বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
সকালে ঘুম থেকে উঠেই এমন একটা খবর
পাবে তা আশা করেনি শায়ন।
তাই বাসায় কোনো কিছু না বলেই
বের হয়ে এসেছে। বসের ফোন পেয়ে
সময় নষ্ট করেনি মোটেও।
এক্সিলারেটরে পায়ের চাপ বাড়িয়ে
দিলো সে। গাড়ির স্পিড বেড়ে
গিয়েছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব
পৌছাতে চায় ও। গন্তব্য রাফিনের
বাসা। বস রিটায়ার্ড কর্নেল.
আনোয়ার হুসাইনের কথাটা এখনো
কানে বাজছে ওর।
“রাফিন কিডন্যাপ হয়েছে। ওর বাসায়
গিয়ে রিপোর্ট দাও আমাকে।"
আফতাব চৌধুরী রাফিন। শায়নের
সাথেই কাজ করে ছেলেটা,
বাংলাদেশ কাউন্টার
ইন্টেলিজেন্সে জয়েন করেছে বছর
দুয়েকের মত হয়েছে। শায়নের থেকে
জুনিয়র পোস্টে কাজ করলেও ছেলেটা
শায়নকে স্যার না বলে “শায়ন ভাই”
বলেই ডাকে, শায়নও ওকে বন্ধুর মতই
মতোই মনে করে, তাই
স্বাভাবিকভাবেই কিছু বলে না।
চৌকস এই ছেলেটা তার বুদ্ধি ও জ্ঞান
দিয়ে খুব সহজেই সকলের আস্থাভাজন
পাত্রে পরিণত হয়েছে। আর সেই
ছেলেটাই কিনা হঠাৎ করে
কিডন্যাপড !!! একদম মানা যায় না।
সবকিছু গোছানো,শুধু বিছানাটা
ছাড়া। চাদরটা এলোমেলোভাবে
আছে। বালিশটা এক পাশে ফেলে
রাখা। শায়ন একবার চোখ বুলিয়ে
নিলো রাফিনের ঘরটাতে। রুমে তেমন
কিছুই নেই। একটা বিছানা, বিছানার
ডান পাশে সাইড টেবিল। টেবিলে
রাখা ছোট্ট একটা টেবিল-ল্যাম্প। আর
রাফিনের একটা ছবি। রুমের বাম পাশে
বাথরুমের দরজাটা হালকা খোলা।
একবার বাথরুমেও চোখ বুলিয়ে নিলো
শায়ন। অস্বাভাবিক কিছুই চোখে
পড়েনি ওর।
নাহ!! মাথায় ঢুকছেনা। কিভাবে
রাফিন কিডন্যাপ হলো তা বুঝতে
পারছেনা শায়ন।
তবে এটুকু নিশ্চিত অজ্ঞান করে নিয়ে
গিয়েছে ওকে। রুমে ঢুকেই খুব হালকা
কিন্তু পরিচিত ক্লোরোফর্মের গন্ধ
নাকে এসেছে শায়নের।
কিন্তু এমন একটা জলজ্যান্ত মানুষকে
কিভাবে তুলে নিয়ে গেলো?? তাও
আবার নিজের বাড়ি থেকেই??
রাফিনের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে
একমনে ভাবছিলো শায়ন। হঠাৎ পায়ে
কিছু একটার খোঁচা লাগতেই ভীষণ
চমকে উঠলো শায়ন। তাকিয়ে দেখলো
পায়ের কাছে একটা কবুতর। ভীষণ সুন্দর
কবুতরটা। মানুষের খুব কাছাকাছি
থাকে বলে ভয় একদমই নেই। কবুতর
সাধারণত মানুষ জোড়া হিসেবে পালন
করে। একটা কবুতর দেখে একটু কৌতূহলী
হয়ে শায়ন নিচু হয়ে ধরতে চাইলেই একটু
দূরে সরে গেল কবুতরটা।
- স্যার, কোন ক্লু খুঁজে পাওয়া যায়নি।
হঠাৎ বেরসিকের মত বলে উঠল একজন
পুলিশ অফিসার।
শায়ন ব্যালকনি থেকে ঘরে প্রবেশ
করলো। ঘরে ঢুকে পুলিশ অফিসারকে
উদ্দেশ্য করে কিছু বলতে গিয়ে মুখ
খুলেও আবার বন্ধ করে ফেললো। কারণ
তার চোখ আটকে গেছে রাফিনের
ঘরে একটা দেয়াল পেইন্টিং এর ওপর।
পেইন্টিংটা রুমের দরজার ঠিক পাশের
দেয়ালে। সেই পেইন্টিংটার ওপরে
একটা কাগজ আটকানো। বোঝাই
যাচ্ছে হালকা আঠা দিয়ে লাগানো
হয়েছে কাগজটা। খেয়াল করে না
তাকালে চোখে পড়তোনা এটা।
কাগজটার দিকে কিছুক্ষণ এক দৃষ্টিতে
তাকিয়ে রইলো শায়ন।
খুব ছোট্ট করে একটা মেসেজ লেখা
আছে সেখানে।
মেসেজটা পড়ে চোয়াল শক্ত হয়ে
এলো শায়নের। হাত মুঠো পাকিয়ে
গেলো অজান্তেই। একটানে
পেইন্টিংটার ওপর থেকে কাগজটা
তুলে নিলো ও। বের হয়ে এলো
রাফিনের ঘর থেকে।
একই সাথে রুম থেকে বের হয়ে আসলো
পুলিশ অফিসারটি।
তার হাতে কাগজটা দিয়ে বললো,
"এটা ল্যাবে পাঠাও। হাতের ছাপ,
কলমের কালি, কখন লেখা হয়েছে সব
কিছুর রিপোর্ট আমার চাই!"
"ইয়েস স্যার," বলেই একটা স্যালুট ঠুকে
বের হয়ে গেলো লোকটা।
কাগজটার লেখা শায়নের মাথায়
ঘুরছে এখনো। ওর ভেতরে রাগ আর বন্ধুর
প্রতি দায়িত্ব দুটোই নাড়া দিচ্ছে।
এখনো মনে হচ্ছে চোখের সামনে
ভাসছে লেখাটা।
"Try but fail"
নিজের অফিসের ডেস্কে বসে আছে
শায়ন। শরীরটাকে চেয়ারের সাথে
হেলান দিয়ে বসে বসে ভাবছে সে।
রাফিনের বাসা থেকে সেদিন তেমন
কিছুই পাওয়া যায়নি। রাফিনের
সাথে থাকতো শুধু ওর অন্ধ চাচা। তিনি
অসুস্থ, শয্যাশায়ী। রাফিনের ছোট্ট
অ্যাপার্টমেন্টের একটা ছোট্ট রুমেই
তিনি সারাদিন শুয়ে থাকেন। তাকে
জিজ্ঞেস করে তেমন কোন লাভ হয়নি।
রাতে তিনি বেঘোরে ঘুমুচ্ছিলেন।
সন্দেহজনক কোন শব্দই নাকি পান নি।
রাফিনের কললিস্ট রিপোর্ট
আনিয়েছিল। সেগুলো দেখছে। তেমন
কারো সাথেই কথা বলেনি। তাই
কাওকে সন্দেহের চোখে দেখতেও
পারছেনা।
শায়ন কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে রইলো
চেয়ারে। এরপর মাথাটা হেলান
দিলো চেয়ারে। তাকিয়ে আছে
উপরে ঘুরতে থাকা সিলিং ফ্যানের
দিকে। দরজায় টোকার শব্দ শুনে সোজা
হয়ে বসলো শায়ন। তাকিয়ে রইলো
দরজার দিকে।
- আসতে পারি স্যার?
ওদের অফিসের এক জুনিয়র অফিসার
দাড়িয়ে। হাতে ফাইল। ফাইলের ওপর
লেখা আছে রাফিনের নাম।
- আসো তাসিন।
- স্যার,, রাফিন স্যারের ফাইলটা।
- হুম! রেখে যাও। আর কিছু পেলে ওর
ব্যাপারে?
- স্যার রাফিন ভাইয়ের বাসা থেকে
আর কিছুই পাওয়া যায়নি। কিভাবে
তাকে তুলে নিয়ে গেলো সেটাও
বুঝতে পারছিনা। গত কাল রাতে
বাসায় ফিরে তিনি নাকি সরাসরি
নিজের রুমে চলে যান। রাতে খাওয়া-
দাওয়া করেননি। খুব চিন্তিত
দেখাচ্ছিল তাকে। ওদের বাসার
কাজের বুয়ার কাছে জেনেছি।
- হুম! আচ্ছা যাও। আমি একটু একা
থাকতে চাই। কেউ আসলে বলে দিয়ো
আমি ব্যস্ত। আর মুবিনকে দিয়ে এককাপ
কফি পাঠিয়ে দিয়ো।
- আচ্ছা স্যার।
আবার চিন্তার সাগরে ডুব দিলো
শায়ন। রাফিন ইন্টেলিজেন্সের
ভেতরকার অনেক কিছুই জানে, তার
কিডন্যাপ হওয়াটা অনেক বেশী
চিন্তার কারণ। বোঝাই যাচ্ছে কোন
প্রকার মুক্তিপণের জন্য রাফিনকে
কিডন্যাপ করা হয়নি। সে ক্ষেত্রে
ইন্টেলিজেন্স বেশ খানিকটা হুমকির
মুখে আছে। নিজের রুমে ডেকে এ কথা
গুলা কিছুক্ষণ আগে বস বলেছেন। যদিও
বলাটা এমনিই বলা, পরিস্থিতি
বোঝার মত বুদ্ধি শায়নেরও আছে।
কিডন্যাপের সাথে কারা জড়িত যদিও
বা এখন পর্যন্ত বোঝা যাচ্ছে না তবে
এটুকু বোঝা যাচ্ছে কাজটার সাথে এমন
কেউ জড়িত যে শুধু রাফিনকে না
শায়নকেও নিজের হাতের মুঠোতে
নিতে পারে।
কফির ধূমায়িত কাপের দিকে
তাকিয়ে রইলো ও। গরম কফির কাপ
থেকে ধোয়া বের হচ্ছে। নিজের
ভেতর থেকে নিজেরই এক অস্তিত্ব
মিশে যাচ্ছে বাতাসে। কফির কাপে
চুমুক দিতে দিতে রাফিনের ফাইলটা
টেনে সেখান থেকে ফরেনসিক
রিপোর্টের এনভেলাপটা বের করলো
শায়ন। এনভেলাপ থেকে ঐ ছোট্ট
ম্যাসেজের কাগজটার ফরেনসিক
রিপোর্টটা বের করে দেখতে
লাগলো। রিপোর্টে বলা হয়েছে
লিখাটা লিখতে সাধারন বলপয়েন্ট
কলম ব্যবহার করা হয়েছে তবে
রিপোর্টের কোনায় মন্তব্য লেখার
জায়গাটায় ছোট্ট করে একটা লেখা
আছে। সেখানে বলা হয়েছে,
লেখাটা সম্ভবত রাশিয়ান কোন
মানুষের লেখা। কেন সেটা ব্যাখ্যা
করেছেন ফরেনসিক ডিপার্টমেন্টের
হেড ডঃ নজরুল ইসলাম।
মন্তব্য এবং তার ব্যাখ্যা পড়ে শায়ন খুব
পুলকিত অনুভব করলো। সেই সাথে কি
যেন একটার কথা মনে পড়ি পড়ি করেও
মনে পড়ছে না শায়নের।
এনভেলাপ থেকে পরবর্তী কাগজটা
বের করল শায়ন। চিরকূটটা থেকে একটু
মাটির নমুনা পাওয়া গেছে। সেই
মাটি সম্পর্কে বিস্তারিত লেখা
আছে। এই মাটি বাংলাদেশের
কোথায় কোথায় পাওয়া যায় সেটাও
লেখা আছে রিপোর্টে।
যেহেতু চিরকূটটার গায়ে ঐ মাটি
পাওয়া গেছে। তার মানে হয়তোবা
লেখার সময় কাগজটা হাত থেকে পড়ে
গেছিলো মাটিতে। তার মানে
চিরকূটটা কিডন্যাপাররা শায়নের
বাসায় বসে লেখেনি, আগেই লিখে
এনেছে। প্ল্যানেরই অংশ ছিলো
চিরকূটটা, হঠাৎ করে লেখা হয়নি।
কিন্তু একটা ব্যাপার শায়ন বুঝতে
পারছে না, এতো ঝামেলার মাঝে
কেন গেল কিডন্যাপাররা? তারা তো
চাইলে রাফিনের বাসায় বসেই
কাজটা করতে পারতো। আরেকটা
ব্যাপার মোটামুটি ক্লিয়ার হয়েছে,
রাফিন খুন হয়নি। কিডন্যাপারদের
উদ্দেশ্য খুন করা নয়। খুন করতে চাইলে
তারা খুব সহজেই রাফিনের বাসায়ই
রাফিনকে খুন করতে পারতো। তাদের
উদ্দেশ্য হয় রাফিনের কাছ থেকে
ইনফরমেশন বের করা নাহয় রাফিনকে
বন্দী রেখে মুক্তিপণ হিসেবে কিছু
একটা চাওয়া। এবং সেটা যে টাকা
নয় এ ব্যাপারে শায়ন মোটামুটি শিওর।
যারা রাফিনকে ধরে নিয়ে গেছে
তারা নিঃসন্দেহে প্রফেশনাল।
রাফিনের কাছ থেকে ইনফরমেশন
আদায় করাটা করাটা যেমন সহজ হবেনা
তেমনি ওরাও রাফিনকে এত সহজে
রাফিনকে ছেড়ে দেবেনা। ইনফরমেশন
গোপন রাখতে গিয়ে রাফিনকে কি
পরিমাণ টর্চার সহ্য করতে হতে পারে
এটা চিন্তা করে শায়নের কপালে
একটা ভাঁজ পড়লো। পরমুহূর্তেই চোয়াল
দৃঢ় হয়ে গেল তার। কাছের বন্ধু ও
সহকর্মীর ওপর টর্চার সে কোনভাবেই
হতে দেবেনা।
রাফিনের বাসায় যেতে হবে আবার।
হয়ত কোন ব্যাপার চোখ এড়িয়ে গছে
তার। কফির কাপে একটা চুমুক দিয়ে
অবশিষ্ট অংশটুকু পেটে চালান করে
দিলো সে। তারপর প্রায় দৌড়ে বের
হয়ে গেলো অফিস থেকে।
বাইরে পার্ক করে রাখা গাড়িতে
উঠেই ইগনিশনে চাবি ঢুকিয়ে মোচড়
দিতেই স্টার্ট নিলো গাড়িটা।
এক মুহূর্ত দেরী না করে
এক্সিলারেটরে পায়ের চাপ বাড়িয়ে
দিলো।
রাফিনের বাসার দিকে ছুটে চলছে
গাড়ি।
হতাশ বোধ করছে শায়ন।
রাফিনের বাসায় এসে কোন লাভই
হয়নি। ‘বিকেলটাই মাটি হলো’
ভাবতে ভাবতে ব্যালকনিতে গিয়ে
একটা সিগারেট ধরালো শায়ন। হঠাৎই
চোখ গেল কবুতরটার দিকে। একটু ভালো
করে খেয়াল করে দেখলো কবুতরের
ডান পায়ে একটা রিং পড়ানো,
খানিকটা কৌতুহল বোধ করে
কবুতরটাকে খুব সাবধানে ধরে ফেললো
শায়ন। চিকন লোহার রিং টা কেন
কবুতরের পায়ে পড়ানো হয়েছে বুঝতে
পারলো না। যদি এটা কোন টাইপের
গয়না হতো তবে সেটা অন্য কোন দামী
ধাতুর হত।
- স্যার, আমারে ডাকছেন?
বুয়ার ডাকে সম্বিত ফিরে পেলো
শায়ন।
- জ্বী ডেকেছি। এক কাপ চা
খাওয়াতে পারবেন?
- জ্বে স্যার, পারমু। রং চা না দুধ চা?
- রং চা ই দেন।
- জ্বে আইচ্ছা।
বলে চলে যেতে উদ্যত হলো বুয়া। কি
ভেবে শায়ন আবার তাকে ডাকলো।
- খালা, শুনুন।
- জ্বে স্যার?
- আচ্ছা, এই কবুতরটা কি রাফিনের?
- জ্বে, হের নিজের।
- কবুতর কি একটাই ছিল? নাকি জোড়া
ছিল?
- না স্যার, একটাই ছিল। আমি হ্যারে
অনেক দিন কইছি এইডার জোড়া
কিন্না আনতে কিন্তু হ্যায় কিছু না
কইয়্যা খালি হাসে।
- কবে কিনেছিল বলতে পারেন?
- তা হইবো প্রায় বছরখানেক। কিন্তু
এট্টুও যত্ন নেয় না হ্যায়। আমিই পালি।
কি যেন ভাবলো একটু শায়ন। তারপর
আবার জিজ্ঞেস করলো...
- আচ্ছা, ও কি কখনো কবুতরটা নিয়ে
কিছু করে? মানে আমি জানতে চাচ্ছি
কবুতরকে খাওয়ায় নাকি কিংবা আদর
করে নাকি?
- না, তেমুন একটা না। হ্যায় বাসায়ই
তো কম থাকে। থাকলেও কইতরের
ধারে যায়না। তয় মাঝে মাঝে
কইতররে উড়ায়া দিয়া হাততালি
দিয়া খেলে। কইতরডা দুইডা
ডিগবাজি দিয়া অনেক দূর যায়। হ্যায়
চাইয়্যা চাইয়্যা দ্যাহে।
- আচ্ছা, ঠিক আছে। আপনি যান।
বুয়াকে বিদায় করে দিয়ে হাতে ধরা
কবুতরটার দিকে ভালো করে
তাকালো শায়ন। কবুতরটা ‘রেসিং
হোমার’ প্রজাতির। এই কবুতর খুব একটা
সহজলভ্য নয়। সাধারণত রেস খেলার জন্য
এই কবুতর ব্যবহার করা হয়। এই কবুতর কিনতে
গেলেও বেশ কিছু টাকা গুনতে হবে।
কবুতর প্রেমীদের কাছে এই কবুতর অনেক
দামী। তবে কবুতরের প্রতি রাফিনের
ব্যবহারে তাকে কবুতর প্রেমী মনে
হচ্ছেনা। শায়নের কাছে একটু রহস্যজনক
লাগলো কবুতরের বিষয়টা। কবুতরের
পায়ের দিকে তাকাতেই একটা
ব্যাপার খেয়াল করলো শায়ন। সাথে
সাথে কিছু একটা মাথায় আসলো তার।
ব্যাপারটা মাথায় আসতেই মনে হলো
এখুনি অফিসে যাওয়া দরকার। রহস্যের
জট খুলতে শুরু করছে একটু একটু।
............................................................
ঘুটঘুটে অন্ধকারের মাঝে দাঁড়িয়ে
আছে শায়ন।
জায়গাটা সাভারের কাছাকাছি।
মোটামুটি জনমানবশূন্য এলাকা।
কিডন্যাপারদের ঘাঁটি হিসেবে অতি
উত্তম জায়গা।
সামনে দাঁড়ানো বাড়িটাতেই যে
রাফিন আছে সে ব্যাপারে
মোটামুটি শিওর শায়ন।
- তুমি বাড়ির পেছন দিক দিয়ে ঢুকবে,
আমি সামনের দিকটা দেখবো। কোন
রকম শব্দ করা যাবেনা। এবং একা
কাউকে দেখতে পেলেই গুলি করবে,
যতটা নিঃশব্দে পারো। ওরা কিন্তু
সংখ্যায় অনেক বেশী থাকতে পারে।
সো কোন ভুল করা যাবেনা, সেক্ষত্রে
মার্ডারও হতে পারো। মনে রেখো
সুযোগ কিন্তু একটাই পাবে।
তাসিনকে পুরো ব্যাপারটা বুঝিয়ে
দিতেই তাসিন মাথা নেড়ে
জানালো যে সে বুঝতে পেরেছে।
নির্দেশ পেয়েই তাসিন বেড়ালের
মতো নিঃশব্দে সামনে যেতে
লাগলো। আসন্ন রোমাঞ্চকর দৃশ্যের কথা
ভেবে বুকে জমে থাকা নিঃশ্বাসটা
‘হুফ’ করে ছেড়ে দিয়ে সামনে বাড়লো
শায়ন।
বাড়িটার সামনের দিকে একটা
মানুষকে দেখা যাচ্ছে। হালকা
ঝিমুচ্ছে। নিঃশব্দে পা টিপে টিপে
তার সামনে গিয়ে রিভলবারের
বাঁটটা দিয়ে ঘাড়ের পেছনে আঘাত
করলো শায়ন। টুঁ শব্দ করতে পারলো না
লোকটা। নীরবে ঢলে পড়লো। আপাতত
২-৪ ঘন্টা জ্ঞান ফিরবে না আশা করা
যায়।
তাকে একটা গাছের সাথে বেঁধে
মুখে রুমাল গুঁজে বাড়ির ভেতরে
ঢোকার প্রস্তুতি নিলো শায়ন।
পুরো বাড়িটাই অন্ধকার বলা চলে। শুধু
একটা রুমে ডিম লাইটের মত হালকা
আলো জ্বলছে। সেখানেই রাফিন
আছে বলে ধারণা করছে শায়ন।
একটু এগুতেই চোখে পড়লো তাসিন
উল্টাদিক থেকে পা টিপে টিপে
আসছে। শায়নকে দেখে প্রথমে হাতের
২ আঙুল ও পরে একটা হাত গলা কাঁটার
মত করে দেখিয়ে বোঝালো ২ জনকে
খতম করে দিয়েছে।
দুজনে একসাথে হয়ে আস্তে আস্তে
এগুতে লাগলো।
“গুস্তাভ”
হঠাৎ একটা বাজখাঁই কন্ঠস্বর শুনে দুজনেই
পাশে থাকা একটা টেবিলের নিচে
আশ্রয় নিলো।
“গুস্তাভ” আবার ডাকতে লাগলো
দৈত্যটা। ডাকতে ডাকতে তাদের
এদিকেই আসছে। গুস্তাভ যে তাসিনের
গুলিতে ধরাধাম ত্যাগ করেছে সেটা
এখনো বুঝতে দৈত্য বুঝতে পারেনি,
ভেবে কিছুটা স্বস্তি পেল শায়ন।
কাছাকাছি আসতেই টেবিলের একটু
কোণা দিয়ে তাকালো শায়ন।
বাজখাঁই কন্ঠের মালিককে দেখে
বিষম খেল সে, দেখতে আসলেই
দৈত্যের মত। আবছা আলোয় চেহারা
দেখে শায়ন ঠিক বুঝতে পারলো কোন
দেশের লোক সে। হতে পারে স্পেন
বা রাশিয়ার।
টেবিলের একদম কাছাকাছি আসতেই
তাসিন একটা পা বাড়িয়ে দিল।
তাতে দৈত্যের অবস্থানের কোন
পরিবর্তনই হলো না, তবে সে বুঝে
গেলো সে নিরাপদ নয়। দৈত্য কোমরে
হাত দিতেই শায়ন আর দেরী করলো
না। উল্টাভাবে মাথা বের করে একটা
গুলি চালান করে দিল দৈত্যর চিবুক
বরাবর।
রিভলবার ধরা হাতেই স্রেফ কাটা
কলাগাছের মতো পড়ে গেল দৈত্য।
এক সেকেন্ড দেরী হলেই তার
অবস্থাটা কি হতো সেটা আর ভাবতে
চাইছে না শায়ন।
বেচারা তাসিনের দিকে তাকানো
যাচ্ছে না।
তাসিনকে ওঠার তাড়া দিলো শায়ন।
আবার রাফিনের সম্ভাব্য রুমমুখী রওনা
দিলো তারা। প্ল্যান দুজন দরজার দুদিক
দিয়ে আক্রমণ করবে। দরজার যে পাশটার
গা ঘেঁষে শায়ন দাঁড়িয়ে আছে সে
পাশ থেকে রুমের একপাশটা দেখা
যাচ্ছে। তার দৃষ্টিসীমার মাঝে সে
কোন মানুষ দেখতে পেল না।
তাসিনের দিকে তাকাতেই তাসিন
ইশারায় জানালো একজন আছে
ভেতরে। তাসিনকে পূর্বনির্দেশ মত
অপেক্ষা করার ইশারা দিয়ে আচমকা
ঘরে ঢোকার প্রস্তুতি নিতে লাগলো
শায়ন।
শেষ লোকটাকে মারতে মোটেও বেগ
পেতে হয়নি। আচমকা আক্রমণে সে খেই
হারিয়ে ফেলতেই পর পর দুটা বুলেট
তার বুকে পাঠিয়ে দিলো শায়ন।
ঘরের ভেতর একটা চেয়ারে রাফিনকে
বসে থাকতে দেখে হাসি মুখে
এগিয়ে গেল শায়ন। শায়নের দিকে
তাকিয়ে একটা শুকনো হাসি দিয়ে
চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো রাফিন।
- আমাকে কীভাবে খুঁজে পেলে শায়ন
ভাই?
- ওসব কথা পরে হবে। আগে বলো
এখানে মোট কতজন আছে? জানো
কিছু?
- নাহ, শায়ন ভাই।
- আচ্ছা যাই হোক, এটা রাখো, আর
আমার সাথে আসো। আগে এখান
থেকে বেরোতে হবে। তারপর তোমার
সাথে অনেক কথা আছে।
কোমর থেকে অন্য একটা রিভলবার
টেনে বের করে রাফিনের দিকে
এগিয়ে দিলো শায়ন।
আস্তে আস্তে পা টিপে বাড়ির
বাইরে চলে আসলো শায়ন আর রাফিন।
- শায়ন ভাই, আপনার কাছে সারাজীবন
কৃতজ্ঞ থাকবো আমি।
হাঁটতে হাঁটতে কথাগুলো বলছিল
রাফিন।
- আরে রাখো তো।
- এবার বলেন কীভাবে আমার খোঁজ
পেলেন?
- তোমার বাসায় একটা নোট রেখে
এসেছিল কিডন্যাপাররা, আর
সেটাতে লাল মাটির নমুনা পেয়েই
আমার সন্দেহ হয়েছে, তাদের
আস্তানা এমন কোথাও যেখানে
লালমাটি আছে। আর তাদের আস্তানা
যে মোটামুটি ঢাকা থেকে
কাছাকাছি কোথাও এটা তো সহজেই
আন্দাজ করা যায়। দুয়ে দুয়ে চার
মিলিয়ে বের করে ফেললাম।
- ব্রিলিয়ান্ট শায়ন ভাই।
- তোমাকে কারা কিডন্যাপ করেছিল
সেটা সেটা জানো?
- নাহ।
- মাফিয়ার লোকজন।
শুনে রাফিনের মুখটা হা হয়ে গেল।
- আগেই অবাক হয়ো না। এখন এমন কিছু
বলবো যেটা শুনে তোমার অবাক হবার
মাত্রা ছাড়িয়ে যাবে।
বলেই চুপ হয়ে গেল শায়ন। রাফিনের
চোখে প্রশ্ন দেখে আবার বলা শুরু
করলো শায়ন...
- আর এই মাফিয়া এবং তোমার
কিডন্যাপের সাথে জড়িত আমাদের বস
কর্নেল আনোয়ার হুসাইন।
রাফিনের চোখটা বড় বড় হয়ে গেল।
- আমার আগেই সন্দেহ হয়েছিল যে
আমাদের ভেতরকার কেউ
নিশ্চিতভাবে মাফিয়ার সাথে
জড়িত। নাহয় আমরা যতবারই মাফিয়ার
কোন ডনদের পেছনে লাগি তারা
কীভাবে টের পেয়ে যায়? তোমার
মনে আছে সেবারের কথা? যেবার
তুমি আর আমি তোমার বাসায় বসে
করা ৫ মিনিটের প্ল্যানে সেলিম
চৌধুরীকে ধরতে বেরিয়েছিলাম।
মনে করে দেখো, আমাদের সেই টপ
সিক্রেট প্ল্যানের কথা আমি তুমি
বাদে শুধুমাত্র বস জানতেন। সেবারো
আমরা ব্যর্থ হয়েছি। এর একটাই কারণ
কোন না কোন ভাবে সেলিম চৌধুরীর
কাছে খবর পৌছে গিয়েছিল। তুমি আর
আমি তো একসাথেই ছিলাম, আমাদের
মাঝে কেউ জানায়নি, তাহলে
সেলিম চৌধুরী খবর পেল কীভাবে?
উত্তর একটাই বস জানিয়েছে। তোমার
কি মনে হয় এ বিষয়ে?
পাশে তাকাতেই দেখলো রাফিন
নেই। পিছে ঘুরে তাকাতেই বুকে
লাথি খেয়ে পড়ে গেল শায়ন।
লাথিটি দিয়েছে তারই বন্ধু রাফিন।
তাল সামলাতে না পেরে প্রায় ৬
ফিট দূরে গিয়ে পড়লো শায়ন।
কিছুটা ধাতস্থ হতেই দেখলো
রিভলবার হাতে সামনে দাঁড়িয়ে
আছে রাফিন, মুখে ক্রুর হাসি।
নিজের কোমরের দিকে হাত
বাড়াতেই রাফিন বলে উঠলো...
- উহু, এই ভুল করো না। তুমি রিভলবার
বের করতে করতেই অন্তত তিনটা বুলেট
তোমার বুকে পাঠানোর ক্ষমতা আমি
রাখি। আমার ক্ষিপ্রতা সম্পর্কে
তোমার থেকে ভালো আর কে জানে,
শায়ন আহমেদ?
বলেই আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে
হাসলো রাফিন।
- কিছু মনে করো না। আসলে তোমার
বিশ্লেষণ শুনে অনেক কষ্টে হাসি
চেপে রেখেছি। আর পারলাম না।
জ্বলজ্বলে চোখ নিয়ে শায়ন শুধু
তাকিয়ে রইলো, কিছু বলল না।
- তোমার ধারণা কিছুটা ঠিক আছে।
আমাদের ভেতর কেউ একজন মাফিয়ার
ইনফরমার হিসেবে কাজ করছে, তবে
সেটা বস নয়, সেটা আমি। লাস্ট ৭ বছর
ধরে আমি মাফিয়ার সাথে আছি।
মাফিয়ার ইনফরমার হিসেবে কাজ
করার উদ্দেশ্যেই আমার
ইন্টেলিজেন্সে জয়েন করা। আর আমার
কিডন্যাপ আমারই সাজানো।
তোমাকে এখানে টেনে আনার
জন্যে। সে উদ্দেশ্যেই মাটিটা
লাগানো হয়েছে ঐ নোটটাতে যাতে
কুকুরের মত গন্ধ শুকে শুকে তুমি এখানে
চলে আসো। এটা তুমিও পারবে তা
আমি জানতাম, তোমার ওপর আমার সে
বিশ্বাসটুকু আছে। তাই এসে ধরা দিলে
আমারই ফাঁদে। তবে এতোটা
তাড়াতাড়ি পারবে বুঝতে পারিনি।
সে জন্যে আমার কোন লোক রেডি
ছিল না, তাই আমি হারালাম আমার
কিছু চৌকস লোককে।
শায়ন কিছু বলল না।
- এখন আমি কি করবো জানো?
তোমাকে খুন করে খুব সুন্দর ভাবে এখান
থেকে পালিয়ে যাবো। সবাই ভাববে
তুমি খুন হয়েছ আমাকে বাঁচাতে এসে।
আর আমি কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে
থাকবো। তারপর বের আসবো। সবাই
ভাববে এজেন্ট রাফিন
কিডন্যাপারদের হাত থেকে
পালিয়ে এসেছে নিজ কৌশলে।
শায়ন তাও কিছু বলল না, মুখের কোনায়
একটু হাসি দেখা গেল শুধু।
- ওহ হো তোমার একটা প্রশ্ন আছে, যদিও
তুমি করনি। তাও আমি বলি, জানতে
ইচ্ছা করছে না কীভাবে সেলিম
চৌধুরী তোমার আমার প্ল্যানের
খবরটা পেল?
মুচকি হেসে জানতে চাইলো রাফিন।
শায়ন এবারও কিছু বলল না, হাসিটা
খানিকটা বিস্তৃতি পেল শুধু।
- বার্তাবাহক হিসেবে কবুতরের কোন
বিকল্প নেই, বুঝলে ভায়া?
হাসিমুখে জানলো রাফিন।
শায়ন কোমরে হাত দিল।
প্রায় সাথে সাথেই ট্রিগার চাপলো
রাফিন !!!
ক্লিক ! ক্লিক !!
কোন গুলি বের হলো না। রাফিন আশ্চর্য
হয়ে নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে
আছে। উত্তেজনায় আসলে রিভলবারে
গুলি আছে কিনা সে ব্যাপারটা সে
চেক করেই দেখেনি।
ততক্ষণে শায়নের মুখে শোভা পাচ্ছে
হাসি আর হাতে শোভা পাচ্ছে
রিভলবার।
দেরী না করে রাফিন উল্টো ঘুরে
দৌড় দিতে গিয়ে দেখে ১০ ফিট দূরে
দাঁড়িয়ে আছে তাসিন। তার হাতেও
বিদঘুটেদর্শন রিভলবার। রাফিন বুঝতে
পারলো যে সে ধরা পড়ে গেছে।
- তোমার ব্যাপারে এখানে আসার
আগেই আমি জানতে পেরেছি সব। এখন
বাকিরাও জানবে সব কারণ তোমার
হাতে ধরা আমার দেয়া
রিভলবারটাতে একটা ছোট্ট টেপ
রেকর্ডার আছে। তোমার ‘রেসিং
হোমার’ কবুতরটাই তোমার সর্বনাশ
করলো। আর তাছাড়া এতো
তাড়াতাড়ি তোমাকে কীভাবে
খুঁজে পেয়েছি সেটা দেখেও তোমার
কি একটুও সন্দেহ জাগেনি?
রাফিন কিচ্ছু বলছে না। শুধু তাকিয়ে
আছে শায়নের দিকে।
- দিকনির্দেশনা দিতে কবুতরের কোন
বিকল্প নেই, বুঝলে ভায়া?
রাফিনের দিকে তাকিয়ে মুচকি
হেসে চোখ টিপ দিয়ে বলল শায়ন।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now