপ ছিলাম।এই কারণেই তর বিয়ার প্রস্তাবেও তহন আমি রাজি হই নাই।নিজের শরীর বেচছি,তবু নিজের বাপের খুনির কাছে যাই নাই।আর আইজ এতকাল পর যহন পতিতাপল্লীর আশেপাশে তরে ঘুরতে দেখলাম তহন প্রতিশোধের নেশা উইঠা গেলো।এবার জেলে বইয়া পিরিত কর।হা হা হা।"
পুলিশ অফিসার বললো,"প্রতি সপ্তাহের মত সেদিনও পতিতা পল্লী রেইড দিতে গিয়ে আমরা তোমাকে দেখি অনিক ওরফে অক্টেল।আমাদের সংগ্রহে তখন শুধু তোমার একটা ছবি আর অক্টেল নামটা ছিলো।পতিতা পল্লীর পাশে তোমায় দেখেই আমি চিনে ফেলি এবং পতিতাপল্লীর প্রত্যেকটা সদস্যকে তোমার সম্পর্কে বলে রাখি এবং তাদের সাহায্য করতে বলি।সেখানে গিয়েই মুনমুনের কাছ থেকে জানতে পারি তোমার নাম অনিক।তার তারপর বাকি প্ল্যানটা তো তুমি জানোই।নাউ লেট'স গো টু জেইল মি. রোমিও ...জীবনের বাকি প্রেমটা না হয় জেলে বসেই করো।"
অনিক আর তার সাথের লোকটাকে নিয়ে পুলিশ চলে গেলো।আকাশের দিকে তাকিয়ে দু'ফোঁটা চোখের পানি ফেলে মুনমুন বললো,"আমি পারছি আব্বা।তোমার খুনিরে শাস্তি দিবার পারছি।"
(সমাপ্ত) ……
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now