বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
আজ তিনদিন হলো সাইকেলটা অসহযোগিতা করছে ,রোদে রোদে পায়ে হেঁটে বাড়ি বাড়ি দুধ নিয়ে যেতে বিনয়ের ভীষণ কষ্ট হচ্ছে ।গরমটাও পড়েছে খুব ,একেবারে হাঁসফাঁস অবস্থা ।
কলেজের আজ লাস্ট পরীক্ষা ,কোনোরকমে পরীক্ষাটা দিলেই ওর ছুটি তারপর ও মুক্তবিহঙ্গ ।
পরীক্ষা আছে বলে মা আজ তাড়াতাড়ি ভাতে ভাতে করে দিয়েছে।কলমি শাকও করেছে ,শাকের যাত্রা নাকি শুভ ।
বাবা বলছে ,এবার নিজের কিছু একটা গতি করো ,অনেক কষ্ট করে ডোবার ধারে জমিটা বেচে লেখা পড়া শিখিয়েছি,সেটা কি আমার মতো বাড়ি বাড়ি দুধ বিলি করার জন্য ?
বিনয় একমনে খেয়ে চলেছে মাথা নিচু করে ।বাবা জানে না এখন আর পাসকোর্স -এ গ্রাজুয়াসেশন করে কোনো চাকরি পাওয়া যায় না ।
কলেজে ঢুকতেই মালবিকার সাথে দেখা ।এগিয়ে এসে হাসতে হাসতে জিজ্ঞাসা করলো ,পরীক্ষার পড়া কিছু করেছো নাকি সারারাত শুধুই ভাবনার সমুদ্রেই ভেসেছো ?
কথা বলতে বলতেই এগোলো পরীক্ষা হলের দিকে । বিনয় জানে মালবিকার মনে একটা ছোট্ট জায়গা আছে ওর জন্য ।
কে জানে ওর জন্য না ওর কবিতার জন্য?
কলেজ শেষ করে বিনয় ঠিক কি করবে সেটাই জানতে চাইছিল মালবিকা ।ইলেক্ট্রনিক্সের বিশাল শো- রুম আছে ওর বাবার ,বাবাকে বলে বিনয়ের একটা ভদ্র চাকুরীর ব্যবস্থা করে দিতেই পারে ও ,সেটা আকারে -ইঙ্গিতে বলেছেও মাঝে সাঝে ।
সন্ধ্যেবেলায় সবার অলক্ষ্যে বিনয় রোজ নিয়ে বসে ওর প্রাণের রসদ লাল মলাটের খাতাটাকে ।
বৃষ্টির টুপটাপ ,শিশিরের নিশ্চুপ পতন ,আকাশের অভিমান ,সূর্যের ক্রোধ , রাত পরীদের গান আরো কত কি ধরে রেখেছে এই খাতা ।কত কত কবিতা কথা বলে চলেছে নিয়ত ওর সাথে ,হৃদয়ের গভীরে কত রঙের আঁকিবুকি কেটে চলেছে প্রতি মুহূর্তে ,তার খবর কেউ রাখে না ,মালবিকাও নয় ।এই কবিতা গুলোর একছত্র অধিকার বিনয়ের , এগুলো ওর একান্ত নিজের ।
অনুপমদা বলেছে একবার নিয়ে যাবে " হৃদয়ের কথায়", পাবলিসার নাকি ওর চেনা ।বিনয় আজ যাবে অনুপমদার কাছে ওর লাল মলাটের খাতাটা নিয়ে ।
একটা বেশ নীলকভারের ডায়রী হলে ভালো হতো ,এই দোকানের
হিসাব লেখার মতো খাতা দেখে কি কিছু ভাববে ? মনে একটু সংশয় রয়েছে বিনয়ের তবে ও নিশ্চিত জানে এই খাতার মধ্যে ও যে লাইনের পর লাইনের মায়াজাল সৃষ্টি করেছে তা নিয়ে ওর শুধুই অহংকার আছে ,কোনো কুন্ঠা নেই ।
গরুর দুধ দোয়া সকাল ৫ টার মধ্যেই বাবা শেষ করে ,তারপর ও লোকের বাড়ি বাড়ি বিলি করে ।আজকাল প্যাকেট দুধের জোগান বেড়ে যাওয়ায় গরুর দুধের চাহিদাও কমেছে ।
সাথে সাথে পড়েছে বিনয়দের অবস্থাও আর বেড়েছে বাবার মেজাজ ।
বিনয়ের এত কথা ভাবার অবকাশ নেই ,বাবার গালাগাল আর মায়ের আক্ষেপ ওর এখন গা সওয়া হয়েগেছে ।
কলেজের ম্যাগাজিনে প্রথম যেবার ওর কবিতা প্রকাশ পেলো সেদিন ওর গায়ের মলিন জামাটাও ঝকঝক করছিল, বোধহয় আনন্দের আতিশয্যে ।সকলের প্রশংসায় বিনয় তখন উদ্ভাসিত ।
মালবিকার সাথে সেদিনই পরিচয়।খুব স্মার্ট ভাবে এসে বলেছিল কবিতাটা নাকি ও ধার নিতে চায় আবৃত্তি করার জন্য ।
আজ সিঁদুরে আকাশটাকে দেখে বিনয়ের বহু আগের সেই লেখাটার কথা মনে পড়ে গেল ।
অনুপমদার সাথে ' হৃদয়ের কথা' প্রকাশন থেকে ফিরে এসে মন খারাপ হয়েগেছে বিনয়ের।প্রকাশক পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন এসব অলস কবিতা বাজারে কেউ খাবেনা, কিছু চটপটা ,রগরগে লিখুন ।
মাথাটা টিপটিপ করছিল ওর ,কষ্ট হচ্ছিল কবিতা সম্পর্কে এই ধরণের বিশেষণ শুনে ।
বাবার আজ শরীরটা ভীষণ খারাপ ,তাই বাবার সকালের কাজগুলো ও নিজেই করছিল ।হঠাৎ তাকিয়ে দেখে মালবিকা একটা গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে আসছে ওর বাড়ির দিকে ।
ওকে গোয়ালে গরুদের পরিচর্যা করতে দেখে হতবাক মালবিকা।বোধহয় মেলাচ্ছে কলেজের কবিতা পাগল বিনয়কে । অনেক অনুরোধেও বাড়ির ভিতরে গেল না ও ।বিনয়ের মনে হলো যেন চিরবিদায় জানিয়ে চলে গেল মালবিকা ।
মনখারাপের পারদ বেড়েই চলেছে বিনয়ের ।প্রকাশকদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে ঘুরে জুতোর সুকতলা ক্ষয়ে গেলেও কিছু হবে না ,
প্রকাশ পাবে না ওর লাল মলাটের খাতার উজাড় করা আবেগ ।পরীক্ষার রেজাল্টও খুব ভালো হবে না ও জানে ।
কাল সন্ধ্যে বেলায় সাহস করে একটা বড় প্রকাশনীতে জমা দিয়েছে ওর রাতজেগে ক্লান্ত চোখে লেখা অনুভূতিদের ।ওর কবিতারা স্বয়ংসম্পূর্ণ ,নিজেরাই ব্যক্ত করে নিজেদের কান্না -হাসি ,সুখ- দুঃখকে , যেটা বিনয় নিজে পারে না ।
অবশেষে খবর পেলো বিনয় ।অবিশ্বাস আর আনন্দে মুখের চেহারা তখন অবর্ণনীয় । ' ভোরের পাখি' নামে ওই নামী প্রকাশনী প্রকাশ করতে চলেছে ওর লাল মলাটের খাতার অনুভূতি আর উপলব্ধিদের ,অবশেষে প্রকাশ পেতে চলেছে বিনয় হালদারের কবিতা সংকলন।
কিছুতেই যেন নিশ্ছিদ্র আনন্দ জোটে না ওর কপালে ।আজই ওর স্বপ্নগুলোর বাস্তবে প্রকাশ আর আজই কিনা কলেজের রেজাল্ট আউট ।
প্রথমে কলেজে গেল বিনয় ,যদিও রেজাল্ট নিয়ে ও মোটেও আশাবাদী নয় ,তবু আজকের মতো শুভদিনে বাড়িতে অশান্তি হোক ও চায়না ,তাই ভালোয় ভালোয় পাশটা করে গেলেই বাঁচে ।তারপর ছুটবে 'ভোরের পাখিতে' ।মালবিকা এগিয়ে এসে বললো রেজাল্টটা আরেকটু ভালো হতো হয়তো যদি কবি না হতে ।
ওর এসব কথা গা সওয়া হয়ে গেছে ।
না ,দিলো ও আজকের আনন্দের খবরটা মালবিকাকে ।
'ভোরের পাখির' অফিসে থেকে যখন বেরোচ্ছে বিনয় তখন ওর হাতে কবিতা সংকলন
'নীল নির্জনে'
কবি বিনয় হালদার - এর
কয়েকটা কপি, একটা খামে কিছু টাকা আর পরের সংকলনের কবিতা লেখার উদ্যম ।
আজ মেট্রো দিয়ে বাড়ি ফিরবে ও ।বাবার হাতে টাকাটা দেবে ,মায়ের হাতে বই ,রেজাল্টটা না হয় উৎসর্গ করবে ওদের গোয়ালের গরুগুলোকে ।আপন মনে হাসছে বিনয় ...
রাস্তার লোক চিৎকার করছে বেঁচে আছে না মরে গেছে ।একটা গাড়ীর ধাক্কায় বিনয় তখন কাতরাচ্ছে ।বোধহয় বাঁচবে না মেরুদণ্ডে লেগেছে , পথ চলতি বিশেষজ্ঞের উক্তি ।
হাতের বই থেকে একটা খবর বোধহয় সবাই জানবে - * পথ দুর্ঘটনায় কবি বিনয় হালদারের মৃত্যু ।*
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now