বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
তাহলে একেবারে গোড়া থেকে শুরু করি।’
‘ হ্যাঁ, গৌরচন্দ্রিকা বাদ দিয়ে।’
‘ শোন । আজ এক বছর হল, অমরনাথ বসু মারা
গিয়েছেন। তিনি ছিলেন একজন বড় জমিদার,
যথেষ্ট স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির মালিক।
অজিতকুমার, অসীমকুমার আর অমলকুমার হচ্ছে
তাঁর তিন ছেলে। ছোট অমল নাবালক, সেকেণ্ড
ইয়ারের ছাত্র । অমরবাবুর একটি মাত্র মেয়ে
সুষমা, তার বিবাহ হয়েছে, স্বামীর নাম
সুরেন্দ্রনাথ মিত্র। সুষমার শ্বশুরবাড়ি বিদেশে
কিন্তু পিতার মৃত্যুর পর ভাইদের অনুরোধে
স্বামীর
সঙ্গে বাপের বাড়িতেই বাস করে । এই হচ্ছে গত
আর বর্তমান পাত্রপাত্রীদের পরিচয়।
‘ প্রথমে অজিত যখন বজ্রাঘাতে মারা পড়ে,
ঘটনাটা আমার মনে স্থায়ী রেখাপাত করেনি।
ডাক্তার বললে মৃত্যুর কারণ বিদ্যুতের আঘাত ।
কিন্তু গেল পরশু অসীমও ঐ ভাবে মারা পড়তে
আমরা রীতিমত চমকে গিয়েছি ; এবারেও
ডাক্তারের মুখে মৃত্যুর কারণ শুনলুম বটে, কিন্তু
দুই
সপ্তাহের মধ্যে একই পরিবারের উপর বজ্রের এমন
পক্ষপাতিত্ব বিস্ময়কর। অবশ্য দুটি ঘটনার
রাত্রেই মেঘাচ্ছন্ন সজল আকাশ থেকে বজ্রের
হুঙ্কার
আমরা সকলেই শুনেছি।’
‘ তবে তুমি সন্দিগ্ধ হয়েছ কেন?’
‘ দু-দিনই ঘটনাস্থলে গিয়ে দুটো মৃতদেহ ছাড়া
বজ্রাঘাতের আর কোনও
চিহ্ণই দেখতে পাইনি ।’
‘ এ ছাড়া আর কিছু লক্ষ্য করেছ ?’
‘ করেছি । দু-দিনই লাস পাওয়া গিয়েছে
পূর্বদিকের জানালার নীচে মেঝের উপর । এও
লক্ষ্য করেছি মৃত্যুর রাত্রে অজিত আর অসীম যে
বিছানায় ঘুমিয়েছিল, খাটের শয্যার উপরে সে
প্রমাণের অভাব নেই। কিন্তু দুর্যোগময় রাত্রে
তারা শয্যা ত্যাগ করে জানালার ধারে
এসেছিল কেন ? এ প্রশ্নের উত্তর পাইনি।’
‘ তাহলে তোমরা কোন মামলা খাড়া করতে
পারনি ।’
‘ উঁহু ! মামলা দাঁড়াবে কিসের উপরে । প্রমাণ কই
। সন্দেহ তো প্রমাণ বলে গ্রাহ্য হবে না!’
‘ আমাকে একবার ঘটনাস্থলে নিয়ে যেতে পার?’
‘ অনায়াসে । সেখানে গিয়ে পৌঁছতে পাঁচ-ছয়
মিনিটের বেশি লাগবে না। কিন্তু সেখানে
গিয়ে তুমি কি দেখবে?’
‘ যা দেখবার তাই।’
গিরীন্দ্র হেসে উঠে বললে, ‘ কিন্তু আমি
ভবিষ্যত্বাণী করছি সেখানে গিয়ে
আমরা যা দেখেছি, তার চেয়ে বেশি কিছুই
তুমি দেখতে পাবে না? এটা
মামলাই নয়, আশ্চর্যভাবে দৈব দুর্ঘটনায় দুটো
লোক মরেছে এইমাত্র।’
‘ আশা করি তোমার কথাই সত্য হবে। এখন চল।’
অমরবাবুর বাড়িখানি মাঝারি। তার পূর্বদিকে
ট্রাম লাইনের পাতা রাস্তা, পশ্চিম দিকে
খিড়কির পুকুর ও বাগান এবং দক্ষিণদিকে
প্রতিবেশীদের বাড়ির সারি ।
গিরীন্দ্রের সঙ্গে জয়ন্ত ও মানিক রাস্তার
দিকের দোতলার বারান্দায় এসে দাঁড়ালো ।
গিরীন্দ্র সব দেখাতে দেখাতে বললে, ‘
বারান্দার কোণে এই যে তিনখানা ঘর দেখছ এর
প্রথমখানা হচ্ছে অজিতের ঘর। দ্বিতীয়খানা
অসীমের আর তৃতীয়খানা অমলের । প্রথম ঘরের
এই জানালার তলায় অজিতের আর দ্বিতীয় ঘরের
ঐ জানালার তলায় পাওয়া গেছে অসীমের
মৃতদেহ। এ দুটো ঘর এখন খালি পড়ে আছে।’
জয়ন্ত দু’খানা ঘরে ঢুকেই চারিদিকে দৃষ্টিপাত
করতে লাগল।
প্রত্যেক জানালা, এমনকি দেওয়ালের লোহার
গরাদে পর্যন্ত ভাল করে পরীক্ষা করলে।
উল্লেখযোগ্য কিছুই পাওয়া গেল না ।
তারপর তারা তৃতীয় ঘরের একটা জানালার
কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। বাহির থেকেই দেখা
গেল, ঘরের ভিতরে চেয়ারের উপরে বসে রয়েছে
দুটি লোক। একজনের বয়স হবে আঠারো ঊনিশ আর
এক জনের চল্লিশের কাছাকাছি ।
জয়ন্তের দিকে ফিরে গিরীন্দ্র চুপি চুপি বললে, ‘
অমল আর তার ভগ্নিপতি সুরেনবাবু ।’ তারপর
ঘরের দিকে ফিরে চেঁচিয়ে বললে, ‘ কী হয়েছে
সুরেনবাবু, অমলের মুখের ভাব অমনধারা কেন।’
অমলের মাথায় সস্নেহে হাত বুলোতে বুলোতে
সুরেন বললে, ‘ বাড়িতে আবার পুলিশ দেখে অমল
ভয় পেয়েছে । তাই আমি একে বোঝাবার চেষ্টা
করছি।’
‘ বেশ করেছেন । আমরা বাঘ নই, তেড়ে গিয়ে
অমলকে কামড়ে দেব না। আজ
একেবারে শেষ তদন্ত করতে এসেছি, আর আসব না
।’
সুরেন বললে, ‘ আর তদন্ত! এ হচ্ছে ভগবানের মার,
পুলিশ তদন্তের ধার ধারে না !’
সেদিক থেকে ফিরে আসতে আসতে জয়ন্ত
জিজ্ঞাসা করলে, ‘ অমল কি এখনো এই ঘরেই
থাকে?’
‘ হ্যাঁ।’
‘ একলা?’
‘ হ্যাঁ।’
‘ সুরেনবাবুর ঘর কোথায়?’
‘ বাড়ির পশ্চিম দিকে।’
বারান্দার রেলিঙের উপরে হাত রেখে ট্রামের
রাস্তার দিকে তাকিয়ে জয়ন্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে
রইল। সে যে কী ভাবছে, তার মুখ দেখে কিছুই
বোঝবার জো নেই ।
মানিক বললে, ‘কী হে, ধ্যান সাগরে তলিয়ে
গেলে নাকি?’
‘ আমি তলাবার চেষ্টা করছি না মানিক, আমি
ভাসবার চেষ্টা করছি ।’
গিরীন্দ্র ঠাট্টার সুরে বললে, ‘ কী আবিষ্কার
করলে শুনি?’
‘ শুনবেন? এই বাড়িতে চোর আসতে পারে সহজেই
।’
‘ তাই নাকি?’
‘ নিচের ঐ গ্যাস-পোস্টটার দিকে তাকিয়ে
দেখ। ওর উপরে উঠলেই এই বারান্দার নাগাল
পাওয়া যায়।’
‘ উঃ, অভাবিত আবিষ্কার!’
‘ আর একটা আবিষ্কার করেছি রাস্তার ওধারকার
ঐ বাড়িখানার গায়ে ভাড়া-
পত্র টাঙানো রয়েছে। ঐ বাড়িখানা ভাড়া
দেওয়া হবে।’
‘ তাতে তোমারই বা কী, আমারই বা কী?’
‘ মনে করছি বাড়িখানা আমিই ভাড়া নেব।
জায়গাটি আমার বেশ লাগছে।
কিছুদিন এখানে বাস করব।’
‘ মানে ?’
‘ মানে কিছুই নেই। এ হচ্ছে আমার খেয়াল। আর
খেয়াল হচ্ছে অর্থহীন। অতঃপর
আমরা প্রস্থান করতে পারি।’
জয়ন্ত ঠাট্টা করেনি, আজ কদিন হল সত্যসত্যই
শালিখার সেই বাড়িখানায় উঠে এসেছে।
মানিকের কৌতুহলের সীমা নেই। সে বিলক্ষণ
জানে, জয়ন্তর খেয়াল হয় না অকারণে । ঐ দুই
মৃত্যুর ভিতর থেকে সে কোন সূত্র আবিষ্কার
করেছে নিশ্চয়ই। নইলে ঘটনাস্থলের সামনা-
সামনি থাকবার জন্য তার এতখানি আগ্রহ কেন?
জয়ন্তের মনের ভিতর প্রবেশ করবার জন্যে
গিরীন্দ্রও কম ব্যস্ত হয়ে ওঠেনি । সে রোজই
আসে আর একই প্রশ্ন করে, ‘ কেন তুমি এ
বাড়িখানা ভাড়া নিলে। এখানে থাকলে
তোমার কোন্ উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে?’
জযন্ত বোবা । শুধু মুখ টিপে হাসে আর নস্য নেয়।
হপ্তা-দুই কেটে গেল। দুপুরবেলায় জয়ন্ত বাইরে
বেরিয়েছিল একটা ছোট ব্যাগ হাতে করে ফিরে
এল সন্ধ্যার সময়ে।
মানিক বললে, ‘ ব্যাগটি নূতন দেখছি , ভিতরে
কি আছে?’
ব্যাগটা সযত্নে আলমারির ভিতর পুরে রহস্যময়
হাসি হেসে জয়ন্ত বললে,
‘যথাসময়েই বুঝতে পারবে।’
মানিক রাগ করে বললে, ‘ এত লুকোচুরি কেন?’
‘ প্রথম পরিচ্ছেদেই পরিশিষ্টের কথা বলে দিলে
উপন্যাস পড়তে কারুর ভাল লাগে
না। গোয়েন্দা-কাহিনীর আর্ট প্রকাশ পায়
লুকোচুরির ভিতর দিয়ে।’
রাত এগারোটা বেজে গেল। এই সময়ে নৈশ
আহার শেষ করে জয়ন্ত শয্যায় গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ
করে। কিন্তু আজ সে খেয়ে দেয়ে রাস্তার ধারের
জানালার সামনে চেয়ার টেনে নিয়ে গিয়ে
বসে পড়ল ।
মানিক সুধোলে, ‘ ঘুমোতে যাবে না ?’
‘ না।’
‘ কেন হে?’
‘ আমি দেখতে চাই আজ গভীর রাত্রে চাঁদের
মুখে কালি ঢেলে গোটা আকাশ মেঘে
মেঘে ছেয়ে যায় কি না। তারপর হয়ত জাগবে হু-
হু ঝোড়ো বাতাস, হয়ত ঝরবে
ঝরো-ঝরো বাদলধারা, হয়ত বাজবে ডিমি ডিমি
বজ্র ডমরু ।’
‘ হঠাত্ উদ্ভট কবিত্বের কারণ কী?’
‘ কবি হতে চায় না কে বল।’
‘ আকাশে তো দেখি প্রতিপদের চাঁদের প্রতাপ।
কেমন করে আজ ঝড়বৃষ্টি নামবে ।’
‘ গণত্কার জানিয়ে দিলে।’
‘ সে আবার কে?’
‘ আবহবিদ্যা নিয়ে যাদের কারবার । জান তো
আবহবিদ্যা জাহির করবার জন্য সরকারি
অফিস আছে। আজ আমি সেখানে গিয়েছিলাম।
খবর পেলুম, আজ শেষ রাতের দিকে রীতিমত ঝড়-
বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে।’
‘ তুমি ক্রমেই অন্যায় রকমের দুর্বোধ্য হয়ে উঠছ ।
আর তোমাকে বোঝাবার চেষ্টা
করব না। আমি এখন ঘুমোতে যাই ।’
‘ তথাস্তু।’
অনেক রাতে কিসের শব্দে হঠাত্ মানিকের ঘুম
ভেঙে গেল। ঘরের ভিতর হু হু করে জোর হাওয়া।
ঘরের দরজাটা খোলা। জানালার সামনে
চেয়ারের উপর জয়ন্ত নেই। তার বিছানাও শূণ্য।
বজ্রের হুঙ্কারে চমকে মানিক বাইরের দিকে
তাকিয়ে দেখলে চাঁদের আলোর বদলে সেখানে
দেখা যাচ্ছে কেবল অন্ধকারকে। বৃষ্টি নামার
শব্দও শোনা গেল।
তাড়াতাড়ি জানালা বন্ধ করতে গিয়ে
মানিকের চোখে পড়ল আর এক দৃশ্য। অমরবাবুর
বাড়ির সামনে গ্যাস-পোস্টের উপরে একটা
মূর্তি। পরমুহূর্তে মূর্তিটি ঝাঁপ খেল মাটির
উপরে । গ্যাসের আলোকে চিনতে বিলম্ব হল না।
জয়ন্ত ।
মানিক হতভম্বের মত দাঁড়িয়ে আছে, জয়ন্ত
আবার এসে দাঁড়ালো ঘরের ভিতরে । তার
হাসি-হাসি মুখ।
‘ এসব কী জয়ন্ত, তুমি চোরের মত অমরবাবুর
বাড়িতে গিয়েছিলে?’
‘ গিয়েছিলাম।’
‘ তোমার পায়ে রবারের জুতো, হাতে রবারের
দস্তানা!’
‘ হাঁ, এ হচ্ছে ভালকানাইজড্(vul
canised)রবার।’
‘ আশ্চর্য!’
‘ এর চেয়ে বেশি আশ্চর্য যদি হতে চাও তাহলে
ছুটে যাও টেলিফোনের কাছে।’
‘ তারপর?’
‘ গিরীন্দ্রকে ফোন কর । বল, এখনি সদলবলে ছুটে
আসতে।’
‘ সেকি, এই রাতে! এই ঝড়-জলে ?’
‘ হাঁ, হাঁ, হাঁ! বোকার মত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে
প্রশ্ন কোরো না । গিরীন্দ্রকে বল এখনি
সদলবলে অমরবাবুর বাড়িতে না গেলে এ মামলার
কিনারা হবে না । ততক্ষণে আমি একটু বিশ্রাম
করে নি।’
অল্পক্ষণ পরেই একদল পাহারাওয়ালা নিয়ে
গিরীন্দ্র এসে হাজির হলেন হন্তদন্তের মত।
সে কোনও প্রশ্ন করার আগেই জয়ন্ত বললে, ‘ এখন
কোনও কথা নয় । এখনই আমাদের যেতে হবে
অমরবাবুর বাড়ির ভিতরে ।’
দ্বারোয়ান দরজা খুলে দিয়ে এই অসময়ে পুলিশ
দেখে অবাক হয়ে গেল। জয়ন্ত সকলকে নিয়ে উঠে
গেল একেবারে উপরে। রাস্তার ধারের
বারান্দায় গিয়ে সে টর্চের আলো ফেললে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now