বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
স্বপন একমনে বনরুটি চিবোচ্ছিল। আপাতত এটা তার সকালের নাশতা। টঙয়ের বনরুটির গুণগত মান এখন আগের চাইতে অনেক খারাপ, খেলেই এসিডিটি হয়। কিন্তু কিচ্ছু করার নাই, পকেটের সম্বল বুঝে ব্যয় করতে হবে।
এই একটু আগে সে একটা ইন্টারভিউ বোর্ড থেকে বের হয়েছে। টানা তিনঘণ্টা বসে থাকার পর যখন সে ঢোকে, সকালের সেই উত্তেজনা-উদ্দীপনা কিছুই আর অবশিষ্ট ছিল না। সে শুধু ইন্টারভিউ শেষ হওয়ার অপেক্ষা করছিল। ইন্টারভিউ বোর্ডের মানুষগুলোর ব্যবহার দেখলে স্বপন সবসময়ই বিস্মিত হয়! এখনকার বাংলাদেশে মানুষ এখনো এত ভাল ব্যবহার করে তা স্বপনের জানা ছিল না। তার কথোপকথনগুলো হয় অনেকটা এরকম-
“স্বপন ... আহমেদ। বাহ্। ভারি স্মার্ট নাম। তা পড়াশোনা কোথায়?”
“জ্বি, রুয়েট।”
(পাশ থেকে একজন) “ও, রাজশাহী ইঞ্জিনিয়ারিং? আগে যে বিআইটি ছিল?”
“জ্বি স্যার।”
“তার মানে তো ব্রাইট স্টুডেন্ট। গুড। ইলেকট্রিকাল ... ইঞ্জিনিয়ারিং? গুড গুড। ভেরি গুড। আচ্ছা, বলুন তো দেখি, পৃথিবীতে এখন হঠাৎ করেই যদি সূর্য ওঠা বন্ধ করে দেয়, তাহলে আমরা ইলেকট্রিসিটি কোথা থেকে পাব?”
স্বপন থতমত খেয়ে যায়। প্রথমে ভাবল, সোলার এনার্জী বন্ধ হলেও তো রিসার্ভ জীবাশ্ম দিয়ে চলবে, উইন্ডমিলে চলবে, হাইড্রো ইলেকট্রিকে চলবে। পরে ভাবল, সূর্য না থাকলে তো এগুলোও আর নতুন করে তৈরী হবে না। উদ্ভিদ জন্মাবে না, অক্সিজেন থাকবে না। সে ভেবেচিন্তে উত্তর দেয়, “স্যার, সূর্য না থাকলে ইলেকট্রিসিটির দরকার পড়বে না।”
প্রশ্নকর্তারা একে অন্যের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। বোর্ডের চেয়ারম্যান হেসে বলে, “ইন্টারেস্টিং। সেটা কিরকম?”
“কোন মানুষ বা প্রাণী বাঁচবে না স্যার। ইলেকট্রিসিটি দিয়ে কি হবে?”
বনরুটির শেষ টুকরাটা মুখে পুরে দেয় স্বপন। একটা কলা নেবে কি না তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভোগে। পকেটে পাঁচ টাকাই বাকি, বাসভাড়া। কলা খেয়ে নিলে বাকি রাস্তা হাঁটতে হবে। অনেক ভেবেচিন্তে সে পানি গিলে নেয়। পানির অপর নাম জীবন।
“ইউ আর ভেরি ব্রাইট এন্ড ইন্টেলিজেন্ট। থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ।” চশমার ফাঁক গলে তাকিয়ে তাকে বলে ইন্টারভিউ বোর্ডের হেড।
পাশ থেকে একজন মহিলা প্রশ্ন করেন, “আপনি নিজেকে কেন এই পোস্টের যোগ্য মনে করেন? আপনার ভেতর এমন কি আছে যা আর বাকিদের থেকে আলাদা? এবং সেটা কি করে আমাদের কোম্পানির জন্য প্রফিটেবল হবে?”
স্বপন কাঁচের দেয়াল দিয়ে বাইরে তাকায়। বিশ তলার ওপর থেকে নিচের ব্যস্ত শহরটা চোখে পড়ে, মানুষের যান্ত্রিক ছুটে চলা আর দৈনন্দিন খুনসুটিগুলো খুব ক্ষুদ্র মনে হয় এতদূর থেকে।
“সত্যি কথা বলতে গেলে আমার ভেতর এমন কিছুই নেই যা বাকিদের তুলনায় আলাদা। আমি খুব সাধারণ একজন মানুষ, আর সবার মতই। কিন্তু আমি এটা স্বীকার করে নিচ্ছি, যা অন্যরা করছে না। আমার ভেতর অহংকার বা হিংসা বলতে কিছু নেই, কেননা আমি জানি আমি খুব সাধারণ। এটা আপনাদের কোম্পানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ, নির্ভেজাল একজন এমপ্লয়ী পাওয়া।”
প্রশ্নকর্তাদের খুব একটা সন্তুষ্ট মনে হয় না। তারা গৎবাধা উত্তর আশা করে, তারা যন্ত্র আশা করে। যন্ত্র হলে যন্ত্রের মত কাজ করানো যায়, স্বপনকে দিয়ে যা হবে না।
হেড ইন্টারভিউয়ার আবার স্বপনের ফাইলটা হাতে নেয়, “আপনার প্রিভিয়াস জব সম্পর্কে বলুন। সেখানে আপনার দায়িত্ব কি ছিল এবং কেন সে কাজ ছাড়তে চাইছেন?”
এবার স্বপন একটু থতমত খেয়ে যায়। তার পূর্ববর্তী কোন কাজের অভিজ্ঞতা নেই।
“আমার প্রিভিয়াস কোন জব এক্সপেরিয়েন্স নেই। আমি ফ্রেশার।”
ইন্টারভিউ বোর্ডের কর্মকর্তারা কিছুক্ষণ নিজেদের ভেতর ফিসফাস করেন। মিনিট দশেক পর তারা মুখ খোলেন।
মহিলাটি একটু হাসি দিয়ে বললেন, “আসলে একটু ভুল বোঝাবুঝি হয়ে গিয়েছে। আমাদের পোস্টে এক্সপেরিয়েন্সড লোক প্রয়োজন। আপনাকে সম্ভবত ভুলে কল করা হয়েছে। এমন ভুলের জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দু:খিত।”
স্বপন “কোন সমস্যা না” টাইপের কিছু কথাবার্তা বলে ইন্টারভিউ বোর্ড থেকে বের হয়ে আসে। এ নিয়ে এটা তার সপ্তম ইন্টারভিউ, এবং এখানে তার পারফরমেন্স সবচেয়ে ভাল ছিল। প্রতিবারের মত এবারও সে আশায় আশায় ছিল, চাকরিটা বুঝি তার হয়েই যাবে।
মাথার ওপর খাড়া রোদ। স্বপন বাড়ির দিকে না গিয়ে নিয়াজের সাথে দেখা করতে চলে, নিয়াজের অফিসটা কাছেই। ডাকলে হয়তো মিনিট দশেকের জন্য অফিস থেকে বের হতে পারবে নিয়াজ।
“ইন্টারভিউ কেমন হইল দোস্ত?” সিগারেটের ধোয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল নিয়াজ, পাশাপাশি টান দিয়ে গলার টাইয়ের বাধনটায় একটু ঢিল দেয়।
“ভাল হইছে। কিন্তু চাকরিটা হবে না। এক্সপেরিয়েন্স চায়।”
“টেনশন নিস না। তুই ব্রিলিয়ান্ট পাবলিক, বিশাল এক চাকরি পাবি। টেনশন নিস না।” স্বপনের চাকরি না হওয়া নিয়ে নিয়াজের কোন ভাবান্তর দেখা যায় না। “তারপর বল্, অন্যান্য খবর বল্।”
মাথা নাড়ে স্বপন, “আর কোন খবর নাই দোস্ত। কিছু টাকা দরকার, ধার দে। বোনের কলেজের ফিস বাকি পড়ে আছে।”
সিগারেটটা স্বপনের দিকে এগিয়ে দেয় নিয়াজ, স্বপন না করে। সে সিগারেট ছেড়ে দিয়েছে, টাকায় কুলোয় না। নিয়াজ বাকিটা রাস্তায় ফেলে পা দিয়ে পিষে দেয়।
“আসলে হইছে কি দোস্ত, এই মাসে একটু টানের মধ্যে আছি। নিশির বার্থডে আছে সামনে। একটা গিফট কিনছি, খুব দামি। পুরা বেতন শেষ, এমন অবস্থা যে আমারই কর্য করা লাগে।”
“ও।” স্বপন আকাশের দিকে তাকায়। আবহাওয়া ভাল না। ধীরে ধীরে কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে।
“আরে দোস্ত শোন। টাকা পয়সা কিছুই না, বুঝলি? যখন চাকরি করবি, তখন দেখবি, যতই বেতন পাস, পোষাইব না। এরচেয়ে চাকরি না কইরেই ভাল আছিস। ঝুটঝামেলা নাই, বসের ঝাড়ি নাই। মন খারাপ করিস না, তারচেয়ে তোরে একটা জিনিস দেখাই।”
বলে নিয়াজ পকেট থেকে একটা ছোট বাক্স বের করে, তাতে ছোট্ট একটা হীরের আঙটি। মেঘলা দিনেও জ্বলজ্বল করে ওঠে।
“দেখতো কেমন হইছে? নিশি পছন্দ করবে কি না কে জানে? হের টেস্ট বুঝি না। হয়তো বলবে এরচেয়ে একটা টেডি বিয়ার দিতা। মাইয়্যা মাইনষের মন বুঝা খুব কঠিন, বুঝছোস?”
হাসল স্বপন, “সব মানুষেরই মন বুঝা খুব কঠিন রে দোস্ত। খুব কঠিন। তুই থাক, আমি যাই। একটু জরুরী কাজ আছে।”
“যা। আর, মন খারাপ করিস না। তোরে নিয়ে আমরা কিন্তু এখনও গর্ব করি।”
স্বপন আস্তে আস্তে হাটতে থাকে। পকেটে বাসভাড়া থাকা সত্ত্বেও সে বাসে ওঠে না। বৃষ্টির আগে একটু ঠান্ডা ঠান্ডা বাতাস বইছিল, সেই ঠান্ডা বাতাসে হাঁটার অনুভূতিটা খুব মায়াময়।
ছোটবলা থেকে স্বপন শিখেছে, স্কুল-কলেজে ঠিকমত পড়াশোনা করো, ইউনিভার্সিটিতে না পড়লেও চলবে। স্বপন স্কুল, কলেজে ঠিকমত পড়েছে। ইউনিভার্সিটিতেও ঠিকমতই পড়ছিল, হঠাৎ মাঝপথে বাবা মারা যাওয়ায় সব এলোমেলো হয়ে যায়। মধ্যবিত্তের এই এক সমস্যা, উপার্জনক্ষম ব্যক্তি চলে গেলে পুরো পরিবার সাগরে ভাসতে শুরু করে। স্বপন কোনরকম টিউশনি করে তার পড়াশোনা চালিয়েছে। টিউশনির ফাঁকে খুব বেশি পড়ার সময় মেলেনি, তবুও রেজাল্ট মোটামুটি ভাল ছিল তার।
আর পড়াশোনা শেষের পর যখন বাস্তব জগতের সম্মুখীন হল, তখন থেকেই পৃথিবীকে চিনতে শিখল স্বপন। যখন তার ভাগ্যবান বন্ধুরা সেকেন্ড ক্লাস সিজিপিএ নিয়ে শুধুমাত্র লিংকের জোরে বড় বড় কোম্পানিতে ঢুকল, যখন তার বিত্তবান বন্ধুরা সবকিছু বাদ দিয়ে একে একে বিদেশ বিভূইয়ে পাড়ি জমাল, যখন তার কোটাধারী বন্ধুরা একে একে নামকরা সব সরকারি প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতার তুলনায় উচ্চতর পদে অসীন হল, স্বপন তখন যুদ্ধ করছিলো তার একমাত্র টিউশনিটা টিকিয়ে রাখার জন্য। মানুষ যে এখন আর বেকারদের টিউশনিও দিতে চায় না। এই সময়টায় স্বপন খুব ভালভাবে পৃথিবীকে চিনতে শিখল, আপন-পর বুঝতে শিখল। হাজার পঞ্চাশেক বেতনধারী বন্ধুদের এখন আর সময় হয় না স্বপনের দু:খের কথা শোনার।
ছিটে ছিটে বৃষ্টির ছাট পড়তে শুরু করে। স্বপন আবারো আকাশের দিকে তাকায়। কেন ছোটবেলা থেকে বাস্তবতার চরম সত্যটুকু জানানো হয়নি? সারাজীবন ভালভাবে পড়ালেখা করতে হবে, যেভাবেই হোক- সবচেয়ে ভাল রেজাল্ট করতে হবে, আর চাকরি বাজারে যাবার আগে প্রস্তুত হয়ে নিতে হবে, সামনের বড় দু:সময়ের জন্য। ধৈর্য্য ধরতে শিখতে হবে সারা জীবনের জন্য।
এইসব স্বপনদের নাম পৃথিবীর খাতা থেকে মুছে যায়। এরা আমাদের আশেপাশেই থাকে, তাদের আমরা খ্যাত-ফকিন্নি টাইপ বিশেষণ যোগ করে দূরে ঠেলে দেই। তাদের ছেলেমেয়েদের সাথে আমাদের সন্তানদের মিশতে দেই না। তারা জীবনে আর ঘুরে দাড়াতে পারে না। এদের জীবন মধ্যবিত্তের এক দুষ্টচক্রে ঘুরতে থাকে, যার শুরুটা হয়েছিল পছন্দের চকলেটটা চাইতে না পারার বেদনা দিয়ে।
এদের চোখে পানি আসে না, এরা কাঁদে ভেতরে ভেতরে।
⚀সমাপ্ত⚁
✔ ভাল লাগলে ১ হলও রেটিং দিন এতে করে অন্যরাও গল্পটা পরতে উৎসাহীত পাবে ✔
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now