বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

নগরফুলদের একুশ উদযাপন

"ছোট গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান mim (০ পয়েন্ট)

X লেখকঃ আরিফুর রশিদ সোহাগ ও সারা দুই ভাই বোন।সোহাগের বয়স ৮ বছর, সারার ৬ বছর।ওরা থাকে নগরীর সি আর বি এলাকায়।বাবা রিক্সা চালায়,মা একটা বাসায় কাজ করে কোন রকমে সংসার চালায়।ওরা আগে পড়ালেখা করত না।সি আর বি তে কেউ ঘুরতে এলে তাদের কাছ থেকে টাকা চাইতো।অনেকে এক/দুই টাকা দিলেও অনেকে গালি দিত,এমনকি অনেক সময় মারও খেতে হয়েছে।ওদের থাকার জন্য নির্দিষ্ট কোন জায়গা না থাকায় সবাই ওদের পথশিশু, টোকাই কত রকম নামেই ডাকতো। ওদের এসব ভাল লাগত না। এখন ওরা কারও কাছে হাত পাতে না। পড়া-লেখাও করে। আর ওদেরকে এখন কেউ সহজে পথশিশু,টোকাইও ডাকতে পারে না।ওদেরকে এখন সবাই "নগরফুল" নামেই চিনে। নগরফুলের আপু-ভাইয়ারা ওদের বলে দিয়েছে কারও কাছে হাত পাতা যাবে না।কোন প্রয়োজনে টাকা লাগলে আপু-ভাইয়াদের কাছেই যেন বলে।তাই ওরা এখন কারও কাছে টাকা চায় না।গালিও শুনতে হয় না ওদের। নগরফুলের সাগর ভাইয়া ওদের জন্য শুক্রবারে পড়া-লেখার ব্যবস্থা করেছে। বই,খাতা,কল্ম যা লাগে সব বিনামূল্যে দেয় নগরফুল।নগরীর অনেক নামকরা স্কুল,কলেজ,ভার্সিটির আপু-ভাইয়ারা ওদের ক্লাস নেয়।অনেক কিছু গিফট নিয়ে আসে।সাথে খাবারও।ভাইয়ারা বলেছে এখানে ভাল করতে পারলে ওরা স্কুলেও যেতে পারবে।ওরা এখন প্রায় ২/৩ শত শিশু।অনেকে এখন স্কুলে যায়। একদিন সোহাগের মনে প্রশ্ন জাগলো,সবাই ওদের টোকাই,পথশিশু ডাকে।কিন্তু সাগর ভাইয়ারা ওদের নগরফুল নামে ডাকে কেন? সে একদিন সাগর ভাইয়াকে একা পেয়ে জিজ্ঞেস করেল, "ভাইয়া,সবাই আমাদের পথশিশু,টোকাই ডাকতো।আপনি "নগরফুল " নাম দিলেন কেন?নামটা কিন্তু আমার অনেক ভাল লাগে। সাগর ভাই জবাব দিল, "তোমরা হলে এই নগরীর ফুল।তোমরা একদিন এই নগরকে উজ্জ্বল করবে।আমরা বিভিন্ন কাজে এই নগরকে ছেড়ে চলে গেলেও তোমরাই আঁকড়ে থাকবে এই নগরকে।তাই তোমরাই হলে নগরফুল।আমরা তোমাদের মালি। সেদিন এই ৮ বছরের বাচ্চাটিরও আনন্দে কান্না চলে আসে।সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে আমি ভাইয়ার মনের আশা পূরণ করব।ভাইয়ারা যেভাবে বলবে সেভাবে চলব।যা যা করতে বলে করব।যা নিষেধ করে তা করব না। জাতীয় যে কোন দিবস এলেই নগরফুলের ভাইয়ারা ওদের নিয়েই দিবস পালন করে। এবারের ২১শে ফেব্রুয়ারিও পালন করবে। ভাইয়ারা এই দিবস সম্পর্কে ওদের জানিয়েছে। ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বলা হয়। একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের জনগণের গৌরবোজ্জ্বল একটি দিন। এটি শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবেও সুপরিচিত। বাঙালি জনগণের ভাষা আন্দোলনের মর্ম ও গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতিবিজড়িত একটি দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ১৯৫২ সালের এই দিনে (৮ ফাল্গুন, ১৩৫৮) বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণে সালাম,রফিক,বরকত সহ অনেক তরুণ শহীদ হন। তাই এ দিনটি শহীদ দিবস হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করা হয়। ভাষা দিবসের ইতিহাস জানার পরদিন সোহাগের বোন সারা সোহাগকে জিজ্ঞেস করলোঃ সারাঃ ভাইয়া, শহীদ দিবসে কি কি করে? সোহাগঃ সেদিন ভোরে উঠে ভাষা শহীদদের জন্য বানানো স্মৃতিসৌধে গিয়ে সবাই ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে।অনেকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শহীদদের স্মরণ করে। সাঃ ভাইয়া,অনুষ্ঠান আর ফুল দিলে কি শহীদদের আত্মা শান্তি পাবে? দাদাভাই মারা যাবার পর আব্বু কি করেছিল মনে নেই? সোঃ হা,মনে আছে। আব্বু কুরআন খতম করাইছিল, তারপর আব্বুর সাধ্যমত গরীব-মিসকীনদের খানা খাওয়াইছিল। সারাঃ তাদের ইছালে সওয়াবের জন্য যেমন আব্বু এসব করেছিল, শহীদদের স্মরণেও সবাই কুরআন খতম বা গরীবদের সহযোগীতা করলেতো গরীবরাও উপকৃত হবে শহীদদের আত্মাও শান্তি পাবে।অন্যদিকে যেসব ফুল স্মৃতিসৌধে দেয়া হয় সেগুলো কিছুক্ষণ পর ফেলে দেওয়া হয়, আর ফুল্পগুলো কিনতেও অনেক টাকা খরচ হয়।তাতে অপচয়ও হয়, কোন উপকারও হয় না কারও। সোহাগঃ তুমি সুন্দর কথা বলেছ, কিন্তু আমাদের কথাতো কেউ শুনবে না বোন। সারাঃ ভাইয়া,কেউ না শুনলে না শুনুক।আমরা আমাদের সাধ্যমত কিছু করতে পারি না? সোহাগঃ কি করতে পারি আমরা? বুদ্ধির ডিব্বা বোনটি আমার,দেখি বলতো তোমার মাথায় কি এসেছে? সারাঃ ভাইয়া, আমরা যদি আমাদের এক/দুই টাকা করে জমানো টাকাগুলো দিয়ে ২১শে ফেব্রুয়ারি কয়েকজন গরীবকে সাধ্যমত কিছু খাওয়াই আর নিজেরা যে কয়েকটা সূরা পারি সেগুলো যদি শহীদদের ইছালে সওয়াবের উদ্দেশ্যে পাঠ করি তাহলে কেমন হয়? সোহাগঃ খুব ভাল হয়,কিন্তু আমাদের জমানো টাকাগুলো তো ঈদের সময় আব্বু-আম্মুকে লুঙ্গী আর শাড়ী দিব বলে জমাচ্ছিলাম।ভূলে গেছ গত বছর আব্বু আমাদের জামা দিতে গিয়ে নিজেরা কিছুই নিতে পারে নি।পুরাতন কাপড় দিয়েই ঈদ করেছিল।সেগুলো খরচ করে ফেললে আব্বু-আম্মুকে আমরা ঈদের সময় কাপড় কিভাবে দিব? সারাঃ ভাইয়া, ভাষা শহীদদের জীবনের বিনিময়ে আমরা আজ প্রিয় মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলতে পারতেছি। মা-বাবা যেমন প্রিয়, মাতৃভাষাও আমাদের কাছে প্রিয়। মা-বাবার জন্য রাখা টাকা শহীদদের জন্য খরচ করলেও সমস্যা হবে না। ঈদতো আরও কিছুদিন আছে, ২১ শে ফেব্রুয়ারি দুইদিন পরেই। ২১ শে ফেব্রুয়ারির টাকা আলাদা করে জমানোর সময় নাই, কিন্তু ঈদ আসতে আসতে আমরা আবার জমা করে ফেলতে পারব আব্বু-আম্মুর কাপড়ের টাকা। আগে দিনে যে এক/দুই টাকার কিছু খেতাম তা না হয় এখন খাব না। (বোনের বুদ্ধিগুণ দেখে সোহাগের চোখে পানি চলে এলো।সে বোনকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে করতে লাগল আর বোন ভাইয়ের চোখের পানি মুছে দিতে লাগল।) সোহাগঃ তোর মত বোন পেয়ে আমি গর্বিত। তুই যেমন বলবি তেমনই হবে বোন। অনেক কথা হলো।এবার কাজ শুরু করে দিই আমরা। তারপর দুইজন মিলে মাটির ব্যাংক ভেঙ্গে নিজেদের জমানো টাকাগুলো গুনে দেখল সারার হয়েছে ৭৮ টাকা এবং সোহাগের ১২৪ টাকা। ওরা হিসাব করে মোট ২০২ টাকা পেল। ওরা ওদের চিন্তাগুলো আব্বু-আম্মুর কাছে বললে তারাও অনেক খুশি হলো ওদের দেশপ্রেম দেখে।ওদের আব্বু-আম্মুও ওদের সাথে অংশীদার হতে চাইল।ওরা শুনে খুশিতে আত্মহারা। আম্মু বলল,"আমরাতো গরীব,আমরা হোটেল থেকে কিনে খাওয়াতে গেলে যে খরচ হবে তা দিয়ে আমরা বাসায় রান্না করে খাওয়ালে দ্বিগুণ লোক খাওয়াতে পারব।সোহাগের আব্বু বাজার নিয়ে আসিও। কাল সকাল সকাল আমরা সবাই মিলে স্মৃতিসৌধে গিয়ে কিছুক্ষণ সুরা পাঠ করে তারপর রান্না করব এবং দুপুরে আমাদের আশেপাশের যাদেরকে পারি খানা খাওয়াব। ২১ শে ফেব্রুয়ারি ফজর নামাজ পড়েই সবাই প্রস্তুত। সোহাগ আর সারার মাথায় ও আব্বু-আম্মুর কাঁধে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা,যা সোহাগের আব্বু কাল বানিয়ে এনেছে। সোহাগ-সারাকে মাঝখানে নিয়ে মা-বাবা একে অপরের হাত ধরে চলতে লাগলো স্মৃতিসৌধ অভিমুখে।কাছাকাছি যেতেই দেখলো প্রচুর ভীড়। সাথে পুলিশের টহল। ওদের হাতে ফুল না থাকায় আর জামা ভাল মানের না হওয়াতে পুলিশ ওদেরকে কাছে যেতেই দিল না।তাই ওরা  কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে বড় করে সুরা পাঠ শুরু করে দিলো।ওদের তিলাওয়াত শুনে আশেপাশের অনেকেই ওদের সাথে কুরআন পাঠ করতে লাগলো।একটু পরেই দেখা গেল গান বন্ধ হয়ে সবার কণ্ঠ থেকে তিলাওয়াত ভেসে আসতেছে। তাদের সাথে দেখা গেল অনেক আলেম-ওলামাও আছে। কিছুক্ষণ তিলাওয়াতের পর একজন হুজুরকে মোনাজাত করতে বলল সোহাগের বাবা। হুজুর মোনাজাতে সকল বীর শহীদদের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করল।মোনাজাত শেষে সবাই ওদেরকে বাহবা দিতে লাগল।অনেকে আগামীতে নিজেরাও ওদেরমত করে বিভিন্ন দিবস পালনের অঙ্গীকার করল। ওরা ফিরে এলো তাদের ঘরে। সোহাগ আর সারাকে পাশের সবাইকে দুপুরে খাওয়ার কথা বলে আসতে পাঠাল মা।তারপর মা রান্নার কাজ শুরু করল।রান্না শেষে সবাইকে খাবার দিল।সবাই জানতে চাইলো কি উপলক্ষে খাওয়ানো? মা সবাইকে বিস্তারিত খুলে বললে অনেকেই সোহাগ-সারার প্রশংসা করতে করতে বলল আমরা আগে জানলে আমরাও এমনকিছু করতাম।বিকেলে আমরাও এমন কিছু করার চেষ্টা করব। সারাদিন "নগরফুলের ভাইয়ারা" ওদের না পেয়ে খবর নিয়ে জানতে পারলো ওদের এই মহান উদ্যোগের কথা। ভাইয়ারা সবাই এসে ওদেরকে "শিরীষ তলায়" এনে ওদের মহান কাজের কথা সবাইকে জানালো।সবাই ওদের বাহবা দেওয়ার পাশাপাশি ওদের যা খরচ হয়েছিল তার দ্বিগুণ হাদিয়া দিল ওদেরকে। সারা এবার তার ভাইয়াকে একাকি ডেকে বলল, "ভাইয়া,তুমি না বলেছিলে আমাদের কথা কে শুনবে? এখন দেখতেছ কে শুনতেছে? আমরা কি কাউকে কিছু বলেছি? শুধু নিজে করার চেষ্টা করেছি।  আমরা নিজেরা না করে অন্যদের দিয়ে করাতে চাই বলেই সমাজে পরিবর্তন আসে না।নিজেকে দিয়ে যে কোন ভাল কাজ শুরু করলে অন্যরাও সেটা গ্রহণ করে।" সোহাগ বোনের দিকে চেয়ে মুচকি হাসি দিয়ে নাক টেনে আদর দিয়ে বলল, "তাইতো আমার আদরের বোনের নাম বুদ্ধির ডিব্বা বোন, যার মাঝে আছে অনেক মহৎ মহৎ গুণ।"


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৯০ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now