বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
শেষ চুমুক দিয়ে মুখের সামনে থেকে চা টা টেবিলে
রাখতেই দেখতে পেলাম লতিফ এসে হাজির। হাপাতে হাপাতে
আমার সামনে এসে বলল-
--- সব্বনাশ হয়ে গেছে বাবু।
বিস্ময়সূচক ভাব নিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম-
--- কি??? কি হয়েছে?
মুহুর্তেই লতিফের মুখটা ফ্যাকাসে দেখতে পেলাম। মাথা নিচু
করে আমার দিকে আমতা আমতা করে বলল-
--- আপনার প্রিয় সেই ফুলগাছটা আর নেই বাবু।
--- হোয়াট??? কি বলছো তুমি এসব?
--- হ্যাঁ বাবু। আমি বাজারে গিয়েছিলাম। আর এসে দেখি ওটা নেই।
অথচ যাওয়ার সময় ঠিকই দেখেছিলাম।
--- আচ্ছা, তুমি যাও। দুপুরের খাবার রেডি কর।
.
এক নিমিষেই আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। ওই ফুলগাছটা আমার খুব
প্রিয়। প্রিয় বলতে অসম্ভব প্রিয়। জবা ফুলের গাছ।এটা প্রিয় হবার
দুটা কারণ আছে। এক, ওটাতে এখন ফুল ফুঁটতে শুরু করেছে।
আর দুই, ওটা আমাকে রাজেশ দিয়েছিলো। রাজেশ আমার
ছোটবেলার বন্ধু। আমরা একসাথেই বড় হয়েছি। একসাথেই
লেখাপড়া করেছি।
রাজেশের কথা মনে হতেই আমার বুকটা ধড়পড় করে উঠল। হ্যা,
রাজেশ পাঁচ বছর আগে মারা গেছে। গলায় ফাঁস দিয়েছিল
রাজেশ। যেটাকে বলে অপঘাতে মৃত্যু। রাজেশ মরার ঠিক
একদিন আগে আমাকে জড়িয়ে ধরে অনেক্ষণ কেঁদেছিল।
তখন বুঝিনি কারণটা। এখন বেশ ভালোভাবে বুঝি।
.
আমাদের ঘরের তিনটা ঘরের পরেই রাজেশের ঘর। প্রতিদিন
ওদের ঘরে যাওয়া আসা হত আমার। আমাদের ঘরেও ও
আসতো। আমার আর রাজেশের বন্ধুত্ব এমনি ছিল যে পাড়ার
সকলে ভাবতো আমরা আপন ভাইয়ের মতো। সবকিছু ঠিকঠাক
চলছিলো। কিন্তু কয়েকদিন পর হল সমস্যা।
রাজেশ একটা মেয়ের প্রেমে পড়েছে। নাম মিথিলা।
আমাদের পাশের গ্রামের মেয়ে। আস্তে আস্তে রাজেশ
ওর প্রতি বেশ দুর্বল হয়ে পড়ে। আমাকে এখন আগের
চেয়ে কম সময় দেয়। ঠিকমতো দেখা করেনা। কথা বলেনা।
যখনি ওর ঘরে যেতাম দেখতাম ও মোবাইলে কথা বলতো।
আর আমাকে এভয়েড করত।আমিও সব মেনে নিয়েছিলাম। থাক
না ও ওর মতো। আমারি তো বন্ধু।
.
এর ঠিক ১৬ দিন পরের কথা। হঠাৎ একদিন আমার ঘরে রাজেশ এসে
হাজির। মুখটা বেসম্ভব কালো হয়ে আছে। বুঝলাম কিছু একটা
ঘটেছে। শোফায় বসার ইশারা করে জিজ্ঞেস করলাম-
--- কি রে? কি হয়েছে
রাজেশ আমার হাতটা ধরে ফুফিয়ে উঠে বলল-
--- আমার সব শেষ হয়ে যাচ্ছে দোস্ত। আমাকে বাচা। কিছু একটা
কর।
চোখ দুটা কপালে তুলে বললাম-
--- আবে সালা। কি হয়েছে সেটা তো বলবি।
--- আগামী সোমবার মিথিলার বিয়ে।
মাথায় আকাশ ভেংগে পড়ল মনে হয়। রসিকতা করে বললাম-
--- তো আমাকে দাওয়াত দিতে এসেছিস? আরে আমি এমনিই যাব।
--- নির্জন প্লিজ। আমার কি অবস্থা তুই কি বুঝতে পারছিস? আর তুই
আছিস মজা নিয়ে।
--- ওকে ওকে। আমাকে কি করতে হবে সেটা বল।
--- বিয়েটা আটকা। নয়তো আমি মরে যাব। মিথিলাকে ছাড়া আমি
বাঁঁচবনা।
.
শুক্রবার আমরা সব বন্ধুরা মিলে ঠিক করলাম যে করেই হোক
বিয়েটা আটকাতে হবে। আমরা গেলাম মিথিলার বাড়িতে। ওর
বাবাকে সব বুঝালাম। কাজ হলনা। উলটা আমাদের তাড়িয়ে দিয়েছে
আর শাসিয়ে দিয়েছে পুলিশে দেবে বলে।
এরপর মিথিলাকে শেষ প্রশ্ন করলাম। সরাসরি কোন উত্তর দিলনা।
যা বুঝলাম তা হল, বাবাকে কষ্ট দিয়ে সেও কিছু করতে পারবেনা।
আমরা আর কিছুই করতে পারিনি। মিথিলার শেষমেশ বিয়ে হয়েই
গেল। পাগলের মতো হয়ে যায় রাজেশ। আমরা সান্তনা
দিয়েছিলাম ঠিকই কিন্তু তার চেয়েও বেশি বকেছিলাম ওকে।
এমন একটা মেয়ের সাথে সম্পর্ক করেছে যে কিনা তার জন্য
একবারও ভাবলোনা। দিব্যি চলে গেল বউ সেজে অন্যের
ঘরে।
.
এরপর কয়েকদিন কেটে যায়। রাজেশ অনেকদিন ঘর থেকে
তেমন বের হয়নি। হঠাৎ একদিন আমাকে ধরে অনেক্ষন
কেঁদেছিল। আমিও কেঁদেছিলাম। তার ঠিক দুইদিন পরেই রাজেশ
গলায় ফাস দিয়ে মারা যায়। সেদিন অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম আমি।
একটা প্রেম কত কিছুইনা ধ্বংস করে দিতে পারে!
.
রাজেশের কথা ভাবতে ভাবতে আমার দুই চোখ ভিজে গেল।
কত ভাল বন্ধুই ছিল ও আমার। কিন্তু একটা জিনিস বুঝতে পারছিনা।
ফুলগাছটা চুরি করল কে? ওটা রাজেশ মারা যাওয়ার আগের বছর
ফ্রেন্ডশিপ ডে তে আমাকে গিফট দিয়েছিল। তখন বুঝতে
পারিনি ওটাই ওর শেষ স্মৃতি হয়ে থাকবে। কিন্তু এখন ত সেটাও
নেই। এসব ভাবতে ভাবতেই আমার কপালে চিন্তার রেখা ফুটে
উঠল। আমি বেশ গভীরভাবে চিন্তা করে দেখলাম কেন আমার
ফুলগাছটা মিসিং!
.
তারও ঠিক তিনদিন পরে...
.
আমি একটা স্বপ্ন দেখলাম! ভয়ানক বেপার! ফুলগাছটা চুরি হওয়াতে
রাজেশ আমাকে ঝাড়ি দিচ্ছে।অপমান ও করছে হালকা পাতলা। আমি
কিচ্ছু বলতে পারছিনা।শুধু 'থ' হয়ে দাড়িয়ে আছি।ও বলছে আমি নাকি
তাকে একদম ভালবাসিনা তাই অই গাছটার প্রতি খেয়াল রাখিনি। ঠিক এই
কথাটাই আমাকে প্রচণ্ড রকমের কস্ট দিল।আমি রাজেশকে খুব
ভালবাসতাম।এখনো বাসি!
দুই একদিনের মধ্যেই আমার শোচনীয় অবস্থা হয়ে দাড়াল।
ঠিকমতো খেতে পারছিনা।ঘুমুতে পারছিনা।
.
আমি একজন সরকারি কর্মকর্তা। পোস্টিং হয়ে এই বাংলো তে
আছি।সরকারি কতগুলা প্রজেক্ট সাবমিশন করতে হবে আমাকে।
কিন্তু ঐ ফুলগাছটা নিয়ে আমি এতটাই দিশেহারা হয়ে গেলাম যে,
আমি কোন কাজই করতে পারছিনা। বলতে গেলে পাগলের
মতো হয়ে গেলাম। চারিদিকে খালি ফুলগাছটার খোজ করছি।
একে ওকে! যাকে তাকে! সবাইকে শুধু একটাই প্রশ্নঃ আমার জবা
ফুলের গাছটা দেখেছো?
.
অনেকে আমাকে ইতোমধ্যে পাগল বলা শুরু করে দিয়েছে।
আমার চাকরি চলে যাওয়ার পথে। মোট কথা, একটা ফুলগাছের
জন্য আমি এখন সম্পূর্ণ অসহায়। আমার জীবনটাই আজ দুর্বিষহ।
কিন্তু তা আর বেশিদিন আমাকে সহ্য করতে হয়নি। আশ্চর্যকর
ঘটনা হচ্ছে এই যে, একদিন সকালেই আমি ঠিক আগের
জায়গাতেই দেখতে পেলাম আমার সেই বহুল কাঙ্খিত জবা
ফুলের গাছটা!
.
বেশ অবাক হলাম। কোথায় গিয়েছিল আর কেনই বা ফিরে এল!
তবে তাতে আমার উপকারই হয়েছে।ফুলগাছটা পেয়ে আমি
আবার আগের মতোই স্বাভাবিক। কাজকর্মও ঠিকভাবে চলছে।
.
এভাবে অনেকদিন কেটে গেল। একদিন ভোরে বাগানে
হাটছিলাম। ফুলগাছটাকেও দেখছিলাম। কলি এসেছে। অনেক
সুন্দর দেখাচ্ছে ওটাকে। আমার মুখেও হাসির রেখা ফুটল।
তৎক্ষনাৎ আমার মনে হল ফুলগাছটা নড়ে উঠল। চোখটাকে
মুছে নিলাম। আবার দেখলাম। হ্যা, আমি ঠিকি দেখছি। কিন্তু এটা
কেমনে সম্ভব!
আচ্ছা, কলিগুলা কি আমাকে কিছু বলছে? কিছু জানানোর চেষ্টা
করছে?
আমার সর্বশক্তি আর ষষ্ট ইন্দ্রিয় দিয়ে বুঝার চেষ্টা করলাম...
.
"দোস্ত, আমি জানি তুই খুব অবাক হচ্ছিস! অবাক হবার কিচ্ছু নেই।
আমি এ তুর ফুলগাছ। এটা আমি তুকে দিয়েছিলাম কারণ আমি তুকে
ভীষণ ভালবাসি। আমি মরেছি মিথিলার জন্য ঠিকি কিন্তু মরার পর
বুঝতে পারছি যে আমি কতবড় ভুল করেছি। তুর মত বন্ধুকে
ফেলে আমি এখানে ভাল নেই রে। আমার খুব আযাব হয়
এখানে, খুব কষ্ট। আর তাই আমি তুর কষ্ট সহ্য করতে পারিনি। আমার
শেষ স্মৃতি ধরে রাখতে না পেরে তুই যেভাবে পাগলের মত
হয়ে গেছিস,এটা আমি মানতে পারিনি। আর তাই নিজেই এই জায়গায়
ফুলগাছ হয়ে আছি। শুধুই তুর জন্য। ভাল থাকিস আর হ্যা, জিবনেও
কখনো প্রেম করিসনা দোস্ত।"
.
মাথাটা ভনভন করছে আমার। কি দেখলাম আর কি শুনলাম এসব!
রাজেশ আমার কাছে! এই ফুলগাছ!
বাকিটা আর ভাবতে পারিনি।ওখানেই বেহুঁশ হয়ে পড়ে যায়...
যখন জ্ঞান ফিরল তখন দেখলাম আমি আমার রুমে শুয়ে আছি।
পাশেই লতিফ আর গ্রাম্য ডাক্তার। সাথে আরও কয়েকজন অচেনা
লোক। আমি কিছুই বললাম না। কালকের ঘটনাটাকে ব্যাখ্যা করার বৃথা
চেষ্টা করতে যাব ঠিক এমন সময় হুড়মুড় করে একটা লোক
এসে আমাদের অবাক করে দিয়ে বলল-
--- স্যার, আপনার চুরি হওয়া সেই ফুলগাছটা পাশের গ্রামের দাগাই
চোরের বাড়িতে পাওয়া গেছে! আমরা কি গিয়ে নিয়ে
আসবো!!!
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now