বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

পিছুডাক

"শিক্ষণীয় গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রাসেল পারভেজ (০ পয়েন্ট)

X দেশলাইয়ের কাঠিগুলো বারবার জ্বালাচ্ছি আর নিভাচ্ছি। সামনের ঝোপ ঝাড়ের পাতার ফাকে মিটিমিটি জোনাকি জ্বলছে। রোড লাইটের নিয়ন আলো পার্কের বেঞ্চিতে এসে পড়েছে। তবুও একটু আবছা আলো আবছা অন্ধকার। এই আলো ছায়ার সন্ধিস্থলে একটা দোপেয়ো জীব বসে আছে। বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে "হোমো সেপিয়েন্স "বলে। হ্যাঁ সেই হোমো সেপিয়েন্সটা হচ্ছে আমি। সাঝেঁর কালিমাখা অন্ধকারের নিমন্ত্রণে এখানে এসে বসেছি। মাঝেমধ্যে শূন্য দৃষ্টিতে তাকাচ্ছি প্রায় ৩০ মিটার দূরের ওই স্যাটেলাইট টাওয়ারটার দিকে। লাল রঙ্গের সিগন্যাল বাতিটা একনাগাড়ে জ্বলছে। কোনও বিরাম নেই। আমার ধৈর্য্যটাও এখন বিরামহীন। চাকরীর পিছনে ছুটতে ছুটতে ধৈর্য্যটাও বিরামহীন হয়ে গেছে। পাশে কোথাও একটা কান ঝাঁঝালো শব্দে ঝিঁঝিঁ ডেকে চলছে। কিন্তু তাতেও মনে কোনও বিরক্তির লেশমাত্র নাই। আমার বিরামহীন ধৈর্য্য বিরক্তিকে গ্রাস করে ফেলেছে। . আজ সকাল ১০ টায় একটা চাকরির ইন্টারভিউ ছিলো, তাই তাড়াতাড়ি হাত মুখ ধুয়ে নাস্তা করতে গিয়ে শুনলাম এই মাসে আমি খাবারের টাকা দিতে পারিনি বলে খাবার ব্যাবস্থাপক আমার meal off করে দিয়েছে। তাই না খেয়েই ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছিলাম। জানি ইন্টারভিউটা লোক দেখানো আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। যার চাকরি হওয়ার সেটা আগেই হয়ে গেছে। তবুও সেই আনুষ্ঠানিকতা রক্ষার খাতিরেই ইন্টারভিউতে অংশগ্রহণ করতে হলো। ভাইভাটা ভালোই হয়েছে। তবুও চাকরির আশা করিনা। তারপর সারাদিন রাস্তায় রাস্তায় কাটিয়েছি। পেটের ক্ষুধাটাও ইচ্ছার সাথে সাথে মরে গেছে। অনেকেরই দেখি দুঃখ কষ্টকে সাময়িক চাপা দেওয়ার জন্য সিগারেট খায়। আমিও চেয়েছিলাম। কোঁকড়ানো ২০ টাকার নোটটা দিয়ে মেসের সামনের রফিক মামার দোকান থেকে একটা দেশলাই এবং একটা সিগারেট কিনে এনেছিলাম। সিগারেটটা আমার হাতে দেওয়ার সময় খেয়াল করেছিলাম রফিক মামার হাতটা মৃদু কাপছে। চোখ দুটোতে শূন্য দৃষ্টি আর মুখঅবয়বে এক রাশ বিস্ময়ের চিহ্ন। হয়তোবা আমাকে খুব ভালোবাসে বলেই হঠাৎ শারীরিক ভঙ্গিটা বদলে গেছিলো। হয়তো এক কাতারে নামাজ পড়া ছেলেটার মধ্যে হঠাৎ পরিবর্তন তাকে ঘোরের মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। আমি শুধু একরাশ মুচকি হাসি হেসেছিলাম। তারপর পার্কের কোণের এই বেঞ্চিতে বসে আছি। কয়েকবার সিগারেটটা জ্বালাবার চেষ্টা করেছি। কিন্তু বারবারই ব্যার্থতা আমাকে আলিঙ্গন করেছে। "আল্লাহ তামাক এবং মাদকজাত দ্রব্যকে হারাম করেছেন " তাই বিবেকবোধ আর তাকওয়াবোধ আমাকে বারবার বাধা দিয়েছে। তাই সিগারেটটা ছুড়ে ফেলে দিয়েছি। আর দেশলাইয়ের কাঠিগুলো জ্বালাচ্ছি। হঠাৎ উরু কাঁপানো ভোঁ ভোঁ শব্দে ফোনটা আর্তনাদ করে উঠলো।। স্কিনে চোখ রগড়ে দেখি ছোটবোন তিন্নি। রিসিভ বাটনে চেপে বললাম.. --কেমন আছিস? . -- আছি ভালোই। ভাইয়া তোর চাকরির কিছু হলো? আমি খানিকক্ষণ চুপ থেকে বললাম.. --এইতো চেষ্টায় আছি। আব্বু, আম্মু কেমন আছে রে? . --আব্বুর শরীরটা খুব খারাপ। হাঁপানীটা আবার বেড়েছে। আমি আবার চুপ। ওপাশ থেকে ভীরু কন্ঠে ভেসে এলো.. -- ভাইয়া, হাওরের পানিতে সব ধান ভেসে গেছে। এই মাসে আব্বু টাকা পাঠাতে পারবে না। প্লিজ তুই একটু কষ্ট করে চালিয়ে নে। আমি ফোনের লাইন কেটে বেঞ্চির উপরে রেখে দিলাম। কিইবা বলতাম? যে বাবা ধার দেনা করে আমাকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন, তাকে আমি একটা বেকারত্বের চাকরি দিয়েছি। একজন বর্গাচাষী বাবার চোখে ছেলেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো সত্যিই একটা ফ্যান্টাসি ছিলো। আর তার ফ্যান্টাসিতে আমি একজন খলনায়ক হয়ে দাড়িয়েছি। • ছোট্ট একটা টিউশনি করে কোনও রকমে হাত খরচটা চালায়। কিন্তু একটা প্রবাদ আছে " অভাগা যেদিকে চায়, সাগর শুকায়ে যায়। কথাটা আমার সাথে সংগতিপূর্ণ। দুই মাসের টিউশনি ফি টা আটকে রেখেছে। তাই নানারকমের চিন্তা চেতনা আপনা আপনিই মাথায় এসে ভর করে। সেই চিন্তার বোঝা মাথায় নিয়ে মেসে ফিরছিলাম। প্রাকৃতিক খেয়ালগুলো সব উবে গেছে। মাথা হেট করে হাটছি। হঠাৎ একটা শরীরের আঘাতে চলার গতিটা শ্লথ হয়ে গেল। কে যেন পিছন থেকে আমার উদ্দেশ্যে বিশ্রী ভাষায় গালাগালি ছুড়ে দিলো। পিছনে ফিরে দেখলাম কালো রঙ্গের স্যুট কোট পরা একটা ব্যাক্তি। গায়ের রং টা উজ্জ্বল ফর্সা। লাল রঙ্গের টাই আর দামি সানগ্লাসে ঢাকা মুখটা আমার দিকে ক্রোধের তীর ছুঁড়ে দিচ্ছে। হ্যাঁ চেহারাটা অতি পরিচিত। আমার ক্লাশ ফ্রেন্ড নাঈম। দুই বছরের ব্যাবধানে চেহারা আর বেশভূষাতে দারুন পরিবর্তন এসেছে। আমার দিকে নজর পড়তেই ক্রোধের আগুনে জ্বলা মুখটাতে লজ্জাবোধের চিহ্ন ফুটে উঠলো। কাছে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো.. --দোস্ত আমি চিনতে পারিনি। বল কেমন আছিস? . আমি মিইয়ে পড়া মুখটাতে এক চিলতে হাসি আনার চেষ্টা করে বললাম.. -- এইতো আছি আলহামদুলিল্লাহ। তুই তো দেখছি এখন সাহেব হয়ে গেছিস রে। . -- ধুর কিহ যে বলিস, তোদের দোয়ায় একটা ব্যাবসা করছি। মোটামুটি সংসারটা চলে যাচ্ছে। বল তোর কি অবস্থা? ব্যাবসা করছিস নাকি চাকরি করছিস? . -- আপাতত একটা চাকরির খোজে আছি। ইনসাল্লাহ হয়ে যাবে। . নাঈম আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার ভালোভাবে দেখে নিয়ে বললো.. -- বোধহয় খুব অভাববোধের ভিতরে আছিস? . আমি শুধু হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লাম। নাঈম পকেট থেকে একটা ভিজিটিং কার্ড আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো.. -- চিন্তা করিস না। মনেকর তোর চাকরি হয়ে গেছে। এই ঠিকানায় যোগাযোগ করিস। আর তোর বেতনটা জেনে আসিস। . নাঈমের সাথে কথাবার্তার পাঠ চুকিয়ে বিদায় নিলাম। নাঈমের চাকরির বিষয়ে মনে সন্দেহ জেগে উঠলো। নাঈম হঠাৎ করে কি ব্যাবসা শুরু করলো যে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে গেল। আবার হতেই পারে ভাগ্য চক্রে সে একজন সফল ব্যাবসায়ী। • গত পরশু নাঈমের অফিসে গিয়েছিলাম। বেশ সাজানো গোছানো জাঁকজমকপূর্ণ। তবে অফিসের মুলতো কাজ কি সেটা বুঝতে পারলাম না। অনেকবার আমার কাজ সম্পর্কে জানতে চেয়েছি কিন্তু নাঈম প্রতিবারই হেসে হেসে বলছে.. --তুই আমার বন্ধু। তোকে অন্তত কঠিন কাজ দেব না এই বিষয়ে নিশ্চিত থাক। . আমিও যেঁচে জানতে চায়নি। টাকা হলেই তৃপ্তি। যে টাকা আমাকে ছিটকে দিয়েছে মিথ্যায় ঢাকা ভদ্র সমাজ থেকে। যে টাকার অভাবে ছোটখাটো ইচ্ছে টুকুও পূরন করতে পারিনি। যে টাকা অভাবে আমার বাবাকে শেষ বয়সে অসুস্থ শরীরেও এখনও কাজ করতে হয়, সেই টাকা হলেই তৃপ্তি। • দুদিন পরে শুক্রবারে নাঈম হঠাৎ ফোন দিয়ে আমাকে ডেকে পাঠালো। কারন জানতে চাইলে বললো জরুরি একটা কাজ আছে। নাঈম শত হলেও আমার অফিসের বস সুতরাং বাধ্যবাধকতার জন্য গেলাম। অফিসে পৌঁছে দেখি অফিসে নাঈম ছাড়া কেউ নেই। আমাকে দেখে একগাল হেসে বললো.. --আসলি দোস্ত? আমি তো ভেবেছিলাম আসবি না। . --তুই আমার বস। তোর অধিনে চাকরি করি। আসতে আমি বাধ্য। . নাঈম আমার হাতে একটা ব্যাগ ধরিয়ে দিয়ে বললো, "এখন কাজের কথায় আসি। এই ব্যাগটা তোকে একজনের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।" আমি অনেকটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম এবং ব্যাগের ভিতরে কি আছে জানতে চাইলাম। নাঈম চোখমুখ পাকিয়ে বললো, " তুই আমার অধিনে চাকরি করিস। তোকে আমি যা করতে বলবো তাইই করবি। " আমার সন্দেহের মাত্রাটা আরও বেড়ে গেল। আমি একগুঁয়ে হয়ে বললাম, "ব্যাগের ভিতরে কি আছে তুই যদি না বলিস তায়লে তোর অধিনে আমি চাকরিও করব না। " নাঈম অনেকটা হকচকিয়ে গেল এবং কিছুক্ষন চুপ করে থেকে ব্যাগের মুখটা খুলে দিলো। ব্যাগের দিকে চোখ পড়তেই আমি একদম অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। নিজের চোখটাকে বিশ্বাস করতে পারছি না। মনে হতে লাগলো পায়ের নিচ থেকে মাটিগুলো সরে যাচ্ছে। বিশ্বাসই করতে পারছি না যে নাঈম ইয়াবা ব্যাবসায়ী চক্রের সাথে জড়িত। আমি নাঈমের চোখের দিকে চেয়ে স্তব্ধ হয়ে গেলাম। নাঈম আমার স্তব্ধতা ভঙ্গ করে দিয়ে বললো, "তুই কি চাস টাকার অভাবে তোর বোনের পড়াশোনা বন্ধ হোক? তুই কি চাস তোর হাঁপানী রোগী বাবা টাকার অভাবে বিনা চিকিৎসায় চিকিৎসায় মারা যাক? দেখ বন্ধু দুনিয়াতে টাকা ছাড়া কোনও কিছুর মুল্য নাই। যতক্ষণ তোর টাকা আছে ততক্ষণ তুই আছিস। এই দুনিয়ায় টাকা ছাড়া আবেগের কোনও মুল্যায়ন নাই। সৎ হয়ে কোনও লাভ নাই বন্ধু। " আমি কিছু বলতে চাচ্ছিলাম নাঈম আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললো, " টাকার চিন্তা করছিস? সেটা নিয়ে তুই ভাবিস না। এই চালানটা ভালোভাবে পৌছাতে পারলে তোকে যে টাকা দেব সেটা তোর ৩ মাসের বেতনেরও বেশি। " হঠাৎ আমার চোখের সামনে বাবা -মা আর ছোটবোন তিন্নির মায়াবী মুখটা ভেসে উঠলো। দৈন্যতার করুন সুর মন জুড়ে ভেসে উঠলো। টাকার লোভের গন্ধ মস্তিষ্কের সমস্ত শিরা উপশিরার মধ্যে ঢেলে খেলে বেড়াতে লাগলো। মূহুর্তের মধ্যেই হারিয়ে ফেললাম আমার সততা আর বিবেকবোধকে এবং রাজি হয়ে গেলাম নাঈমের অসৎ প্রস্তাবে। • পূর্ব দিগন্তের সূর্যটা প্রায় অস্তমিত। আস্তে আস্তে চারিদিকে ঢেকে যাচ্ছে অন্ধকারের কালো চাদরে। আমি রাস্তায় একাএকা হাটছি। সাথে সেই ব্যাগ নিয়ে নাঈমের বর্ননামতে সেই গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। মাথার উপর দিয়ে এক ঝাঁক পাখি কিচিরমিচির শব্দে উড়ে গেল। রাস্তার পাশের কোনও একটা গাছ থেকে শালিখের বাচ্চার চিঁচিঁ ডাক ভেসে আসছে। ফুটপাতের এক কোনে একটা লোক কয়েকটা বই হাতে দাড়িয়ে করুন সুরে বলছে, " ভাই আমার একটা বই নিয়ে যান, আমি অন্ধ মানুষ ভিক্ষা করিনা সৎভাবে বই বিক্রি করি। কেউ আছেন ভাই আমার একটা বই নিয়ে যান। " আমি লোকটার দিকে এগিয়ে গেলাম। লোকটা আমার উপস্থিতি টের পেয়ে বললো, " ভাই আমি অন্ধ মানুষ, আমি ভিক্ষা করিনা, আমার একটা বই নিয়ে যান, আমার বাড়িতে ছোট ছোট দুটো ছেলে মেয়ে আছে। আজকে একটা বইও বিক্রি হয়নি। বাচ্চা দুটোর মুখে বোধহয় আজ খাবার তুলে দিতে পারব না। দয়াকরে ভাই একটা বই নেন। " আমি লক্ষ্য করলাম কথাগুলো বলতে গিয়ে লোকটার চোখটা ভেসে গেছে। লোকটার চোখের পানিতে আমার হারিয়ে যাওয়া সততা এবং বিবেক আবার ফিরে এলো। আমি হাতের সেই ইয়াবা ভর্তি ব্যাগটা ড্রেনের ভিতরে ছুড়ে ফেলে দিলাম। এতক্ষণে আমার চোখ দুটোও জলের ছোঁয়ায় ভেসে উঠেছে। পকেট হাতরে দুটো একশো টাকার নোট খুজেঁ পেলাম। সেটাই লোকটার হাতে গুঁজে দিলাম। মসজিদ হতে মাগরিবের আযানের ধ্বনি ভেসে আসছে। সততা আর বিবেকের পিছুডাকে আমি সাড়া দিলাম। হেটে চললাম মসজিদের পানে। হঠাৎ কার যেন একটা হাত আমার কাধ ছুয়ে দিলো। পিছনে ফিরে দেখি আমার মেসের ছোটভাই তমাল। হাতে একটা খাম। খামটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো, " আপনার সেই চাকরির জয়েনিং লেটার। "


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৩ জন


এ জাতীয় গল্প

→ সেই পিছুডাক

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now