বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
বাবা,
কেমন আছ তুমি? আমার না তোমার কথা খুব মনে পড়ছে, তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছা করছে।। আচ্ছা তোমার কি আমাকে দেখার ইচ্ছা হয় না, তোমার এই ছোট্ট মামণিটাকে কোলে নিতে ইচ্ছা করে না? ইচ্ছা করে না তোমার এই মামণিটাকে সাথে নিয়ে চিড়িয়াখানায় ঘুরতে যেতে?
কমদামী আইস্ক্রীম কিনে দিয়েছ বলে রাগ করে থাকা মামনিটার গালে দুটো চুমু দিয়ে আদর করে দিতে। যদি করেই থাকে তাহলে আমাকে এখানে একা রেখে তুমি অত দূরে চলে গেলে কেন?
তুমি জানো তোমাকে ছাড়া এখানে আমার কত কষ্ট হয়। তুমি বুঝি ভূলে গেছ আমি নিজে মাছের কাটা বেছে খেতে পারিনা। তুমি আমার মাথায় হাত রেখে ঘুমপাড়ানি গান না বললে আমার ঘুম আসতে চায়না তুমি জানোনা।।
আমার স্কুলের সবার জন্মদিনে তাদের আব্বু আম্মু তাদের নিয়ে ঘুরতে যায়, আর তুমি? তুমি তো একা একা আমায় এখানে ফেলে রেখে ভালোই চলে গেছ।।
আব্বু জানো আমার এখনো মনে আছে আম্মু যেদিন আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলো, তুমি তখন খাটের এক কোণে চুপ করে বসেছিলে আর আম্মু বলছিল আমি আর পারছিনা। সতীনের মেয়েকে নিয়ে আমি আর তোমার ঘর করতে পারবোনা।
আমারও একটা ছেলে আছে এবার হয় তোমার ওকে বাদ দিতে হবে নাহয় আমাকে, তবু তুমি চুপ করে ছিলে।
আচ্ছা আব্বু আমাকে আম্মু সতীনের মেয়ে বলেছিল কেন? আমিও তো আম্মুর মেয়েই ছিলাম তাই না।।সেদিন আম্মু বাবুকে নিয়ে চলে গিয়েছিলো নানুদের বাসায় আর কখনোই আসেনি কেন?
জানো আমার না বাবুকে দেখতে খুব ইচ্ছা করে, জানতে ইচ্ছা করে বাবু কত বড় হয়েছে। আচছা বাবা, বাবু কি এখন তার এই আপুনিটাকে চিনতে পারবে?
আম্মু যেদিন চলে যায় সেদিন তোমার চোখ দিয়ে অনেক পানি ঝড়েছিল আম্মু সেটা দেখেনি কিন্তু আমি দেখেছিলাম।। কিছুদিন পর যখন তুমিও অসুস্থ হলে, তোমাকে যখন হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিল তখন আমি অনেক অনেক কেদেছিলাম।।
সবাই বলাবলি করছিল তোমার নাকি ব্রেইন ক্যান্সার হয়েছে। আমি ভেবেছিলাম ব্রেইন ক্যান্সার
বুঝি জ্বরের মত কোন অসুখ, অসুধ খেলেই সেরে যাবে।। তারপর পরদিন সকালে যখন তুমি ঘুমাচ্ছিলে আর সবাই কান্না করছিল, আমার তখন তোমাকে ঘু্মপাড়ানি গান শুনাতে মন চাচ্ছিল।
কিন্তু কে জানি বলছিলো তুমি নাকি অনেক দূরে চলে গেছ আর কখনোই নাকি ফিরে আসবে না, আমি তখন ওদের কথা বিশ্বাস করিনি কারণ তুমি তো তখন আমার পাশে শুয়ে ঘুমাচ্ছিলে। তারপর সবাই মিলে তোমাকে সেদিন কি একটা কাঠের বাক্সে করে কোথায় নিয়ে চলে গেল আর ফিরে আসনি।।
আব্বু তোমার মেয়েটার যে তোমাকে ছাড়া একমহুর্তও ভালো লাগে না। তুমি বোঝনা।
এই ছোট্ট ঘরটা তে মরচে ধরা ইটের গন্ধে আমার প্রচন্ড এলার্জি হয়। রাতের বেলা একা ঘুমুতে গিয়ে হুট করে ঘুম ভেঙ্গে যায়। বাবা ফিরে আসোনা তুমি, অনেকদিন যে আমি ভাত খেতে চাইতাম না বলে তুমি কোলে বসিয়ে জোর করে ভাত খাওয়াও না। গোসল করতে চাইতাম না বলে কিছুটা কপট রাগ দেখিয়ে জোর করে গোসল করিয়ে দাও না।
তুমি যে বলেছিলে আমি এমন করলে একদিন তুমি হারিয়ে যাবে, তাও আমি এমন করতাম বলেই বুঝি তুমি হারিয়ে গেছ তাই না বাবা। বাবা আর একবার শুধু ফিরে আসো তুমি, কথা দিচ্ছি আর একফোটাও জ্বালাবো না তোমায়। তুমি বলার আগেই গোসল করবো, ঠিকঠাক মত খাওয়াদাওয়া করবো। আর মাঝে মাঝে তোমার সাথে সিটি পার্কের ওদিকটায় ঘুরতে যাবো। তুমি সস্তাদামের আইস্ক্রীম কিনে দিবে আমি তোমায় আবার কপট রাগ দেখাবো। তখন তোমার ভয় পাওয়া মুখটা দেখে আমার খুব মায়া হবে, আর আমি বলবো ইসরে! আমার ছেলেটা খুব ভয় পেয়েছে।
বাবা, আমি জানিনা তুমি এখন কোথায় আছো,। তবে সেদিন আমার এক বান্ধবী বলেছে তুমি নাকি আল্লাহর কাছে চলে গেছ।। আমি জানিনা ওখান থেকে তুমি আমার চিঠিটা পাবে কিনা কিন্তু একটা কথা প্লীজ আব্বু হয় তুমি চলে আস নইলে তুমি যেখানে আছো আমাকেও সেখানে নিয়ে যাও।
ইতি,
তোমার মেয়ে
ফারিহা
".......
কোন একটা অনাথ আশ্রমের পাশ দিয়ে হাটার সময় এই ছোট ছোট, কাপা কাপা হাতের লেখা চিঠিটা পাই আমি।
চিঠিটা পড়ে প্রচন্ড একটা খারাপ লাগার অনুভূতি জেকে ধরে আমাকে।
আমি সাথে সাথে চলে যাই আশ্রমের সুপারিন্টেনডেন্ট এর কাছে। গিয়ে জিজ্ঞাসা করি ফারিহার কথা। সেই সাথে চিঠিটাও দেখাই তাকে।
সুপারিন্টেনডেন্ট কিছু বলার আগেই দেখি তার চোখে চিকচিক করছে জল। আমি বুঝতে পারি কোন একটা গল্প আছে এখানে। বুকের ভেতরে অজানা একটা ভয় জেকে বসে মেয়েটার কিছু হয়নি তো!
এবার আমার সামনের মানুষটা বলে উঠে, এমন হাজারও চিঠি আছে এই আশ্রমের যেখানে সেখানে। প্রতিদিন একটা করে চিঠি লিখতো মেয়েটা আর মাঝে মাঝে দুই একটা চিঠি বেলুনে বেধে আকাশে উড়িয়ে দিতো।
আসলে ওর গল্পটা নিশ্চয় আপনি চিঠিটা পড়েই কিছুটা বুঝতে পেরেছেন।
খুব ছোটবেলায় ওর মা মারা
যান। ওর বাবা ওকে একাই মা বাবার আদরে মানুষ করা শুরু করে। কিন্তু বাবা তো, একদিন একটু বেখেয়ালে পুকুরের পানিতে ডুবে যায় ও, ভাগ্য ভালো থাকায় কেউ একজন দেখে ফেলে ফলে সে যাত্রায় বেচে যায় মেয়েটা।
এরপর সবাই মিলে অনেকটা জোর করেই ওর বাবাকে বিয়ে করতে বাধ্য করে। বিয়ের প্রথম বছর নিজের মায়ের মতই কেয়ার নিত ওর নতুন মা। কিন্তু কপাল মন্দ মেয়েটার। একবছর পর যখন ওর একটা ভাই জন্ম নেয় তখনি মিথ্যে খোলস থেকে বেরিয়ে আসে ওর সৎ মায়ের আসল রূপ। একসময় ওকে নিয়ে ওর বাবার সাথে রাগ করে বাপের বাড়িতে চলে যায়।
একটু কষ্ট হলেও বাবার আদরেই আবার কিছুটা ভালো দিন কাটতে লাগে মেয়েটার কিন্তু বিধি বাম। "অভাগা যেদিকে চায় সাগর শুকায়ে যায়" এবারে ব্রেইন ক্যান্সারে মারা যায় ওর বাবা। তখন থেকেই এই অনাথ আশ্রমে ঠাই হয় ওর। সেই থেকেই বারবার ওর আব্বুকে ফিরে আসার মিনতি জানিয়ে চিঠি লিখতো ও।
এমন করেই ধীরে ধীরে কেটে যায় ৩ টা বছর। তারপর কোন একদিন কে যেন ওকে বলে উচু পাহাড়ের উপরে উঠে বেলুনে বেধে চিঠি পাঠালে ওর আব্বুর কাছে চিঠিটা পৌছাবে। আর তাই আশেপাশে বড় পাহাড় নেই বলে রাস্তার ওপাশে গিয়ে বড় টিলাটার উপরে উঠে বেলুনে বেধে চিঠি উড়িয়ে দিতো ও। মেয়েটার বুকে রাখা কষ্ট জেনে ওকে তেমন কিছুই বলতাম না আমরা। এমন করেই একদিন রাস্তা পার হতে গিয়ে এক্সিডেন্ট করে না ফেরার দেশে চলে যায় মেয়েটা।
ঝরঝর করে কেদে ফেললেন সুপারিন্টেনডেন্ট, আমার চোখেও যেন জলের বাধ ভেঙ্গেছে।
-আচ্ছা আমি কি ওর রুমে যেতে পারি।
-আচ্ছা চলুন। বলে পা বাড়াল সুপারিন্টেনডেন্ট। ওর চলে যাওয়ার পর থেকেই খালি পড়ে আছে রুমটা।
এই রুমেই থাকতো ফারিহা, বলে রুমটা দেখিয়ে চলে গেলেন উনি।
আস্তে করে দরজাটায় ধাক্কা দিলাম অনেকদিন ধরেই অব্যবহৃত রুমের দরজাটা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে খুলে গেল।
ছোট্ট একটা বেড, দেয়ালে টানানো মেয়েটার ছবি। একটা নিষ্পাপ চাহনি সেখানে। চারপাশে অনেকগুলো চিঠি ছড়ানো ছিটানো। আর পুরোটা রুমজুড়ে যেন বাবা বাবা আর্তনাদ।
বেরিয়ে এলাম ওখান থেকে। আমার সাথে সাথে আকাশটার চোখেও জল। হাটতে লাগলাম চুপচাপ।
কোন একটা অনাথ আশ্রমের ছোট্ট ঘরে মরচে ধরা ইটের বদ্ধ চারদেয়ালে এভাবেই বন্দী হয়ে যায় নিষ্পাপ কিছু মনের চাওয়া আর আর্তনাদ, অনেক গুলো না পাওয়া, আর কোন একটা আদর স্নেহ ভালোবাসা পাওয়ার আকুতি। বাবা বাবা আকুতি।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now