বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
অনীশ-পর্ব ৭
এসএসসিতে আমার এত ভাল রেজাল্ট হবে আমি
কল্পনাও করিনি। আমাদের ক্লাসের অন্যসব
মেয়ের প্রাইভেট টিউটর ছিল, আমার ছিল না। মা’র
পছন্দ নয়। মা’র ধারণা অল্পবয়স্ক প্রাইভেট মাস্টাররা
ছাত্রীর সাথে প্রেম করার চেষ্টা করে,
বয়স্করা নানান কৌশলে গায়ে হাত দেয়ার চেষ্টা
করে। কাজেই যা পরলাম, নিজে নিজে পরলাম।
রেজাল্ট হবার পর বিস্ময়ে হকচকিয়ে গেলাম।
কী আশ্চর্য কাণ্ড, ছেলেমেয়ে সবার মধ্যে
ফিফথ। পাঁচটা বিষয়ে লেটার।
আমি বললাম, তুমি কি খুশি হয়েছ মা?
মা যন্ত্রের মত বললেন, হু ।
‘খুব খুশি না অল্প খুশি?’
‘খুব খুশি।’
‘আমাদের সঙ্গে যে-মেয়েটা ফোর্থ
হয়েছে সে শান্তিনিকেতনে পড়তে যাচ্ছে।
তুমি কি আমাকে শান্তিনিকেতনে পড়তে দেবে?’
মা আমাকে বিস্মিত করে দিয়ে বললেন, হ্যাঁ,
দেব।
‘সত্যি?’
‘হ্যাঁ সত্যি। কীভাবে যেতে হয়, টাকাপয়সা কত
লাগে খোঁজখবর আন।’
‘তুমি সত্যি সত্যি বলছ তো মা?’
‘বললাম তো হ্যাঁ।’
‘আমার এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না।’
‘বিশ্বাস না হবার কী আছে? এই দেশে কি আর
পড়াশোনা আছে? টাকা থাকলে তোকে
বিলেতে রেখে পড়াতাম।’
আমার আনন্দের সীমা রইল না। ছোটাছুটি করে
কাগজপত্র জোগাড় করলাম। অনেক যন্ত্রণা।
সরকারি অনুমতি লাগে। আরো কী কী সব
যন্ত্রণা। সব করলেন রুমার বাবা। রুমা হচ্ছে সেই
মেয়ে যে ফোর্থ হয়েছে। রুমার বাবা সংস্কৃতি
মন্ত্রণালয়ের এডিশনাল সেক্রেটারি। তিনি যে শুধু
ব্যবস্থা করে দিলেন তা-ই না, আমাদের দুজনের
জন্যে দুটো স্কলারশিপেরও ব্যবস্থা করে
দিলেন। পাসপোর্ট ভিসা সব উনি করলেন।
বাংলাদেশ বিমানে যাব, ভোর ৯টায় ফ্লাইট।
উত্তেজনায় আমি রাতে ঘুমুতে পারলাম না। মা
আমাকে জড়িয়ে ধরে সারারাতই ফুঁপিয়ে কাঁদলেন।
খানিকক্ষণ কাঁদেন, তারপর বলেন, ও বুড়ি, তুই কি
পারবি আমাকে ছেড়ে থাকতে?
‘কষ্ট হবে, তবে পারব। তুমিও পারবে।’
‘না, আমি পারব না।’
‘যখন খুব কষ্ট হবে তখন কলকাতা চলে যাবে।
কলকাতা থেকে শান্তিনিকেতন দেড় ঘণ্টা লাগে
ট্রেনে। শান্তিনিকেতনে অতিথিভবন আছে,
সেখানে উঠবে। আমার যখন খারাপ লাগবে, আমিও
তা-ই করব, হুট করে ঢাকায় চলে আসব।’
‘তুই বদলে যাচ্ছিস।’
‘আমি আগের মতোই আছি মা। সারাজীবন
এইরকমই থাকব।’
‘না, তুই বদলাবি। তুই ভয়ংকর রকম বদলে জাবি। আমি
বুঝতে পারছি।’
‘তোমার যদি বেশিরকম খারাপ লাগে তা হলে আমি
শান্তিনিকেতনে যাবার আইডিয়া বাদ দেব।’
‘বাদ দিতে হবে না। তোর এত শখ, তুই যা।’
‘মা শোন, যাবার পর যদি দেখি খুব খারাপ লাগছে তা
হলে চলে আসব।’
খুব ভোরে আমার ঘুম ভাঙল। দেখি মা বিছানায়
নেই। দরজা খুলতে গিয়ে দেখি বাইরে থেকে
তালাবন্ধ। আমি আগেরবারের মত হৈচৈ চেঁচামেচি
করলাম না, কাঁদলাম না, চুপ করে রইলাম। তালাবন্ধ
রইলাম সন্ধ্যা পর্যন্ত। সন্ধ্যাবেলা মা নিচুগলায়
বললেন, ভাত খেতে আয় বুড়ি। ভাত দিয়েছি।
আমি শান্তমুখে ভাত খেতে বসলাম। এমন ভাব
করলাম যেন কিছুই হয়নি। মা বললেন, ডালটা কি টক
হয়ে গেছে? সকালে রান্না করেছিলাম, দুপুরে
জ্বাল দিতে ভুলে গেচি। আমি বললাম, টক হয়নি।
ডাল খেতে ভাল হয়েছে মা।
‘ভাত খাবার পর কি চা খাবি? চা বানাব?’
‘বানাও।’
আমি চা খেলাম খবরের কাগজ পড়লাম। ছাদে
হাঁটতে গেলাম। মা যখন এশার নামাজ পড়তে
জায়নামাজে দাঁড়ালেন তখন আমি এক অসীম সাহসী
কাণ্ড করে বসলাম। বাড়ি থেকে পালালাম। রাত ন’টায়
উপস্থিত হলাম এষার বাসায়। এষা আমার বান্ধবী। এষার
বাবা-মা খুবই অবাক হলেন। তাঁরা তক্ষুনি আমাকে
পৌঁছে দিয়ে আসতে চান। অনেক কষ্টে তাঁদের
আটকালাম। একরাত তার বাসায় থেকে ভোরবেলা
চলে গেলাম রুবিনাদের বাড়ি। রুবিনাকে বললাম, আমি
দুদিন তোদের বাড়িতে থাকব। তোর কি অসুবিধা
হবে? আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছি।
রুবিনা চোখ কপালে তুলে ফেলল। আমি বললাম,
তুই তোর বাবা-মাকে কিছু একটা বল যাতে তাঁরা
সন্দেহ না করেন যে আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে
এসেছি।
রুবিনাদের বাড়িতে দুদিনের জায়গায় আমি চারদিন
কাটিয়ে পঞ্চমদিনের দিন মা’র কাছে ফিরে যাওয়া
স্থির করলাম। বাড়ি পৌঁছলাম সন্ধ্যায়। মা আমাকে
দেখলেন, কিছুই বললেন না। এরকমভাবে
তাকালেন যেন কোথাও বেড়াতে গিয়েছিলাম।
ফিরে এসেছি। আমি চাপাগলায় বললাম, কেমন আছ
মা?
মা বললেন, ভাল।
‘তুমি মনে হয় আমার উপর ভয়ংকর রাগ করেছ। কী
শাস্তি দিতে চাও দাও। আমি ভয়ংকর অন্যায় করেছি।
শাস্তি আমার প্রাপ্য।’
মা কিছু বললেন না। রান্নাঘরে ঢুকে গেলেন।
আমি লক্ষ করলাম, বসার ঘরে অল্প-বয়েসি একটি
ছেলে বসে আছে। কঠিন ধরনের চেহারা।
রোগা, গলাটা হাঁসের মতো অনেকখানি লম্বা। মাথার
চুল তেলে জবজব করছে। সে খবরের কাগজ
পড়ছিল। আমাকে একনজর দেখে আবার খবরের
কাগজ পড়তে লাগল।
আমি মাকে গিয়ে বললাম, বসার ঘরে বসে আছে
লোকটা কে?
‘ওর নাম জয়নাল। আমার দূর সম্পর্কের আত্মীয়।
ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে। ফাইনাল ইয়ারে। এবছর পাশ করে
বেরুবে।’
‘এখানে কী জন্যে?’
‘তুই চলে যাবার পর আমি খবর দিয়ে আনিয়েছি। একা
থাকতাম। ভয়ভয় লাগত।’
‘আই অ্যাম সরি মা। এ রকম ভুল আর করব না। আমি
চলে এসেছি, এখন তুমি ওঁকে চলে যেতে
বলো।’
‘তুই আমার ঘরে আয় বুড়ি। তোর সঙ্গে আমার
জরুরি কথা আছে।’
আমি মা’র ঘরে গেলাম। মা দরজা বন্ধ করে
দিলেন। মা’র দিকে তাকিয়ে আমি চমকে উঠলাম।
এতক্ষণ লক্ষই করিনি এই পাঁচদিনে মা’র চেহারা,
স্বাস্থ্য সম্পূর্ণ ভেঙ্গে গেছে। তাঁকে
দেখে মনে হচ্ছে একটা জীবন্ত কঙ্কাল। মা
বললেন, তুই চলে যাবার পর থেকে আমি পানি ছাড়া
আর কিছু খাইনি। এটা কি তোর বিশ্বাস হয়?
আমি কাঁদতে কাঁদতে বললাম, হয়।
মা বললেন, দোকান থেকে ইঁদুর-মারা বিষ এনে
আমি গ্লাসে গুলে রেখেছি – তোর সামনে খাব
বলে। আমি যে তোর সামনে বিষ খেতে পারি
এটা কি তোর বিশ্বাস হয়?
আমি কাঁদতে কাঁদতে বললাম, হয়।
মা বললেন, এক শর্তে আমি বিষ খাব না। আমি যে-
ছেলেটিকে বসিয়ে রেখেছি তাকে তুই বিয়ে
করবি। এবং আজ রাতেই করবি। আমি কাজি ডাকিয়ে
আনব।
আমি বললাম, এসব তুমি কী বলছ মা!
‘এই ছেলে খুব গরিব ঘরের ছেলে। ভাল
ব্রিলিয়ান্ট ছেলে। আমি তাকে ইন্টারমিডিয়েট
থেকে পড়ার খরচ দিয়ে যাচ্ছি। তোর জন্যেই
করছিলাম। এই ছেলে বিয়ের পর এ-বাড়িতে
থাকবে, আমাদের দুজনকে দেখাশোনা করবে।
আমার মুখে কথা আটকে গেল। মাথা ঘুরছে। কী
বলব কিছুই বুজতে পারছি না। মা বললেন, টেবিলের
দিকে তাকিয়ে দেখ – গ্লাসে বিষ গোলা আছে।
এখন মন ঠিক কর। তারপর আমাকে বল।
সেই রাতেই আমার বিয়ে হল। নয়াটোলার
কাজিসাহেব বিয়ে পড়িয়ে দিয়ে গেলেন।
দেনমোহরানা এক লক্ষ টাকা। বিয়ে উপলক্ষে দামি
একটা বেনারসি পড়লাম। মা আগেই কিনিয়ে
রেখেছিলেন।
বাসর হল মা’র শোবার ঘরে।
আমার স্বামী বাসররাতে প্রথম যে-কথাটি আমাকে
বললেন, তা হচ্ছে- গত পাঁচদিন তুমি কার কার
বাড়িতে ছিলে আমাকে বলো। আমি খোঁজ
নেব।
আমি কঠিন গলায় বললাম, কী খোঁজ নেবেন?
আমার স্বামী বললেন, গরিব হয়ে জন্মেছি বলে
আজ আমার এই অবস্থা – বড়লোকের নষ্ট
মেয়ে বিয়ে করতে হল। নষ্টামি যা করেছ
করেছ। আর না। আমি মানুষটা ছোটখাটো কিন্তু ধানি
মরিচ। ধানি মরিচ চেন তো? সাইজে ছোট – ঝাল
বেশি।
আমার ধারণা শরীর থেকেই ভালবাসার জন্ম হতে
পারে। আমি আমার স্বামীকে ভালবাসলাম। আমার
ধারণা, এই ভালবাসার উৎস শরীর। মানুষের মন
যেমন বিচিত্র, তার শরীরও তেমনি।
আমি এবং আমার মা, আমরা দুজনই ছিলাম নিঃসঙ্গ।
তৃতীয় ব্যক্তি এসে আমাদের এই নিঃসঙ্গতা দূর
করল। বাড়ির একতালাটা মা আমাদের দুজনকে
ছেড়ে দিলেন। মা’র সঙ্গে থেকেও তাঁর কাছ
থেকে আলাদা থাকার স্বাদ খানিকটা হলেও পাওয়া
গেল। আমারা এসে আবার খেতাম। তখন আমার
স্বামী মজার মজার কথা বলে আমাদের খুব
হাসাতেন। আমার মা’কে তিনি বেশ পছন্দ করতেন।
আমরা হয়ত খেতে বসলাম, তিনি আমার মা’র দিকে
তাকিয়ে বললেন, আম্মা, আপনাকে এমন মনমরা
লাগছে কেন? তা হলে শোনেন একটা মজার
গল্প – মন ভাল করে দেবে। আমাদের দেশের
বাড়িতে সফদরগঞ্জ বাজারে এক দরজি থাকত। এক
ঈদে সে তিনটা হাতা দিয়ে এক পাঞ্জাবি বানাল…
গল্প এই পর্যন্ত শুনেই মা হাসতে হাসতে
ভেঙ্গে পড়লেন। মা হাসছেন, আমি হাসছি আর
উনি মুখ গম্ভীর করে বসে আছেন কখন আমরা
হাসি থামাব সেই অপেক্ষায়।
ঘরজামাইদের নানারকম ত্রুতি থাকে। তারা সারাক্ষণ
শ্বশুরবাড়ির টাকাপয়সা সম্পর্কে খোঁজখবর করে।
তাদের চেষ্টাই থাকে কী করে সবকিছুর দখল
নেয়া যায়। আমার স্বামী তা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত
ছিলেন। তিনি কখনো এসব নিয়ে মাথা ঘামাননি।
অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। রাতদিন পড়াশোনা
নিয়ে থাকতেন। অবসর সময়টা মাকে গল্প
শোনাতে পছন্দ করতেন। আমাকে গল্প
শোনানোর ব্যাপারে তিনি তেমন আগ্রহ বোধ
করতেন না। আমার শরীর তিনি যতটা পছন্দ
করতেন আমাকে ততটা করতেন না।
বিয়ের দুমাস যেতেই আমার ধারণা হল সম্ভবত আমি
‘কনসিভ’ করেছি। পুরোপুরি নিশ্চিতও হতে পারছি না।
একই সঙ্গে ভয় এবং আনন্দে আমি অভিভূত।
এক রাতে স্বামীকে বললাম। তিনি সরু চোখে
দীর্ঘ সময় আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
পেটে বাচ্চা?
আমি চুপ করে রইলাম।
‘বয়স কত বাচ্চার?’
‘জানি না। আমি কি করে জানব? ডাক্তারের কাছে
নিয়ে চলো, ডাক্তার দেখে বলুক।’
‘ডাক্তারের কাছে নিতে হবে না। বাচ্চা কখন
এসেছে সেটা তুমিই জান। ঐ যে পাঁচ রাত ছিলে
অন্য জায়গায়, ঘটনা তখন ঘটে গেছে।’
‘কী বলছ তুমি!’
‘এরকম চমকে উঠবে না। চমকে ওঠার খেলা
আমার সাথে খেলবে না। তোমার পেটে অন্য
মানুষের সন্তান।’
আমি হতভম্ব।
আমার স্বামী কুৎসিততম কথা কটি বলে বাতি নিভিয়ে
শুতে এলেন এবং অন্যসব রাতের মতোই
শারীরিকভাবে আমাকে গ্রহণ করলেন। ঘৃণায় আমি
পাথর হয়ে গেলাম।
আমি সত্যি সত্যি মা হতে যাচ্ছি এই ব্যাপারে
পুরোপুরি নিশ্চিত হবার পর আমার জীবন দুর্বিষহ
হয়ে পড়ল। আমার স্বামীর মনে এই ধারণা বদ্ধমূল
হল যে সন্তানটির পিতা তিনি নন। অন্য কেউ। মানসিক
নির্যাতনের যত পদ্ধতি আছে দিনের বেলা তাঁর
প্রতিটি তিনি প্রয়োগ করেন। রাতে আমাকে গ্রহণ
করেন সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে। দিনের কোনো
কিছুই তখন তাঁর মনে থাকে না।
আমার স্বামী আমাকে বললেন, বাচ্চাটিকে তুমি
নষ্ট করে ফেলো। যদি নষ্ট করে ফেল তা
হলে আমি আর কিছু মনে পুষে রাখব না। সব ভুলে
যাব। সব চলবে আগের মতো। তুমি মেয়ে খারাপ
না।
আমি বললাম, বাচ্চা আমি নষ্ট করব না। এই বাচ্চা
তোমার।
‘চুপ থাকো। নষ্ট মেয়েছেলে!’
‘তুমি দয়া করে আমাকে বিশ্বাস করো।’
‘চুপ চুপ । চুপ বললাম – পাঁচ রাত বাইরে কাটিয়ে ঘরে
ফিরেছ। রাতে কী মচ্ছব হয়েছিল আমি জানি না?
ঠিকই জানি। আমি খোঁজ নিয়েছি।’
‘তুমি কোনো খোঁজ নাওনি।’
‘চুপ। চুপ বললাম।’
আমি দিনরাত কাঁদি । আমার মাও দিনরাত কাঁদেন। এক
পর্যায়ে মা আমাকে বলতে বাধ্য হলেন – বাচ্চাটি
নষ্ট করে ফেলাই ভাল। বাচ্চাটা তুই নষ্ট করে
ফেল। সংসারে শান্তি আসুক।
আমি বললাম, আমার শান্তি দরকার নেই। অশান্তিই ভাল।
মানসিক আঘাতে আঘাতে আমি বিপর্যস্ত। একদিন
ইচ্ছে করেই আমার স্বামী আমার পেটে লাথি
বসালেন। এই আশায় যেন গর্ভপাত হয়ে যায়। আমি
দুহাতে পেট চেপে বসে পড়তেই তিনি গভীর
আগ্রহে বললেন, কী, যন্ত্রণা খালাস হয়ে
গেছে? রাতে আমি ঘুমুতে পারি না। দিনে
খেতে পারি না। ভয়ংকর অবস্থা। আমার পেতের
বাচ্চাটির বৃদ্ধিও ব্যাহত হচ্ছে। ডাক্তার প্রতিবারই
পরীক্ষা করে বলেন – বেবির গ্রোথ তো
ঠিকমতো হচ্ছে না। সমস্যা কী? আরও
ভালমতো খাওয়াদাওয়া করবেন। প্রচুর বিশ্রাম
করবেন। দৈনিক দুগ্লাস করে দুধ খাবেন।
আন্ডারওয়েট বেবি হলে সমস্যা। এই দেশে
বেশির ভাগ শিশুমৃত্যু হয় আন্ডারওয়েটের জন্য।
আমার সন্তানের যখন ছমাস তখন ভয়াবহ বিপর্যয়
ঘটল। আমার স্বামী এক সকালে চায়ের টেবিলে
শান্তমুখে ঘোষণা করলেন – আমি আজ এই বাড়ি
ছেড়ে চলে যাচ্ছি। আপনারা আমার কথা
শোনেননি। সন্তানটাকে নষ্ট করতে রাজি হননি।
কাজেই আমি বিদায়। তবে আরেকটা কথা – যদি
সন্তানটা মৃত হয়, মৃত হবারই কথা – তা হলে আমি
আবার ফিরে আসব। অতীতে যা ঘটেছে তা
মনে রাখব না। রূপা মেয়ে খারাপ না। পাকেচক্রে
তার পেটে অন্য পুরুষের সন্তান এসে গেছে।
আমি সেই অপরাধ ক্ষমা করে দিয়েছি। সন্তান মৃত
হলে সব চলবে আগের মতো।
আমার মা কঠিন গলায় বললেন, সন্তান মৃত হওয়ার কথা
তুমি বললে কেন? এই কথা কেন বললে?
‘বললাম, কারণ আমি জানি সন্তান মৃত হবে। আমি…
আমি..’
‘তুমি কী?’
আমার স্বামী আরকিছু বললেন না। মা’র অনুরোধ,
কান্নাকাটি, আমার কান্না – কিছুতেই কিছু হল না, তিনি
চলে গেলেন। আমি অসুস্থ হয়ে পড়লাম। প্রচণ্ড
জ্বর, গায়ে চাকাচাকা কী সব বেরুল, মাথায় চুল
পড়ে গেল। ভয়ংকর ভয়ংকর স্বপ্ন দেখতে শুরু
করলাম। সেই সময়ের সবচে’ কমন স্বপ্ন ছিল –
আমি একটা ঘরে বন্দি হয়ে আছি। ঘরে কোনো
আসবাবপত্র নেই। শাদা দেয়াল। হঠাৎ সেই দেয়াল
ফুঁড়ে একটা কালো লম্বা হাত বের হয়ে এল। হাত
না, যেন একটা সাপ। সাপের মাথা যেখানে থাকে
সেখানে মাথার বদলে মানুষের আঙুলের মত
আঙুল। হাতটা আমাকে পেঁচিয়ে ধরল। ঠাণ্ডা কুৎসিত
তার স্পর্শ। ঘুম ভেঙ্গে যায়। দেখি সারা শরীর
ঘামে চটচট করছে। বাকি রাতটা জেগে থাকার
চেষ্টা করি। আবার একসময় তন্দ্রার মতো আসে।
সে একই স্বপ্ন দেখি, চিৎকার করে জেগে
উঠি।
যারা গল্প পড়ে ৫ রেটিং দেয় না তারা দেশ ও যাতির দুশমন
(চলবে...)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now