বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
২০০২ সালের পহেলা জানুয়ারি। আমি হাঁটছিলাম, আমার খুব কাছের একজন মানুষের সাথে।
আমার একটা হাত ঐ মানুষ টা শক্ত করে ধরে আছে। আরেক হাতে দুই টাকার একটা মধুবন চানাচুরের প্যাকেট। খুবই মজার একটা তড়িৎ খাবার ছিল তখনকার যুগে। কিন্তু এই স্বাদের জিনিস টা তখন আমার হাতে থাকা স্বত্ত্বেও আমি খেতে পারছি না। তার কারন টা হচ্ছে, আমার পাশের মানুষ টা। আমার বাবা। বাবা কোনো মতেই আমার হাত ছাড়বেন না। তার ভাষ্যমতে, "আমার হাত ছেড়ে দিলে আমি রাস্তায় অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটবো, আর ফলস্বরুপ সাইকেল এর নিচে চাপা পড়ব।"
কী ভয়ংকর কথাবার্তা!
যাইহোক মনেমনে মানুষ টাকে একগাদা বকাবকি করছি, আর হাঁটছি।
.
ইটের তৈরি একটা কক্ষে ঢুকলাম।একজন মানুষ চেয়ারে বসে কি যেন লিখছেন। প্রথমে গিয়েই কাঁচা কাঁচা গলায় সালাম দিলাম। ভদ্রলোক একটু অবাকই হলেন বোধহয়।আমার গাল দুটো টেনে জিজ্ঞেস করলেন,
"কী নাম তোমার মামুনি?"
আমি নিজের নাম বললাম। উনি বুঝলেন কি না কে জানে। এর মধ্যে বাবা ওই ভদ্রলোকের সাথে রাজ্যের গল্প শুরু করে দিলেন। আর আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কক্ষের চার দেয়ালে টাঙানো ছবি গুলো দেখছি।এটাই কি স্কুল? এখানেই কী আমার মত পিচ্চি-পাচ্চা রা ভর্তি হয়? অ, আ পড়ে? হুম, আমি স্কুলে ভর্তি হতে এসেছি আমার বাবার সাথে।
.
তখনকার যুগে ভর্তি করানোর নিয়ম ছিল, "বাচ্চার ডান হাতটা মাথার উপর দিয়ে ঘুরিয়ে বাম কান ধরতে হবে।
যদি বাম কান ধরতে পারে, তবেই তাকে প্রথম শ্রেণি তে ভর্তি করানো হবে, নতুবা পরের বছর।"
.
যথারীতি আমাকেও ঐ স্যার টা বলল, ডান হাত দিয়ে বাম কান ধরতে।
আমি তখন আমার তখনকার ছোট্ট ছোট্ট হাত দিয়ে আপ্রাণ ভাবে চেষ্টা করছি, কিন্তু কোনো মতেই ধরতে পারছি না।
বড় মানুষ দুটি আমাকে বারে বারে উৎসাহ দিচ্ছিলেন,
-আরেকটুহ।
-আরেকটু টেনে নাওনা হাতটা।
কিন্তু অবশেষে যখন আমি ব্যর্থ হলাম, তখনই চেয়ারে বসা মানুষটা একটু হতাশ হয়ে বললেন,
-আপনার বাচ্চাকে পরের বছর ভর্তি
করান। ওর বয়স হয়নি।
-নাহ স্যার এই বছরই ভর্তি করান। সামনের মে মাসেই ওর ৬ বছর পূর্ণ হবে।
-ও পারবেতো? সব ছাত্র ছাত্রীরা কিন্তু ওর থেকে বড়।
-পারবে স্যার। আপনি ওকে কিছু জিজ্ঞেস করে দেখুন। আমার বিশ্বাস, ও বলতে পারবে।
এবার ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়ে আমাকে স্বরবর্ণ, ব্যন্জ্ঞনবর্ণ, শতকিয়া, ইংরেজি বর্ণ জিজ্ঞেস করতে থাকলেন। আর আমি ধীরে ধীরে প্রায় সবগুলোর উত্তর দিতে থাকলাম। শুধু মাঝখানে 'ট' বর্ণটা বলতে পারিনি। আমার এখনো মনে আছে, পরে বাড়ি এসে বাবা আমাকে প্রায় ২০ বার 'ট' লিখিয়েছেন।
.
সেই যে জীবনের প্রথম দিনটা বাবা স্কুলে নিয়ে গেলেন। এরপর আর কখনোই তার স্কুলে যাওয়া হয়নি। চাকরি আর ব্যস্ততায় বাড়িতে খুব কমই আসা হতো। আর যখন আসতো তখন স্কুল বন্ধ থাকতো।কারন বাবা বছরে দুই ঈদ আর গ্রীষ্মের ছুটি ছাড়া বাড়ি আসতোনা। কিন্তু বাড়িতে আসলেই আমি যখন ঘুমিয়ে যেতাম, আমার বই খাতা ঘাটাঘাটি করতেন। প্রমাণ স্বরুপ পরের দিন সকালে গোছানো বই গুলা আউলা ঝাউলা হয়ে থাকতো।
.
মাঝরাতে যখন সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকতো, তখন একটা মানুষ জেগে থেকে তার মেয়ের বই খাতা ঘেঁটে ঘেঁটে দেখত।
.
একদিন হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে দেখি, ঘরে বাতি জ্বলছে। বিছানা থেকে নেমে দেখি মোটা ফ্রেমের চশমা চোখে দিয়ে বাবা আমার এস এস সি তে কৃতকার্য হওয়ার জন্য পাওয়া মেডেল আর পুরষ্কারটা এপিঠ ওপিঠ করে খুব নিখুঁত ভাবে দেখছে।একটু পর পর চোখ মুচছেন। আমি উঠে গিয়ে বাবাকে ডাকলাম,
-আব্বু, ঘুমাওনি?
বাবা চমকে গেলেন। আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আমার হাত ধরে টেনে তার পাশে বসালেন। আর একটা দীর্ঘশ্বাস দিয়ে বললেন,
-বুঝলি মা? আমার যখন এস এস সি পরীক্ষা, তখন টাকার জন্য ফর্ম ফিলাপ করতে পারিনি। মা কোনমতেই এতো টাকা দিয়ে ফর্ম ফিলাপ করাবেননা। অবশ্য তাকেও কী বলব বল? আমাদের ছিল অভাবের সংসার।
.
আমি বাবার চোখের দিকে তখন তাকিয়েছিলাম। বাবার চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে। বাবা আবার বলতে শুরু করলেন,
-অল্প কিছু টাকার জন্য আমি এস এস সি
পরীক্ষা দিতে পারিনি। সেদিন থেকে আমার ইচ্ছা, আমি আমার সন্তানদেরকে যতদুর পারি পড়াব। আমার শরীরের শেষ
রক্তবিন্দু দিয়েও চেষ্টা করব।তোরা দুই
বোনই আমার ছেলে। তোদেরকে নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন। অনেক.....
.
সেদিন বাবার কথার জবাবে কোন উত্তর
দিতে পারিনি শুধু নির্বাক হয়ে তার চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। বাবা আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছিলেন। ভালোবাসা কী সেদিন বুঝেছিলাম। মনে মনে আমিও একটা প্রতিজ্ঞা করে ফেললাম। এই মানুষটার এই ছোট্ট ইচ্ছাটা পূরণ করার চেষ্টা আমিও করব। সেদিনের পর থেকেই নিজের মনের ভিতর একটা জেদ চাপে। বাবার হাতটা শক্ত করে ধরে আমি বলেছিলাম,
-আমি বড় হব আব্বু। অনেক বড় হব। তোমার মুখ উজ্জ্বল করব।
.
মেয়েদের জীবনে প্রথম হিরো নাকি তার বাবা। আসলেই কী তাই? হয়ত হ্যাঁ। কিন্তু আমার জীবনে প্রথম এবং শেষ হিরো তুমি, বাবা। তোমার মত করে এতোটা নিঃস্বার্থ ভাবে আমাকে কেউ কোনো দিন ভালোবাসেনি। আর বাসবে ও না। ছোট বেলা থেকে তোমাকে কখনো কাঁদতে দেখিনি, কিন্তু প্রচুর ঘামতে দেখেছি। আমি অসুস্থ হলে তুমি হয়ত মায়ের মত বিলাপ করে কাঁদতে পারো নি, কিন্তু চিন্তায় সারারাত বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে দেখেছি। তবুও কেন তোমার ভেতর টা সবাই বুঝেনা? বলতে পারো, বাবা? মা কে নিয়ে কত হাজার হাজার গান, কবিতা, কতকিছু হয়। তোমাকে নিয়ে কেন হয়না বলতে পারো? কারন তুমি যে তোমার ভেতর টা কাউকে দেখাতে পারো না। তোমার প্রিয় মানুষ গুলোর জন্য জমানো ভালোবাসা টা যে কেউ দেখেনা। তোমার বাইরের চোখ রাঙিয়ে তাকানো টাই যে সবাই দেখে।
সবার কাছে তাদের বাবা কেমন আমি জানিনা। জানতে চাই ও না। আমি শুধু জানি, আমার জীবনে "best" শব্দ টা তোমার জন্যই। তোমার ভালোবাসা একদিনের জন্য নয়। হাজার হাজার বছর ধরে অম্লান থাকুক। প্রতিটা মেয়ের জীবনেই মাথার উপরে ছাদ হয়ে তোমার মত বাবাদের বিশ্বস্ত হাত গুলো থাকুক।
কখনো মুখ ফুটে বলা হয়নি, আর কখনো বলা হবেওনা এই দুনিয়ায়। মৃত্যুর পর যদি উপরওয়ালার ইচ্ছায় কোনোদিন দেখা হয়, তবে শুধু একটা কথাই বলব,
"অনেক বেশি ভালোবাসি তোমায়।"
.
আমি জীবনে তেমন কিছুই করতে পারিনি। তবে এটা শতভাগ নিশ্চিত দিয়ে বলতে পারি যে, যতটুকু করেছি, আর যযতটুকু করছি, সবই তোমার অনুপ্রেরণায় আর ভালোবাসায়।প্রথম দিনই তো তোমার হাত ধরে প্রথম স্কুলে যাওয়া। আমার জীবনে যতটুকু প্রাপ্তি, সবই তোমার জন্যই। তুমি তোমার কথা রেখেছ। মৃত্যুর কয়েক মিনিট আগেও তুমি ভেবেছ,
"এত টাকার ঔষধ কিনার কী দরকার
ছিল?"
আমিও আমার কথা রাখবো বাবা। তোমাকে দেওয়া সেদিনের সেই কথা। তুমি শুধু আমার পাশে থেকো.......
.
লিখা: মৃত্তিকা(সেই মেয়েটি)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now