বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
রোদ বৃষ্টি সকাল রাতে
--------------------------------
জামাল খান মোড় থেকে চেরাগীর মোড়ে
যাওয়ার পথে হাতের ডানে চট্টগামের প্রেসক্লাব
পড়ে। সেখানে চোখ বুলালে ‘বাতিঘর’ বইয়ের
দোকানটি খুব সহজে দৃষ্টি কাড়ে। দোকানটি
‘সকাল’ ও ‘রাত্রি’ দুজনেরই পছন্দ। বই দেখতে
দেখতে, বই পড়তে পড়তে কিংবা বই কিনতে
বাছাইয়ের সময় তাদের আলাপ এখানেই বেশ
জমে। আজকেও দুজনের এখানে আসার কথা।
টিউশন শেষ করে প্রায় দৌড়ে দৌড়ে ‘সকাল’ যখন
দোকানের ভেতর ঢুকল তখন আধা ঘণ্টা লেট।
এই নিয়ে পাঁচ দিন তার এই সময়ানুবর্তিতার
প্রতিসারণ!!! সময় যেন তার কথা শুনে না।
সময়কেও আটকাতে পারে না।
দোকানটা অনেকটা আর্ট গ্যালারির মতো। ঘুরে
ঘুরে দেখার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা। এক প্রান্ত
থেকে আরেক প্রান্ত এক-পলকেই দেখে
ফেলা সম্ভব না। ঢোকার সাথে সাথে তাই
‘রাত্রি’কে পাওয়া গেল না। কবিতার বইগুলো
যেখানে রাখা সেখানে গিয়েই সকাল পেল রাত্রির
দেখা। পড়ন্ত বিকেলে কারও মেজাজ তেমন
একটা খারাপ হয় না। রাত্রি যখন ঠাস করে সকালের
গালে পাঁচ আঙ্গুলের থাপ্পড় বসিয়ে দিয়ে হনহন
করে দোকান থেকে বের হয়ে গেল, তখন
বুঝতে বাকি নেই পড়ন্ত বিকেলেও কারও কারও
মেজাজ মহিষাসুর মর্দিনী দূর্গার মতো হয়।
কিংকর্তব্যবিমূঢ মহিষাসুর তখন দোকানের মধ্যমণি।
বুদ্ধি থাকলেই উপায় হয়! একগাল কৃত্রিম হাসি
মেখে ‘মধ্যমণি’ তখন কবিতার একটি বই নিয়ে তড়িৎ
গতিতে কাউণ্টারে হাজির। কাউণ্টারে বইটা রেখেই
জোর গলায় বলল, কী বই রাখেন??? পছন্দ
করে না!!! দেন, এইটাই প্যাক করে দেন।
কাউণ্টারের লোক থতমত খেয়ে কিছু বলতে
যাবে, সে আবার বলে উঠল, আরে, কিচ্ছু
বলতে হবে না, নেন, এইটাই প্যাক করেন। বই
নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে বের হয়ে আসে
দোকানের মধ্যমণি। মধ্যমণি তখন আরেক
মধ্যমণিকে খুঁজছে, কিন্তু সে ততক্ষণে উধাও।
ফোনের পর ফোন করে যাচ্ছে সকাল, রাত্রির
কোনো রিপ্লাই নেই। রাত আট’টার দিকে ফোন
রিসিভ হলো।
তুই এতবার ফোন দিচ্ছিস কেন??? কী সমস্যা
তোর???
রাত্রি, প্লিজ আমার দেরি হওয়ার কারণটা শোন...
টিট...টিট...টিট.........(লাইন কেটে গেছে)
আবারও ফোনের পর ফোন। রাত সাড়ে আট’টায়
সাড়া মিলল।
রাত্রি, কাটিস না প্লিজ। আমার স্টুডেণ্টগুলোর
সামনে পরীক্ষা, তার মধ্যে একটার মাথা এত
মোটা, তাকে বোঝাতে গিয়েই আমার এই দশা,
রাত্রি, রাত্রি......
টিট.........টিট.........টিট...
সকাল এবার দেরি না করে লেডিস হলের দিকে
রওনা দিল। সঙ্গে কবিতার বই। দারোয়ানকে দিয়ে
বইটি পাঠাল রাত্রির কাছে। কিছুক্ষণ পর রাত্রির
ফোন।
এই??? তুই এত দূর, এত রাতে কেন এলি???
দেশের অবস্থা জানিস না?? কখন কী হয়!!!
তাড়াতাড়ি হলে যা। কাল কলেজে দেখা হবে।
সকালের কাছে রাত্রির এই খবরদারিটাই ভালো
লাগে, ঠিক যেন তার মায়ের মতো। মা’র কাছ
থেকে দূরে থেকেও এই অভাবটা যেন দূর
করে দিয়েছে এই রাত্রিই।
রাত্রি, শোন, তোকে একটা কথা বলব। আজকে
নয় কালকে। তুই আমাকে আবার রিজেক্ট করে
দিবি নাতো? তোর সাথে আমি বন্ধুর চেয়েও
বেশি কিছু হয়ে থাকতে চাই। থাকতে দিবি? তাহলে
বলব।
তুই কী বলবি, সেটাতো জানিই। সাহস করে বলে
ফেলিস।
তুই জানিস!!!
হুমম......
তারপর দুজনার প্রাণখোলা হাসি।
মুখে সেই হাসি লাগিয়ে সকাল হাঁটতে শুরু করল। পাশ
দিয়ে সিটি-বাস, অটোরিকশা হর্ণ বাজিয়ে চলে
যাচ্ছে, কোনোটাতেই সে উঠছে না। এই
রাতের শহরে আজ তার খুব হাঁটতে ইচ্ছে হচ্ছে
। কাল হরতাল, পরিবেশটা একটু রহস্যময়। বাংলাদেশে
হরতালের আগের রাত ভয়ংকর। কখন কী হয়ে
যায় বলা যায় না। তবু মানুষ থেমে নেই, চলছে তার
গন্তব্যের দিকে। সকাল হাঁটতে হাঁটতে কবিতা
বানাচ্ছেঃ
কোথাও থেমে নেই জীবন, কোথাও
থেমে নেই
মরে গিয়েও থেমে নেই, চলে যাচ্ছে সেও
কোথায় যাচ্ছে কেউ জানে না, অনেকেই
ভাবে
স্বর্গ কিংবা নরকে, জান্নাত কিংবা জাহান্নামে।
আমি হয়তো থেমে গেছি, আমি কোথায়,
আমি হয়তো জানি না, জেনেও জানি না।
কী করে বুঝাই তোমায়, আমি থেমে গেছি,
তুমিও হয়তো জানো না, তুমিও থেমে আছ।
কালকের জন্য আমরা থেমে আছি, আমরা আরও
থেমে যাবো, শুধু কালকের অপেক্ষা।
এটা কী কবিতা বানালো সে! থেমে আছে-
থেমে যাবে, এসব কী! মাথামুণ্ডু কিচ্ছু নেই।
নিজেকে নিজেই বুঝতে পারে না সকাল। সে
অনবরত হাঁটতে থকে। আজ সারারাত সে বাইরে
ঘুরবে, হেঁটে হেঁটে ঘুরবে......
কাল সে কলেজে যাবে না। কলেজের
গ্যালারিতে কাল প্যাথোলজি ক্লাস, খুব ইম্পর্টেন্ট,
তবু সে যাওয়ার চিন্তা বাদ দিয়েছে। এই গ্যালারিতে
বসেই একদিন তার চোখ আটকে গিয়েছিল রাত্রির
মুখ দেখে। ঠিক যেন তার মায়ের মতো চেহারা।
সেই থেকে সে লেগে গেল রাত্রির পিছু
পিছু। তারপর দিন, মাস, বছর যায়, তবু সে মনের কথা
বলতে পারে না। তার ভয়, রাত্রি তাকে সেভাবে
নেবে না। রাত্রিকে সে ভালোবাসে, খুব
ভালোবাসে, তবু যেন সমস্যা। সকাল রাত্রিকে
হারাতে চায় না, কোনোভাবেই না। রাত্রির ভেতর
যেন সে অন্য কাউকে দেখতে পায়, রাত্রিকে
সে খোলাখুলি বলতেও পারে না।
সকাল হাঁটতে থাকে। তার পিছে পিছে আরেকজন।
ছায়া। সেই আরেকজন তাকে ধরে ফেলার
চেষ্টা করছে। সকাল দৌড়াতে থাকে। তার ছায়াও
দৌড়ায় তার সঙ্গে। সেই ছায়া একসময় তাকে ধরে
ফেলে। হেরে যায় সে। সকাল হেরে
যায়......
**********************************
পরের দিন সকাল ও রাত্রির দেখা হয়, বিকেল
বেলা, ‘বাতিঘর’ বইয়ের দোকানে। চারপাশে কবিতা
আর প্রবন্ধের বইয়ের তাক, তার মাঝে তারা দুজন।
সকাল, তুই আজকে কলেজে এলি না কেন?
কাল রাতে আমায় ভূতে ধরছিল, তাই।
ফাজলামি ছাড়, কোনো খোঁজ ছিল না কেন
তোর? আমি এদিকে চিন্তায় মরি।
রাত থেকে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছি, মোবাইলের
চার্জ চলে গেছিল। টিউশনেও যাই নি। কিছুক্ষণ
আগে বাইরে থেকে ফোন দিলাম তোকে।
কী, হিমু হলি নাকি! কালকে কী একটা বলতে
চেয়েছিলে, সেই টেনশন? অভয় দিলাম, বলে
দে। ছ্যাক দিব না, তবে একটু ঘোরাবো। এতদিন
বলিস নি কেন তাই।( রাত্রি হাসতে থাকে )
তুই তো জানিস, আমার মা নেই। বোনও নেই। তুই
আমার বোন হবি?
কী বললি? ফাজলামি ছাড় না? আসল কথাটা বল?
সত্যি বলছি, তুই আমার বোন হবি? তোর চেহারায়
আমি মাকে খুঁজে পেয়েছি।
বইগুলো এবার শব্দ করে উঠল। রাত্রির হাতে থাকা
বইগুলো পড়ে গেল। তারপর সকালের গালে ঠাস
ঠাস কয়েকটি থাপ্পড়। হনহন করে বেরিয়ে গেল
রাত্রি।
এই রাত্রির জন্ম হয়েছিল কোন এক
কালবোশেখী ঝড়ের রাতে। মেয়েটি সেই
ঝড়ের বৈশিষ্ট্য বয়ে বেড়াচ্ছে তার
চালচলনে......
আর সকালের কথা বলতে গেলে অনেক কথাই
বলতে হয়......
মা’র খুব ইচ্ছে ছিল ছেলেটির জন্ম হোক
সকালবেলায়। মাঝরাত না আসতেই মায়ের ভীষণ
ব্যথা উঠল। ছেলেটির বাবা বছরখানেক ধরেই
অপ্রকৃতিস্থ, কী করবে কিছুই বুঝতে পারছিলেন
না। পাশের বাড়ির ‘মায়া’ আণ্টি মায়ের গোঙানির
আওয়াজ শুনে মা’র কাছে ছুটে আসলেন। তিনিই
সব ব্যবস্থা নিলেন। অবশেষে সেই
মাহেন্দ্রক্ষণ। ভোর হতে না হতেই ছেলেটি
পৃথিবীর মুখ দেখল। মা চোখ খুললেন
সকালবেলা। মুখভরা হাসি আর তৃপ্তি নিয়ে ছেলেটির
নাম তিনি ‘সকাল’ই রাখলেন।
ছেলেটি বড় হয়ে ডাক্তার হোক, মা সেটাই
চাচ্ছিলেন। মা’র খুব স্বপ্ন-ছেলেটি খুব ভালো
ডাক্তার হয়ে বাবাকে সারিয়ে তুলবে। তিনি পরম
যত্নে ছেলেটিকে বড় করতে লাগলেন।
অপ্রকৃতিস্থ স্বামী, ঘর-সংসার, বাইরের কাজ আর
ছেলেটিকে সামলে নিতে নিতে মায়ের
শরীরটা ভেঙ্গে যেতে লাগল।
সেই ছেলেটি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে
ভর্তি হয়ে মাকে শুধু প্রশান্তিই দিল না, দিল এক
স্বপ্ন জাগানিয়া ভালো লাগা। সেই ভালো লাগা
নিমেষেই মিলিয়ে গেল। ছেলেটির যবে
থেকে মেডিকেল-হোস্টেলে থাকতে
হলো, সেই থেকে মা’র শরীরের চেয়ে
মনটা বেশি চুরমার হওয়া শুরু হলো। মা আর বেশিদিন
বাঁচলেন না, সব ছেড়ে সবাইকে ফেলে চলে
গেলেন। সেই মায়ের মুখটা ছেলেটা সবসময়
খুঁজে বেড়াত, প্রাণভরে দেখত এমন কাউকে
পায় কিনা! রাত্রির সঙ্গে মায়ের খুব মিল ছিল, সে
বুঝতে পারত না রাত্রিকে সে কীভাবে কাছে
নেব.....................
*********************************************
********
সকাল ফোন করে যাচ্ছে রাত্রিকে। রাত্রি যেন
গা ঢাকা দিয়েছে আজ। কোন সাড়া নেই।
অবশেষে রাত্রির উদয় হলো রাতের
বেলাতেই।
রাত্রি, তুই কি আমার সঙ্গে আর সম্পর্ক রাখবি না?
কেন রাখব না, তবে শোন, আমি তোর বোন
হতে পারি এক শর্তে!
কী শর্ত, বল, আমি শুনব।
তোকে প্রতিদিন আমার হাতের থাপ্পড় খেতে
হবে। পারবি?
হুমম, পারব।
দুজনের সে কী হাসি। রাত্রির চোখে তখন
জলের ঝিলিক। কিছুক্ষণ পর তা টপটপ করে
পড়তে শুরু করল.........রাত্রি হেরে গেল
সকালের কাছে।
রাতের আকাশে তারারা যেমন জ্বলে, সকালও
জ্বলতে শুরু করল রাত্রির বুকে।
সত্যিই-
কেউ থেমে নেই এই পৃথিবীতে
রোদ বৃষ্টি সকাল রাতে
রাতের আকাশে সকাল আসে
সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে।
খুব যে আপন তারা, তবু কেউ কারও নয়,
কেউ কারও নয়।
[তুষার সবুজ]
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now