বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
যখন তুলির ১০ বছর বয়স , তখন ওদের স্কুলে বিভূতিভূষণ এর জন্মদিন উপলখ্যে একটা সিনেমা দেখানো হয়েছিল.. 'পথের পাঁচালি'... অপু আর দুর্গার গল্প ,.. তুলি সাধারণ জ্ঞান বই এ অনেক বার পরেছিল ,'পথের পাঁচালির' জন্য সত্যজিত রায় প্রথম ভারতীয় যিনি অস্কার পেয়েছিলেন .. কিন্তু উত্তরটার মানে ও কখনো আলাদা করে বোঝেনি .. স্বাভাবিক, বোঝার বয়স ও ওর ছিল না .. তবে যেইদিন 'পথের পাঁচালি' সিনেমাটা দেখল, চোখের জল ধরে রাখতে পারল না... অপু দুর্গার সাথে যেন ও নিজেও কোথাও একটা জড়িয়ে গেল ... আর সেইদিন থেকেই শুরু হলো তুলির সিনেমার প্রতি একটা অদ্ভুত ভালোবাসা....
বাংলা , হিন্দি, ইংলিশ, তামিল , তেলেগু , মারাঠি সব ভাষার সিনেমাই যেন ওকে টানে .. ও যখন হাঁ করে টি.ভির সামনে তামিল সিনেমার দিকে তাকিয়ে বসে থাকে, ওর বাড়ির লোকেরা অবাক, "কি রে তুলি ? ওই রকম হা করে কি দেখছিস ? এনডেরা ম্যান্দেরা কি সব বলছে , বুঝিস কিছু ?"...... তুলি তখন এক কথায় উত্তর দেয় , " আরে বাবা, ভাষা আলাদা তো কি হয়েছে, সুখ দুঃখ গুলো তো এক... সেই গুলোর সাথে কনেক্ট করতে পারলেই সিনেমাটার সাথেও কনেক্ট করতে পারবে ......".... বাড়ির লোকের যদিও কথাটা মাথার ওপর দিয়েই চলে যায় !.....
আসলে তুলি ভালোবাসে কল্পনাকে... গল্পকে.. আর সিনেমা ওর কাছে এমন একটা জায়গা যেখানে জীবনের সেই ছোট ছোট মুহূর্ত, গল্পগুলো কয়েকটা সিন দিয়ে সাজিয়ে দেয়া হয় ....... সিনেমা দেখে কাঁদাও যায়, হাঁসাও যায় , আবার ভালো ও বাসা যায় ....
তুলির মনে আস্তে আস্তে একটা স্বপ্ন উঁকি দিতে শুরু করলো, সিনেমাকে ঘিরে দেখা স্বপ্ন .... গল্প বলার স্বপ্ন ... ওর বয়স যখন ১৮ , যখন উচ্চ মাধ্যমিক পরিক্ষা শেষ হয়ে কলেজ জীবন শুরুর পালা, তখন ও বাড়ির লোকেদের কাছে বলেই ফেলল মনের জমা ইচ্ছে টা, "বাবা, আমি ফিল্ম মেকিং এর একটা কোর্স করতে চাই ......"...........
ব্যাস, বাড়িতে তো কালবৈশাখির ঝড় উঠলো, বাবা বলল ,"তোর্ কি সিনেমা দেখে মাথা টাথা খারাপ হয়েছে না কি ?জানিস ওই সব লাইন এ কি হয় ?", মা বলল, "তুই জয়েন্ট না দিয়ে ফিল্ম মেকিং টেকিং কি সব করবি !.. এই ছিল আমার কপালে !... একটা মেয়ে হয়ে ওই সব লাইন এ , কোনো মানে হয় !.."....... আর ঠাম্মা তো অত ইংরেজি বোঝে না, তাই অন্য কথা বলল, "তুই শেষে হিরয়িন হবি ? আমাদের বংশের মুখ পুড়ল..."
যাই হোক, অনেক বুঝিয়ে, কেঁদে, না খেয়ে তুলি সাত দিনের কঠিন পরিশ্রমে কালবৈশাখীর ঝড় থামাতে সক্ষম হলো ... বাবা বলল, "ঠিক আছে, তোর্ যখন এটাই ইচ্ছে..আমি আর কি বলি !"........ মা আর ঠাকুমা যদিও চুপ ছিল .. ওদের রাগ পড়তে আরো এক মাস লাগবে ...
তুলি ভর্তি হলো SRFTI তে , 'সত্যজিত রায় ফিল্ম এন্ড টেলিভিসন ইনস্টিটিউট '.... ওর স্বপ্নের শুরু ..... দু বছরের কোর্স এ সিনেমাটগ্রাফি , ক্যামেরার কাজ , সেট ডিসাইনিং , স্ক্রিপ্ট রিডিং সব ই একে একে শিখল ... আর এর মধ্যে তুলি নিজের একটা গল্প ও লিখে ফেলেছে, 'উড়ো চিঠি', একটা মধ্যবিত্ত মেয়ের একজন ফিল্ম ডিরেক্টর হয়ে ওঠার গল্প.... হ্যা , নিজের জীবন থেকে অনেক ঘটনায় তুলে নিয়ে সাজিয়েছে 'উড়ো চিঠি' তে, আর সঙ্গে কিছু কল্পনাকে ও মিশিয়ে দিয়েছে .......
দু বছর বাদে শুরু হলো বাস্তবের গল্প.... তুলি এখন 'উড়ো চিঠি' গল্পের স্ক্রিপ্ট নিয়ে ষ্টুডিও পারার দরজায় দরজায় ঘোরে... কখনো কোনো প্রডিউসারের কাছে, কখনো কোনো সিনেমা আর্টিস্ট .... কেউ দেখেও দেখে না, শুনেও শোনে না.....একে তুলি নতুন, কাজের বিশেষ কোনই এক্সপিরিয়েন্স নেই... তার মধ্যে কোনো সুপার স্টার এর মেয়ে ও না...... তাহলে ওকে পাত্তা দেয়ার মতন কি আছে !...
কিছু ডিরেক্টার বলে , "একটা মেয়ের ডিরেক্টার হওয়ার গল্প ? এটা আবার কেমন ! তুমি বরং নতুন কিছু লেখ,যেমন হিরো গরিব, হিরোইন বড়লোক, তারপর দুজনের প্রেম হলো, তারপর বেশ হিরোর সাথে গুন্ডা দের মারামারি.! আর মাঝখানে একটা আইটেম সঙে হিরোইন এর নাচ.. এই সব গল্প জমবে ভালো ..."....... তুলি আর কোনো উত্তর দেয় না , চুপ করে থাকে ............. আসলে এটা তো তা ও অনেক ভদ্র ভাবে না বলে, অনেকে তো মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেয়, সিকিউরিটি কে ডেকে বার করে দেয় .....
আর বাড়ি ফিরে মা বাবার গম্ভীর মুখ ... দীর্ঘ্যশ্বাস ... বাবা বলে, "তোর্ কথায় রাজি হওয়াটাই আমার উচিত হয়নি .. এই সব পাগলামি কেউ করে?"... মা বলে , " তোর্ মাসতুত বোন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে আই.আই.টি তে, তোর্ জেঠুর ছেলে মেডিক্যাল , আর তুই ? টালিগঞ্জে ঘুরে ঘুরে সারাটা দিন নষ্ট করছিস !.. সত্যি এই ছিল আমার কপালে ..!"... আর ঠাকুমা তো আরো এক কাঠি ওপরে উঠে বলে, " আমার মনে হয় এবার তুলির বিয়ে দিয়ে দেয়া উচিত.. এখনো মেয়ে পুরো উচ্ছন্নে যায়নি .. সময় থাকতে থাকতেই সম্বন্ধ দেখ , নইলে মুখ পুড়িয়ে আসলে আর পাত্র ও পাওয়া যাবে না ..".........
যাই হোক , এই সব কথার ই অভ্যেস হয়ে গেছে তুলির ...নতুন কিছু না !... কিন্তু তুলি চেষ্টা করা ছাড়বে না .. 'উড়ো চিঠি' কে ও বাস্তবের মাটিতে দাঁড় করাবেই,... এই সব ভেবেই রোজ ষ্টুডিও পাড়ায় যায় ..... এর মধ্যে একদিন হঠাত একটু অন্য হলো ... তুলির মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলো ... স্ক্রিন এ 'অনির্বান চ্যাটার্জির ' নম্বর .. টালিগঞ্জ এর সব থেকে বড় প্রডিউসার .... ফোন টা ধরতেই ওপারের গলা বলল , "হ্যালো, আমি অনির্বান চ্যাটার্জি বলছি.. আমি তোমার স্ক্রিপ্ট উড়ো চিঠি পড়েছি.. আমার এক চেনা ডিরেক্টার এর হাত থেকে আমি স্ক্রিপ্টটা পাই .. যাই হোক, আজ রাত ৯ টায় হোটেল পার্ক এ এস..ওখানে তোমার সাথে একটা মিটিং করব ....".....
তুলি ফোনটা রেখে আনন্দে নেচে উঠলো প্রায় ... ভাবা যায় ! এত বড় একজন প্রডিউসার ওকে নিজে ফোন করে ডেকেছে ! .. তুলি সেজে গুজে স্ক্রিপ্ট হাতে ঠিক রাত ৯ টায় হাজির হলো হোটেল পার্ক এ ... এসিস্টেন্ট বলল , "উনি ১১২ নম্বর রুমে আছেন..ওখানে যান .."........ তুলি হাসি মুখেই লিফট এর দরজায় পা দিল .... ১১২ নম্বর রুমের সামনে লিফট এর দরজা খুলে গেল... কিন্তু দরজার ওপারে যেতেই তুলির পা থমকে গেল, অনির্বান চ্যাটার্জি সোফাতে বসে, ড্রিংক হাতে... ... লোকটা মদ খাচ্ছে, ! সেই অবস্থায় কি মিটিং করবে .. যাই হোক , ও ঘরের ভেতরে ঢুকে সোফাতে বসলো.. অনির্বান বলল, "স্ক্রিপ্ট টা দাও, দেখি আর একবার.."... তুলি স্ক্রিপ্টটা দিতে হাত টা বাড়াতেই অনির্বান ওর হাতটা ধরে নিল, তার পর ওকে এক টানে নিজের কাছে টেনে নিল, " স্ক্রিপ রিডিং না হয় কিছুক্ষণ পরে হবে, তার আগে এস, তোমাকে একটু রিড করি..".. কথাটা বলেই অনির্বার তুলিকে জড়িয়ে ধরল.. অনির্বানের হাতগুলো তুলির পিঠে, বুকে ঘোরাফেরা করতে থাকলো, তুলির যেন দম বন্ধ হয়ে এলো !... কি করবে কিছুই বুঝতে পারছিল না, তারপর নিজের সমস্ত শরীরের শক্তি দিয়ে তুলি অনির্বানকে এক ধাক্কা দিল, অনির্বানের শরীরটা লুটিয়ে পড়ল সোফায় .... তুলি মাটিতে পরা স্ক্রিপ্টটা তুলে দৌড়ে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এলো .......... সামনেই লিফট টা দাঁড়িয়ে.. তুলি লিফট এ ঢুকে গ্রাউন্ড ফ্লোরের বটন টা টিপলো .......হাত পা যেন কাঁপছে এখনো, শরীরটা অবশ হয়ে আসছে ওর ... লিফট এর দরজা গ্রাউন্ড ফ্লোরে খুলতেই ও জোরে পা চালালো.. হোটেল এর দরজাটার বাইরে ওকে বেরোতে হবে.... দম আটকে আসছিল যেন ওর.. এই সময়েই ওর একজনের সঙ্গে ধাক্কা লাগলো .. ওর হাতের স্ক্রিপ্টের ফাইলটা মাটিতে পরে গেল.. যদিও তুলি সেটা খেয়াল করেনি .... ওর যেন মাথা কাজ করছে না আর .. শুধু মনে হচ্ছে এই হোটেলটা থেকে বেরোতে হবে.... তুলি আরো জোরে পা চালিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেল ...
হোটেল থেকে বেরিয়ে সামনের ভির রাস্তা পেরিয়ে একটা বাস দাঁড়িয়ে ছিল.. তুলি জায়গার নাম না দেখেই বাসে উঠে পড়ল ... সিনেমা তৈরী করার স্বপ্নের জন্য যে ওকে এত বড় একটা মূল্য দিতে হবে ও ভাবতেই পারেনি !.....বাসের জানলা দিয়ে ঠান্ডা হাওয়াটা ওর শরীর আর মনে লাগতেই ও যেন অনেকক্ষণ বাদে ভালো করে শ্বাষ নিল ....না , আর না ........ মা বাবা ঠাকুমা সবাই ঠিক বলে, এই লাইনটা ওর জন্য না ....... 'উড়ো চিঠি' ওর আর বানানো হবে না !.. ও একটা পাগল, একটা বোকা .... বার বার কথাগুলো ভেবে চোখ দুটো জলে ভিজে যাচ্ছিল .... কিন্তু তখনি হঠাত মনে হলো ওর হাতে তো 'উড়ো চিঠির' স্ক্রিপ্ট টা ছিল ..সেটা কোথায় গেল ! সেটা কি ও হোটেল রুমেই ফেলে এসেছে !.. ঠিক কিছুই স্পষ্ট ভাবে মনে পরছে না....হঠাত মনে হলো ওর সেই স্ক্রিপ্টটা হয়ত খুব সস্তা ,কোনো দাম নেই সেটার..তাই ভাগ্যই আজ ওর জীবন থেকে 'উড়ো চিঠি' কে সরিয়ে দিল....শেষ করে দিল ... ....... সেই রাতে কিছুতেই ঘুম এলো না তুলির.. বার বার চোখের সামনে অনির্বানের দুটো লোভী চোখ ভেসে উঠছিল .. চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাচ্ছিল সেই নোংরা মুখটা কে ... বার বার জলে ভিজে যাচ্ছিল দুটো চোখ ....
পরের দিন সকালে উঠেই তুলি ওর মা বাবার কাছে গেল, আর নিজের মর্জি মতন চলবে না ও ... বাড়ির সবাই যেটা বলে সেটাই করবে ... আর ও স্বপ্ন দেখবে না.... আর ও ষ্টুডিও পাড়ায় যাবে না .. এই সব কাল রাতেই ভেবেছে, তাই আজ মা বাবার সামনে গিয়ে বলল," তোমরা আমার জন্য ছেলে দেখো ... ঠাম্মার কথাই শুনব ... আমি বিয়ে করে নেব ....."......... ওর মা বাবা তো অবাক !.. হঠাত মেয়ের হলো কি !.. সব পাগলামি একদিনে চলে গেল !.... বাড়ির সবার মুখে হাঁসি ... সেইদিনই ম্যাট্রিমনিয়াল সাইট এ তুলির প্রফাইল বানানো হলো ... বেশ অনেকগুলো পাত্রের লিস্ট ও করা হলো.. তার মধ্যে একজন এই রবিবার তুলিকে দেখতে আসবে .. ছেলে ডাক্তার ... অনেকদিন বাদে তুলির মা বাবা ঠাকুমা ভীষণ খুশি ... শুধু তুলির মুখটাই আজকাল খুব গম্ভীর ... আর বেশি কথা বলে না.. ওর যেন সব কথা, সব স্বপ্ন শেষ ..
রবিবারের সকালে সূর্যের আলো চোখে পরতেই তুলির ঘুম ভাঙ্গলো .. আজ পাত্র পক্ষ ওকে দেখতে আসবে ... মিষ্টির প্লেট হাতে তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে হবে ওকে .. তুলির মা আজ ওকে খুব সুন্দর ভাবে সাজিয়ে দিয়েছে... লাল রঙের তাতের শাড়ি, চুলটা খোলা, কপালে একটা টিপ ... বাবা তো দেখে বলেছে, "আজ তো আমার মেয়ের দিকে তাকালে কেউ চোখ ই ফেরাতে পারবে না !''..... ঠাম্মা ওকে মিষ্টির প্লেট টা সাজিয়ে দিয়েছে,তারপর কানে কানে বলেছে, "ছেলের বাড়ি থেকে জিগেশ করলে বলবি সব ধরনের রান্না করতে পারিস.. বুঝলি..".......... তুলি কাঠের পুতুলের মতন মিষ্টির প্লেট হাতে পাত্র পক্ষের সামনে হাজির , তখনই দরজার কলিং বেলটা বেজে উঠলো .. এখন আবার কে !... তুলির বাবা দরজা খুলতেই হা ! অবাক চোখে তাকিয়ে.. সামনে দাঁড়িয়ে আকাশ সেনগুপ্ত ... এই ইন্ডাস্ট্রির সব থেকে নামী হিরো, সুপার ষ্টার.. এতক্ষণে পাত্র পক্ষ , তুলির মা ঠাকুমারও চোখ কপালে উঠেছে.. এত বড় একজন ষ্টার আজ ওদের বাড়িতে ! কেউ ভাবতেই পারছে না !... ঘরের নিঃস্তব্ধতা ভেঙ্গে আকাশ সেনগুপ্ত তুলির সামনে এসে দাঁড়ালো, " হ্যালো তুলি .. তোমাকে আমি অনেক সময় ষ্টুডিও পাড়ায় দেখেছি আমাদের.. সেই দিন মনে আছে, হোটেল পার্ক এ তোমার আমার সাথে ধাক্কা লেগেছিল .. তোমার স্ক্রিপ্ট টা পরে গেছিল .... তুমি হয়ত খেয়াল করনি তখন .. আমি সেই রাতে পুরো 'উড়ো চিঠির' স্ক্রিপ্ট টা পরেছি .. দারুন গল্প ... আমি তোমার সাথে কাজ করতে চাই ..... তোমার নাম্বারে সাত দিন ধরে কল করছিলাম, কিন্তু সুইচ অফ ছিল, তাই তোমার বাড়ির এড্রেস যোগার করে নিজেই চলে এলাম .....".. হাসি মুখে কথা গুলো বলে গেল আকাশ .. তুলি চুপ... বিশ্বাস হচ্ছে না কি হচ্ছে !.... সেইদিনের পর থেকে রাগে, দুঃখে ও তো ফোনটাকে অফ করে রেখেছিল .. আর তখনি ওকে এত বড় একজন ষ্টার ফোন করেছে !... ও কি স্বপ্ন দেখছে !.....তখন আবার আকাশ বলে উঠলো , "তুলি , প্লিস সে সমথিং .. আই ওয়ান্ট এন আনসার ... "...... তুলির কথাটা শুনে সম্ভিত ফিরল ... নিজেকে সামলে বলল, "কিন্তু আমার কাছে তো কোনো প্রডিউসার নেই ..".... আকাশ হেসিই উত্তর দিল, "সেটা নিয়ে তুমি ভেব না.. আমি দেখছি.. 'উড়ো চিঠি' ফিল্ম টা কে করতেই হবে ..... ".... তুলির এখনো মুখে কথা আসছে না !.. মনে হচ্ছে হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন গুলোকে যেন আবার হঠাত ফিরে পেয়েছে.. নিজের কাছে ..... তখন আবার আকাশ বলে উঠলো, " এনীয়য়েই , আই এম সরি , আমি হঠাত এই ভাবে চলে এলাম.. মনে হয় তোমাদের বাড়িতে কোনো অকেসন আছে .."... তুলি দৃঢ় গলায় এবার উত্তর দিল, ''অকেসন ছিল .. আমাকে পাত্রপক্ষ দেখতে এসেছিল ... কিন্তু এখন প্ল্যান ক্যানসেল .....".........
এরপর আর পেছনে ফিরে তাকানো না .. তুলির জীবনের একটা নতুন চ্যাপ্টার শুরু ... আকাশ প্রডিউসার ও যোগার করে নিয়েছে ... আস্তে আস্তে ওদের বন্ধুত্ব টা ও হয়েই গেছে... আসলে আকাশ এত বড় একজন ষ্টার হলেও মাটির কাছের একজন মানুষ ... ওর কথা বার্তা চিন্তাধারা খুব সাধারাঁও .. এত গ্ল্যামার এর জগতে থেকেও ও যেন সবার থেকে আলাদা ... ওর সাথে খুব সহজের কথা বলা যায়, গল্প করা যায়, হাঁসা যায় ..তাই তুলির ওর সাথে বন্ধুত্ব করতে বেশিদিন সময় লাগেনি ... এখন মাঝে মাঝেই আকাশ ওদের বাড়িতে আসে .. প্রথম দিনে তুলির মা বাবা ঠাকুমা খুব ঘাবড়ে গিয়েছিল যদিও . শুধু চোখ বড় বড় করে ওকে দেখেইছিল, একটাও কথা বলতে পারেনি .. কিন্তু এখন অনেকটাই নরমাল হয়েছে ব্যাপারটা ... টুকরো টুকরো কথা, গল্প গুজবও হয় ... আর এত বড় একজন ষ্টার মেয়েকে সাপোর্ট করছে মানে ওরা একটা কথা বুঝেছে যে মেয়ে পাগল না .. যা করছে ,ঠিক ই করছে .... সিনেমা বানানোর স্বপ্ন টা টাইম ওয়েস্ট মোটেও না .....
এই সবের তিন মাসের মধ্যেই উড়ো চিঠির শুটিং শুরু হলো ... তুলি 'লাইট', 'ক্যামেরা', 'একসন' এর জগতে পা রাখল ....... ওর স্বপ্নের জগত ওকে হাতছানি দিয়ে কাছে ডেকে নিয়েছে ......
আকাশ এর কথাই মিলে গেল ...... 'উড়ো চিঠি' শুধু হিট করেনি দর্শকদের মাঝে, ফিল্ম ক্রিটিকদের সুনামও পেয়েছে ভীষণ... একজন নতুন পরিচালক, ২৩ বছরের একটা মেয়ে, তুলিকা , যে এত ভালো সুন্দর একটা সিনেমা তৈরী করতে পারে এটা দেখে সবাই অবাক ..... মেয়ের পেপারে ফটোও বেরিয়েছে.. তুলির বাবা তো সেই পেপারটা নিয়েই সেইদিন অফিস গেল ........ তুলির ফোন এখন বার বার বেজে উঠছে, প্রডিউসারদের ভির ওর দরজায় ....... এর মধ্যে একদিন একটা পার্টিতে অনির্বান চ্যাটার্জির সঙ্গে দেখা হয়েছিল.. তুলিকে দেখে ওর চোখটা নিচে নেমে গিয়েছিল .. লজ্জায় ... দু একবার চেষ্টাও করেছিল তুলির সাথে কথা বলার .. কিন্তু তুলি দেখেও দেখেনি ...
যাই হোক ,ফিল্ম রিলিস এর কিছুদিন পর হঠাত একদিন আকাশ ওকে বলে উঠলো,
"আচ্ছা, এখন তো আমরা খুব ভালো বন্ধু, তো আমি তোমাকে একটা কোয়েস্চেন করতে পারি !"....
" হ্যান, বল .. কি কোয়েস্চেন ? আর এত পারমিসন নিচ্ছ কেন ?"
" না , মানে .. আচ্ছা তুলি তুমি সেই প্রথমদিন বলেছিলে না, যে বিয়ে করার প্ল্যান ক্যানসেল.. ওই ডিসিসন টা কি এখনো এক ই আছে? আরেকবার ভাবা যায় না ? "
" হ্যা, ভাবতে পারতাম.. যদি হাতের কাছে কোনো পাত্র থাকত .....".....তুলি হেসেই বলল..
তখন আকাশ বেশ গম্ভীর ভাবে বলল, " হাতের কাছেই তো আছে, তোমার চোখের সামনে বসে আছে .. ".......
তুলির চোখ বড় বড় , তার মানে আকাশ কি ওকে প্রপস করছে ! .... " তুমি হঠাত এত সুন্দরী সুন্দরী হিরোইন আর মডেলদের ছেড়ে আমাকে এই সব বলছ ? আর ইউ সিরিয়াস ?"
" 100 % সিরিয়াস ... সেই প্রথম দিন থেকেই .... যখন হঠাত পার্ক হোটেল এ ধাক্কা টা লাগলো ... হ্যা, লাভ এট ফার্স্ট সাইট সিনেমাতে হয় .. আবার মাঝে মাঝে রিয়াল লাইফ এ ও হয়েই যায় ...... আচ্ছা, আমি কি পাত্র হিসেবে খুবই খারাপ ? আমকে কি ধুতি পাঞ্জাবি আর টোপর পরে একদমই ইমাজিন করা যায় না ? "
তুলির চোখে একটা লাজুক হাসি .. সত্যি এর কি উত্তর হয় !... ভালো তো ওর ও লেগেছে প্রথম থেকেই ..... শুধু কখনো আলাদা করে বলে ওঠা হয়নি .. তাই সেইদিন আকাশের প্রশ্নের উত্তরে বলেছিল , " তুমি ই বেস্ট পাত্র .... এতে কোনো সন্দেহ নেই আমার.. বুঝলে .."........
সত্যিই জীবনটা একটা সিনেমা ... এর স্ক্রিপ্ট রাইটার ওপরঅলা .... সব ই যেন সিন এর পর সিন সাজানো থাকে .. আর আমরা সেটা শুধু অভিনয় করে যাই মাত্র ......... তুলি আজ একটা অ্যাওয়ার্ড পাবে, 'সত্যজিত রয় বেস্ট নিউ ডিরেক্টার অ্যাওয়ার্ড'... যার সিনেমা দেখে তুলির প্রথম সিনেমার প্রেমে পরা, আজ তাঁর নামেরই একটা অ্যাওয়ার্ড ওর হাতে ........... এটা একদিন ওর স্বপ্ন ছিল, আজ সত্যি .....
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now