বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
কোন এক প্রচন্ড অদ্ভুত মায়াময় সন্ধ্যার কথা। আকাশে ফকফকা চাঁদ। ছয়তালা বাসার ছাদের উপর
দাঁড়িয়ে জ্যোৎস্না দেখছি। আমার ধারণা সেদিনের জ্যোৎস্না ছিল আমার দেখা সবচেয়ে তীব্র জ্যোৎস্না! এর আগে পরে আমি কখনও এত তীব্র জ্যোৎস্না দেখি নি! কতটা তীব্র জ্যোৎস্না বলি। আমার ধারণা সেখানে হুমায়ুন স্যারের কোন বই আনলে অনায়াসে পড়া যাবে। হুমায়ুন কেন আসল সেটা বোধ করি আমার রূপা জানে।
সেদিনের সন্ধ্যাটা একটু তীব্র মায়াময়ই। ঝিরঝির হাওয়া, বাতাসে অদ্ভুত একটা সুন্দর গন্ধ। কিসের গন্ধ ছিল আমি জানি না। কিন্তু বাতাসটা কেমন জানি ছিল! এমন অদ্ভুত বাতাস আমি জীবনে কখনও টের পাই নি। ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়ায়ে আছি। চিরপরিচিত ছাদ কিন্তু একেবারেই অচেনা পরিবেশ। একদম অচেনা। আমি মোবাইল হাতে নিয়ে দাঁড়ায়ে আছি। কি মনে করে যেন হঠাত রূপাকে একটা ফোন দিতে ইচ্ছে হল। রূপা আমার বান্ধুবী। আমরা এক সাথে পড়ি। পড়ি বললে কি ঠিক হবে? পড়তাম। সে যাই হোক, রূপাকে জীবনে প্রথমবারের মত ফোন দিলাম। সত্যি কথা বলতে কোন কারণ ছাড়া কোন মেয়েকে জীবনে প্রথমবারের মতন ফোন দিলাম। কি এক অদ্ভুত অপেক্ষাময় সময়! মাত্র চারবার রিং হতেই তুই ফোন ধরলি। যখন ফোনটা ধরলি কি যে এক অদ্ভুত শিহরণ! বোঝাতে পারব না। সে যাই হোক, এক কথা দুই কথা বলতে বলতে ঠিক চার মিনিট আটত্রিশ সেকেন্ড কথা হল। কি কথা হল মাঝে মাঝে স্পষ্ট কানে বাজে। যখন ফোনটা ছাড়লি গায়ে যেন পুরো কাটা দিয়ে উঠছিল। ঠিক তার পরেও অনেকটা সময় ফোন কানে নিয়ে বসে ছিলাম! জ্যোৎস্না মাখা আলো আধারে ঘেরা পরিবেশটাকে কিরকম যেন লাগছিল। মনে হচ্ছিল সব কিছুই তোর জন্য সৃষ্টি হয়েছিল। সব কিছু। বিশ্বাস কর, চোখ বন্ধ করলে আমি এখনও সেই সময়টাকে স্পষ্ট দেখতে পাই।
এক সাথে ক্লাস করলে অনেক সময়ই অনেক কথা হয় বা হওয়াটা স্বাভাবিক। তুই জানতিস আমি মেয়েদের সাথে খুব কম কথা বলি। তাই তোর সাথেও কম কথাই বলা হয়েছিল। আর তাছাড়া তুই সবার মধ্যমণি ছিলি বলে সব সময় তোর বান্ধুবী দ্বারাই পরিবেষ্টিত থাকতি। তাই হয়ত তোর সামনে গিয়ে তোর সাথে কথা হত না। তুই যখন কাছে এসে কথা বলতি কিংবা যখন ফ্রি থাকতি কেবল মাত্র তখনি আমাদের কথা বার্তা হত। একেবারেই বন্ধু সুলভ কথা। বন্ধুর বাইরে তো একটা কথাও না। জানিস, তুই যেদিন আমার কাছে প্রথম কোন গল্পের বই পড়তে চেয়েছিলি কি ভালটাই না লেগেছিলি। একদিন মনে হত বাসার সব গল্পের বই এনে এনে তোকে পড়তে দিই। হয়ত দিয়েছিও অনেক। চোখ বন্ধ করলে আমি সব কিছু স্পষ্ট দেখতে পাই। তুই আমার পাশে দাঁড়ায়ে আছিস আর আমি তোকে গল্পের বই দিচ্ছি! আমি জানি, তুই আমাকে বন্ধুর চেয়ে বেশি কোনদিন কিছু ভাবিস নি। আমার মত অতি তুচ্ছ একটা মানুষকে কেউ কিছু ভাববে না সেটা আমি ভাবিও না। কিন্তু কে জানে তোর প্রতি আমার অন্য রকম একটা এক্সপেক্টেশন ছিল বোধ হয়। হয়ত আমার মত তুচ্ছ একটা জীবকে তুই তুচ্ছ ভাববি না। হয়ত আপন করে নিবি মনের মাধুরী মিশিয়ে। এত কিছু যে কেন কিভাবে ভেবেছিলাম কে জানে। কি হাস্যকর চিন্তা ভাবনা বল। যাই হোক, মনে আছে প্রথম সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা দিতে বহু দেরী করে এক্সাম হলে এসেছিলাম। এক্সাম শেষ হয়ে বের হতে না হতেই তোর এসএমএস। কি ঝাড়ি দিয়ে বললি, কেন এক্সাম হলে দেরীতে এসেছি। জানিস, মোবাইল চেঞ্জের সাথে সাথে এসএমএস ডিলিট হয়ে গেছে কিন্তু মনের চিলেকোঠায় সেই এসএমএসটা আজও আটকে আছে। সারাটা জীবন যদি এমন করে ঝাড়ি দিতি খুব কি কষ্ট হত?? হা হা। কি হাস্যকর পাগলামী মার্কা চিন্তা ভাবনা আমার।
আচ্ছা রূপা বল তো, তোর সাথে আমার কোনদিন হাতে হাত রেখে ঘোড়া হয় নি। একই রিকশাতেও চড়া হয় নি। রাত জাগা জোনাক পোকার মত আমাদের মোবাইল ফোনে গল্পও করা হয় নি। তাও তোর প্রতি আমার এত মায়া কোথা থেকে আসল বল তো? চোখ বন্ধ করলে তোর মুখের হাসিই দেখতে পেতাম। তোর ঘাড় বেয়ে নেমে আসা খোলা চুলের অরণ্যে কতবার হারিয়েছি সে খবর আমার ঈশ্বর জানেন। ক্লাসের ফাঁকে কতবার তোর দিকে চেয়েছিলাম সেটা আর নাই বা বলি। চোখ বন্ধ করলে তোর আধো আধো পাগলামীগুলোই চোখে ভেসে উঠত।
রূপা, তুই কি জানিস তোর জন্য ফেসবুকে এসে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতাম। কখন আসবি সেটা জানার জন্য কি অপেক্ষা। আমাদের মধ্যে বেশিরভাগ কথাই হয়েছিল ফেবুর ম্যাসেজে। কি হাস্যকর কথা। বাস্তবের সবচেয়ে পরিচিত মানুষের সাথে ভার্চুয়েল জগতে কথা! সব কিছুর ডেফিনেশন আছে কিন্তু এগুলা কি হাস্যকরই না ছিল!! রূপা নামের মেয়েটা ক্লাসের সবচেয়ে প্রথম বেঞ্চে বসত আর আমি ক্লাসের সবচেয়ে পিছনের বেঞ্চে! ক্লাস লেকচার তোলার ফাঁকে ফাঁকে কতবারই না আলতো করে তোর মুখের দিক তাকায়ে থাকা হত! ভাগ্যিস, আমি সেমিস্টার ড্রপ খেয়েছিলাম! এখন আর তোর সাথে ক্লাস করতে হয় না। তুইও বেঁচে গেছিস। তোর অগোচরে কেউ আর তোর দিকে তাকায় না। কিংবা ঢাকা শহরে গ্রামীণ পরিবহনের সেই ছোট্ট বাসটির দিকেও গভীর আশা নিয়ে তাকায় না যে বাসে করে তুই ভার্সিটি যাতায়াত করতি। জানিস, ক্লাস শেষ করে বাসায় ফেরার সময় রাস্তায় যতগুলো গ্রামীণ বাস দেখতাম হা করে তাকায়ে থাকতাম। যদি অনেকগুলো বাসের কোন একটিতে করে তুই বাসায় যাস তাহলেই তো তোকে দেখতে পাব!! কি পাগলামিই না ছিল বল।
রূপা, জানিস ইউনিতে উঠার পর একটা এক্সামও তোর ছবি দেখা ছাড়া দিতাম না। প্রত্যেক এক্সামের আগে তোর ছবি দেখে এক্সাম দিতে যেতাম। আমার ল্যাপটপের ওয়াল পেপারে শুধু তোরই ছবি ছিল।
ও ভাল কথা, কোন এক ভয়ঙ্কর মন খারাপ করা বিকেলে প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছিল। আকাশ ডেকে যাচ্ছিল তারস্বরে। কি নিঃসঙ্গটাই না লাগছিল তখন। আমার ছোট্ট মন খারাপ করা ঝুলবারান্দাটায় দাঁড়িয়ে যখন আকাশে ভেসে বেড়ানো নিকষ কালো মেঘদল গুলোকে দেখছিলাম মনে হচ্ছিল আমি বুঝি তোর সাথে ঝুম বৃষ্টিতে হেটে যাচ্ছিলাম। হঠাত মনে হল কিছু লিখে ফেলি। সাথে সাথে বসে একটা গল্প লিখে ফেললাম। বিশ্বাস কর, সেদিনের আগ পর্যন্ত আমি জানতাম না আমি কিছু লিখতে পারি। একদিন এই ফেসবুকের যুগে ফেসবুকের পেজে একটা গল্প লিখে দিয়ে দিলাম। অবশ্যই সেটা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দিয়ে। মানুষ গল্প পড়ল। কেউ কেউ ভাল বলল, কেউ বা বলল ফালতু। আমার কিছু যায় আসে না। আমি কি লেখক নাকি! কিন্তু সেই লেখায় যখন তুই কমেন্ট করলি তখন আমার আর খুশিতে আত্মহারা হয়ে যেতে ইচ্ছে করল। যাকে নিয়ে লেখা লিখেছি সে পড়েছে। জানিস, সেদিনের মত আনন্দ আমি জীবনে কোনদিনই পাই নি।
তারপর থেকে যখনই তোর কথা মনে হত তখনি গল্প লিখে ফেলতাম। কিছু দিতাম ফেবুর পেজে কিছু ব্লগে। আর বাকিগুলো রেখে দিতাম আমার ডায়েরিতে। আমি লেখক না কাজেই আমার লেখা তেমন ভাল কিছুও না। হয়ত কেউ কেউ ভুলে পড়ে ফেলত। হয়ত বা মনের অজান্তে ভাল বলত! আমার কোন বন্ধু ছিল না। এখনও নেই। একটা চরম নিঃসঙ্গ মানুষের বন্ধু হতে পারে তার লেখা গল্পের চরিত্রগুলো। আমার পরিচিত মানুষের কেউই জানে না আমি লিখালিখি করতাম। কেউ না। হয়ত দুই একটা ছাইপাশ গল্প আমার নামে পেজে দেখে জানত আমি লিখি! রূপা জানিস, এক সময় প্রচন্ড একাকীত্ব নিয়ে তোকে মিস করে গল্প লিখে যেতাম আর ভাবতাম জীবনে যখন একদিন ম্যাচিউরিটি আসবে তখন তোকে আমার ভালবাসার কথা বলব। তুই আমাকে ফিরিয়ে দিবি না।
দেখতে দেখতে দুইটা বছর কেটে গেল। সেকেন্ড ইয়ার সেমিস্টার ফাইনাল দিয়ে কেন যেন মনে হল রেসাল্ট খুব খারাপ হবে। আমি হয়ত সেমিস্টার ড্রপ খাব। হলে থাকত ভাল লাগত না বলে বাসায়ই থাকতাম। তুই জানিস আমি তোর পুরো উলটা ক্যারেক্টার। আমি একদমই ইন্ট্রোভার্ট। হয়ত সেই সময় হলে থাকলে এক্সামে পাশ করে যেতাম। যাই হোক, একদম ভাল লাগত না বাবা মাকে ছাড়া তাই হলে আসা হয় নি। সেই সময় মনে হল আমার লাইফের একটা খুঁটি থাকা দরকার। যাকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকতে পারব। যে আমাকে পৃথিবীর সব হতাশা থেকে বাঁচিয়ে রাখবে। যদি সত্যিই সত্যিই সেমিস্টার ড্রপ করি তাহলে তো লজ্জাতেই আর বাসায় থাকতে পারব না। আর যেই মা আমাকে প্রতিদিন মুখে তুলে ভাত খাইয়ে দিত, ভার্সিটি যাওয়ার আগে ড্রেস গুছিয়ে দিত হয়ত বা তাকে ছাড়াই আমার থাকতে হবে। বাবা মার একমাত্র ছেলে হলে যা হয় আর কি! কাপড় ধুয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে সব সব কিছুই মা করে দিত! যদি পরীক্ষায় খারাপ করি তাহলে সব কিছু দূরে চলে যেতে হবে। তখন আমি থাকব কিভাবে? আমি পারব না একটা দিনও বেঁচে থাকতে।
রূপা জানিস, ভার্সিটিতে যাওয়ার সময় আমার আব্বু আমাকে সব সময় বাসে তুলে দিত। কি হাস্যকর না বল? এসব কিছু থেকে দূরে সড়ে গিয়ে বেঁচে থাকা একটা মুহুর্ত আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। ঠিক সেই সময় মনে হল তুই আমার পাশে থাকলে সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে। তাই স্বার্থপরের মতন তখন তোর হাত ধরতে চেয়েছিলাম। একেবারে স্বার্থপরের মতন। দোস্ত, আমি দুনিয়ার সবচেয়ে বড় সেলফিশ। যদিও আমি জানতাম তুই আমার চেয়ে সহস্রগুণ ভাল ছেলে ডিসার্ভ করিস, তাও। একেবারে সেলফিশের মতন তোর হাত ধরতে চেয়েছিলাম শুধু মাত্র বেঁচে থাকার জন্য।
রূপা, তুই যখন আমাকে ফিরিয়ে দিলি প্রথমে আমার মনে হয়েছিল এটাই স্বাভাবিক।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now