বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

ম্যানর হাউসের বিভীষিকা-04

"উপন্যাস" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়াদুল ইসলাম রূপচাঁন (০ পয়েন্ট)

X ‘অ্যাঁই, কী আবোল-তাবোল বকছিস? আমাকে চিনতে পারছিস না?’ চমক ভাঙ্গলো সৈকতের ঘড়ঘড়ে গলায়। তাকিয়ে দেখি আমার বন্ধু সৈকত দাঁড়িয়ে আছে ঠিক যেখানটায় একটু আগে রহস্যময়ী এক রমণীকে দেখে তোতলাতে শুরু করেছিলাম। চারদিকের পরিবেশ এতক্ষণে কিঞ্চিত পরিবর্তিত হয়েছে – আলো-ছায়ার খেলাটা কমে হলরুমের মশালগুলোকে আলো ছড়াতে দেখা গেলো। সেই ধূসর আলোতে সৈকতকে একটু কি অন্যরকম দেখাচ্ছে? কিন্তু সেই ‘অন্যরকম’টা যে কীরকম, সেটা ঠিক বুঝে উঠা গেলো না। তবে সে যে ভীষণ অবাক হয়েছে এটা স্পষ্ট, একটু বিরক্তও নাকি? ‘কী ব্যাপার সেজান, বলা নেই কওয়া নেই, হঠাত কোত্থেকে উদয় হলি? আর ঢুকলিইবা কী করে? আমি তো তোকে আসতে দেখলাম না!’ ‘যাক বাবা, ডাকতে ডাকতে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছিলি। এখন এলাম তো উল্টো পিঠ দেখাচ্ছিস? আর দেখিস নি মানে কী? নিজেই তো ড্র-ব্রীজটা খুলে দিয়ে তামাশা দেখছিলি। এখন কি বলবি – সেটাও করিস নি!’ রাগ হতে থাকলো আমার। সৈকত মুখে একটা কিঞ্চিত উদ্বেগের ভাব ঝুলিয়ে রেখে, ‘ আহা, চটছিস কেন? আমি আসলেই বুঝতে পারছি না। সত্যি করে বলতো ভাই এলি কেমন করে?’ আমার ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেলো – ‘ দেখ, আমি খুব ক্লান্ত। একটু বসতে বলবি তো নাকি? তা না, তখন থেকে কী ছাই জেরা করে চলেছিস! এমন জানলে এই বিশ্রী জায়গায় তোর অসাধারণ(!) আতিথ্য গ্রহণ করার জন্য আসতাম কিনা সন্দেহ আছে।’ সৈকতের তেমন ভাবান্তর হলো না, কেমন নির্বিকার একটা ভাব, ‘ অ তাই বুঝি? তা চল, নীচে চল – অতিথি সৎকার করি।’ খানিক ব্যঙ্গের মত শোনাল কি? নীচে নেমে কাঠের বড় গোল টেবলখানা ঘিরে বেশ ক’খানা গদি আঁটা চেয়ার দেখতে পেলাম। ভুল হবার কথা নয়, বেশ মনে আছে ফাঁকা দেখেছিলাম। এখন দেখছি আছে। ভোজবাজী নাকি? সে যা হোক, একটা চেয়ারে ধপাস করে বসে পড়লাম। বিগত ক’টা ঘন্টা যা কাটলো না! বেশ অবসন্ন লাগছে। সৈকত কিন্তু আমার পাশে বসলো না; বসলো ঠিক আমার বিপরীতে। আর বসেই কেমন চোখ সরু করে চেয়ে রইল যেন নজর দিয়েই এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেবে। একটু ভয়ভয় করতে লাগলো। কিন্তু একে ভয় পাবার কী আছে – এ যে আমার বাল্যবন্ধু! তবুও ওর দৃষ্টিটাকে স্বাভাবিক বলা যায় না; আবার ঠিক অস্বাভাবিকও নয়। ওর পেছনেই মা-মেয়ের সেই অসম্ভব জীবন্ত পেইন্টিংটা। মনে হলো সর্বমোট তিনজন উৎসুক মুখে তাকিয়ে আছে! বাতাসে একটা প্রচণ্ড গুমোট ভাব – কী একটা না বলতে পারার আক্রোশে দম আটকে আছে। পরিবেশটা হাল্কা করা দরকার। আমি উদ্যোগী হলাম। একটা আধখানা হাসি ঝুলিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ কী রে অমন হোঁদল-কুতকুতের মত চেয়ে আছিস কেন? এসে কি মহাভারত অশুদ্ধ করে ফেললাম? বিপদে ফেললাম নাকি তোকে?’ ‘বিপদ? না, বিপদ নয়তো! তবে, খুব চমকে গেছি। এই ঝড়-জলের শীতের রাত্রে তোকে ঐভাবে বিড়বিড় করতে দেখে যে কেউই ভড়কে যাবে...তাছাড়া এমন একটা সময়ে...কী একটা বলতে গিয়েও বলে না। কেবল পিছু ফিরে পেইন্টিংটা এক ঝলক দেখে নেয়। আমিও দেখেও দেখলাম না। কৌতুকভরে চোখ নাচিয়ে, ‘ চমকে গেছিস বলছিস? আরে, এই জন্যই তো আসা – লুবনা কে তো জানিসই – খামোখা অমূলক সন্দেহ। একটা শিক্ষা দেবার জন্য ওকে একা রেখে এবার ভাবলাম তোর পোড়োবাড়িটাতে যাই না কেন? না জানিয়ে একেবারে সোজা গিয়ে হাজির হয়ে তোকে সারপ্রাইজ দেব। তা সত্যি কথা হলো গিয়ে এতক্ষণ আমিই চমক খাচ্ছিলাম। জঙ্গল, খানা-খন্দ পেরিয়ে কী ভয়ানক জায়গায় ডেরা গেড়েছিস হে?’ ‘আ..তু তুই ঐ জঙ্গলের ভেতর দিয়ে ঘুরে এসেছিস? সোজা পথে এলি না কেন? ওটা তো...আই মীন লোকে বলাবলি করে ওখানে রাত্রিরে গিয়ে কাউকে নাকি জলজ্যান্ত ফিরে আসতে দেখা যায় নি! তুই এলি কী করে? বেঁচে আছিস নাকি মরে ভূত হয়ে এসেছিস? ওখানে তো এডনার প্রেতা...’ ‘ধ্যাত, কী যা-তা বকছিস! তবে, ঘটনা কিছু ঘটেছে বৈকি। ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম বুঝলি। জান নিয়ে দৌড়তে গিয়ে মোবাইল, ব্যাগ সব খুইয়েছি। আর অবাক কাণ্ড কী জানিস – একটা বাচ্চা মেয়েকে আবছা দেখলাম ঐ কালিগোলা জঙ্গলটার মধ্যে – সবুজাভ চোখ অন্ধকারে যেন ধিকি ধিকি জ্বলছে।’ ঠিক ঐ সময়ে কোথাও একটা কড়াত শব্দে বাজ পড়লো। আলোর ঝলকানিতে পেইন্টিংটাতে চোখ পড়ে গেলে কোলের মেয়েটিকে ঝট করে চিনতে পারলাম – এ যে সেই জঙ্গলের বাচ্চাটি! বিস্ময়ে খানিকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলাম – মুখে কথা সরল না। কেবল অজানা একটা ভয় শিরদাঁড়া বরাবর হাঁটতে লাগলো। তারপর চেঁচিয়ে উঠে, ‘ সৈকত, এই যে এই পেইন্টিং –এর বাচ্চা-মেয়েটিকেই তো দেখেছি। কী আশ্চর্য!’ সৈকত উঠে দাঁড়িয়েছে। গদি আঁটা চেয়ারটা সশব্দে উল্টে পেছনে পড়ে গেলো। অল্প অল্প কাঁপছে। বিবর্ণ মুখে দু’চোখ যেন ঠিকরে বেরুচ্ছে। ওর দৃষ্টিটা ফলো করেই দেখতে পেলাম – ছবির সেই শিশুটি একবার পিছে তাকিয়ে ধুপধাপ শব্দে করিডোর ধরে দৌড়ে চলে গেলো। একটা শিশুসুলভ খিলখিল হাসি ঝড়-জলের শব্দ ছাপিয়ে গমগম করে উঠলো ম্যানর হাউসের বিশাল হলরুমটাতে। শব্দটা ধীরে ধীরে বেড়েই চলেছে। সৈকত কেমন ছটফট করে উঠে। তারপর ফিসফিস করে বলে ওঠে, ‘এডনা, দাঁড়াও। কোথাও যাবে না বলছি’ আর সাথে সাথেই সেও ছুটে বেড়িয়ে গেলো যেদিকে বাচ্চাটা চলে গেলো। আমি হতভম্ভ হয়ে সব স্লো-মোশন পিকচারের মত দেখে চলেছি। এইমাত্র হুঁশ ফিরে এলো যেন। সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। এডনা টি কে? সে যদি পেইন্টিং –এর শিশুটি হয়, তাহলে সে তো কম করে হলেও মধ্যযুগের...তাকে আমার খ্যাপাটে বন্ধু সৈকত চিনবে কী করে? এমন আকাশ-পাতাল ভাবছি...হঠাত দেখি হলঘরখানা আবার আগের সজ্জায় ফিরে গেছে – মশাল আর জ্বলছে না, তার বদলে ঐ প্রথম দেখা চর্বি পোড়ানো মোমটি হলদেটে আলো আবার বিলোতে আরম্ভ করেছে। কোথা থেকে একটা ক্ষীণ বাতাসের প্রবাহ শিখাটিকে থেকে থেকে দুলিয়ে চলেছে। আর তার আলোটা যেন গোত্তা খেতে থাকে লাইফ সাইজ তেলচিত্রটির প্রাচীন ক্যানভাসে। সেখানে একটি চরিত্র উধাও হয়ে গেছে। শিশুটি নেই; শুধু রমণীটি মোহনীয় ভঙ্গীতে হাসছে। আমার কেমন একটা ঘোরের মত হলো। যা দেখছি তা অবিশ্বাস্য! ছবির ভেতর দিয়ে একটা জলজ্যান্ত হাত বেড়িয়ে এসেছে। কাগজের মত সাদা অদ্ভুত পেলব আঙ্গুলগুলি; তর্জনীতে একটা মস্ত রক্ত রঙ্গা রুবী স্বল্প আলোতেও ঝিকিয়ে উঠলো। হাতটা এমন করে বাড়িয়ে দিয়েছে যেন কোনো সম্মানীয়া লেইডি কোনো গুণমুগ্ধ পুরুষের গদগদ সবল হাতের প্রতীক্ষায় – যে তাকে ছবির খাঁচা থেকে নামিয়ে আনবে। কোনো এক ব্যাখ্যাতীত কারণে নিজেকে গুনমুগ্ধ মনে হতে লাগলো। এগিয়ে গিয়ে হাতখানা আলতো ধরে ফেললাম। ছ্যাঁত করে ঠাণ্ডা লেগে গেলো – বরফ নাকি? কিন্তু মনে হলোঃ কিছুই তাতে যায় আসে না। ধীরে ধীরে ছবি ফুঁড়ে সেই রমণী বেড়িয়ে এলো। আশ্চর্য, এ তো ব্যাল্কনিতে দেখা সেই রমণী যাকে দেখে তোতলাতে শুরু করেছিলাম! মুখে সেই ভূবন ভোলানো মোহিনী হাসি। অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যত গুলে যেতে থাকলো। একটা তীব্র চুম্বকের প্রভাবে আমি যেন মোহাবিষ্ট এক টুকরো লৌহ খণ্ড! একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। চিরে ফেলা দৃষ্টি যেন এক লহমায় দেখে ফেললো সবকিছু। ঐ চোখে তাকিয়ে মনে হলো সে যেন নিঃশব্দে কথা বলছে। এলেনাহ ওঁর নাম – এই সিকল মুনের কর্ত্রী। ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো সে আরো কাছে। অসামান্য আবেদনে বাহুডোরে আচমকা বন্দী হয়ে গেলাম আমি। আমার একান্ত কাছে রাঙ্গা উলের জবরদস্তি খসখসানি – মনে হয় পাগল হয়ে যাচ্ছি। আমার মুখের খুব কাছে সেই অসামান্য সুন্দর দু’টি চোখ এবং একজোড়া কামনাতপ্ত ঠোঁট – অনাদিকালের তৃষ্ণায় একটু যেন ফাঁক হয়ে আছে। শিরায় শিরায় অসংযত ইচ্ছেরা বল্গাহীণ ঘোড়া ছুটিয়েছে – ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছি পঙ্কিলতায়। হঠাত কী হলো জানি না। অস্তিত্বের কোথায় যেন অকৃত্রিম ভালো মানুষ সেজান হাত নাড়তে থাকলো – জলে ডোবার আগে ডুবন্ত মানুষ যেমন ভেসে উঠতে চায়। ওতেই কাজ হলো। আমি বোধ করি কাণ্ডজ্ঞান ফিরে পেলাম। লুবনার কথা মনে পড়ে গেছে। হাতের ফাঁস ছাড়িয়ে নিলাম চট করে। এ যাত্রা বেঁচে গেলাম নাকি পাপের হাত থেকে? কিন্তু তাই কি? ছিটকে দূরে সরে গিয়ে ফুঁসছে এলেনাহ। অচিরেই সেখানে রাগ সরে গিয়ে একটা অদ্ভুত ক্রূর হাসি ফুটে উঠলো। আমার অন্তরাত্মা কেঁপে গেলো – এ হাসির মধ্যে চূড়ান্ত দখলদারিত্বের প্রত্যয় কিলবিল করতে থাকে। সভয়ে পেছোতে পেছোতে শেষে সৈকত যেদিকে গিয়েছিলো সেই অন্ধকার পথ ধরে ছুটতে থাকলাম। একবারে অন্ধের মত ছুটছি তো ছুটছি। আচ্ছা কত বড় এই বাড়িখানা? এতটা পথ কী করে থাকবে ওটার ভেতরে? এবারে থামা দরকার এবং প্রায় সাথে সাথেই একটা দেয়ালে হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেখে আন্দাজে বুঝলাম – একটা দরজা। ধাক্কা দিয়ে খুলে ফেলতেই ভক করে একটা বোঁটকা গন্ধ নাকে এলো। নাড়ি-ভুড়ি উল্টে গেলো প্রায়! তবুও পা বাড়ালাম এবং আশ্চর্য কোনো শক্ত কোনো ফুটিং পেলাম না! একেবারে মুক্তকচ্ছ হয়ে পড়তে থাকলাম। যে সময় আর বেগ নিয়ে পড়ছি তাতে বাঁচবার কোনো আশা থাকতে পারে না। মৃত্যু যেন সমানে হাত নাড়ছে! কী কুক্ষণে যে ম্যানর হাউসে আসতে গেছিলাম!!!


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৩১ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now