বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
দেয়াল ঘড়িটাতে টিক করে একটা শব্দ হলো। দুপুর একটা বাজল। এখনি পেটে ছুঁচোরা হালকা কেত্তন শুরু করে দিয়েছে। বেশ সুগন্ধে বাড়িটা ম ম করছে। আশ্চর্যের কথা হলো – প্রীতু পুরোপুরি স্পিকটি নট হয়ে গেলেও রান্নাটা কিন্তু ঠিকই করে যাচ্ছে! আর হলে সে সব বন্ধ করে দিয়ে মুখ ভার করে থাকতো। কিন্তু আজকে অন্য কারবার। কান পেতে শুনতে পেলো কি – গুনগুনিয়ে কী যেন গাইছে! এ অসম্ভব! বিয়ের চার বছরের মাথায়ও এই মেয়েটার ঠিক কূলকিনারা করে উঠতে পারলো না।
বাইরে বৃষ্টিটা ধরার নামই করছে না! সে বারান্দায় একটা ইজি চেয়ার পেতে একটা উপন্যাসের পাতা ওল্টাতে চেষ্টা করছে। কিন্তু মনটা ঠিক বসছে না। কী বিতিকিচ্ছিরি কাণ্ডটা হয়ে গেলো! মিথি কে দোষ দিয়ে কী লাভ? সব দোষই তার নিজের। সে কেনো ফেইসবুকটা খুলতে গেলো? অযাচিত ঝামেলা। নইলে আজকের এই দিনটাতে প্রীতুকে জ্বালিয়ে বেশ কাটিয়ে দেয়া যেতো।
এই এক রান্নাঘরেই তো কতবার হামলা চালাত! ভাবতে ভাবতে একটা দিনের কথা মনে পড়ে গেলো। ওরা তখন সবেমাত্র এই বাড়িতে উঠেছে। প্রীতুর পিঠেপিঠি বোন ইতু এসেছে ক’দিনের জন্য বেরিয়ে যেতে। প্রীতু আর ইতুর মধ্যে গড়নে বেশ মিল। সেদিন কী একটা রান্না হচ্ছিলো। তো যথারীতি শাহেদ ছোঁকছোঁক করছে রান্নাঘরের আশেপাশে। ঢুকেই যা করে আর কি – পেছন থেকে জাপটে ধরতে যাচ্ছিলো। হঠাত বুকে কাঠের কী একটা ঠুকল। মুখ তুলে তাকিয়ে দেখে এতো প্রীতু নয়, ইতু – পরণে প্রীতুর একটা শাড়ি। কাঠের ডাল-ঘুঁটনিটা নাচাতে নাচাতে, ‘কী হে দুলহা ব্রাদার, কী করা হচ্ছিলো?’ শাহেদ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে, ‘ অ্যা, তু-তুই? তোর আপা কোথায়? লক্ষী বোন, প্রীতুকে এ কথা বলিস না – আমাকে মেরেই ফেলবে, আর আজকে খেতেই দেবে না’
হঠাত অট্টহাসির একটা রোল উঠলো – একটি নয়, দু’টি কণ্ঠের। দরজায় প্রীতু দাঁড়ানো। ইতু বলে, ‘ দেখলি আপু, এই লোকটা খাওয়ার কথা তুলবেই তুলবে। বাজীতে তুই হেরে গেলি হা হা হা’ শাহেদের করুণ মুখটার দিকে তাকিয়ে হঠাত প্রীতু ধ্মকে ওঠে, ‘ ইতু, বেশি পাকামো করিস না। না হয় ও একটু খেতেই ভালোবাসে। তাই বলে এমন করে পঁচাবি? যা, ভাগ এখান থেকে’ ইতুও কম যায় না, ‘ যাহ বাবা, আসলে কী খেতে এত রান্নাঘরে আসে সে তো দেখতেই পেলাম! হি হি হি’ প্রীতুর টকটকে ফর্সা মুখ রাঙ্গা হয়ে ওঠে, ‘ দেখলে তো কেমন পাজি হয়েছে মেয়েটা! যা-তা বলছে’ মুচকি হাসতে হাসতে শাহেদ, ‘ ভুল তো কিছু বলে নি। দাও, পাওনাটা দিয়ে দাও – কেটে পড়ি’ কপট রাগে প্রীতু, ‘ তবে রে পেটু সাহেব, পেটে পেটে এতো শয়তানি! ভাগো, ভাগো এখান থেকে’ দু’জনই হাসতে থাকে...তারপর...
সুখের স্মৃতিগুলিই যেন কেমন! সেই কবেকার হাসিটা এইক্ষণে বৃষ্টির ছাঁটে ভেজা বারান্দায় বসে শাহেদ অনায়াসে হেসে ফেললো। ওদিকে জানালার ওপাশে শাহেদকে অমন একলা হাসতে দেখে প্রীতু দাঁড়িয়ে পড়েছিলো। হঠাত কী মনে করে শাহেদ ঘুরে সেদিকে তাকাতেই চোখাচোখি হয়ে যায়। দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নিয়ে প্রীতু অন্যদিকে চলে গেলো। তবে, যাবার আগে খুবই সরু এক চিলতে হাসি কি ছিলো ওর ঠোঁটে? নিশ্চিত হতে পারে না শাহেদ – চশমাটা কোলে রেখেই যে দিবাস্বপ্ন দেখছিলো! কী হচ্ছে এসব?
থাকুক, শাহেদ কিছুক্ষণ থাকুক ওর ঘোর নিয়ে। আমরা বরং ঘুরে আসি প্রীতুর মনোরাজ্য থেকে।
কচুর লতি দিয়ে ইলিশের মাথার চচ্চড়িটা চাখাতে প্রীতু এসেছিলো। অনেকক্ষণ হয়ে গেলো তবুও শাহেদের কোনো সাড়া-শব্দ নেই – ব্যাপারটা অবাক করার মত! করছে কী লোকটা? রুমে গিয়ে দেখল, দরজাটা ভেজানো। একটা গনগনে রাগ ঈশান কোণে খুব জোরে হাওয়া দিচ্ছে – আপাতত ৩ নং বিপদ সংকেত বাজছে। সন্তর্পণে ঢুকে বিগলিত শাহেদ কে ফেইসবুকে মিথির সাথে আবিষ্কার করে সেটা এক লাফে ৯ নং এ উঠে গেলো। ছি ছি, কীভাবে ও পারলো, ফাঁকি দিয়ে চোরের মত মিথির সাথে রসের কথোপকথন? আজকের এই দিনটাতে এই দেখবার বাকী ছিলো? রাগে-দুঃখে অনর্গল জল পড়তে থাকে।
চড়টা কষিয়ে এবং আরো দু’ একটা কটু কথা শুনিয়ে প্রীতু যখন চলে যাচ্ছিলো, তখন কোনো এক বিচিত্র কারণে শাহেদের হতবিহ্বল মুখটার জন্য বুকের কোথায় যেন টনটন করে উঠলো! কিন্তু, পরক্ষণেই সেটা ঝেড়ে ফেললো। কার জন্য সে এসব ভাবছে – প্রতারক কোথাকার! কত কী করবে, ভেবে রেখেছিলো – সব ভেস্তে যেতে বসেছে। তারপর, কী একটা ভেবে – হয়তো প্রতিশোধের স্পৃহায় প্রীতুর সুন্দর মুখটায় একটা ক্রর হাসি খেলে যায়! শাস্তি তোমাকে পেতেই হবে, শাহেদ – মনে মনে ভাবে প্রীতু।
অতঃপর ঘড়ির কাঁটাটা যখন একটার আশেপাশে, তখন জানালার গ্রীল গলে বারান্দায় একাকী বসে থাকে শাহেদের ঘোরলাগা হাসিমুখ দেখে পিত্তি জ্বলে গেলো! বেহায়া কোথাকার – কার সাথে কী ফষ্টি-নষ্টি করেছে, বোধহয় তাই বসে বসে জাবর কাটছে। পুরুষ জাতটাই হচ্ছে গিয়ে পিছল জীয়ল মাছের মত – কেবল হাতছাড়া হয়ে যেতে চায়! মিথির সাথে শাহেদের কথাগুলো আবার মনোশ্চোক্ষে ভেসে ওঠে। বুকটা আবার মুচড়ে উঠে। উফ, অসহ্য!!
চলেই যাচ্ছিলো, তখন দেখতে পেলো ঠাণ্ডায় জড়সড় হয়ে আছে শাহেদ – চশমাটা কোলে রেখেই যেন দিবাস্বপ্ন দেখছে! তারপর কী মনে করে একটা পাতলা কাঁথা বিনা বাক্য ব্যয়ে ছুঁড়ে দিয়ে যখন চলে যাচ্ছিলো, তখন খপ করে প্রীতুর হাতখানা ধরে ফেললো শাহেদ – ‘ প্রীতু?’ প্রীতু জবাব দেয় না। কেবল হাতখানা এক ঝটকায় সরিয়ে নিয়ে চলে যেতে চায়। শাহেদের রাগ হয়ে যায়, ‘ যদি আমার কথা না শোনো, আমি কিন্তু খাবই না কিছু আজকে!’ প্রীতু ঝামটে ওঠে, ‘আহ, আমার তাতে বয়েই গেলো! না খেলে না খাবে। তবু কথা বলতে এসো না’
প্রীতু চলে গেলে এইমাত্র আবেগের বশে করা চরম ভুলটা শাহেদ বুঝতে পারলো। খাবে না – এটা লাগানোর কী দরকার ছিলো? খাওয়ার সাথে মান-অভিমানের কী সম্পর্ক, অ্যাঁ? খাওয়া, খাওয়ার জায়গায় – আর অভিমান, অভিমানের জায়গায়। কিন্তু বড় দেরী হয়ে গেছে - নিজের নির্বুদ্ধিতায় হাত কামড়াতে ইচ্ছে হচ্ছে।
বেলা বেড়েছে বেশ। ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ করছে। প্রীতু এইমাত্র মাছ ভাজার প্লেটটা রাখলো। এই দূর থেকেও সে দিব্যি সদ্য ডুবো তেলে ভাজা মাছগুলির শনশনে মধুর শব্দ শুনতে পাচ্ছে। সাথে কুচি কুচি পেঁয়াজ ভাজা। দুঃখে শাহেদের চোখে প্রায় পানি চলে এলো। এখন আর কোনো উপায় নেই – বসে বসে নিজের দুর্ভাগ্য দেখো! সে না হয় বলেই ফেলেছে – খাবে না। তাই বলে প্রীতু কি একটু ইশারায় কিংবা পরোক্ষ বচনে বলতে পারতো না? সে ভালো করেই জানে শাহেদ ক্ষুধা সহ্য করতে পারে না। তার উপর আজকের এই এলাহী আয়োজন, ইলিশের রকমারি পদ ইত্যাদি ইত্যাদি!! অথচ, প্রীতুর কোনো বিকার নেই; গুনগুনিয়ে কী একটা গানও একটা ভাজছে! হঠাত সব পরিষ্কার হয়ে যায় – ‘অ, বুঝতে পেরেছি। এটাই বোধহয় আজকে আমার শাস্তি! আমাকে কষ্ট দিয়ে আনন্দ উদযাপন করা হচ্ছে। ইয়্যু, স্যডিস্ট লিটল উমেন! ঠিক আছে, একটা দিন না খেলে কী আর এমন হবে? মরে তো আর যাব না!’
দুঃখে, অভিমানে ক্লান্ত শাহেদ দু’চোখের পাতা এক করতেই ঘুমিয়ে গেলো! একটা স্বপ্ন দেখতে আরম্ভ করলো। স্বপ্নটা সুন্দর -ই ছিলো – প্রীতু মাছের কালিয়াটা নিয়ে শাহেদের সাথে বেশ জোরাজুরি করছে। শাহেদ না না করলেও প্রীতু উঠিয়ে দিচ্ছে। দু’জনেই বেশ হাসছে। বড় আনন্দঘন দৃশ্য! হঠাত কোত্থেকে জানি মিথিলা কাঠের চামচটা নাড়াতে নাড়াতে ওর মাথায় একটা চাটি বসিয়ে দিলো। কিংকর্তব্যবিমূঢ় শাহেদ মাথার চাঁদিতে হাত বুলাচ্ছে। উফ, স্বপ্নেও দস্যু রানি – অসহ্য হয়ে গেলো!
ধড়মড় করে জেগে উঠে শাহেদ কিছুই দেখতে পেলো না। দেখবে কী করে? কিছু বুঝে ওঠার আগেই চোখে একটা কালো কাপড় সেঁটে গেলো এবং তারপর চাপা গলায় হিসহিসে আদেশ – ‘চলো, ঘুমের মধ্যেও মিথি মিথি করতে হবে না’ এই আদেশ যে কোনো শান্তিপ্রিয় ব্যক্তি নির্দ্বিধায় মেনে নেবে। শাহেদেরও না মেনে উপায় নাই। তবু মিনমিনে গলায় একটা চেষ্টা, ‘ইয়ে প্রীতু, দুঃস্বপ্ন – তুমি যা ভাবছো, তা নয়’ প্রীতু ধ্মকে ওঠে, ‘চুপ!!’
কালো কাপড়টা সরিয়ে দিতেই শাহেদের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো। পুরো টেবল জুড়ে কত রকমারি পদ যে রেঁধেছে প্রীতু! তবে, সব ছাড়িয়ে একটা কেক আর তার একমাত্র রঙ্গিন মোমবাতিটা দেখে শাহেদ আশ্চর্য হয়ে গেলো। মনের আদাড়ে বাদাড়ে আঁতিপাঁতি ঘুরেও কোনো উপলক্ষ্য আবিষ্কার করতে পারলো না। অথচ প্রীতু কেমন উজ্জ্বল চোখে তাকিয়ে আছে। কিছুই বুঝছে না - সবটাই কি বড় কোনো কৌতুক? নাকি আরো কঠিন কোনো শাস্তির পাঁয়তারা?
বেলা অনেক হয়েছে। না খেয়ে ঘুমিয়ে থেকে ক্ষুধাটাও গেছে মরে। এখন আর কিছুই ভালোলাগছে না শাহেদের। তার উপর কোত্থেকে একটা অদ্ভুত অভিমান দানা বাঁধতে থাকে। কেকটা ঠেলে সরিয়ে দিয়ে, ‘এভাবে চলে না, প্রীতু!’ প্রীতু অবাক হয়ে, ‘কী চলে না?’
কেশে গলাটা পরিষ্কার করে শাহেদ, ‘তুমি আমাকে এতদিন পরেও বিশ্বাস করতে পারো না! এটা যে কী পরিমাণ লজ্জার এবং অসম্মানের, সেটা কি কখনো ভেবে দেখেছো? সম্পর্কের ভিত্তি পারস্পরিক বিশ্বাস। তোমার অযথা অমূলক সন্দেহ আমাকে কতটা খাটো করে, সেটা কোনোদিন ভেবে দেখারও ফুরসৎ পাওনি বোধহয়। ভালোবাসি বলেই এতদিন সব সহ্য করেছি, কিন্তু আর কত? আর কত দিন গেলে, আর কতটা নুয়ে পড়লে তোমার বিশ্বস্ততার কঠিন পরীক্ষায় পাশ করবো? এইসব আদর-আপ্যায়ন, আয়োজন – আমার এগুলির কিচ্ছু দরকার নাই। আমারও একটা স্বতন্ত্র জীবন থাকতেই পারে; সেখানের মানুষেরা, নানান ঘটনা আর বন্ধুরা – এরা কেউই ফেলনা নয়। এটা বুঝলেই না – বুঝতে চাওই না; খালি স্বার্থপরের মত নিজের কথা ভাবো! আমার, আমার আর কিছু চাই না, কেবল তুমি আমায় একটু বিশ্বাস করো...’
একটানে কথাগুলো বলে ফেলে শাহেদ যেন বহুদিন পর ভারমুক্ত হয়। খেয়াল করে না কখন প্রীতুর উজ্জ্বল চোখগুলি নিমেষে অকথ্য বিষাদে ছেয়ে যায়। আকস্মিক আক্রমণে দিশেহারা হয়ে প্রীতু কোনো জবাবই দিতে পারে না। তাল তাল কান্না দলা পাকিয়ে কণ্ঠরুদ্ধ করে ফেলে। তারপর একছুটে বেরিয়ে যায়।
যাক গে, আমার মান ভাঙ্গাতে বয়েই গেছে! আমার অভিমানও কম কীসের? - মনে মনে ভাবে শাহেদ। ঠিক তখনি ঝলমলে মোড়কে মোড়ানো গিফটের বাক্সটা নজরে পড়ে। ঢং কত? এটার আবার কী দরকার? নিতান্ত কৌতুহলে বাক্সটা খুলেই আকাশ থেকে পড়ে – একখানা প্রেগন্যান্সি টেস্ট কিট!!
নীল-সাদা কিটখানায় দু’টো বেগুনী দাগ। একটা গাঢ় – কন্ট্রোল দাগ, আর একটা হালকা – টেস্ট দাগ। পজিটিভ রিজাল্ট! প্রথমটায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেও সহসা একটা তীব্র আনন্দে শাহেদের মুখ উজ্জ্বল হয়ে যায়। সব রাগ নিমেষে জল হয়ে গেলো। সে যে বাবা হতে চলেছে! উফ! এ আনন্দ রাখে কোথায়? তারপর প্রীতুকে খুঁজতে বেরিয়ে গেলো।
বেডরুমের আলতো ভেজানো দরজাটা সরিয়ে দিতেই প্রীতুর হালকা ফোঁপানির শব্দ কানে এলো শাহেদের। খোলা জানালাটার গ্রীলটা আঁকড়ে ধরে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে প্রীতু – কাঁদছে। নিজেকে বড্ড পাষণ্ড মনে হলো – কড়া কথাগুলি না ওভাবে শোনালেও চলত। ভেতরের খবর তো উভয়েই জানে, তবুও কেন যে এসব ছাতামাথা বলতে গেলো! খুব মৃদুস্বরে ডাকল – প্রীতু! কোনো জবাব এলো না!
শাহেদ খুব সন্তর্পণে হাতটা রাখলো প্রীতুলার সুডৌল বাহুতে, ‘তুমি কাঁদছো? আ-আমাকে ক্ষমা করে দাও, জান। আমি লোকটা মোটেও সুবিধার নই, কেমন দুম করে তোমায় কষ্ট দিয়ে ফেললাম’ প্রীতু ফুঁসে উঠে হাতটা ছাড়িয়ে নেয়। তারপর, ‘ খবরদার আমাকে ছোঁবে না, আমি কে তোমার? কাঁদবো কেন? আমি তো স্বার্থপর। খালি নিজের কথাই ভাবি। কখনো কারো কথা ভাবি নি। কাউকে ভালোবাসিনি। কত কষ্ট করে সারাটা দিন খরচ করে রান্নাবান্না করলাম, চমকে দেবো বলে কত প্ল্যান করলাম। না, এসব তো তুচ্ছ! এসব বুঝবে কেন? মিথিলারাই তোমার কাছে বড় – আমি কেউ না, কেউ না’ হু হু করে কেঁদে ওঠে প্রীতু।
শাহেদ বিচলিত হয়ে পড়ে। শেষে প্রীতুকে ঘুরিয়ে নিয়ে ওর মুখখানা দু’হাতে নিয়ে অপলক চেয়ে থাকে। দেখাই হয় নি – কী সুন্দর সেজেছে প্রীতু! হালকা কাজল টানা চোখে অভিমানতপ্ত জলের বান ডেকেছে। হালকা কালো অশ্রুজলের রেখাটা কপোল বেয়ে ভরাট ঠোঁটের সঙ্গমে এসে মিশেছে! সেদিকে তাকিয়ে নিজেকে ধন্য মনে হয়। স্রষ্টাকে ধন্যবাদ দেয় এই অদ্ভুত মেয়েটাকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পাইয়ে দেবার জন্য। তারপর বুকে টেনে নেয়। প্রীতু অবশ্য হাত-পা ছুঁড়ে প্রতিবাদ জানাতে থাকে। কিন্তু শাহেদের সবল বাহুডোরে সেই প্রতিবাদ ধোপে টেকে না। কোনো কথা হয় না। বলবার দরকারই নেই! দু’টো অভিমানী সত্ত্বা হৃদয়বলের প্রাচীন অফেরতা পাল্লায় আটকে যায়। সেখানে শব্দ, গন্ধ, বর্ণ - সব, সব একাকার হয়ে যায়। শুধু একাত্মতার চেতনা বিহ্বল হয়ে ভাসতে থাকে। প্রীতু শাহেদের বুকে মুখ লুকায়।
এই, এইখানে আপনারা একটু যতি দিন তো! ওদেরকে একটু একলা থাকতে দেই। দিয়েছেন? বাহ, বেশ ভালো। এখন চলুন দেখি ওরা কী করছে?
প্রীতু এখনও শাহেদের বুকেই আছে। শাহেদ মুখটা নামিয়ে প্রীতুর কানের কাছে, ‘অভিনন্দন এবং ধন্যবাদ। ওহ, আমি বাবা হতে যাচ্ছি। কী ভয়ানক মেয়ে তুমি? বল, কী চাও?’ শাহেদের চোখে অর্থপূর্ণ ইশারা! প্রীতু ছিটকে গিয়ে হঠাত ব্যস্ত হয়ে পড়ে, ‘আমার কিছু চাই না! ওহ, কত বেলা হয়ে গেছে – এসো, খাবে কিছু। তোমার পছন্দের কত কী করলাম...’
‘এই, কথা ঘোরাবে না। সত্যিই কিছু চাও না?’ প্রীতুর বিপজ্জনক কাছে এসে ঘেঁষে শাহেদ।
‘না, চাই না কিছু, অসভ্য!’
‘মিথ্যুক’
‘পেটুক!’ এবং প্রীতুর অসহায় আত্ম-সমর্পন!
অবশ্য আপনাদের এই দুঃখে জল ফেলার দরকার নেই!
এই তো অনেক হয়েছে। এখন আপনারা কাটুন তো! আর কী চান? হা হা হা।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now