বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

স্বপ্ন থেকে বন্ধন

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X গ্রীষ্মের ছুটিতে শহর থেকে গ্রামে ফিরছিলাম। প্রতিবারের থেকে এবার অনেকটা ব্যাপ্তি নিয়ে এসেছি, তাই মনে- মনে অনেক অায়োজনও করে রেখেছি। বাড়িতে পৌঁছলেই রেখা ঘরের কপাটে দাঁড়িয়ে স্থির চাহনিতে অামার দিকে তাকিয়ে থাকে। মেয়েটির চোখ বেয়ে অভিমানের অশ্রু ঝরে। অামি থমকে দাঁড়িয়ে শুধাই, ''কি গো, ঘরে যেতে দেবে না?'' তখন সে অারো অভিমান মিশিয়ে কপাট চেপে দাঁড়ায়। অামি হাত বাড়িয়ে অাঙুলের ডগায় মেয়েটির অশ্রু ছুঁয়ে বলি, 'এবার তোমাকে নিয়ে জয়নপুর বেড়াতে যাব। সে অামার হাত চেপে নয়নজলে ঈষৎ হাসি ফুটিয়ে বলে উঠে, ঠিক তো? অামি বলি, হ্যাঁ গো হ্যাঁ। প্রতিবারই এমন উত্তর পাওয়ার পর সময় এবং সুযোগের অভাবে জয়নপুর যেতে না পারা মেয়েটি না জানি এবার অভিমানে কপাট ছাড়ে কি না। অবশ্য এবার কপাট মুখেই তার হাত ধরে বলব, এই নাও জয়নপুরের টিকিট। একটি তোমার অার একটি অামার। অামরা অাগামীকাল ভোরেই জয়নপুরে রাওয়ানা হবো। এই দেখেই নিশ্চয় মেয়েটির জমাটবাঁধা অভিমানগুলো নিমিষেই গলে যাবে। অামি জানি, মেয়েটির অভিমানের পাল্লাটা ভারি হলেও অামাকে বড্ড বেশি ভালোবাসে। . স্টেশন থেকে দু'কেজি অানার অার এক কেজি অামরুজ নিই। রেখার এদু'টো ফল বড্ড পছন্দের। একটি হাতপাখাও নিয়েছি। গ্রীষ্মের মৌসুমে গ্রামে খুব একটা বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। অার তাছাড়া উঠোনে বসে চাঁদের অালো উপভোগ করিনি অনেকদিন ধরে। রেখা পাশে থাকবে, অামি হাতপাখা দিয়ে তার গায়ে বাতাস করতে-করতে রবীন্দ্রনাথের গানটি নিজ কণ্ঠে ছেড়ে দেবো- ''অামারো পরাণে যাহা চায়গো, তুমি তাই গো তুমি তাই।'' জয়নপুর ভ্রমণে ট্রেনে বসে মেয়েটি অামার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমানোর পূর্বে গানটি শুনতে-শুনতে রাতে একবার ঘুমিয়ে পড়বে। স্টেশন থেকে বাস ছাড়ার পূর্বে এসব ভাবতে- ভাবতে টিকিট কেটে সিটে বসে পড়ি। বাস ছুটে চলছে বিরতিহীন। রেখা এতক্ষণে সবকাজ সেরে ফেলে অামার জন্য অপেক্ষা করতেছে। তাকে বলেছিলাম বিকেল চারটার পূর্বেই পৌঁছে যাব। ঘড়ির কাটায় এখন ১টা:১০। চট্টগ্রাম থেকে চৌদ্দগ্রাম পৌঁছতে অন্তত সন্ধ্যা ছুঁই-ছুঁই হবেই। মেয়েটা ততক্ষণে অপেক্ষায় থাকতে-থাকতে জমে যাবে। তবে এটা সেদিনের অপেক্ষা থেকে বড় হবে না। যেদিন অামি তার চোখে-মুখে হতাশা এবং ভিতরের অাত্মচিৎকার ভেসে উঠতে দেখেছিলাম। . সেদিন সন্ধ্যা ছুঁই-ছুঁই। অাকাশেও ঘন কালো মেঘ। অামি চট্টগ্রাম যাওয়ার জন্য স্টেশন থেকে টিকিট নিচ্ছি। টিকিট নিতে-নিতে খেয়াল করেছি, সেখানে বসে থাকা মানুষগুলোর চোখের দৃষ্টিতে লোভনীয় ছায়া ভাসছে। চোখের সাথে-সাথে তাদের মুখেও অশ্লীল কথাবার্তা। অামি টিকিট কেটে তাদের দৃষ্টি বরাবর তাকাতেই একটা মেয়েকে দেখতে পাই। অদ্ভুত সৌন্দর্যের অধিকারিণী এই মেয়েকে নিয়ে কেন এমনসব হচ্ছে, এটা ভাবতে-ভাবতে অামি তার সামনে গিয়ে দাঁড়াই। মেয়েটা মাথা তুলে স্থির চাহনিতে তাকিয়ে হঠাৎ অামাকে অাকড়ে ধরে বলে উঠে, তোমার অাসতে এত বেলা হলো কেন? অামি কিছু না বুঝার মতোই বিদ্যুৎ চমকিয়ে উঠি। মেয়েটি হু-হু করে কেঁদে উঠল। অামি বিব্রত বোধ করি। হঠাৎ মায়ের কথাটা মাথায় ঝাঁক দিয়ে উঠে। "বাজান, সন্ধ্যে বেলায় যাসনে, এসময় বিপদ ঘুরে।'' অামি ততক্ষণে বুঝে গিয়েছি, বিপদ যে অামার উপর ভর করেছে। মেয়েটি অামার হাত ধরে বাহিরে নিয়ে গেল। অামি বুঝেই উঠতে পারছি না কি করবো! কিছুক্ষণ হেটে এসে স্টেশনটা অাড়াল হতেই অামি থমকে দাঁড়াই। তারপর বলে উঠি, "শুনুন, অামি খুব বিব্রত বোধ করছি। অাপনি অামার সাথে এমন ব্যবহার করছেন কেন? অামাকে যেতে দিন। অামি অাপনাকে চিনি না।" কথাগুলো শুনেই মেয়েটি অামার হাত ছেড়ে ধপাস করে বসে পড়ে। অাবার হু-হু করে কেঁদে উঠে। অাকাশ থেকে তখন ঝিরেঝিরে বৃষ্টি নেমে পড়ে। বৃষ্টি অামাকে একপ্রকার অানন্দ দিলেও মেয়েটির চোখের জল অামাকে চিন্তায় ভারি করে তুলে। অামি বুঝতে পারছি, কোথাও ভুল বুঝাবুঝি হচ্ছে। যেটার গভীরতা অনেক। খুব সহজে এটা সমাধান করা যাবে না। অামি মেয়েটির মাথায় হাত রাখি। সে চোখ তুলে তাকাতেই অামি অগ্যতা হেসে উঠি। মেয়েটি অাবার অামাকে অাকড়ে ধরে। তারপর বলে উঠে, ''সে এগারটা থেকে তোমার জন্য অামি অপেক্ষা করতেছি। তুমি বলেছিলে, ঠিক সময়েই উপস্থিত হবে। তোমার না অাসা দেখে অামি বারবার তোমার মুঠোফোনে কল দিতে থাকি, কিন্তু সংযোগ দিচ্ছিল না। তোমার বলা মতো স্টিশনে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বসে থাকতে দেখে সেখানের মানুষগুলো অামাকে নিয়ে মন্দ বলতে লাগল। তবু অামি উঠিনি, শেষ তুমি এসে যদি অামাকে যথাস্থানে না পেয়ে হতাশ হও।'' . মেয়েটির কথা বলা শেষ হতেই অামার ফোনটা বেজে উঠে। অামি পকেট থেকে ফোনটা বের করে দেখি মা কল দিয়েছে। রিসিভ করতেই মা বলে উঠে, কিরে বাজান গাড়িতে উঠেছিস? মায়ের প্রশ্নের উত্তর কি দেব ভাবতে-ভাবতে মা দ্বিতীয়বার প্রশ্ন করে উঠেন, ''বাজান, কোনো বিপদ হয়নি তো?'' না মা, গাড়ি অাসতে দেরি হচ্ছে। মাকে উত্তর দিয়ে, ফোনটা রেখে মেয়েটিকে বললাম, 'অাপনি অাবার কল দিনতো অামার ফোনে।' মেয়েটি অামার দিকে অাশ্চর্য লোচনে তাকিয়ে, কল দিতে থাকল। অামার ফোন বাজছে না দেখে সে বারবার কল দিয়ে যাচ্ছে। তারপর সে হতাশ হয়ে বলে উঠে, ''তুমি নাম্বারটা চেঞ্জ করে ফেলেছ, তাই না?'' অামি এবার রাগ মিশ্রিত বিরক্তি নিয়ে বলি, 'না, অামি অামার নাম্বার চেঞ্জ করিনি। কিন্তু অাপনি ভুল করতেছেন। অামি অাপনাকে চিনি না।'' অামার কথা শুনে মেয়েটি খানিক নিরবতা কেটে বলে উঠে, ''তুমি অাসিফ। তুমি কাল সকালে চট্টগ্রামের একটা প্রতিষ্ঠানে টিচার হিসেবে জয়েন করবে। অামাদের মাঝে কথা হয়েছিল, অামি সকালে এখানে অাসলে, তুমি অামাকে চট্টগ্রাম নিয়ে যাবে। তারপর সেখানে অামরা বিয়ে করে সংসার করবো। তোমার কথা মতো অামি বাবা-মা পরিবারের সবাইকে ছেড়ে এসেছি। অার তুমি বলছো, তুমি অামাকে চিনো না?'' তার কথাগুলো শুনে অামি স্তব্ধ হয়ে যাই। একটা অচেনা মেয়ে, যাকে অামি কখনোই দেখিনি। অথচ সে অামাকে পুরোটা চিনে, জানে! অাবার বলে তার সাথে নাকি অামার কথা হয়েছে। সে কথা অনুযায়ী অামার জন্য সেই সকাল থেকে অপেক্ষা করতেছে! বড্ড অদ্ভুত ব্যাপার। জীবনে প্রথম অামি এতটা অাশ্চর্য হয়েছি। তবে পুরো হিসেবটা এখনো মিলছে না। এক, মেয়েটি অামার নাম্বার জানে না। দুই, চট্টগ্রামে অামার সকালে যাওয়ার কোনো কথাই ছিল না। তবে কি মেয়েটাকে যে ছেলেটা কথা দিয়েছিল, কাকতালীয়ভাবে এ দু'টো ছাড়া বাকি সবকিছু অামার সাথে মিল? একি শহরে দু'জন মানুষ একি রকম দেখতে? অাচ্ছা, ছেলেটি যদি মেয়েটিকে কথা দিয়ে থাকে, তাহলে সে অাসলো না কেন? এমন সুন্দরী মেয়েকে কীভাবে সে উপেক্ষা করতে পারলো? অামি ভাবতে থাকি। সন্ধ্যা শেষে তখন রাত। অাকাশে মেঘ কেটে তারা দেখা দিয়েছে। হাইওয়ে দিয়ে দুর্বার গতিতে ছুটে চলছে গাড়িগুলো। কখন যে অামার অপেক্ষিত বাসটিও স্টেশন ছেড়ে চলে গেছে, টেরও পাইনি। অামি ভাবতে থাকি অামার সামনে দুটো সিদ্ধান্ত নিয়ে। এক, মেয়েটিকে একা ছেড়ে অন্য বাসে করে চলে যাওয়া। দুই, তাকে নিয়ে বাড়ি ফিরা। - মেয়েটি অামার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে। তার নিশ্বাসের সাথে রাতের দীর্ঘতা বেড়ে চলছে। দু'টো সিদ্ধান্ত। অথচ অামি একটিও গ্রহণ করতে পারছি না। কি অদ্ভুত! যখন ভাবি তাকে একা রেখে চলে যাব, তখন অামার কাঁধে তার অাশা, ভরসা দেখতে পাই। যখন ভাবি তাকে নিয়ে বাড়ি ফিরবো, তখন তার সাথে ছলনা হয়ে যায়। কারণ, সে তো অন্য কাউকে ভালোবাসে। মা বারবার ফোন দিয়ে যাচ্ছে। অামি কোথায়, কতটুকু পৌঁছেছি, জানতে। মাকে বলছি না, অামি ভীষণ সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছি। শুধু বলতেছি, এই তো অার কিছুক্ষণ। মেয়েটি মাঝে-মাঝে মাথা তুলে নিদ্রাচ্ছন্ন চোখে বলে উঠে, ''অামরা কোথায় যাব?'' অামি চুপ করে থাকি, উত্তর দিই না। শুধু ভাবতে থাকি। ভাবতে ভাবতে মেয়েটি অাবার ঘুমিয়ে পড়ে। . রাত বেড়ে যাওয়াতে মাকে ফোন দিয়ে জানিয়ে দিই, অামি বাড়ি ফিরছি। মা অাশ্চর্য হয়ে বলে, বাজান তুই এখনো যাসনি? উত্তরে অামি বলি, 'না মা, যাইনি।' মাকে পুরো ঘটনাটা সংক্ষেপে বলি। মা কিছু বলেনি। মায়ের মৌনতাকে অামি সিদ্ধান্ত হিসেবে ধরে নিয়ে মেয়েটিকে নিয়ে বাড়ি ফিরি। ঘরে যা ছিল, তা কোনো রকম খেয়ে মেয়েটিকে মায়ের সাথে বিছানা তৈরি করে দিই। মেয়েটি গভীর ঘুমে তলিয়ে পড়ে। অামি একা বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকি। সকাল হতেই একটা উপায় বের করতে হবে, না হলে সমাজে মুখ কাটা যাবে। অামি মেয়েটির মোবাইলে বারবার ডায়াল করা নাম্বারটি সংগ্রহ করে সেটাতে কল দিতে থাকি। ফোনের ওপাশ থেকে বারবার অপারেটিং সিস্টেমে ভেসে অাসে, ''অাপনার কাঙ্খিত নাম্বারে এই মুহূর্তে সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। যতবার এই স্বরটি ভেসে অাসে ততবার মাথার ভিতর চিন্তার পোকাগুলোর পায়চারি বাড়তে থাকে। মা একবার উঠে এসে বললেন, ''বাজান, শুয়ে পড়।'' অামি মাকে ঘুমাতে বলে এক-এক করে মেয়েটির সব নাম্বার চেক করি। তার বাবার নাম্বার, মায়ের নাম্বার। হঠাৎ 'ড্যাডি' স্পেলিং দিয়ে সেভ করা নাম্বারটিতে চোখ পড়ে অামার। অামি তার ফোন থেকে নাম্বারটিতে কল দিই। রিসিভার উঠতেই ওপাশ থেকে মাঝ-বয়সি একটি কণ্ঠে ভেসে অাসে, ''কিরে মা, বান্ধবীর বাসায় ঘুম অাসছে না?'' উত্তরে অামি থতমত খেয়ে বসি। কি সাংঘাতিক! মেয়েটি বান্ধবীর বাসায় যাবে বলেই বের হয়েছে। অথচ...। অামি কোনো কথা বলছি না দেখে, মাঝ-বয়সি কণ্ঠটি থেকে অাবার ভেসে অাসে, ''ঘুমিয়ে পড় মা। সকালে তাড়াতাড়ি ফিরিস।'' অামি ফোনটা রেখে দিয়ে মেয়েটির সাথে থাকা ব্যাগটা দেখতে থাকি। ব্যাগে নীল বর্ণের একটি ডায়েরী দেখতে পেয়ে নিজের মাঝে কিছুটা স্থিরতা কাজ করে। অামি ডায়েরীর শুরু ও শেষপ্রান্তের পৃষ্ঠাগুলো দেখতেই একটা ঠিকানা চোখে পড়ে। নাম : তাজনীন রেখা। বাবা : অাশফাক সাহেব। মা : রাবেয়া খাতুন। গ্রাম : জয়নপুর। অামি ডায়েরীটা তার ব্যাগে রেখে জানালার পাশে বসি। বাহিরে তখন চাঁদের অালো। অামি চাঁদ দেখতে থাকি। চাঁদের সাথে অারেকটি রাত জাগা গল্প তৈরি করি। . সকাল হতেই অামি মেয়েটির বাবার নাম্বারে নিজ ফোন থেকে একবার ডায়াল করি। রেখা তখনো বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। ওপাশ থেকে মাঝ-বয়সের কণ্ঠটি ভেসে অাসতেই অামি সালাম বিনিময় করি। উনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে উঠেন, কে তুমি? অামি ধীর কণ্ঠে নিজের পরিচয় দিয়ে পুরো ঘটনাটা উনাকে বুঝিয়ে বলি। উনি ঘটনার পরিসমাপ্তিতে বলে উঠেন, ও মাই গড! ইট ইজ অ্যা ড্রিম ইফেক্ট। উনার মন্তব্যটা শুনে অামি দ্বিতীয়বারের মতো খুব বেশি অাশ্চর্য হই। উনি অাবার বলে উঠেন ''শুন অাসিফ, তোমার বাড়ির ঠিকানাটা অামাকে টেক্সট কর। অামি অাসতেছি।'' অামি সালাম বিনিময় করে ফোনটা রেখে দেই। রেখা ততক্ষণে অামার পিছনে দাঁড়িয়ে। অামি মুখ ফিরিয়ে তার দিকে তাকাতেই, সে বলে উঠে, ''অাসিফ, অামি ফিরে যেতে অাসিনি।'' অামি তার কথাটা হেসে উড়িয়ে দিই। . ১১টা বাজতেই রেখার বাবা এসে উপস্থিত। সাথে একজন ডাক্তার। দু'জনেই অামাকে দেখে মনে হলো অাকাশ থেকে পড়েছে। চোখগুলো কেমন বড়-বড় করে অামার দিকে তাকিয়ে অাছে। তাদের এই ব্যাপারটাকে এড়িয়ে অামি কুশল বিনিময় করতে চেষ্টা করি। দু'জনেই তখন হতভম্ব। অামি বুঝে উঠতে পারছি না কী এমন হয়েছে। হঠাৎ রেখার বাবা বলে উঠেন, তুমি জীবন ভাইয়ের ছেলে? মা তখন এগিয়ে এলেন। অামি মায়ের দিকে তাকিয়ে বলি, উনি অামার মা। অার অামার বাবার নাম শাহ্ অাহমেদ। অামার উত্তরে উনার মুখভঙ্গি দেখে মনে হলো, অামার পরিচয়টা নিতান্তই পাতানো। উনি বলে উঠেন, তুমি যদি জীবন ভাইয়ের ছেলে না হও, তাহলে দু'টো মানুষ একি রকম একি নামে হয় কীভাবে? অামি উনার কথাটা না বুঝার ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকি। উনি অাবার বলে উঠেন, তুমি জীবন ভাইয়ের ছেলে। অযথা মিথ্যে বলে তুমি অামাদের বিব্রত করার চেষ্টা করছ। উনার একথায় অামি হেসে উঠলেও একপ্রকার বিরক্তিবোধ করি। হঠাৎ ডাক্তার সাহেব বলে উঠেন, 'উনার বন্ধু জীবন ভাইয়ের ছেলে অাসিফের সাথে রেখার বিয়ে ঠিক হয়। বিয়ের জন্য অাসিফ তিনমাস সময় নিয়েছে। কারণ সে রেখাকে ভাল করে জানতে চায়। রেখাও একি সম্মতি গ্রহণ করে। এর মাঝে তারা একে অপরকে সময় দিতে থাকে। দু'জন দুজনকে ভাল জেনে নেয় বুঝে নেয়। তিনমাস অতিবাহিত হওয়ার পর বিয়ের সময় যখন অাসন্ন, তখন অাসিফ এক্সিডেন হয়ে মারা যায়। রেখা সেদিন থেকে অনেকদিন যাবৎ বাক্যহীন ছিল। কারণ সে অাসিফকে মন-প্রাণ দিয়ে ভালোবেসে ফেলে। বেশ কয়েকদিন যাবৎ সে এদিক-সেদিক অাসিফের খোঁজে নেমে পড়ে। সকাল থেকে সন্ধ্যা অব্দি ঘুরাঘুরি করে হতাশা মুড়িয়ে বাসায় ফিরে অাসে। অামি জানি গতকাল তোমার সাথে যা হয়েছে এটা ওর স্বপ্ন ছিল। তবে এটা কাকতালীয় যে সেই অাসিফ এবং তুমি দেখতে সম্পূর্ণ একি, এবং স্বপ্নটাও বাস্তবের সাথে মিলে যায়। কিন্তু অামি জানি সেই অাসিফ তুমি নও। কারণ সেই অাসিফের কপালে একটা কাটা দাগ ছিল।'' ডাক্তারের কথা শুনে অামি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও অাশফাক সাহেবকে স্বাভাবিক মনে হলো না। উনি মেয়ের দিকে ভাঙ্গা চাহনিতে তাকিয়ে থাকেন। . বাস যখন ফেনীর সীমানা পার হয়, তখন ঘড়ির কাঁটায় ৪: ০০ টা বাজে। রেখা বারবার ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করছে, কোথায় এসেছি, অার কতক্ষণ লাগবে? অামি ধীর গলায় তাকে এক-এক করে উত্তর দিতে থাকি। . সেদিন অাশফাক সাহেব মেয়ের অমতেই তাকে নিয়ে গেলেন। অামি তাদের বিদায় দিয়ে চট্টগ্রাম রাওয়ানা হলাম। সেখানে পৌঁছে কিছুতেই মনকে স্থির করতে পারছিলাম না। বারংবার রেখার শেষ চাহনিটা ভেসে উঠে। যে চাহনিতে সে অকপটে বলে ফেলেছে অনেক কথা। অামি ভাবতে থাকি গত সন্ধ্যা থেকে রাতের ঘটনাগুলো। এক অন্যরকম টান অনুভব করি মেয়েটার প্রতি। অাশফাক সাহেব নিশ্চয় এতক্ষণে মেয়েকে স্বপ্ন অার বাস্তবতার তফাৎটা বুঝিয়ে দিয়েছেন। গতকাল সে যেগুলো করেছে সেগুলো স্বপ্নের অযুহাতে ছিল। স্বপ্ন কখনো বাস্তবার সাদৃশ্য হতে পারে না। অামি পায়চারি করে যাচ্ছি ভাবনার এপাশ থেকে ওপাশে। রেখা কি ফিরে অাসবে অাবার? হয় তো, অাবার হয় তো না। দ্বিধায় অামার নিশ্বাস ছোট হয়ে অাসছে। হঠাৎ করেই দেখি অাশফাক সাহেব ফোন দিয়েছেন। অামি পড়িমরি করে ফোনটা রিসিভ করতেই অাশফাক সাহেব বলে উঠেন ''অাসিফ, রেখা অাবার তোমার কাছে ছুটে যেতে চাচ্ছে। অামি তাকে বহুবার বুঝিয়েছি। কিন্তু সে শুনছে না। অামার মনে হলো ও তোমার কাছে ভরসা পেয়েছে। উনার কথা শুনে অামার পুরো কায়ায় উৎফুল্লতার ঝড় বয়ে যায়। অামি অাত্মহারা হয়ে পড়ি। মুখে দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না অামার। ফোনের ওপাশ থেকে অাশফাক সাহেব পুনঃরায় বলে উঠেন, ''তুমি কিছু বলছ না যে?'' অামি কোনো রকম নিজেকে সামলে নিয়ে বলে উঠি, অাপনি ফোনটা রেখাকে দিন।'' রেখা ফোনটা হাতে নিতেই তাকে বলে উঠি, 'শুন, অামি অাগামীকাল তোমাদের বাসায় অাসতেছি। তুমি বাসায় থাক।'' অাশফাক সাহেব মেয়ের থেকে ফোনটা নিয়ে হাসতে-হাসতে বলে উঠেন, ''তোমার মাকেও সাথে করে নিয়ে অাসবে। অায়োজন হবে। অামরা পরিবারের সবাই তোমাদের জন্য অপেক্ষা করবো।'' - বাস থেকে নেমে যখন বাড়ি পৌঁছি, তখন সন্ধ্যা ছুঁই-ছুঁই। রেখা কপাট মাঝে দাঁড়িয়ে অভিমানী কণ্ঠে বলে উঠে, ''তোমার অাসতে এতো বেলা হলো কেন?'' অামি অানার, অামরুজ এবং জয়নপুরের টিকিটগুলো তার হস্তদ্বয়ে দিয়ে বলে উঠি, তোমার স্বপ্ন চারণে এতো বেলা হয়েছে । মেয়েটি টিকিটগুলো হাতে পেয়ে খুশিতে অাত্মহারা হয়ে উঠে। এবার বহুদিন পর নিজ পিত্রালয়ে যাওয়া হবে। - গল্প : স্বপ্ন থেকে বন্ধন লিখেছেন : অাবু সুফিয়ান ( Sufian Ovi)


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১১২ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now