বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
আফা ৫ টা টেহা দিবেন?- বলতেই ভদ্র মহিলাটি বাচ্চা মেয়েটিকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো। বাচ্চা মেয়েটি না কেঁদেই আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে চলে গেলো । ভদ্র মহিলাটিকে যতটা ভদ্র ভেবেছিলাম ততটা ভদ্র সে নয়। সে একজন অভদ্র ও ঘৃণিত মহিলা । কিন্তু সাজগোজ দেখে মনে হয় যেনো উনার ভেতরে অনেক দয়ামায়া । একবার ঘৃণার দৃষ্টি নিয়ে মহিলাটিকে দেখেই উঠে পড়লাম। আসলে মানুষকে বাহিরে থেকে যেমন মনে হয় তেমন হয় না ।
.
আমি সেই বাচ্চা মেয়েটিকে খুঁজছি। এই রেল ষ্টেশনের প্লাটফর্মে মেয়েটিকে খুঁজে পাওয়াটা খুবই কঠিন । ঈদের ছুটির যাতায়াত করছে সবাই । লোকজনের অনেক ভীড়। তবুও আমি খুঁজে চলেছি । আমার খোঁজা স্বার্থক হলো । মেয়েটিকে পেলাম । ও আরেকজনকে ধরেছে টাকার জন্য। একজন বয়স্ক লোক। দাদু বলে ডাকছে। লোকটাকে দেখে মনে হচ্ছে সে মেয়েটিকে এখনই ধাক্কা দেবে। কিন্তু না, লোকটি একটা দশ টাকার নোট বের করে মেয়েটিকে দিলো। আমারও খুশি লাগলো । নাহ্ লোকটি ভালো । আর সেই জন্যই হয়তো উনার মাথায় চুল নেই।
.
মেয়েটি দৌড়ে আমার দিকেই আসছে। এবার মনে হয় আমাকে ধরবে ও । এরা খুব সহজ সরলের হয়। মানুষের দুর্ব্যবহার এরা অল্পতেই ভুলে যায় । দশ টাকা পাওয়ার আনন্দটা খুব সহজেই লুকিয়ে ফেললো বাচ্চা মেয়েটি । কি অদ্ভুত গুণ। নিখুঁত অভিনয় করার ক্ষমতা এই মেয়ের আছে। কিন্তু কেউ তার মূল্য দেবে না। কারন মেয়েটি অভিনয়টা খুবই নিম্নমানের করছে । কিন্তু তবুও আমার মনে হচ্ছে মেয়েটি নিখুঁত অভিনয়ে পারদর্শী । ও আমার কাছে এসে চেহারায় দুঃখী ভাবটা ফুটিয়ে বললো, সাহেব পাঁচটা টেহা দিবেন?
- টাকা দিয়ে তুমি কি করবা?( আমি বললাম)
-ওমা টেহা দিয়া মাইনষে কি করে?
-টাকা দিয়ে তো মানুষ অনেক কিছুই করে। তুমি কি করবা?
-আমিও টেহা দিয়া অনেক কিছু করুম।
-তো শুনি কি কি করবা?
.
মেয়েটি আমাকে বলতে যাচ্ছিলো এই সময় আমি ওকে বাধা দিলাম। এক মিনিট এক মিনিট । আচ্ছা তোমার নামটা কি? মেয়েটি তার ফোকলা দাঁতের হাসি দিয়ে বললো - তুম্পা । বুঝলাম ওর নাম টুম্পা। সামনের নিচের সাড়ির দুইটা দাঁত নেই ওর। বয়স আনুমানিক সাত বছর হবে হয়তো। আমি বললাম, আচ্ছা টুম্পা চলো আমরা ঐখানটায় বসে গল্প করি। টুম্পা রাজি হলো না। বললো, না, আমার অনেক লস হইয়া যাবো । কি সাংঘাতিক ব্যাপার মেয়েটি এখনই লাভ-লোকসান কি বুঝে গেছে । আরও বড় হলে কি হবে কে জানে। আমি বললাম, তোমার যা ক্ষতি হবে আমি তা পুষিয়ে দেবো । চলো ।
.
অবশেষে সাত বছরের মেয়েটি যেতে রাজি হলো। ওকে নিয়ে প্লাটফর্মের বাধানো গোল বৃত্তাকার জায়গায় বসলাম। প্লাটফর্মে অনেক মানুষ । কিন্তু কারও নজর আমাদের দিকে নেই। টুম্পা ছেড়া একটা ফ্রগ পরে আছে। ওর গা থেকে বোটকা ঘামের গন্ধ বেরুচ্ছে । কিন্তু আমার খুব একটা অসুবিধা হচ্ছে না। মেসে ফ্রেন্ডদের সাথে শুয়ে শুয়ে ওদের গন্ধ শুঁকে সহ্য হয়ে গেছে। টুম্পাকে এবার জিজ্ঞেস করলাম, তোমার কে কে আছে?
-আমার কেউ নাই । জন্মের পর থেকেই এইহানে বড় হইছি।
-তোমার মা?
-মা তো গত বছর শীতেই ঠান্ডা লাগাই মইরা গেছে।
.
দেখলাম মেয়েটির গলা একটুও কাঁপলো না। চোখের কোণে কোনো পানি নেই। বড্ড কাটখোট্টা স্বভাবের মেয়ে । এই পরিবেশ ওকে এমন বানিয়ে দিয়েছে।
-আচ্ছা তাহলে তুমি টাকা দিয়া কি করো?
-টেহা দিয়া পেটের ক্ষুধা মিটাই ।
-দিনে তোমার কই টাকা করে লাগে খেতে?
-উমমম জানি না । ওদের টেহা দেই। আর ওরা আমায় খাইতে দেই।
-তুমি গুনতে জানো না।
-না। লেহাপড়া শিখি নাই ।
.
সাত বছরের মেয়েটিকে দেখে আমার সত্তর বছরের মহিলার কথা মনে পড়ছে । মেয়েটির কথাবার্তায় বড়মানুষি ভাব আছে । ও কথা বলতে বলতে দৌড়ে চলে গেলো এক মহিলার কাছে। টুম্পার মা বয়সী হবে। দুর থেকে দেখলাম মহিলাটি ওকে দুরদুর করে তাড়িয়ে দিলো। এই পৃথিবীতে খুব কম মানুষী জন্মেছে দয়ামায়া নিয়ে। তাছাড়া সবাই স্বার্থপর । মেয়েটি একটু পর একরাশ হতাশা নিয়ে ফিরে আসলো আমার কাছে। মনে হয় ও আমাকে বিশ্বাস করেছে। সচারচর এ ধরনের কোনো ছেলেমেয়ে কাউকে বিশ্বাস করে না। কারন তাদের বিশ্বাসটুকু অনেক আগেই নষ্ট হয়ে যায়। আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম, ঈদে তোমার জামা-কাপড় নেও না। ও বললো, না।
-তোমার ইচ্ছে করে না ঈদে নতুন জামা-কাপড় পড়তে?
-হুম করে তো। কিন্ত কেউ দেয় না । নতুন জামা-কাপড় কিরম হয়?
.
আমি খুবই অবাক হলাম। মেয়েটি নতুন জামা-কাপড় কি তাই চেনে না। শুধু টাকা ইনকাম করে পেটের ভাত জোগায়। আমি বললাম, তুমি নিবে নতুন জামা-কাপড়? টুম্পা বললো, নিবো , কিন্তু আমার সগ বন্দুকেউ দেওন লাগবো।
-আচ্ছা দেবো। তোমার সব বন্ধু কি তোমার মতোই ছোট?
-হ। কিন্তু একজন বড় আছে।
-কতো বড়?
-মেলা বড় ।
-আচ্ছা সমস্যা নেই। তাহলে আগামী দিন তোমাদের সবার জন্যই নতুন জামা-কাপড় আনবো কেমন । আজকে আমার ট্রেন এসেছে। আজকে যায়।
.
উঠে চলে আসছিলাম । কিন্তু টুম্পার ক্ষতিপূরণ দিতে ভুলে গিয়েছিলাম। পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখছি মেয়েটা নিরুপায় বসে আছে। কেউ বিঃশ্বাসঘাতকতা করলে যেমন হয় আর কি । আমি ওর কাছে গিয়ে ৫০ টাকার একটা নোট এগিয়ে দিলাম। মেয়েটি চিলের মতো ছোঁ মেরে টাকাটা নিয়ে বুকে আগলে ধরলো। মনে হচ্ছে কেউ বুঝি ওর টাকাটা কেড়ে নিবে ।
.
আমি সেদিন চলে এসেছিলাম ষ্টেশন থেকে। আজ ৪ জুলাই । ট্রেনের টিকিট না পাওয়ায় বাসে করে এসেছি । আমার কাঁধ ব্যাগে অনেকগুলো নতুন জামা-কাপড় আছে। টুম্পা ও তার বন্ধুদের জন্য । রিক্সায় উঠে যাচ্ছি ষ্টেশনের দিকে । দুর থেকে আব্দুলপুর ষ্টেশনের নেমপ্লেটটা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সেখানে মনে হচ্ছে বড় ধরনের হট্টগোল হয়েছে । সবাই দৌড়াচ্ছে ষ্টেশনের দিকে। ষ্টেশনের প্লাটফর্মের মাথার উপর ডজন তিনেক কাক উড়ছে । আমার মনটা কেমন জানি অস্থির হয়ে উঠলো টুম্পার জন্য । তাড়াতাড়ি করে ভাড়াটা মিটিয়ে প্লাটফর্মের দিকে দৌড় দিলাম। হ্যাঁ খুব বড় একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে। প্লাটফর্মের সাথে লেগে থাকা রেললাইনের ট্রেনটা বেসামাল হয়ে কাত হয়ে পরেছে।
.
খুব নিচু এবং ছোট্ট প্লাটফর্মটার অর্ধেকটা ট্রেনের পেটের তলে। সবাই সবার আত্মীয়দের উদ্ধার করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে । আমি টুম্পাকে খুঁজছি। কোথাও পাচ্ছি না । অবশেষে তাকে দেখতে পেলাম । কিন্তু খুবই মর্মান্তিক দৃশ্য দেখতে হলো আমাকে । টুম্পার পুরো শরীর ট্রেনের নিচে চাপা পড়ে আছে। মাথাটা শুধু বের হয়ে আছে । কেউ ওকে বের করার জন্য আগ্রহ দেখাচ্ছে না । কারও মনে কষ্ট হচ্ছে না মেয়েটির জন্য। সবাই যেনো খুব আনন্দের সাথে উপভোগ করছে। আমি টুম্পার মাথার কাছে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লাম। দেখলাম মেয়েটির নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেছে । ওর চোখটা বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ওর মুখটা হা করে আছে তাই ওর ফোঁকলা দাঁতের মাঝখানে মাছি উড়ছে। আমি টুম্পার হাতটা ধরলাম। খুব শীতল একটা হাত। কোনো পাল্স নেই । আমার দুচোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে । সামনেই ঈদ । ওর শখ নতুন জামা পড়ার। আমি এনেছি । কিন্তু আর টুম্পা নেই । সাত বছরের নিখুঁত অভিনয় শিল্পীর সমাপ্তি ঘটেছে । ওকে আর অভিনয় করতে হবে না। কিন্তু ও কোনো মর্যাদার সাথে দাফনও পাবে না। ওর দাফন হয়তো বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে হবে । আমার কাঁধের ব্যাগে নতুন ঈদের জামা । আর আমার কোলে টুম্পার নিঃষ্প্রাণ মাথা।
.
আমার সবকিছু কেমন জানি নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে । পরিবেশটা ঝাপসা হয়ে আসছে । নিরুপায় টুম্পাকে রেখে চলে আসতে হচ্ছে । এখন যা কিছু হবে সবই পুলিশি নিয়মে হবে । হয়তো মেয়েটির শরীরটাকে কেটে বের করবে। এছাড়া কোনো উপায় নেই । আমি চলে যাচ্ছি । নতুন জামা গুলো আর কাউকে দিতে পারলাম না। চোখ থেকে পানি টা মুছে নিলাম। টুম্পার দিকে তাকিয়েই হাঁটছি । ধীরে ধীরে চোখের আড়াল হয়ে গেলো টুম্পা ।
.
#লেখকের_কথা
বেশ কিছুদিন হলো কোনো গল্প লিখতে পারছি না। আসলে সময় পাচ্ছি না তাই লেখা হচ্ছে না। অনেক পুরোনো একটা গল্প লেখা ছিলো পোস্ট করলাম। গল্পটার সাথে কেউ কেউ পরিচিত থাকতে পারে। গল্প লিখতে গিয়ে বেশ কষ্ট পেয়েছিলাম। তবুও লিখেছিলাম লেখার তাগিদে নয়। টুম্পার মতো কাউকে নিয়ে লেখার তাগিদেই লিখেছি। ভালো লাগাটা পাঠকের ওপর।
লেখা:- নিনিত নিলয়
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now