বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

"ঝারোয়ার জঙ্গলে" ২য় ও শেষ পর্ব

"ভূতুড়ে অভিজ্ঞতা" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান আর.এচ জাহেদ হাসান (০ পয়েন্ট)

X জঙ্গলে কাজ করি, অত ভীতু হলে আমার চলে না। আমি জানি এসব জঙ্গলকুলীদের বেজায় বিশ্বাস ভূতপ্রেত, দেওপিশাচে। আমি ধীলনকে দাহ করি, কুকুরটাকে কবর দিই। বাড়িটা বন্ধ করে ধীলনের জিপটা নিয়ে চলে আসে। তারপর জঙ্গল অফিসের সহায়তায় ধীলনের কে আছে না আছে খোঁজ নিই। অবশেষে রাঁচি থেকে এল ভার্মা নামের একটি ছেলে। ধীলন তার সম্পর্কে মামা হয়। ভার্মা বলল " আমি ওখানে বাস করব না। বাড়িতে যা আছে সব জিপে নিয়ে রাঁচি চলে যাব।" ভার্মার সঙ্গে তার এক বন্ধুও এসেছিল। কিন্তু কোনও জঙ্গলকুলী ওদের সাথে গেল না। তারা সাফ বলে দিল, জানোয়ারের ভয় করি না কিন্তু যে জঙ্গলে জানোয়ার অব্দি ঢোকে না সেখানে কে যাবে? আমি আমাদের হেডকুলী দাসাইন ওঁরাও কে ধমকালাম। সেও বলল বাবু, আমরা তো যাবই না, ঐ বাবুও যেন না যায়। ভার্মা সে কথা উড়িয়ে দিল। ভার্মার কাছেই আমি ঐ জঙ্গলটা ইজারা নিই। আদিম অরণ্য, বড় বড় শাল গাছ, প্রত্যেকটা গাছ খুব দামে বিকোবে। ভার্মা যাবার দিন হাটেও দেখা হল। বলল, কাল সকালে একটু আসবেন। ফ্লাস্কে একটু গরম চা বানিয়ে আনলে তো কথাই নেই। সেই শেষ দেখা। পরদিন সকালে থার্মস ভর্তি চা নিয়ে ঝারোয়ার জঙ্গলে গিয়ে দেখলাম, ভার্মা আর তার বন্ধু ঘরের মেঝেয় চিত হয়ে পড়ে আছে। দুজনেই মৃত, দুজনের চোখই অবিশ্বাস্য আতঙ্কে বিস্ফারিত, দুজনের শরীরই রক্তশূন্য।" কাকা থামলে মইনুরা বলল " তারপর? " "দুজনের গলাতেই ছোট ছোট পাংচারের দাগ ছিল"- কাকা বললেন। " এর মানে কি?" মইনুরা প্রশ্ন করল। " জানি না, পুলিশ এখনো খোঁজ চালাচ্ছে। কিন্তু কোনও কিনারা হয় নি। শুধু কুলীদের মধ্যে ভয়ঙ্কর আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। কেউ আর ওখানে যাচ্ছে না গাছ কাটতে। " " পুলিশ যাচ্ছে না?" " কয়েকবার গেছে। সেও এক রহস্য।" " কিরকম? " " বাড়িটা পুলিশ বন্ধ করে তালা মেরে আসছে। কিন্তু প্রত্যেকবার গিয়ে বাড়ি খোলা পাচ্ছে। ঝকঝকে, তকতকে মেঝে, কে বলবে বাড়িতে মানুষ থাকে না।" " এসবের মানে কি?" মইনুরা বলে উঠল। " কোন মানুষ আছে এর পেছনে। আমার তো তাই বিশ্বাস। হাজার সত্তর শাল গাছ, করম গাছ, তেঁতুল গাছ, লাখ লাখ টাকার জঙ্গল তো। কেউ আতঙ্ক সৃজন করছে।" কাকা এবার চুপ হয়ে গেলেন। খুব ভেঙে পড়েছেন মনে হল। ঝারোয়ার জঙ্গলের ওপর খুব ভরসা করেছিলেন। বাদল বলল " তুমি ভাবছ কেন? আমরা চারজন আছি, বন্দুক নিয়ে যাব ওখানে। সব রহস্য ফরসা হয়ে যাবে। " কাকা বারণ করলেন, কুলিদের 'হেড' যে সেই দাসাইন ওঁরাও বারণ করলেন। কিন্তু মইনুদের জেদ চেপে গেল। তারা যাবেই। চার চারটে জোয়ান ছেলে, সাঁতার কাটতে, স্কুটার চালাতে, পাহাড়ে উঠতে সবাই পটু। রাইফেল ক্লাবে চারজন একসঙ্গে ঢুকেছিল। বন্দুক চালাতে সবাই জানে। বাদলের তো লাইসেন্সও আছে। জঙ্গলের কাজে আসার আগেই সে লাইসেন্স নিয়েছে। মইনু ক্যারাটে, তাতা আর সোনাম জুডোও শিখেছে। পুলিশ অফিসার সুজা সিং বললেন, " ঠিক আছে, পাহাড়ের এপারে সুমোতে রইলাম আজ। অনেক দিন পর জমিয়ে তাস খেলা যাবে"। কাকার বাংলোয় রয়ে গেলেন সুজা সিং। মইনুরা যখন রওনা দিল তখন তিনি বললেন " এই হুইসেলটা রাখুন। পাহাড়ের নির্জনতায় শব্দ বহুদূর যায়। কিছু বিপদ বুঝলেই বাজাবেন। আমরা এসে পড়ব"। দাসাইন ওদের কিছুদূর এগিয়ে দিল তারপর মাথা নাড়তে নাড়তে বকবক করতে করতে চলে গেল। সুমা থেকে ঝারোয়া, মাঝে একটি পাহাড়। পাহাড়টা খুবই নীচু। যাবার পথ পাহাড়ের গা ঘেঁষে পাহাড় ঘিরে। ধীলনের বাংলোয় যখন ওরা পৌঁছল তখন বিকেল। ওরা ব্যাগ নামিয়ে আশপাশটা দেখতে লাগল। আশপাশটা দেখার পর বাদল বলল " যতসব গাঁজাখুরি কথা। ওই তো হরিণ দৌড়ে গেল, কাঠবিড়ালি ছুটছে। ভূতুড়ে জঙ্গল না হাতি!" মইনু, সোনাম আর তাতা অবশ্য কোন হরিণ বা কাঠবিড়ালি দেখে নি। কিন্তু বাদল তো দেখেছে! সন্ধে ঘনাতে ওরা বাংলোর দিকে ফিরে এল। বাদল বলল, " এত বড় বড় শাল গাছ, ওহ। কত দাম বল তো? লাখ লাখ টাকা।" " তাহলে? তুই লক্ষপতি হচ্ছিস?" মইনুরা ওর পিঠ চাপড়ে বলল। " না:, বেজায় বড়লোক হওয়াটা আর ঠেকানো গেল না দেখছি। কি আর করি বল"। " আমাদের মাঝে মাঝে দিয়ে দিস"। বাংলোয় আলো জ্বলছে। তাই দেখেই ওরা অবাক হয় একটু। বারান্দায় পেট্রোম্যাকস, ঘরে পেট্রোম্যাকস, কে জ্বালল? আরেকটু এগিয়ে আসতে জবাব মিলল। বারান্দায় বসে আছে একটি মেয়ে। তার কোলে একটি বাচ্চা। ওদের দেখে মেয়েটি উঠে দাঁড়াল বাচ্চাটিকে শুইয়ে রেখে। তারপর হাত জোড় করে কান্নায় ভেঙে পড়ল। মইনুরা যতখানি না অবাক, তার চেয়ে বেশী বিব্রত, আবার আশ্বস্তও। মইনু বলল, " থামুন, থামুন। কাঁদবেন না। আপনি, আপনি ধীলনের বউ?" " হ্যাঁ বাবুজী। এ তো আমারই বাংলো"। " কোথায় ছিলেন?" " কোথায় থাকব? জঙ্গল দিয়ে আমাদের গাঁয়ে পালিয়ে ছিলাম। পুলিশ যে বড্ড ঝামেলা করে। কি বলে কিছু বুঝি না। আমি কি জানি যে স্বামী মরে যাবেন? উনি পরব পূজা পছন্দ করতেন না তাই ঝগড়া করে আমি বাচ্চাকে নিয়ে চলে যাই। তারপর যা যা হল......গাঁয়ে আমায় থাকতে দেয় না। বলে, বাবুকে বিয়ে করেছিলি। সেখানে যা। আবার এখানে এলেও পুলিশ তাড়া করে আমায়"। " আপনিই বাংলোর ঘরদোর সাফ করেন?" " হ্যাঁ বাবুজী। তাছাড়া কে করবে?" " ঘর খোলেন কি করে?" " এই যে মাস্টার চাবি দিয়ে! এ চাবিগুলো দিয়ে সব তালা খোলা যায়। বাচ্চাটার বড় অসুখ। কেবল শুকিয়ে যাচ্ছে, কিছু খেতে চায় না। তাই এসে বসে আছি। ভেবেছি সকাল হলে নিজে যাব পুলিশের কাছে। বলব, আমাকে যা বল, তাই করব, বাচ্চাটাকে হাসপাতালে দাও। জংলি মানুষ আমি, কিছু বুঝি না। স্বামী সব বুঝতেন, সব দেখেশুনে রাখতেন। বাবুজী! রাতটুকু এখানে থাকব?" " ছি, ছি, সে কি কথা!" মইনুরা বলল, " আপনি বাচ্চাকে নিয়ে ঘরে থাকুন। আমরা ঐ ঘরে থাকব। সকালে আমরাই আপনাকে নিয়ে যাব"। মেয়েটি বাচ্চাকে শুইয়ে এল। সেই-ই ওদের খাবার সাজিয়ে দিল প্লেটে। কাকা ওদের টিফিন ক্যারিতে খাবার সঙ্গে দিয়েছিলেন। অনেক পীড়াপীড়িতেও মহিলাটি নিজে কিছু খেল না। কথা বলল অনেক। ধীলনের ভাগ্নে ভার্মাকে কে মেরেছিল তা ও জানে না। ও তো ভয়ের চোটে আসতই না। গ্রামের লোকরা থাকতে দিল না বলে যাওয়া আসা করছে। বসার ঘরে মইনু, সোনাম, তাতা আর বাদল শুয়ে পড়ে। ঘুম কি আসতে চায়? এখন তো ঝারোয়ার বাংলোর রহস্যের সব সমাধানই মিলেছে। মেয়েটির গল্পের মধ্যে যে সব ফাঁকফোকর রয়েছে তা ওদের কিছু কানে বাজছে না। মেয়েটির চাউনি এত কাতর, গলার স্বর এত কান্নায় ভরা! হঠাৎ মেয়েটি কেঁদে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে ওরা ছুটে যায়। মেয়েটি ওদের কাঁদতে কাঁদতে বলে " বাবুজী, বাবুজী! মেয়ে আমার নেতিয়ে পড়ছে কেন? একটু দেখ না গো? এমন রাতে আমি কি করি?" ধড়ফড় করে ওরা ছুটে আসে বাচ্চাটির কাছে। সত্যিই, তিন চার মাসের বাচ্চাটা যেন অসাড় হয়ে যাচ্ছে। বাদল সামনে ছিল, পাগলিনীর মতো বাচ্চার মা বাদলের হাত ধরে টানতে থাকে। " এস, দেখ না বাবুজী, আমার মেয়ে বেঁচে আছে কিনা দেখ না"। হতভম্ব বাদল এগিয়ে যায় বাচ্চার বিছানার কাছে। আর যে বাচ্চাটা এতক্ষণ মড়ার মতো পড়েছিল বিছানায়, সে হঠাৎ খলখল করে হেসে উঠে বিছানা ছেড়ে ভেসে উঠে আসে, বাদলের গলায় মুখ লাগায়, চুষতে থাকে কি যেন। বাদলের গলার স্বর আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে যায়। চোখ হয় বিস্ফারিত। মইনুরা এক পা নড়তে পারে না, এই অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখে। মেয়েটি বাদলকে ধরে থাকে আর একেবারে মমতাময়ী মানুষী মায়ের গলায় বলতে থাকে- " খেয়ে নে সোনা, খেয়ে নে মণি, খেয়ে নে...... সোনাম এই ভয়ঙ্করতার অভিশাপ কাটিয়ে বাদলের রাইফেলটা এনে পরপর গুলি করেছিল মহিলাটির ওপর। মহিলাটি একচুল নড়েনি। বাচ্চাটাকে ও একসময় কোলে নিয়ে বেরিয়ে যায়। বাদল পড়ে যায়। রাইফেলের শব্দে সুজা সিং ও কাকা এসে পড়েন। তারপর সব অস্পষ্ট। ধোঁয়াটে, গোলমেলে। ওদের চারজনকেই হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়। বাদল অবশ্য জীবিত ছিল না। তারপর ওরা একদিন কলকাতা ফিরে আসে। ঝারোয়ার জঙ্গলের নাম ওরা কখনো করে না। কিন্তু খুব ছোট শিশু দেখলে ওরা আজও ভীষণ ভয় পায়। জীবনেও এ আতঙ্ক ওদের কাটবে না। ঝারোয়ার জঙ্গলে আর কেউ কোনদিন ঢোকেনি। .............সমাপ্ত...........


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১২৩০ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now