বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
গল্পঃThe Dead Lake-দি ডেড লেক।
ভাষান্তরঃ সুপ্রিয়া রায়।
কালেক্টেটঃ Sarwar Ahmad
পর্বঃ০১
Golper jhurite ami dilam
_
গাড়ি থেকে নেমেই আশপাশের অপূর্ব নিসর্গের দিকে তাকিয়ে আপনা থেকেই স্যামে'র মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো - 'ওয়াও!'
এমন প্রাকৃতিক শোভা না থাকলে কি আর্টওয়ার্ক জমে! চারদিকে সবুজ গাছগাছালিতে ঢাকা উঁচু পাহাড়। চোখের সামনে শুধু হাজারো সবুজের মেলা। কানে আসছে চারদিক থেকে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির সুমধুর কলকাকলি। পাহাড়ের নিচে এই অরণ্যই এই অঞ্চলে হ্যারভ ফরেস্ট নামে পরিচিত। তার পিটার আঙ্কলের কেবিন এই বনের মধ্যেই। শহর থেকে এখানে আসার আগে সে শুনেছে যে তার আঙ্কলের কেবিনের কাছাকাছি একটা লেক'ও আছে নাকি। পাহাড়, ঘন অরণ্য, অরণ্যের মাঝে লেক - ফ্যান্টাসটিক! এই-ই তো চাই।
বনের রাস্তায় মোটরগাড়ি আর এগোবে না। ওকে এখানেই নামতে হবে। বনের মধ্য দিয়ে একটু এগোলেই ওর আঙ্কলের কেবিন। এক হাতে গায়ের জ্যাকেট'টা আর অন্য হাতে লাগেজ ব্যাগটা নিয়ে চারপাশের প্রকৃতির দিকে আলগা আলগা নজর বোলাতে বোলাতে পায়ে পায়ে সে এগিয়ে চলল বনের দিকে। এক নজর দেখেই যতটুকু স্যাম বুঝে গিয়েছে, জায়গাটা বাইরের পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। অথচ শহর থেকে কত-ই বা দূরে? গাড়িতে দু'ঘন্টার পথ। কিন্তু জায়গাটা দেখলে মনে হয় যেন শহর -সভ্যতা থেকে কতদূরে চলে এসেছে।
পায়ে পায়ে বনের ভেতর ঢুকল স্যাম। পিটার আঙ্কলের কাছ থেকে সে জেনেছে, বনের পথ'টা নাকি মোটেও ভালো নয়। একটু অসাবধান হলেই সাপের গায়ে পা পড়ে যেতে পারে! কথাটা মনে পড়তেই নিজের অজান্তেই গা-টা একটু শিরশির করে উঠল স্যামের। তবে লেকের ধারে নাকি সাপ তেমন দেখা যায় না বললেই চলে। অদ্ভুত কথা! বনের এদিকটায় সাপের ভয়, আবার অন্যদিকে লেকের কাছ'টায় নাকি সাপের উৎপাত নেই, এ তো বড় বিচিত্র! সাপ সাধারণত জলা জায়গার আশেপাশেই যেখানে আরও বেশী থাকে, অথচ ওদিকটাতেই সাপ নেই, এ কেমন কথা! তবে আঙ্কল বলেছেন, দু-একটা নাকি কখনো সখনো এসে পড়ে। ভারী ইন্টারেস্টিং! বনের সাপগুলো কি লেক আর চারপাশের জায়গাটাকে এড়িয়ে চলে নাকি! ভগবান জানে!
গুল্ম আর লতায় ঢাকা বন্যপথে সতর্ক পা ফেলে ফেলে চলতে লাগল স্যাম। আঙ্কল ভুল কিছু বলে নি দেখা যাচ্ছে! একেবারে গাছ-পাতায় ছাওয়া পথ। পাতার নিচে যদি তেনা'দের কেউ ঘাপটি মেরে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকে আর তার গায়ের ওপর তার পা পড়ে যায়, আর দেখতে হবে না। এক ছোবলে ছবি! হাতে সরু একটা লাঠি-টাঠি থাকলে ভালো হতো। সামনের লতাগুল্মগুলোর ওপর বাড়ি মেরে মেরে দেখেশুনে এগোন যেত। দু-পাশ দিয়ে সার সার উঁচু উঁচু পাইন গাছ। এই বনে পাইন গাছের সংখ্যাই বেশী দেখা যাচ্ছে। একেকটা গাছের মাথা ঘিরে বনের পাখিদের উচ্চৈঃস্বরে কিচিরমিচির শুনতে পাচ্ছে সে। শব্দ অনুসরণ করে গাছের মাথার ওপর তাকাতে দেখতে পেল, ও বাবা! এ যে গাছের ওপর পাখিদের পিকনিক চলছে মনে হচ্ছে! স্যাম অবাক হয়ে দেখল, গাছের মাথায় হাজারো পাখির মেলা। চক্রাকারে ঘুরছে তারা গাছের মাথা ঘিরে। মাঝেমাঝে কোনওটা কোনওটা বসে পড়ছে গাছের ডালে, আবার উড়ে যাচ্ছে। শহরের মেয়ে স্যাম কখনো অরণ্যকে এত কাছ থেকে দেখেনি। আজন্ম শহরে লালিত সে, তাই হঠাৎ একরকম ঝোঁকের বশে এই আদিম অরণ্যের বুকে চলে এসে অরণ্যের রূপ প্রত্যক্ষ করে সে নিজেও খানিকটা বিহ্বল হয়ে পড়েছে। মাঝেমাঝেই ভুলে যাচ্ছে, সাপ নিয়ে পিটার আঙ্কলের দেওয়া সাবধানবাণী।
....আন্দাজ মিনিট তিনেক চলার পর কিছুটা দূরেই একটা দোতলা কেবিন নজরে পড়ল স্যামের। কেবিনটাকে দেখামাত্রই উল্লসিত হয়ে উঠল ও। যাক, এসে গেছে তাহলে। কেবিন'টা আগাগোড়া কাঠের তৈরি। শেষ বেলার সূর্যের আলো কেবিনের কাঠের ছাদের ওপর পড়ে কেমন চকচকে পাথরের মতো দেখাচ্ছিল। আর...আর....ওই যে লেক! বাবাঃ! মনে মনে আঙ্কলের খেয়ালীপনার প্রশংসা না করে পারল না স্যাম। কেবিন বানিয়েছেন একেবারে লেকের ধার ঘেঁষে। জলের অত কাছে যে কেউ ঘর বানায়, তা এই প্রথম দেখল স্যাম। দূর থেকে দেখে মনে হলো যেন কেবিনটা জলের ওপরেই তৈরি হয়েছে। হ্রদের একেবারে তীর ঘেঁষে তৈরি হওয়ায় কেবিনের দোতলার ঝুলবারান্দাটা একেবারে যেন হ্রদের ওপরেই ঝুলে আছে। বারান্দায় দাঁড়ালেই পায়ের নিচে জল! ওঃ ভাবা যায়! কেবিনঘরের ঠিক পেছন দিক দিয়ে ছোট ছোট নুড়িপাথরের পথ বন'টাকে দু'ভাগে চিরে সোজা চলে গিয়েছে পেছনের ওই পর্বতশ্রেণীর দিকে। পিটার আঙ্কল এই কেবিনঘরটা প্রায় এক দশক আগে তৈরি করেছিলেন, যাতে মাঝেমাঝে এখানে এসে উইকেন্ড কাটাতে পারেন। বাবার কাছে স্যাম শুনেছে, আঙ্কল নিজে এই কেবিনঘরের ডিজাইন বানিয়েছিলেন। এই ঘর বানাবার সময় কাঠের কাজগুলো নাকি তিনিই করেছিলেন। নিজে হাতে। সে জানে, পিটার আঙ্কল কাঠের কাজে খুবই দক্ষ কিন্তু তিনি যে এই কাজে এত দক্ষ, এত সুচারু তা স্যামের ধারণায় ছিল না। কেবিনটাকে তিনি এমনভাবে গড়েছেন, কাঠের ওপর এমন বাহারি ডিজাইন দিয়ে কাজ করেছেন যেন মনে হচ্ছে ঘরটা কাঠের তৈরি নয়, পাথরের তৈরি। যেন কেউ গড়েনি, হঠাৎ আপনা থেকেই মাটি থেকে গজিয়ে উঠেছে। অদ্ভুত শিল্পনৈপুণ্য আঙ্কলের! মনে মনে তাঁর হাতের কাজের তারিফ না করে পারল না স্যাম। জ্যাকেট'টা কাঁধের ওপর ফেলে আর লাগেজ ব্যাগটা ডান হাত থেকে বাম হাতে নিয়ে সে এগিয়ে যেতে লাগল কেবিনঘরের ফ্রন্ট ডোরের দিকে। পকেটে চাবি ছিলই, আসবার সময় আঙ্কলই দিয়ে দিয়েছিল তাকে, সেটা দিয়ে ফ্রন্ট ডোরের লক'টা খুলতেই ভারী কাঠের দরজা একটা গুরুগম্ভীর শব্দ করে ভেতর দিকে খানিকটা খুলে গেল। দরজা খুলতেই ভেতরে একটা বড় ঘর চোখে পড়ল স্যামে'র। ডান দিকে একটা বড় ফায়ারপ্লেস আর তার কাছেই স্তুপাকার হয়ে পড়ে আছে একরাশ জ্বালানি কাঠ। আবার সেই জ্বালানি কাঠের স্তুপের পাশে পড়ে ছুঁচালো-মুখ বড়সড় একটা কুড়ুল। ফায়ারপ্লেসের কাছে পশুলোমের গদিওয়ালা দুটো বড়সড় আর্মচেয়ার। তাদের অভিমুখ ফায়ারপ্লেসের দিকে ফেরানো। ফায়ারপ্লেসের বিপরীত দিকে অর্থাৎ ফ্রন্ট ডোরের বাম দিকে পালিশ করা কাঠের ডাইনিং টেবিল-চেয়ার। ওদিকে একটা ছোট ঘরের মতো দেখা যাচ্ছে, বোধ হয় কিচেন-টিচেন হবে। কিচেনের পাশ দিয়েই একটা সিঁড়ি উঠে গিয়েছে দোতলার দিকে।
দরজার পাশেই হাত থেকে লাগেজ ব্যাগটা 'ধপ' করে নামিয়ে রাখল স্যাম। তার বেশ অবাক লাগছে। আঙ্কল এখন থাকেন না এই কেবিনে, তাহলে ঘরগুলো এত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রয়েছে কি করে! যেন মনে হচ্ছে কেউ নিয়মিত ঘরদোর সাফসুতরো করে রাখে! এমনটা কি করে সম্ভব? আঙ্কল এখানে হলিডে কাটাতে আসেন মাসে একবার, তাঁর অনুপস্থিতিতে কেবিনের ভেতরটা এত ঝকঝকে তকতকে! অথচ মেইন্টেনান্সের জন্য তিনি এখানে কাউকে নিযুক্ত করে রেখে গিয়েছেন, তা-ও শোনা যায়নি। তবে লোকজন না থেকেও কি করে এমন পরিষ্কার থাকতে পারে এই কেবিনঘর'টা? ভাবতে ভাবতে স্যাম জ্যাকেটের পকেট থেকে আঙ্কলের দেওয়া চিঠিটা বের করে আরও একবার পড়তে লাগল প্রথম থেকে। তাকে হ্যারব লেকের ধারে কেবিনঘরে ছুটি কাটাতে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে আঙ্কল লিখেছেন - ওখানকার জঙ্গলে ভালুক আছে, তাই বেশী গভীর বনে যেও না। তবে যে বিশাল লেক'টা দেখতে পাবে,সাঁতার প্রাকটিস করার জন্য দারুণ হবে তোমার পক্ষে। ঘাটের ধারে সবসময় একটা ডিঙি নৌকো বাঁধা অবস্থায় আছে দেখতে পাবে। রাতে ওখানে খুব ঠাণ্ডা পড়ে, তাই রাত নামলে সবসময় ঘরের ফায়ারপ্লেসে আগুন জ্বালিয়ে রাখবে। জায়গাটায় একটাই অসুবিধে, ওখানে কোনো ইলেক্ট্রিসিটি নেই, ফোন লাইন'ও নেই। অতএব ওখানে গিয়ে বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে তোমার যোগাযোগ একপ্রকার বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। তবে কিচেনের কাপবোর্ডের ভেতর একটা টু-ওয়ে রেডিও আছে। চিঠিতে আমি কিছু ইম্পরট্যান্ট codes লিখে দিচ্ছি, সেগুলো মেনে চলবে। কখনো লেকের ঘাটের দিকে যেও না। স্যাম লক্ষ্য করল, 'কখনো লেকের ঘাটে যেও না' কথাটার নিচে দু'বার আন্ডারলাইন করে দিয়েছেন পিটার আঙ্কল। ঘাটের সিঁড়িগুলোর কাঠ পচে গিয়েছে, আমি নেক্সট টাইম গিয়ে সিঁড়িগুলোয় নতুন কাঠ বসাবার ব্যবস্থা করব। ওখানে পৌঁছেই কিচেনের কাপবোর্ডের ভেতর কিছু 'ড্রাই ফুডস' দেখতে পাবে, সেগুলো খেয়ে নিও। আদর নিও - তোমার পিটার আঙ্কল।
চিঠিটা পড়ে নিজের মনেই হাসল স্যাম। তারপর চিঠিটা ভাঁজ করে জ্যাকেটের বুক পকেটে রেখে দিল। সূর্য ইতিমধ্যে দূরে পর্বতশ্রেণীর পেছনে নেমে যাচ্ছে ক্রমশ। হ্রদের জলে অস্তগামী সূর্যের সিঁদুরে লাল ছটা পড়ে মনে হচ্ছে যেন কেউ আবির গুলে দিয়েছে জলে। এই রে! এতক্ষণে খেয়াল হলো স্যামে'র। গাড়ি থেকে তো এখনও বাকি জিনিসগুলো আনাই হয় নি। এদিকে বনের ভেতর অন্ধকার নামতে আর বেশী দেরী নেই। তাড়াতাড়ি কেবিনঘর থেকে বেরিয়ে এলো স্যাম। বনের গাছগুলোর তলায় ইতিমধ্যে অন্ধকার গাঢ় হতে শুরু করেছে। এটা শহর নয়, চারপাশে আকাশছোঁয়া ঝুপসি গাছগুলোর জন্য এখানে অন্ধকার একটু তাড়াতাড়িই নেমে আসে। দ্রুত পা চালাতে লাগল বনের বাইরের দিকে, যেখানে তার গাড়িটা পার্ক করে রেখে এসেছে সে। সাবধানে পা চালিয়ে এসে পৌঁছল বনের বাইরে, গাড়িটার কাছে। গাড়ির ডিকি থেকে একে একে নামাতে লাগল একটা ঈজেল ( যে ফ্রেমের ওপর সাদা কাগজ রেখে চিত্রকর'রা ছবি আঁকে; ছবি আঁকার জন্য তেপায়া কাঠের ফ্রেম), জলরঙ আর তেলরঙের বাক্স, কাঠকয়লা, তুলি, রঙ পেন্সিল, স্কেচবুক সহ মাঝারি সাইজের একটা বাক্স আর এক ডজন ক্যানভাস। জামাকাপড় আর নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস ভর্তি লাগেজ ব্যাগটা আগেই কেবিনে নিয়ে এসে রেখেছে স্যাম। এখন গাড়ি থেকে বাকি জিনিসগুলো নামিয়ে সেগুলো কারোর সাহায্য ছাড়াই একা একা কাঁধে ফেলে, দু-হাতে বয়ে নিয়ে আসতে লাগল স্যাম। ফলে তাকে অনেকটা ঝুঁকে পড়তে হলো সামনের দিকে। কেবিনের ঘরে নিয়ে সেগুলোকে মেঝের ওপর রেখে এই প্রথম হাঁফ ছাড়ল সে। ততক্ষণে বাইরে অন্ধকার আরও একটু গাঢ় হয়েছে কিন্তু আকাশের গা থেকে শেষ বিকেলের ফিকে আলো তখনো পুরোপুরি বিদায় নেয়নি। একটু দম নিয়ে 'ঈজেল'টাকে ঘরের এক কোণে নিয়ে গিয়ে রাখল। অত:পর বাক্সগুলোকে রাখতে লাগল ঘরের মাঝখানের বড় টেবিলটার ওপর। ঈজেল'টাকে ঘরের এমন পজিশনে রাখল যেন জানলা দিয়ে প্রকৃতির আলো এসে পড়ে তার গায়ে। বড় একটা সাদা ক্যানভাস সেঁটে দিল ফ্রেমের ওপর। আজকের সন্ধেটা তার গোছগাছ করেই কাটবে। আগামীকাল থেকে শুরু হবে তার পেইন্টিং'এর কাজ। সন্ধের কিছু পরেই ঘরটাকে নিজের আর্টওয়ার্কের জিনিসগুলো দিয়ে পুরো গুছিয়ে ফেলল স্যাম। এতক্ষণে সে এবার স্বস্তি পেল। এত দিনে সে একটা উপযুক্ত জায়গায় এলো। নির্জন, নিরালা। জনমানবহীন প্রকৃতির বুকে নিশ্চিন্তে বসে সে এখন থেকে কলালক্ষ্মীর আরাধনা করতে পারবে। কেউ ডিস্টার্ব করার নেই, কারোর ফোন আসার নেই, কোনো শহুরে হট্টগোল বা চেঁচামেচি নেই। এখানে শুধুই আছে নির্জনতা আর অদ্ভুত প্রশান্তি। আর্টিস্টদের স্বপ্নরাজ্য। এই জায়গায় থেকেও যদি তার পেইন্টিং'এর কাজ শেষ না হয়, তাহলে ধরে নিতে হবে, আর কোনোদিনই তা শেষ হবার নয়।
বাইরে আকাশের গা-টা দেখে মনে হচ্ছে যেন কেউ তার গায়ে সিঁদুরে লাল আর নীল রঙ দিয়ে জলছবি এঁকে দিয়েছে। বাসাফেরত পাখিদের ডাক এখন খুব অস্পষ্টই কানে আসছে। বেশীরভাগ পাখি অনেক আগেই বাসায় ফিরে গেছে। ঘরের ভেতর ফায়ারপ্লেসে আগুন জ্বালিয়েছে স্যাম। ঘরে যে যথেষ্ট জ্বালানি কাঠ মজুত ছিল, তাই দিয়েই অপটু হাতে ফায়ারপ্লেসে আগুন দিয়েছে সে। ঘরটায় ধীরেধীরে উষ্ণতা ফিরছে। বেশ আরাম লাগছে ওর। আঙ্কল ঠিকই বলেছিল চিঠিতে, সূর্যাস্তের পর এখানে বেশ ঠাণ্ডা পড়ে। আগুনে আরও গোটাকতক কাঠ ফেলে স্যাম আর্মচেয়ারে বসতে যাবে হঠাৎ ওর খেয়াল হলো, আরে! দোতলাটা যে এখনো ওর দেখাই হয় নি। এখানে আসা ইস্তক শুধু একতলাটাই ঘুরে ঘুরে দেখেছে ; কিন্তু দোতলায় কি আছে এখনো যে দেখা বাকি রয়ে গিয়েছে!
দোতলায় ওঠার সিঁড়িগুলো কাঠের ফ্লোরবোর্ডের আর বেশ সরু। কোনওরকমে একজন উঠতে বা নামতে পারে। জুতোয় 'ঢপ ঢপ' শব্দ তুলে স্যাম উঠে এলো দোতলায়। দোতলায় এসে সিঁড়িটার শেষমাথায় এসে সে দেখতে পেল, একটা সরু প্যাসেজ সিঁড়ির মাথা থেকে ডানদিকে টার্ন নিয়ে শেষ হয়েছে গিয়ে একটা ঘরের কাছে। সম্ভবত ওই ঘরটাই বেডরুম। তার বিপরীত দিকে, প্যাসেজের গায়েই আরেকটা ঘর। তার দরজাটা খোলা। স্যাম বাইরে থেকেই দেখতে পেল, ঘরটা বাথরুম। সিঙ্ক, কাপবোর্ড, আয়না, টয়লেট, বাথটাব সবই দেখতে পেল ভেতরে। একেবারে আধুনিক স্নানঘর। কিন্তু হতাশ হলো কোনো শাওয়ার নেই দেখে। সিঙ্ক আর বাথটাবের প্লাগ দেখতে পেল কিন্তু আশ্চর্য হলো কোনো ট্যাপ নেই দেখে। অনেক ভালো করে দেখে, খোঁজাখুঁজি করার পর স্যাম দেখতে পেল, দেওয়ালের ভেতর থেকে একটা পাইপ বেরিয়ে এসেছে, যার নিচে রয়েছে একটা নল আর একটা বালতি। পাইপ সেখানে বালতির কাছে এসে শেষ হয়েছে, সেখানে পাইপের গায়ে একটা হ্যান্ড পাম্প রয়েছে দেখা গেল। স্যাম আন্দাজ করল, পাইপটা সম্ভবত কেবিনের পেছনে কোনো রেইন ওয়াটার ট্যাঙ্কের সাথে সংযুক্ত আছে। অনেকটা পথ গাড়িতে আসায় এখন স্যামের দেহ-মন দুই-ই ক্লান্ত। তার খুব ইচ্ছে এখন স্নান করে। কিন্তু রেইন ওয়াটার ট্যাঙ্কের জল এখন বরফশীতল, এত ঠাণ্ডা জলে স্নান করবে কি করে! তাকে অগত্যা জল হিটারে গরম করে নিতে হবে। উষ্ণ জলে স্নান সারতে হবে তাকে। পিটার আঙ্কল ভারী অদ্ভুত লোক। খেয়ালী প্রকৃতির। মাছ ধরা, শিকার করা আর কাঠের কাজ করা - এই নিয়েই মেতে আছেন সারা জীবন। আর মনে হয় ঠাণ্ডা জলে স্নান করতেই তিনি বেশী ভালোবাসেন।
ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো স্যাম। এসে ঢুকল বেডরুমে। পুরো ঘর জুড়ে পাতা ডবল বেড খাট। মজবুত কাঠের, ওপরে পরিপাটি করে পাতা পশুলোমের চাদর। এই বিছানাতে ওর আজ প্রথম রাত্রিবাস।স্যাম এক মূহুর্ত ইতস্তত করল। মরা পশুর লোম দিয়ে তৈরি চাদরের ওপর সে শুতে চায় না। চাদরটা তাই আস্তে আস্তে গুটিয়ে নিয়ে ঘরের ওয়ার্ডোবের ভেতর রেখে দিল সে। ওপাশে ব্যালকনির দরজা। দরজাটা বন্ধ। স্যাম এগিয়ে গেল ওদিকে। দরজাটা খুলতেই ঠাণ্ডা বরফকুচি মেশানো হাওয়া ঝাপটা মারল ওর চোখেমুখে। সূর্য দূরে পাহাড়গুলোর পেছনে পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে, আকাশে এখনও চলছে ফিকে নীল রঙের খেলা। তবে পশ্চিমের পাহাড়গুলোর মাথার ওপর তখনো রাঙা রঙের আভা লেগে রয়েছে। ব্যালকনি থেকে এবার নিচে লেকের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল স্যাম। লেকের জলটাকে এখন মনে হচ্ছে কাঁচের মতো। যেমন মনে হয়েছিল প্রথম দর্শনে দেখেই, ব্যালকনিটা এমনভাবে ঝুলে রয়েছে হ্রদের ওপর যে তার পায়ের নিচেই জল। হ্রদটা বেশ লম্বা। কতদূর পর্যন্ত যে এঁকেবেঁকে এগিয়ে গিয়েছে, তার ঠিক নেই। সম্ভবত দূরের ওই পাহাড়ের পাদদেশের কাছে গিয়ে শেষ হয়েছে। ওপরে আকাশের গায়ে লেগে থাকা সাদা তুলোর মতো মেঘগুলোর অস্ফুট প্রতিবিম্ব খেলা করছে জলের ওপর। কেবিনঘরের বেশ কাছেই জলে নামার জন্য ধাপে ধাপে সিঁড়ি নেমে গিয়েছে জলের দিকে। হ্রদের দিকে কুড়ি মিটার পর্যন্ত নেমে গিয়েছে পাথরগুলোর সিঁড়ি। সেই সিঁড়ির একেবারে শেষ ধাপে হঠাৎ মনে হলো কেউ বা কিছু যেন বসে রয়েছে। বস্তুটা গোচরে আসতেই স্যাম ব্যালকনির রেলিঙ-এর ওপর আরও ঝুঁকে পড়ল, জিনিসটা কি দেখার জন্য। কিন্তু সন্ধের অন্ধকার তখন আরও জমাট বেঁধেছে তাই স্যাম কিছুতেই বুঝতে পারছে না, জলের একেবারে ধারে ওটা কি! মানুষ না অন্যকিছু! সে বারবার অসহায়ভাবে উঁকিঝুঁকি দিতে লাগল সেদিকে। কিন্তু তবু জিনিসটাকে ঠিকঠাক ঠাহর করে উঠতে পারল না সে। বেশ কিছুটা সময় তার উঁকিঝুঁকি মেরে জিনিসটাকে ভালো করে দেখতেই কেটে গেল। আবার ওর এমনও ইচ্ছে করল না যে 'কে ওখানে' বলে জোরে একটা হাঁক দেয়। আসলে মন থেকে সেই মূহুর্তে ঠিক সাহস পেলো না।
সন্ধে পুরোপুরি না নেমে আসা পর্যন্ত সেই 'মানুষ না কি যেন বস্তুটা' ঠায় একভাবে সেখানেই স্থির হয়ে রইল। হ্রদের জলের একেবারে ধার ঘেঁষে।
সন্ধের অন্ধকার একটু গাঢ় হতেই হঠাৎ এবার সেই বস্তু'টা নড়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে স্যামের হৃদপিন্ডটা যেন ভীষণ চমকে উঠে একটা পাক খেয়ে গেল। অন্ধকারেও এবার বস্তুটা কি বুঝতে পারল সে। বস্তুটা আর কিছুই নয়, একটা মানুষ। পাথরের সিঁড়ির ওপর একেবারে জলের ধারে উবু হয়ে এতক্ষণ বসে ছিল লোকটা। স্থিরভাবে বসে ছিল জলের দিকে চেয়ে।
এবার সে উঠে দাঁড়িয়েছে!
(চলবে)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now