বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
১
" রায়হান ঢাকা গিয়ে কি তুই আমাকে ভুলে যাবি?"
ব্যাগ কাঁধে বাসস্ট্যান্ডে বাসের জন্য অপেক্ষা করছে রায়হান। এই প্রথম সে ঢাকা যাচ্ছে, তবে কোথাও বেড়ানোর জন্য নয়। রায়হান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়ে গেছে। রায়হানদের গ্রাম থেকে এই প্রথম কেউ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেয়েছে।
তাই রায়হান ঢাকা যাচ্ছে। রায়হানের মনে একই সাথে আনন্দ আবার বেদনায় ভরপুর। অানন্দের ব্যাপার হচ্ছে তার অনেকদিনের স্বপ্ন অবশেষে পূরন হয়েছে। আর দুঃখ হচ্ছে মা বাবা ছোট বোন আইরিন আর আদিবাকে ছেড়ে ঢাকায় যেতে হচ্ছে।
আদিবা হচ্ছে রায়হানের চাচাতো বোন। একই সাথে আদিবা রায়হানের ছোটবেলার খেলার সাথী। একসাথেই তারা ছোট থেকে বড় হয়েছে। আনন্দ, দুঃখ, হাসি, কান্না সবকিছুই তারা একসাথে ভাগাভাগী করে নিয়েছে। সেই আদিবাকে ছেড়ে যেতে হচ্ছে আজ।
কিছুক্ষন অপেক্ষা করার পর বাস চলে এলো। রায়হান বাসে উঠতে যাবে এমন সময় আদিবা রায়হানকে উদ্দেশ্য করে একেবারে শুরুর কথাটা বলে উঠলো।
" তোরে তো সবার আগে ভুলতে হবে। তোর মত একটা পেত্নির কথা কেন মনে রাখবো? আমাকে কি পেত্নিতে কামড়েছে? "
রায়হানের উত্তর শুনে আদিবা মুখ কালো করে দাঁড়িয়ে রইলো বাসস্ট্যান্ডে। রায়হানের বাবা মা ওদের কান্ড দেখে হাসছে।
" ওই নলডাঙ্গার হাতি, তুই আমাকে পেত্নি বললি কেন? আমি পেত্নি হলে তুই আস্ত একটা হাতি।"
এইবার রায়হান না হেসে পারলো না। আদিবা এখনো সেই বাচ্চা রয়ে গেল। কেমন ঠোঁট ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রায়হানের দিকে তাকিয়ে। দেখেই গড়াগড়ি দিয়ে হাসতে ইচ্ছে করছে রায়হানের। বাস থেকে আবার নেমে গেল রায়হান । আর পাঁচ মিনিট পরেই বাস ছেড়ে দেবে। আদিবার চুলের বেণি ধরে আলতো করে টেনে দিল সে।
" ভাল থাকিস রে আদিবা। আমি যাই বাস ছেড়ে দিবে।"
" আচ্ছা যা, ওখানে গিয়ে ঠিকমত খাবি কিন্তু। এখন যেমন হাতির মত মোটা আছিস ঠিক যেন তেমনি থাকিস। যদি চিকন হয়ে যাস তাহলে খবর আছে তোর।"
" যথাজ্ঞা পেত্নিরাণী।"
বাবা মা আর বোনের কাছ থেকেও বিদায় নিয়ে বাসে উঠে পড়লো রায়হান। কিছুক্ষন পরই বাস ছেড়ে দিল। বাসের জানালা দিয়ে বাসস্ট্যান্ডের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলো রায়হান। তার চোখ ঝাঁপসা হয়ে আসছে।
২
আজকে রায়হানের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম দিন। যথেষ্ঠই পরিপাটি হয়ে সে ক্যাম্পাসে উপস্থিত হলো। রায়হানকে দেখে বোঝাই যায়না যে সে সদ্যই পাড়া গাঁ থেকে এসেছে ঢাকায়।
প্রথম দিনেই বেশ কয়েকজন বন্ধু হয়ে গেল রায়হানের। আর রায়হানের বন্ধু তো হবেই, কারন রায়হান সবার সাথে খুব সহজেই মিশে যেতে পারে। তার বন্ধুদের মধ্যে আরমান নামের একটা ছেলের সাথে রায়হানের খুব ভাল সম্পর্ক তৈরী হয়ে যায়। এই আরমানের মাধ্যমেই ইবনাতের সাথে প্রথম পরিচয় হয় রায়হানের। মেয়েটার পুরো নাম ইবনাত বিনতে ইরা। নামের মতই সুন্দর চেহারার অধিকারী ছিল ইবনাত।
ক্যাম্পাসের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েদের মধ্যে ইবনাত অনায়াসেই জায়গা করে নিতে সক্ষম। এমনই ছিল তার রুপের আগুন।
ধীরে ধীরে রায়হান আর ইবনাতের বন্ধুতের সম্পর্ক তৈরী হতে থাকে। রায়হান যথেষ্ঠ মেধাবী ছাত্র, আর ইবনাত সেই তুলনায় গবেট টাইপের। আর সবসময় মেধাবী আর গবেটদের মধ্যেই সবচেয়ে ভাল সম্পর্কগুলো তৈরী হয়।
রায়হান আর ইবনাতের বেলায় তার ব্যতিক্রম হয়নি। ইবনাত সারাদিন ক্লাস না করে ক্যাম্পাসের এখানে সেখানে টইটই করে ঘুরে বেড়াতো। আর রায়হান ক্লাস করে এসে সব নোট ইবনাতকে দিত। এভাবেই চলতে থাকে ইবনাত আর রায়হানের দিন।
এভাবে চলতে থাকলেই বোধহয় ভাল হতো। কিন্তু বেশিদিন এভাবে চললো না ব্যাপারটা।
৩
প্রায় একমাস হয়ে গেল রায়হান ঢাকা গিয়েছে। তারপর থেকে এখন পর্যন্ত রায়হানের সাথে আদিবার কোন যোগাযোগ নেই। রায়হান মাঝে মাঝে তার বাবা মা আর বোনের সাথে কথা বললেও আদিবার সাথে কথা বলেনি কোনদিন। রায়হান যখনি ফোন দিত তখনই আদিবা চলে যেত রায়হানদের ঘরে। চাচা চাচীর কথা বলা শেষ হলে আদিবা রায়হানের ব্যাপারে চাচা চাচীকে অনেক প্রশ্ন করতো।
রায়হান কেমন আছে, ঠিকমত পড়াশোন করে কিনা, ঠিক মত খায় কিনা এইসব জিজ্ঞেস করে আদিবা। কিন্তু মনে একটা দুঃখ আদিবার থেকে যায়। রায়হান কখনোই আদিবার খোঁজ নিল না।
তাই একদিন আদিবা ফোন করলো রায়হানকে। রায়হান তখন ইবনাতের সঙ্গে বসে বসে আড্ডা দিচ্ছিল।
হঠাৎ অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন আসায় রায়হান প্রথমবার ফোন ধরলোই না। পরের বার আবার ফোন দেওয়ার পর রায়হান ফোন ধরলো।
" হ্যালো কে? "
" কিরে কেমন আছিস? "
" জী ভাল আছি, কিন্তু আপনি কে? "
" আমি আদিবা।"
" ওহ আদিবা তুই? কেমন আছিস রে তুই? "
" এইতো ভাল, তুই কেমন আছিস? "
" এইতো ভাল আছি, চাচা চাচীর কি অবস্থা? "
" বাবা মা ভালই আছে।"
" আচ্ছা আদিবা তোকে পরে ফোন দেই? একটা গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস আছে।"
" এতদিন পর তোর সাথে কথা বলছি আর তুই বলছিস পরে কথা বলবি? "
" আহ আদিবা তুই কি বুঝিস না কিছু? আমি রাখছি।"
" রায়হান শোন.........!"
রায়হান ফোন কেটে দিয়েছে। আদিবার চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি পড়তে লাগলো। মোবাইলে আদিবা স্পষ্ট শুনতে পেয়েছে কোন একটা মেয়ে রায়হানের পাশে আছে। মেয়েটা খিলখিল করে হাসছিলো।
আদিবার কলিজাটা কেউ যেন দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছিলো। আচ্ছা আদিবা কি রায়হানকে হারিয়ে ফেলছে?
৪
রায়হান ওয়াশরুমে এসে চোখে মুখে পানির ঝাঁপটা দিচ্ছে। প্রচন্ড কষ্টে রায়হানের বুকের পাঁজর ভেঙ্গে যেতে চাইছে। এভাবে কি কোন মানুষ কষ্ট পেতে পারে ?
ইবনাতের সাথে রায়হানের বন্ধুত্বের সম্পর্ক প্রায় দুইবছর পেরিয়ে গেছে। এই দুই বছরে রায়হানের হৃদয়ের কোণে ইবনাতের জন্য আলাদা একটা জায়গা তৈরী হয়ে গিয়েছে। রায়হান খুবই ঘুম কাতুরে ছেলে, বালিশে মাথা লাগানোর পরপরই সে ঘুমিয়ে পড়ে।
কিন্তু যেদিন থেকে ইবনাতের ব্যাপারে অন্যরকম করে ভাবতে শুরু করলো রায়হান, সেদিন থেকেই ঘুম নামক জিনিস রায়হানের কাছ থেকে পালিয়ে গেছে। ঘুমের বদলে এখন শুধুই ইবনাতকে কল্পনা করতে ইচ্ছে করে রায়হানের।
বেশিক্ষন রোদে ঘোরাঘুরি করলে ইবনাতের নাকের ডগা লাল হয়ে যায়, গালে ফুটে ওঠে লাল আভা। বাতাসে অবাধ্য হয়ে উঠা চুলগুলো ঠিক করতে গিয়ে বিরক্ত হচ্ছে ইবনাত। ঠিক এই ব্যাপারগুলোই বারবার রায়হানের মস্তিষ্কে চলতে থাকে।
এভাবে বেশিদিন ভালবাসা চেপে রাখা যায় না। তাই একদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে নিজেকে মানসিক এবং পোশাকগত ভাবে তৈরী করতে লাগলো রায়হান। আজ এসপার নয়তো ওসপার হয়েই যাবে। আজই ইবনাতকে মনের কথা বলে দেবে রায়হান।
" ইবনাত তোকে একটা কথা বলার ছিল।"
রায়হানের গলা কাঁপছে। শুধু গলা নয়, রায়হানের পুরো শরীর কাঁপছে। এতদিন ইবনাতের সাথে কথা বলার সময় তো এমন হয়নি। আজ কেন এমন হচ্ছে। মনে হচ্ছে রায়হান এখনি মাটিতে লুটিয়ে পড়বে।
" কি এমন কথা বলবি যে এভাবে কাঁপাকাঁপি করছিস?"
" আসলে অনেকদিন ধরেই তোকে..........!"
রায়হান কথাটা শেষ করতে পারলো না। ইবনাতের ফোন বেজে উঠেছে। পার্স থেকে ফোন বের করে কল ধরলো সে।
" হ্যালো আসিফ বলো। কিহ তুমি আমার ভার্সিটির সামনে? কোথায় দাঁড়িয়ে আছো? আচ্ছা তুমি চলে আসো। আমি সামনেই আছি, নেভি ব্লু কালারের সেলোয়ার কামিজে।"
ইবনাত ফোন রেখে আবার রায়হানের দিকে তাকালো। ইবনাতের চোখে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি।
" হ্যা রায়হান বল কি যেন বলছিলি? "
" কে ফোন দিয়েছিল রে ইবনাত? "
" আমার হবু উনি, মানে আমার ইয়ে আরকি।"
খিলখিল করে হেসে উঠলো ইবনাত, আর ইবনাতের হাসি. ৩২৭ ম্যাগনামের বুলেটের মত রায়হানের বুকে বিদ্ধ হচ্ছিল।
কিছুক্ষন পর বাইকে চড়ে আগমন ঘটলো এক সুদর্শন যুবক। তারপর আর কি হবে? ইবনাত ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরে, তারপর সব বন্ধুর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় তার হবু স্বামী হিসেবে।
৫
রায়হানের ফোন বন্ধ, প্রায় একশোবার ফোন দিয়েছে আদিবা। প্রতিবারই সুমধুর কন্ঠে এক মেয়ে কন্ঠ বলে উঠছে ' আপনার কাঙ্খিত নাম্বারে এই মূহুর্তে সংযোগ দেয়া সম্ভব নয়।'
আদিবার চোখ ফেটে পানি পড়ছে। আজই পাগলটার ফোন বন্ধ রাখা লাগলো? আজ আদিবাকে ছেলে পক্ষ দেখতে আসছে। আদিবা রায়হানকে ভালবাসে। বিয়ে যদি করতেই হয় তাহলে রায়হানকেই করবে। তাই মনের কথা বলার জন্য রায়হানকে ফোন দিচ্ছে বারবার। কিন্তু রায়হানের ফোন এখনো বন্ধ।
" রায়হান তোকে একটা কথা বলি। আমি তোকে ভালবাসি, সেই স্কুল জীবন থেকে। হয়তো ভাবতে পারিস তাহলে এতদিন বলিনি কেন। আসলে এতদিন তোকে হারানোর ভয় মনে ছিল না। ভাবতাম তুই শুধু আমার। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে আমি তোকে হারিয়ে ফেলছি। আমি শুধু তোর মুখ থেকে একবার ভালবাসি কথাটা শুনতে চাই, একবার শুধু তোর বুকে মাথা রেখে কাঁদতে চাই। আর শোন, আজ আমাকে ছেলেপক্ষ দেখতে আসছে। তুই তাড়াতাড়ি চলে আয়।"
দীর্ঘ একটা বার্তা লিখে রায়হানের নাম্বারে পাঠিয়ে দিল আদিবা। ফোন যখন খুলবে তখন নিশ্চয়ই রায়হান দেখতে পাবে বার্তাটা। তখনই হয়তো ছুটে আসবে রায়হান আদিবার জন্য।
৬
সেদিন ইবনাতের হবু স্বামীকে দেখার পর রাগে দুঃখে রায়হান পাগল হয়ে গিয়েছিল। মনে মনে অনেক রেগে ছিল রায়হান। ভার্সিটি থেকে হাঁটতে হাঁটতে চলে আসলো অনেক দূরে। তারপর চুপচাপ বসে রইলো একস্থানে। হঠাৎ ফোন এলো রায়হানের। আরমান ফোন দিয়েছে।
হঠাৎ রায়হান রেগে গিয়ে ফোন হাতে নিয়ে সজোরে আছাড় দিলো। সস্তা চায়না মোবাইল, সাথে সাথে মোবাইল চুরমার। সীম কার্ডটা নিজ হাতে ভেঙ্গে তারপর ক্ষান্ত হলো রায়হান।
যখন রাগ কমে রায়হানের তখন অনেক আফসোস হতে থাকে তার। শুধু শুধু মোবাইলটা ভাঙ্গলো সে। এখন আবার টাকা খরচ করে মোবাইল কিনতে হবে।
একমাস পর এক বন্ধুর কাছ থেকে কিছু টাকা ধার করে একটা নতুন মোবাইল আর সীম কিনে ফোন দিল তার বাবা মায়ের কাছে।
" হ্যালো বাবা, আমি রায়হান।"
" আল্লাহ রায়হান এতদিন তোর ফোন বন্ধ ছিল কেন? তোর কি হয়েছিল বাবা? "
" বাবা আমার কিছু হয়নি। আসলে ফোনটা হারিয়ে গিয়েছিল। তাই ফোন দিতে পারিনি।"
" তোর কোন বন্ধুর নাম্বার থেকে তো দিতে পারতি।"
" আহা বাবা বাদ দাও, তোমরা কেমন আছো বলো।"
" আমরা ভালই আছি, আদিবার তো গেল সপ্তাহে বিয়ে হয়ে গেল।"
" কিহ? আদিবার বিয়ে হয়ে গেছে? কবে হলো এই কান্ড? "
" একসপ্তাহ আগে বিয়ে হলো। ছেলের পরিবার অনেক টাকা পয়সার মালিক। আদিবা সুখেই থাকবে। তোকে তো আদিবার বিয়েতে আসতে বলার জন্য কত ফোন দিলাম। তোর তো ফোনই বন্ধ।"
" ইশ আদিবার বিয়েতে থাকতে পারলাম না। আদিবাকে কথা দিয়েছিলাম যে ওর বিয়েতে ইচ্ছেমত নাচবো।
আরো কিছুক্ষন কথা বলে ফোন রেখে দিল রায়হান। সত্যি আদিবার বিয়েতে নাচতে না পেরে রায়হানের অনেক অাফসোস হচ্ছে।
৭
আদিবা রান্নাঘরে বসে তরকারি কাটছে। আর ভাবছে শুধু একটাই কথা।
বিয়ের আগে রায়হানের সাথে শেষ দেখা হলো না, ওর মুখ ভালবাসি শোনা হলো না। ওর বুকে মাথা রেখে মনভরে কাঁদার সৌভাগ্য হলো না।
.
সমাপ্ত
লেখক : আবির রায়হান অভ্র
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now