বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
দুপুরে আমি সেলুনে ঢুকে মাথা কামিয়ে ন্যাড়া হয়ে বাসায় আসলাম।
সেলুনের ছেলেটা অতি পরিচিত। নাম রতন। সবসময় এখান থেকেই চুল কাটাই। সে কোনমতেই মাথা ন্যাড়া করতে রাজি না।
-- ভাই কাইলকা ঈদ আর আইজকা আপনে মাথা বেল কইরা ফালাইবেন?
-- হ্যাঁ।
-- ভাই এতো সুন্দর চুলগুলান ফালাইয়েন না। কেমন দেখাইবো আপনেরে?
-- তোর এতো কথার কি দরকার? ন্যাড়া করতে বলছি, কর।
-- না ভাই, আরেকবার ভাইবা দেখেন। এতো সুন্দর চুল আপনের। ঈদের দিনে কেমন দেহাইবো বেইল্যা মাথায়?
-- ধুত্তুরি! করবি নাকি করবি না?
রতন বিরস মুখে ক্ষুর চালাতে লাগলো। মুখ দেখে মনে হচ্ছে আমার না, তার নিজের মাথার চুল ফালাচ্ছে।
সেলুন থেকে বের হতেই ঠান্ডা বাতাস লাগলো মাথায়। আহ! কি শান্তি! মানুষ কি জন্য শুধু শুধু চুল রাখে? ন্যাড়া মাথায় এতো শান্তি জানলে তো সবসময় ন্যাড়া হয়েই থাকতাম। মাথায় একগাদা ঝাঁকড়া চুলের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি। চুল না থাকলে কি হয়? দেখতে খারাপ লাগে? তা লাগুক খারাপ। আমার যেই চেহারা, সেটার আবার ভালো-খারাপ কি? চুল থাকা অবস্থায় যে কোন ললনার মনে জায়গা নিতে পেরেছি এমন তো না। তারচেয়ে ন্যাড়া মাথাই ভালো। শ্যাম্পুর টাকা বেঁচে যাবে।
বাসায় ঢোকার পর আম্মা তুলকালাম শুরু করলেন। প্রথমে কিছুক্ষণ মুখ হা করে রইলেন, তারপর মেশিনগানের গুলির মতো বকা শুরু করলেন,
-- এতো বড় দামড়া পোলা, আক্কেল নাই তোর? কালকে ঈদ আর আজকে মাথা কামাইয়া আসছোস? কেমন লাগে নিজেরে আয়নায় গিয়া দেখছোস একবার?
আরে আজব! চুল কি মানুষ কামায় না? এইটার জন্য এতো বকাবকির কি আছে? ঈদে মাথায় চুল থাকতেই হবে, নইলে ঈদ পালন করা যাবে না এমন কোন নিয়ম আছে নাকি? পৃথিবীতে এতো টাক মাথার মানুষ, তারা কি ঈদ পালন করে না? আমি মিনমিন করে বললাম,
-- যেই গরম পড়ছে! চুল ফেলে দিয়ে এখন আরাম লাগছে। মনে হচ্ছে মাথায় এসি বসিয়েছি।
-- এতো দিন ধরে বলতেছি চুল কাটতে, কাটোস নাই। আজকে টাক হওয়ার বুদ্ধি দিলো কে? দেখতেই খালি দামড়া হইছোস, বুদ্ধিশুদ্ধি কিছু হয় নাই মাথায়?
-- টাক হওয়া কি খারাপ নাকি? কেন কোরবানি ঈদের সময় হাজীরা মাথা কামায় না? তাদের ঈদ কি হয় না নাকি?
একেবারে মোক্ষম জায়গায় আঘাত করেছি। আম্মা এবার আর কথা না পেয়ে অনেকটা চুপ হয়ে গেলেন।
কিন্তু যন্ত্রণা কমলো না। ছোটবোন তিশা "টাক্কু টাক্কু" করে কান ঝালাপালা করে ফেললো। বিকালে আড্ডা দিতে গিয়ে বন্ধুদের কাছে আরেক কাহিনী।
টিটকারি, হাসি-তামাশা শেষে আমার বেল মাথা নিয়ে কবিতাও বানিয়ে ফেলা হয়েছে। আমি কোন মতে কান-টান বন্ধ করে আড্ডা থেকে ভাগলাম। একবার যখন ছড়া বানানো শুরু হয়েছে, সহজে থামবে না। নতুন নতুন কবিতা বানাতে থাকবে। এরচেয়ে ভেগে যাওয়াই ভালো।
আড্ডা থেকে এসে ইফতার করতে বসলাম। আব্বা টাক মাথা দেখে ভ্রু কুঁচকালেন শুধু, কিছু বললেন না। আম্মা বললেন,
-- টাক মাথা নিয়ে ঘুরতেছোস কেন? একটা ক্যাপ মাথায় দিতে পারোস না? এই রোজার মাসে মাথায় টুপি দিলেও তো হয়।
-- ক্যাপ পড়লে আর লাভ হলো কি? সেই গরমই তো লাগবে। টাক মাথায় বাতাস লাগলে কি যে আরাম লাগে সেটা যদি তুমি বুঝতা তাহলে তুমিও টাক হয়ে যেতা।
আম্মা একটা কড়া দৃষ্টি দিলো। আমি বিপদ বুঝে তাড়াতাড়ি চুপ হয়ে গেলাম।
ইফতার শেষে নামাজ পড়ে রাস্তায় বের হলাম। দুই-একটা বাসা থেকে বিটিভিতে "ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ" গানটা ভেসে আসছে। চাঁদ উঠেছে তাহলে। কালকে ঈদ। রাস্তায় উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটতে হাঁটতে সাদা একটা পাঁচতালা বিল্ডিংয়ের সামনে এসে দাঁড়ালাম। কিছুক্ষণ ঘুরঘুর করার পর হঠাৎ উপর থেকে ডাক আসলো,
-- এই সুমন ভাই!
আমি মুখ তুলে তাকালাম। দোতলা থেকে নীলা ডাকছে।
-- উপরে আসেন।
আমি উপরে এসে দরজা নক করলাম। নীলা নিজেই এসে দরজা খুলে দিলো। এক হাতে মেহেদী দেওয়া, আরেক হাতে মেহেদীর টিউব।
-- কি ব্যাপার? আপনার এই অবস্থা কেন? বেল্লু মাথা!
-- আরে সেলুনে গিয়ে বললাম শেভ করে দে। সেলুনের পোলাটা বলদ টাইপের, বুঝতে পারে নাই। দাড়ি শেভ না করে মাথা শেভ করে দিয়েছে।
-- হইছে, আপনার চাপাবাজি থামান। সত্যি করে বলেন।
-- এবার বিশ্বকাপে ফ্রান্স সাপোর্ট করছি তাই এমবাপ্পের মতো মাথা বেল করে ফেলেছি।
-- আপনাকে তো এমবাপ্পের মতো লাগছে না, আপনাকে লাগছে এন'গোলো কান্তের মতো।
বলেই নীলা হাসতে লাগলো। বহু কষ্টে হাসি থামিয়ে চিৎকার দিয়ে বললো,
-- আম্মু দেখো সুমন ভাই টাক্কু হয়ে গেছে।
নীলার ছোটবোন শীলা দৌড়ে এলো।
-- আল্লাহ্। সত্যি সত্যি টাক্কু হয়ে গেছে? আম্মু দেখো।
ডাকাডাকি শুনে নীলার আম্মু চলে এলেন। সম্ভবত রান্নাঘরে কাজ করছিলেন।
-- আসসালামু আলাইকুম আন্টি।
-- ওয়ালাইকুম আসসালাম। তুমি দেখি সত্যি সত্যি টাক হয়ে গেছো।
-- এমনি আন্টি। গরম লাগে তাই ভাবলাম চুল ফেলে দেই।
-- আম্মু জানো, আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি হঠাৎ দেখি রাস্তায় কি জানি আলো। প্রথমে বুঝতে পারি নাই, পরে ভালো করে তাকিয়ে দেখি লাইটের আলোয় সুমন ভাইয়ের মাথা আয়নার মতো চকচক করতেছে।
দুই বোন হাসতে হাসতে বিষম খেলো।
-- হ্যাঁ, মাথা দেখে দেখে দিব্যি চুল আঁচড়ানো যাবে। আয়না লাগবে না। এই সুমন ভাই, আপনি কি মাথায় তেল দিয়ে আসছেন? এমন চকচক করতেছে কেনো? শীলা বললো।
দুই বোন আবার দুলে দুলে হাসতে লাগলো। আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো কিন্তু কিছু বললাম না। এরা অর্বাচীন মূর্খ নারী, টাক মাথার উপকারিতা এরা কি বুঝবে? আয়নার মতো লাগলে লাগুক, সমস্যা কি? চুল আঁচড়াবি, দরকার হলে মেকআপটাও করে নিবি।
আন্টিও মেয়েদের সাথে তাল মিলিয়ে হাসতে হাসতে বললো,
-- বসো, পায়েস রান্না করতেছি। খেয়ে যেও। আধাঘণ্টা লাগবে।
-- না আন্টি, আরেকদিন। বাসায় কাজ আছে। রুম গুছাতে হবে।
-- আরে বসো!
নীলারা আমাদের পাশের ফ্ল্যাটে থাকতো। বেশ ভালো সম্পর্ক ছিল আমাদের পরিবারের সাথে। মনে হতো দুই পরিবার মিলে একটাই পরিবার। এক বাসায় ভালো কোন খাবার রান্না হলে অন্য বাসায় পাঠানো হতো। চার মাস আগে ওরা বাসা চেঞ্জ করে এদিকে চলে আসছে। তারপর থেকে যোগাযোগ কম।
-- সুমন ভাই, আপনাকে কেমন দেখাচ্ছে জানেন? একেবারে কদবেলের মতো। ইচ্ছে করতেছে মাথাটা কদবেলের মতো বাড়ি দিয়ে ফাটাই।
দুই বোন পাল্লা দিয়ে হাসতে লাগলো। আমি মনে মনে বললাম তোদের মতো বদবেল হওয়ার চেয়ে কদবেল হওয়া ভালো।
নীলার আম্মুর পায়েস খেয়ে বিদায় নিলাম। নীলা গেইট খুলে দিতে এসে হঠাৎ বললো,
-- আপনি এমন বলদ কেনো?
-- কেনো? কি করলাম?
-- এতোক্ষণ ধরে বসে আছেন অথচ 'ঈদ মোবারক' বললেন না।
-- ওহ, মনেই ছিল না। ঈদ মোবারক।
-- চুল ফেলে দিয়েছেন কেনো?
-- বললাম তো গরম লাগে তাই।
-- আমি সেদিন "বিশ্রি চুল" বলেছিলাম বলে?
কথা সত্য। নীলাকে গত পরশুদিন রাস্তায় দেখা হওয়ার পর কি একটা বিষয় নিয়ে রাগাচ্ছিলাম। নীলা আমাকে আক্রমণের সুযোগ না পেয়ে শেষে বিচ্ছিরি হাসি দিয়ে বলেছিলো, "আপনার মাথার চুলগুলো এমন কোঁকড়ানো কেন? দেখলে মনে হয় ম্যাগী নুডলস। কি বিশ্রি চুল। ইয়াক!"
কারো চুল দেখতে খারাপ হতেই পারে। তাই বলে এভাবে বলতে হবে? মন-মেজাজ খারাপ করে আমি তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম চুল কামিয়ে ফেলবো। মাথার উপরে বিশ্রী চুল থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো। কিন্তু এখন তো সেটা স্বীকার করা যাবে না।
-- কে কি বলেছে সেই কথা শুনে আমি আমার চুল ফেলে দিবো নাকি? আমি মুখ বাঁকিয়ে বললাম।
-- ও এই কথা? এজন্য আয়নার মতো চকচকে টাক নিয়ে আমার বাসার নীচে ঘুরতেছেন?
-- আমি ঘুরছি কে বললো? বাসার নীচ দিয়ে যাচ্ছিলাম।
-- তাই, না? তিনবার যে ঘুরে এলেন আমি দেখি নাই?
-- তুমি দেখার জন্য দাঁড়িয়ে ছিলে?
নীলা অপ্রস্তুত হয়ে প্রসঙ্গ পাল্টালো।
-- আপনার রুচি এমন জঘন্য কেন? আপনাকে যে টাক মাথায় কি বিশ্রি লাগতেছে সেটা আপনি জানেন না? আয়নায় দেখেন নাই?
-- আমাকে চুল থাকলেও বিশ্রী লাগে, না থাকলেও বিশ্রী লাগে। এটা নতুন কিছু না।
-- মাথা ফাটাই দিবো একদম! আপনি জানেন ঘোড়ার ডিম। এই নিন, এই টুপিটা রাখেন। আব্বুর জন্য কিনেছিলাম, এখন দেখি আপনার বেশী দরকার।
-- টুপি লাগবে না আমার। বাসায় টুপি আছে।
-- নিবেন নাকি নিবেন না?
আমি টুপিটা নিলাম। বেশ সুন্দর, দামী টুপি। হালকা নীল কাপড়ের উপর সাদা সুতার কাজ। উপরের দিকে বেশ কয়েকটা ফুটা, মনে হয় বাতাস চলাচলের জন্য।
-- আর কোনদিন টাক মাথা নিয়ে আমাদের বাসায় আসবেন না।
-- আমি যাই নি। তুমি ডেকে নিয়েছো।
-- এই কথা বলার জন্য ডেকেছি। আর কখনো মাথা কামাবেন না। নইলে সত্যি সত্যি কদবেলের মতো মাথা ফাটাই দিবো।
-- কেনো?
-- ন্যাড়া মাথা আমি দুই চোখে দেখতে পারি না, বিশ্রি লাগে।
-- আমাকে বিশ্রী লাগলে তোমার কি?
-- উফ! আমি বলেছি মাথা ন্যাড়া করবেন না, করবেন না ব্যাস। এতো কথা কিসের?
.
বলেই হন হন করে হেটে নীলা চলে গেলো। আমি রাস্তায় নেমে মাথা থেকে টুপিটা খুলে ফেললাম। কি মুশকিলে পড়া গেলো! আমার মাথা আমি ন্যাড়া করতে পারবো না এটা কেমন আবদার! এখন সারাজীবন মাথায় একগাদা কোঁকড়া চুল নিয়ে ঘুরতে হবে। কোন মানে হয়?
.
#ঈদ_মোবারক
লেখা:-অলিভার কুইন(শুভ)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now